হাশিম আমলা, ভিভিএস লক্ষ্মণের সমগোত্রীয় বিরাট কোহলি

গাভস্করের জীবনের শেষ টেস্ট ইনিংসকে বলা হয় ঘূর্ণি উইকেটে উচ্চমানের স্পিনের বিরুদ্ধে ব্যাটিংয়ের টিউটোরিয়াল। ওই মানের কোনো ইনিংস বিরাটের ব্যাট থেকে এসেছে কি? ১৯৯৮ সালে চিপকে সিরিজের প্রথম টেস্টেই শচীনের ওয়ার্নকে দমিয়ে দেওয়া ১৫৫, ওই মাঠেই পরের বছর চতুর্থ ইনিংসে আক্রম-ওয়াকার-সাকলিন সমৃদ্ধ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৩৬ – এসব ছিল অতিমানবিক ইনিংস। কারণ ব্যাটার একক লড়াই লড়ছিলেন। তেমন ইনিংসই বা বিরাট খেললেন কবে?

যদি কোনো অস্ট্রেলিয়কে জিজ্ঞেস করেন ‘ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা ডন ব্র্যাডম্যানকে বাদ দিলে আপনাদের সর্বকালের সেরা টেস্ট ব্যাটার কারা?’ উত্তরে মোটামুটি সকলেই যে নামগুলো বলবেন সেগুলো হল – গ্রেগ চ্যাপেল (গড় ৫৩.৮৬), অ্যালান বর্ডার (৫০.৫৬), স্টিভ ওয় (৫১.০৬), রিকি পন্টিং (৫১.৮৫), স্টিভ স্মিথ (৫৬.৭৪)। একই প্রশ্ন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কাউকে করলে যে নামগুলো আসবে সেগুলোও সবার জানা – গারফিল্ড সোবার্স (৫৭.৭৮), ব্রায়ান লারা (৫২.৮৮), ভিভিয়ান রিচার্ডস (৫০.২৩)। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের তিন ডব্লিউও – এভার্টন উইকস (৫৮.৬১), ক্লাইড ওয়ালকট (৫৬.৬৮), ফ্র্যাংক ওরেল (৪৯.৪৮) – আলোচনায় আসবেন। দু-একজন হয়ত জর্জ হেডলির (৬০.৮৩) নামও করতে পারেন, তবে হেডলি মাত্র ২২ খানা টেস্ট খেলেছেন।

ইংরেজদের এই প্রশ্ন করলে তাঁরা আধুনিক ক্রিকেটারদের মধ্যে জো রুটের নাম অবশ্যই করবেন, কারণ জো প্রায় ১৩,০০০ রান করে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই (৫০.৮৭)। ইনিংস শুরু করার মত শক্ত কাজ করে প্রায় সাড়ে বারো হাজার রান করেছেন এবং অধিনায়কত্ব করেছেন বলে অ্যালাস্টেয়ার কুকের নামও এসে পড়বে (৪৫.৩৫)। কিন্তু ইংরেজরা কুকের চেয়ে বেশি করে বলবেন ওয়াল্টার হ্যামন্ড (৫৮.৪৫), কেন ব্যারিংটনের (৫৮.৬৭) কথা। পাকিস্তানিদের সর্বকালের সেরা টেস্ট ব্যাটারদের নাম জিজ্ঞেস করলে অবশ্যই তাঁরা জাভেদ মিয়াঁদাদ (৫২.৫৭), ইনজামাম-উল হক (৪৯.৬০), ইউনিস খানের (৫২.০৫) নাম করবেন। পুরনো দিনের লোকেরা হয়ত জাহির আব্বাস (৪৪.৭৯), হানিফ মহম্মদের (৪৩.৯৯) কথাও বলতে পারেন। কিন্তু প্রথম তিনজনের কীর্তি যে এই দুজনকে ছাড়িয়ে অনেকদূর চলে গেছে তা নিয়ে বিশেষ বিতর্কের অবকাশ নেই।

এই দেশগুলোর চেয়ে অনেক পরে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে শুরু করা শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটপ্রেমীরা অনায়াসে বলবেন তাঁদের দেশের সর্বকালের সেরা ব্যাটারের নাম কুমার সঙ্গকারা (১২,৪০০ রান, গড় ৫৭.৪০)। তাছাড়াও বলবেন মাহেলা জয়বর্ধনের (১১,৮১৪ রান, গড় ৪৯.৮৪) কথা। অরবিন্দ ডি সিলভার নাম আসবে তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে। তিনিই শ্রীলঙ্কার প্রথম তারকা ব্যাটার। কিন্তু সাফল্যে অনেক পিছিয়ে (৬৩৬১ রান, গড় ৪২.৯৭)। বর্ণবৈষম্যের কারণে নির্বাসনে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট ক্রিকেটে ফেরত এসেছে ১৯৯১ সালে। তাই সেদেশের দুজন অসামান্য প্রতিভাধর ব্যাটার গ্রেম পোলক (৬০.৯৭) আর ব্যারি রিচার্ডস (৭২.৫৭) যথাক্রমে ২২ খানা আর চারখানা টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটপ্রেমীরা সর্বকালের সেরা ব্যাটার বলতে জাক কালিস (৫৫.৩৭) আর এবি ডেভিলিয়ার্সের (৫০.৬৬) নাম করবেন। অত্যন্ত অল্প বয়সে, দলের দুঃসময়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে একশোর বেশি টেস্টে অধিনায়কত্ব করে সফল হয়ে, ইনিংস শুরু করার গুরুদায়িত্ব পালন করেও প্রায় দশ হাজার রান করে ফেলা গ্রেম স্মিথের (৪৮.৭০) নামও বলবেন নির্ঘাত। এঁদের পরে হাশিম আমলার (৪৬.৬৪) নামও বলতে পারেন, কারণ তিনিও প্রায় দশ হাজার রান করেছেন। কিন্তু কখনোই ওই তিনজনের আগে আমলার কথা বলবেন না। ঠিক যেমন কোনো ক্যারিবিয়ান ভুলেও তাঁদের সর্বকালের সেরাদের পাশে বসাবেন না শিবনারায়ণ চান্দেরপলকে, যতই তিনি ৫১.৩৭ গড়ে ১১,৮৬৭ রান করুন। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটপ্রেমীরা জানেন যে ৫০ থেকে ৫৫ গড়ের ব্যাটার আর ৪৭ গড়ের ব্যাটারের জাতই আলাদা। এদের এক বন্ধনীতে রেখে আলোচনা করার কোনো মানে হয় না। আর কুড়ি বিশের ক্রিকেটের পেটে চলে যাওয়া ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটরসিকরা আজও বোঝেন, শুধু ধারাবাহিকতা সর্বকালের সেরাদের ক্লাবের পাস নয়। সর্বোচ্চ মানের বোলিংয়ের ঘাড়ে চেপে বসার ক্ষমতাও থাকতে হয়। সেটা চান্দেরপলের ছিল না।

বিরাট কোহলির অবসরগ্রহণ নিয়ে লেখায় তিন-তিনটে অনুচ্ছেদ জুড়ে এই আলোচনা কেন? কারণ এই মুহূর্তে কোনো ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীকে ভারতের সর্বকালের টেস্ট ব্যাটারদের নাম বলতে বললে সুনীল গাভস্কর (৫১.১৪) আর শচীন তেন্ডুলকরের (৫৩.৭৮) সঙ্গে বিরাট কোহলির (৪৬.৮৫) নামই বলবেন, রাহুল দ্রাবিড়ের (৫২.৩১) নাম বলবেন না। এমনকি সোশাল মিডিয়ায় অসংখ্য মানুষকে দেখা যাচ্ছে বিরাটকেই ভারতের সর্বকালের সেরা বলে দিতে। অবশ্য এ আর নতুন কী? তাঁকে তো কবেই গোটা খেলাটার GOAT (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম) আখ্যা দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। অথচ ভারতীয়দের মধ্যে টেস্টে মোট রান (১৩,২৮৮) এবং গড়ের দিক থেকে রাহুল ঠিক শচীনের (১৫,৯২১) পরেই। এমনকি গড়ের দিক থেকে বীরেন্দ্র সেওয়াগও (৪৯.৩৪) কোহলির চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু ৪৭ গড়ের ব্যাটার আর পঞ্চাশের উপরে গড় যে ব্যাটারদের, তারা যে কোনোভাবেই তুলনীয় নয় – সেকথা বললে এখন কেবল ক্রিকেটভক্তরা নয়, প্রাজ্ঞ ধারাভাষ্যকার, ক্রিকেট সাংবাদিক এবং প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও মানবেন না। কথাটা অন্য দেশের ক্রিকেটারদের সম্পর্কে বললে মানতে পারেন, চাই কি ওকথার সপক্ষে চাট্টি যুক্তিও জুগিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু এদেশের ক্রিকেটারদের নিয়ে বললে, বিশেষত বিরাটকে নিয়ে বললে তো গাভস্কর, তেন্ডুলকরও মানবেন না। গাভস্কর তো ইদানীং এত মহান হয়েছেন (বা এত নিচে নেমেছেন) যে ধারাভাষ্যে ঋষভ পন্থের কঠোর সমালোচনা করে পরে আবার সেই সমালোচনাকে ব্যঙ্গ করে তৈরি বিজ্ঞাপনে ঋষভের সঙ্গে মুখও দেখাচ্ছেন।

অতএব বিশেষজ্ঞ এবং ভক্তদের বিরাটপুজোর প্যান্ডেল থেকে বেরিয়ে এসে উনি টেস্ট ক্রিকেটে সর্বকালের সেরাদের মধ্যে ঠিক কোথায় পড়েন তা নিয়ে একটা নির্মোহ আলোচনা করার চেষ্টা চালাচ্ছি। তার সূচনা পরিসংখ্যান দিয়েই করতে হত। কারণ ফুটবল বা হকির চেয়ে ক্রিকেটে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সাফল্য-ব্যর্থতা অনেক বেশি পরিমাপযোগ্য এবং একজন ব্যাটারের সাফল্য পরিমাপ করার জন্য রান আর গড়কে গুরুত্ব দেওয়া আদ্যিকাল থেকে চলে আসছে। তবে কোনো সন্দেহ নেই, আজকাল ক্রিকেটালোচনায় যে পরিসংখ্যানসর্বস্বতা এসে পড়েছে তা পরিহার্য। ক্রিকেট সম্প্রচার প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহজলভ্যতায় আজকাল এমন অনেক পরিসংখ্যান নিয়ে আলোচনা চলে যা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গোঁসাইবাগানের ভূত গল্পের অঙ্কের মাস্টার করালীবাবুর জন্যে মনোরঞ্জক হতে পারে, কিন্তু খেলাটা সম্পর্কে কোনো সত্য উদ্ঘাটন করে না। তাছাড়া খেলাটা খেলে মানুষ, তার মানবিক সুবিধা-অসুবিধা সুস্থতা-অসুস্থতা সমেত; খেলা হয় বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে। এসবের যে প্রভাব খেলার উপর পড়ে, তা অতিক্রম করে মানবিক প্রয়াসের সাফল্য-ব্যর্থতাই ক্রিকেটকে মনোমুগ্ধকর করে তোলে। তার সবকিছু পরিসংখ্যানে ধরা পড়া অসম্ভব। নেভিল কার্ডাসের কথা অনুযায়ী স্কোরবোর্ড গাধা। তা যদি না-ও হয়, স্কোরবোর্ড যে সর্বজ্ঞ নয় তা মানতেই হবে। সুতরাং পরিসংখ্যান পেরিয়েও বিরাটের অবদান নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।

সংখ্যাতীত

সমস্যা হল, সেটা করতে গেলে বিরাটকে বিরাট তো দেখাবেই না, উলটে আরও সাধারণ দেখাবে। কারণ সর্বকালের সেরা যেসব নামের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা হয় (যাঁদের নিয়ে প্রথম তিনটে অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে), তাঁদের আমলের তুলনায় বিরাটের আমলে টেস্ট ক্রিকেট যে অনেক সহজ হয়ে গেছে তা অস্বীকার করা শক্ত। কথাটা কেবল আমিই বলছি এমন নয়। হর্ষ ভোগলে ২০২২ সালে ‘দ্য ফাইনাল ওয়ার্ড’ নামে এক পডকাস্টে কথাটা সবিস্তারে বলেছিলেন এবং সেজন্যে বিস্তর ট্রোলিংয়ের শিকার হয়েছিলেন। প্রসঙ্গটা ছিল তার আগের ৭-৮ বছরে টেস্ট ক্রিকেটে ভারতের আধিপত্য। তিনি যা বলেছিলেন তার বাংলা করলে এরকম দাঁড়ায়

আমি চাই না কেউ মনে করুক একটা দারুণ রেকর্ডের মধ্যে আমি ছিদ্রান্বেষণ করছি। কিন্তু মন দিয়ে রেকর্ডটা দেখলে আপনি দেখবেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় আমরা জিতিনি, নিউজিল্যান্ডে জিতিনি, ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডে ৪-১ হেরেছিলাম। ক্রিকেটের ইতিহাসে এক নম্বর হওয়ার জন্যে এটাই সবচেয়ে সহজ সময়। ৪-০ ফলে অ্যাশেজ জিতলেও এই অস্ট্রেলিয়া অতীতের অস্ট্রেলিয়া দলগুলোর মত নয়। ইংল্যান্ডের অবস্থা বেশ খারাপ। দক্ষিণ আফ্রিকা দলটা নির্বাসন থেকে ফিরে আসার পরে সম্ভবত সবচেয়ে দুর্বল এখন। আমি জানি এটা বিতর্কিত মন্তব্য হয়ে যাচ্ছে। ওদের বোলিং এখনো ওদের দেশে দারুণ। কিন্তু এই দলটা কালিস, আমলা, ডেভিলিয়ার্স, ফ্যাফ, গ্রেম স্মিথের সেই দল নয়। এই দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভারতের দক্ষিণ আফ্রিকায় হারাতে পারা উচিত ছিল।

এই লেখায় আমরা যখন অধিনায়ক বিরাটকে নিয়ে আলোচনা করব, তখন হর্ষের এই উক্তির কাছে আবার ফিরতে হবে। কিন্তু আপাতত এখানে তিনি যা বলেছেন তাকে বিরাটের ব্যাটিং বিচারে কাজে লাগালে কী পাব? বুঝতে পারব যে বিরাটের খেলোয়াড় জীবনের বেশিরভাগ সময় জুড়ে যেসব বোলিং আক্রমণের মোকাবিলা তাঁকে করতে হয়েছে, সেগুলো ক্রিকেটের ইতিহাসে কোথাও জায়গা করে নেওয়ার মত নয়।

অতীতে টেস্ট ক্রিকেটে প্রায় সব দলেই অন্তত একজন সত্যিকারের ফাস্ট বোলার থাকতেন। ‘সত্যিকারের’ বলতে যে বোলারের গতিই মূল শক্তি, স্পিড গানের যুগে বলতে হবে – ঘন্টায় ১৪৫ কিলোমিটারের বেশি। গাভস্করের আমলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের তেমন ৪-৫ জন ছিলেন – অ্যান্ডি রবার্টস, জোয়েল গার্নার, কলিন ক্রফট, মাইকেল হোল্ডিং, ম্যালকম মার্শাল। দম ফেলার ফুরসত পাওয়া যেত না। অস্ট্রেলিয়ার ছিল ডেনিস লিলি আর জেফ থমসনের জুটি, সঙ্গী হিসাবে লেন প্যাসকোর মত কেউ কেউ জুটে যেতেন। ইংল্যান্ডের ছিলেন বব উইলিস, পাকিস্তানের ইমরান খান। নিউজিল্যান্ডের রিচার্ড হেডলি তো একাই একশো। শচীনের আমলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ছিল কার্টলি অ্যামব্রোস আর কোর্টনি ওয়ালশের জোড়া ফলা। সঙ্গে কখনো ইয়ান বিশপ, কখনো প্যাট্রিক প্যাটারসন, কখনো উইনস্টন বেঞ্জামিন বা কেনেথ বেঞ্জামিন, কখনো আবার সেই বার্বাডোজের বিভীষিকা ফ্র্যাংকলিন রোজ। পাকিস্তানের সঙ্গে রাজনৈতিক কারণে বিরাটের একটাও টেস্ট খেলা হল না, শচীনও অল্পই খেলেছেন। কিন্তু যখন খেলেছেন তখন পাকিস্তানের হয়ে বল করেছেন ওয়াসিম আক্রম-ওয়াকার ইউনিস, শোয়েব আখতার। শচীনের ক্রিকেটজীবনের শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ার জোরে বোলার ছিলেন মার্ভ হিউজ, ক্রেগ ম্যাকডারমট, মার্ক হুইটনিরা। পরে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে তাদের বোলিং আক্রমণ। নেতৃত্বে গ্লেন ম্যাকগ্রা, যিনি ঠিক ‘ফাস্ট’ বোলার নন, কিন্তু নিখুঁত লাইন লেংথ এবং সুইং আর সিমের ব্যবহারে ক্রিকেট ইতিহাসে অনন্য। গতি জোগাতে তাঁর পাশে এসে যান ব্রেট লি। তাছাড়াও ছিলেন জেসন গিলেসপি। পল রিফেল, মাইকেল কাসপ্রোউইচ, ড্যামিয়েন ফ্লেমিংরা আসা যাওয়া করেছেন। একমাত্র ইংল্যান্ডেই সে যুগে ডমিনিক কর্ক আর অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ ছাড়া সত্যিকারের জোরে বোলার আসেনি, কিন্তু নিউজিল্যান্ড পেয়েছিল শেন বন্ডকে। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত শচীনের আমলে অ্যালান ডোনাল্ডের নেতৃত্বে এসে পড়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার জোরে বোলাররা – ব্রেট শুলজ, ব্রায়ান ম্যাকমিলান, গতি কম হলেও প্রায় ম্যাকগ্রার মত নিখুঁত ফ্যানি ডেভিলিয়ার্স, লান্স ক্লুজনার, শন পোলক; পরের প্রজন্মে মাখায়া এনতিনি, ডেল স্টেইন, মর্নি মর্কেল।

বিরাট খেললেন কাদের? সারা পৃথিবীতে ক্রিকেট যে হারে বেড়েছে তাতে জোরে বোলারদের পক্ষে গতি ধরে রাখা যে শক্ত তা বলাই বাহুল্য। বিরাটের ক্রিকেটজীবনে গোটা বিশ্বে ১৪৫+ কিলোমিটার/ঘন্টা গতিতে বল করা বোলার হাতে গোনা। একমাত্র ২০১৩-১৪ সাল নাগাদ মিচেল জনসনের সেই গতি ছিল, পরের দিকে ইংল্যান্ডের জোফ্রা আর্চার আর মার্ক উডের। কিন্তু আর্চার ভারতের বিরুদ্ধে মাত্র দুটো টেস্ট খেলেছেন, উড খেলেছেন চারটে। বিরাটের সময়ের বিশ্বসেরা বোলার বলতে দক্ষিণ আফ্রিকার কাগিসো রাবাদা, ইংল্যান্ডের সুইং শিল্পীদ্বয় জেমস অ্যান্ডারসন আর স্টুয়ার্ট ব্রড, অস্ট্রেলিয়ার ত্রয়ী মিচেল স্টার্ক-জশ হেজলউড-প্যাট কামিন্স। রাবাদা, স্টার্ক আর কামিন্স নিজেদের সেরা দিনে নতুন বলে ১৪০-১৪৫ কিলোমিটার/ঘন্টা গতিতে বল করেন। বল পুরনো হয়ে গেলে, পিচ বোলিং সহায়ক না হলে স্টার্ককে ভীষণই নিরামিষ দেখায়। এতটাই, যে ২০১৪ সালে শেন ওয়ার্ন বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করেছিলেন – স্টার্কের শরীরী ভাষা এবং পারফরম্যান্স ‘সফট’। ২০২২ সালে তো বলে দিয়েছিলেন স্টার্ককে দল থেকে বাদ দেওয়া উচিত। কামিন্স তেমন নন, কিন্তু তিনিও কদাচিৎ ব্যাটারকে স্রেফ গতিতে পরাস্ত করেন। হেজলউডের তো গতি অস্ত্রই নয়। তিনি খানিকটা ম্যাকগ্রার মত, মূলত লাইন লেংথ আর বাউন্স ব্যবহার করে সুইং আর সিমের উপর নির্ভর করেন।

ব্রড আর অ্যান্ডারসন যখন তরুণ ছিলেন তখন রাবাদা বা স্টার্কের মত গতিতেই বল করতেন, কিন্তু বিরাটের কেরিয়ার যত এগিয়েছে তত ওঁদের বয়স বেড়েছে এবং গতি কমেছে। ওঁরা মূলত সুইং শিল্পী। তাতেই বিরাটকে বিস্তর নাকানি চোবানি খাইয়েছেন। সেই কারণেই ইংল্যান্ডে ১৭ খানা টেস্ট খেলে বিরাটের গড় মাত্র ৩৩.২১ (১০৪৯ রান, শতরান ২, অর্ধশতরান ৫)। সুইং বোলিং নির্ভর আরেকটা দেশ হল নিউজিল্যান্ড, যাদের দলে টিম সাউদি আর ট্রেন্ট বোল্টের মত বোলার ছিলেন এবং যারা বিরাটের যুগের অন্যতম সেরা টেস্ট দলও বটে। সেই নিউজিল্যান্ডের মাটিতে বিরাট খেলেছেন মাত্র চারটে টেস্ট, গড় ৩৬। নিজের দেশে বা ইংল্যান্ডে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালেও নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিরাটের রেকর্ড বলার মত নয়। সাউদি-বোল্টের দেশের বিরুদ্ধে মোট চোদ্দখানা টেস্ট খেলে এক হাজার রানও করে উঠতে পারেননি, গড় মাত্র ৩৮.৩৬।

তবু তো বেশকিছু বিশ্বমানের সুইং বোলারকে খেলতে হয়েছে, যে ঝামেলায় বিরাটকে একেবারেই পড়তে হয়নি, তা হল বছরের পর বছর উঁচু মানের স্পিনারদের খেলা। শচীন, লারা, পন্টিং, কালিসদের যুগের মত শেন ওয়ার্ন, মুথাইয়া মুরলীধরন, মুস্তাক আহমেদ, সাকলিন মুস্তাকদের মানের স্পিনার আজ একজনও নেই। নাথান লায়ন বড়জোর প্রয়াত ডেরেক আন্ডারউডের মানের। ঘরের মাঠে একটা সিরিজে গ্রেম সোয়ান আর মন্টি পানেসরের বিরুদ্ধে গোটা ভারতীয় ব্যাটিং লাইন-আপ ল্যাজেগোবরে হয়েছিল সেই ২০১২-১৩ মরশুমে, বিরাটও হয়েছিলেন। ওই দুজনের কেরিয়ার লম্বা হলে আলাদা কথা ছিল। কিন্তু সোয়ান দ্রুত অবসর নিয়ে নেন আর পানেসর নাইট ক্লাবে অত্যধিক পান করে ফেলে কেলেঙ্কারি বাধিয়ে ইংল্যান্ড দল থেকে বিতাড়িত হন, ফিরতে পারেননি। বিরাটের ক্রিকেটজীবনে পাকিস্তানের হয়ে অন্তত দুজন বিশ্বমানের স্পিনার টেস্ট ক্রিকেট খেলেছেন – সঈদ আজমল আর ইয়াসির শাহ। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে বিরাটের খেলা হয়নি। কেরিয়ারের শেষদিকে ভারতের মাটিতে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের আনকোরা স্পিনারদের খেলতে গিয়েই বিরাটের কী হাল হয়েছে আমরা দেখেছি। বিরাটভক্তরা অবশ্য এর মধ্যেও তাঁর মহানতা খুঁজে বার করেন। তিনি নাকি অধিনায়ক হিসাবে জিততে চান বলে ভীষণ স্পিন সহায়ক পিচ বানাতে বলতেন, তাই তত রান করতে পারেননি। একই কারণে নাকি তাঁর সমসাময়িক রোহিত শর্মা, অজিঙ্ক রাহানে, চেতেশ্বর পূজারাও দেশের মাঠে স্পিনের বিরুদ্ধে সুবিধা করতে পারেননি। এর চেয়ে হাস্যকর যুক্তি কিছু হতে পারে না। তার কারণ অনেকগুলো।

প্রথমত, ভারতে চিরকালই স্পিন সহায়ক পিচ হয়। এরকম পিচে খেলেই ভারতীয় ব্যাটাররা বড় হন। তাই শচীন, গাভস্কর, রাহুলের মত সর্বকালের সেরাদের কথা ছেড়ে দিন; নভজ্যোৎ সিং সিধুর মত সাধারণ ব্যাটারও দেশের মাঠে স্পিনারদের বিরুদ্ধে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করতেন। ওয়ার্ন এখানে এসে সুবিধা করতে পারেননি, মুরলীরও ভারতের মাটিতে গড় ৪৫.৪৫, যেখানে তাঁর গোটা কেরিয়ারে গড় ২২.৭২। অথচ ওঁদের দলের বিরুদ্ধে ভারতের কুম্বলে, হরভজন সিং প্রমুখ কিন্তু দিব্যি উইকেট নিয়ে গেছেন। সেওয়াগও স্পিনারদের ত্রাস ছিলেন, মহম্মদ আজহারউদ্দিন বা ভিভিএস লক্ষ্মণ ব্যাট করলে তো স্পিন বোলিং একটা করার যোগ্য কাজ বলেই মনে হত না। সুতরাং স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে বিরাট এবং তাঁর প্রজন্মের অন্য ভারতীয় ব্যাটাররা স্পিনটা ভাল খেলতে পারেন না।

দ্বিতীয়ত, স্পিনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতা সত্ত্বেও দেশের মাটিতে বিরাট কিন্তু অনেক রান করেছেন। চোদ্দটা শতরান সহ ৫৫ টেস্টে ৪৩৩৬ রান, গড় ৫৫.৫৮। এই রানগুলো কোন ধরনের পিচে হয়েছিল তাহলে?

তৃতীয়ত, যদি বলা হয় বিরাটের অধিনায়কত্বে এমন ঘূর্ণি পিচ বানানো হত যা ভারতে অভূতপূর্ব এবং তাতে যে কোনো স্পিনার বল করলেই খেলা শক্ত হত, তাহলে মানতে হবে যে ৬৮ টেস্টে অধিনায়কত্ব করে ৪০ খানা জিতে নেওয়ার যে রেকর্ড, তাতে পিচের অবদান বিরাটের অধিনায়কত্বের চেয়ে বেশি। উপরন্তু, রবিচন্দ্রন অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজার কৃতিত্বও তাহলে যতখানি বলা হয় ততখানি নয়। যে কোনো দুজন স্পিনারই ওই ম্যাচগুলো জিতিয়ে দিতে পারতেন। বিরাটভক্তরা এ যুক্তি মানবেন কি?

বিরাটের অধিনায়কত্ব এবং তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে ব্যাটিং নিয়ে কথাবার্তা শেষ করে নেওয়া যাক। এই যে দেখা গেল সত্যিকারের ফাস্ট বোলার এবং উচ্চমানের স্পিনারদের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বিরাট শেষ করলেন ৪৭ গড়ে, তা থেকে কী কী প্রমাণ হয় ভাবি।

তিনি বিশ্বের সর্বকালের সেরাদের মধ্যে তো পড়েনই না, এমনকি পরিসংখ্যানের দিক থেকে ভারতের সেরা পাঁচজন ব্যাটারের মধ্যে পড়লেও নৈপুণ্যে তিনি গাভস্কর, শচীন, রাহুলের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। বরং লক্ষ্মণের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা যায়। দুজনেই অস্ট্রেলিয়ায় সফল আর লক্ষ্মণও কোনোদিন ইংল্যান্ডের মাটিতে সুবিধা করতে পারেননি। বিরাটের ওখানকার রেকর্ডটা তবু ভদ্রস্থ দেখায় ২০১৮ সালের দ্বিতীয় সফরটার জন্যে। ইংল্যান্ড সফরকে যে কোনো ব্যাটারের জাত চেনানোর পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়। সেখানে বিরাটের চেয়ে এমনকি দিলীপ বেঙ্গসরকর আর সৌরভ গাঙ্গুলিও বেশি সফল

তবে শুধু সেকথা নয়। গাভস্কর গোটা ক্রিকেটজীবনে কত হারা ম্যাচ বাঁচিয়ে দিয়েছেন তার হিসাব করাই শক্ত। তা বাদে ১৯৭৬ সালে পোর্ট অফ স্পেনে চতুর্থ ইনিংসে ৪০৩ রান তাড়া করার সময়ে তাঁর ম্যাচ জেতানো শতরান বিপক্ষ বোলিং আর পরিস্থিতির বিচারে মহাকাব্যিক। তেমনই অবিশ্বাস্য ১৯৭৯ সালে লন্ডনের ওভালে চতুর্থ ইনিংসে ৪৩৮ তাড়া করতে নেমে ২২১ রান, যা ভারতকে এক অভাবনীয় জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল। এমনকি গাভস্করের জীবনের শেষ টেস্ট ইনিংসকে বলা হয় ঘূর্ণি উইকেটে উচ্চমানের স্পিনের বিরুদ্ধে ব্যাটিংয়ের টিউটোরিয়াল। ওই মানের কোনো ইনিংস বিরাটের ব্যাট থেকে এসেছে কি?

১৯৯৮ সালে চিপকে সিরিজের প্রথম টেস্টেই শচীনের ওয়ার্নকে দমিয়ে দেওয়া ১৫৫, ওই মাঠেই পরের বছর চতুর্থ ইনিংসে আক্রম-ওয়াকার-সাকলিন সমৃদ্ধ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৩৬ – এসব ছিল অতিমানবিক ইনিংস। কারণ ব্যাটার একক লড়াই লড়ছিলেন। তেমন ইনিংসই বা বিরাট খেললেন কবে? পাকিস্তান ম্যাচটা তো তাও জেতাতে পারেননি শচীন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে চিপকের ঘূর্ণি উইকেটে সোয়ান-পানেসর জুটির বিরুদ্ধে চতুর্থ ইনিংসে শতরান করে সে কাজও করে দিয়েছিলেন। ২০০৪ সালে সিডনিতে তাঁর অপরাজিত ২৪১ রানও ভোলার নয়। ওই ইনিংস যে ঋষিপ্রতিম সংযমের দৃষ্টান্ত, সেকথা বারবার বলা হয়। যা আমরা খেয়াল করি না, তা হল কতগুলো স্কোরিং শট তূণে থাকলে অফসাইডে ড্রাইভ করা প্রায় বন্ধ করে দিয়েও অতগুলো রান করা যায়। বিরাটের হাতে যদি অতরকম শট থাকত, তাহলে শেষ পাঁচ বছরে সাফল্যের লেখচিত্র এভাবে নামত না।

দুই লিটল মাস্টারের তবু অনেক ভক্ত আছে, বিস্তর লেখালিখি হয় ওঁদের নিয়ে। কিন্তু দ্রাবিড়? জীবনের প্রথম টেস্ট সিরিজ ইংল্যান্ডে, দলে তখন ডামাডোল। লর্ডসে অভিষেকেই ৯৫ চাপা পড়ে গিয়েছিল সৌরভের ঝলমলে শতরানের পাশে। কিন্তু নিজের নবম টেস্টেই সব গাছ ছাড়িয়ে ওঠে তাঁর মাথা। জোহানেসবার্গে ডোনাল্ড, পোলক, ম্যাকমিলান, ক্লুজনারের বোলিংয়ে ১৪৮ আর ৮১ করেন। ২০০২ সালে হেডিংলিতে সবুজ পিচে মেঘলা দিনে ১৪৮ তো প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে জেতার অসামান্য কাহিনি। এমনকি জীবনের শেষ ইংল্যান্ড সফরেও, যখন গোটা দলের ব্যাটিং ব্যর্থ, দ্রাবিড় চারটে টেস্টে তিনটে শতরান করে গেছেন। আর এই রত্নখচিত মুকুটের কোহ-ই-নূর অবশ্যই ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ইডেন টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসের ১৮০। বিরাট কোন বিচারে এঁর চেয়ে বড় ব্যাটার?

বিরাট নিজের প্রজন্মেরও এক নম্বর ব্যাটার নন। স্মিথ আর রুট তো বটেই, কেন উইলিয়ামসনের (১০৫ টেস্টে ৯,২৭৬ রান; গড় ৫৪.৮৮, শতরান ৩৩) সঙ্গেও টেস্টে তাঁর তুলনা চলে না।

নিঃসংশয়ে বিরাট নিজের প্রজন্মের সেরা ভারতীয় টেস্ট ব্যাটার। ব্যাট হাতে তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব অস্ট্রেলিয়ার মাঠে রীতিমত মস্তানি। ২০১৪-১৫ মরশুমে চার টেস্টে চারটে শতরান অবিস্মরণীয়। অ্যাডিলেডে দুই ইনিংসেই শতরানও অসাধারণ কীর্তি। পরবর্তীকালেও অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর সেরা খেলা বেরিয়ে এসেছে। ও দেশে সাতখানা শতরান, নিজের কেরিয়ারের গড়ের চেয়ে বেশি গড়ে রান করা যে কোনো ব্যাটারের পক্ষে গর্বের। তিরিশটা শতরান করেছেন, ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দ্বিশতরানও করেছেন। এ তো চাট্টিখানি কথা নয়।

পরিসংখ্যানের বাইরে চলে গেলে অবশ্য বলতে হয় যে গত শতকের তুলনায় এই শতকে অস্ট্রেলিয়ার পিচগুলোর চরিত্র বদলেছে অনেক। তাতে রান করা সহজ হয়েছে। ১৯৯১-৯২ সফরে ভারত যে পিচগুলোতে খেলেছিল তার প্রচণ্ড গতি এবং বাউন্স আজও টের পাওয়া যায় ইউটিউব খুললে। তার সঙ্গে গত ১০-১৫ বছরের পিচগুলোর তফাত বোঝা কঠিন নয়। এই তফাত হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় ড্রপ-ইন পিচ ব্যবহার শুরু হওয়ার পর থেকে। ভারতের এবারের অস্ট্রেলিয়া সফরে পার্থের অপটাস স্টেডিয়ামের পিচ বরং নয়ের দশকের ওয়াকা (Western Australia Cricket Association) মাঠের পিচের কাছাকাছি আচরণ করেছে। এখানে একটা ছোট্ট পরিসংখ্যান হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আজ পর্যন্ত মাত্র চারটে ত্রিশতরান হয়েছে। প্রথমটা এসেছিল ১৯৬৬ সালে মেলবোর্নে বব কাউপারের ব্যাট থেকে। বাকি তিনটেই এই শতাব্দীতে। প্রথমে ২০০৩ সালে ম্যাথু হেডেন পার্থে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ৩৮০ করেন, তারপর ২০১২ সালে ভারতের বিরুদ্ধে অ্যাডিলেডে মাইকেল ক্লার্ক করেন অপরাজিত ৩২৯ আর ২০১৯ সালে সিডনিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ডেভিড ওয়ার্নার অপরাজিত ছিলেন ৩৩৫ রানে।

অধিনায়কত্ব ও উত্তরাধিকার

হর্ষ ভোগলের যে মন্তব্যের কথা উল্লেখ করেছিলাম গোড়ার দিকে, তার কাছে ফিরে যাওয়া যাক। মহেন্দ্র সিং ধোনি আর বিরাটের আমলে ভারতীয় দলের কোচ, টিম ডিরেক্টর ইত্যাদি পদে থাকা রবি শাস্ত্রী যা-ই বলে থাকুন, ঘটনা হল বিরাটের আমলে ভারতের টেস্ট দলের বিদেশে সাফল্য মোটেই ঈর্ষণীয় নয়। হর্ষ একেবারে সত্যি কথা বলেছিলেন। বিরাটের আমলে ভারত নিউজিল্যান্ডকে নিউজিল্যান্ডে হারাতে পারেনি, দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে দুর্বল দলটাকে সামনে পেয়েও দুবারের চেষ্টায় একবারও সিরিজ জিততে পারেনি। গর্ব করার মত সাফল্য বলতে পরপর দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা। তার মধ্যে ২০২০-২১ মরশুমে কিন্তু প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে লজ্জাজনকভাবে ৩৬ রানে অল আউট হয়ে গিয়েছিল বিরাটের ভারত। দ্বিতীয় টেস্ট থেকে তিনি ছিলেন না। মেলবোর্নে লড়াকু শতরান করেন অস্থায়ী অধিনায়ক রাহানে, ভারত জেতে। তারপর সিডনির তৃতীয় টেস্টে হনুমা বিহারী আর অশ্বিন শেষদিনে অত্যাশ্চর্য ব্যাটিং করে ম্যাচ বাঁচিয়ে দেন। ব্রিসবেনে চতুর্থ টেস্ট জিতে ভারত সিরিজ পকেটস্থ করে। এই জয়ের কৃতিত্বও অধিনায়ক বিরাটের হলে আইআইটি, আইআইএম তৈরির কৃতিত্ব ইংরেজদের।

আমাদের আজকাল তথ্যের প্রতি প্রবল অনীহা আর নাটকীয়তার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ। তাই বিরাটের অবসর ঘোষণার পর থেকেই প্রচুর লেখালিখি হচ্ছে ২০২১ সালের লর্ডস টেস্ট নিয়ে। সেখানে চতুর্থ ইনিংসে ৬০ ওভার মত বল করার সুযোগ পেয়ে ভারত ইংল্যান্ডকে ৫১.৫ ওভারেই অল আউট করে ম্যাচ জিতে নেয়। শোনা গিয়েছিল, বিরাট ইংল্যান্ডের ইনিংস শুরুর আগে দলের সবাইকে বলেছেন ‘এই ৬০ ওভার যেন ওদের জন্যে নরক হয়ে দাঁড়ায়’। তারপর ওই জয়। সুতরাং বলা হচ্ছে – ওই আগ্রাসনই ভারতীয় ক্রিকেটকে বিরাটের দান, ওই তাঁর উত্তরাধিকার। যা বলা হচ্ছে না, তা হল, ওই সিরিজটাও কিন্তু ভারত জেতেনি। ঠিক পরের টেস্টেই প্রথম ইনিংসে ভারত ৭৮ রানে অল আউট হয়ে যায়, বিরাট নিজে করেন সাত। আগ্রাসনের ‘আ’ দেখা যায়নি। ম্যাচটা ইনিংসে হারতে হয়।

ভারত ২-১ এগিয়ে থাকা অবস্থায় সিরিজের শেষ টেস্ট খেলাই হয়নি অদ্ভুত কারণে। শাস্ত্রী আর বিরাট কোভিডজনিত বায়ো বাবল ভেঙে এক বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে চলে গিয়েছিলেন। তারপর দেখা যায় শাস্ত্রী, ফিল্ডিং কোচ শ্রীধর, বোলিং কোচ ভরত অরুণ কোভিড পজিটিভ। ফলে ভারত আর শেষ টেস্ট খেলতে চায়নি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের অবশ্য অভিযোগ – তার কয়েকদিন পরেই আইপিএল ফের চালু হওয়ার কথা ছিল। ভারতীয় ক্রিকেটাররা তার জন্যে সুস্থ থাকতেই টেস্টটা খেলতে চাননি। না হয় সেকথা আমরা বিশ্বাস করলাম না। কিন্তু যে বিরাট টেস্ট অন্তপ্রাণ ছিলেন বলে লেখালিখি চলছে, তিনি কোন আক্কেলে বায়ো বাবল ভেঙে অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন ঠিক শেষ টেস্টের আগে? এ প্রশ্ন এতদিন কেউ তোলেননি, আর তুলেই বা কী হবে? যা-ই হোক, ওই পঞ্চম টেস্ট খেলা হয় পরের বছর জুলাইয়ে। ততদিনে বিরাটের টেস্ট অধিনায়কত্ব চলে গেছে। সে ম্যাচে ভারত হারে, সুতরাং সিরিজের ফল হয় ২-২। তার আগের সফরে, অর্থাৎ ২০১৮ সালে, বিরাট প্রায় ছশো রান করলেও সিরিজটা কিন্তু ৪-১ ব্যবধানে হারতে হয়েছিল।

একথা ঠিক যে বিরাটের নেতৃত্বে ভারতকে ভারতে কেউ হারাতে পারেনি। কিন্তু সে এমন কিছু চোখ কপালে তোলার মত ব্যাপার নয়। ভারত সম্পর্কে চিরকালই বলা হত – দেশে বাঘ বিদেশে বেড়াল। গতবছর নিউজিল্যান্ডের কাছে ৩-০ হারার আগে ভারত ঘরের মাঠে শেষ সিরিজ হেরেছিল ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের কাছে। তার আগে ২০০৪-০৫ মরশুমে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট-পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার কাছে। তার আগের সিরিজ হার ছিল ১৯৯৯-২০০০ মরশুমে, হ্যানসি ক্রোনিয়ের দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। অর্থাৎ আড়াই দশকে মোটে চারটে সিরিজ হার। আর গত শতকের ইতিহাস?

অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। সেই অস্ট্রেলিয়া ২০০৪-০৫ মরশুমের ওই জয়ের আগে ভারতে শেষ জিতেছিল ১৯৬৯-৭০ সালে। ইংল্যান্ডের আগের সিরিজ জয় ছিল ১৯৮৪-৮৫ মরশুমে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ দেশে এসে শেষবার সিরিজ জিতেছে ১৯৮৩-৮৪ মরশুমে। শ্রীলঙ্কা আজ পর্যন্ত জেতেনি, নিউজিল্যান্ড তো গতবছরই প্রথম জিতল। তারা শেষবার এ দেশে একটা টেস্ট ম্যাচই জিতেছিল সেই ১৯৮৮ সালে, তাও ১৯৬৯ সালের পর। এমনকি পাকিস্তান, যাদের সঙ্গে আমাদের আবহাওয়া এবং পিচের চরিত্র সবচেয়ে বেশি মেলে, তারাও ১৯৫২-৫৩ থেকে ২০০৭-০৮ পর্যন্ত ভারত সফরে এসে সিরিজ জিততে পেরেছিল মাত্র একবার – ১৯৮৬-৮৭ মরশুমে।

অন্যদিকে ভারতের বিদেশ সফরের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ইংল্যান্ডই একমাত্র দেশ যেখানে ভারত মাঝেমধ্যেই সিরিজ জিতেছে। অধিনায়ক হিসাবে অজিত ওয়াড়েকর জিতেছেন (১৯৭১), কপিল জিতেছেন (১৯৮৬), দ্রাবিড় জিতেছেন (২০০৭)। বিরাট পারেননি। এমনকি নিউজিল্যান্ডেও ভারত মনসুর আলি খান পতৌদি (১৯৬৭-৬৮) আর ধোনির আমলে (২০০৮-০৯) সিরিজ জিতেছিল। বিরাটের আমলে পারেনি।

ভারতকে জোরে বোলারদের দলে পরিণত করা বিরাটের উত্তরাধিকার বলে গণ্য করা হচ্ছে। যেন আটের দশকে ইমরান পাকিস্তানের জন্যে যা করেছিলেন, বিরাট তাই করেছেন। অর্থাৎ ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে খুঁজে খুঁজে আবিষ্কার করেছেন বুমরা, মহম্মদ শামি, মহম্মদ সিরাজ, উমেশ যাদব, ভুবনেশ্বর কুমার প্রমুখকে। অথচ ঘটনা তা নয়, হওয়া সম্ভবও ছিল না। কারণ ভারতীয় দল সারাবছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে বছর পঁচিশেক হয়ে গেল। তার উপর আছে আইপিএল। ফলে বিরাটের মত শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার সুযোগই হয় না। কী করে জানবেন কোথায় কোন ভাল জোরে বোলার আছে? ওই কৃতিত্ব যদি কাউকে দিতে হয় তো দিতে হবে এই পর্বে যাঁরা নির্বাচক ছিলেন তাঁদের। বস্তুত ভারতে জোরে বোলারের সংখ্যা এবং গুণমান বাড়ার একটা ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসের সুবিধাই অধিনায়ক বিরাট পেয়েছেন। একসময় বেদিকে নতুন বলে বল করতে হত, এমনকি গাভস্করও করেছেন দু-একবার। সেখান থেকে বুমরা-শামিতে পৌঁছনো বিরাট নামক কোনো জাদুকরের ইন্দ্রজাল নয়। জিনিয়াস কপিল; তাঁর পিছু পিছু মধ্যমেধার চেতন শর্মা, মনোজ প্রভাকর; তারপর সত্যিকারের গতিময় জাভাগাল শ্রীনাথের সঙ্গে মূলত সুইং বোলার ভেঙ্কটেশ প্রসাদ; অতঃপর জাহির খান, আশিস নেহরা, ইরফান পাঠান, শান্তাকুমারণ শ্রীশান্ত, আর পি সিং; রঞ্জি ট্রফিতে সবুজ পিচ, ন্যাশনাল ক্রিকেট অ্যাকাডেমির যত্ন – এত কিছু পেরিয়ে আজকের জোরে বোলাররা এসেছেন। বস্তুত বিরাট অধিনায়ক হওয়ার আগেই এসে পড়েছিলেন ইশান্ত শর্মা, উমেশ, ভুবনেশ্বর, বুমরা, শামি। এঁদের মধ্যে একমাত্র বুমরার টেস্ট অভিষেকই বিরাটের অধিনায়কত্বে।

তারপর যে জোরে বোলাররা এসেছেন তাঁরা কেউ কিন্তু এখনো ভরসা জাগানোর জায়গায় পৌঁছতে পারেননি। টানা দু-তিনটে সিরিজই খেলে উঠতে পারেন না ফিটনেসের সমস্যায়। প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ, আকাশ দীপ, হর্ষিত রানাদের উপরে পরবর্তী টিম ম্যানেজমেন্টের ভরসা এত কম যে পরপর ৪-৫ খানা টেস্টে সুযোগ দেয় না। অস্ট্রেলিয়া সফরে মেলবোর্নে অবস্থা এমন দাঁড়াল যে অধিনায়ক পারলে বুমরাকে দিয়েই সবকটা ওভার করিয়ে নেন। তাঁকে নিজমুখে বলতে হল – আর পারছি না। শেষ টেস্টে খেলতেই পারলেন না। তাহলে কীরকম পেস ব্যাটারির উত্তরাধিকার অধিনায়ক বিরাটের? উত্তরাধিকার তো তাই, যা একজনের প্রস্থানের পরেও রয়ে যায়।

সুতরাং প্রচারের ঢক্কানিনাদ আর আবেগের বাষ্প সরালে যা দেখতে পাচ্ছি, তা হল বিরাট টেস্ট ব্যাটার হিসাবে সর্বকালের সেরাদের দলে পড়েন না। পড়েন আমলা, লক্ষ্মণদের দলে। এই দলে ঢুকে পড়াও বড় কম কথা নয়। অবশ্য আমলার খাতায় একটা ত্রিশতরান আছে, লক্ষ্মণের এমন একখানা ২৮১ আছে যার জন্যে তাঁর নাম ক্রিকেটের ইতিহাসে অক্ষয়। বিরাটের সেসব নেই। অধিনায়ক হিসাবে পরিসংখ্যানগতভাবে অবশ্যই তিনি ভারতের সেরা, কিন্তু তা ভারতীয় ক্রিকেটের উন্নতির ধারাবাহিকতাতেই। শ্রীকান্তের পর থেকে যাঁরা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি টেস্ট অধিনায়ক হয়েছেন তাঁদের সাফল্যের হার ক্রমশ বেড়েছে। আজহার অতীতের সকলের চেয়ে বেশি সফল, সৌরভ আজহারের চেয়ে বেশি সফল, ধোনি সৌরভের চেয়ে বেশি সফল, বিরাট ধোনির চেয়ে বেশি সফল। আর বিরাটের উত্তরাধিকার কী – সে প্রশ্ন আপাতত উত্তরকালের জন্যে তুলে রাখাই ভাল।

গম্ভীর যুগ নয়, শুরু হচ্ছে নতুন ব্র্যান্ড সন্ধান

ভারত সিন্ধুনদের জল আটকে দিয়ে পাকিস্তানকে সত্যিই শুকিয়ে মারতে পারে কিনা সেটা এখনো ঠিক পরিষ্কার হল না। বিশেষজ্ঞরা একরকম বলছেন, সরকার একরকম বলছে। কিন্তু বিরাট কোহলি আর রোহিত শর্মা টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ায় প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিক এবং সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরা যে পরিমাণ চোখের জল ফেলছেন তা যদি পাকিস্তানের দিকে গড়িয়ে যায় – তাহলে পাকিস্তানিদের আর সিন্ধুর জল নিয়ে দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে। বিশেষ করে বিরাটের অবসরের পর দেখা যাচ্ছে কোনো প্রাক্তন বিস্ময়ে হতবাক, কেউ ভারতীয় দলে নেতৃত্বের শূন্যতা নিয়ে চিন্তিত, কেউ আবার বলছেন বিরাট এখনো হেসে খেলে ২-৩ বছর খেলে দিতে পারত। কেউ কেউ বলেছেন রোহিতকে স্রেফ অধিনায়ক হিসাবেই আসন্ন ইংল্যান্ড সফরে দরকার ছিল। তারপর রান পেয়ে গেলে আরও কয়েকটা সিরিজ খেলতে পারত। এসব যাঁরা বলছেন তাঁরা প্রত্যেকে দীর্ঘদিন পেশাদার ক্রিকেট খেলেছেন, জানেন কত ধানে কত চাল হয়। বহুবছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কভার করা সাংবাদিকরাও লিখে চলেছেন বিরাটের মধ্যে কত ক্রিকেট বাকি ছিল। এই যখন অবস্থা, তখন পাড়া ক্রিকেটের গণ্ডি না পেরনো ক্রিকেটপ্রেমীরা সোশাল মিডিয়ায় ‘অভি না যাও ছোড় কর/কে দিল অভি ভরা নহি’ ইত্যাদি কাব্যি করলে তাঁদের দোষ দেওয়া চলে না। ব্যাপারটা নভেম্বর-ডিসেম্বরে ঘটলে নির্ঘাত কলকাতা বইমেলায় বিরাটকে নিয়ে কবিতা সংকলন, লিটল ম্যাগাজিনের বিশেষ সংখ্যা ইত্যাদি বেরিয়ে যেত। সেই উপনিবেশের যুগে নাক উঁচু সাহেবরা ঘোষণা করেছিল – জনগণের স্মৃতিশক্তি ভাল নয়। কথাটার বহু প্রমাণ আছে, এখন সোশাল মিডিয়ার যুগে তো স্মৃতি নিজেই স্মৃতি হয়ে গেছে। তাই এই হাহুতাশের মাঝে একটু স্মৃতি তাজা করে নেওয়া যাক। যে দুজনের জন্যে এত কান্নাকাটি, শেষ তিনটে সিরিজে (যার প্রথমটা দুর্বল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে, আর পরের দুটোতে ভারত হেরেছে) তাঁদের রানগুলো দেখে নেওয়া যাক।

বিরাট – ৬, ১৭, ৪৭, অপরাজিত ২৯, ০, ৭০, ১, ১৭, ৪, ১, ৫, অপরাজিত ১০০, ৭, ১১, ৩, ব্যাট করেননি, ৩৬, ৫, ১৭, ৬।

রোহিত – ৬, ৫, ২৩, ৮, ২, ৫২, ০, ৮, ১৮, ১১, ৩, ৬, ১০, ব্যাট করেননি, ৩, ৯।

এগুলো দুই তরুণ ক্রিকেটারের রান হলে তাঁদের পৃথিবীর যে কোনো দেশে দল থেকে বাদ দিয়ে বলা হত ‘যাও, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলো গে। ওখানে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করো, তখন আবার সুযোগ দেব।’ কিন্তু কোহলির বয়স ৩৬, রোহিতের ৩৮। এ বয়সে আর ফিরে আসা যায় না। যায় না যে, তার প্রমাণ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের চাপে বহু যুগ পরে রঞ্জি ট্রফি খেলতে গিয়েই দুজনে পেয়ে গিয়েছেন। একজনের স্টাম্প সাধারণ বোলারের আপাত নিরীহ একটা ডেলিভারিতে মাটিতে গড়াগড়ি খেয়েছে।

অন্যজন লেগের দিকে খেলতে গিয়ে ব্যাটের বাইরের কানায় বল লাগিয়ে হাস্যকরভাবে আউট হয়েছেন।

দেশের মাঠে ঘরোয়া ক্রিকেটের পেসারদের খেলতে গিয়েই যাঁদের এই অবস্থা, তাঁরা যে ইংল্যান্ডের গ্রীষ্মে সেখানকার পেসারদের বিরুদ্ধে চোখে অন্ধকার দেখবেন – এটা বোঝার জন্যে সুনীল গাভস্কর বা অনিল কুম্বলের মত বিরাট ক্রিকেটার হতে হয় না, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কভার করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও থাকতে হয় না। যখন রোহিত আর বিরাটের বয়স কম ছিল, তখন ইংল্যান্ডে গিয়ে তাঁরা কী করেছেন তা খেয়াল রাখলে আরও পরিষ্কার হয় যে এবার ইংল্যান্ডে গিয়ে দলের উপকারে আসা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব ছিল।

রোহিত ইংল্যান্ডের মাটিতে সাতটা টেস্ট খেলেছেন। সেখানে ১৪ ইনিংসে ৫০ পেরিয়েছেন মাত্র দুবার, শতরান মোটে একটা। তাঁর পক্ষে বলার মত কথা একটাই – তিনি ৫২৪ রান করেছেন ৪০.৩০ গড়ে, যা তাঁর গোটা টেস্ট জীবনের গড়ের প্রায় সমান। অর্থাৎ তিনি অন্য দেশের চেয়ে ইংল্যান্ডে বেশি খারাপ খেলেননি। কিন্তু বিরাট?

ইংল্যান্ডে ১৭ খানা টেস্ট খেলে ৩৩ ইনিংসে ১০৯৬ রান। শতরান দুটো, অর্ধশতরান পাঁচটা। বিরাটের টেস্টে গড় যেখানে ৪৬.৮৫, সেখানে ইংল্যান্ডে গড় মাত্র ৩৩.২১। ২০১৪ সালের সফরে তো তাঁর সর্বোচ্চ রান ৩৯, জেমস অ্যান্ডারসন সাক্ষাৎ যম হয়ে উঠেছিলেন বিরাটের জন্য। ২০১৮ সালে অনেক উন্নতি করেন। সিরিজটা শুরুই করেন এজবাস্টনের প্রথম ইনিংসে ১৪৯ দিয়ে, দ্বিতীয় ইনিংসেও ৫১। তৃতীয় টেস্টে ট্রেন্টব্রিজে প্রথম ইনিংসে প্রায় শতরান (৯৭), দ্বিতীয় ইনিংসে ১০৩। পরের দুটো টেস্টেও ধারাবাহিক ছিলেন, শুধু ওভালের শেষ টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে শূন্য রানে আউট হন। ২০২১-২২ জুড়ে হওয়া পাঁচ টেস্টের সিরিজে কিন্তু আবার ব্যর্থ। মাত্র দুবার ৫০ পেরিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের জুনে ওভালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালেও ১৪ আর ৪৯। এই বিরাট আগামী ইংল্যান্ড সফরে থাকবেন না বলে ভারতীয় দলের বিরাট ক্ষতি হবে? সচেতনভাবে একথা দুই ধরনের লোক বলতে পারে – ১) অন্ধ বিরাট ভক্ত, ২) বিরাট নামক ব্র্যান্ড ঘিরে যাদের ব্যবসা।

আমাদের প্রবাদপ্রতিম প্রাক্তন ক্রিকেটাররা, ধারাভাষ্যকাররা এবং সংবাদমাধ্যম দ্বিতীয় দলের সদস্য। বিশ্ব ক্রিকেটে বিরাটের উপর যত টাকা লগ্নি করা রয়েছে তার ধারে কাছে কেউ নেই। ভারতীয় ক্রিকেটে দ্বিতীয় স্থানে রোহিত। এটা বোঝার জন্যে খুব বেশি গবেষণা করতে হবে না। নিজের বাড়ির টিভি বা হাতের মোবাইলের ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপনগুলো খেয়াল করলেই টের পাবেন। ভারত-ইংল্যান্ড সিরিজের সম্প্রচার স্বত্ব পেতে যে টাকা খরচ করেছে সম্প্রচার সংস্থা, ওঁরা দুজন না খেললে সে টাকা উঠে আসবে কিনা সন্দেহ। কারণ অধিকাংশ ভারতীয় ক্রিকেট দেখেন না, ক্রিকেটার দেখেন। প্রীতি জিন্টা থেকে শুরু করে পাড়ার পাঁচুদা – অনেককেই বলতে দেখা যাচ্ছে ‘বিরাট না খেললে আর টেস্ট দেখব না’। এ থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় – এঁরা কোনোদিনই টেস্ট দেখতেন না, বিরাটকেই দেখতেন। এমনিতে এমন দর্শক চিরকালই ছিল। শচীন তেন্ডুলকর আউট হয়ে গেলে টিভি বন্ধ করে দেওয়া, বাঙালির ক্ষেত্রে সৌরভ আউট হয়ে গেলে টিভি বন্ধ করে দেওয়া – এসব হত। গাভস্করের যুগে রেডিও বন্ধ করে দেওয়ার কাহিনিও আছে। কারণ ভারতীয়দের ব্যক্তিপুজোর অভ্যাস সুপ্রাচীন। আমাদের দেশের প্রাচীনতম দুটো মহাকাব্যই লেখা হয়েছে দুজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে – রাম আর কৃষ্ণ। তার উপর ক্রিকেট বোধহয় একমাত্র দলগত খেলা, যেখানে মূল লড়াইটা সারাক্ষণ দুজন ব্যক্তির মধ্যে চলে। তার উপর ব্যাটারকে হেলমেট-টেলমেট পরে বেশ যোদ্ধা যোদ্ধা দেখায়। বিরাট, রোহিতের যুগ আবার ‘নিউ ইন্ডিয়া’-র যুগ। মানে অশোক চক্রের চেয়ে সুদর্শন চক্রের জনপ্রিয়তা বেশি। ফলে তাঁদের নিয়ে যে মানুষ বেশি গদগদ হবে এতে আর আশ্চর্য কী? কিন্তু সমস্যা অন্যত্র।

গাভস্কর, শচীনদের আমলের তুলনায় এখন কিন্তু ভারত দল হিসাবে অনেক বেশি পরিপূর্ণ। দুজনের কারোর খেলোয়াড় জীবনেই যশপ্রীত বুমরার মত কেউ ভারতীয় দলে ছিলেন না, যিনি কখনো গতিতে কখনো সুইংয়ে কখনো কাটে ব্যাটারদের পরাস্ত করতে পারেন। কপিলদেব ছিলেন, কিন্তু যোগ্য সঙ্গী পাননি। বুমরা অন্য প্রান্তে মহম্মদ শামিকে পেয়েছেন, বিভিন্ন সময়ে আরও অনেককে পেয়েছেন। শচীনের ক্রিকেটজীবনের দ্বিতীয়ার্ধে রাহুল দ্রাবিড়, সৌরভ গাঙ্গুলি, বীরেন্দ্র সেওয়াগ, ভিভিএস লক্ষ্মণরা এসেছিলেন বটে, কিন্তু বালক বয়সে ভারতীয় ব্যাটিং বলতেই ছিলেন তিনি। ফলে তাঁর অতিমানবিক ভাবমূর্তি তৈরি হওয়ার ক্রিকেটিয় কারণও ছিল। গাভস্করের তো গোটা ক্রিকেটজীবনেই ভারতীয় দল মানে তিনি একা এবং কয়েকজন। সেই কয়েকজনের মধ্যে আবার ৯০% হলেন বেদি-এরাপল্লি প্রসন্ন-ভাগবত চন্দ্রশেখর। ফলে ভারত জিতত কালেভদ্রে। বিরাট, রোহিতদের আমলে কিন্তু দল অনেক বেশি ম্যাচ জেতে। মনোরঞ্জক খেলোয়াড়ও দু-একজন নয়। তবু এরকম ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা কেন? কারণ আমাদের মাথা – ক্ষয়ে গেছে ওটা, ব্র্যান্ডে গিলিয়াছে গোটা। তাই ক্রমাগত ব্যর্থ হয়ে চলা, স্পষ্টত ফুরিয়ে যাওয়া ক্রিকেটারকেও দলবদ্ধভাবে ‘যেতে নাহি দিব’ বলা চলছে।

ক্রিকেটভক্তদের অনেকে দেরিতে হলেও উপলব্ধি করেছেন যে ভারতীয় ক্রিকেট দলটা আসলে বিজেপির করতলগত হয়েছে, তারা যেভাবে চালাচ্ছে সেভাবেই চলছে। কিন্তু সেই উপলব্ধি থেকে আশ্চর্য অতিসরলীকৃত ধারণায় পৌঁছে গেছেন। তাঁদের তত্ত্ব হল – প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ গৌতম গম্ভীর দলটাকে নিজের মর্জি মত চালাতে চান, এই দুজন থাকলে সুবিধা হচ্ছিল না। তাই ওঁরই চক্রান্তে এঁদের চলে যেতে হল। গম্ভীর যে সুবিধার লোক নন তাতে সন্দেহ নেই, তাঁর হাতে জাতীয় ক্রিকেট দলের রাশ থাকলে যে আরএসএস-বিজেপির খুশি হওয়ার কথা তাও অতীতে লিখেছি। কিন্তু তাতে তো বিরাট, রোহিতের ক্রমাগত ব্যর্থতা মিথ্যে হয়ে যায় না। দলের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দুজনকে স্রেফ ব্র্যান্ড মূল্যের জন্যে বয়ে চলার অন্যায়টাও ন্যায় হয়ে যায় না। তাছাড়া বিরাট আর রোহিত দলের মধ্যে মোটেই কোনো ধুন্ধুমার ধর্মনিরপেক্ষ লড়াই চালাচ্ছিলেন না, যে সে জন্যে তাঁদের দল থেকে বার করা বিজেপির আশু প্রয়োজন হয়ে উঠবে।

টেস্ট ক্রিকেটে রোহিত শর্মা একজন মাঝারি ক্রিকেটারের নাম কিনা, আর বিরাট কোহলি এমনকি নিজের সময়েরও অবিসংবাদী বিশ্বসেরা কিনা, তা অন্য আলোচনার বিষয়। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটে গম্ভীর যুগ শুরু হতে চলেছে বলে যে হইচই চলছে কদিন ধরে, সে ব্যাপারে কটা কথা বলা দরকার। ভারতীয় দলের সঙ্গে নিয়মিত ঘোরেন যে সাংবাদিকরা, তাঁদের পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদনগুলো থেকে যে নির্যাস বেরিয়ে আসে তা হল – গম্ভীর তারকা প্রথা ভাঙতে চান। কিন্তু ভাঙতে চাইলেই তো হল না। ভারতে ক্রিকেট হল কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। সেই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তারকা, মহাতারকা লাগবেই আর ক্রিকেট ব্যবসায়ীরা নিজেদের প্রয়োজনে তা বানিয়েও নেবে। গম্ভীর আটকাতে পারবেন না, আটকাতে চাওয়ার মত বোকাও তিনি নিশ্চয়ই নন। আসলে তিনি দল সংক্রান্ত বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো নিজে নিতে চাইছেন। সেটা আধুনিক ক্রিকেটের ইতিহাসে অভূতপূর্ব কিছু নয়। আটের দশকে অস্ট্রেলিয়া দলে বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো ববি সিম্পসনই নিতেন, যতদিন না অ্যালান বর্ডার অধিনায়ক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। নয়ের দশকে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ করতেন বব উলমার। তাতে দলের ক্ষতি হয়নি, ভালই হয়েছে। উলমারের তো এত প্রভাব ছিল দলের উপর যে, ১৯৯৯ বিশ্বকাপে তিনি ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে ফিল্ডিংয়ের সময়ে অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রোনিয়েকে ইয়ারফোনের মাধ্যমে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। আইসিসি নিষেধ করে দেয়

লেখালিখি হচ্ছে – গম্ভীর যুগ এসে পড়ায় ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে এই প্রথম নাকি এমন একটা যুগ আসতে চলেছে যখন কোনো ক্রিকেটারের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হবেন কোচ। একেবারে ভুল তথ্য। ভারতের সফলতম টেস্ট অধিনায়ক হিসাবে এখনো চার নম্বরে থাকা মহম্মদ আজহারউদ্দিনকে প্রবল প্রতাপশালী রাজ সিং দুঙ্গারপুর, কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্তের পর অধিনায়ক করে দিয়েছিলেন দলে কপিলদেব, দিলীপ বেঙ্গসরকর, রবি শাস্ত্রীর মত প্রাক্তন অধিনায়ক এবং তারকা থাকা সত্ত্বেও। আজহার তখন শুভমান গিলের (যিনি অধিনায়ক হবেন বলে শোনা যাচ্ছে) মতই উঠতি তারকা, একদিন ভারত অধিনায়ক হতে পারেন বলে অনেকে ভাবে। কিন্তু অত তাড়াতাড়ি হয়ে যাবেন – একথা আজহার নিজেও ভাবেননি। বোর্ডের ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল এমন একজনকে অধিনায়ক করা, যার নিজের প্রবল প্রতাপ নেই। আজহারের দলের কোচ করে দেওয়া হয়েছিল প্রবাদপ্রতিম বিষাণ সিং বেদিকে, ক্রিকেটার হিসাবে গম্ভীর যাঁর নখের যুগ্যি নন। তারপর প্রবল অশান্তি। ১৯৯০ সালে ইংল্যান্ড সফরে গিয়ে লর্ডস টেস্টে বেদি নাকি আজহারকে বলেছিলেন টস জিতে ব্যাটিং নিতে, কিন্তু আজহার ফিল্ডিং নেন। তারপর গ্রাহাম গুচ একাই ৩৩৩ করেন, ভারত কোনোমতে ফলো অন বাঁচালেও শোচনীয়ভাবে হারে। সিরিজ তো হারেই। তার আগে নিউজিল্যান্ডে ব্যর্থতা, ইংল্যান্ডের পর অস্ট্রেলিয়ায় চূড়ান্ত ব্যর্থতা এবং একটা জেতা একদিনের ম্যাচ হেরে যাওয়া নিয়ে বেদির প্রকাশ্য মন্তব্যে বিতর্ক। বেদির জায়গায় আব্বাস আলি বেগ দায়িত্ব নেওয়ার পরে আজহারের প্রভাব বাড়ে, কিন্তু দল সাফল্যের মুখ দেখেনি। আজহার জিততে শুরু করেন ১৯৯২-৯৩ মরশুমে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড সিরিজ থেকে। তার পিছনেও বড় কারণ কোচ অজিত ওয়াড়েকরের মাথা। ঘূর্ণি পিচ বানিয়ে কুম্বলে-ভেঙ্কটপতি রাজু-রাজেশ চৌহানকে লেলিয়ে দেওয়ার বুদ্ধি তাঁরই ছিল। ১৯৯৬ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে হারের আগে আজহার-ওয়াড়েকর জুটিকে ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই দলে ছিলেন অস্তাচলের কপিল, অধিনায়কের সঙ্গে সুসম্পর্ক না থাকলেও তারকা শাস্ত্রী আর ক্রমশ তারকা হয়ে উঠতে থাকা শচীন, বিনোদ কাম্বলি, কুম্বলেরা।

আসন্ন ইংল্যান্ড সফরে গম্ভীর যে দল নিয়ে যাবেন তার চেহারা অনেকটা আজহার-ওয়াড়েকরের প্রথম দলটার মত হতে চলেছে। যে দলে বুমরা আছেন, সে দলে তারকা নেই – একথা বলা আহাম্মকি। গিল যতটা সাড়া জাগিয়ে শুরু করেছিলেন, এখন সেই তুলনায় বিবর্ণ। কিন্তু তাঁর প্রায় গোটা ক্রিকেটজীবন পড়ে আছে ফর্ম ফিরে পাওয়ার জন্যে। তাছাড়াও থাকবেন প্রতিভাবান পন্থ, ৫৮ খানা টেস্ট খেলার পরেও প্রতিশ্রুতিমান কে এল রাহুল, ৮০ খানা টেস্ট খেলে ফেলা রবীন্দ্র জাদেজা। একটা দল খেলতে পারলে জেতার জন্যে এর থেকে বেশি অভিজ্ঞতার প্রয়োজন পড়ে না। এঁদের সঙ্গে যুক্ত হবেন ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে ভাল খেলে আসা তরুণ সাই সুদর্শন বা ধ্রুব জুড়েলরা। ফলে বিজ্ঞাপনদাতাদেরও একজন বা কয়েকজনকে খুঁজে নিয়ে নতুন ব্র্যান্ড তৈরি করার যথেষ্ট অবকাশ আছে। কেউ একজন সফল হলেই তাকে আকাশে তুলে দেওয়া হবে নিমেষের মধ্যে। দু-এক বছরের মধ্যেই এমন অনেককে পাওয়া যাবে যারা বলবে ‘শুভমানের জন্যেই খেলা দেখি’ বা ‘ঋষভের জন্যেই খেলা দেখি’। সুতরাং নিশ্চিন্ত থাকুন, গম্ভীর যুগ-টুগ নয়। ইংল্যান্ড সফর থেকে শুরু হতে চলেছে ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন ব্র্যান্ড সন্ধান। দল ব্যর্থ হলে গম্ভীরও চাকরি খোয়াতে পারেন, ব্র্যান্ড তৈরির কাজ জারি থাকবে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত