বাংলা বলে কোনো ভাষা নেই, বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই?

আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ঠিক এক দশক আগের কথা। সদ্য রাজকাহিনী বেরিয়েছে (অবন ঠাকুরের নয়, সৃজিত মুখার্জির)। ইংরিজি জানা বাঙালি ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা আপ্লুত হয়ে একটা গান শেয়ার করতে লাগলেন সোশাল মিডিয়ায়। কী গান? ওই যে গানটা আমাদের জাতীয় স্তোত্র। কিন্তু এত আপ্লুত হওয়ার কারণ কী? কারণ রবীন্দ্রনাথের লেখা গানটা আসলে অনেক বড়, অত বড় জাতীয় স্তোত্র রাখা যায় না ব্যবহারিক অসুবিধার কারণেই। তাই আমাদের জাতীয় স্তোত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয় শুরুর দিকের খানিকটা অংশ। ওই ছবিতে সৃজিতবাবু গোটা গানটাই ব্যবহার করেছিলেন। এই নিয়ে আপ্লুত হওয়া অন্যায় নয়। কিন্তু মুশকিল হল, দেখা গেল যাঁরা শেয়ার করছেন তাঁদের অনেকেই লিখছেন ‘লিসন টু দ্য বেঙ্গলি ভার্শন অফ আওয়ার ন্যাশনাল অ্যান্থেম। ইট’স বিউটিফুল’ – এই জাতীয় কথাবার্তা। সাধারণত সোশাল মিডিয়ায় কারোর কোনো ভুল ধরলে তিনি প্রবল খেপে গিয়ে যিনি ভুল ধরেছেন তাঁকে অপমান করেন। এক্ষেত্রে যেসব বাঙালি মান-অপমানের তোয়াক্কা না করে ওইসব পোস্টে মন্তব্য করেছিলেন বা নিজে পোস্ট করেছিলেন যে গানটা তো বাংলাতেই লিখেছিলেন রবিবাবু, তার আবার বাংলা ভার্শন কী – তাঁদের ‘আঁতেল’, ‘সবজান্তা’ ইত্যাদি বিশেষণ দেওয়া হচ্ছিল। তবে ভারতবর্ষে ইংরিজি জানা মূর্খদের আত্মবিশ্বাস বেশি। তাই সেই মূর্খরা কেউ কেউ আবার যিনি শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁকেই ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল। ব্যাপার দেখে হাসা উচিত না কাঁদা উচিত তা বুঝতে না পারলেও, এটুকু বুঝে গিয়েছিলাম যে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক যে ভদ্রলোক শ্রেণি, তাদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে গেছে। আজ অমিত মালব্যকে যতই গালাগালি দিন, একথা নিশ্চিত হয়ে বলার উপায় নেই যে তাঁর ওই গণ্ডমূর্খ পোস্টের যুক্তিগুলো কোনো ইংরিজি শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকেরই জুগিয়ে দেওয়া নয়।

এই ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের অতি পছন্দের একখানা ধর্মীয় সংগঠন আছে, যাকে তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন বলে ভাবতে ভালবাসেন (মানে আমড়াকে আম বলে ভাবতে ভালবাসেন) – রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। রাজকাহিনীর গান নিয়ে ভদ্রলোক শ্রেণির রাজবোকামির দেড় দশক আগে ওই সংগঠন পরিচালিত একটা কলেজের পড়ুয়া ছিলাম। আমার সহপাঠী ছিল মঠের ভিতরেই গড়ে ওঠা, সন্ন্যাসীদের দ্বারা পরিচালিত বেদ বিদ্যালয়ে ছোট থেকে লেখাপড়া করে আসা কয়েকজন ছাত্র। তারা জনগণমন গাইত সংস্কৃত উচ্চারণে। আমরা কয়েকজন ছাত্র মিলে একদিন তাদের জিজ্ঞেস করলাম ‘ওরকম উচ্চারণে গাস কেন?’ তারা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানাল, ওটা ছোট থেকে শিখেছে। ওটাই শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণ। আমরা জিজ্ঞেস করলাম ‘বাংলা গানের উচ্চারণ সংস্কৃতের মত হবে কেন?’ তারা কিছুতেই মানতে রাজি হল না যে গানটা বাংলায় লেখা। নির্ঘাত তারা আজও জাতীয় স্তোত্র গাওয়ার প্রয়োজন হলে ‘শুদ্ধ সংস্কৃত’ উচ্চারণেই গায়। এরা কেউ কিন্তু প্রান্তিক পরিবারের সন্তান নয়, হিন্দিভাষীও নয়। গ্রাম, শহর – দুরকম জায়গার ছেলেই ছিল সেই দলে। সত্যি কথা বলতে, কেবল এরা নয়। আইসিএসই বা সিবিএসই স্কুলে পড়ে আসা বাঙালি সহপাঠীদেরও দেখেছি সংস্কৃত উচ্চারণে জনগণমন গাইতে। অর্থাৎ আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাই অনিবার্য ছিল।

এখন কথা হচ্ছে, এমনটা হল কেন? বাংলা ভাষা, সংস্কৃতির লাগাম তো চিরকালই এই ভদ্রলোকদের হাতেই থেকেছে। দুই বাংলা ভাগ হওয়ার পরে তো আরওই। বাংলা সিনেমার যত বিখ্যাত অভিনেতা, অভিনেত্রীর নাম মনে করতে পারেন তাদের কজন হিন্দু নিম্নবর্গীয় বা মুসলমান? পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হওয়ার পরে দু-চারজন মুসলমান অভিনেতা, অভিনেত্রী পশ্চিমবঙ্গে অভিনয় করেছেন বটে, কিন্তু মুসলমান চরিত্র কটা এপারের বাংলা সিনেমায়? মুসলমান সমাজের গল্পই বা কটা? পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পত্রপত্রিকার সম্পাদক, সাহিত্যিকদের মধ্যে খুঁজতে গেলেও ঘুরে ফিরে সেই প্রাক-স্বাধীনতা যুগের মীর মোশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দিন, সৈয়দ মুজতবা আলী, এস ওয়াজেদ আলী বা একটু পরের সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের নাম আসবে। কিছু নিবিষ্ট পাঠক হয়ত আবুল বাশার বা আফসার আহমেদের নাম মনে করতে পারবেন। জনপ্রিয় গাইয়ে, বাজিয়েদের মধ্যেও সেই ইংরিজি শিক্ষিত বামুন, কায়েত, বদ্যিরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। শিক্ষক, অধ্যাপক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ – যেদিকে তাকাবেন সেদিকই তো ভদ্রলোকরা আলো করে আছেন। তাহলে এ অবস্থা হল কেন? স্পষ্টতই পূর্বসুরিরা পতাকা যাদের হাতে দিয়েছেন তাদের বহিবার শকতি দেননি। কিন্তু কেন দেননি, বা দিতে পারেননি?

বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক স্কুল থেকে ইংরিজি তুলে দেওয়ার জন্যে ভদ্রলোকেরা বেসরকারি ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করতে বাধ্য হন আর তা থেকেই শিক্ষিত বাঙালির সঙ্গে বাংলা ভাষার বিযুক্তি শুরু, কারণ ইংরিজিটা তো শিখতেই হবে। নইলে কাজকর্ম পাওয়া যায় কী করে? ওটাই তো কাজের ভাষা।

এরকম একটা তত্ত্ব প্রায়শই খাড়া করা হয়। এই তত্ত্ব নজর করার মত। শিক্ষা মাতৃভাষাতেই হওয়া উচিত – একথা আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ বসু থেকে শুরু করে গোটা দুনিয়ার অনেক বড় বড় পণ্ডিত বলেছেন। আবার বিপক্ষেও যুক্তি আছে। সে বিতর্কে না গিয়ে একথা মেনে নেওয়া যাক যে, কোনো ভাষা কাজের ভাষা হয়ে না থাকলে গুরুত্ব হারায়। বামফ্রন্ট সরকার মাতৃভাষার উপর জোর দিলেও বাংলাকে গোটা রাজ্যের কাজের ভাষা করে তোলার পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেয়নি। পাশাপাশি ভারতের মত বহুভাষিক দেশে ইংরিজির গুরুত্ব বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এবং ভদ্রলোকরা বাংলা ভাষাকে ক্রমশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন – একথা তর্কের খাতিরে নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু কথা হচ্ছে, বাঙালি ভদ্রলোকদের ছেলেমেয়েরা তো ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই। যাঁর বই ছেলেমেয়ের হাতে তুলে না দিলে আজও এমনকি অনাবাসী বাঙালিদেরও ‘বাংলার সংস্কৃতি শেখাচ্ছি না’ ভেবে অপরাধবোধ হয়, সেই লীলা মজুমদার নিজেই কনভেন্টের ছাত্রী ছিলেন। তা ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করলেই ছেলেমেয়েকে বাংলা বইপত্তর পড়ানো, বাংলা গান শোনানো, সিনেমা দেখানো, নাটক দেখানো তুলে দিতে হবে – এ নিয়ম কি বামফ্রন্ট সরকারের তৈরি? আগেকার বাঙালির অমন করার দরকার পড়েনি, হঠাৎ বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ইংরিজি তুলে দিতেই দরকার পড়ল?

সত্যি কথা বলতে, সিপিএম ক্রমশ ভদ্রলোকদের পার্টি হয়ে যাওয়ায় বামফ্রন্টও মেহনতি মানুষের সরকার থেকে ভদ্রলোকদের সরকারেই পরিণত হয়েছিল নয়ের দশকের শেষার্ধে। তাই ভদ্রলোকদের ইংরিজি নিয়ে হাহুতাশের প্রভাবে এই সহস্রাব্দের গোড়ায় কিন্তু প্রাথমিকে ইংরিজি ফিরিয়েও এনেছিল। তারপর কি ভদ্রলোকেরা ছেলেমেয়েদের সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ফিরিয়ে এনেছিলেন? মোটেই না। উলটে মাধ্যমিক স্তরেও বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করার ঝোঁক বেড়ে গিয়েছিল। এখন নাহয় এসএসসি কেলেঙ্কারি ইত্যাদি যুক্তি দিয়ে বলা যায় সরকারি স্কুলগুলো পড়াশোনার অনুপযুক্ত হয়ে গেছে। বাম আমলে তো প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষা হত, রাজ্যের আনাচে কানাচে গজিয়ে ওঠা ইংরিজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর মাস্টারদের চেয়ে অনেক কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোতে যোগও দিতেন। ত্রুটি থাকলেও স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে, পড়াশোনা নিয়ে তখনকার সরকারের আগ্রহ যে বর্তমান সরকারের চেয়ে বেশি ছিল – তা আজকাল অনেক তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থকও স্বীকার করেন। তাহলে?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আসলে বাঙালি ভদ্রলোকের অভদ্রতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। বহু ভদ্রলোকের কাছেই আপত্তিকর ছিল বাম আমলে মুটে, মজুর, রিকশাওয়ালা, বাড়ির কাজের লোক, মুচি, মেথরের ছেলেমেয়েদের তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে একই স্কুলে ঢুকে পড়া। আরও বেশি গায়ে লাগত যখন তারা কেউ নিজের ছেলেমেয়ের চেয়ে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেয়ে যেত। পরীক্ষার ফল বেরোবার পর আমাদের অনেককেই বকুনি খেতে হয়েছে ‘তোর লজ্জা করে না? অমুকের বাড়িতে কোনোদিন কেউ স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি, আর ও অঙ্কে ৮৫ পেয়ে গেল। তুই মাস্টারের ছেলে হয়ে ৫৫? ছিঃ!’ মাস্টারের ছেলে বড় হয়ে মাস্টার; ডাক্তারের ছেলেমেয়ে তো বটেই, ছেলের বউ আর জামাইও ডাক্তার; উকিলের ছেলেমেয়ে উকিল; মুদির ছেলে মুদি, তার মেয়ে অন্য ছোট ব্যবসায়ীর গৃহবধূ; রিকশাওয়ালার ছেলে সবজিওয়ালা – এই সামাজিক স্থিতাবস্থায়, গোবলয়ের লোক বলে বাঙালি ভদ্রলোক যাদের দিকে তাকিয়ে নাক সিঁটকোয়, তাদের মত নিজেরাও অভ্যস্ত ছিল। সেই স্থিতাবস্থা ঘেঁটে যাওয়ার সামান্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল বাম আমলে। ওটুকুই ভদ্রলোকদের পক্ষে শিশুর আত্মার উপর নরকের দুঃস্বপ্নের মত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ তারা খুঁজে পায় অনেক টাকা মাইনের বেসরকারি স্কুলে। নয়ের দশক থেকে মনমোহনী অর্থনীতির জোরে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে আমূল পরিবর্তন এসে যায়। তাদের হাতে এসে গেল খরচ করার মত অতিরিক্ত টাকা। ফলে ছোটলোকের ছেলেপুলের সঙ্গে এক স্কুলে পড়ানোর আর দরকার রইল না। পাঠিয়ে দাও ফেলো কড়ি মাখো তেল স্কুলে। এমনকি বামফ্রন্ট সরকারের বদান্যতায় উচ্চমধ্যবিত্ত হয়ে ওঠা সরকারি স্কুলের মাস্টারমশাই, দিদিমণিরাও নিজেদের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পাঠানো শুরু করেন তখনই। সংখ্যাটা অবশ্যই এখন অনেক বেড়েছে, তার পিছনে বর্তমান সরকারের শিক্ষাজগৎ নিয়ে ছেলেখেলার অবদান কম নয়। কিন্তু আসল কথা হল, ‘ইংরিজি শিখতে হবে বলে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়াচ্ছি’ – এটা স্রেফ অজুহাত। দুর্বল অজুহাত। সেটা বুঝতে পেরেই যুক্তি জোরদার হবে মনে করে নয়ের দশকে অনেক বাবা-মা বলতেন ‘ইংরিজি বলা শিখতে হবে। নইলে কম্পিটিশনে দাঁড়াতে পারবে না। তাই ইংলিশ মিডিয়ামে দিয়েছি।’ এও ভারি মজার কথা। স্কুলটা কি তাহলে ‘স্পোকেন ইংলিশ’ শেখার জায়গা? ওটা জানলেই চাকরিবাকরি পাওয়া যায়? চোস্ত ইংরিজি বলতে পারলেই অঙ্ক, বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস – সব শেখা হয়ে যাবে? অধিকাংশ বাঙালি ভদ্রলোক কিন্তু তেমনই মনে করে আজও। কথা বললেই টের পাওয়া যায়। তবে আজকাল একটা নতুন ব্যাপার ঘটেছে। ইংরেজ আমলে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনের লক্ষ্য ছিল যতটা সম্ভব ইংরেজ হওয়া, স্বাধীনতার পর থেকে – অনাবাসী ভারতীয় হওয়া। আজকের বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে একটা নতুন লক্ষ্য যোগ হয়েছে – মাড়োয়ারি বা গুজরাটি হওয়া। তাই ছেলেপুলেকে ইংরিজি মাধ্যমে পড়িয়ে ইংরিজি বলা শিখিয়েই সে খুশি নয়, দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দিও গুঁজে দিচ্ছে। সুতরাং বাংলা মাঠের বাইরে। গল্পের বই পড়ার এবং পড়ানোর চল বাঙালি ভদ্রলোক বাড়ি থেকে উঠে গেছে বহুকাল, এখন আবার বাবা-মায়েরা খেয়াল রাখেন, ছেলেমেয়ে যেন বাংলা সিরিয়াল বা সিনেমা দেখে না ফেলে।

এমতাবস্থায় বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি কী, কোনটা তার অঙ্গ আর কোনটা নয় – তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকবে কোন চুলোয়? সংজ্ঞাগুলো ঠিক করে দিয়েছি আমরা ভদ্রলোকরা। আমাদের সংজ্ঞায়িত বাংলা ভাষা-সংস্কৃতিকে আমরাই বাংলার বাইরে বাংলা বলে পরিচিত হতে দিইনি, ওগুলোকে আমাদের সংস্কৃতির বৃত্তে জায়গাই দিইনি। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার ভাষায় লেখা গান আমাদের ‘আধুনিক গান’। বাঙাল ভাষার গানকে তখনই বাংলা গান বলে মেনেছি যখন শচীন দেববর্মণের মত রাজপুত্র গেয়েছেন। গ্রামের মানুষের নিজের গানকে লোকগীতি বলে আলাদা বাক্সে রেখেছি। পনিটেল বাঁধা শহুরে ভদ্রলোকরা গিটার বাজিয়ে ব্যান্ড বানিয়ে গাইলে তবেই সে গানের জায়গা হয়েছে প্রেসিডেন্সি, লেডি ব্র্যাবোর্ন বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস মোচ্ছবে। আচ্ছা তাও নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু নিজেরা যাকে বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি বলে দেগে দিয়েছি তাকে সমাজের নিচের তলায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাও কি করেছি? ফিল্ম সোসাইটি বানিয়ে ঋত্বিক ঘটকের উদ্বাস্তুদের নিয়ে তৈরি ছবি দেখেছি আর প্রবন্ধ লিখেছি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা উদ্বাস্তু, যারা এখানে এসে পেটের দায়ে আমাদের বাড়িতে বাসন মাজে বা ঘর ঝাঁট দেয় – তাদের দেখানোর তো চেষ্টা করিনি। সত্যজিৎ রায় বিশ্ববন্দিত পরিচালক বলে জাঁক করেছি, কিন্তু পথের পাঁচালী-র হরিহর রায়ের পরিবারের মত হতদরিদ্র বাঙালিকে ওই ছবি দেখানোর কোনো প্রয়াস তো আমাদের ছিল না। কারণ আমরা নিশ্চিত ছিলাম – ওরা ওসব বুঝবে না। ওদের জন্যে বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না-ই ঠিক আছে। ঘটনা হল, যার দুবেলা পেট ভরে ভাত জোটে না, তারও মনের খিদে থাকে এবং সে খোরাক খুঁজে নেয়। বাংলার গরিব মানুষ, নিম্নবর্গীয় মানুষও তাই করেছে। আমাদের তৈরি সংস্কৃতি যখন তাদের পোষায়নি তখন তারা হিন্দি সিনেমা, হিন্দি গানে মজেছে। অধুনা ইউটিউব শর্টস আর ইনস্টা রিলসে। আমাদের অ্যাকাডেমি, আমাদের নন্দন নিয়ে আমরাই বুঁদ ছিলাম। ও জিনিস আজ কেউ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিলেই বা ওদের কী? এদিকে আমরা, বিশ্বায়িত ভদ্রলোকরাও, হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকেছি। ইংরিজি তো ছিলই। ফলে এখন হঠাৎ আবিষ্কার করছি – হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান তত্ত্বের প্রবক্তারা বলে দিচ্ছে বাংলা বলে আসলে কোনো ভাষা নেই, আর সেটাকেই ঠিক বলছেন বাংলা ভাষায় বইপত্তর লিখে নাম করে ফেলা লেখকরা।

নবজাগরণই বলি আর সমাজ সংস্কার আন্দোলনই বলি, উনিশ শতকে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আলোর সন্ধান যে বাঙালি ভদ্রলোক পেয়েছিল তা অনস্বীকার্য। কিন্তু আলো বাড়াতে গেলে আলো ছড়াতে হয়। ভদ্রলোকরা কী করেছে? প্রদীপ নিজের ঘরেই রেখে দিয়েছে, হাতে নিয়ে যাদের ঘরে আলো নেই তাদের কাছে যায়নি, তারা আমাদের প্রদীপ থেকে নিজেদের প্রদীপ জ্বালিয়ে নিতে পারেনি। এখন আমাদের প্রদীপের আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, তাই চারপাশ অন্ধকারে ডুবে যেতে বসেছে। আসলে আমাদের বাংলা ভাষা চর্চা, সংস্কৃতি চর্চা বা যে কোনো চর্চাই বহুকাল হল প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। ওর মধ্যে ঘাম ঝরানোর কোনো ব্যাপার নেই, তাই ও থেকে আমাদের কোনো অর্জনও নেই। কেন এমন হল? ভাবতে গেলে জ্যোতি ভট্টাচার্য ‘কালচার’ ও ‘সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে যে গোলমালের কথা বলেছেন সেটাই মনে পড়ে যাচ্ছে। একবার পড়ে দেখা যাক

ইংরেজি ভাষা থেকে ‘কালচার’ শব্দটার আমরা বাংলা পরিভাষা করেছি ‘সংস্কৃতি’। ঠিক পরিভাষা কী হওয়া উচিত – ‘সংস্কৃতি’ না ‘কৃষ্টি’, তা নিয়ে বিসংবাদ হয়েছে এককালে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘কৃষ্টি’ শব্দটা বাংলা ভাষায় কুশ্রী অপজনন। ‘তাসের দেশ’ নাটকে শব্দটা নিয়ে কৌতুকও করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপরে ‘কৃষ্টি’ শব্দটা ক্রমে লোপ পেয়েছে, ‘সংস্কৃতি’-ই ব্যবহারসিদ্ধ লোকগ্রাহ্য শব্দ হয়ে উঠেছে।

ইংরেজরা ‘কালচার’ শব্দটা নিয়েছিল লাটিন ভাষা থেকে। লাটিন ভাষায় শব্দটার প্রধান অর্থ ছিল কৃষিকর্ম, ‘এগ্রিকালচার’ শব্দের মধ্যে সেই প্রধান অর্থ বাহিত হচ্ছে। এই কারণেই বাংলায় কেউ কেউ ‘কৃষ্টি’ বলতে চেয়েছিলেন, কর্ষণের সঙ্গে তার সম্পর্ক। কৃষিকর্মে কর্ষিত ক্ষেত্রে বীজ বপন করে নতুন শস্য উৎপাদন করা হয়…চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগজীবাণুর প্রতিষেধক জীবাণু ‘কালচার’ করে তৈরি করা হয়; রক্তে রোগজীবাণু বা ক্ষতিকর কোনো পদার্থ থাকলে অণুবীক্ষণে তা দেখতে হলে অনেক সময় রক্তবিন্দুর ‘কালচার’ করে তাকে বর্ধিত করতে হয়। মোট কথা ‘কালচার’ শব্দটার মধ্যে কর্ষণ বা অনুশীলনের দ্বারা নতুন বস্তু অথবা নতুন গুণ সৃষ্টি ইঙ্গিত রয়েছে, এর ঝোঁক উৎপাদনমুখী। কোনো না কোনো রকম বৃদ্ধি এর ফল।

আমাদের ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির শব্দার্থগত ঝোঁক কিন্তু এরকম নয়। এর প্রধান অর্থ রূঢ় অবস্থা থেকে মার্জিত অবস্থায় আনয়ন, স্থূল অবস্থা থেকে বাহুল্যবর্জিত করে সূক্ষ্ম অবস্থায় আনয়ন। নতুন বস্তু সৃষ্টি, নতুন গুণ উৎপাদন, বা সংখ্যাবৃদ্ধি এর অভীপ্সিত লক্ষ্য নয়, যা আছে তাকেই একটা পরিশীলিত সংযত সুসমঞ্জস সুকুমার রূপদান এর লক্ষ্য। ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির এই প্রধান ঝোঁক আমাদের আজকের পরিস্থিতিতে খানিকটা বাধাস্বরূপ হয়ে উঠছে – এরকম আশঙ্কা করছি।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি আগে লেখা এই কথাগুলো আজ আবার ভাবাচ্ছে। কারণ সংস্কৃতি শব্দের প্রধান ঝোঁক এখন আর খানিকটা বাধা নয়, গভীর কুয়োর দেওয়াল হয়ে গেছে দেখা যাচ্ছে। সেই কুয়োর ব্যাং হয়ে গেছি আমরা ভদ্রলোকরা; বাইরে রয়ে গেছে বাঙালি মুসলমান, বাঙালি নিম্নবর্গীয় হিন্দু এবং সাধারণভাবে, গরিব বাঙালি। কৃষ্টি শব্দটায় রবীন্দ্রনাথ প্রবল আপত্তি করেছিলেন বটে, তবে ভদ্রলোকদের কূপমণ্ডূকতা ধরে ফেলতে তাঁরও ভুল হয়নি। বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনে প্রথমে নেতৃত্ব দিয়েও তাই সরে গিয়েছিলেন। কারণ ফাঁকিবাজিটা ধরে ফেলেছিলেন। পরেও তাঁর লেখাপত্রে ভদ্রলোকি চালাকির আবরণ উন্মোচন করেছেন বারবার। ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে যেমন লিখেছেন

অল্পবয়সে যখন প্রথম জমিদারি সেরেস্তা দেখতে গিয়েছিলুম তখন দেখলুম, আমাদের ব্রাহ্মণ ম্যানেজার যে তক্তপোষে গদিতে বসে দরবার করেন সেখানে এক ধারে জাজিম তোলা, সেই জায়গাটা মুসলমান প্রজাদের বসবার জন্যে; আর জাজিমের উপর বসে হিন্দু প্রজারা। এইটে দেখে আমার ধিক্কার জন্মেছিল। অথচ এই ম্যানেজার আধুনিক দেশাত্মবোধী দলের। ইংরেজরাজের দরবারে ভারতীয়ের অসম্মান নিয়ে কটুভাষাব্যবহার তিনি উপভোগ করে থাকেন, তবু স্বদেশীয়কে ভদ্রোচিত সম্মান দেবার বেলা এত কৃপণ। এই কৃপণতা সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে অনেকদূর পর্যন্ত প্রবেশ করেছে; অবশেষে এমন হয়েছে যেখানে হিন্দু সেখানে মুসলমানের দ্বার সংকীর্ণ, যেখানে মুসলমান সেখানে হিন্দুর বাধা বিস্তর।

এই ম্যানেজারই বাঙালি ভদ্রলোকের সংস্কৃতি আর কৃষ্টির তফাতের প্রমাণ। এঁর দেশাত্মবোধ হল প্রদর্শনী। ওটার নির্দিষ্ট মঞ্চ আছে, সেখানে নিজের পরিশীলিত দেশাত্মবোধ প্রমাণ করতে ওটা কাজে লাগে। কিন্তু নিজের জীবনে মেনে চলার, মুসলমানও যে তাঁর সমান ভারতীয় তা স্বীকার করার এবং অনুশীলন করার দায় নেই। এমন চরিত্রই এখন হাজারে হাজারে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ এই প্রবন্ধ লিখেছিলেন স্বাধীনতার আগে। স্বাধীনোত্তর ভারতে আবার সারা দেশের উদারপন্থী এবং বাঙালি ভদ্রলোকদের নিজেকে সংস্কৃতিবান প্রমাণ করতে ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখন দেশের রাজনীতি বদলে যাওয়ায়, পরিবেশ বদলে যাওয়ায় ওটা আর আবশ্যিক নয়। তাই এই ম্যানেজারবাবুর মনের কথা তিলোত্তমা মজুমদার, পবিত্র সরকারদের মুখে উঠে এসেছে, যার মর্মার্থ হল – ভদ্রলোকরাই বাঙালি। মুসলমানরা বাঙালি নয়। ভদ্রলোকদের উপর আক্রমণ হলে তবেই বলা চলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হয়েছে, মুসলমানদের উপর আক্রমণ বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ নয়।

এ হল বাঙালি ভদ্রলোকের অন্তত দুশো বছর ধরে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তৈরি সত্য। এর সঙ্গে বাস্তবের কোনো সম্পর্ক নেই। এই তিলোত্তমা, এই পবিত্র, এই সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়রাই একুশে ফেব্রুয়ারি এসে পড়লে গদগদ উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন বাংলা ভাষা নিয়ে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, ওগুলো সব প্রদর্শনী। আজকাল যাকে বাংলায় বলে ‘পারফরম্যান্স’। মনের কথা হল – একুশের ভাষা শহিদরা কেউ বাঙালি নয়, তারা ভদ্রলোকদের বাংলা ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়েছিল মাত্র। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেও এঁরা বিস্তর লেখালিখি, বলাবলি করে চলেছেন সেই ২০১৪ সাল থেকে। কিন্তু স্পষ্টতই ওসবও পারফরম্যান্স। নইলে বিশাল বিশাল গেটওয়ালা আবাসনে থাকা এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়া লেখক, বুদ্ধিজীবীরা কী করে বলেন যে এই বাংলায় হঠাৎ চতুর্দিকে প্রচুর নতুন লোক দেখতে পাচ্ছেন, যাদের সঙ্গে বাঙালিদের কোনো সংস্কৃতিগত মিল নেই? কোনো পরিসংখ্যানই এই সত্য প্রতিষ্ঠা করে না। এ যে নাজিদের আতঙ্ক সৃষ্টির ধ্রুপদী কৌশল, তা না জানার মত কম লেখাপড়া এঁদের নয়। উপরন্তু, যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া যায় চারপাশটা বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গায় ভরে গেছে, তাহলেই বা তাদের সঙ্গে এই ভদ্রমহিলা, ভদ্রলোকদের সংস্কৃতিগত মিলের অভাব হয় কী করে? অনেক বেশি অমিল তো হওয়ার কথা কলকাতা ও শহরতলিতে দ্রুত বেড়ে চলা বহুতলগুলোর বাসিন্দা হয়ে আসা হিন্দিভাষীদের সঙ্গে, যাদের অনেকেই আমিষের গন্ধ পেলে নাক কোঁচকায়। তাদেরই রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ও মুসলমান প্রবাসী শ্রমিকদের বাংলাদেশি দেগে দিয়ে কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, বৈধ কাগজপত্রকে পাত্তা না দিয়ে মারধোর করা হচ্ছে, পে লোডার দিয়ে বাংলাদেশে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।

এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা অবশ্য রোগ নন, রোগাক্রান্তের নমুনা। এই রোগে আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব অনেকেই আক্রান্ত। আমাদের যে কোনো একজনকে দেখলেই বোঝা যায়, বাঙালি ভদ্রলোকের কূপমণ্ডূকতা এবং নীতিহীনতা ঐতিহাসিক হলেও, গত অর্ধ দশকে বিশেষ অবনমন হয়েছে। ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মানসিকতা এরকম থাকলে বাঙালরা উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে এসে হয় অনাগরিক বেগার শ্রমিকে পরিণত হত, বা ভিক্ষা করতে করতে অনাহারে মারা যেত। সেক্ষেত্রে ১৯৭১ সালেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ভারত সরকারকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে যুদ্ধে নামার প্ররোচনা দিত না (অশোক মিত্র লিখিত আপিলা-চাপিলা দ্রষ্টব্য), সাধারণ মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আবেগ তৈরি হত না, বাঙালরা আরও এক দফা উদ্বাস্তু হওয়ার ধাক্কা সামলে এদেশে থিতু হতে পারত না।

মজার কথা, এখন ভদ্রলোকদের যে অংশের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের চিন্তায় রাতে ঘুম হচ্ছে না, তাদের অনেকে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল। এরা বুঝতে পারছে না, বা রিপাবলিক টিভি দেখে দেখে এত অন্ধ হয়ে গেছে যে বুঝতে চাইছে না, যে ভাষাকে বাংলাদেশি ভাষা বলে আজ চালাচ্ছে বিজেপি, সেই ভাষা অনেকাংশে তাদের মা-দিদিমার ভাষা। ওই ভাষাকে অস্বীকার করলেও ওই পরিচিতি যাওয়ার নয়। আগামীদিনে এ কার্ড ও কার্ড সে কার্ড – কোনো কার্ড দিয়েই নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করে ওঠা যাবে না। কারণ কোনটা নাগরিকত্বের প্রমাণ সেটা ঠিক করে রাষ্ট্র। আর ভারত রাষ্ট্রের এই মুহূর্তে প্রকল্প হল বাঙালিদের অনাগরিক প্রমাণ করা।

ভদ্রলোকের ছেলেমেয়েদের স্মৃতিশক্তি তাজা করে দেওয়ার জন্যে বলি, সেই বামফ্রন্ট আমল থেকে – যখন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রথম অভিযোগ তোলেন যে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকিয়ে ভোটে জেতে বামেরা – বঙ্গ বিজেপির বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের শরণার্থী ধরে নিয়ে আশ্রয় দিতে হবে এবং মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী ধরে নিয়ে শাস্তি দিতে হবে, ফেরত পাঠাতে হবে। অধুনা সোশাল মিডিয়ার বাইরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া তথাগত রায় যখন বঙ্গ বিজেপির সভাপতি ছিলেন, তখন তিনি একাধিক টিভি বিতর্কে বসে একথা বলেছেন। নরেন্দ্র মোদী সরকার যে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) পাশ করে ২০১৯ সালে, তার মর্মবস্তুও এটাই। সে কারণেই এ রাজ্যের হিন্দুদের, বিশেষত ভদ্রলোকদের, ওই আইন খুব পছন্দ হয়েছিল। মতুয়াদের মত বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে চলে আসা নিম্নবর্গীয় জনগোষ্ঠীর মানুষও ওই আইন পাশ হওয়ায় উল্লসিত হয়েছিলেন। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর না বিজেপি দিতে চায়, না সম্প্রতি বিজেপি সমর্থক হয়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গবাসী তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল ভদ্রলোকরা। প্রশ্নটা হল, শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া এবং নাগরিকত্ব দেওয়ার মত মানবিক প্রকল্পের ‘কাট-অফ ডেট’ থাকবে কেন? সিএএ অনুযায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার ‘কাট-অফ ডেট’ হল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪। এর মানে কী? ওই তারিখের পরে কি বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন বন্ধ হয়ে গেছে? নাকি ওর পরে যে হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে তারা মায়ের ভোগে যাক – এটাই হিন্দু দরদি বিজেপি এবং ভারতের নাগরিকত্ব এতদিনে অধিকারে পরিণত হয়ে গেছে বলে মনে করা বাঙাল ভদ্রলোকদের মনের কথা? এ প্রশ্ন করলেই বিজেপি নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি থেকে শুরু করে বাঙাল ভাষা বলতে না পারা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বাঙাল, সকলেই এক সুরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’

এখন কথা হচ্ছে, এই আজকের বাঙালদের পূর্বপুরুষরা যখন ভিটেমাটি চাটি হয়ে এপারে চলে এসেছিলেন অধুনা বাংলাদেশ থেকে, তখন কি দেশটা ধর্মশালা ছিল? তখনকার শাসকরা মনে করেছিলেন – ছিল। ভাগ্যিস করেছিলেন, তাই আজকের বাঙাল ভদ্রলোকরা কলার তুলে এই প্রশ্ন করতে পারছেন। ওঁরা অবশ্য বলবেন ‘তখনকার পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতি কি এক নাকি? ১৯৪৭ সালে তো একটা দেশকে আনতাবড়ি কেটে ভাগ করা হয়েছিল। আমাদের পূর্বপুরুষদের এই ভাগটার উপরে ততখানিই অধিকার, যতখানি আগে থেকেই এ ভাগে থাকা লোকেদের।’ ১৯৭১ সালে কিন্তু দেশভাগ-টাগ হয়নি। তখনো বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের এ দেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেকথা মনে রাখলেও মানতেই হবে, যুক্তিটা সঠিক। কিন্তু মুশকিল হল, একবার যদি বিভাজনে হাততালি দেওয়া শুরু করেন, তখন দেখবেন অনেক চেপে রাখা বিভাজন বেরিয়ে পড়ছে। বাঙালরা এপারে চলে আসায় মোটেই পশ্চিমবঙ্গীয়রা (চলতি কথায় যাদের এদেশি বা ঘটি বলা হয়) সকলে খুব আপ্লুত হয়নি। ‘বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকছে পিলপিল করে, রোহিঙ্গায় চারপাশ ভরে গেছে’ – এই প্রোপাগান্ডায় আপনি যত ধুয়ো দিচ্ছেন, তত সেদিনের উদ্বাস্তুদের প্রতি বিদ্বেষ চেপে রাখা পশ্চিমবঙ্গীয়দের স্মৃতি তাজা হয়ে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে আরএসএস-বিজেপির শক্তি বাড়ার পাশাপাশি ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান সমর্থকদের মধ্যে অনলাইন পা টানাটানির ভাষা যেভাবে বদলেছে, তা খেয়াল করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়। অতএব বাঙাল ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের বোঝা উচিত যে তারা হিন্দিভাষীদের ‘রোহিঙ্গা’, ‘বাংলাদেশি’ বলে চিৎকারে যোগ দিয়ে নিজেদের ডিটেনশন ক্যাম্পের রাস্তা বানাচ্ছে।

বাড়াবাড়ি মনে হল কথাটা? আসামে এনআরসি-র সময়েও দেখেছিলাম সেখানকার বাঙাল ভদ্রলোকরা অনেকে বলছে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’ ঠিক এই কথাটাই যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিদের সম্পর্কে জাতিবিদ্বেষী অসমিয়াদের বক্তব্য, সেকথা তাদের খেয়াল ছিল না। খেয়াল হল, যখন এনআরসি থেকে বাদ পড়ে যাওয়া ১৯ লক্ষ মানুষের মধ্যে সাড়ে ১২ লক্ষ হিন্দু বেরোল এবং তার মধ্যে তারাও পড়ে গেল। নেলি গণহত্যার ইতিহাসও ওই ভদ্রলোকরা ভুলে থাকতে চেয়েছিল, কারণ ওতে যারা মরেছিল তারা মুসলমান। এখন আসামের বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে কারা দিন কাটাচ্ছে সেটা পশ্চিমবঙ্গে চতুর্দিকে রোহিঙ্গা দেখতে পাওয়া বাঙাল ভদ্রলোকরা একটু দেখে নিতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করার পরিকল্পনা এখনো সরকারের নেই, কিন্তু এসআইআরের পরিকল্পনা বিলক্ষণ আছে। সেটাও একটা তালিকা, তারও থাকবে ‘কাট-অফ ডেট’। এসব ভদ্রলোকরা ভালই জানেন, কিন্তু কুয়োর ব্যাং তো কুয়োর বাইরের জগতের কথা জানতে পারলেও মানতে চায় না। যেমন নির্বাচন কমিশনের বানানো আরেকটা তালিকা – ভোটার তালিকা – কেমন হয় আজকাল সেকথা রাহুল গান্ধী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও ভদ্রলোকরা চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময়কার ভদ্রলোকদের ফাঁকিবাজিকে রবীন্দ্রনাথ চিহ্নিত করেছিলেন, নিন্দাও করেছিলেন। তবু মানতে হবে, সেই ভদ্রলোকদের অন্য সময়ে না হলেও বিপদের সময়ে বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে জোট বাঁধার বুদ্ধি ছিল। এখনকার ভদ্রলোক শ্রেণির মস্তিষ্ক এত উর্বর যে বিপদের সময়ে আরও বেশি করে নিজেদের আলাদা করে নিচ্ছে। বিপন্ন বাঙালির পাশে দাঁড়ানোর বদলে ‘আমি স্নান বলি, ও গোসল বলে। অতএব ও বাঙালি না, আমি বাঙালি’ – এসব বোকা বোকা কথা বলে নিজের কুয়োটা আরও গভীর করে খুঁড়ছে। যে হিন্দি আধিপত্যবাদী হিন্দুরা কোনোদিনই বাঙালিকে আপন বলে মনে করেনি এবং করবে না, তারা নিজেদের মনোভাব স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিলেও ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা বুক ফুলিয়ে প্রতিপন্ন করতে চাইছে – বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই। আছে দুটো আলাদা জাতি – বাঙালি হিন্দু আর বাংলাদেশি। বাংলা বলেও কোনো ভাষা নেই। আছে দুটো আলাদা ভাষা – হিন্দুর বাংলা আর বাংলাদেশি বাংলা। এই ঐতিহাসিক মূর্খামি যে দৃশ্যের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে তা এইরকম – ভদ্রলোকরা বাঙালি বলে মার খাচ্ছে হিন্দিভাষীদের হাতে, আর এখন যে বাঙালিদের মার খাওয়া চলছে, যাদের বাঙালি বলে স্বীকার করতেই রাজি নয় ভদ্রলোকরা, তারা দূর থেকে বলছে ‘ওমা! আপনি ভদ্রলোক? আমি ভেবেছিলাম বাঙালি।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাংলার ক্রিকেটের রূপ খুঁজিতে যাই না আর

কলকাতা নাইট রাইডার্স আইপিএল জেতায় রাজ্যের রাজধানীতে এ রাজ্যের করদাতাদের টাকায় ঘটা করে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছিল। তাতে বাংলার ক্রিকেটের কী উপকার হয়েছে?

শিল্পপতি সৌরভ গাঙ্গুলির শালবনির প্রস্তাবিত ইস্পাত কারখানা সফল হবে কিনা তা ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল কর্তা সৌরভের ভিশন ২০-২০ প্রোজেক্ট যে মুখ থুবড়ে পড়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সিএবি প্রধান হয়েই ভারতের সর্বকালের সেরা ক্রিকেট অধিনায়কদের অন্যতম সৌরভ বাংলার ক্রিকেটকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতির জোরে ব্যাটারদের জন্যে ভাঙ্গিপুরাপ্পু ভেঙ্কটসাই লক্ষ্মণ, জোরে বোলারদের জন্যে ওয়াকার ইউনিস, স্পিনারদের জন্যে মুথাইয়া মুরলীথরন বাংলা দলের নেট আলো করে ছিলেন বেশ কিছুদিন। কিন্তু সেসবই ক্ষণিকের হাসিকান্না। তাতে বাংলার ক্রিকেট দলের বা রাজ্যের ক্রিকেটের কোনো দীর্ঘমেয়াদি লাভ হয়েছে বলে এই ২০২৪ সালের শেষ শীতে এসে তো দেখা যাচ্ছে না। এই বাক্য এমন একটা সময়ে লিখতে হচ্ছে যখন ভারতীয় দলে একসঙ্গে দুজন বাংলা দলের বোলার রয়েছেন, রাঁচি টেস্টে আকাশ দীপের অভিষেকও মন্দ হয়নি। মহম্মদ শামি এই মুহূর্তে চোটের জন্যে বিশ্রামে থাকলেও দীর্ঘকাল ধরে তিনি ভারতীয় বোলিংয়ের স্তম্ভ। ফিরে এলে অদূর ভবিষ্যতে যশপ্রীত বুমরার বিশ্রামের ম্যাচে যদি বাংলার তিন পেসারকে একসঙ্গে খেলতে দেখা যায় তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অভিমন্যু ঈশ্বরণ যে হারে রান করে চলেছেন ঘরোয়া ক্রিকেটে এবং ভারত এ দলের হয়ে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে তাঁকেও ভারতীয় দলে খেলতে দেখা যেতেই পারে। তাহলে বাংলার ক্রিকেটের কোনো লাভ হয়নি বলছি কেন? কারণ একাধিক।

এগুলো ব্যক্তিগত সাফল্য মাত্র। শামি, মুকেশ কুমার আর আকাশকে রঞ্জি ট্রফিতে বাংলার হয়ে একসঙ্গে খেলতে দেখা যাবে – এমন সম্ভাবনা কম। ভারতীয় দল এত বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে যে একবার জাতীয় দলে থিতু হয়ে গেলে রঞ্জি ম্যাচ খেলার আর অবকাশ থাকে না। তার উপর সময়, সুযোগ থাকলেও ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার আগ্রহ এখন ক্রিকেটারদের মধ্যে ক্রমহ্রাসমান। আইপিএলে নিয়মিত হয়ে যেতে পারলে তো কথাই নেই। বাংলার প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের ঈশান কিষণ তো টেস্টও খেলতে চাইছেন না। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের মাঝপথ থেকে পলাতক ছবির অনুপকুমার হয়ে গেলেন। ঝাড়খণ্ড দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও তাঁকে খুঁজে পাচ্ছেন না। ফলে রাজ্য থেকে কোনো ক্রিকেটার জাতীয় দলে সুযোগ পেলে এখন বেল পাকলে কাকের কী বলাই সমীচীন। দেখা দরকার, রাজ্য দল সাফল্য পাচ্ছে কি? সে প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক।

শীত শেষ হওয়ার আগেই বাংলার রঞ্জি দলের অভিযান শেষ হয়ে গেছে এবারে। এলিট গ্রুপ বি-তে তৃতীয় স্থানে শেষ করেছে বাংলা। ফলে নক আউট পর্যায়ে পৌঁছনো হয়নি। গত মরসুমে ফাইনালে পৌঁছে থাকলেও সৌরাষ্ট্রের কাছে শোচনীয় হার হয়েছিল। তার আগেরবার সেমিফাইনালে মধ্যপ্রদেশের বিরুদ্ধেও একই ঘটনা ঘটে। অতিমারীর আগের শেষ রঞ্জি ট্রফিতেও ফাইনালে সৌরাষ্ট্রের কাছেই ইনিংসে হার হয়েছিল বাংলার। অর্থাৎ ঘরোয়া ক্রিকেটে যে দলগুলো ধারাবাহিকভাবে সফল, তাদের সামনে পড়লেই ব্যবধান অনেকখানি হয়ে যাচ্ছে। মুম্বাইয়ের মত ঘরোয়া ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা দল দূর অস্ত, কর্ণাটক বা তামিলনাড়ুর স্তরেও পৌঁছয়নি বাংলা। সাফল্যের লেখচিত্র ঊর্ধ্বগামী হওয়ার বদলে নিম্নগামী বললেও ভুল হয় না। পঞ্চাশ ওভারের প্রতিযোগিতা বিজয় হাজারে ট্রফিতেও সাম্প্রতিককালে বলার মত সাফল্য নেই। কুড়ি ওভারের মুস্তাক আলি ট্রফি নিয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন, কারণ ওটা বস্তুত আইপিএলের প্রতিভা অন্বেষণ পরীক্ষা। সেখান থেকে আকাশ দীপ, শাহবাজ আহমেদদের ফ্র্যাঞ্চাইজগুলো খুঁজে নিচ্ছে।

বাংলার ক্রিকেটের আরেকটা দিকও আলোচনার যোগ্য। শামি, মুকেশ, আকাশরা নিজেদের রাজ্যে ক্রিকেট খেলার পরিবেশ না পেয়ে কলকাতায় এসে পরিশ্রম করে জাতীয় দলে খেলার যোগ্যতা অর্জন করছেন। অথচ সৌরভের পর ঋদ্ধিমান সাহা ছাড়া কোনো স্থানীয় ক্রিকেটার কিন্তু ভারতীয় দলে নিয়মিত হয়ে উঠতে পারেননি। তাহলে নয়ের দশক থেকে সৌরভের দৃষ্টান্তে পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে ওঠা কোচিং সেন্টারগুলো কী অবদান রাখল? না, বাংলা পক্ষ মার্কা বাঙালির প্রতি বঞ্চনার অভিযোগ তুলছি না। বলছি ছেলের কিটব্যাগ বয়ে নিয়ে যাওয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাঙালি বাবা-মায়েরা ভিনরাজ্য থেকে আসা ছেলেগুলোকে দেখে শিখতে পারেন – সাফল্যের খিদে আসলে কী জিনিস এবং পরিশ্রম কাকে বলে।

পরিশ্রমী বাঙালিকে অবশ্য বাঙালিরাও যে প্রাপ্য সম্মান দেন তা নয়। নইলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটে মনোজ তিওয়ারির চেয়ে অনেক বেশি সফল ঋদ্ধিমান সাহাকে বাংলা ছেড়ে ত্রিপুরায় চলে যেতে হত না। তাঁর অপরাধ কী ছিল? অনেক ভেবেও সৌরভ-ঘনিষ্ঠ এক সাংবাদিককে চটিয়ে ফেলা ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া যাবে না। অথচ মনোজ গত মরসুমের শেষে আর খেলব না বলায় কান্নাকাটি পড়ে গিয়েছিল। শেষমেশ সিএবি সচিব স্নেহাশিস গাঙ্গুলির অনুরোধে তিনি এ মরসুমেও খেলতে রাজি হয়ে যান। তরুণ ক্রিকেটারদের উঠে আসার সুযোগ দিতে হবে ইত্যাদি যুক্তি কারোর মাথায় আসেনি। এবারে বিহারের বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচ খেলে চূড়ান্ত অবসর ঘোষণা করার পর মনোজকে রীতিমত সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছে। অবশ্য ঋদ্ধিমান এমন ব্যবহার আশা করতে পারেন না। তাঁর চোদ্দ পুরুষে কেউ কখনো সিএবি কর্তা ছিলেন না। তার উপর তিনি কলকাতার অভিজাত পরিবারের সন্তান নন। তিনি হলেন শিলিগুড়ির ছেলে, যেখান দিয়ে কলকাতার বাবু বিবিরা দার্জিলিং, কালিম্পং, গ্যাংটক বেড়াতে যান। খেলতে খেলতেই রাজনীতিতে নেমে পড়ে কেউকেটা হতে পারলে অন্য কথা ছিল। অন্যথায় ঋদ্ধিমান বাংলার ক্রিকেটের কতটা সেবা করেছেন না করেছেন তার হিসাব করা বৃথা।

আরও পড়ুন কুস্তিগীরদের আন্দোলন: মহাতারকাদের মহাকাপুরুষতা

আরও একটা কথা ভেবে দেখার মত। শাহরুখ খান ধুতি পাঞ্জাবি পরে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে মালা দিয়ে, ভুল বাংলায় থিম সং গেয়ে ইডেন উদ্যানে যে দলটার তাঁবু ফেলেছেন, সেই কলকাতা নাইট রাইডার্সকে দিয়ে বাংলার ক্রিকেটের কী উপকার হচ্ছে? ওটা কাল রাজকোট নাইট রাইডার্স বা অযোধ্যা নাইট রাইডার্স হয়ে গেলেই বা কী ক্ষতি হবে? সে দল আইপিএল জেতায় রাজ্যের রাজধানীতে এ রাজ্যের করদাতাদের টাকায় ঘটা করে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছিল। তাতে বাংলার ক্রিকেটের কী উপকার হয়েছে? আইপিএল যখন চালু হয়, তখন বলা হয়েছিল ফ্র্যাঞ্চাইজগুলো যে এলাকায়, সেই এলাকার ক্রিকেটের উন্নতিকল্পে তারা কাজ করবে। সে কাজের কোনো হিসাব আছে? রাজ্য সরকারের এ রাজ্যের সমস্ত খেলায় যেরকম কড়া নজর, তাতে কলকাতা নাইট রাইডার্সের জবাবদিহি চাইতে পারে কিন্তু।

মনোজ নিজেই মন্ত্রিসভার সদস্য। সুতরাং চাইলে স্বয়ং এ কাজ করতে পারেন। কিন্তু বাংলার ক্রিকেটের যে আর গুরুত্ব নেই তা তো তিনি ভালই বুঝে ফেলেছেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দশ হাজারের বেশি রানের মালিক মনোজ বিদায়কালে বলেছেন, তরুণ খেলোয়াড়রা আইপিএলকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে হতাশ হয়ে এক্সে পোস্ট করে ফেলেছিলেন যে পরের মরসুম থেকে রঞ্জি ট্রফি বন্ধই করে দেওয়া উচিত। তার জন্যে বোর্ডকে জরিমানাও দিতে হয়েছে। কিন্তু কথাটা তো ভুল বলেননি। আগামী দিনে বাংলার ক্রিকেট বলে আদৌ কিছু থাকবে কিনা কে জানে? সুতরাং আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজকে চটিয়ে কী লাভ? তাদের বিরুদ্ধে কিছু করে, লড়েই জেতার আশা নেই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

বাংলা মাধ্যম ও বাংলা বিপন্ন, কিন্তু রেডিও জকির হাতে নয়

অভিজ্ঞতাকে যুক্তি হিসাবে খাড়া করায় যাদের আপত্তি আছে, তাদের এ লেখা না পড়াই ভাল। কারণ দর্শন বলে একটা বিষয় সারা পৃথিবীতে পড়ানো হয়। জ্ঞান কী করে আহরণ করা যায়, বা সহজ করে বললে, সত্য জানার উপায় কী, তা দর্শনের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। নানা দার্শনিক ঘরানা এ নিয়ে নানা কথা বললেও কেউই সত্য জানার উপায় হিসাবে অভিজ্ঞতাকে একেবারে অগ্রাহ্য করে না। কিন্তু দর্শন-টর্শন, মাননীয়া রেডিও জকি অয়ন্তিকা ফেসবুক লাইভে যাদের আঁতেল বলেছেন, তাদের বিষয়। কারণ দর্শন নিয়ে গবেষণা করে কর্পোরেটে চাকরি পাওয়া যায় না। দর্শনের ছাত্রছাত্রীরা বিলক্ষণ কর্পোরেটের চাকরি পেতে পারে এবং পায়, কিন্তু তা অন্য কোনো পারদর্শিতার জন্য। উপরন্তু কেবল অয়ন্তিকার সমর্থকরাই যে দর্শনকে আঁতেল ব্যাপার মনে করেন তা নয়, যাঁরা তাঁর বিপক্ষে তাঁরাও দর্শন-ফর্শনের ধার ধারেন না। কিন্তু বর্তমান লেখকের তাতে বয়ে গেছে। সোশাল মিডিয়ার দস্তুর মেনে অয়ন্তিকার পক্ষে বা বিপক্ষে মুচমুচে কথা লিখে চটজলদি লাইক কুড়োনো এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। অয়ন্তিকা যা বলেছেন তার মধ্যে সার কিছু আছে কি, না সবটাই ঘুঁটে? যতটা ঘুঁটে তা দিয়ে উনুন জ্বালানো চলবে কি, নাকি ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে? সেসব তলিয়ে দেখাই এ লেখার উদ্দেশ্য।

যাঁরা অয়ন্তিকার বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত, তাঁদের অনেকের অনেক যুক্তিপূর্ণ মন্তব্য দেখলাম। কিন্তু একটা কথা চোখে পড়ল না। মাননীয়াকে কেউই ধরিয়ে দিচ্ছেন না, যে কর্পোরেটের চাকরি না পেলেই শিক্ষা বৃথা – এর চেয়ে বড় ভুল ধারণা আর হয় না। লেখাপড়ার উদ্দেশ্য জগতকে জানা, জীবিকা অর্জন করা নয় – রচনাবই মুখস্থ করা এরকম কোনো বক্তব্য রাখছি না। এই চূড়ান্ত বেসরকারিকরণের যুগেও কর্পোরেটের চাকরি নয়, এরকম কত চাকরি আছে নিজেই একবার ভেবে দেখুন। রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় স্তরের আমলারা কি কর্পোরেটের চাকরি করেন? একেবারে উচ্চপদস্থদের বাদ দিলে, আমলাদের মাইনেপত্তর, অন্যান্য সুযোগসুবিধা কিন্তু এখনো ভারতে যারা বহুজাতিকের চাকরি করে তাদের সমান বা তার চেয়েও ভাল। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীরাও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কর্পোরেটের চাকুরে ছিলেন না। তাঁদের লেখাপড়া কি বৃথা গিয়েছে? ডাক্তার, নার্সরা অনেকেই কর্পোরেটের চাকুরে নন। বস্তুত কর্পোরেট হাসপাতালে যে ডাক্তারদের আমরা দেখাই, তাঁরা অনেকেই আসলে সরকারি হাসপাতালে চাকুরিরত। সেই পরিচয়ের কারণে, সেখানে অর্জিত সুনামের ফলেই কর্পোরেট হাসপাতালের মালিকরা ওঁদের নিজের হাসপাতালে নিয়ে যান। অনেক ডাক্তার আবার হাজার পীড়াপীড়ি করলেও যান না। যাঁরা পুলিসে চাকরি করেন তাঁরাও কর্পোরেটের চাকুরে নন, সেনাবাহিনীর লোকেরা তো ননই। স্বাধীনোত্তর ভারতে সম্ভবত সাংবাদিকতাই একমাত্র ক্ষেত্র, যেখানে দূরদর্শন আর অল ইন্ডিয়া রেডিও বাদ দিলে পুরোটাই কর্পোরেটের হাতে (কর্পোরেট শব্দটা যদিও তুলনায় নবীন, আগে প্রাইভেট সেক্টর বা বেসরকারি ক্ষেত্র বলা হত) ছিল। সেই ক্ষেত্রের চেহারাও বদলাচ্ছে, যদিও গতি এখনো মন্থর। ‘স্বাধীন সাংবাদিকতা’ বলে অশ্রুতপূর্ব একটা কথা উঠে এসেছে, বিশাল কর্পোরেট হাউসের বাইরে ছোট ছোট ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সাংবাদিকতার পরিসর গড়ে উঠছে। আগামীদিনে সাংবাদিকতার চাকরির জন্যও হয়ত সেগুলোর দিকে যেতে হবে ছেলেমেয়েদের।

সুতরাং বাংলা মাধ্যমে পড়লে কর্পোরেটের চাকরি পাওয়া যাবে না, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে – এই কথাটা আসলে পারিবারিক হোয়াটস্যাপ গ্রুপ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত বন্ধুদের সমসত্ত্ব জনগোষ্ঠীর মতামত, তার বেশি কিছু নয়। তাছাড়া সবাই চাকরি করবেই বা কেন? কেউ খেলোয়াড় হতে পারে। শুধু ক্রিকেট নয়, যত দিন যাচ্ছে এ দেশে অন্য খেলাধুলোতেও রোজগারের পরিমাণ বাড়ছে। কেউ অভিনেতা হবে, কেউ গায়ক বা বাজিয়ে হবে। সকলেরই চোস্ত ইংরেজি বলার দরকার পড়বে কি? কল্পনা করুন, একটি বাঙালি ছেলে শতরান করেছে আর অয়ন্তিকার মত কোনো ইংরেজি মাধ্যমে পড়া ধারাভাষ্যকার নাক সিঁটকে বলছেন “ভাল করে ইংরেজি বলতে পারে না বলে দ্বিশতরান করতে পারল না।” বা ধরুন একটি মেয়ে চমৎকার গান গায়। বলিউডে অডিশন দিতে গেল, ইংরেজি মাধ্যমে পড়া এক সঙ্গীত পরিচালক বললেন “ইংরেজিটা ঠিক বলতে পারে না তো, তাই সা থেকে পা-তে পৌঁছতে পারছে না।”

হাসছেন তো? হাসবেন না। কোনো ধারাভাষ্যকার এত বোকা নন, কোনো সঙ্গীত পরিচালকও এত মূর্খ নন। তাঁরা পেশাদার লোক, যোগ্যতার দাম দিতে জানেন। ফলে এমনটা কখনো ঘটবে না। কিন্তু ইংরেজি জানা (কেবল ইংরেজি মাধ্যমে পড়া নয়) বাঙালি এভাবেই ভাবতে অভ্যস্ত, অর্থাৎ ভাল ইংরেজি বলতে পারা আলাদা একটা যোগ্যতা বলে ভাবতে অভ্যস্ত। অয়ন্তিকা যা বলেছেন সেই অভ্যাস থেকেই বলেছেন। বিতর্ক তৈরি হওয়ায় নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে তিনি যে দীর্ঘ ফেসবুক লাইভ করেছেন সেখানে এই ভাবনাটা আরও পরিষ্কার হয়ে গেছে। তিনি বেশ জোর দিয়ে বলেছেন, বাংলা মাধ্যমে পড়ে যারা ভাল করে ইংরেজি বলতে পারে না, তারা নির্ঘাত হীনমন্যতায় ভোগে।

কথাটা ঠিক। ইংরেজি মাধ্যমে পড়া অনেকেও যে জঘন্য ইংরেজি বলে, কেবল টের পায় না যে ভুলভাল বলছে, সে কথা থাক। কিন্তু বিভিন্ন পেশায় দারুণ সফল অনেককেই চিনি যারা এই হীনমন্যতায় ভুগছে। কদিন আগেই আমার মত বাংলা মাধ্যমে পড়া এক অন্তরঙ্গ বন্ধুর সঙ্গে কথা হল। সে-ও বলল, মনে হয় আরও উন্নতি করতে পারতাম গড়গড়িয়ে ইংরেজি বলতে পারলে। এই হীনমন্যতার কারণ কী? কারণ অন্য বাঙালিরা। আমি কাজ করতাম ইংরেজি কাগজে, বেশকিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচের প্রতিবেদন লেখার সুযোগ পেয়েছি। লক্ষ করেছি, সাংবাদিক সম্মেলনে সব রাজ্যের আঞ্চলিক ভাষার সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরাই ইংরেজিতে প্রশ্ন করতে গিয়ে হোঁচট খান। উত্তর ভারতীয়রা সেই কারণে সাধারণত হিন্দিতে প্রশ্ন করেন বা হিন্দি মিশিয়ে বলেন। দক্ষিণ ভারতের অনেকে আবার হিন্দিতেও সড়গড় নন। তাঁরা কিন্তু বুক ফুলিয়ে যেমন ইংরেজি আসে, তেমন ইংরেজিতেই প্রশ্ন করেন। বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব যিনি উত্তর দেবেন তাঁর বা দায়িত্বপ্রাপ্ত মিডিয়া ম্যানেজারের। ইংরেজিটা নেহাত দুর্বোধ্য হলে ওই সাংবাদিকের রাজ্যের ভাল ইংরেজি জানা অন্য সাংবাদিকরা দেখেছি সাহায্য করেন। মাতৃভাষায় প্রশ্নটা জেনে নিয়ে ইংরেজিতে অনুবাদ করে বলে দেন। অথচ কলকাতার বাংলা কাগজ, চ্যানেলের সাংবাদিকদের কাউকে কাউকে দেখেছি ইংরেজি বলতে গিয়ে দরদর করে ঘামছেন। যাঁরা ফরসা তাঁদের মুখচোখ লাল হয়ে যেতে দেখেছি। কারণটা আর কিছুই নয়। উনি জানেন ওঁকে নিয়ে পরে হাসাহাসি করবে ওঁর নিজের শহরের সাংবাদিকরাই। হাতে গোনা দু-একজন ভাল ইংরেজি বলা সাংবাদিক সাহায্য করেন, বাকিরা জুলজুল করে তাকিয়ে থেকে সান্ধ্য মদ্যপানের আসরের হাসির খোরাক সংগ্রহ করেন। কারণ তাঁরাও অয়ন্তিকার দলে। মনে করেন কে কত ভাল ইংরেজি বলে তা দিয়ে প্রমাণ হয় কে কত ভাল সাংবাদিক। কলকাতার এক বহুল প্রচারিত বাংলা কাগজের ক্রীড়া সম্পাদক তো এই সেদিনও বলে বেড়াতেন, তাঁর ভাল বাংলা জানা তরুণ সাংবাদিক দরকার নেই। দরকার ভাল ইংরেজি বলতে পারা সাংবাদিক। সে কাগজের প্রতিবেদনের মান এবং ভাষার মান পাল্লা দিয়ে নেমেছে।

পৃথিবীর কটা জাতি ভাল ইংরেজি বলতে পারা আলাদা যোগ্যতা মনে করে সন্দেহ আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করতে যাওয়া এক বন্ধুর মুখে শুনেছিলাম, প্রথম দিকে টক দিতে উঠে সে ঘেমে নেয়ে যেত। তারপর তার রিসার্চ গাইড, যাঁর মাতৃভাষা ইংরেজি, একদিন জিজ্ঞেস করেন, তুমি তো যথেষ্ট ভাল ফিজিক্স জানো। বলতে গিয়ে অত ঘাবড়ে যাও কেন? সে উত্তরে জানায়, ইংরেজিটা ভুলভাল হয়ে যায় যদি? ভয় লাগে। তিনি তখন তাকে বলেন, ইংরেজি তোমার মাতৃভাষা নয়। তোমাকে আমরা নিয়েছি পদার্থবিদ্যার জন্যে, ইংরেজির জন্যে তো নয়। ও নিয়ে অত ভেবো না, কাজ চালিয়ে নিলেই হল। বাঙালি অধ্যাপক হলে ও কথা বলতেন না বোধহয়। আমার তো ইদানীং সন্দেহ হয়, সত্যজিৎ রায়ের ইংরেজি উচ্চারণ সাহেবদের মত না হলে বাঙালি বোধহয় তাঁকে বড় পরিচালক বলে মানত না।

এবার অন্য দিকটা দেখা যাক। অয়ন্তিকার বিরোধিতায় বাংলা মাধ্যমে পড়া জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল, এমনকি কর্পোরেট চাকরিতেই বহুদূর উঠেছেন এমন অনেক মানুষকে মুখ খুলতে দেখা গেছে। এটা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। মাননীয়ার কথায় যে যুক্তির য আর মেধার ম নেই সে তো আগেই বললাম। নিজের পিঠ বাঁচাতে যিনি বাংলাপক্ষের বাংলায় বাঙালিদের জন্য কাজ সংরক্ষণের দাবিকে সমর্থন করেন, তাঁর যুক্তিবোধ নিয়ে আর শব্দ খরচ করব না। কিন্তু কথা হল এই যে এত বাংলাপ্রেমী ও বাংলা মাধ্যমপ্রেমীর দেখা পাওয়া গেছে, এঁদের অনেকের প্রেমই যে দুষ্মন্তের শকুন্তলার প্রতি প্রেমের মত হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানে অভিজ্ঞানটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিজে পড়েছেন বাংলা মাধ্যমে, তার জন্যে কোথাও হোঁচট খেতেও হয়নি। কিন্তু নিজের সন্তানকে পড়াচ্ছেন ইংরেজি মাধ্যমে। শুধু কি তাই? সন্তানের দ্বিতীয় ভাষা করেছেন হিন্দি। ছেলের ইংরেজি ও হিন্দি শিক্ষায় কোনো ছিদ্র দিয়ে যাতে বাংলা ঢুকতে না পারে, সে জন্য টিভিতে বাংলা অনুষ্ঠান দেখাও নিষিদ্ধ – এমন বাড়ি মফস্বলেও হয়েছে আজকাল। অয়ন্তিকা জনপ্রিয় এফ এম চ্যানেলে কাজ করেন। মুখের ভাষা শুনলেই বোঝা যায় বাংলা কোনোদিন ঠিক করে শেখেননি, তার জন্যে কিঞ্চিৎ গর্বও আছে। তা সত্ত্বেও ভাঙব তবু মচকাব না ফেসবুক লাইভটি করতে হল কেন? বাজারের চাপ। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ বাজার সমীক্ষা করে থাকেন, ফলে জানেন এফ এম চ্যানেলের শ্রোতাদের একটা বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গের মফস্বল ও গ্রামের বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করা মানুষজন, বিশেষ করে অল্পবয়সীরা। তারা শোনে কিন্তু হিন্দি গান, নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময়ে ইংরেজি, হিন্দি মিশিয়েই কথা বলে। কারণ ওই খিচুড়ি ভাষা না বললে গ্রামের বন্ধুরাও গাঁইয়া ভাববে। এরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে না, কারণ পড়ার সুযোগ পায় না। হয় বাবা-মায়ের সে সামর্থ্য নেই, নয় এলাকায় তেমন স্কুল নেই। এদের চটিয়ে ফেললে এফ এম চ্যানেলের সমূহ ক্ষতি। আর জে ভদ্রমহিলা ইংরেজি মাধ্যমে পড়েও এমনই অশিক্ষিত, অভব্য যে জানেন না, মানুষকে তার দুর্বলতা নিয়ে খোঁচা দিতে নেই। সেই অভব্যতার দায় চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নেবেন কেন? জবাবদিহির আসল কারণ বোধহয় সেইটা।

এখান থেকেই তাহলে এসে গেল পরবর্তী প্রশ্নগুলো। ১) বাংলা মাধ্যমে পড়া পেশাগতভাবে সফল বাবা-মা ছেলেমেয়েকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে চান কেন? ২) যারা বাংলা মাধ্যমে পড়ে তারাও অনেকে নিজেদের ইংরেজি মাধ্যমের মত করে তুলতে চায় কেন?

এসবের একটা কারণ অবশ্যই ইংরেজি বলার ক্ষমতাকে অকারণ গুরুত্ব দেওয়া, ইংরেজি শিখতে চাওয়া নয়। কারণ কোনো ভাষা শিখতে হলে সব বিষয় সেই ভাষাতেই পড়তে হয়, নইলে শেখা যায় না – এমনটা পৃথিবীর কোথাও প্রমাণ হয়নি। তাছাড়া যে কোনো বাঙালি বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করুন, ইংলিশ মিডিয়ামে কেন পড়ান? উত্তর আসে, আজকালকার দিনে তো ইংলিশটা বলতে না পারলে হবে না। অর্থাৎ ইংরেজি শেখা নয়, অঙ্ক, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল বেশি ভাল করে শেখা যায় বলেও নয়, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করা শুধু ইংরেজি বলতে শেখার জন্য। মানে স্কুলটা মূলত স্পোকেন ইংলিশ ক্লাস। একই যুক্তিতে আজকাল হিন্দিকে বাঙালি শিশুর দ্বিতীয় ভাষা করা হচ্ছে। ভারতের অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলোর মধ্যে মহারাষ্ট্র ছাড়া সবই দক্ষিণে, অথচ বাঙালির নাকি হিন্দি বলতে না পারলে চাকরি হবে না। কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ হলে ভাবনা ছিল না।

কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এ রাজ্যে বরাবর বাংলা মাধ্যম স্কুল মানে সরকারি স্কুল (সরকারপোষিত স্কুলগুলো সমেত), আর ইংরেজি মাধ্যম স্কুল মানে বেসরকারি স্কুল। ইংলিশটা বলতে না পারলে হবে না – এই যুক্তিতে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে দেওয়া বরাবর ছিল। কিন্তু গত শতকের আশি-নব্বইয়ের দশকেও, বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ছেলেমেয়েকে পড়তে পাঠানো এক ধরনের বিলাসিতা, সরকারি স্কুলে দিব্যি পড়াশোনা হয় – এই ধারণা চালু ছিল। ফলে এখন যারা বাবা-মা, তাদের বাবা-মায়েরা অনেকেই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ছেলেমেয়েকে সরকারি স্কুলেই পড়িয়েছেন। ছবিটা এই শতকের শুরু থেকে বদলাতে বদলাতে এখন এমন হয়েছে, যে অবস্থাপন্ন বাড়ির ছেলেমেয়েরা প্রায় কেউই আর সরকারি স্কুলে পড়ে না। কলকাতা থেকে মাত্র ৩০-৩৫ কিলোমিটার দূরে আমাদের নবগ্রাম। এখানকার সবচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে বড় ছেলেদের স্কুলের এক প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক বছর পাঁচেক আগে আমাকে সখেদে বলেছিলেন, আগে আমাদের স্কুলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, মাস্টার, ব্যবসাদার, মুচি, মেথর – সবার ছেলেই পড়ত। এখন শুধু রিকশাওলা, দিনমজুর, মেছো, কশাইদের ছেলেরা পড়ে। অর্থাৎ মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত আর নেই।

কেনই বা থাকবে? একে তো আর সবকিছুর মত স্কুলও ঝাঁ চকচকে না হলে সেখানে পড়াশোনা হয় না, এমন ধারণা বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং পরিকাঠামোর দিক থেকে অনেক সরকারি স্কুলই পিছিয়ে ছিল সেইসময়। উপরন্তু নব্বইয়ের দশক থেকেই স্কুলের পড়াশোনার মান কমাতে বিরাট ভূমিকা নিয়েছে প্রাইভেট টিউশন। সকালে স্কুল যাওয়ার আগে পর্যন্ত এবং বিকেলে স্কুল থেকে ফিরেই ঘরের বাইরে চটির পাহাড় জমিয়ে প্রাইভেট পড়াচ্ছেন সরকারি স্কুলের মাস্টারমশাই, আর স্কুলে গিয়ে অকাতরে ঝিমোচ্ছেন – এ জিনিস আমরা অনেকেই দেখেছি। স্কুলশিক্ষকদের এই সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা এই শতাব্দীর শুরুতে এমন ফুলে ফেঁপে উঠেছিল এবং এতরকম দুর্নীতির জন্ম দিয়েছিল যে ২০০১-০২ আর্থিক বর্ষের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত ঘোষণা করেছিলেন সরকারি স্কুলের শিক্ষক, অধ্যাপকদের প্রাইভেট টিউশন করা চলবে না। তা নিয়ে শিক্ষকদের সংগঠনগুলো এবং অভিভাবক, ছাত্রছাত্রীদের প্রবল দুশ্চিন্তা ও আপত্তি নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। শেষপর্যন্ত বামফ্রন্ট সরকার ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে উঠতে পারেনি। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল প্রাইভেট টিউশন। হেনকালে গগনেতে উঠিলেন চাঁদা। অর্থাৎ ব্যাঙের ছাতার মত বিপুল সংখ্যক ঝলমলে বেসরকারি স্কুল।

বর্তমান সরকারের আমলে সরকারি স্কুলে পড়াশোনার হাল কেমন তা শিক্ষক, শিক্ষিকাদের সাথে কথা বললেই জানা যায়। ক্লাস পিছু ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বরাবরই অসুবিধাজনক ছিল, এ আমলে আবার স্কুলে নিয়োগেও প্রায় দাঁড়ি পড়ে গেছে। রাজ্যে যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাব নেই, কিন্তু তাঁরা হয় আদালত চত্বরে পড়ে আছেন, নয় অনশন করছেন কোথাও। কপাল নিতান্ত মন্দ হলে পুলিসের লাঠি, জলকামান হজম করছেন, মরেও যাচ্ছেন কেউ কেউ। যাঁরা স্কুলে আছেন তাঁরা কেবল পড়াবেন আর পরীক্ষা নেবেন, খাতা দেখবেন তার জো নেই। অশিক্ষক কর্মী নিয়োগও অনিয়মিত, ফলে তাদের কাজ ঘাড়ে চাপছে, তার উপর সরকারি প্রকল্পের করণিকও হয়ে উঠতে হবে। শিক্ষাবর্ষে ক্লাসের চেয়ে বেশি সময় যাচ্ছে এই শ্রী, ওই শ্রী, সেই শ্রীর হিসাব রাখতে। গরীব সরকার ওসব কাজের জন্য আলাদা লোক রাখতে পারেন না। মাধ্যমিকের প্রশ্ন ফাঁস না হলে খবর হচ্ছে। কোনো স্কুলে প্রধান শিক্ষক বা টিচার ইন চার্জ জমিদারি কায়েম করে নিয়োগ আটকে দিচ্ছেন। এমন গণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম হয়েছে যে নিয়োগ সংক্রান্ত কেসের বিচারপতি তাঁর রায়ের উপর বারবার স্থগিতাদেশ দেওয়া হচ্ছে বলে ডিভিশন বেঞ্চের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে নালিশ করছেন।

এত ডামাডোল দেখেও কোন বাবা-মা ছেলেমেয়েকে সরকারি স্কুলে পড়তে পাঠাবেন? মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা ভুক্তভোগী। তাই তাঁরাও নিজেদের ছেলেমেয়েদের বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যমে দিচ্ছেন। সরকারের পোয়া বারো। বহু স্কুল ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, সেগুলোকে তুলে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা খাতে খরচ আরও কমিয়ে ফেলা যাচ্ছে, ভবিষ্যতের কত খরচ বেঁচে যাচ্ছে ভাবুন। তবে মাঝে মাঝে দেখানো দরকার যে সরকার স্কুলগুলোকে নিয়ে ভাবেন। তাই কিছু সরকারি স্কুলকে ইংরেজি মাধ্যম করে দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে হয়ত আরও হবে। এর পাশাপাশি আছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়। কেবল অয়ন্তিকাকে গাল পেড়ে বাংলা মাধ্যমের মান থাকবে?

ভারতের মত বহুভাষিক দেশে কেবল নিজের মাতৃভাষা শিখলে যে চলে না, তা ঠিকই। কিন্তু নিজের ভাষার বারোটা পাঁচ বাজিয়ে দেওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। তার প্রমাণ তামিল, মালয়ালম, কন্নড় ভাষাভাষীরা। আজকের ভারতে কোনো বিষয়েই তারা অন্য রাজ্যের লোকেদের চেয়ে পিছিয়ে নেই। শিল্প, সাহিত্য, কলা, বিজ্ঞানে বাঙালিদের চেয়ে ঢের এগিয়ে। দুঃখের বিষয় খিচুড়ি ভাষায় কথা না বলেও তারা দিব্যি ইংরেজি আয়ত্ত করে ফেলছে। আর বাঙালি কর্পোরেটের চাকুরে হয়ে উঠতে এত ব্যস্ত যে একসময় বাঙালি পণ্ডিতদের যা বৈশিষ্ট্য ছিল, বাংলা ও ইংরেজিতে সমান মুনশিয়ানা, তা লুপ্তপ্রায়। এখন বাঙালির ভাষা চৌরঙ্গী ছবির স্যাটা বোসকে মনে পড়ায়। বাংলা শেক্সপিয়রের মত, ইংরেজি তুলসীদাসের মত আর হিন্দি রবীন্দ্রনাথের মত। মাননীয়া রেডিও জকির মত লেখাপড়া জানা কূপমণ্ডূক বাঙালি মনে করে হিন্দি, ইংরেজি ছাড়া বাংলা বলে আঁতেলরা। সে বাংলা বঙ্কিমচন্দ্রের। আর খিস্তি হল নবারুণ ভট্টাচার্যের বাংলা। কিন্তু কেবল এফ এমের আর জে নয়, আজকাল সাহিত্যিকরাও খিচুড়ি ভাষাই ব্যবহার করেন। কবিতা পত্রিকায় ওই ভাষায় বাংলা কবিতা নিয়ে প্রবন্ধ লেখা হয়। কদিন আগে বাংলা ভাষার এক ফেসবুক কাঁপানো কবি খিচুড়ি ভাষায় নামকরণ করা এক অনুষ্ঠানের বিচারক হয়েছেন। সোশাল মিডিয়ায় এক বাঙালি মুসলমান যুবক তা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় কবির পাল্টা যুক্তি ছিল, আপনার নামটাই তো বাংলা নয়।

আর আপনি ভাবছেন বাংলা বিজেপি বা অয়ন্তিকার হাতে বিপন্ন?

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে

আরও পড়ুন

হিন্দির হাতে বাংলা বিপন্ন: বাঙালি কি নির্দোষ?