২০২২ সালে করোনা অতিমারীর চোটে স্কুল বন্ধ থাকায় ছাত্রছাত্রীদের উপর পাঠ্যক্রমের ভার কমানোর দোহাই দিয়ে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার অঙ্গ হিসাবে ধাপে ধাপে গত তিন বছরে ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি) তাদের বিভিন্ন ক্লাসের ইতিহাস বই থেকে মোগল যুগ একেবারে বাদ দিয়ে দিয়েছে। এর ফল কী? সারা দেশের সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশনের অধীন স্কুল এবং বহু রাজ্যের বোর্ডের স্কুল এনসিইআরটি-র বই পড়ায়। সেইসব স্কুলের ছেলেমেয়েরা মোগল সম্রাটদের শাসন সম্পর্কে জানবে না, তাঁদের ভাল কাজ মন্দ কাজ জানবে না। ভারতের ধর্মীয় সমন্বয়ের ইতিহাসে মোগলদের অবদান সম্পর্কেও কিছু জানবে না। ঋজু বিদূষক বরুণ গ্রোভার সকৌতুকে বলেছেন, তাজমহল কারা বানিয়েছিল – এ প্রশ্নের উত্তর হল ‘ইউ পি পি ডব্লিউ ডি কে এক ইঞ্জিনিয়ার থে… শ্রীবাস্তব সাহব। উনহো নে বিজলি বিভাগ কা এক দফতর বনওয়ায়া থা, ইস লিয়ে মিনার হ্যাঁয়… চার সাইড পে চার মিনার হ্যাঁয়, উস সে চার ফেজ – এ বি সি ডি – নিকলতে হ্যাঁয়। আগ্রা কে চার হিসসোঁ মে বিজলি জাতি থি ইয়হাঁ সে। ১৫২৬ মে পানিপথ কি পহলি লড়াই মে ইব্রাহিম লোদী কো হরা কর ইন্ডিয়া মে শ্রীবাস্তব ডাইনেস্টি আয়ি থি। করীবন তিনসো সাল উনহো নে রাজ কিয়া, ফির ১৮৫৭ মে কুইন ভিক্টোরিয়া আঈ, শ্রীবাস্তব সাহব কো পকড়ি, মুহ দবাঈ, বোলি বিয়া হো গয়া তুমহারা? শ্রীবাস্তব সাহব কি থোড়ি ফট গঈ… বোলি কাঁপ কাহে রহে হো? শ্রীবাস্তব সাহব বোলে অচ্ছা ঠিক হ্যায়, হম নিকল লেতে হ্যাঁয়। আপ দেখ লো আপ কো জো করনা হ্যায়।’
এই কৌতুকের বাংলা তরজমা করার প্রয়োজন নেই, কারণ আজকের বাঙালি এটুকু হিন্দি জানে। কিন্তু একথা বলা এইজন্যে যে ভারতের ইতিহাস থেকে নিজেদের অপছন্দের পর্বগুলো মুছে দেওয়ার যে হাস্যকর কিন্তু ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদী প্রকল্প ভারতে চালু করেছে বিজেপিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার, তা এবার স্কুলপাঠ্য বই থেকে বেরিয়ে পৌঁছে গেছে ক্রিকেট মাঠেও। আপনি যদি বোকা বা ন্যাকা না হন, তাহলে অস্বীকার করবেন না যে বিশ্ব ক্রিকেটকে এখন নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। জাতীয়তাবাদী হলে তো আপনি এ নিয়ে গর্বিতই হবেন। বিসিসিআই বহুদিন ধরেই গোটা ক্রিকেট দুনিয়ার উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে টাকার জোরে, আর এখন তো বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সম্পাদকই হয়ে বসেছেন অমিত শাহের ছেলে জয় শাহ। ঔপনিবেশিক যুগের ইতিহাস যা-ই থাক, এখন কিন্তু ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের লেজুড় ছাড়া কিছুই নয়। তাদের ঘাড়ে কটা মাথা, যে ভারতীয় বোর্ডের অনুমতি ছাড়া ট্রফির নাম বদল করবে? ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠেয় ভারত-ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজের বিজয়ীকে দেয় ট্রফির নাম ২০০৭ সালে রাখা হয়েছিল পতৌদি ট্রফি। সে নাম বদলে ফেলা হয়েছে বেমালুম। ২০ জুন থেকে যে সিরিজ শুরু হতে যাচ্ছে, তাতে জয়ী দলকে দেওয়া হবে তেন্ডুলকর-অ্যান্ডারসন ট্রফি। এটাও ইতিহাস মুছে দেওয়ার চেষ্টা।
২০০৭ সালে কেন ট্রফির নাম রাখা হয়েছিল পতৌদি ট্রফি? কারণ সেবার ভারতীয় দলের ইংল্যান্ড সফরের ৭৫ বছর পূর্তি হল। তাকে স্মরণীয় করে রাখতেই এমন একটা নাম রাখা হয়, যে নামের সঙ্গে দুই দেশের ক্রিকেটই জড়িয়ে আছে। ইফতিকার আলি খান পতৌদি ভারত, ইংল্যান্ড – দুই দেশের হয়েই টেস্ট খেলেছেন। ভারতের অধিনায়কত্বও করেছেন। ক্রিকেটার হিসাবে সাধারণ ছিলেন, কিন্তু ক্রিকেটের ইতিহাসে তাঁর একটা কাজের অসাধারণত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। ১৯৩২-৩৩ সালের অ্যাশেজ সিরিজে যখন ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন বডিলাইন কৌশল (লেগ সাইডে যত বেশি সম্ভব ফিল্ডার রেখে ক্রমাগত ব্যাটারদের শরীর লক্ষ্য করে শর্টপিচ বল করে যাওয়া) অবলম্বন করেন ডন ব্র্যাডম্যানের রান আটকাতে, তখন ইফতিকার বলেন যে ওটা ক্রিকেট নয় এবং তিনি লেগ সাইডে ফিল্ডিং করবেন না। ফলে অধিনায়ক জার্ডিন তাঁকে দল থেকে বাদ দিয়ে দেন এবং কথিত আছে যে হুমকি দিয়েছিলেন, আর কোনোদিন ইফতিকার ইংল্যান্ড দলে জায়গা পাবেন না। ইফতিকার কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত বদল করেননি। মনে রাখা ভাল, ভারতের স্বাধীনতা তখন দূর অস্ত। ফলে আর কখনো টেস্ট খেলা হবে না – এ সম্ভাবনা জেনেই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কেউ বলতেই পারেন, ক্রিকেট ইফতিকারের পেশা ছিল না। তাঁর মত ধনীর দুলালের টেস্ট না খেললে কী-ই বা এসে যেত? তাই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন। যুক্তিটা ভুল নয়, কিন্তু পরাধীন দেশের একজন ক্রিকেটারের শাসক জাতির অধিনায়কের বিরুদ্ধে ওই অবস্থান যে ইংরেজদেরও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল তার প্রমাণ আছে। ১৯৮৪ সালে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন একখানা টিভি মিনি সিরিজ নির্মাণ করে ওই বডিলাইন সিরিজ নিয়ে। সেখানে জার্ডিন আর ইফতিকারের ওই কথোপকথন দেখানো হয়েছে। নয়ের দশকে দূরদর্শনে আমরা কেউ কেউ সেই সিরিজ খানিকটা দেখেছি। আজকের তরুণরা, যাঁরা মনে করেন যা নাই ইন্টারনেটে তা নাই ভুবনে – তাঁরা এই লিংকে ক্লিক করে দৃশ্যটা দেখে নিতে পারেন।
কিন্তু ইফতিকারের চেয়ে ক্রিকেটার এবং ভারত অধিনায়ক হিসাবে অনেক বড় ছিলেন, ঐতিহাসিকভাবে অনেক মহত্তর ভূমিকা পালন করেছেন তাঁর ছেলে মনসুর আলি খান পতৌদি। তাঁরও ইংল্যান্ড, ভারত – দুই দেশের ক্রিকেটের সঙ্গেই সম্পর্ক। ভারতের হয়ে টেস্ট খেলেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন আর সাসেক্স কাউন্টির হয়ে দীর্ঘদিন খেলেছেন। মনসুর মাত্র ২১ বছর বয়সে ভারত অধিনায়ক হন। তার আগেই গাড়ি দুর্ঘটনায় একটা চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাঁর ব্যাটিংয়ের অনেকখানি ক্ষতি হয়। ছেচল্লিশটা টেস্ট খেলে ছটা শতরান সমেত ৩৪.৯১ গড়ে ২৭৯৩ রান একজন সাধারণ ক্রিকেটারের পরিসংখ্যান। কিন্তু যাঁরা তাঁকে ব্যাট করতে দেখেছেন, তাঁরা কেউ কেউ বলেছেন, লিখেছেন যে দুটো চোখই ঠিক থাকলে তিনি হয়ত বিশ্বের সেরা ব্যাটার হতে পারতেন। সেই আমলে ফিল্ডার হিসাবেও তিনি যে অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন, সেকথা বহু প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে পাওয়া যায়। ওসব না হয় বাদই দেওয়া গেল। এটুকুই যথেষ্ট যে মনসুর সেই অধিনায়ক যিনি ভারতকে প্রথমবার বিদেশে সিরিজ জেতান (নিউজিল্যান্ড, ১৯৬৭-৬৮)। বস্তুত ভারতীয় ক্রিকেটে তিনি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটান। বিদেশের মাঠে, যেখানে স্পিন সহায়ক পিচ হয় না, সেখানেও তিন স্পিনার খেলানোর সিদ্ধান্ত তাঁরই। সেটাই ইতিহাস বদলে দেয়। নিউজিল্যান্ডের ওই ঐতিহাসিক জয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন অফস্পিনার এরাপল্লি প্রসন্ন, সঙ্গে ছিলেন বিষাণ সিং বেদি। প্রবাদপ্রতিম বেদি কারোর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করার লোক ছিলেন না, কিন্তু তিনিও আজীবন বলেছেন, মনসুর তাঁদের সময়ের সেরা ক্রিকেটার। অন্যত্র তিনি বলেছেন, ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে মনসুর ভারতীয়ত্ব জাগিয়ে তোলেন।
অর্থাৎ আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, চীন, শক, হুন, পাঠান, মোগলকে এক দেহে লীন করার যে ক্ষমতা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসেও খুব বেশি নেতা দেখাতে পারেননি; ঠিক সেটাই ছিল ‘টাইগার’ পতৌদির। দুঃখের বিষয়, ভারতের সমাজের কোনো শাখাতেই সুঅভ্যাসগুলো বেশিদিন টেকে না। ফলে মনসুরের প্রস্থানের পর প্রাদেশিকতা, স্বজনপোষণ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো ফিরে এসেছিল। একুশ শতকের শুরুতে আবার সেসব দূর করে জাতীয় দলকে যথার্থ ভারতীয় দল করে তুলতে দেখা গিয়েছিল অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিকে। মনসুর আর সৌরভের যুগের ক্রিকেটারদের মধ্যে যোগ্যতার বিস্তর পার্থক্য ছিল। স্বভাবতই অধিনায়ক সৌরভের সাফল্য অনেক বেশি। সৌরভের পরবর্তীকালের মহেন্দ্র সিং ধোনি বা বিরাট কোহলিরা আরও বেশি সফল হয়েছেন অধিনায়ক হিসাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শিকড় ছাড়া গাছ হয় না; ইতিহাস ছাড়া মানুষ হয় না। ফলে টাইগার ছাড়া আজকের বিরাটও হয় না। কিন্তু এই সত্য স্বীকার করা আজকের ভারতীয় ক্রিকেটের নিয়ামকদের পক্ষে অসম্ভব। ভারত নামক ‘একটি বিরাট হিয়া’ জাগিয়ে তুলতে মোগল শাসকদের ভূমিকার কথা স্বীকার করা সংঘ পরিবারের পক্ষে অসম্ভব, কারণ তাহলে ‘ভারত আসলে একটি হিন্দুরাষ্ট্র’ – এই তত্ত্ব ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ঠিক তেমনি, ভারতীয় ক্রিকেট আজ পত্রে পুষ্পে পল্লবিত হয়ে যে চেহারা নিয়েছে তার শিকড় যে একজন মুসলমান অধিনায়ক – সেকথাও স্বীকার করা চলে না। হিন্দুরাষ্ট্রের জনতার আফিম যে ক্রিকেট, তা যে আদ্যোপান্ত হিন্দুদের হাতেই তৈরি – এমনটা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে চলবে কেন? ইতিহাসে অন্য কিছু থাকলে তা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে হবে।
টাইগার পতৌদিকে ব্যক্তি হিসাবেও অপছন্দ করার কারণ আছে সংঘ পরিবারের। তিনি বিয়ে করেছিলেন বাঙালি বামুনের মেয়ে শর্মিলা ঠাকুরকে। তাঁদের ছেলে সঈফ দুবার বিয়ে করেছেন, দুবারই বউ অমুসলমান। সংঘ পরিবারের আজকের লব্জে যাকে বলে ‘লভ জিহাদ’। টাইগার-শর্মিলার মেয়ে সোহার বর আবার কেবল হিন্দু নন, একেবারে কাশ্মীরী পণ্ডিত। কুণাল খেমুর জন্মও শ্রীনগরে। ভারতের সর্বত্র কাশ্মীরী পণ্ডিতদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেই মুসলমানরা কত খারাপ সেকথা প্রচার করে থাকে হিন্দুত্ববাদীরা, অথচ এই পরিবারের সকলে মিলে সব ধর্মীয় গোঁড়ামির বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছেন। শর্মিলা, অমৃতা বা করিনাকে হিজাব বা বোরখা পরে ঘুরতে দেখা যায়নি। কুণালকেও সোহার সঙ্গে বিয়ের পর দাড়ি রেখে ফেজ পরে ঘুরতে দেখা যায় না। মুসলমানদের যে যে স্টিরিওটাইপ হিন্দুদের সামনে তুলে ধরে ভয় দেখায় সংঘ পরিবার, তাকে এভাবে প্রতিনিয়ত নস্যাৎ করে চলা পরিবারের নাম কী করে জড়িয়ে থাকতে দেওয়া যায় নরেন্দ্র মোদীর ভারতের এক নম্বর জনপ্রিয় খেলার সঙ্গে? পারে না বলেই বোধহয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড ২০১৩ সালে চালু হওয়া বার্ষিক পতৌদি স্মারক বক্তৃতাও বন্ধ করে দিয়েছে ২০২০ সালের পর থেকে।
লক্ষণীয়, বিশেষ করে ২০১৯ সাল থেকে, এদেশের জনপরিসর থেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতি মুছে দেওয়ার সযত্ন প্রচেষ্টা চলছে। বলিউডে ক্রমাগত মুসলমানবিরোধী, ইতিহাসবিকৃত, যুদ্ধবাজ ছবি বানানো হচ্ছে। উপরন্তু বলিউড শাসন করতেন যে তিন খান – তাঁদের বিরুদ্ধেও নানা শক্তি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। শাহরুখ খানের ছেলেকে অতি সামান্য অভিযোগে হাজতবাস করানো হয়েছে, সলমন খানকে খুন করার পরিকল্পনা হয়েছে, আমির খানের ছবি মুক্তি পাওয়ার সময় এলেই দক্ষিণপন্থী আই টি সেল বয়কটের ডাক দিয়েছে। এর বাইরে মনসুর-শর্মিলার ছেলেকেও খুনের চেষ্টা হয়েছে কিছুদিন আগে।
এই দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে তিষ্ঠোতে দেওয়া হবে পতৌদি পিতা-পুত্রকে? কক্ষনো না। বরং থাকুন বাধ্য মারাঠি ব্রাহ্মণ তেন্ডুলকর, যিনি হাসিমুখে অযোধ্যার রামমন্দিরের উদ্বোধনে গিয়েছিলেন। সঙ্গে থাকুন সর্বকালের সেরা ইংরেজ ক্রিকেটারদের একজন – জেমস অ্যান্ডারসন। তাহলে সাপও মরে, লাঠিও ভাঙে না।
আরও পড়ুন অপমানে হতে হবে মহম্মদ শামির সমান
যাঁদের এখনো ধারণা ক্রিকেট খেলা হয় শুধু মাঠের ভিতরে, এসব রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে আনা নেহাত বাচালতা (অল্পবয়সীদের ভাষায় ‘ফেসবুকের কাকুদের হ্যাজ’), তাঁরা বলবেন শচীনের মত মহান ক্রিকেটারের নামে ট্রফির নাম রাখা হলে আপত্তির কী আছে? লোকটা টেস্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান এবং শতরান করেছে। সে কি অযোগ্য? নাকি অ্যান্ডারসন অযোগ্য? তিনি তো জোরে বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টেস্ট উইকেট নিয়েছেন (৭০৪)। আজ্ঞে না, দুজনের কেউই অযোগ্য নন। সমস্যা অন্য জায়গায়। সাধারণ গ্র্যাজুয়েট বাবা-মায়ের ছেলে যদি নোবেল পুরস্কার পেয়ে বলে ‘বাড়িটা ওঁদের নামে থাকবে কেন? আমার যোগ্যতা বেশি, বাড়ি আমার নামে করে নেব’, তাহলে কি আমরা হাততালি দেব? অবশ্য আজকের ভারতে দেব হয়ত। কারণ এই ভারতের ইতিহাস তো ২০১৪ সাল থেকে শুরু। তার আগে ভারতীয়রা নাকি খুবই লজ্জা পেতেন নিজেদের ভারতীয় হিসাবে পরিচয় দিতে। ঠিক তেমনি আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসও শুরু করতে হবে ক্রিকেট নামক ধর্মের ভগবান শচীন থেকে।
তাই হোক, তবে তাই হোক। বরাবর কামনা করেছি, লালকৃষ্ণ আদবানি শতায়ু হোন। যাতে তাঁর রথযাত্রার চাকার নিচে গোটা দেশটার তলিয়ে যাওয়া তাঁকে দেখে যেতে হয়। এখন থেকে কামনা করব, শচীনও শতায়ু হোন। যাতে বছর দশেক পরেই তাঁকে দেখতে হয়, এই ট্রফির নাম বদলে হয়ে গেল কোহলি-রুট ট্রফি। তার বছর দশেক পরে হয়ত জয়সোয়াল-ব্রুক ট্রফি। তারপর আর টেস্ট ক্রিকেট বেঁচে থাকুক না থাকুক, শচীন আর বিরাট যেন সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকেন। পূর্বসুরিদের অস্বীকার করার অসম্মান যেন তাঁদেরও ভোগ করতে হয়। যে দেশে ক্রিকেটপ্রেমীদের জীবনের দাম ফুটো পয়সার সমানও নয় আর ক্রিকেটাররা হয়ে গেছেন ভগবান, সেদেশে কোনো ভগবানই যে চিরায়ু নন – এই উপলব্ধি যেন তাঁদের ইহকালেই হয়।
আর দেশটার কী হবে? সেকথা বোধহয় জর্জ সান্তায়ানার এই উক্তিতে আছে ‘Those who cannot remember the past are condemned to repeat it.’ অর্থাৎ যারা ইতিহাস ভুলে যায়, তারা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করার অভিশাপে অভিশপ্ত।
নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত
