জন্মান্ধ মেয়েকে জ্যোৎস্নার ধারণা দিতে চেয়েছেন আমাদের ভাষার কবি জয় গোস্বামী। আর জন্মান্ধ ছেলেকে এই মহাবিশ্বের আলো, গান, তারামণ্ডলের রহস্য সন্ধানে প্রবৃত্ত করতে চেয়েছেন পদার্থবিদ্যার শিক্ষক অতীন। কেবল অন্ধ নয়, কোমরের নিচ থেকে পঙ্গু হয়ে যাওয়া একমাত্র ছেলে পলাশকে ঘিরে অতীন আর তাঁর স্ত্রী আরতির যে জীবনসংগ্রাম, ইন্দ্রিয়গত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ওঠার জন্য পলাশের যে সংগ্রাম – তা নিয়েই আমার গান নাটক বুনেছে চেতলা কৃষ্টি সংসদ। এই নাটকের নাম আমার আলো বা আমার মুক্তি হলে হয়ত আরও যথাযথ হত, কারণ গান এই নাটকে ধরতাই, নাটকের প্রাণ নয়। অন্তত এই আলোচকের তাই মনে হয়েছে। কিন্তু আসল কথা সেটা নয়। অতীন-আরতি-পলাশের মত সাধারণ পরিবার বাংলার শহরে বা মফস্বলে কোনোদিনই বিরল নয়। আটপৌরে জীবনের মধ্যে থেকে বিশ্বসাথে যোগে বিহার করার সাধনাই একসময় বাঙালি মধ্যবিত্তের অভিজ্ঞান ছিল। সেই জীবনযাপনকে মঞ্চায়িত করতে গিয়ে নির্দেশক সুমন সেনগুপ্ত যেভাবে একবিংশ শতাব্দীর হোমো স্যাপিয়েন্সের বিশ্ববীক্ষা এবং জ্ঞানচর্চা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন, সেটাই এই নাটককে বিশিষ্ট করে তোলে। একবার দেখে মনে হয় – আরও কী যেন ছিল, খেয়াল করলাম না! আরেকবার দেখলে হয়।
পলাশ এমন একজন যুবক যার কৌতূহলের শেষ নেই এবং যে উন্মাদের মত জানতে চায় – আলো কী? যেহেতু সে চক্ষুষ্মান নয়, তাই তার আলোকে জানার একমাত্র উপায় জ্ঞানার্জন। বাবা আর ব্রেইল – এই তার সহায়। আর সহায় বাবার একদা ছাত্র বাবুদা, যে প্রবল তার্কিক, লোকের চোখে পাগল। কখনো সে প্রহেলিকা; আবার কখনো জলবৎ তরলং করে বুঝিয়ে দেয় মহাকর্ষ থেকে শুরু করে অণু, পরমাণুর রহস্য। মানুষকে যেভাবে সর্বদাই ঘিরে থাকে আলো আর অন্ধকার, তেমন করেই পলাশকে ঘিরে থাকে তার বাল্যবন্ধু মুনমুন। মোটের উপর এই কজনকে নিয়েই পলাশের মনোজগৎ। আর যারা আছে, তারা সকলেই বাইরের লোক। অবশ্য আরেকজন ব্যক্তি আছে যাকে দৃষ্টিহীন পলাশই কেবল দেখতে পায়, কিন্তু তার কথা বলে দিলে এই নাটকের রহস্য উদ্ঘাটন করে দেওয়ার অপরাধ ঘটে যাবে।
পলাশের চোখ দিয়ে, অর্থাৎ মন দিয়ে, জগৎটাকে দেখানোর জন্যে মঞ্চসজ্জায় (সুরজিৎ দে) এবং পোশাক-আশাকে (পিয়ালী সামন্ত, রুশতি চৌধুরী) সাদা, কালো আর ধূসরের বাইরে কোনো রং ব্যবহার করা হয়নি। ব্যতিক্রম শুধু পলাশের কল্পনায় তৈরি দিগন্ত, মানুষ বা পাখির মূর্তি। এই কল্পনাশক্তি মুগ্ধ করে। আগাগোড়া হুইলচেয়ারে বসা পলাশের চরিত্র বহুমাত্রিক। সে যেমন জ্ঞানপিপাসু, তেমনি অবুঝ। যত সরল, তত দুর্বোধ্য। সে অনাবিল আনন্দ পেতে পারে, আবার হতাশার চোটে হিংস্রও হয়ে উঠতে পারে। অভিনেতা সায়ন্তন মৈত্র এই পরস্পরবিরোধিতা তুলে ধরতে অনেকটাই সফল, তবে কিছু কিছু মুহূর্তে মনে হয়েছে তিনি অভিব্যক্তির বৈচিত্র্যের অভাবে ভুগছেন। তাঁর হাহাকার আর চরম আনন্দের অভিব্যক্তি প্রায় এক হয়ে গেছে।
ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পলাশের বাবা এবং পথপ্রদর্শক অতীন। এই চরিত্রের অভিনেতা ময়ূখ দত্তের (নির্দেশনা সহকারীও বটে) বৈজ্ঞানিক আলোচনায় মশগুল হয়ে জটিল তত্ত্ব সহজ করে বুঝিয়ে দেওয়ার সাবলীলতা যতখানি মনোমুগ্ধকর, প্রতিবন্ধী সন্তানের বাবা হিসাবে অসহায়তা ততখানি স্পষ্ট হয় না। মঞ্জিমা চট্টোপাধ্যায় অভিনীত আরতি চরিত্রের পরিসর বড্ড সীমিত মনে হয়। তিনি তো স্বামীর মত ছেলের সঙ্গে জ্ঞানবিজ্ঞানের অভিযানে বেরোতে পারেন না, ফলে তাঁর সঙ্গে রসায়ন নিশ্চয়ই ভিন্নতর; মা হিসাবে তাঁর যন্ত্রণারও কিছু নিজস্বতা থাকার কথা। তা নাটকে তেমনভাবে আলাদা করে দেখা যায় না। পিয়ালী অভিনীত মুনমুনের চরিত্রও যতটা সকলের ভালোবাসা ও আক্রমণের লক্ষ্য, ততটা সোচ্চার নয়। সেদিক থেকে এই নাটকের নারী চরিত্রগুলোকে তুলনায় দুর্বল বললে ভুল হবে না। মঞ্চে সামান্য সময় কাটানো ইন্দ্রাণীও (সৃজনী দে) যেমন একেবারেই প্রান্তিক চরিত্র। জানার ইচ্ছা, জানার জন্যে ক্লেশ স্বীকার করার রোমাঞ্চ উপলব্ধি করা অতীনের বিপরীতে উপরচালাক সাংবাদিকের চরিত্রে সুস্নাত ভট্টাচার্য্যের অভিনয় খুবই বিশ্বাসযোগ্য। খুব বেশি সময় মঞ্চে না থাকলেও যিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী অভিনয় করেন তিনি হলেন পলাশের দেখা ব্যক্তির চরিত্রে অরিত্র দে। নাটকের তুঙ্গ মুহূর্তে পলাশের সঙ্গে তাঁর মানসিক দ্বন্দ্বযুদ্ধ রীতিমত রোমাঞ্চকর।
যে অভিনেতার কথা শেষে বলতে হবে, তিনি হলেন বাবুদার চরিত্রে অভিনয় করা অর্ক চক্রবর্তী। চরিত্রটা বেশ বিপজ্জনক। একাধারে যাত্রার বিবেক, ‘কমিক রিলিফ’, বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ চিরছাত্র, অতীন-আরতি-পলাশের পরিবারের প্রায় অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু যা সবচেয়ে বিপজ্জনক – সে দর্শককে বারংবার অস্বস্তিতে ফেলে স্বাভাবিকত্ব আর পাগলামির ধারণাকে ওলটপালট করে দিয়ে। অর্কর চরিত্র নাট্যকারের পূর্ণ সহায়তা পেয়েছে। সবচেয়ে হাস্যরস উদ্রেককারী সংলাপগুলো তার, আবার সবচেয়ে ভাবিয়ে তোলার মত সংলাপগুলোও তার। এই মহাবিশ্বকে পলাশের কাছে ভাঙতে ভাঙতে ফার্মিয়ন আর বোসন কণায় এনে ফেলার দায়িত্বও পালন করে বাবুদাই। নাটকটাকে যদি ঘুড়ি হিসাবে ভাবা হয়, তাহলে তার লাটাই অনেকাংশে অর্কর হাতেই থাকে এবং তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ঘুড়ির উড়ান নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর পাগলামি মাত্রা ছাড়ায় না বা লোক হাসানোর চেষ্টা বলে মনে হয় না। আবার অন্য চরিত্রগুলোকে হাস্যাস্পদ করে তুলে নিজে হাসলেও, বিজ্ঞানালোচনার সময়ে গাম্ভীর্যের ঘাটতি হয় না।
আরও পড়ুন অবহেলিত বিজ্ঞান আর কৈশোরকে ভালবেসে এল পক্ষীরাজের ডিম
শুরুতেই বলেছিলাম – গান এই নাটকের ধরতাই। রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে নাটকের ভাবনাকে সংহত করতে চেয়েছেন নির্দেশক। যে গানগুলো ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলো যে নাটকের বিষয়বস্তু এবং পরিস্থিতির সঙ্গে জুতসই তা নিয়ে সন্দেহ নেই। সেঁজুতি গুপ্ত, অরিত্র এবং মঞ্জিমার গাওয়াও চমৎকার। কিন্তু গানের ব্যবহার কিঞ্চিৎ কম হলেই ভালো হত মনে হয়। বিশেষত যে গানের দু কলি পলাশ গাইছে মঞ্চের উপর, আলো নিভে যাওয়ার পর সেই গানেরই আরও খানিকটা অংশ অন্য কণ্ঠে বাজছে – এ জিনিস নেহাতই বাহুল্য। বাহুল্যের সমস্যা মঞ্চসজ্জাতেও রয়েছে। পলাশের বিজ্ঞানমগ্নতা বোঝাতে বেশকিছু জিনিস টাঙিয়ে মঞ্চটাকে ছোট করে আনা হয়েছে। তাতে ক্ষতি নেই, কিন্তু দর্শকের দেখতে পাওয়ার মত করে একখানা বাক্সের গায়ে ‘And God Said’ এবং জটিল অঙ্ক লিখে রাখার কি খুব প্রয়োজন ছিল? অত নিচু জায়গায় কোনোকিছুর গায়ে বড় বড় করে লিখে নিশ্চয়ই অতীন অন্ধ ছেলেকে অঙ্ক শেখান না? আজকের বাড়িতে ল্যান্ডলাইনের ভূমিকা যতটুকু দেখানো হয়েছে তাতে ওটাও না থাকলে ক্ষতিবৃদ্ধি হত না।
এ নাটক যেমন ভাললাগার, তেমনই যন্ত্রণার। অতীন এক জায়গায় বলছেনও ‘ব্যথাকে উপভোগ করতে শেখো’। স্বভাবতই এই নাটকে ফিরে ফিরে এসেছেন জীবনানন্দ দাশ। চিরায়ত জ্ঞানের সঙ্গে এ যুগের কেজো জ্ঞানের দ্বন্দ্ব যথার্থ ধরা পড়েছে ব্যক্তির সংলাপে ‘আমাদের এই শতকের/বিজ্ঞান তো সংকলিত জিনিসের ভিড় শুধু— বেড়ে যায় শুধু’ উচ্চারণে। কিন্তু এমন নাটকের সংলাপে মাঝেমাঝে এত পেলবতা কেন? পলাশ নামের ছেলেটাকে বাবা, মা, বন্ধু মিলে বারবার ‘পলাশ ফুল’ বলে ডাকা কেন? আবহসঙ্গীতে ফিরে ফিরে আরামদায়ক ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’ সুর বাজানোই বা কেন? রাবীন্দ্রিকতা আসলে বেশ বিপজ্জনক ব্যাপার। মাত্রা ছাড়ালেই অশ্লীল লাগতে শুরু করে।
তবে যতই দোষ ধরা যাক, এই নাটক যে বিষয়কে তুলে ধরেছে তার যে দৃশ্যায়ন সম্ভব – না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত, এবং নাটকের শুরুতে দর্শকের মনে যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করা হয়েছে, শেষে তার নিরসনের মুহূর্তটা বিশুদ্ধ ম্যাজিক। সেই ম্যাজিকের বড় কৃতিত্ব অবশ্যই আলোর দায়িত্বে থাকা কল্যাণ ঘোষের। তিনি মঞ্চে আলো ফেলার পাশাপাশি দর্শকের দেখতে পাওয়ার মত অন্ধকারও সৃষ্টি করেছেন। নইলে রেশ থেকে যাওয়ার মত ম্যাজিক সৃষ্টি হত না ক্লাইম্যাক্সে।
নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত
