চিরাগ পাসোয়ান বেজায় চটেছেন। কে তিনি? তিনি এখন কেবল রামবিলাস পাসোয়ানের ছেলে নন। রীতিমত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং এনডিএ সরকারের অন্যতম শরিক। কার উপর চটেছেন? দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একটা রায়ের উপর। গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের সাত বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ রায় দিয়েছে – তফসিলি জাতি, উপজাতির মানুষের জন্য সরকারি চাকরি এবং শিক্ষায় যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে তার মধ্যে আলাদা করে বেশি পিছিয়ে থাকা শ্রেণিগুলোর জন্যে রাজ্য সরকারগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারবে।
এই রায়ে কেন চিরাগ চটে গেলেন? তিনি দলের নেতৃত্ব পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে, কিন্তু তাঁর বাবার রাজনীতিতে উত্থান বিহারে পিছিয়ে পড়া জাতের মানুষের অধিকারের রাজনীতি করে। তাই সংবিধানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা কেন রাখা হয়েছে তা নিয়ে চিরাগের ধারণা খুব পরিষ্কার। যে কথা এদেশের উচ্চবর্গীয় মানুষ বোঝেন না অথবা না বোঝার ভান করেন, তা হল, দেশের গরিব মানুষকে ধনী বা মধ্যবিত্ত করে তোলার জন্য সংবিধানপ্রণেতারা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেননি। ওই ব্যবস্থা করা হয়েছিল কয়েক হাজার বছর ধরে বর্ণাশ্রমমাফিক যাদের নিচু জাত বলে দেগে দিয়ে যাবতীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তাদের হাতে অধিকার তুলে দিতে। স্বাধীনতার ৭৭ বছর হতে চলল, সংরক্ষণের সুফল পেয়ে কিছু মানুষ আর্থসামাজিক দিক থেকে অনেকটা অগ্রসর হয়ে থাকলেও ভারতীয় সমাজ কিন্তু এখনো বর্ণাশ্রম মেনেই চলে। বিহারে অফিসের ব্রাহ্মণ চাপরাশি দলিত কালেক্টরকে আজও এক গ্লাস জল দেয় না। কালেক্টর বিচক্ষণ ব্যক্তি হলে জল চেয়ে ঝামেলা বাড়ান না। তাই চিরাগ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন – সাতজন বিচারপতি নিজ নিজ রায়ে এত কথা বললেন আর ‘অস্পৃশ্যতা’ শব্দটাই উচ্চারণ করলেন না!
চাপরাশি-কালেক্টরের ব্যাপারটা বিশ্বাস না-ও হতে পারে, কারণ এইভাবে অস্পৃশ্যতার অনুশীলন পশ্চিমবঙ্গে সাধারণত দেখা যায় না। বাঙালি ভদ্রলোকদের অস্পৃশ্যতা অনুশীলন বাড়িতে মুসলমান অতিথি এলে তাঁর ব্যবহৃত কাপ প্লেট আলাদা করে সরিয়ে রেখে মেজে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অতিথি দেখতে পান না বলে প্রগতিশীলতা আর জাত – দুটোই বজায় থাকে। তাই মানুষ যে আজও জাতের ভিত্তিতে অন্যায়ের সম্মুখীন হন, তা বাঙালিরা অনেকে বিশ্বাসই করেন না। অতএব নামধাম সমেত ঘটনা তুলে ধরা আবশ্যক।
জুলাই ২০১৫। উত্তরপ্রদেশের রেহুয়া লালগঞ্জের এক দলিত পরিবারের রাজু সরোজ আর ব্রিজেশ সরোজ নামে দুই ভাই আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেছিলেন বলে গ্রামের উচ্চবর্ণের লোকেরা তাঁদের বাড়িতে ঢিল পাটকেল ছুড়েছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব রাজু আর সরোজকে সংবর্ধনা দেওয়ার পরে গ্রামের লোকের ব্যবহারে পরিবর্তন আসে। কিন্তু এক সর্বভারতীয় দৈনিকের প্রতিবেদককে তাঁরা জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় নিরুৎসাহ করত গ্রামের লোকেরা। বলা হত, দলিতদের দ্বারা লেখাপড়া হয় না। আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে গ্রামের লোকেরা তাঁদের বাড়ির জলের লাইন পর্যন্ত কেটে দিয়েছিল। ২০২০ সালে হাথরসে উচ্চবর্গীয় ছেলেরা একটা দলিত মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করে দিয়েছিল। আজও কারোর শাস্তি তো হয়নি বটেই, মেয়েটার পরিবারই গৃহবন্দি হয়ে আছে। সেকথা এই কাগজেই ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন পর্বে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া অমুক জায়গায় দলিত বর ঘোড়ার পিঠে চেপে বিয়ে করতে যাচ্ছিল বলে তাকে উচ্চবর্গীয়রা পিটিয়েছে (যেমন ফেব্রুয়ারি ২০২৪), তমুক জায়গায় একজন দলিতের মুখে এক উচ্চবর্ণ কুলাঙ্গার পেচ্ছাপ করে দিয়েছে (যেমন জুন ২০২৪) – এসব সংবাদ তো কদিন অন্তরই আসতে থাকে।
মহামান্য বিচারপতিরা হয়ত এসব জানতে পারেন না। তাই তাঁদের বিচার্য মামলার বিষয় না হওয়া সত্ত্বেও কয়েকজন বিচারপতি স্বপ্নের মত সব কথা লিখেছেন রায়ে। যেমন ওই বেঞ্চের একমাত্র দলিত বিচারপতি বি আর গাওয়াই লিখেছেন ‘ক্রিমি লেয়ার’-এর কথা। অর্থাৎ তফসিলি জাতি, উপজাতিভুক্ত মানুষের মধ্যে যেসব পরিবার আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে গেছে কয়েক প্রজন্ম ধরে সংরক্ষণের সুবিধা পেয়ে, তাদের সংরক্ষণের সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া উচিত। বিচারপতি পঙ্কজ মিথাল আবার লিখেছেন, সংরক্ষণের সুবিধা কোনো পরিবারকে এক প্রজন্মের বেশি দেওয়া উচিত নয়।
এই দুই বিচারপতির কথার পিছনে যে ভাবনা কাজ করছে, তা হল সংরক্ষণ আর্থিক উত্তরণের এক উপায় মাত্র। সামাজিক বৈষম্যের প্রতিষেধক নয়। মোদী সরকারের মন্ত্রী চিরাগ তাই বলেছেন, জাতভিত্তিক বৈষম্য আপনি আর্থিকভাবে কত উপরে উঠেছেন বা কত বড় পদে আছেন তার উপর নির্ভর করে না। চূড়ান্ত সফল হলেও এই বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়। তিনি যে ১০০% ঠিক কথা বলেছেন তা কয়েকদিন আগেই প্রমাণ করে দিয়েছেন মন্ত্রিসভায় চিরাগের সহকর্মী অনুরাগ ঠাকুর। তিনি বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বর্ণভিত্তিক জনগণনার দাবিকে নস্যাৎ করার যুক্তি হিসাবে বলেছেন – যার নিজের জাতের ঠিক নেই সে আবার জাতভিত্তিক জনগণনার দাবি করে। বস্তুত ভারতের উঁচু জাতের লোকেরা নিচু জাতের লোকেদের সঙ্গে পেরে না উঠলে এই ভাষাতেই কথা বলে থাকে। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে অমৃতকাল চলছে বলে সংসদের ভিতরেও এভাবে বলা গেল। এই দেশে ‘ক্রিমি লেয়ার’ কী? দেবা ন জানন্তি। বিচারপতি মিথাল তো আবার শ্রীমদ্ভগবদগীতা উদ্ধৃত করে বলেছেন প্রাচীন ভারতে বর্ণভিত্তিক অসাম্য ছিলই না। তাহলে মনুস্মৃতি বোধহয় কোনো ইংরেজের লেখা।
আরও পড়ুন বিহারের লালু: যে শত্রুকে মোদী ভোলেন না
তবে এসবের জন্য বিচারপতিদের ‘দক্ষিণপন্থী’, ‘কাউ বেল্টের লোক’ – এসব আখ্যা দিলে কিন্তু অন্যায় হবে। বাংলাদেশের চলতি হাসিনা সরকার-বিরোধী আন্দোলন নিয়ে প্রগতিশীল, বামপন্থী ভদ্রলোক শ্রেণির অনেক বাঙালি সোশাল মিডিয়ায় যা পোস্ট করেছেন তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় – তাঁরা বাংলাদেশের সংরক্ষণ নীতি আর ভারতের সংরক্ষণ নীতির তফাত বোঝেননি এবং তাঁদের মনোভাব উক্ত বিচারপতিদের থেকে কিছুমাত্র আলাদা নয়। শুধু কি কয়েকজন ব্যক্তিরই এহেন মতামত? পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর বামপন্থী সরকারে নেতৃত্বকারী মার্কসবাদী দলটার মুখপত্রের সম্পাদকীয় এই রায় সম্পর্কে বলেছে ‘এটা ঠিক দারিদ্র্য দূরীকরণ, সমাজের সব অংশের কাছে উন্নয়নের সুফল সমানভাবে পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ব্যবস্থা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ হতে পারে কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। তাই এই ব্যবস্থা অনন্তকাল চলতে পারে না। তেমনি সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন হয়। আজ যারা পশ্চাদপদ কাল তারা পশ্চাদপদ নাও থাকতে পারে। তেমনি শুধু জাতির পরিচয়ে কোনও অংশ প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুবিধা ভোগ করে যেতে পারে না।’ অনিল বিশ্বাস এই পার্টিরই রাজ্য সম্পাদক তথা সর্বময় নেতা ছিলেন দীর্ঘকাল। বামফ্রন্ট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন কান্তি বিশ্বাস। তারপরেও সংরক্ষণ সম্পর্কে এরকম ভ্রান্ত, বামনাই ভাবনা যখন এ রাজ্যের এককালীন শাসক দলের রয়ে গেছে, তখন পশ্চিমবঙ্গে জাতভিত্তিক বৈষম্য যে দিব্যি খেয়ে পরে বেঁচে আছে তা আর বলে দিতে হয় না।
অবশ্য এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। যোগেন মণ্ডলকে তো বাংলার রাজনীতিতে কেউ স্মরণ করে না, চুনী কোটালকে স্মরণ করা হয় কেবল সিপিএমকে গাল দেওয়ার দরকার হলে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিদিমণি মেরুনা মুর্মুকে সোশাল মিডিয়ায় আজও উচ্চবর্ণ কন্যাসমা ছাত্রী গাল দেয় ‘কোটায় চাকরি পেয়েছেন’ বলে। এসবের বোধহয় একটাই সমাধান। বিহারের মত জাতভিত্তিক জনগণনা এ রাজ্যেও হয়ে যাক। দেখা যাক, সোনার চাঁদ আর সোনার টুকরো বলে যাদের কটাক্ষ করা হয় তারাই সব চাকরি-বাকরি নিয়ে বসে আছে আর বেচারা বামুন কায়েতরা সবার পিছে সবার নিচে পড়ে আছে কিনা।
উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত
