খেলোয়াড় মেয়েদের জয় হোক

মেয়েদের দলের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাকে বড় করে দেখানোর যে প্রবণতা এতদিন দেখা গেছে, তার ব্যাখ্যা নারীবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে হয় না।

‘খেলোয়াড় মেয়ে’ কথাটা প্রথম কার মুখে শুনেছিলাম মনে করতে পারছি না, কিন্তু কয়েকশোবার শুনেছি। কোনও মেয়েকে খারাপ মেয়ে বলে দেগে দিতে এই শব্দবন্ধ বেশ জনপ্রিয়। রবিবার মাঝরাতে যখন নাদিন দে ক্লার্কের ব্যাট থেকে বেরোনো উড়ন্ত বলটাকে টেনে নামিয়ে দু-হাত ছড়িয়ে উড়ান শুরু করলেন হরমনপ্রীত কৌর আর তাঁকে ধরতে দৌড়লেন স্মৃতি মান্ধনা, শেফালি বর্মা, জেমিমা রডরিগস, দীপ্তি শর্মা, অমনজ্যোত কৌর, রিচা ঘোষ, রাধা যাদব, শ্রী চরনি, ক্রান্তি গৌড়, রেণুকা সিং ঠাকুররা— ঠিক তখন, এ-যুগের সেরা ধারাভাষ্যকার ইয়ান বিশপ বলে উঠলেন ‘এই মুহূর্ত কয়েক প্রজন্মের উত্তরাধিকার তৈরি করল।’ আমার ভাবতে ইচ্ছে হল, সেই উত্তরাধিকারের জোরে খেলোয়াড় মেয়ে কথাটা আর গালাগালি থাকবে না। চারপাশ দেখে আমরা যতই হতাশ হই প্রায়শ, দুনিয়া যে বদলায় তাতে তো সন্দেহ নেই। একসময় ভালোঘরের মেয়েরা অভিনয় করে না— এই সংস্কার তো ছিল আমাদের সমাজে। সত্যিই ‘ভালো’-ঘরের মেয়েদের অভিনয় করতে দেওয়াও হত না। সেই পরিস্থিতি তো বদলেছে। মেয়ে অভিনেত্রী হলে, বিখ্যাত হলে তাকে নিয়ে তো আজ গর্ব করেন বাবা-মা, পাড়া-প্রতিবেশীরা। তেমন এমন ভবিষ্যৎও নিশ্চয়ই আসবে, এই ভারতেই আসবে, যখন একটা মেয়ের যৌন বিশুদ্ধতাই তাকে বিচার করার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হয়ে থাকবে না।

বাইরে আমরা যে যা-ই বলি, মেয়েরা বিশ্বখেতাব জিতেছে বলে যতই তাদের প্রশংসায় ভরিয়ে দিই এখন, সামগ্রিকভাবে কিন্তু আজও ওটাই মাপকাঠি। মান্ধাতার আমলের কথা বলছি না। মাত্র এক দশক আগে, রিও অলিম্পিকের সময়ে, এক সর্বভারতীয় ইংরেজি কাগজে কাজ করতাম। সেদিন নিউজ এজেন্সি একটা খবর পাঠিয়েছিল গেমস ভিলেজে কন্ডোমের চাহিদা সম্পর্কে। সন্ধেবেলার এডিট মিটিংয়ে অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, উচ্চশিক্ষিত সাংবাদিকরা জানতেনই না যে গেমস ভিলেজে অ্যাথলিটদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক হয়। কিন্তু ব্যাপারটা বিস্ময়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও কথা ছিল। সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলা সাংবাদিক বলে বসলেন ‘তাহলে বাপু মেয়েদের খেলতে না দেওয়াই ভালো।’ অর্থাৎ মেয়েদের ‘সতীত্ব’ বজায় রাখাই আসল। ওটা করতে না পারলে হাজার সাফল্যেও কিছু এসে যায় না। আশা করা যাক, হরমনপ্রীতদের বিশ্বজয়ের পরে অন্তত উচ্চশিক্ষিত বাবা-মায়েরা ওই সাংবাদিকের মতো ভাবা বন্ধ করবেন।

‘অনার কিলিং’-খ্যাত হরিয়ানার মেয়ে শেফালি, হিমাচল প্রদেশের ঠাকুর পরিবারের মেয়ে রেণুকা, মুম্বাইয়ের ধার্মিক খ্রিস্টান জেমিমা বা আমাদের শিলিগুড়ির রিচা— প্রায় সকলেরই ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে, তাদের ক্রিকেট শুরু ছেলেদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে। কিংবদন্তি ঝুলন গোস্বামীর শুরুটাও একইভাবে হয়েছিল চাকদায়। কারণ মাঠের দখল ছেলেদের হাতে। খেলোয়াড় জীবন তৈরি করতে হলে এ-দেশে আগে ছেলেদের সমকক্ষ হতে হয়, তাদের হারিয়ে দেখাতে হয়। ঠিক যেমন দঙ্গল (২০১৬) ছবিতে আমরা দেখেছিলাম— মহাবীর সিং ফোগতকে মেয়েদের এমনভাবে তৈরি করতে হয়েছিল যাতে তারা কুস্তিতে ছেলেদের হারাতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো দেশের মেয়েদের পেশাদার খেলোয়াড় হতে হলে এমন অসম লড়াই দিয়ে শুরু করতে হয় না। ফলে রবিবারের জয় এ-দেশের নারীবাদীদের দায়িত্ব বাড়িয়ে দিল। রাতদখলের মতো মাঠদখলের আন্দোলনও তাঁদের করতে হবে। প্রাক্তন বোর্ড সভাপতি এন শ্রীনিবাসনের সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল পুরনো মন্তব্য থেকে নিশ্চয়ই সকলে জেনে গেছেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড যাঁরা চালান, তাঁরা মেয়েদের ক্রিকেটকে কী নজরে দেখেন। বর্তমান বোর্ডকর্তারাও খুব অন্যরকম ভাবেন এমন মনে করার কারণ নেই। ফাইনালের দিন মাঠে সপরিবার জয় শাহের উপস্থিতি দেখে ঠকবেন না।

প্রথমত, ভারতের জয়ে প্রকাশ্যে উল্লাস করা তাঁর বর্তমান পদের সঙ্গে মোটেই মানানসই নয়। কারণ তিনি এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, ভারতের বোর্ডের কেউ নন, যদিও বকলমে তিনিই সর্বেসর্বা। খেলাটার প্রতি গভীরে প্রোথিত অশ্রদ্ধা না থাকলে এবং নিজের পদমর্যাদা বুঝতে সম্পূর্ণ অক্ষম না হলে ওই পদের লোক অমন আচরণ করে না। অতীতে যে ভারতীয়রা আইসিসির সর্বোচ্চ পদ অলঙ্কৃত করেছেন (যেমন জগমোহন ডালমিয়া, শরদ পাওয়ার, শশাঙ্ক মনোহর) তাঁরা এই আদেখলেপনা করতেন না। দ্বিতীয়ত, জয়ের অনুগত ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা এখন কদিন বিস্তর প্রোপাগান্ডা চালাবেন, জয় মেয়েদের ক্রিকেটের জন্যে কত কিছু করেছেন তার ফিরিস্তি দিয়ে। ওতেও ভুলবেন না। তথ্যের আড়ালে লুকিয়ে ফেলা তথ্য জানতে এইটা পড়ে নিতে পারেন।

সত্যিই যদি বোর্ডের মেয়েদের ক্রিকেটের প্রতি দরদ থাকত, তাহলে টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটার দীপ্তি শর্মাকে মুখ ফুটে বলতে হত না— আরও বেশি ম্যাচ খেলার ব্যবস্থা হলে ভালো হয়। মনে রাখবেন, কিংবদন্তি ঝুলন গোস্বামী দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটজীবনে খেলতে পেরেছিলেন মাত্র এক ডজন টেস্ট আর ২০৪ খানা একদিনের ম্যাচ। অথচ ভারতের হয়ে বছর বারো খেলেই ৯২ খানা টেস্ট আর ২০০ একদিনের ম্যাচ খেলেছিলেন জাহির খান। বিরাট কোহলি ১৩-১৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জীবনেই ১২৩ খানা টেস্ট আর তিনশোর বেশি একদিনের ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। আজকের বিশ্বজয়ী দলের সহ-অধিনায়িকা স্মৃতি ২০১৩ সালে অভিষেকের পর থেকে খেলেছেন ১১৭ খানা একদিনের ম্যাচ আর ২০১৪ সালে টেস্ট অভিষেকের পর মাত্র সাতখানা টেস্ট। ওদিকে একই সময়ে অভিষেক হওয়া মহম্মদ শামি খেলে ফেলেছেন ৬৪ খানা টেস্ট আর ১০৮ খানা একদিনের ম্যাচ। ইচ্ছাকৃতভাবে মেয়েদের বিশ্বকাপকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে ছোট ছোট শহরে ম্যাচ দেওয়া, মুম্বাইয়ের তিনটে ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মধ্যে সবচেয়ে ঐতিহ্যহীন এবং শহরের প্রান্তে থাকা স্টেডিয়ামকে সেমিফাইনাল ও ফাইনালের জন্যে বেছে নেওয়া আর বিশ্বকাপসুলভ প্রচারের ব্যবস্থা না করা তো আছেই। বোঝাই যায়, অ্যালিসা হিলির অস্ট্রেলিয়া, ন্যাট শিভার-ব্রান্টের ইংল্যান্ড বা লরা উলভার্টের দক্ষিণ আফ্রিকা খেলছিল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। হরমনপ্রীতের ভারত খেলছিল প্রতিপক্ষ এবং নিজেদের বোর্ডের বিরুদ্ধে। এখন দলকে এককালীন ৫১ কোটি টাকা পুরস্কার দিয়ে নারীদরদি সাজবে বোর্ড।

আরও পড়ুন আলতো ফ্লিক: ক্রিকেট নিয়ে ব্যতিক্রমী বই

অবশ্য কেবল বোর্ডই যে হরমনপ্রীতদের বিরুদ্ধে ছিল তা নয়। মেয়েদের দল এত বছরে যতবার হেরেছে, ততবার মেয়েদের দ্বারা যে ক্রিকেট হয় না, মেয়েদের দলের পিছনে টাকা খরচ করা যে অপচয়— সে-কথা আজ উদ্বাহু নৃত্য করা সাধারণ দর্শকরা তো বটেই, ক্রীড়া সাংবাদিকরাও বলে গেছেন সোশাল মিডিয়ায়। খবরের কাগজে বা টিভি চ্যানেলে যৎসামান্য জায়গা বরাদ্দ হয়েছে মেয়েদের ক্রিকেটের জন্য। এ-কথা ঠিকই যে খেলায় সাফল্য না এলে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ে না, সংবাদমাধ্যমেও বেশি জায়গা দেওয়ার কোনও যুক্তি নেই। এখন চূড়ান্ত সাফল্য এসেছে, স্বভাবতই সব মহলের আগ্রহ বাড়বে। কিন্তু মেয়েদের দলের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাকে বড় করে দেখানোর যে প্রবণতা এতদিন দেখা গেছে, তার ব্যাখ্যা নারীবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে হয় না। ভারতের মেয়েরা এর আগেও দু-দুবার একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছেছিল। দুবারই হেরে যাওয়া মাত্রই লেখালিখি হয়েছে— এদের দিয়ে কিস্যু হবে না। এদের জন্যে এত করা হয়, তবু…। কত যে করা হয় তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপরেই দিয়েছি। এদিকে ছেলেদের দল পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ডের বিরাট মুনাফার যাবতীয় সুবিধা পেয়ে থাকে। অথচ গত ১২ বছরে অসংখ্য সুযোগেও বিশ্বখেতাব মাত্র একটা, তাও কুড়ি-বিশের ক্রিকেটে। বরং গত দুবছরে একদিনের ম্যাচ আর টেস্ট ক্রিকেটে হারের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু ওই দলের ন্যূনতম সাফল্যকেও বিরাট করে দেখাতে উঠে পড়ে লাগে বোর্ড আর তার গোদি মিডিয়া। হারা সিরিজের গুরুত্বহীন ম্যাচে রোহিত শর্মা বা বিরাট শতরান করলে সেই ইনিংসকেই কাব্যিক করে তুলতে ঝাঁপিয়ে পড়েন প্রাক্তন ক্রিকেটার, সাংবাদিক আর সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা। অথচ ভেবে দেখুন, কতবার আপনি পড়েছেন যে, বর্তমানে মেয়েদের ক্রিকেটে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটার হলেন স্মৃতি, আর সবচেয়ে ধারাবাহিক অলরাউন্ডারদের একজন দীপ্তি?

যা-ই হোক, হয়তো আমি পুরুষ বলেই এসব নিয়ে ভাবছি। স্মৃতি, দীপ্তি, রিচারা যেভাবে বেড়ে উঠেছেন তাতে ওঁরা জানেন যে এরকমই হওয়ার কথা ছিল, এরকমই হবে। কদিন পরেই যদি তাঁদের কারও উপরে মেয়ে বলে কোনও আক্রমণ চলে (যেমনটা বিশ্বকাপ চলাকালীন দুই অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটারের উপরে চলেছে), তখন আজ মাথায় তুলে নাচা ‘পাবলিক’ এবং ‘মিডিয়া’ পাশে দাঁড়াবে না। নিজের সম্মান বজায় রাখতে না পারার দোষ নিজের— এই জাতীয় কিছু বলে দেবেন কৈলাস বিজয়বর্গীয়ের মতো কোনও নেতা। বিশ্বকাপটা যে মধ্যরাতে জেতা হয়েছিল, সে-কথা ভুলে গিয়ে কোনও মহিলা মুখ্যমন্ত্রী বলে দিতে পারেন— অত রাতে বাইরে যাওয়া উচিত হয়নি। সাংবাদিকরা গসিপের খোঁজ করবেন, কেউ হয়তো লিখে দেবেন— বিশ্বকাপ জিতে ধরা কে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছিল এরা। তাই এই ঘটনা ঘটেছে। এরা মহা খেলোয়াড় মেয়ে।

সে যা-ই হোক, হরমনদের দৌলতে অনেকদিন পরে আস্ত একখানা প্রতিযোগিতা দেখা গেল, যেখানে প্রতিপক্ষকে আউট করে মুখের সামনে গিয়ে অসভ্যের মতো চিৎকার করলেন না ভারতীয় ক্রিকেটাররা। আউট হলে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন না, আম্পায়ারদের সিদ্ধান্ত নিয়ে আক্রমণাত্মক বিবৃতি দিলেন না পৃথিবীর সবচেয়ে পয়সাওয়ালা বোর্ডের খেলোয়াড় হওয়ার রেলায়। নীল জার্সির গা বেয়ে উপচে পড়ল না উগ্র জাতীয়তাবাদ, গ্যালারির হিংস্র চেহারাও দেখা গেল না।

খেলোয়াড় মেয়েদের জয় হোক।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ভারতে মেয়েদের ক্রিকেটের পথ এখনো বন্ধুর

জেমিমাকে মাঠের মধ্যে এনে ধর্ষণ করা উচিত – এমন কথাও পোস্ট করা হচ্ছিল সোশাল মিডিয়ায়। নারীবাদীরা কেউ তখন টুঁ শব্দ করেছিলেন বলে জানি না। এখন করছেন, কারণ জেমিমাকে চেনা গেছে। বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে, মহিলাদের ক্রিকেটের খবর নারীবাদীরাও বিশেষ রাখেন না।

লক্ষ করে দেখলাম, বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ নিয়ে কোনো মতপার্থক্য নেই যে ৩০ অক্টোবর ২০২৫ মেয়েদের ক্রিকেটের ইতিহাসে একটা বিশেষ দিন ছিল। মেয়েদের ক্রিকেটে এত রান তাড়া করে কোনো দল কখনো জেতেনি। শুধু তাই নয়, ছেলেদের বিশ্বকাপেও নক আউট ম্যাচে এত রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড নেই। জেমিমা রডরিগসের অপরাজিত ১২৭ রান যে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে কোনো ভারতীয়ের সেরা ইনিংস তা নিয়েও মনে হয় না বিশেষ তর্কের অবকাশ আছে। ২০১১ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে শচীন তেন্ডুলকর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একা কুম্ভ হয়ে ৮৫ রান করেছিলেন, যা পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল। শচীনও একাধিকবার আউট হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন জেমিমার মতই। কিন্তু সেদিন ভারত প্রথমে ব্যাট করেছিল, ঘাড়ে পাহাড়প্রমাণ রানের বোঝা ছিল না। সেই পাকিস্তান কোনো ভয় ধরানো দলও ছিল না। বৃহস্পতিবার রাতে যে অস্ট্রেলিয়াকে হরমনপ্রীত কৌররা হারালেন, তারা কিন্তু ছেলেদের ক্রিকেটে ১৯৯৯-২০১১ পর্বের অস্ট্রেলিয়ার মত দুর্ধর্ষ। এরা বিশ্বকাপে শেষবার একটা ম্যাচ হেরেছিল সেই ২০১৭ সালে। এই অবিস্মরণীয় রাতের পর দেশজুড়ে সবাই উচ্ছ্বসিত। অনেকে বলছেন, এরপর জেমিমারা বিশ্বকাপ জিতুন আর না-ই জিতুন, ভারতে মেয়েদের ক্রিকেটের দারুণ উন্নতি হতে চলেছে। সুতরাং অপ্রিয় কথাগুলো বলে ফেলার এটাই সঠিক সময়।

ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত মেয়েদের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ শেষ লগ্নে পৌঁছে গেছে। এই বিশ্বকাপ নিয়ে কথাবার্তা সম্ভবত বহুবছর পরেও শেষ হবে না। তার কারণটা স্রেফ ক্রিকেটীয় হলে চমৎকার হত। জেমিমার ঐতিহাসিক ইনিংস, ভারতের ঐতিহাসিক জয় তো রইলই, ফাইনালে যে দল জিতবে তাদেরই এটা প্রথমবার বিশ্বকাপ জয় হবে। কেবল সেগুলোই চর্চার বিষয় হয়ে থাকলে ভালো হত। প্রথম সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়িকা লরা উলভার্ট যে অনবদ্য শতরান (১৪৩ বলে ১৬৯) করেছেন, যদি তা নিয়ে আলোচনা হয় তাহলেও ক্ষতি নেই। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার ফিবি লিচফিল্ডের মারকাটারি শতরান (৯৩ বলে ১১৯), হরমনপ্রীত কৌরের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের খেলা নিয়ে কাটাছেঁড়া হলেও কোনো কথা ছিল না। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন, বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়ার পর থেকে, এদেশে না হলেও বাকি ক্রিকেট দুনিয়ায় এসবের চেয়ে বেশি আলোচনা হবে মাঠের বাইরের একটা ঘটনা নিয়ে। তার কারণ গত ২৬ অক্টোবর (রবিবার) ইন্দোরে যে ঘটনা ঘটেছে, তা ক্রিকেটে কেন, কোনো খেলার আন্তর্জাতিক আঙিনাতেই বিরল। বিশ্বকাপ খেলতে এসে অস্ট্রেলিয়ার দুই মহিলা ক্রিকেটারের সেই অভিজ্ঞতা হয়েছে যা এদেশের মেয়েদের রাস্তাঘাটে প্রায় রোজই হয়। অর্থাৎ তাঁরা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। টিম হোটেল থেকে বেরিয়ে তাঁরা কাছাকাছি এক কাফেতে যাচ্ছিলেন, পথে আকিল খান নামে একজন বাইক নিয়ে তাঁদের পিছু ধাওয়া করে, এমনকি তাঁদের শরীরেও হাত দেয়।

ব্যাপারটা নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দেড় দিনের বেশি হইচই হয়নি, ফলে হয়ত অনেকেরই নজর এড়িয়ে গেছে। কেনই বা হবে? ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত নিত্যযাত্রী মহিলারাই তো এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন প্রায়ই। ছাত্রীজীবন থেকে সাংবাদিক জীবনে পৌঁছতে পৌঁছতেই এটা এমন অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায় যে তাঁরা অফিসে বা বাড়িতে – কোথাও আর এ নিয়ে বাক্য ব্যয় করেন না। করলে বাড়িতে যার যেমন অভিজ্ঞতাই হোক, অফিসের পুরুষ সহকর্মীরা যে এটাকে কোনো ব্যাপার বলেই মনে করবেন না – একথা তাঁরা জেনে যান। অফিসের ভিতরেই তাঁদের যৌন হয়রানির ঘটনা যে ঘটে তা তো ‘মি টু’ আন্দোলনের সময়ে সংবাদমাধ্যমের বাইরের লোকেরাও জেনে গেছেন। যৌন হয়রানি প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে তৈরি আভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটিগুলো (ICC) অনেক অফিসেই হয় নিষ্ক্রিয়, নয় যারা হয়রান করে তাদেরই আখড়া। তাছাড়া আর সব পেশার মত সাংবাদিকতাতেও অধিকাংশ জায়গাতেই লাগাম তো পুরুষদের হাতে। কোনটা খবর আর কোনটা নয়, কোনটা কত বড় খবর – এসব সিদ্ধান্ত পুরুষরাই নেন। ফলে যে দিন দুয়েক অস্ট্রেলিয়ার মেয়েদের খবরটা টিভি চ্যানেল এবং খবরের কাগজে জায়গা জুড়ে ছিল, তখনো সেটা এমনকি খেলার বিভাগেরও সবচেয়ে বড় খবর হয়ে দাঁড়ায়নি। মধ্যপ্রদেশের শাসক দল বিজেপির অন্যতম পরিচিত মুখ কৈলাস বিজয়বর্গীয় যদি খাঁটি ভারতীয় কায়দায়, আক্রান্ত ক্রিকেটারদেরই এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত – এই মর্মে বক্তব্য না রাখতেন, তাহলে আরও কমেই নটে গাছ মুড়িয়ে যেত।

সত্যি বলতে, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের সম্ভবত ভারতের মেয়েরা কীভাবে বাঁচে সে ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই। হোটেলে আসা খবরের কাগজও তাঁরা বিশেষ পড়েন না বা ভারতীয় খবরের চ্যানেলগুলো দেখেন না। দেখলে হয়ত কৈলাসকেই শুভাকাঙ্ক্ষী বলে মনে করতেন, কারণ ওই ঘটনার ঠিক দুদিন আগে মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলায় এক মহিলা ডাক্তার হাতের তালুতে সুইসাইড নোট লিখে আত্মহত্যা করেন। কারণ একজন পুলিশকর্মী তাঁকে পাঁচ মাস ধরে বারবার ধর্ষণ করেছেন এবং অন্য এক পুলিশকর্মী তাঁর উপর মানসিক অত্যাচার চালাচ্ছিলেন। রক্ষকই ভক্ষক কথাটার এমন প্রাঞ্জল উদাহরণ চট করে পাওয়া যায় না। কিন্তু আমাদের দেশের মেয়েরা এমন ঘটনাতেও অবাক হবেন না। কারণ তাঁরা হাথরাসের কথা জানেন, মহিলা কুস্তিগিরদের দুর্দশাও দেখেছেন। অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটাররা অত খবর পাবেন কোথায়? ফলে নিশ্চয়ই তাঁদের মনে হয়েছিল – শহরের মাঝখানে রয়েছি, রাস্তায় লোকজনও আছে, অতএব একটু এদিক ওদিক ঘুরে আসাই যায়। ওঁরা কী করে জানবেন যে ভারতের রাস্তায় নির্জনতাই কোনো মেয়ের একমাত্র শত্রু নয়, বরং লোক বেশি থাকলে ভয় বেশি!

এ মাসের গোড়ার দিকে হায়দরাবাদ বেড়াতে গিয়ে একদিন চারমিনার দেখতে গিয়েছিলাম, সঙ্গীদের মধ্যে তিনজন লিঙ্গ পরিচয়ে নারী। একজনের বয়স ১৩, একজন চল্লিশোর্ধ্ব, আরেকজন প্রায় ৭০। সেদিন রবিবার, সন্ধে হয়ে গেছে। সামনে দেখতে পাচ্ছি চারমিনার, কিন্তু যত এগোচ্ছি সেটা যেন পিছিয়ে যাচ্ছে, কিছুতেই পৌঁছতে পারছি না। কারণ রাস্তাটায় তিলধারণের জায়গা নেই। নিজের শরীরটাকে ওই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে এদিক ওদিক করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আক্ষরিক অর্থে রুদ্ধশ্বাস ‘অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্ট’। সেই ভিড় পেরিয়ে যখন গন্তব্যে পৌঁছলাম, তখন সঙ্গী তিন নারী এক যোগে যে মন্তব্য করলেন তাতেই টের পাওয়া যায় ভারতের রাস্তাঘাট মেয়েদের জন্যে কেমন। বললেন ‘জীবনে এই প্রথম ভিড়ের মধ্যে কেউ অসভ্যতা করল না’।

এই অবস্থা অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটারদের জানার কথা নয়। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডও নাকি জানে না। অস্ট্রেলিয়ার দুই মহিলা ক্রিকেটার আক্রান্ত হওয়ার পর বোর্ডের অনারারি সেক্রেটারি দেবজিৎ শইকিয়া যে বিবৃতি দেন, তাতে বলা হয় ‘এটা গভীরভাবে দুঃখজনক এবং বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ভারত চিরকাল তার সমস্ত অতিথির প্রতি উষ্ণতা, আতিথ্য ও যত্নের জন্য পরিচিত।’ বিচ্ছিন্ন ঘটনা! মধ্যপ্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন, যাদের আতিথ্যে অস্ট্রেলিয়া দল ছিল, তাদের অনারারি সেক্রেটারি সুধীর আসনানির বিবৃতির একটা অংশ আরও এককাঠি সরেস – ‘এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় এটা পরীক্ষা করে দেখতেই হবে যে খেলোয়াড়রা হোটেলের বাইরে ঘোরাফেরা করার জন্যে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেছিলেন, নাকি তেমন কোনো অনুরোধ ছাড়াই বেরিয়েছিলেন।’ যদিও অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের চিফ এক্সিকিউটিভ পল মার্শ অচিরেই জানিয়ে দেন, খেলোয়াড়রা নিরাপত্তা প্রোটোকল মেনেই বাইরে বেরিয়েছিলেন।

এইসব কথাও আমাদের অতি পরিচিত। বাইরে বেরোল কেন, না বেরোলেই তো ধর্ষণ হত না – একথা ভারতের কত নেতা যে কতবার বলেছেন তার ঠিক নেই। নেহাত এক্ষেত্রে ব্যাপারটা আন্তর্জাতিক, বিশ্বগুরুর সম্মানের প্রশ্ন জড়িত। তার উপর যে লোকটি এই কাণ্ড করে ধরা পড়েছে সে মুসলমান। নইলে হয়ত বলা হত – মেয়েগুলো উত্তেজক জামাকাপড় পরে বেরিয়েছিল। অথবা এমনও বলা যেতে পারত যে মেয়েগুলোই লোকটাকে উত্তেজিত করে আকর্ষণ করেছিল। মানে আগামীকাল অমনজোত কৌর বা রিচা ঘোষ এমনভাবে আক্রান্ত হলে যে কর্তারা সেরকম বলবেন না তার গ্যারান্টি কিন্তু বিশ্বকাপ জিতলেও পাওয়া যাবে না। সাক্ষী মালিক, বিনেশ ফোগতদের বেলায় আমরা দেখেছি যে দেশের জন্যে সোনার মেডেল জেতাও ভারতের মেয়েদের নিরাপত্তার বা যৌন অত্যাচারের শিকার হলে তার প্রতিকারের গ্যারান্টি নয়।

আসলে মেয়েরা বাইরে বেরোবে, নিজেদের মত করে ঘুরে বেড়াবে, ক্রিকেট খেলবে – এসব ভারতের বড় অংশের মানুষের আজও পছন্দ নয় (মানুষই লিখলাম, কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজে অনেক মেয়েও ঘোর পিতৃতান্ত্রিক)। তেমন লোকেদের হাতেই এখন দেশের ভার এবং সেই সূত্রে ক্রিকেট বোর্ডের ভার। সম্ভব হলে এঁরা নতুন বন্ধু তালিবানদের মত মেয়েদের ক্রিকেট দলটা তুলেই দিতেন। কিন্তু স্বাধীনতার পরের প্রায় আট দশকে দেশটা যেখানে পৌঁছেছে সেটা তো দুম করে অস্বীকার করা যায় না, চোখের চামড়া আছে তো। সুট বুট পরা ইংরিজি জানা মৌলবাদীদের ‘মেয়েদের ক্রিকেট খেলা চলবে না’ বলতেও একটু কেমন কেমন লাগে। নইলে বিজেপির করতলগত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের মেয়েদের ক্রিকেট সম্পর্কে অবজ্ঞা কিছু কম নয়।

প্রমাণ চান? ভারতে কোথায় কোথায় বিশ্বকাপের খেলাগুলো হল দেখুন – গৌহাটি, ইন্দোর, বিশাখাপত্তনম আর মুম্বই। কল্পনা করতে পারেন, ভারতে ছেলেদের বিশ্বকাপ হচ্ছে আর কলকাতার ইডেন উদ্যান, দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা (ইদানীং অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম), চেন্নাইয়ের চিপক বা বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে একটাও খেলা নেই? ২০২৩ সালে যখন এদেশে ছেলেদের বিশ্বকাপ হল, তখন এই প্রত্যেকটা জায়গায় খেলা ছিল। মেয়েদের খেলা দেখতে এইসব বড় শহরে লোক আসবে না, তাই ছোট শহরে খেলা দেওয়া হয়েছে – এই যুক্তির কিন্তু কোনো পরিমাপযোগ্য প্রমাণ নেই। বরং বোর্ডের পক্ষ থেকে বিশ্বকাপসুলভ প্রচার না থাকা সত্ত্বেও যে চার শহরে খেলা হয়েছে, সেখানে ভারতের ম্যাচগুলোতে নিয়মিত ২৫,০০০-৩০,০০০ দর্শক হয়েছে। এর বেশি দর্শক আজকাল ছেলেদের ৫০ ওভারের ম্যাচেও প্রায়শই হয় না। এমনকি আমেদাবাদে ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ম্যাচ হচ্ছে, বিরাট কোহলি বহুদিন পরে শতরান করছেন, অথচ গ্যালারি খাঁ খাঁ – এই দৃশ্যও সাম্প্রতিক অতীতে দেখা গেছে। উপরন্তু ভারত ফাইনালে ওঠায় এখন ফাইনালের টিকিটের দাম বেড়ে গেছে বহুগুণ, কারণ চাহিদা বিপুল বেড়েছে।

মুম্বইতেও ঐতিহ্যশালী ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম বা ব্র্যাবোর্ন স্টেডিয়ামে খেলা দেওয়া হয়নি। ডি ওয়াই পাতিল স্টেডিয়াম এমন জায়গায়, যার সম্পর্কে ২০০৮ সালে মুম্বইয়ের সাংবাদিকরা মজা করে বলতেন ‘ওটা মুম্বইয়ের চেয়ে পুনের বেশি কাছাকাছি।’ শ্রীলঙ্কায় যে খেলাগুলো ছিল তার সবকটাই কিন্তু রাজধানী কলম্বোর বিখ্যাত রণসিঙ্ঘে প্রেমদাসা স্টেডিয়ামে হয়েছে। ডাম্বুলা বা ক্যান্ডিতে নয়।

তবে মেয়েদের ক্রিকেটের প্রতি বোর্ডের অবহেলা এটুকুই নয়। বিজেপির মত বিসিসিআইয়েরও গোদি মিডিয়া আছে। তার সাংবাদিকরা সোশাল মিডিয়া বিদীর্ণ করে লিখে থাকেন, মেয়েদের ক্রিকেটের জন্যে বোর্ড কতকিছু করছে। ২০২২ সালে জয় শাহ বোর্ডের সরাসরি দায়িত্বে থাকার সময়ে ঘটা করে ঘোষণা করা হয়েছিল – এখন থেকে বোর্ডের সঙ্গে কেন্দ্রীয় চুক্তিতে আবদ্ধ ছেলে আর মেয়ে ক্রিকেটাররা সমান ম্যাচ ফি (টেস্ট পিছু ১৫ লক্ষ টাকা, একদিনের ম্যাচ পিছু ৬ লক্ষ টাকা, কুড়ি বিশের ম্যাচ পিছু ৩ লক্ষ টাকা) পাবেন। গোদি মিডিয়া ঢাকঢোল পিটিয়ে একে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বলেছিল। কিন্তু এর চেয়ে ন্যক্কারজনক অর্ধসত্য কমই হয়। কারণ কোহলি, রোহিত শর্মা, শুভমান গিলরা এক বছরে যত ম্যাচ খেলেন হরমনপ্রীত, জেমিমারা তার অর্ধেকেরও কম খেলেন। ২০২২ সালের উদাহরণই নেওয়া যাক। ভারতের ছেলেদের দল খেলেছিল ১১ খানা টেস্ট ম্যাচ, ২৯ খানা একদিনের ম্যাচ আর ২২ খানা কুড়ি বিশের ম্যাচ। ভারতের মেয়েরা খেলেছিলেন মাত্র দুটো টেস্ট, ২১ খানা একদিনের ম্যাচ আর ১৭ খানা কুড়ি বিশের ম্যাচ। ২০২১ সালে করোনা অতিমারীর জন্যে স্থগিত মেয়েদের একদিনের ম্যাচের বিশ্বকাপ ২০২২ সালে হয়েছিল। নইলে একদিনের ম্যাচের সংখ্যাটা আরও কম হত। মেয়েদের ক্রিকেট এভাবে চলে বলেই ২০২৩ সালে টেস্ট অভিষেক হওয়া জেমিমা এ পর্যন্ত খেলেছেন মাত্র তিনটে টেস্ট, অথচ একই বছরে টেস্ট খেলা শুরু করে যশস্বী জয়সোয়াল খেলে ফেলেছেন ২৬ খানা ম্যাচ। সমান কাজ না দিলে সমান পারিশ্রমিক দেওয়ার ঘোষণা যে বিশুদ্ধ গঞ্জিকা, তা বলাই বাহুল্য।

পৃথিবীর যে কোনো খেলায় সাফল্য অনেককিছু বদলে দেয়। এই বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা বা খেতাব জিতে নেওয়া মেয়েদের ক্রিকেট সম্পর্কে বোর্ডের ভাবনাচিন্তা বদলাবে কিনা সেটা সময় বলবে। লোকের আগ্রহ নেই কথাটা কিন্তু মিথ্যে। যে হাজার হাজার দর্শক মাঠে এসেছেন তাঁরা সকলে যে মহিলা নন তা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না। উপরন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের তথ্য বলছে, এই বিশ্বকাপের প্রথম ১১ ম্যাচেই লিনিয়ার ও ডিজিটাল রিচের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে গেছে। বাহাত্তর মিলিয়ন দর্শকের কাছে পৌঁছেছে এই ম্যাচগুলো। গত বিশ্বকাপের চেয়ে এটা ১৬৬% বেশি। বিশেষত ৫ অক্টোবরের ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মেয়েদের ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দর্শকের দেখা ম্যাচ হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন ঝুলন সেরা বাঙালি ক্রিকেটার? মোটেই না

শেষে যে কথাটা বলব, সেটা সম্ভবত অনেক নারীবাদীরও ভালো লাগবে না। যে জেমিমার হাউ হাউ করে কান্না নিয়ে সকলে মিলে কাব্যি করা চলছে এখন, গতবছর অক্টোবরে কুৎসিতভাবে তাঁরই পিছনে লেগেছিল এদেশের সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে অনেকেই। মুম্বইয়ের খার জিমখানার প্রথম মহিলা সদস্য জেমিমাকে সেই ক্লাব ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল, তাঁর বাবার বিরুদ্ধে ক্লাব চত্বরে ধর্মান্তরের আসর বসানোর অভিযোগ তুলে। ধর্মপ্রাণ ইভান রডরিগসকে বিবৃতি দিয়ে জানাতে হয়েছিল – তিনি প্রার্থনা সভার আয়োজন করেছিলেন, তাও ক্লাব কর্তৃপক্ষের আপত্তিতে বন্ধ করে দেন। সেইসময় জেমিমাকে মাঠের মধ্যে এনে ধর্ষণ করা উচিত – এমন কথাও পোস্ট করা হচ্ছিল সোশাল মিডিয়ায়। নারীবাদীরা কেউ তখন টুঁ শব্দ করেছিলেন বলে জানি না। এখন করছেন, কারণ জেমিমাকে চেনা গেছে। বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে, মহিলাদের ক্রিকেটের খবর নারীবাদীরাও বিশেষ রাখেন না। সেটা যে খুব দোষের তা নয়। খেলার জগতে জয় না এলে মানুষের আগ্রহ তৈরি হয় না। ঠিক যে কারণে ভারতের ছেলেদের জাতীয় ফুটবল দলের থেকে ক্রিকেট দলের খবর বেশি রাখি আমরা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। যে কারণে সায়না নেহওয়াল, পি ভি সিন্ধুর সাফল্যের পর আমাদের সকলের ব্যাডমিন্টনে আগ্রহ বেড়েছে। নীরজ চোপড়ার কারণেই তো আমরা জ্যাভেলিনের খবর রাখতে শুরু করেছি।

বলার কথা এটুকুই যে খেলার মাঠে কেঁদে ফেলা অভিনব কোনো ব্যাপার নয়, পুরুষরাও কাঁদেন। ভারতীয় পুরুষরাও। স্মৃতিশক্তি নিতান্ত দুর্বল না হলে সকলেরই মনে থাকার কথা। ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের ফুটেজ দেখুন, শচীনের অবসর নেওয়ার দিনের ফুটেজ দেখুন। দিয়েগো মারাদোনার সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে পড়ে তাঁর কান্নার ছবি। সামনের বছর ফুটবল বিশ্বকাপে আবার তেমন দৃশ্য দেখতে পাবেন। কিন্তু জেমিমার কান্না মাঠে থামেনি। তিনি ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে গিয়েও ফোঁপাচ্ছিলেন। বলেছেন তিনি প্রবল উদ্বেগের শিকার (‘anxiety’) হয়েছেন গোটা বিশ্বকাপ জুড়ে। কেন এই উদ্বেগ, তাঁর কান্না কেবলই আনন্দাশ্রু কিনা, তা তলিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। মাত্র কয়েক ঘন্টার প্রশংসার পরেই সোশাল মিডিয়ায় জেমিমার কৈশোরের ভিডিও খুঁড়ে আনা শুরু হয়ে গেছে, যেখানে তিনি খ্রিস্টানদের সভায় কিছু ধর্মীয় কথাবার্তা বলছেন। সেটা নাকি ভীষণ অপরাধ। দাঁত নখ বেরিয়ে এসেছে হিন্দুত্ববাদীদের, কারণ জেমিমা ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলতে পারার জন্যে বাইবেলকে, যিশুকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা। ফাইনালে জেমিমা শূন্য রানে আউট হতে পারেন, লোপ্পা ক্যাচ ফেলে দিতে পারেন। তাঁর জন্যে আমাদের গদগদ আবেগ যেন সেদিনও অক্ষত থাকে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত