লোকসভা নির্বাচনের বাজারে একটা মৃত্যু প্রায় সকলের নজর এড়িয়ে গেছে, কারণ বাংলা সংবাদমাধ্যমে তা নিয়ে এক লাইনও লেখা হয়নি। মূলধারার সংবাদমাধ্যমে অবশ্য সেই মৃত্যু নিয়ে লেখালিখি হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। নিজের অপরাধ সকলেই ধামাচাপা দেয়। মূলধারার বাইরে আছি বলেই আমার লেখার সুযোগ ছিল। কিন্তু নির্বাচন সংক্রান্ত লেখালিখিতে মেতে গিয়ে আমিও সেই বর্ষীয়ান সাংবাদিকের মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করার দোষে দুষ্ট হয়েছি। এই লেখা বস্তুত পাপস্খালনের চেষ্টা।
ভদ্রলোকের নাম সতীশ নন্দগাঁওকর। তিনি সর্বভারতীয় এবং স্বনামধন্য খবরের কাগজ হিন্দুস্তান টাইমস-এর মুম্বাই সংস্করণের মুম্বাই-থানে ব্যুরোর প্রধান ছিলেন। যাঁরা খবরের কাগজের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাঁরা জানেন যে পদটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের পদগুলোতে সাধারণত থাকেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ রিপোর্টাররা। তাঁদের অধীনে কাজ করেন অন্যরা। এই ব্যুরো প্রধানদের কাজের সময় বলে কিছু থাকে না, থাকা সম্ভব নয়। হয়ত অফিস থেকে বাড়ি চলে গেলেন রাত নটায়, কিন্তু দুটোর সময়ে ফোন আসতে পারে যে অমুক জায়গায় তমুক ঘটনা ঘটেছে। তখন নিজে না গেলেও, তাঁরই দায়িত্ব অন্য কোনো রিপোর্টারকে জানিয়ে খবরটা যেন পরদিন কাগজে বেরোয় তা নিশ্চিত করা। অফিসে নাইট ডিউটিতে থাকেন যে রিপোর্টার, তিনিও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ হলে যত রাতই হোক ব্যুরো প্রধানকে ঘুম থেকে তোলেন। এটাই দস্তুর। আবার কোনো খবর হাতছাড়া হয়ে গেলে, বা ভুল খবর বেরিয়ে গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহির দায়িত্বও প্রথমে ব্যুরো প্রধানের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অত বড় কাগজের ব্যুরো প্রধানরা নিজেরাও নামকরা সাংবাদিক হন। ফলে কাগজের উপর রাজনৈতিক/অরাজনৈতিক যেসব চাপ আসে বাইরে থেকে, তার অনেকটাও তাঁদেরই সামলাতে হয়। তার উপর রিপোর্টাররা অনেক ক্ষেত্রে অপাঠ্য, দুর্বোধ্য কপি লেখেন। সেই কপিকে বোধ্য করে তুলে তবে সম্পাদনার ডেস্কে পাঠানোও ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব।
এইরকম প্রচণ্ড চাপের একটা কাজ করতেন সতীশ। সঙ্গে আরও বেশকিছু অতিরিক্ত কাজ তাঁকে করতে হত। তিনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে অফিসের কাছেই এক ওষুধের দোকানে ব্যথার ওষুধ কিনতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা বলেন সতীশ মারা গেছেন। এমন মৃত্যু নেহাত বিরল নয়। আমার আপনার অনেক পরিচিতই এরকম হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আজকাল। তাহলে সতীশকে নিয়ে লিখছি কেন? কারণ তাঁর মৃত্যুর পর কিছু অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে।
গত ১৩ মার্চ মুম্বাই প্রেস ক্লাবে সতীশের স্মরণসভায় তাঁর স্ত্রী অঞ্জলি অম্বেকর বলেন, ‘সাংবাদিক না হলে সতীশ একটা সুন্দর জীবন কাটাতে পারত।’ কথাটা নেহাত একজন অকালমৃতের স্ত্রীর বিলাপ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ তিনি হিন্দুস্তান টাইমসের মুম্বাই সংস্করণের রেসিডেন্ট এডিটর মীনা বাঘেলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এডিটর্স গিল্ড অফ ইন্ডিয়া, প্রেস কাউন্সিল এবং মুম্বাই প্রেস ক্লাবে। তাঁর অভিযোগ, মীনা অনবরত অন্য সাংবাদিকদের সামনে সতীশকে অপমান করতেন, যা তাঁর মত সংবেদনশীল মানুষকে প্রবল আঘাত করত। মারা যাওয়ার খানিকক্ষণ আগে, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে কুলকুল করে ঘামতে ঘামতে সতীশ বলেছিলেন যে তিনি পরদিনই পদত্যাগ করবেন। কারণ সেদিনও খানিক আগেই মীনা একই আচরণ করেছিলেন এবং এই আচরণ দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। অঞ্জলির অভিযোগের ভিত্তিতে মুম্বাই প্রেস ক্লাব প্রাথমিক তদন্ত চালিয়ে রিপোর্ট তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, যদিও সতীশের মৃত্যু আর মীনার ব্যবহারের মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায়নি, তবু একথা সত্যি যে মীনা তাঁকে প্রচণ্ড মানসিক চাপে রাখতেন এবং নিয়মিত অপমান করতেন। এসব ‘কার্ডিয়াক এপিসোড’-এর কারণ হয়ে থাকতেই পারে।
এডিটর্স গিল্ডও এক বিবৃতিতে হিন্দুস্তান টাইমস কর্তৃপক্ষকে এই মৃত্যুর যথাযথ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে অনুরোধ করেছে। এর বেশি কিছু করার ক্ষমতা প্রেস ক্লাব বা গিল্ডের আইনত নেই, কারণ এগুলো সাংবাদিকদের সংগঠন মাত্র। ট্রেড ইউনিয়ন পর্যন্ত নয়। সত্যি কথা বলতে, ভারতের কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে বছর তিরিশেক হল সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করা বন্ধ হয়ে গেছে। নয়ের দশকে উদারীকরণের সময়ে সংবাদমাধ্যমগুলো কর্মচারীদের চাকরিগুলোকে চুক্তিভিত্তিক করে ফেলার চেষ্টা শুরু করে। সংবাদমাধ্যমে যাঁরা শ্রমজীবী, অর্থাৎ ছাপার মেশিন চালানোর কাজ করেন বা অফিসগুলোতে পিওনের কাজ ইত্যাদি করতেন, তাঁদের মধ্যে এর বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ তৈরি হয়েছিল। তাই তাঁদের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী করে ফেলা সহজ হয়নি, অনেকে পুরনো ওয়েজ বোর্ডের অধীনেই রয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের যখন তখন তাড়ানো যায় না; যেমন ইচ্ছে ইনক্রিমেন্ট না দেওয়া বা মাইনে কমিয়ে দেওয়াও যায় না। অর্থাৎ নানা ঝামেলা পোয়াতে হয় মালিককে। অত টাকা দিতে পারব না, ব্যবসার অবস্থা ভাল না – এসব ওজর নিয়ে কোটিপতি কাগজগুলোর মালিকরা বিভিন্ন সময়ে আদালতে পর্যন্ত গেছেন ওই ধরনের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। কর্মচারীরাও গেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মচারীদেরই জয় হয়েছে।
কিন্তু যাঁরা নিজেদের বুদ্ধিজীবী মনে করেন, সেই সাংবাদিকরা, পাকা চাকরি থেকে চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে চলে যেতে বিশেষ আপত্তি করেননি। কারণ তাঁদের সামনে মহার্ঘ প্যাকেজের গাজর ঝোলানো হয়েছিল। ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে থেকে ইউনিয়ন তুলে দিতে মালিকদের বিশেষ কসরত করতে হয়নি। কিন্তু কেবল শ্রমজীবীদের মধ্যে ইউনিয়ন থাকতে থাকতে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে; মালিকরা যে দুর্বল করে দিতে সক্রিয় ছিল তা বলাই বাহুল্য। যত পুরনো কর্মী অবসর নিয়েছেন, তত চুক্তিভিত্তিক কর্মী বেড়েছে, ইউনিয়ন ততই সাইন বোর্ডে পরিণত হয়েছে। সেই ৩০-৩৫ বছর আগে শুরু হওয়া প্রক্রিয়ার ফল এই, যে আজ সতীশরা কারণে-অকারণে গালমন্দ সহ্য করে কাজ করতে বাধ্য হন। পরিণামে জীবনটা পর্যন্ত চলে যায় অনেক সময়।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত হিন্দুস্তান টাইমস সতীশের বস মীনার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করছে না। করলেও সতীশের মৃত্যুতে তাঁকে দায়ী করার মত কোনো প্রমাণ যে পাওয়া যাবে না তা বলাই বাহুল্য। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগই আদালতে প্রমাণ করা যথেষ্ট দুরূহ, আর এ তো ডাক্তারি পরিভাষায় স্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু গত কয়েক বছরে সাংবাদিকদের মধ্যে ৫০-৬০ বছর বয়সে মৃত্যু কীভাবে বেড়েছে তার যদি কোনো সমীক্ষা করা যায়, তাহলে যে চোখ কপালে তোলার মত একটা সংখ্যা পাওয়া যাবে তা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কেন সন্দেহ নেই?
কারণ যে পরিস্থিতিতে পড়ে সতীশের হৃদপিণ্ড কাজ বন্ধ করে দিয়েছে, তেমন পরিস্থিতিতে খবরের কাগজের দেড় দশকের কর্মজীবনে আমি নিজেও পড়েছি, অগ্রজ সহকর্মীদেরও পড়তে দেখেছি। হয়ত বয়স কম ছিল বলে আমার শরীর লড়ে গেছে। কিন্তু অগ্রজদের চল্লিশ না পেরোতেই নানারকম ছোট বড় রোগে আক্রান্ত হতে দেখেছি। সাংবাদিকদের মধ্যে ডায়বেটিস, হাইপার টেনশন, হৃদরোগ আজকাল জলভাত। আমার শেষ চাকরির এক অনুজ হঠাৎ একদিন রাতে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে পড়েছিল। অন্য বিভাগের কর্মী হওয়ায় তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল না আমার। কিন্তু তার মৃত্যুর পরে তারই বিভাগের সাংবাদিকদের থেকে জেনেছিলাম, ওই ঝুলে পড়া মোটেই আকস্মিক নয়। তার কাজের সময় উদ্ভট হওয়ায় বৈবাহিক জীবনে অশান্তি চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে। সে তার সুরাহা করার জন্যে বসের কাছে সামান্য পেশাদারি সাহায্য চেয়েছিল – কাজের সময়টা যদি অন্তত কিছুদিনের জন্য বদল করা যায়। তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েও সে বদল করা হয়নি। স্ত্রীর সঙ্গে অশান্তিও মেটেনি। ছেলেটি খুব বলিয়ে কইয়ে ছিল না। যাওয়ার সময়ে সুইসাইড নোট লেখার নাটকীয়তাটুকুও করেনি। এই মৃত্যুর দায়িত্ব কে নেবে? কেউ না। বেচারির তো অভিযোগ করারও কেউ ছিল না।
আমার দ্বিতীয় চাকরিতে যিনি আমার বস ছিলেন, তিনি এক বিরল প্রজাতির ভদ্রলোক। একটুর জন্যে সতীশ হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন। আমি ওই কাগজের খেলার পাতায় যোগ দিয়েই শুনি, ক্রীড়া সম্পাদকের কয়েকদিন আগেই গুরুতর স্ট্রোক হয়েছে। তাই তিনি হাসপাতালে ভর্তি। মাস দেড়েক পরে যখন কাজে যোগ দিলেন, দেখলাম নিপাট ভালমানুষ এবং অফিসে অসম্ভব জনপ্রিয়। শুধু কাগজের সম্পাদক ভদ্রমহিলা, যিনি অত্যন্ত দক্ষ সহ-সম্পাদককেও ভরা নিউজরুমে হাঁটুর বয়সী ছেলেমেয়েদের সামনে অপদস্থ করতে ছাড়েন না, তিনিই আমাদের ক্রীড়া সম্পাদকের উপর খড়্গহস্ত। কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই। তাঁর সব কাজেই উনি ভুল ধরেন। মজার কথা, কাজ বলতে যা বোঝায় তা ওই ভদ্রমহিলাকে একদিনও করতে দেখিনি। আমি যে আট মাস ওই কাগজে ছিলাম, তার মধ্যে একদিনও সম্পাদক এক লাইন লেখেননি কাগজে। সম্পাদকীয় পর্যন্ত লিখতেন না। সারাদিন বসে বসে এর তার উপর চেঁচানো আর কয়েকটা পাতায় চোখ বোলানো ছাড়া তাঁর কাজ বলতে ছিল ম্যাড়মেড়ে ইংরিজিতে একে তাকে অপ্রয়োজনীয় ইমেল পাঠানো। কোনোদিন প্রথম পাতায় একটা শিরোনাম পর্যন্ত দিতে দেখিনি। অথচ তিনিই ওই কাগজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। সদ্য মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা আমার বসকে দেখতাম – সম্পাদকের চিৎকার শুরু হলেই হাত কাঁপছে। এর অনিবার্য ফল যা, একদিন ঠিক তাই ঘটল। সকালবেলা খবর পেলাম, আমাদের ক্রীড়া সম্পাদকের আবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। তিনি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি। আমি আর আমার এক সহকর্মী হাসপাতালে দেখতে গিয়ে ক্রীড়া সম্পাদকের স্ত্রীর মুখে যা শুনেছিলাম, তার সঙ্গে সতীশের স্ত্রীর বয়ানের শিউরে ওঠার মত মিল। সুখের কথা, তিনি কিছুদিন পরেই অবসর নেন। হয়ত সে কারণেই এখনো সুস্থ শরীরে জীবিত।
আরও পড়ুন টুইটার, বাইজু’স আঁধারে ছাঁটাই সম্পর্কে কয়েকটি কথা
এসব কথা লিখছি কেন? সব কর্পোরেট চাকুরেরই তো অল্পবিস্তর একইরকম অভিজ্ঞতা হয়। তাই তো আজকাল কাউকে জিজ্ঞেস করলে শোনা যায় না যে সে নিজের চাকরিতে সুখী। তাহলে সাংবাদিকরাই বা ব্যতিক্রম হবেন কেন? তাঁদের নিয়ে আলাদা করে লেখার কী আছে? সঙ্গত প্রশ্ন। আসলে ভারতের মূলধারার সাংবাদিকতা যে অতল খাদের মধ্যে পড়েছে গত এক দশকে, তাকে বুঝতে গেলে সাংবাদিকরা কোন অবস্থার মধ্যে কাজ করেন তা জানা দরকার। নইলে অন্ধের হস্তিদর্শন হয়।
শিক্ষকতার ব্যাপারে অনেকে বলে থাকেন, প্রচণ্ড মারধর করে সেইসব শিক্ষকরাই, যারা ভাল করে পড়াতে পারে না। সাংবাদিকতার ব্যাপারেও বললে ভুল হবে না যে অধস্তনদের উপর নিত্য চোটপাট চালানো, গালিগালাজ, অপমান করা অযোগ্য সাংবাদিকের লক্ষণ। ওই আচরণের পিছনে নিজের যোগ্যতার অভাবজনিত নিরাপত্তাহীনতার বড় ভূমিকা থাকে। বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন কেউ তাকে অতিক্রম করে যাবে – এই উৎকণ্ঠা থেকে অধস্তনদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেওয়ার প্রচেষ্টা থাকে। এর অজস্র উদাহরণ আছে। কিন্তু নাম করলে আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে। কে না জানে, রাজনৈতিক নেতাদের পরেই সবচেয়ে লম্বা হাত বড় মিডিয়ার বড় সাংবাদিকদের? তাঁরা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে না পারুন, কোটিপতি মালিকের মদতে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের সঙ্গে দহরমের সুবাদে ক্ষমতাহীনকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে সিদ্ধহস্ত। দুঃখের বিষয়, নয়ের দশক থেকে মিডিয়ার দখল সম্পাদকদের হাত থেকে সরাসরি মালিকদের হাতে চলে যাওয়ায় এই ধরনের অযোগ্য অথচ বশংবদ সাংবাদিকদেরই তাঁরা উঁচু পদগুলোতে বসিয়েছেন। কারণ যোগ্য সাংবাদিক মালিককেও প্রশ্ন করবেন, মালিকের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য পালন করতে অস্বীকার করতেও পারেন। এরই ফলশ্রুতিতে সতীশের মত দশা হচ্ছে বহু সাংবাদিকের। তার চেয়েও বেশি সাংবাদিকের চাকরি যাচ্ছে করোনা অতিমারী বা কোম্পানির আর্থিক ক্ষতির অজুহাতে। ফলে মিডিয়া ভরে যাচ্ছে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত সাংবাদিকে। তারাই হয়ে উঠছে সংবাদমাধ্যমগুলোর নীতি নির্ধারক। রবীশ কুমাররা সরে যাচ্ছেন ইউটিউবে, টিভি চ্যানেলে জাঁকিয়ে বসছেন অর্ণব গোস্বামীরা। নাম করা চ্যানেলে হোয়াটস্যাপে ফরোয়ার্ড হওয়া ভুয়ো খবর ঘটা করে প্রচারিত হচ্ছে। কোথাও সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছেন অঞ্জনা ওম কাশ্যপ, কোথাও বিতর্ক আয়োজনের ভান করে এক পক্ষকে মৌপিয়া নন্দী ধমকাচ্ছেন ‘কে তুমি?’
এসবে তিতিবিরক্ত মানুষ ইদানীং ঝুঁকছেন বিকল্প সংবাদমাধ্যমের দিকে। তবে ভাবলে ভুল হবে যে এসব বালাই সেখানে একেবারেই নেই। তেমনটা হওয়া সম্ভবও নয়। কারণ বিকল্প সংবাদমাধ্যম আকাশ থেকে পড়েনি। যাঁরা এই মঞ্চগুলো গড়ে তুলেছেন বা তুলছেন, তাঁদের হাতেখড়ি হয়েছিল মূলধারাতেই। সকলেই যে আদর্শের কারণে অন্য পথে এসেছেন এমন নয়। অনেকে সেখানে যোগ্যতা প্রমাণ করতে না পেরেও বিকল্প পথে এসেছেন। তাঁরা হতে চান মূলধারার মহীরুহদের মতই। আসলে তাঁরাই এদের আদর্শ। অধস্তনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার না করলে, যিনি টাকা জোগাচ্ছেন তাঁর পায়ে তৈলমর্দন না করলে, ক্ষমতাবানদের দাদা দিদি বানাতে না পারলে বড় সাংবাদিক হওয়া যায় না – এ ধারণা বিকল্প মাধ্যমের অনেকের মধ্যেও বদ্ধমূল। এই মনোভাবের ফল কাজে পড়তে বাধ্য। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কাজে পড়েছে, বিকল্প মাধ্যমেও অবশ্যই পড়বে। সত্যি কথা বলতে, এ দেশের বিকল্প সংবাদমাধ্যম এখনো বিকল্প ব্যবসায়িক মডেল হিসাবে সম্পূর্ণ বিকশিত হয়নি। অর্থাৎ মূলধারায় কাজ করে যতখানি রোজগার করা যায়, বিকল্পে এখনো যায় না। যশও এখনো মূলধারায় বেশি। বিকল্পে একই পরিমাণ যশলাভে পরিশ্রম অনেক বেশি। কোনোদিন ওগুলো মূলধারার সমান হয়ে গেলে বিকল্প মাধ্যমের সাংবাদিকদের আদর্শবাদের যথার্থ পরীক্ষা হবে। আমরা অনেকেই তো আসলে সুযোগের অভাবে চরিত্রবান।
ডুলুং পত্রিকার আষাঢ়-শ্রাবণ ১৪৩১ সংখ্যায় প্রকাশিত
