ভাগ করলে বাড়ে

একজন স্রষ্টা কিভাবে আরেক স্রষ্টার সৃষ্টি আত্তীকরণ করে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান, বোধহয় এই গান তার এক উজ্জ্বল নিদর্শন

“ও আয় রে ছুটে আয় পুজোর গন্ধ এসেছে / ঢ্যাং কুড়কুড় ঢ্যাং কুড়াকুড় বাদ্যি বেজেছে…” গানটা বেশ জনপ্রিয়। পুজোর মরসুমে বিশেষত ছোটদের নাচ-গানের অনুষ্ঠানে প্রায় সর্বত্র শোনা যায়। ১৯৭৭ সালের পুজোয় সলিল চৌধুরীর এই সৃষ্টি তাঁর কন্যা অন্তরার গলায় প্রথম শোনা গিয়েছিল। গানটার সঞ্চারী এরকম “কাঁদছ কেন আজ ময়নাপাড়ার মেয়ে? / নতুন জামা ফ্রক পাওনি বুঝি চেয়ে? / আমার কাছে যা আছে সব তোমায় দেব দিয়ে / আজ হাসিখুশি মিথ্যে হবে তোমাকে বাদ দিয়ে।”

আনন্দ যে ভাগ করলে বাড়ে, সে কথা আজকাল আর ছোটদের বোঝানোর সময় পাই না আমরা। সলিল চৌধুরীর প্রজন্মের মানুষ প্রাণপণে শেখাতেন। এই স্তবকটা সেদিক থেকে চমকপ্রদ কিছু নয়। কিন্তু বহুবার শোনা এই গানটা কদিন আগে নিজের মেয়ের গলায় শুনে যে কারণে কানটা বেশি খাড়া করতে হল, তা হল দুটো শব্দ — “ময়নাপাড়ার মেয়ে”।

ঐ দুটো শব্দে ঘুমন্ত স্মৃতি সজাগ হয়ে উঠল। আমাদের বাড়িতে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি প্রথম টেপ রেকর্ডার (বা ক্যাসেট প্লেয়ার) আসার পর গোড়ার দিকে কেনা ক্যাসেটগুলোর একটার নাম ছিল ‘হিটস অফ সলিল চৌধুরী’। সেই ক্যাসেটের অধিকাংশ গান সকলের চেনা, সেই বারো-তেরো বছর বয়সে আমারও চেনা। কিন্তু সেই প্রথম শুনেছিলাম এক আশ্চর্য গান — সুচিত্রা মিত্রের গলায় ‘সেই মেয়ে’।

১৯৫০ এ প্রকাশিত সেই গানের শরীরে পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বাংলার গ্রামের মানুষের দুর্দশা আর তেভাগা আন্দোলন। কলকাতায় এসে পড়া অগণিত অভুক্ত, অর্ধভুক্ত মানুষের মধ্যে একটি মেয়েকে দেখে গীতিকার লিখেছেন “হয়ত তাকে কৃষ্ণকলি বলে, কবিগুরু, তুমিই চিনেছিলে।” শীর্ণ বাহু তুলে ক্ষুধায় জ্বলতে দেখে শুরুতেই ভেবেছেন “কে জানে হায়, কোথায় বা ঘর কী নাম কালো মেয়ে?” তারপরই চিহ্নিত করেছেন “হয়ত বা সেই ময়নাপাড়ার মাঠের কালো মেয়ে।” একজন স্রষ্টা কিভাবে আরেক স্রষ্টার সৃষ্টি আত্তীকরণ করে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান, বোধহয় এই গান তার এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

চৌঠা আষাঢ় ১৩০৭ এ রচিত রবীন্দ্রনাথের “কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি” সুচিত্রা মিত্র বা শান্তিদেব ঘোষের গলায় কে না শুনেছে? সেই উৎকৃষ্ট প্রেমের (যদিও ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের এই কবিতা গীতবিতানের প্রেম পর্যায় নয়, বিচিত্র পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত) গানের নায়িকা সলিল চৌধুরীর কলমে ফিরে এল অভুক্ত পল্লীবালা হিসাবে। তেভাগা আন্দোলনে উদ্দীপ্ত গীতিকার নিজের গানের শেষে কবিগুরুকে বললেন “আবার কোনদিন যদি তারে দেখো পথে / বোলো তারে বোলো তারই তরে / ময়নাপাড়া থেকে খবর আসে তারি তরে রে / সে যেন ফিরে যায় রে।”

জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে দুই স্রষ্টার এই সংলাপ কৈশোর থেকেই জানা ছিল। মধ্যবয়সের মুখে এসে খেয়াল করে শিহরিত হলাম যে সেই ময়নাপাড়ার মেয়ে সলিল চৌধুরীকে ১৯৭৭ এও ছেড়ে যায়নি। ১৯৫০ এ তিনি বছর আঠাশের যুবক, সাতাশ বছর পরে প্রায় বৃদ্ধ। তাঁর কল্পনায় রবীন্দ্রনাথের গানের যুবতী ততদিনে ছোট্ট মেয়ে হয়ে গেছে। তেভাগার তাপ এ গানে নেই, সময় বদলেছে বলে, হয়ত শিশুদের জন্য গান বলেও। কিন্তু গানটা যে সচ্ছল পরিবারের শিশুর জবানিতে রচিত, সে নিজে যা উপহার পেয়েছে তার সবই ময়নাপাড়ার মেয়েকে দিয়ে দেবে বলছে, নইলে হাসিখুশি মিথ্যে হয়ে যাবে।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আর সলিল চৌধুরীর সংলাপ বোধহয় এই গানে কেবল ময়নাপাড়ার মেয়েতে শেষ নয়, কারণ সচ্ছল মেয়ের প্রত্যয়ে প্রতিধ্বনি পাচ্ছি ‘শিশু’ কাব্যগ্রন্থের ‘পূজার সাজ’ কবিতার। দরিদ্র কৃষক বাবার দুই ছেলে — বিধু আর মধু। বাবার কিনে আনা সামান্য ছিটের জামা বিধুর পছন্দ হয়েছে, মধু কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষী। সে ধনী রায়বাবুর কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করে। রায়বাবু নিজের ছেলেকে ডেকে বলেন “ওরে গুপি, তোর জামা দে তুই মধুকে।” কবিতার মূল প্রতিপাদ্য অবশ্য আত্মসম্মান, তাই বিধু-মধুর মা মধুর ধার করা জামা দেখে দুঃখ পান, বিধুকে বলেন “দরিদ্র ছেলের দেহে দরিদ্র বাপের স্নেহে / ছিটের জামাটি করে আলো।” কিন্তু লক্ষণীয় যে, রায়বাবুও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার পক্ষপাতী।

স্রষ্টারা ভাগ করে নিতে জানেন।

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading