অনধিকার চর্চা

২০১৭ সালের নভেম্বরে আমার ডেঙ্গু হয়েছিল। সেবার চারিদিকে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার প্রকোপ। বেশকিছু মানুষ মারা যান। আমি নার্সিংহোমের যে ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছিলাম সেই ওয়ার্ডেই আরো দু তিনজন মশাবাহিত রোগে ভুগছিলেন। একজনকে আমার চোখের সামনেই আই সি ইউ তে নিয়ে যাওয়া হল, পরে শুনলাম মারা গেছেন। কিন্তু পরিষ্কার মনে আছে, আমার রোগ নির্ণয় করে ডাক্তারবাবু ডেঙ্গু লেখেননি, লিখেছিলেন অজানা জ্বর। ডাক্তার আমার এক ডাক্তার আত্মীয়ের বন্ধু হওয়াতে তাঁকে একান্তে জিজ্ঞেস করা গিয়েছিল মুখে ডেঙ্গু বললেও লিখলেন না কেন। উত্তর দেওয়ার সময়ে ডাক্তারবাবুর কাঁচুমাচু মুখটা আজও মনে পড়ে। ডেঙ্গু লিখলেই সরকারের পক্ষ থেকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা। অগত্যা।
অর্থাৎ কী রোগ হয়েছে সেটা এম বি বি এস, এম ডি ইত্যাদি করা ডাক্তার বোঝেন না, বোঝে সরকার। একে একনায়কতন্ত্র না বললে কাকে বলে জানি না। যে কোন একনায়কতন্ত্র শেষ পর্যন্ত কী করে? নৈরাজ্যের জন্ম দেয়। সোজা বাংলায় “বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো।” এখন সেই গেরোতেই আমরা পড়েছি। পশ্চিমবঙ্গের সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সেই বাম আমল থেকেই রুগ্ন, মৃতপ্রায়। এই আমলে যোগ হয়েছে নতুন উপসর্গ — অবহেলার অভিযোগে ডাক্তার পেটানো।
আসলে এমন সুন্দর ব্যবস্থা তৈরি করেছি আমরা যে আমাদেরই ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কোন প্রশ্ন করা চলে না। করলেই কেউ বলেন “মাওবাদী”, কেউ বলেন “দেশদ্রোহী”। অথচ ডাক্তারদের যথেচ্ছ প্রশ্ন করা চলে, কিচ্ছু না জেনে বিজ্ঞের মত তাঁদের সিদ্ধান্তকে অপ্রয়োজনীয় বলে দেগে দেওয়া চলে। এ বিষয়ে হিন্দু, মুসলমান, ধনী, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত কেউ কম যায় না। যার হাতে স্মার্টফোন আছে, সে-ই ডাক্তারবাবুর প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ কেনার আগে একবার গুগল করে নিচ্ছে, তারপর নিজের বিবেচনা অনুসারে অমুক ওষুধটা খাচ্ছে আর তমুকটা খাচ্ছে না। মানে ডাক্তার পরিশ্রম করে জয়েন্ট এন্ট্রান্স পাশ করলেন, তারপর পাঁচ সাত বছর পড়াশোনা করে এম বি বি এস হলেন, আরো দু তিন বছর পড়ে এম ডি বা এম এস কিছু একটা হলেন, কেউ কেউ এরপর আরো পড়াশোনা করে, ট্যাঁকের পয়সা খরচা করে আরো নানা ডিগ্রি পেয়ে যে চিকিৎসা করলেন সেটা যে ফালতু তা বুঝতে একটা গুগল সার্চই যথেষ্ট। যার স্মার্টফোন নেই তার আছে পাড়ার ওষুধের দোকান অথবা সর্বজ্ঞ আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব। কোন অসুখে অ্যান্টিবায়োটিক খেতেই হবে, কোন অন্তঃসত্ত্বার অস্ত্রোপচার করার কোন দরকার নেই এগুলো আজকাল হাসিম শেখ, রামা কৈবর্তও জানে। এবং তারা এও জানে যে তাদের হিসাব অনুযায়ী “চিকিৎসায় গাফিলতি” হলেই হাসপাতালে দলবল নিয়ে চড়াও হয়ে ভাংচুর, মারপিট করাই যায়। কেউ কিচ্ছু বলবে না। বরং আলাপ পরিচয় থাকলে স্থানীয় কাউন্সিলর, এম এল এ বা এম পি স্বয়ং দক্ষযজ্ঞে নেতৃত্ব দেবেন।
তাছাড়া যেহেতু “অ্যালোপ্যাথিতে আসলে শরীরের ক্ষতি করে”, তাই সঙ্গে হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদ, ইউনানি, বাবা রামদেব, আর্ট অফ লিভিং, গোমূত্র — এসব তো আছেই। খোদ কেন্দ্রীয় সরকার একখানা আয়ুশ মন্ত্রক খুলে বসেছেন। অতএব একথা জানতে কারো বাকি নেই যে লেখাপড়া করে এম বি বি এস ইত্যাদি হওয়া ডাক্তারগুলো নেহাত ফালতু। জুনিয়রগুলো তো তস্য ফালতু। অতএব দলবল নিয়ে যাও আর যত ইচ্ছে ঠ্যাঙাও।
অবশ্য এতে আশ্চর্য হওয়ার তেমন কিছু নেই। অমর্ত্য সেন যেখানে অর্থনীতি জানেন না সেখানে ডাক্তাররা চিকিৎসা করতে জানে এ কি বিশ্বাসযোগ্য? বললেই মানতে হবে নাকি? এরপর তো বলবে মানুষ বাঁদর থেকে এসেছে, পৃথিবী বাসযোগ্য হতে কয়েক লক্ষ বছর সময় লেগেছে।
সরকারও বুঝেছে জনগণ কী চায়। জনগণ অধিকার চায়। নানারকম সব অধিকার, যার মধ্যে স্বাস্থ্যের অধিকারটাও আছে। তারা চায় নিজের সাধ্যের মধ্যেই উপযুক্ত চিকিৎসা। কিন্তু বাপু সবাইকে সব অধিকার দিয়ে দিলে বেচার জন্যে থাকবেটা কী? চিকিৎসার মত এমন একটা জিনিস যদি সরকারী হাসপাতালে গেলেই কম পয়সায় দিব্যি পাওয়া যায় তাহলে কত লোকের পোলাও মারা যাবে বলুন দেখি? যার পয়সা আছে সে যাক না ঝাঁ চকচকে বেসরকারী হাসপাতালে। যার সামর্থ্য নেই সে সরকারী হাসপাতালে আসুক, যেখানে সারাক্ষণ নেই রাজ্যের নৈরাজ্য চলে। বেড নেই, ওষুধ নেই, পরীক্ষা নিরীক্ষা করার যন্ত্রপাতি নেই, প্রয়োজন অনুসারে ডাক্তারও নেই। একজন ডাক্তার টানা চব্বিশ ঘন্টা, ছত্রিশ ঘন্টা ডিউটি করেন। এখানেই লোকে আসুক। পরিষেবা পাবে না, হাতের কাছে ডাক্তার, নার্সগুলোকে তো পাবে। পেটাক, মেরে ফেলুক, যা ইচ্ছে করুক। আরে বাবা অন্তত মারপিট করার অধিকারটা তো দিতে হবে, নইলে সরকার চলবে কী করে? স্বাস্থ্যের অধিকারের চেয়ে এই অধিকার দিলে অনেক শস্তা হয় সরকারের। পুজো, কার্নিভাল, এ উৎসব সে উৎসবের বাজেটে টান পড়ে না।
কী মনে হচ্ছে? খামোকা বেসরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে গাল দেওয়া হচ্ছে? আচ্ছা মনে করে দেখুন তো, ২০১৭ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারী কলকাতার টাউন হলে একটা মিটিং হয়েছিল না? সেখানে মুখ্যমন্ত্রী বেসরকারী হাসপাতালের মালিকদের ডেকে খুব ধমকে দিয়েছিলেন। খামোকা পেশেন্টদের থেকে বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে, স্বাস্থ্য নিয়ে বিজনেস করবেন না, মানুষকে ঠকাবেন না, সরকার কড়া ব্যবস্থা নেবে ইত্যাদি। আচ্ছা কার বিরুদ্ধে কটা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে আজ অব্দি? তার চেয়েও বড় কথা মুখ্যমন্ত্রী সারা রাজ্যের সরকারী হাসপাতালের সুপারদের নিয়ে টাউন হলে কবে বসেছেন? কবে জানতে চেয়েছেন কী কী সমস্যা আছে, কিভাবে মেটানো যায়? অর্থাৎ এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না। মাঝেমধ্যে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত যেখানে যায় সেখানকার ব্যাপারে একটু হম্বিতম্বি করলাম — এই যথেষ্ট।
সরকারী হাসপাতালেও কি আর কিছু করব না? করব। জবরদস্ত গেট লাগাব, আলো লাগাব, নীল সাদা রঙ করব, সেগুলো মাঝেরহাট ব্রিজের মত সুরক্ষিত হবে। এর বেশি করা যাবে না। বেসরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার খদ্দেররা সরকারী হাসপাতালের দিকে চলে না যায় সেটা তো নিশ্চিত করতে হবে। হ্যাঁ, উন্মত্ত জনতা কখনো কখনো ওখানেও গিয়ে পেটাবে বটে। সে মারও তো ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মীরাই খাবে। সরকার আর মালিকপক্ষ মান্না দের মত গান গাইতেই পারে “তাতে তোমার কী? আর আমার কী?”
অতএব প্রিয় ডাক্তারকুল, আপনারা মানিয়ে নিন। এ দেশে ডাক্তারি করতে গেলে হয় কাফিল খান নয় পরিবহ মুখোপাধ্যায় হতেই হবে।
যাঁরা ডাক্তার নন তাঁরা খুব রাগ করছেন, তাই না? ভাবছেন “ডাক্তাররা যে কত বদমাইশি করে সেকথা তো একবারও বলল না? নার্সিংহোম আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবসা ফেঁদে লাল হয়ে যাচ্ছে কত ডাক্তার তা তো বলল না? এই যে সব চিকিৎসা বন্ধ করে দিয়ে বসে আছে, এটা কি উচিৎ কাজ? কোন অধিকার নেই অসুস্থ মানুষের সাথে এরকম করার।”
ঠিক কথা। কোন কোন ডাক্তার অত্যন্ত অসৎ। নানারকম চক্র তৈরি করে দু নম্বরী পয়সা করেন, সরকারী টাকাও মেরে দেন। ইঞ্জিনিয়াররাও করেন। ব্যবসায়ীরা করেন, রাজনীতিবিদরা করেন, সাংবাদিকদের কথা আর নিজ মুখে কী বলব? আজকাল এমনকি মাস্টাররাও করেন এসব। কিন্তু বাংলা অভিধানে প্রসঙ্গ বলে একটা শব্দ আছে। ইংরিজিতে যাকে বলে context। এন আর এসের ঘটনার প্রসঙ্গে অসাধু ডাক্তারদের কথা আসে না। অবশ্য আজকাল আর প্রসঙ্গ টসঙ্গ কে মানে? ভারতের বেহাল অর্থনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুললে তো উত্তর আসে “পাকিস্তান কো ঘর মে ঘুসকে মারা।”
রইল ডাক্তারদের অধিকারের কথা। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার তাঁদের অবশ্যই আছে। গোটা দেশে এই মুহূর্তে একটা অধিকারই স্বীকৃত — উন্মত্ত জনতার যা ইচ্ছে করার অধিকার। সকলকেই মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে ওটাই একমাত্র অধিকার নয়। বস্তুত ওটা আদৌ কোন অধিকার নয়, ওটা বরং অন্যের অধিকার হরণ।
আর আমাদের অসুবিধা? দুঃখজনক। কিন্তু হাসপাতালে লুম্পেনতন্ত্র চালু হতে দিয়ে ডাক্তার আর রোগীকে যুযুধান দুই পক্ষে স্থাপন করেছেন যিনি, এই বিবাদ মেটানোর দায়িত্ব তো তাঁর উপরেই বর্তায়। তিনি তো মূর্তি আর পাঁচতারা হোটেল উদ্বোধনে ব্যস্ত।

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

2 thoughts on “অনধিকার চর্চা”

  1. Aacha….bujhlam….j protibedok sob janen…..tini janen j jara BHMS ba BAMS poren….Tara aasole poren naa….Tara ku 5yrs ER course koren ni…ba hospital 1yr internship oo koren ni…..Tara sotti e nitanto faltu…1ta pathy k opore tulte gele to onyo gulo k nichu kortei Hobe….
    BHMS ER mane ta na bujhle Google kore neben plz….

  2. সবই ঠিক। কিন্তু বন্ধু, ডাক্তারবাবুদের প্রতিবাদ করার পদ্ধতি টা কি ঠিক ? এতে তো অনেক রুগীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার প্রয়াস। বিশেষ করে জেলার হাসপাতাল গুলিতে।

Leave a Reply