হুলিগানের গুঁতোয় যা যা টের পাওয়া গেল

তখন বাঙালির রাজনীতির সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি ছিল – জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্তেরা ধুন্ধুমার আন্দোলন করবেন। নিজেদের শিল্পের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দেবেন উৎপলবাবু বা মৃণাল সেনরা। এখন ডান, বাম নির্বিশেষে বাঙালির চাহিদা হয়েছে উলটো – শতরূপ, দিলীপদের স্টুডিওয় যেতে হবে। মিছিলে যেতে হবে অনির্বাণদের।

পশ্চিমবঙ্গের বই বাজারে সহায়িকা জিনিসটার বেশ বিক্রি আছে বোঝা যায়। কারণ প্রকাশকরা টিভিতে ওসব বইয়ের বিজ্ঞাপন দিতে টাকা খরচ করেন। ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসাবে নিয়ে আসেন মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম দশে থাকা ছেলেমেয়েদের। এদিকে এ রাজ্যের শিল্পীদের রোজগার ক্রমশ কমছে বলে খবর পাই। বাংলা সিনেমা, বাংলা নাটক, বাংলা গান – কোনোকিছুই যে আর লাভজনক ব্যবসা থাকছে না, তা তো আমরা অনেকেই এখন জেনে গেছি। কিন্তু পকেটে টান পড়লেও এবার থেকে সঙ্গীতশিল্পীদের গানের সহায়িকা প্রকাশ করা উচিত। গানের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে প্রত্যেক দর্শকের হাতে এক কপি করে সেই সহায়িকা ধরিয়ে দেওয়া উচিত। সেখানে কোন গানের কোন কথাটা আক্ষরিক অর্থে নয়, শ্লেষার্থে বলা; কোন লোকের নাম কেন নেওয়া হয়েছে, কার নাম কেন নেওয়া হয়নি, কোন ঘটনার উল্লেখ কেন এসেছে, শিল্পী অতীতে কোন ঘটনা নিয়ে গান বেঁধেছেন, কোনটা নিয়ে বাঁধেননি, না বাঁধলে কেন বাঁধেননি; কোন মিছিলে গেছেন আর কোন মিছিলে যাননি, না গেলে কেন যাননি – এসব পরিষ্কার করে লিখে দেওয়া উচিত। একজন শিল্পীর অনুষ্ঠান হলে এটুকু করলেই চলবে, কিন্তু গানের দল হলে দলের প্রত্যেক সদস্যের অতীতের কোন ঘটনায় কী মতামত ছিল তাও লিখে দিতে হবে। তবে এটুকু করাই যথেষ্ট নয়। অনুষ্ঠানের প্রচারের সময়ে এই সহায়িকার বিজ্ঞাপনও দিতে হবে। ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসাবে নিতে হবে রাজনৈতিক দলের নেতাদের। প্রত্যেকটা সহায়িকার বিজ্ঞাপনেই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে উপস্থিত সব দলের নেতাকে রাখতে হবে। নইলে নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে না। এইসব শর্ত মেনে গান না করলে বুঝতে হবে সংশ্লিষ্ট শিল্পী বা শিল্পীদের দল হয় চটিচাটা, নয় চাড্ডি, নইলে মাকু অথবা সেকু। কখনো কখনো তিনটের মধ্যে দুটো, বা একসঙ্গে তিনটেই।

এখানে দুটো আপত্তি উঠতে পারে।

১) গানের অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে বই কে পড়বে?

২) অনলাইনে কে কী বলল তাতে কী এসে যায়?

যে কোনো ফেসবুক-শিক্ষিত বাঙালিই ১ নম্বর প্রশ্নের উত্তরে জানিয়ে দেবেন যে ওটা অজুহাত, কোনো প্রশ্ন নয়। কেউ পড়বে কি পড়বে না সেটা ভাবার দায়িত্ব শিল্পীর নয়। শিল্পীকে আমাদের শর্তাবলী মানতে হবে। আমরা অত পড়বও না, সব গান মন দিয়ে শুনবও না। আমরা যারা টিকিট কেটে অনুষ্ঠান দেখতে যাইনি, তারা অনুষ্ঠানে পরিবেশিত গোটা আষ্টেক গানের মধ্যে গোটা একটা গানের ভিডিও-ও দেখব না অনলাইনে। দেখব সাড়ে তিন মিনিটের ভাইরাল হওয়া ক্লিপ, তারপর লিখব সাড়ে তিন হাজার শব্দের ফেসবুক-প্রবন্ধ। কারণ শিল্প যিনি বা যাঁরা সৃষ্টি করেন, যাবতীয় দায়িত্ব তাঁদেরই। শিল্পের রসাস্বাদন করতে কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষ যে মানসিক পরিশ্রম করে এসেছে, সেসব করার দায়দায়িত্ব আমাদের নেই। উৎকর্ণ হয়ে গান শোনার দায়িত্ব নেই, গানের কথাগুলো নিয়ে ভাবার দায়িত্ব নেই, যে কথাগুলো বলা হচ্ছে সেগুলো কেন বলা হচ্ছে, যেভাবে বলা হচ্ছে সেভাবেই বা কেন বলা হচ্ছে? এসব নিয়ে ভাবা আমাদের কাজ নয়। আমরা শুধু দেখব আমাদের পছন্দের কথা বলা হচ্ছে কিনা। হলে প্রশংসায় ভরিয়ে দেব, ফেসবুকে লাইক দেব, শেয়ার করব। অপছন্দের কথা হলে বলব ‘ছ্যাঃ! এটা গান?’, ‘একে প্রতিবাদ বলে?’, ‘রকের ভাষা স্টেজে উঠে বলে দিলেই শিল্প হয়?’ শ্লেষ বোঝার ধৈর্য না রেখে গান বা কৌতুকের স্রেফ আক্ষরিক অর্থ দেখেই চিল চিৎকার জুড়ে দেব ‘ইশ! নারীবিদ্বেষী কথা বলে চলে গেল, আর লোকে এই নিয়ে উল্লাস করছে!’

২ নম্বর প্রশ্নটা যে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে অবান্তর, তা নিয়ে বোধহয় বিতর্কের অবকাশ নেই। সোশাল মিডিয়া কেবল শিল্পচর্চার নয়, সাধারণ জীবনচর্যারই অবাঞ্ছিত কিন্তু অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে গেছে। যে কোনো শিল্পের জনপ্রিয়তা, তা থেকে আয় – অনেকটাই নির্ধারিত হচ্ছে জিনিসটা কতখানি ভাইরাল হল তার উপরে। ফলে কোনো শিল্পমাধ্যমই আজ আর অনলাইন প্রতিক্রিয়াকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। সিনেমা বা নাচগান, নাটকের ক্ষেত্রে আগে মুখে মুখে প্রচারের যে ব্যাপারটা ছিল, তা এখন প্রায় উঠে গেছে। যা ঘটে তা অনলাইনেই ঘটে। কোন ছবি দেখতে যাব, কাদের গান শুনতে যাব বা কোন নাটক দেখব – আমরা সকলেই ঠিক করি ফেসবুক রিভিউ পড়ে বা ইউটিউবে কেমন হিট হচ্ছে তাই দিয়ে। তাছাড়া অনলাইনে কে কী বলল তাতে যদি কিছু না-ই এসে যায়, তাহলে অনলাইনে ঘৃণাভাষণ বা মহিলাদের প্রতি লিঙ্গবিদ্বেষী মন্তব্য, ধর্ষণের হুমকি দেওয়া নিয়ে আমরা আপত্তি করি কেন?

বলা বাহুল্য, এতগুলো কথা উঠে আসছে গত কয়েক দিনে মিলনমেলা প্রাঙ্গণে একাধিক ব্যান্ডের এক অনুষ্ঠানে হুলিগানইজম ব্যান্ডের একখানা গানের কিয়দংশ নিয়ে তৈরি হওয়া উত্তেজনা সম্পর্কে।

সাড়ে তিন মিনিটের ওই ভিডিওর ভাইরাল হওয়া প্রমাণ করে, যাবতীয় ডানপন্থী ও বামপন্থী আপত্তি সত্ত্বেও বহু মানুষের ওই পরিবেশনা ভাল লেগেছে। লাগারই কথা, কারণ আজকের পশ্চিমবঙ্গে যেসব কথা সাধারণ মানুষ আলোচনা করেন ফিসফাসে, সেসব কথা হুলিগানইজম মঞ্চে দাঁড়িয়ে গলা তুলে বলে দিয়েছে। এই বাংলায় যাঁরা ঠিক করেন কোনটা গান, কোনটা প্রতিবাদ, কোনটা সিনেমা; যাঁদের সম্পর্কে নচিকেতা সেই বাম আমলে লিখেছিলেন “সংস্কৃতির গ্রাফ উঠছে না নামছে/ফিতে দিয়ে মাপছেন তাঁরা”, সেইসব লোক ও মহিলাদের চোখে ওটা গান না-ই হতে পারে, প্রতিবাদও না হতে পারে। কিন্তু যে মফস্বলের টোটোচালক এই আমলেও সিপিএম করেন আর নিয়মিত কুণাল ঘোষের দলের কর্মীদের কাছ থেকে হাতে ও ভাতে মরার হুমকি শোনেন, তিনি দেখছেন তাঁর কথা একটা গানের দল কলকাতা শহরের বুকে ঝলমলে মঞ্চে উঠে বলে দিয়েছে। যে সিপিএম করা বাসচালক নিজে বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেননি, ভেবেছিলেন ছেলেকে অনেকদূর পড়াবেন অথচ দেখছেন স্কুল-কলেজের বারোটা বেজে গেছে, এদিকে কেন্দ্রের শাসক দলের নেতা গরুর দুধে সোনার তত্ত্ব দিচ্ছেন, পাশের পাড়ায় বাচ্চাদের শেখানো হচ্ছে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার সময়ে এগারো হাজার হিন্দু মারার গালগল্প – তিনি নিজের ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। তিনি দেখছেন, একটা জনপ্রিয় মুখ গরুর দুধে সোনার তত্ত্ব দেওয়া সাম্প্রদায়িক নেতাকে হাসির পাত্র করে দিচ্ছে। ভাবছেন যদি তাতে ছেলেপুলেদের উপর একটু প্রভাব পড়ে।

শতরূপ ঘোষের বাবুয়ানি নিয়ে দু-চার কথা বললে এঁদের কিচ্ছু এসে যায় না, বরং হয়ত ভালই লাগে। কারণ বামপন্থী দলের সংস্পর্শে এসে যদি তাঁরা একটা জিনিসও শিখে থাকেন তা এই, যে লোকে কপালের দোষে গরিব হয় না। দুনিয়ায় বড়লোক আছে বলেই গরিব আছে। সে বড়লোকের টাকা আইনি পথেই আয় করা হোক বা বেআইনি পথে।

কথাটা আলালের ঘরের দুলাল সিপিএমদেরও শেখার কথা ছিল, কিন্তু হুলিগানইজমের হুল্লোড়ে তাঁদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে না পার্টির পক্ষ থেকে শেখানো হয়েছে। ফলে এক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটছে গত কয়েক দিন ধরে। যে নেতাকে নিয়ে টিপ্পনী কাটা হয়েছে, তিনি ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেননি। অথচ সমর্থকদের ক্রোধ আর ফুরোচ্ছে না। নেতা বুদ্ধিমান, তিনি একবার, আমার বাবার টাকায় আমি গাড়ি কিনেছি বেশ করেছি – এই মর্মে আস্ফালন করেই সম্ভবত বুঝে গেছেন যে কমিউনিস্ট পার্টি করে ওকথা বলা চলে না। কিন্তু বিদেশে ছুটি কাটাতে যাওয়া, দামি গাড়ি চড়া ভক্তবৃন্দের এ যে অস্তিত্বের সংকট। যে ভোগে আপাদমস্তক ডুবে আছেন, তা কমিউনিস্টসুলভ নয় – এ বার্তা দিকে দিকে রটি গেলে বামপন্থী হওয়ার রেলাটি বজায় রাখা যে শক্ত হয়ে যাবে। মঞ্চের হুলিগানরা যেভাবে তাঁদের নেতাকে নিয়ে খিল্লি করল, তাতে সাহস পেয়ে যদি গরিব নিম্নবিত্ত বামপন্থীরা এঁদের নিয়ে খিল্লি করতে শুরু করে! এই আতঙ্কেই ‘ওটা কোনো গান নয়’, ‘ওটা প্রতিবাদ হয়নি’, ‘ওই আক্রমণে হুল নেই’ ইত্যাদি বাণী সাড়ে তিন দিনে সাড়ে তিন লক্ষ বার সোশাল মিডিয়ায় লেখা, সাড়ে তিন কোটি শেয়ার করা নয় তো? কিছুই যখন হয়নি, তখন রিমের পর রিম এ নিয়ে লেখার দরকার কী? যাদের জিনিসটা ভাল লেগেছে তাদের দিকে তেড়ে যাওয়ার দরকারই বা কী?

ব্যাপারটাকে খিস্তি খেউড় বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা যাঁরা করছেন, তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন – এটা বাংলা। এখানে কবির লড়াই, তরজা, খেউড়ও খাঁটি দিশি সংস্কৃতি। হুলিগানইজমের অন্যতম প্রধান গায়ক অনির্বাণ ভট্টাচার্য নাহয় ‘গরিবের উত্তমকুমার’ (এই অভিধার প্রকট সাহেবিয়ানা এবং গরিবের সংস্কৃতিকে নিকৃষ্ট বলার প্রচ্ছন্ন বাবুয়ানিটি কি বামপন্থী?), শতবর্ষে পা দেওয়া আসল উত্তমকুমারের এন্টনী ফিরিঙ্গী (১৯৬৭) দেখলেই ব্যাপারটা জানা যায়। অবশ্য শহুরে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত বামপন্থীদের অনেকে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের বাইরে বাংলা ছবি দেখেননি। ফলে তাঁরা না-ও জানতে পারেন। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে কীভাবে প্রতিবাদের ভাষা এবং ভাষ্য পালটে ফেলছেন শিল্পীরা; শিল্পমাধ্যম এবং সাংবাদিকতার সীমারেখা কীভাবে প্রায়শই মুছে যাচ্ছে – সেটুকু তো জানা উচিত। বামপন্থী নেতাদের থেকে সাধারণ জীবনযাপন আশা করা অনুচিত – এমনটা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হচ্ছে। এরপর কি শুনতে হবে তাঁদের কাছে আন্তর্জাতিক চেতনাও আশা করা উচিত নয়? নাকি সেটা বছর বছর ১ সেপ্টেম্বরের মিছিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মেনে নিতে হবে?

চলতি বামাবেগের অরাজনৈতিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে যায় হুলিগানইজমের পরিবেশনা নিয়ে ডানপন্থী আপত্তির দিকে তাকালে। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষকে নিয়ে টিপ্পনী কাটা হয়েছে, তিনি প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন – বাকস্বাধীনতা আছে বলেই যা খুশি বলা যায় না। অথচ তাঁর দলের আইনজীবী নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি হুলিগানইজম, এবং দুই তাদের প্রধান গায়কের অন্যতম, অনির্বাণের নামে পুলিসে যে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন তা কিন্তু দিলীপের প্রতি কটূক্তি নিয়ে নয়, সনাতন ধর্ম সম্পর্কে অন্য একটা টিপ্পনীর জন্য। সোশাল মিডিয়ার ডানপন্থীদেরও ওই সাড়ে তিন মিনিট নিয়ে আপত্তির কারণ সনাতন সম্পর্কে রসিকতা – যা ভারতের দক্ষিণপন্থী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ব্যক্তি নেতাকে নিয়ে তাঁরা ভাবিত নন। অথচ বামেরা উত্তেজিত শতরূপের গাড়ির মান বাঁচাতে। তাহলে কি নেতা আর পার্টি অভিন্ন এঁদের কাছে? যেমন হিন্দুত্ববাদীদের কাছে ২০২৪ নির্বাচনের আগে পর্যন্তও নরেন্দ্র মোদী আর বিজেপি অভিন্ন ছিলেন? শতরূপ কি এত বড় নেতা? যদি তা-ই হয়, তাহলে আবার ‘সাহস থাকলে মহম্মদ সেলিমকে আক্রমণ করতে পারত, সফট টার্গেট বেছেছে’ – এমন কথা উঠছে কেন? যে নেতার এত অনুরাগী, তিনি ‘সফট টার্গেট’ হন কী করে? আর যদি ‘সফট টার্গেট’-ই হন, তাহলে তাঁকে নিয়ে সামান্য একটা গানের দলের টিপ্পনীকে পার্টির প্রতি আক্রমণ বলে ভেবে ফেলা কেন? তৃণমূল সরকার যখন খামোকা মীনাক্ষী মুখার্জিকে হাজতবাস করাল, তখন এর অর্ধেক উৎসাহ নিয়ে সিপিএমের এই সদস্য সমর্থকরা তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে গেলেও বোধহয় সরকারের হৃদকম্প হয়ে যেত, তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হত। তা তো করা হয়নি। তাহলে ‘সফট টার্গেট’ আসলে কে? শতরূপ না মীনাক্ষী? বামেরা বলছেন হুলিগানদের অন্য দুই টার্গেটও ‘সফট’। হয়ত ঠিকই বলছেন, কারণ কুণাল আর দিলীপকে নিয়ে তাঁদের পার্টির সদস্য, সমর্থকরা কিন্তু এত হইচই করলেন না।

এইবার যে যুক্তিটা উঠে আসা অনিবার্য, সেটা শিল্প সম্বন্ধে নয়, শিল্পী সম্বন্ধে। শিল্পীর অধিকার সম্বন্ধে বললেও ভুল হয় না। নিশ্চয়ই বলা হবে, হুলিগানইজম বলে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। আসল হল অনির্বাণ। তিনি সুবিধাবাদী, তিনিই চটিচাটা, তিনিই আর জি কর আন্দোলন নিয়ে চুপ ছিলেন, তিনিই শিক্ষা দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেননি। এখন তিনি জ্ঞান দিলে শুনতে হবে?

এ থেকেও বামপন্থীদের সম্বন্ধে ভারি মজার কিছু কথা টের পাওয়া যাচ্ছে। দক্ষিণপন্থীদের আক্রমণের তির অনির্বাণের উপর স্থির থাকার কারণ সহজবোধ্য। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সনাতন নিয়ে রসিকতা তিনিই করেছেন। শতরূপ ঘোষকে নিয়ে রসিকতা কিন্তু তাঁর মুখ দিয়ে বেরোয়নি। অন্য দুই ঘোষকে নিয়ে তিনি ফুট কাটলেও, শতরূপকে নিয়ে ছড়া কেটেছেন দেবরাজ ভট্টাচার্য। অথচ তিনি চটিচাটা – এমন অভিযোগ কেউ তুলছেন না। এ বোধহয় ব্যক্তির ঊর্ধ্বে দল – মার্কসবাদের এই প্রাথমিক পাঠ ভুলে মেরে দেওয়ার ফল। বস্তুত, ব্যাপারটাকে শতরূপ বনাম অনির্বাণ বানিয়ে ফেলা বামেদের বয়ান দেখে মনে হচ্ছে না তাঁরা কেউ জানেন যে গানগুলো ‘অনির্বাণের গান’ নয়, ব্যান্ডটার গান। এমনও হতে পারে, ওই গা জ্বালানো ছড়াগুলো অনির্বাণের লেখাই নয়। সেক্ষেত্রে ব্যান্ডের বাকিদের তৃণমূলী সংযোগের ফর্দ দেওয়াও কর্তব্য ছিল। অথচ হুলিগানদের উপর রেগে কাঁই হয়ে যাওয়া জনপিণ্ডের কতজন ওই ব্যান্ডের বাকি সদস্যদের নাম বলতে পারবেন তা নিয়েই সন্দেহ আছে। কেবল গৌরবে বহুবচন করা তো ঠিক নয়, তাই হুলিগানইজমের বাকি সাতজনের নাম এইবেলা স্মরণ করে নেওয়া যাক – শুভদীপ গুহ, কৃশানু ঘোষ, সোমেশ্বর ভট্টাচার্য, নীলাংশুক দত্ত, প্রীতম দাস, প্রীতম দেব সরকার, সুশ্রুত গোস্বামী।

সে যা-ই হোক, ওই দলের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ যখন অনির্বাণ, তখন তাঁকেই আক্রমণ করার যুক্তি ভুল নয়। অনির্বাণের বিজেপির লোক হওয়ার প্রমাণ হাজির করতে না পারলেও, তৃণমূলের পক্ষের লোক হওয়ার প্রমাণ হাজির করেছেন সোশাল মিডিয়ার বীরপুঙ্গবরা। তিনি খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির হাত থেকে সরকারি সম্মান গ্রহণ করেছেন। এ একেবারে বামাল সমেত ধরা পড়া যাকে বলে। মুশকিল হল, সরকার আর দলের ভেদরেখা মুছে যাচ্ছে বলে এ রাজ্যের বিরোধীরা সঙ্গতভাবেই চেঁচামেচি করে থাকেন। কিন্তু সরকারি সম্মানকে এক্ষেত্রে তৃণমূল দলের দেওয়া সম্মান বলে ধরে নিতে একটুও ইতস্তত করছেন না। যদি তাও হয়, তাহলে একই যুক্তিতে প্রয়াত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কেও তৃণমূলের লোক বলতে হয়। কারণ শেষ বয়সে তিনিও রাজ্য সরকারের দেওয়া বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার (২০১৭) গ্রহণ করেছিলেন। সুখের বিষয়, তেমনটা কোনো সিপিএম সদস্য সমর্থক আজ পর্যন্ত বলেননি। আমৃত্যু সৌমিত্র প্রকাশ্যেই বামপন্থী ছিলেন, তাঁর সেই সম্মান আজ পর্যন্ত কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা বামপন্থীরা করেননি। ফলে গুটিটা গোড়াতেই কেঁচে যাচ্ছে।

অনেকের অবশ্য সূক্ষ্মতর বক্তব্য আছে। অনির্বাণ তৃণমূলী নন, কিন্তু সুবিধাবাদী। কারণ তিনি আর জি কর আন্দোলনে যোগ দেননি। পশ্চিমবাংলার এত বড় নিয়োগ কেলেঙ্কারির কথা তাঁদের ব্যান্ডের গানে নেই। কেন আর জি কর আন্দোলনে যোগ দেননি, তার ব্যাখ্যা অনির্বাণ ইতিমধ্যেই বহুবার দিয়েছেন। সে ব্যাখ্যা কেউ অবিশ্বাস করতেই পারেন, বিশ্বাস করলেও অপছন্দ করতে পারেন। কিন্তু সমস্যা অন্য। যে কোনো ব্যক্তিরই নিন্দা করা যেতে পারে কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ না করার জন্যে। কিন্তু পরবর্তীকালে কোনো বিষয়ে তিনি কথা বললেই ‘তখন কথা বলেননি, অতএব এখনো চুপ করে থাকতে হবে’ – এই দাবি প্রথমত বনলতা সেনগিরি, দ্বিতীয়ত গা জোয়ারি। এতে মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার ইচ্ছাই প্রকাশ পায়। শেষ বিচারে সেটা দক্ষিণপন্থাই।

এটাই বা কীরকম আবদার, যে একজন শিল্পীর শিল্পকে বিচার করতে হবে তিনি শিল্পের বাইরে কী করেছেন বা করেননি তা দিয়ে? আমি জানি অমুক ডাক্তার চমৎকার পেটের চিকিৎসা করেন। আমার পেটের অসুখ দীর্ঘদিন ধরে সারছে না, হাজারটা ডাক্তার দেখিয়ে হয়রান হয়ে গেছি, তবু তাঁর কাছে যাব না, যেহেতু তিনি বিবাহ বহির্ভূত প্রেম করেন? এরকম হাস্যকর যুক্তিতে আর কোন জিনিসটা করি আমরা? শিল্পীদের নিয়ে ভাবতে গেলেই আমাদের এরকম ভাবনার উদয় কেন হয় – তা নিয়ে বোধহয় রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিএইচডি করানোর ব্যবস্থা করা উচিত এবার।

পৃথিবীর যে কোনো দেশে, যে কোনো কালে শিল্পীদের প্রধান কাজ ক্ষমতাবানের ত্রুটি ধরা, শাসককে এবং সমাজকে নিয়ে বিদ্রুপ করা। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, আন্দোলনে অনুপ্রেরণা দেওয়া। আন্দোলনে নামলে ভাল, না নামলে মহাপাপ হয় না। আন্দোলন করা রাজনীতির লোকেদের কাজ। শিল্পীরা চাইলেই যে আন্দোলন করতে পারবেন তাও নয়। সবাই রবীন্দ্রনাথ হন না যে স্বয়ং স্বদেশি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবেন। লক্ষণীয়, সে আন্দোলন থেকে তিনি আবার বেরিয়েও এসেছিলেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, ওই আন্দোলনে সত্যের চেয়ে ভান বেশি। এই সিদ্ধান্তের কারণে তাঁকে তখনকার জাতীয়তাবাদীদের বিষনজরেও পড়তে হয়েছিল। তারপরেও হিজলি জেলে বন্দিহত্যা নিয়ে তিনি ‘প্রশ্ন’ কবিতাটা লিখেছেন। সে কবিতায় না আছে হিজলি জেলের নাম, না আছে ইংরেজ সরকারের উল্লেখ। এখন হলে নির্ঘাত তাঁকে শুনতে হত ‘ওসব চালাকি। দম থাকলে গভর্নর জেনারেলের নাম করে লিখত।’ ভাগ্যিস তখনকার বাঙালির সহায়িকা দরকার হত না!

কদিন আগেই উৎপল দত্তের জন্মদিন গেছে। তিনি ঘোষিত বামপন্থী, আমৃত্যু সিপিএম দলের ঘনিষ্ঠ, নাট্যজগতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য এবং মঞ্চে তাঁর সব কাজই রাজনৈতিক। কিন্তু গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ দেখে সন্দেহ হচ্ছে – তাঁর জন্মদিনকে ব্যবহার করে যাঁরা ফেসবুক পোস্টে লিখছিলেন উৎপলবাবুর মেরুদণ্ড ছিল, আজকের শিল্পীদের নেই, উৎপলবাবুকে আজ পেলে তাঁকেও মেরুদণ্ডহীন বলতেন। কারণ তিনি রোজগারের জন্যে জনপ্রিয় হিন্দি বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। এমনকি প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র তো লিখেছেন, নাটক করার অপরাধে কংগ্রেস আমলে কারারুদ্ধ উৎপলকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন বম্বের কোনো ছবির প্রযোজক, যাতে তাঁর শুটিং নষ্ট না হয়। এই লোকের কল্লোল বা দুঃস্বপ্নের নগরী যতই সরাসরি রাজনৈতিক হোক, আজকের কমরেডরা কি আর পাত্তা দিতেন? তখন বাঙালির রাজনীতির সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি ছিল – জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্তেরা ধুন্ধুমার আন্দোলন করবেন। নিজেদের শিল্পের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দেবেন উৎপলবাবু বা মৃণাল সেনরা। এখন ডান, বাম নির্বিশেষে বাঙালির চাহিদা হয়েছে উলটো – শতরূপ, দিলীপদের স্টুডিওয় যেতে হবে। মিছিলে যেতে হবে অনির্বাণদের।

আরও পড়ুন অনির্বাণ কাজ পাচ্ছেন না: টালিগঞ্জের অর্ধসত্য বা হিমশৈলের চূড়া

এই উলটো বুঝলি প্রজার দেশে গানের দলের সমালোচনায় তাদের গান নিয়ে আলোচনা হবে না। হুলিগানইজমের এর আগে প্রবল ভাইরাল হওয়া ‘মেলার গান’-এর রাজনীতি আজ পর্যন্ত খেয়াল করার সময় সুযোগ পাননি বামপন্থীরাও। অনির্বাণের সমালোচনা করতে হলেও তাঁর কাজের সমালোচনা করা হয় না। হয় তিনি কাকে বিয়ে করেছেন আর কাকে করেননি তা দিয়ে সুবিধাবাদী প্রমাণের চেষ্টা, নয় কোন মিছিলে গেছেন আর কোন মিছিলে যাননি তা নিয়ে ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকারদের মত গ্রাফিক বিশ্লেষণ। এসব আলোচনার সিদ্ধান্ত আগে থেকেই স্থির থাকে। নইলে ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে অনির্বাণ নির্দেশিত মন্দার সাম্প্রতিককালের বাংলা বিনোদন জগতের সবচেয়ে রাজনৈতিক দুটো ওয়েব সিরিজের অন্যতম (অন্যটা প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য নির্দেশিত বিরহী)। মন্দারে গোড়াতেই একটা রাজনৈতিক হত্যা দেখানো হয়, যিনি খুন হন তিনি একজন বামপন্থী শ্রমিক নেতা। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিন্দুমাত্র ধোঁয়াশা রাখা হয়নি। তাছাড়া বাংলা ছবির ইতিহাসে একটা অভূতপূর্ব ঘটনা গতবছর ঘটিয়েছেন অর্ণ মুখোপাধ্যায় আর অনির্বাণ। তাঁদের যুগ্ম নির্দেশনায় মুক্তি পেয়েছে অথৈমঞ্চসফল নাটক থেকে করা এই ছবিতে পশ্চিমবাংলার ভদ্রলোকদের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে দেখানো হয়েছে তাদের জাতপাতের বাছবিচার কত ভয়ঙ্কর।

তালিকা দীর্ঘতর করা যায়, তবে লেখা দীর্ঘতর করে লাভ নেই। কারণ একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের মনোযোগের আয়ু মাত্র আড়াই মিনিট। কিন্তু এই ভাবনা পীড়াদায়ক যে সংস্কৃতি আর রাজনীতি নিয়ে চিরকাল কলার তোলা বাঙালির এখন ভোট চুরি, ভোটার তালিকার আসন্ন বিশেষ নিবিড় সংশোধনী, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাঙালি বিতাড়ন নিয়ে দিনরাত উত্তেজিত থাকার কথা ছিল এবং সব দলের নেতাদের ব্যতিব্যস্ত করে রাখার কথা ছিল। অথচ বাঙালিদের একটা অংশ মেতে আছে থিয়েটার ও সিনেমার একজন জনপ্রিয় শিল্পীর যাবতীয় কাজ নস্যাৎ করে দিতে, যেহেতু তাঁর গানের দল তাদের আদুরে নেতার ত্রুটি তুলে ধরেছে। দেখছি, মেলার গানে যথার্থই লেখা হয়েছে ‘আমাদের জীবনতলায় মোটরগাড়ি ঘুরছে মরণকুয়ায়…’।

ইনস্ক্রিপ্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

নির্মম সরকার, অনশন এবং কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন

তৃণমূল সরকার কেন, কোনো দলের সরকারই এই যুগে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে কিনা সন্দেহ। একজন বিশেষজ্ঞ হয়ত সরকারি কলেজের শূন্য পদে যোগ দিলে যা বেতন পাবেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বেতন পাবেন কর্পোরেট হাসপাতালে যোগ দিলে।

হপ্তা তিনেক আগে কলকাতায় এসেছিলেন ডাঃ কাফিল খান। সেই কাফিল, যিনি আদিত্যনাথশাসিত উত্তরপ্রদেশে নিজের পেশাগত দায়িত্বের ঊর্ধ্বে উঠে পকেটের পয়সা দিয়ে মরণাপন্ন শিশুদের জন্য অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে গিয়েছিলেন। অথচ সেই শিশুদের মৃত্যুতে তাঁকেই অপরাধী সাজিয়ে কারাবাস করিয়েছিল উত্তরপ্রদেশ সরকার। কাফিল কলকাতায় এসে আর জি কর হাসপাতালে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার নিন্দা করে আন্দোলনকারীদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন, ঘটনাটাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টারও নিন্দা করেছেন। কিন্তু সঙ্গে আরও কিছু কথা বলেছেন, যার বাংলা তরজমা করলে এরকম দাঁড়ায় – ‘চলতি প্রতিবাদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রশংসা প্রাপ্য, কিন্তু আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ক্রুদ্ধ ডাক্তারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং তাঁদের দাবি মেনে নিতে রাজি হয়েছিলেন। আপনারা এখন যতই রেগে থাকুন, দয়া করে বোঝার চেষ্টা করুন যে আজও বাংলায় নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করার, প্রতিবাদ করার পরিসর আছে। এটা উত্তরপ্রদেশ হলে সমস্ত প্রতিবাদীকে জেলে পোরা হত আর তাদের নামে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা ঠুকে দেওয়া হত।’

কাফিলের দোষ নেই। তিনি এ রাজ্যের মানুষ নন, রাজনীতির লোকও নন। ফলে এখানকার আন্দোলনের ইতিহাস বা তৃণমূল কংগ্রেস আমলে আর কী কী ঘটেছে – সেসব জানা তাঁর থেকে প্রত্যাশিত নয়। উপরন্তু দেশের বেশিরভাগ মানুষের বাংলা না জানা এবং এ রাজ্যের ইংরিজি জানা মানুষের বিজেপি-বিরোধিতা এবং/অথবা সিপিএম-বিদ্বেষের সুযোগ নিয়ে মমতা ব্যানার্জির সরকার সফলভাবে নিজেদের যাবতীয় কুকীর্তি বাকি ভারতের কাছে ঢেকে রাখতে সমর্থ হয়েছে। ফলে কাফিলের কানে নিশ্চয়ই এ খবর পৌঁছয়নি, যে এ রাজ্যেও সরকারবিরোধীদের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার দৃষ্টান্ত আছে।

মনে হয় না কাফিলকে যাঁরা কলকাতায় এনেছিলেন তাঁরা আনিস খানের কথাও জানিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে কোনো দাবিতে কেউ সামান্যতম প্রতিবাদ করলেই শাসক দল সেই প্রতিবাদকে মানুষের চোখে হেয় করার চেষ্টা করে রাজনীতির জুজু দেখিয়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এতদিন বলা হত ‘এর পিছনে বিজেপি আছে’। যেহেতু আর জি কর আন্দোলনে বিজেপি বহু চেষ্টা করেও পা রাখতে পারেনি এবং সকলেই টিভির পর্দায় লাইভ দেখে নিয়েছেন যে অভিজিৎ গাঙ্গুলির মত বিজেপি নেতা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করলে কীভাবে তাঁদের বিতাড়িত করেছেন আন্দোলনকারীরা; সেহেতু এখন বলা হচ্ছে, এই আন্দোলনের পিছনে সিপিএম আছে, অতিবাম শক্তি আছে। যেন এরা সব নিষিদ্ধ সংগঠন অথবা সংবিধানে লেখা আছে বিরোধীরা কোনো আন্দোলনে মদত দিতে পারবে না। কিন্তু সে বিতর্কে না গিয়ে ভাবা যাক যে আনিস তো বিজেপি, সিপিএম বা কংগ্রেস করতেন না। তবু প্রতিবাদী হওয়ার অপরাধে তাঁকে মরতে হয়েছে এবং বহু আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই সত্ত্বেও তাঁর পরিবার আজও বিচার পায়নি। বর্তমান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্যেও পুলিস অনেককে বাড়ি গিয়ে হুমকি দিচ্ছে, ভয় দেখাচ্ছে বলে খবরে প্রকাশ। নৈহাটির মত শারীরিক আক্রমণের কথা না-ই বা বললাম। ফলে পশ্চিমবঙ্গ প্রতিবাদের মরুদ্যান – এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।

মমতা প্রতিবাদীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এই প্রথম যাননি। ২০১৪ সালের হোক কলরব আন্দোলনও শেষ হয়েছিল তিনি শেষপর্যন্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দেখা করে তৎকালীন উপাচার্যকে সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা করার পরে। ২০১৯ সালেও লোকসভা নির্বাচনের মুখে স্কুলশিক্ষকের চাকরির দাবিতে প্রেস ক্লাবের সামনে অনশনে থাকা ছেলেমেয়েদের কাছে মমতা গিয়েছিলেন আন্দোলন তুলে নেওয়ার অনুরোধ নিয়ে। কিন্তু দুবারই সেটা করেছিলেন আন্দোলন দমন করতে না পেরে, শেষে নিরুপায় হয়ে। এর কৃতিত্ব আন্দোলনকারীদের, এর জন্যে মুখ্যমন্ত্রীকে মমতাময়ী আখ্যা দিলে সত্যের অপলাপ করা হয়। এবারেও মমতা নানা টালবাহানার পরে জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন অনন্যোপায় হয়ে। গত ১৬ সেপ্টেম্বরের সেই বৈঠকের পর মমতার যাবতীয় ঘোষণা এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও ডাক্তাররা একাধিক হাসপাতালে আক্রান্ত হয়েছেন। তার পরিণামেই চলতি অনশন। ইতিমধ্যে শেঠ সুখলাল কারনানি মেমোরিয়াল হাসপাতালে (এসএসকেএম) দুদল দুষ্কৃতীর মারামারিতে এক রোগীর আত্মীয়ও আহত হয়েছেন। সুতরাং এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জেলে পোরেন না, আলোচনা করেন – এই সন্তোষ হাস্যকর। তেমনই হাস্যকর মুখ্যমন্ত্রীর ধূর্ততা বুঝতে না পারা। সমাধান করতে আলোচনা করা আর ধামাচাপা দিতে আলোচনা করা – দুটোই একইরকম প্রশংসাযোগ্য হতে পারে না। ২০১৯ সালে ভোট মিটলেই চাকরি হবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে মমতা যে শিক্ষক পদপ্রার্থীদের ২৯ দিনের অনশন প্রত্যাহার করিয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশ আজও যে তিমিরে সেই তিমিরেই আছেন।

বস্তুত, কোনো প্রতিবাদ, কোনো আন্দোলনকে পাত্তা না দেওয়াই তৃণমূল সরকারের ট্রেডমার্ক। আরও অনেককিছুর মত, এখানেও কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সঙ্গে মিল। নরেন্দ্র মোদীও ভেবেছিলেন কৃষকদের পাত্তা দেবেন না। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদে তিনটে কৃষি আইন পাস করিয়ে নিয়েছেন, প্রয়োগ করা ঠেকায় কে? চাষাভুষোরা থাক না রাস্তায় বসে। পাত্তা না দিলেই হল। উলটে তাদের পথে ব্যারিকেড বসিয়ে দাও, কংক্রিটের দেওয়াল তুলে দাও, রাস্তায় আক্ষরিক অর্থে কাঁটা বিছিয়ে দাও। দিল্লির প্রচণ্ড ঠাণ্ডা সহ্য করতে না পেরে একসময় সুড়সুড় করে বাড়ি চলে যাবে। কিন্তু তা ঘটেনি। কৃষকরা মাঠেঘাটে কাজ করে অভ্যস্ত। পাঞ্জাবের ধনী কৃষকরাও নিজের জমিতে গায়ে গতরে খাটেন। ফলে শারীরিক কষ্ট তাঁদের অত সহজে কাবু করতে পারে না, যতটা বাঙালি ভদ্রসন্তানদের পারে। তার চেয়েও বড় কথা, সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন পাকা মাথার অভিজ্ঞ আন্দোলনকারীরা। তাঁরা যেমন আক্রমণাত্মক হতে জানেন, কখন পিছিয়ে আসতে হয় তাও জানেন। ফলে সেই আন্দোলন জয়যুক্ত হয়েছিল। মোদী দিল্লি সীমান্তে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি বটে, কিন্তু তাঁর সরকারকে মাথা নোয়াতে হয়েছিল, আইনগুলো প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। বিজেপির সদস্য, সমর্থক ছাড়া কেউ তার জন্যে মোদীর প্রশংসা করে না। বলে না যে আজও ভারতের নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করার, প্রতিবাদ করার পরিসর আছে। ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে প্রথমে পাত্তা না দিয়ে তারপর প্রতিবাদের সামনে মাথা নোয়ানোর জন্যে, কখনো বা মিথ্যা আশ্বাস দেওয়ার জন্যে শাসকের প্রশংসা করার ন্যাকা রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া ভারতের আর কোথাও চলে না।

কিন্তু যেহেতু কৃষক আন্দোলনের কথা এসে পড়ল এবং পশ্চিমবঙ্গ যেহেতু ভারতের বাইরে নয়, সেহেতু চলমান আন্দোলনের ত্রুটিগুলোর দিকেও দৃষ্টি না দিয়ে উপায় নেই। শনিবার দুপুরে মুখ্যসচিবের ফোনে অনশনকারীদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর কথা এবং সোমবার বৈঠকের পরে হয়ত এই অনশন শিগগির উঠে যাবে। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে এই আলোচনা প্রয়োজন।

#

আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তাররা শুক্রবার সিনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে বৈঠক করে ঘোষণা করেছিলেন, আগামী সোমবারের মধ্যে সরকার তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসে দশ দফা দাবি পূরণ না করলে মঙ্গলবার তাঁরা সর্বাত্মক ধর্মঘট করবেন। কোনো সন্দেহ নেই, সরকার তাঁদের দাবিগুলোতে মোটেই আমল দেয়নি। আর জি করের ঘটনার পর প্রথম দিকে ঘটনাপ্রবাহকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসার যে রাজনৈতিক প্রচেষ্টা দেখা গিয়েছিল তৃণমূলের তরফে (যার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত মুখ্যমন্ত্রীর বিচার চেয়ে রাস্তায় নেমে পড়া), এখন আর তাও দেখা যাচ্ছে না। প্রায় সবটাই টিভি স্টুডিও আর সোশাল মিডিয়া থেকে আন্দোলনকারী ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কুৎসা ছড়ানোয়, হুমকি দেওয়ায় সীমাবদ্ধ। স্থানীয় স্তরেও তৃণমূল দলের কোনো কর্মসূচি নেই এই আন্দোলনকে ভ্রান্ত প্রমাণ করার জন্যে অথবা দাবিগুলোকে অসার প্রমাণ করার জন্যে। এর দুটো কারণ থাকতে পারে – ১) তৃণমূল মনে করছে এই আন্দোলন তাদের বৃহত্তম ভোটার গোষ্ঠীর মধ্যে কোনো প্রভাব ফেলছে না। অতএব ছেলেমেয়েগুলো না খেয়ে মরুক গে; কিছু এসে যায় না। ২) এই দশ দফা দাবি পূরণ করার ক্ষমতা সরকারের নেই। উদাসীনতার ভান না করলে কথাটা সর্বসমক্ষে প্রকাশ হয়ে যাবে। তাই উচ্চবাচ্য করা হচ্ছে না।

প্রথম সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়, যতই অমানবিক হোক। ২০২৪ সালে এসেও এই সরকারের কাছে মানবিকতা আশা করার কোনো মানে হয় কি? যে সরকার বারবার ধর্ষণের মত ঘটনাকে ছোট্ট ঘটনা, প্রেম ছিল, খদ্দেরের সঙ্গে যৌনকর্মীর দরাদরি নিয়ে ঝামেলা ইত্যাদি বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তারা আজ হঠাৎ মানবিক হবে কী করে? আর মানবিক নয় বলেই ডাক্তারদের আমরণ অনশনে বসার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। এ হল ব্রহ্মাস্ত্র। আর কে না জানে, ব্রহ্মাস্ত্র রেখে দিতে হয়ে শেষ যুদ্ধের জন্য। যখন অন্য সব অস্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায়, তখন তূণ থেকে বার করতে হয়। এক্ষেত্রে আন্দোলনের সেই অবস্থা হয়েছিল কি? যতদিন কর্মবিরতি চালু ছিল, ততদিন তবু শাসক দল ডাক্তারদের গণশত্রু হিসাবে দাগিয়ে দেওয়ার মত কিছু পাচ্ছিল। কারণ সরকারি হাসপাতালে গরিব মানুষ সম্পূর্ণ পরিষেবা পাচ্ছিলেন না, তার কাঠামোগত ত্রুটির কারণ আড়াল করে গোটা দোষটা ডাক্তারদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যাচ্ছিল। এই আন্দোলনের পিছনে বেসরকারি হাসপাতালের লবি কাজ করছে – এই ষড়যন্ত্রের তত্ত্বও বাজারে চালানো যাচ্ছিল। কিন্তু কর্মবিরতি উঠে যাওয়ার পরে তো সেসব অস্ত্র ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টেও গত শুনানিতে ফের ধমক খেয়েছে রাজ্য সরকার। কেবল হাসপাতালের সুরক্ষায় নয়, সামগ্রিকভাবে সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগ করা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন বিচারপতিরা। এমতাবস্থায় অনশনে বসা ছাড়া কি অন্য কোনো রাস্তা ছিল না? হ্যাঁ, একজন ডাক্তারও অনশন করতে গিয়ে মারা গেলে সরকারকে অভূতপূর্ব বিপদে পড়তে হবে। কিন্তু অপ্রিয় সত্য হল, নির্মম শাসক দল একের পর এক ডাক্তারের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আর অন্য কারোর অনশনে বসা দেখে বুঝে ফেলেছে যে এখানে কারোর মৃত্যুর সম্ভাবনা কম। শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জি এ সম্পর্কে যে স্বভাবসিদ্ধ অসভ্য মন্তব্য করেছেন – তাতেই তাঁর দল এবং সরকারের এই মনোভাব পরিষ্কার। অর্থাৎ ডাক্তারদের ব্রহ্মাস্ত্র সরকার হজম করে ফেলেছে। ব্রহ্মাস্ত্রের পর যে অস্ত্রই প্রয়োগ করা হোক, তার প্রভাব কম হয়। ফলে এখন একদিনের ধর্মঘটকে সরকার কতটা গুরুত্ব দেবে বলা মুশকিল। এই ধর্মঘট অনশনের আগে ডাকা হলে ফল অন্যরকম হতে পারত।

এখানে প্রশ্ন উঠবে, সাধারণ মানুষের যে সমর্থন ধর্মতলার অনশন মঞ্চে দেখা যাচ্ছে, তা কি মিথ্যা, নাকি অপ্রাসঙ্গিক? মিথ্যা তো নয় বটেই, কিন্তু সরকার হয়ত প্রাসঙ্গিক মনে করছে না। নিশ্চিত হওয়ার জন্য সম্ভবত আসন্ন উপনির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। অপ্রিয় হলেও সত্যি, ভোট ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ন্যায়-অন্যায় বিচার ভারতের গণতন্ত্রে বন্ধ হয়ে গেছে। সেই কারণেই কুণাল ঘোষ বুক ফুলিয়ে বলতে পেরেছেন, বিরোধীরা নির্বাচনে জিতে প্রমাণ করুক যে মানুষ তাদের পক্ষে

যেমন ২০০২ সালের পর থেকে গুজরাটে বিজেপি হারেনি, তাই সেবছরের গণহত্যা সঠিক ছিল। ২০১১ সালের পর থেকে যত বড় বড় কেলেঙ্কারিই প্রকাশিত হয়ে থাকুক, তৃণমূল হইহই করে ভোটে জিতেছে। অতএব সব ঠিক আছে। একইভাবে উপনির্বাচনে সাতটা আসনের অধিকাংশ জিতলেই কুণালরা বলে দেবেন, আর জি করে সরকারের কোনো অন্যায় নেই। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাতেও কোনো গোলমাল নেই। ‘সব চাঙ্গা সি’। এরকম মানসিকতার সরকারের বিরুদ্ধে আমরণ অনশনের সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরী?

একটা কথা সত্যি, যে ভারতবর্ষের ইতিহাসে অনশন ব্যাপারটার এমন স্থান রয়েছে যে অনশন যে-ই করুক, যে কারণেই করুক, মানুষ তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। গৌতম বুদ্ধ বোধিলাভের জন্য অনশন করেছিলেন, মহাত্মা গান্ধী অনশনকে রাজনৈতিক আন্দোলনের হাতিয়ার হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেন। কারণ এতে অন্য কারোর ক্ষতি করা হয় না, নিজের ছাড়া। ফলে মানুষের বিশ্বাস জন্মাতে বাধ্য যে অনশনকারী নিজের ফায়দার জন্যে আন্দোলন করছে না। পরের কল্যাণের জন্য আত্মত্যাগ করছে। বাঙালিদের মধ্যে যাঁরা ইতিহাসসচেতন, তাঁরা নিঃসন্দেহে যতীন দাসের কথাও মনে রেখেছেন। ফলে অনশনে বসলে গরিব-বড়লোক, গেঁয়ো-শহুরে সব ধরনের মানুষের সহানুভূতিই পাওয়া যায়। মমতা স্বয়ং একসময় পেয়েছেন, আন্না হাজারের মত ভণ্ড আন্দোলনকারীও পেয়েছেন। ফলে ভাবা অমূলক নয় যে কর্মবিরতির সময়ে যত মানুষ ডাক্তারদের আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন, তার চেয়ে বেশি মানুষ অনশন চালু হওয়ার পরে তাঁদের প্রতি নরম হয়েছেন। কিন্তু তাতে তো সরকারের কাছ থেকে দাবি আদায়ে সুবিধা হবে না। কেবল পশ্চিমবঙ্গ নয়, দুনিয়া জুড়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের সাম্প্রতিক সংকট তো এটাই, যে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার জনগণের প্রভু হয়ে দাঁড়াচ্ছে। উপরন্তু একথাও মনে রাখা দরকার, যে গান্ধীর সমালোচক অরুন্ধতী রায় বলেছেন, অহিংসা-অসহযোগ-অনশন নীতি সফল হতে পারে ‘অডিয়েন্স’ থাকলে, নচেৎ নয়। অরুন্ধতীর কথাটা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়, আবার ফেলে দেওয়ার মতও নয়। তৃণমূল সরকার যে খুব সহানুভূতিশীল ‘অডিয়েন্স’ নয়, তা কিন্তু ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। অনশন মঞ্চের অনতিদূরে নির্বিকার কার্নিভালে প্রমাণিত, আজ মুখ্যমন্ত্রী যে সুরে ফোনে কথা বলেছেন, তাতেও প্রমাণিত।

এই আন্দোলন সম্পর্কে আরেকটা বড় প্রশ্ন হল, এটা কি শুধুই ডাক্তারদের আন্দোলন? নাকি এটা গণআন্দোলন? ৯ অগাস্টের পর থেকে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ মৃতার ধর্ষণ ও খুনের প্রতিবাদে, রাজ্য সরকারের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন তাঁরা একে নিজেদের আন্দোলন করে নিয়েছেন। আর যে কোনো গণআন্দোলনই আদতে রাজনৈতিক আন্দোলন। কিন্তু এতগুলো মাস কেটে যাওয়ার পরেও এই আন্দোলনের চরিত্র সম্পর্কে জুনিয়র ডাক্তাররা নিজেরাই দ্বিধায় ভুগছেন বলে মনে হয়। নয়ত মাঝেমাঝেই গোপাল ভাঁড়ের গল্পের রাজার বিধবা পিসির লাউতে চিংড়ি আছে অভিযোগ শুনে ‘ছি, ছি, ছি’ বলে আর্তনাদ করার মত কোনো কোনো ডাক্তার নেতা ‘আমাদের আন্দোলন অরাজনৈতিক’ বলছেন কেন? কোনো সন্দেহ নেই যে সিপিএম কর্মীরা কদিন আগে ধর্মতলায় দলীয় পতাকা নিয়ে না গেলেই পারতেন। কিন্তু গেছেন বলে মঞ্চ থেকে উত্তেজিত সাফাই গাওয়ারই বা দরকার কী? যে আন্দোলন স্পষ্টত সরকারের বিরুদ্ধে এবং যা সাধারণ মানুষের হাতে চলে গেছে, সেখানে কে কোন পতাকা নিয়ে এল না এল – তার দায়িত্ব জুনিয়র ডাক্তাররা নেবেন কী করে এবং কেন? ভয় কি তৃণমূলের প্রোপাগান্ডা মেশিনারিকে? সে তো দিনরাত চলছেই। মঞ্চের সামনে পতাকা এসে পড়ার আগেও চলছিল, পরেও চলছে, না এলেও চলত। সরকার যে দলের হাতে তারা তো চাইবেই যেনতেনপ্রকারেণ এই আন্দোলনকে হেয় করতে। তা নিয়ে আন্দোলনকারীরা বিচলিত হবেন কেন, যদি তাঁদের চোখ অর্জুনের পাখির চোখ দেখার মত দশ দফা দাবিতেই নিবদ্ধ থাকে? আন্দোলন রাজনৈতিক মানেই অবৈধ – এই যুক্তিই বা তাঁরা মেনে নেবেন কেন? একথা তো অস্বীকার করা যায় না যে পৃথিবীর কোনো আন্দোলন কোনোদিন আক্ষরিক অর্থে স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। বিভিন্ন ছোট বড় রাজনৈতিক দল ও সংগঠন উদ্যোগ না নিলে আর জি কর আন্দোলনও যতটা ছড়িয়েছে তা ছড়াত না। ফলে ডাক্তারদের আন্দোলন এই গুরুত্ব পেত না। ব্যাপারটা বোঝার জন্যে বেশি দূরে তাকানোর দরকার নেই। এসএসসি, টেট, মাদ্রাসার চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনের কথা স্মরণ করলেই বোঝা যাবে।

বলা বাহুল্য, ডাক্তারদের আন্দোলনকে এত বড় আন্দোলনের রূপ দিয়েছে যে দল এবং সংগঠনগুলো, তারা সকলেই কোনো না কোনো মতের বামপন্থী। কারণ ঘটনার দিন থেকে কয়েকদিন পর পর্যন্ত অগ্নিমিত্রা পাল, সজল ঘোষরা আর জি কর নিয়ে সক্রিয় থাকলেও মিইয়ে গেছেন বহুদিন হল। বস্তুত অদ্ভুতুড়ে সংগঠনের নামে নবান্ন অভিযানের পর থেকেই বিজেপি বুঝে উঠতে পারছে না এই আন্দোলন নিয়ে কী করিতে হইবে। কারণ একে দাঙ্গা করার অভিজ্ঞতা হিন্দুত্ববাদীদের যতখানি, তার দু আনাও আন্দোলন করার ব্যাপারে নেই। তার উপর হোয়াটস্যাপ গ্রুপগুলোতে বিস্তর বিষ ছড়িয়েও ব্যাপারটাকে কিছুতেই হিন্দু-মুসলমান বাইনারিতে ফেলা যায়নি। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত ডাক্তারদের অবস্থানে যোগ দিতে গিয়ে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান শুনতে হয়েছে বিজেপি নেতাদের। ফলে কখনো শুভেন্দু অধিকারী একেবারে তৃণমূল নেতাদের সুরেই আন্দোলনকারীদের নেশাখোর বলছেন, আবার কখনো তৃণমূলবিরোধী ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে সরকারি কার্নিভালের পালটা কার্নিভালকে সমর্থন করছেন। বিজেপির কুখ্যাত আই টি সেলের প্রধান অমিত মালব্য তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে ৩ অক্টোবরের একখানা দুর্গার সঙ্গে আর জি কর মেলানো জগাখিচুড়ি ভিডিও পিন করে রেখেছেন। এই আন্দোলন নিয়ে মোটেই পোস্ট করছেন না। বিজেপির আইনজীবী নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি তাঁর পোস্টগুলোতে রাজ্য সরকারের চেয়ে বেশি আক্রমণ করছেন সিপিএমকে। টিভি স্টুডিওতে আসা বিজেপি মুখপাত্রদের কথাবার্তা শুনলেও বোঝা যাচ্ছে তাঁরা তৃণমূলকে কিছু সাধারণ গালাগালি দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান। কোনোভাবেই যেন ডাক্তারদের আন্দোলনের উপরে ফোকাস না চলে যায় – সে ব্যাপারে তাঁরা সতর্ক। বাকি রইল কংগ্রেস, যাদের কর্মী সমর্থক রাজ্যের খুব ছোট একটা এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

এমতাবস্থায় নিজেদের আন্দোলন রাজনৈতিক নয় বলে চেঁচামেচি করার কোনো দরকার আছে কি? আন্দোলনকারী ডাক্তাররাও তো অধিকাংশই কোনো না কোনো বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের সদস্য।

এটা কি শুধুই ডাক্তারদের আন্দোলন? এই প্রশ্নের আরও একটা দিক আছে, যেদিক থেকে এই আন্দোলনের সমালোচনা হওয়া দরকার।

দশ দফা দাবি নিয়ে জুনিয়র ডাক্তাররা অনশনে বসার কিছুদিন আগেই এই আন্দোলনের সমালোচক এক বন্ধু বলছিলেন ‘ওটা ডাক্তারদের আন্দোলন। আর কারোর আন্দোলন নয়।’ তাঁর উষ্মা অকারণ ছিল না। সে পর্যন্ত ডাক্তাররা যা যা দাবি করছিলেন তার সবই নিজেদের নিরাপত্তা, সুযোগসুবিধা সংক্রান্ত। তিনি বলছিলেন, গত শতকের আটের দশকের ডাক্তারদের আন্দোলনের মত স্বাস্থ্যব্যবস্থার ফাঁকফোকর নিয়ে ডাক্তাররা প্রশ্ন তুলছেন না। সে কাজ না করলে এই আন্দোলন নিয়ে সাধারণ মানুষের উত্তেজিত হওয়া ভুল। নিম্নলিখিত দশ দফা দাবির পরে আর সেকথা বলা চলে না।

জুনিয়র ডাক্তার

প্রথম দাবি সম্পর্কে সরকার বলতেই পারে যে এর সুরাহা আদালতের হাতে। দ্বিতীয় দাবি সম্পর্কেও বলা যেতে পারে যে এতে রোগীদের কিছু এসে যায় না। তবে সবকটা দাবিই জরুরি এবং ন্যায্য, ২-১০ পূরণ করাও সরকারের হাতে। কিন্তু ৩-৭ একেবারেই রোগীদের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি হাসপাতালগুলোর যা হাল তাতে এগুলোর চেয়ে প্রয়োজনীয় কিছু হতে পারে না রোগীদের পক্ষে। এই দশ দফা দাবি পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, যার সন্তোষজনক উত্তর দিতে হলে তৃণমূল সরকার যেসব দালাল চক্র, কুচক্রের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেগুলো ভাঙতে হবে। তার চেয়ে নিজের সরকার নিজে ভেঙে দিয়ে চলে যাওয়া সহজ। শুধু তাই নয়, ৩-৭ নম্বর দাবি পূরণ করলে একথা প্রকাশ্যে আসবে যে যেখানে যত ডাক্তার থাকা উচিত তত ডাক্তার নেই। যত শয্যা একটা হাসপাতালে আছে বলে দাবি করা হয়, তাও নেই। ফলে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পকে সর্বরোগহর বড়ি হিসাবে দেখানো যে আসলে সরকারি ব্যবস্থার ফাঁক গোপন করতে, তাও প্রমাণিত হবে।

আরও পড়ুন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি: আর জি কর পেরিয়ে

ডাক্তারদের আন্দোলন চালু হওয়ার পর থেকে তৃণমূল তো বটেই, স্বঘোষিত বামেরা অনেকেও বলে চলেছেন যে এই আন্দোলনকে আসলে চালাচ্ছে কর্পোরেট হাসপাতালের মালিকরা, যাতে তাদের কাছে আরও বেশি সংখ্যক রোগী যায়। একে এই লেখার গোড়ার দিকে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব বলেছি। কারণ প্রথমত, একথা তথ্য দিয়ে কোনোদিন প্রমাণ করা যাবে না। যেমন প্রয়াত রতন টাটা কোনোদিন প্রমাণ করতে পারেননি যে মমতার সিঙ্গুরে কারখানা হতে না দেওয়ার আন্দোলনের পিছনে টাটার প্রতিদ্বন্দ্বী গাড়ি নির্মাণ কোম্পানিগুলোর হাত ছিল। দ্বিতীয়ত, মূলত যে শ্রেণির মানুষ আজও সরকারি হাসপাতালে যান, পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত সরকারি হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলেও তাঁরা কর্পোরেট হাসপাতালের গেট পেরিয়ে ঢুকতেই পারবেন না। অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে বাড়িতেই মরতে দেবেন নিকটাত্মীয়কে। কারণ ওই হাসপাতালগুলোতে প্রথমবার গেলে যে ‘পেশেন্ট রেজিস্ট্রেশন’ করাতে হয় তার খরচই কোথাও হাজার টাকা, কোথাও দু হাজার টাকা। অথচ ওই শ্রেণির মানুষের অনেকের গোটা মাসের পারিবারিক আয় ১০-১২ হাজার টাকা। এখানেই শেষ নয়। ওই হাসপাতালগুলোতে মরণাপন্ন রোগীকে নিয়ে দৌড়লেও এমার্জেন্সিতে ঢুকিয়েই আগে ‘ডিপোজিট মানি’ দিতে হয়। তার অঙ্কটা ওই শ্রেণির মানুষের বাড়িঘর বেচে দিলেও আসবে কিনা সন্দেহ। ফলে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারদের প্রায় আড়াই মাসের আন্দোলনে কর্পোরেট হাসপাতালগুলো ফুলে ফেঁপে উঠেছে আর তার আগে কষ্টেসৃষ্টে দিন কাটাচ্ছিল – এমন আষাঢ়ে গপ্প কার্তিক মাসে একেবারেই অচল।

হঠাৎ এমন ভান করা হচ্ছে যেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর ভীষণ বিরোধী। ব্যাপারটা সত্যি হলে চমৎকার হত। কিন্তু সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প চালু করার দরকারই ছিল না। সম্প্রতি সংবাদ প্রতিদিন একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখানো হয়েছে যে ডাক্তারদের আন্দোলন চলাকালীন স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে সরকারের খরচ বেড়ে গেছে। তা থেকে সিদ্ধান্ত করা হয়েছে যে এর কারণ এই পর্বে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে মানুষের বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করানো।

সংবাদ প্রতিদিন

এখানে চেপে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা হল, আপনার স্বাস্থ্যসাথী কার্ড না থাকলে এখন সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা পাবেন, কিন্তু বেশকিছু খরচসাপেক্ষ পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হবে না, কোনোরকম অস্ত্রোপচারও হবে না। অর্থাৎ স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প থেকেই সরকারি হাসপাতালের রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচারের খরচও দেওয়া হয়। অথচ এই প্রতিবেদনে কেবল সরকারের খরচ বেড়েছে বলা হয়েছে, কোন হাসপাতাল থেকে কত টাকার ‘ক্লেম’ এসেছে তা লেখা হয়নি। ফলে এই অঙ্কের সবটাই যে বেসরকারি হাসপাতালে হওয়া খরচ, তা মোটেই নিশ্চিত করে বলা যায় না। আর্থিক বর্ষের মাঝখানে, এত নির্দিষ্ট কয়েকটা দিনের সরকারি জমা, খরচের হিসাব এভাবে পাওয়া যায় কিনা, কে করল এই সমীক্ষা, সেসব প্রশ্ন না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল।

কিন্তু যে কথা বলার, তা হল স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প চালু করা হয়েছে মানেই সরকার তো মেনে নিয়েছে যে তার নিজস্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রাজ্যের সব মানুষের চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। তাই মানুষকে বেসরকারি ব্যবস্থায় চিকিৎসা করানোর খরচও সরকার জোগাচ্ছে ওই প্রকল্পের মাধ্যমে। সেক্ষেত্রে সরকার কর্পোরেট হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ কীভাবে কমানো যায় তা দেখছে না কেন? এর উত্তর সরকারপন্থীদের ঠোঁটস্থ থাকা উচিত। ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঘোষণা করেছিল যে কর্পোরেট হাসপাতালগুলোকে লাগাম পরানো হবে। সেই অনুযায়ী কলকাতায় ঘটা করে মালিকদের সঙ্গে অন-ক্যামেরা সভা করেছিলেন স্বয়ং মমতা। এমনকি জেলা সফরের সময়ে সেখানকার নার্সিংহোমগুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও সভা করেন দফায় দফায়।

২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত কলকাতার টাউন হলের সভায় মমতা রীতিমত বকাঝকা করেছিলেন কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর প্রতিনিধিদের। তাদের যাবতীয় অনিয়ম, আকাশছোঁয়া বিল নিয়ে সরকারের কাছে অনেক অভিযোগ আছে বলে জানা গিয়েছিল। সেসব আটকাতে কমিশন তৈরি, আইন পাস করা ইত্যাদি অনেক কাণ্ড হয়েছিল। খুব ভাল কথা। কিন্তু তাহলে সাতবছর পরেও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর খরচ একইরকম রয়ে গেল কেন? কর্পোরেট হাসপাতালের অসাধুতা, ডাক্তারদের অসাধুতার যে অভিযোগ এখন সরকারপন্থীরা তুলছেন সেগুলোরই বা সুরাহা হল না কেন? তার মানে ওখানেও ফাঁকি? একথা সত্যি যে সরকারি হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা যথেষ্ট না হওয়া, পর্যাপ্ত পরিমাণ ডাক্তার না থাকার সমস্যা ২০১১ সাল থেকে তৈরি হয়নি। কিন্তু ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তো লুডো খেলতে দেওয়ার জন্য সরকার বদলে ফেলেননি? তাহলে এতদিন এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে বারণ করেছিল কে? এসব প্রশ্নের উত্তর কিন্তু ডাক্তাররা এই আন্দোলনেও চাইতে পারলেন না।

এছাড়াও কিছু প্রশ্ন আছে, যার জন্যে জবাবদিহি সরকারের পাশাপাশি ডাক্তার-সমাজকেও করতে হবে। যেমন ডাক্তাররা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এতগুলো মৌলিক প্রশ্ন তুললেও নার্স এবং আয়াদের কথা কিন্তু তুললেন না। অথচ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো মানুষমাত্রই জানেন, রোগীর সারাদিনের পরিচর্যা থাকে ওঁদের হাতেই। সিনিয়র, জুনিয়র মিলিয়েও প্রয়োজনের তুলনায় ডাক্তার এতই অপ্রতুল যে রোগীকে সুস্থ করে তোলা এবং সুস্থ রাখার জন্যে দক্ষ শ্রমিক নার্স আর অদক্ষ শ্রমিক আয়াদের ভূমিকা বিরাট। এঁদের দাবিদাওয়া বাদ দিয়ে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার যে কোনো সংস্কার অপূর্ণই থেকে যাবে।

দ্বিতীয়ত, সিভিক ভলান্টিয়ারদের দিয়ে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না তো বটেই; কয়েকশো পুলিস দিয়েও নিশ্চিত করা যাবে না, যদি রোগীর বাড়ির লোক আর ডাক্তারদের মধ্যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ থাকে। এই বাতাবরণ তৈরি হওয়ার জন্যে অনেকখানি দায়ী সরকার। কারণ বহু হাসপাতালে ডাক্তার থাকলেও চিকিৎসার সরঞ্জাম থাকে না, ওষুধপত্র থাকে না। উত্তেজিত, উদ্বিগ্ন রোগীর বাড়ির লোকেরা বোঝার অবস্থায় থাকেন না যে এতে ডাক্তারের কিছু করার নেই। তাঁরা ডাক্তারকে সামনে পান বলে তাঁকেই ধরে পিটিয়ে দেন। কিন্তু এই অবিশ্বাস তৈরি হওয়ার পিছনে ডাক্তারদেরও খানিকটা দায় আছে। রোগী যখন দেখেন সিনিয়র ডাক্তাররা গুরুতর অবস্থার রোগীকেও দিনে একবার দেখতে আসেন, অথচ বাইরে চেম্বার আর নার্সিংহোম কামাই যায় না, তখন তাঁদের ভিতরে ক্ষোভ জমা হয়। সেই ক্ষোভের মার তারপর এসে পড়ে জুনিয়র ডাক্তার আর অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর।

তৃতীয়ত, সংখ্যার বিচারে জুনিয়র ডাক্তাররা সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার দশ শতাংশের কম হলেও, সিনিয়রদের বাইরের ব্যস্ততার কারণে তাঁরাই এই ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। তাঁদের বিরুদ্ধেই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে যাওয়া মানুষের নানা অভিযোগ থাকে। ‘যত্ন করে দেখেন না’, ‘ছোট ডাক্তারবাবুর ব্যবহার খারাপ’ ইত্যাদি। আর জি করের যে জুনিয়র ডাক্তার ধর্ষিত হয়ে খুন হয়েছেন তিনি যে টানা ৩৬ ঘন্টা ডিউটি করে তারপর শুতে গিয়েছিলেন তা এখন আমরা সকলেই জানি। বস্তুত অধিকাংশ জুনিয়র ডাক্তারেরই ওটাই রুটিন। নাওয়া-খাওয়া দূরের কথা, শোয়ার সময়ও নেই। তেমন একজনের রোগীর প্রতি বা তাঁর পরিবারের প্রতি ব্যবহার ভাল হবে – এমন আশা করাই অন্যায়। যত্ন করে দেখবেন – এও প্রায় আবদারের পর্যায়ে পড়ে। বরং রোগী দেখতে গিয়ে যে রোজই ওঁরা চরম ভুলভাল করেন না তার জন্যেই প্রশংসা করা উচিত। এর সুরাহা কিন্তু অনেকটাই সিনিয়র ডাক্তারদের হাতে। তাঁরা যেভাবে আজকের আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সেভাবে যদি বছরে ৩৬৫ দিন বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে খেপ খেলা বন্ধ করে সরকারি হাসপাতালে সময় দেন, তাহলেই জুনিয়ররা অনেকটা শারীরিক ও মানসিক স্বস্তি পাবেন। রোগীর পরিবারেরও অসন্তোষ কমবে।

চতুর্থত, বহু হাসপাতালের বহু বিভাগে ডাক্তারের অভাবের একটা কারণ যেমন সরকারের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, প্রায়শই রাজনৈতিক কারণে, বদলি; বিজ্ঞাপন দেওয়া সত্ত্বেও আবেদনপত্র জমা না পড়াও একটা কারণ। কেন জমা পড়ে না আবেদনপত্র? সাধারণত বিশেষজ্ঞদের শূন্য পদ পূরণ করার ক্ষেত্রে এই সমস্যা দেখা দেয়। এর কারণ সামাজিক। তৃণমূল সরকার কেন, কোনো দলের সরকারই এই যুগে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে কিনা সন্দেহ। একজন বিশেষজ্ঞ হয়ত সরকারি কলেজের শূন্য পদে যোগ দিলে যা বেতন পাবেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বেতন পাবেন কর্পোরেট হাসপাতালে যোগ দিলে। ১৯৮০-র দশক থেকে বাঙালি বাবা-মায়েদের মধ্যে একটা মৌলিক বদল এসেছে। তাঁরা ছেলেমেয়েদের প্রাণপণে কেবল ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার করতে চেয়েছেন। মানুষের সেবা করবে বলে নয়, অনেক টাকা কামাবে বলে। ১৯৯১ সালে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর থেকে তাল মিলিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেড়েছে সকলেরই। আজকাল অনেক শিক্ষক, অধ্যাপক, সাংবাদিকও তো নিজের চারচাকার গাড়ি না থাকলে জীবন বৃথা মনে করেন। আজ হ্যাচব্যাক হলে কাল সেডান কিনতে চান। নইলে মনখারাপ হয়। সেখানে একজন ডাক্তার উচ্চতর বেতন, বিদেশযাত্রা, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হাসপাতালের হাতছানি এড়িয়ে আউটডোর, ইন-পেশেন্ট মিলিয়ে দৈনিক কয়েক হাজার রোগী সামলানোর ঝামেলা ঘাড়ে নিতে সরকারি হাসপাতালে ঢুকবেন কেন?

#

অভয়ার জন্য ন্যায়বিচারের দাবি ছাড়িয়ে অনেকদূর চলে আসা হল মনে হচ্ছে তো? রাজ্য সরকারও ঠিক এই কথা বলেই এসব মৌলিক প্রশ্ন তোলার পথ বন্ধ করে দিতে চাইছে, যাতে স্থিতাবস্থা বজায় থাকে। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন, স্থিতাবস্থা বজায় থাকলে অভয়া কাণ্ড আবার হবে। এবারে একজন ডাক্তারের উপর অমন আক্রমণ হয়েছে, কাল একজন নার্সের উপর হতে পারে, পরশু কোনো আয়ার উপর হতে পারে, তার পরদিন কোনো শয্যাশায়ী রোগীর উপরেও হতে পারে। ডাক্তাররাও কি স্থিতাবস্থাই বজায় রাখতে চান স্রেফ নিজেদের কয়েকটা নির্দিষ্ট দাবি পূরণ করে নিয়ে? নাকি আমূল পরিবর্তন চান? এই সিদ্ধান্ত তাঁদেরই নিতে হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁদের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমূল পরিবর্তনে সেইসব মানুষের স্বার্থ জড়িত। কথাটা কিন্তু ডাক্তারদের মাথায় রাখতে হবে।

তবে এত কিছু বদলে দেওয়ার জন্যে লড়াই করার দায়িত্ব একা তাঁদের নয়। অনেকখানি দায়িত্ব সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীদের। উপরন্তু দলমত নির্বিশেষে যত মানুষ এতদিন ধরে লড়ছেন, দায়িত্ব তাঁদেরও। ডাক্তাররা বা রাজনৈতিক নেতারা তো আকাশ থেকে পড়েন না। আমাদের সবার লোভ, লালসা বজায় থাকবে আর ডাক্তাররা নিষ্কাম কর্ম করবেন, নেতারা কেবল আমাদের কল্যাণের জন্যে কাজ করে যাবেন – এমন হয় না।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত