অর্ধসত্য যে মিথ্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর সে তো সকলেই জানেন। কিন্তু ক্লিকটোপের যুগে অর্ধসত্য আবার সত্যের চেয়ে সুবিধাজনকও বটে। অর্ধসত্যে ক্লিক পাওয়া যায় বেশি, তাই সংবাদমাধ্যমের সুবিধা। অর্ধসত্য নিয়ে কয়েকদিন সোশাল মিডিয়ায় রাগ-টাগ দেখিয়ে বিবেক দংশন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, তাই যে সংবাদ গিলছে তার সুবিধা। আবার পুরো সত্যটা জেনে গেলে হয়ত ব্যক্তির এত বেশি রাগ হবে বা গ্লানি হবে যে সত্যিকারের কিছু একটা করতে ইচ্ছে হবে। সেটা ব্যক্তির পক্ষে বিপজ্জনক, ব্যক্তি সমষ্টি হয়ে উঠলে ক্ষমতার পক্ষেও। এরকমই একটা অর্ধসত্য নিয়ে কদিন ধরে বাংলার নিস্তরঙ্গ সংস্কৃতি জগৎ কিছুটা উত্তাল – অনির্বাণ ভট্টাচার্য কাজ পাচ্ছেন না। গোটা ব্যাপারটা যা, তাতে এই খবরটাকে অর্ধসত্য না বলে সোয়া সত্য বা এক দশমাংশ সত্য বললেও ভুল হয় না।
ব্যাপারটা কী আসলে? ব্যাপার হল, টলিউডের কিছু শিল্পীকে কলাকুশলীরা (আজকাল বাংলায় যাঁদের টেকনিশিয়ান বলা হয়) বয়কট করেছেন। কী করে জানা গেল বয়কট করা হয়েছে? কেউ ঘোষণা করেছে? না। কিন্তু ওই শিল্পীরা কোনো ফিল্মের বা ওয়েব সিরিজের নির্দেশক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা, গীতিকার, গায়ক বা অন্য যে ভূমিকাতেই থাকুন না কেন – শুটিংয়ের জন্য ডাকলে কোনো কলাকুশলী যাচ্ছেন না। এই বয়কটের আওতায় পড়ে যাওয়া শিল্পীদেরই একজন অনির্বাণ। এমনকি তিনি তাঁদের গানের দল হুলিগানইজমের মিউজিক ভিডিও শুট করতে গিয়েও দেখেন কোনো কলাকুশলী আসেননি। কিন্তু মূলধারার সংবাদমাধ্যম যেভাবে শুধু অনির্বাণের নাম নিয়ে হইচই করেই ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে চাইছে, তাতে বোঝা যায় যে গভীরে যাওয়ার সাধ নেই। হয়ত সাধ্যও নেই, কারণ সেটা করতে গেলে সরাসরি এ রাজ্যের ক্ষমতাসীনদের চটাতে হবে।
ঘটনা হল, অনির্বাণের একার ভাত মারার চেষ্টা চলছে না টালিগঞ্জে। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে তাঁর পাশাপাশি বাংলা ছবি ও সিরিজের দর্শকদের পরিচিত মুখ পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের নামোল্লেখ করা হয়েছে। বিকল্প সংবাদমাধ্যমগুলো এঁদের পাশাপাশি নির্দেশক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর নামও করেছে, কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে টিভির এক সময়কার পরিচিত মুখ এবং বড় পর্দার বেশকিছু ছবির পরিচালক সুদেষ্ণা রায়ের উল্লেখও করা হয়েছে। এও সেই সোয়া সত্যেরই বেসাতি। এর সুবিধা হল, পাঠক/দর্শক ভাববেন বা তাঁদের ভাবানো যাবে যে এই দু-চারজনের সঙ্গে দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের কোনো ব্যক্তিগত ঠোকাঠুকি লেগেছে। একেকজনের অতীত কার্যকলাপ উল্লেখ করে ‘যা হচ্ছে ওদের নিজেদের মধ্যে হচ্ছে, আমাদের ভাবার দরকার নেই’ – এরকম একটা বয়ান খাড়া করে দেওয়া যাবে। ফলে কয়েকদিন হইচইয়ের পরে সবাই ব্যাপারটা ভুলে যাবে, সোশাল মিডিয়ার যুগে হইচই করার মত নতুন কিছু ঠিক এসে পড়বে (এক্ষেত্রে যেমন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মাতৃভাষা সম্পর্কে হীনমন্যতা এসে পড়েছে)। ফলে কেউ আর খুঁজে দেখতে যাবে না, আসলে কী হয়েছে।
এই কুচক্র থেকে বেরোতে প্রথমেই বলা যাক যে বয়কট হচ্ছেন মূলত ১৩ জন। কোন ১৩ জন? যে ১৩ জন কলকাতা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেছেন এই মর্মে, যে ভারতের একজন নাগরিকের এদেশে কাজ করে উপার্জন করার যে সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার রয়েছে, তা লঙ্ঘন করা হচ্ছে তাঁদের বেলায়। কাজ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এই ১৩ জন কারা? সুদেষ্ণা রায়, সুব্রত সেন, কিংশুক দে, বিদুলা ভট্টাচার্য, আশিস সেন চৌধুরী, সুমিত দাম, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, অভিষেক সাহা, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, দেবাশীষ চক্রবর্তী, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, প্রসেনজিৎ মল্লিক, সৌরভ ভট্টাচার্য।
বাংলা সিনেমার যাঁরা রীতিমত খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের কাছেও হয়ত বেশিরভাগ নাম অচেনা। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে এই তালিকার কারোর কাজ করার অধিকার অন্যদের চেয়ে কম। সুতরাং বোঝা দরকার, একটা বিরাট অন্যায় ঘটে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা শিল্পে এবং সেই অন্যায় ঘটছে রাজ্য সরকারের মদতে। এটা আমার মতামত নয়। পিটিশনাররা এই দাবিটাই করেছেন। বস্তুত, রিট পিটিশন সরকারের বিরুদ্ধেই দাখিল করা যায়। কারণ নাগরিকের যে কোনো সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। ফলে এই শিল্পীদের কাজ করতে না দেওয়ার পিছনে টলিউডের কুখ্যাত ফেডারেশন – যার কর্তা মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস – আছেন বলে অভিযোগ থাকলেও, পিটিশন কিন্তু করা হয়েছে সরকার পিটিশনারদের অধিকার রক্ষা করছে না, এই অভিযোগে। এতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিক্রিয়া কী?
গতবছর এই জুলাই মাসেই যখন টালিগঞ্জে ফেডারেশন বনাম পরিচালক টানাপোড়েন শুরু হয় শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস প্রযোজিত এবং রাহুল মুখার্জি নির্দেশিত একটি ছবির শুটিং নিয়ে এবং তার জেরে কাজ বন্ধ হয়ে যায় পুরো সিনেমাপাড়ায়, তখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি স্বয়ং সব পক্ষকে ডেকেছিলেন। সেই সভায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে সরকার একখানা কমিটি গঠন করে দেবে এবং সেই কমিটি সব মিটিয়ে দেবে। সে কমিটিও গঠন হল না আর তা নিয়ে বিস্তর ইমেল পাঠানোর পরেও কোনো জবাব পাওয়া গেল না দেখে পরিচালকরা আদালতে এই পিটিশন দাখিল করলেন। মজার কথা, হাইকোর্টে বিচারপতি অমৃতা সিনহার এজলাসে এই মামলার শুনানিতে কিন্তু রাজ্য সরকারের কৌঁসুলি কেবলই প্রমাণ করার চেষ্টা করে গেছেন যে এই মামলার দুটি পক্ষ হল ফেডারেশন আর পরিচালকরা। এতে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই, কিছু করার নেই। বিচারপতি অবশ্য সেকথায় আমল দেননি। ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন জানিয়েও রাজ্য সরকার সুবিধা করতে পারেনি। মামলা আবার ফেরত এসেছে বিচারপতি সিনহার এজলাসেই। ইতিমধ্যে বিচারপতি সিনহার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের সচিবকে দেওয়া স্পষ্ট নির্দেশ সত্ত্বেও পিটিশনারদের কাজে বাধা পড়ায় তাঁরা আদালত অবমাননার মামলাও করেছেন। সে মামলার শুনানি হওয়ার কথা আগামীকাল। তাহলে ভাবুন, রাজ্য সরকার ফেডারেশনের স্বার্থরক্ষায় কতখানি মরিয়া আর পরিচালকদের নাগরিক অধিকার রক্ষায় কতখানি উদাসীন। অর্থাৎ ব্যাপারটা স্রেফ অনির্বাণ বা কয়েকজন শিল্পীকে কলাকুশলীদের বয়কট করার ব্যাপার নয়। এ রাজ্যে যে কোনো নাগরিক আইনি পথে নিজের কাজকর্ম করতে পারবেন কি পারবেন না – প্রশ্নটা সেইখানে।
সমস্যার গভীরতা বোঝার জন্যে আরও দুটো তথ্য খুব জরুরি। এই পিটিশন যখন দাখিল করা হয় তখন পিটিশনার ছিলেন ১৫ জন, এখন ১৩। গত এক বছরে আরও একটি মামলা দায়ের করেছেন বয়কট হয়ে যাওয়া শিল্পীরা। সেটা সরাসরি ফেডারেশনের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা স্বরূপের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা, কারণ তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন যে বেশিরভাগ নির্দেশকের নামেই নাকি যৌন হয়রানির অভিযোগ জমা পড়েছে তাঁর কাছে। সেই মামলা করেছিলেন ২৩০-৩৫ জন। মামলার শুনানি এখনো শুরুই হয়নি, অথচ ৭০-৮০ জন মামলাকারী মামলা প্রত্যাহার করে ফেলেছেন।
কেন এমন হল? ঠিক যে কারণে প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যস্ত রাস্তায় খুন হওয়ার পরেও পুলিস একজন সাক্ষী পায় না খুনিকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্যে। ঠিক যে কারণে আর জি কর কাণ্ডের সময়ে সারা রাজ্যের মেডিকাল কলেজের জুনিয়র ডাক্তাররা হুমকি সংস্কৃতির কথা বলছিলেন; যে কারণে সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজে ছাত্রীর ধর্ষণের পর জানা যাচ্ছে, ম্যাংগো কুমার আগেও বিস্তর কুকর্ম করেছে। কিন্তু কেউ তার টিকি স্পর্শ করতে পারেনি। উপরন্তু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে যে রাজ্যের বহু কলেজই নানা জাতের ম্যাংগোর গন্ধে বারো মাস ম ম করে। এহেন ম্যাংগোরাই এ রাজ্যের সর্বময় কর্তা এখন। গত ২০ জুন উত্তরবঙ্গ সংবাদের পাতায় বর্ষীয়ান সাংবাদিক রূপায়ণ ভট্টাচার্যকে লিখতে হয়েছে
মমতা রাত জেগে টিভি সিরিয়াল দেখেন, তাঁর মতো করে সাহিত্যচর্চা করেন, সবার জানা। অথচ টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিই সবচেয়ে বিপন্ন শিল্প। সাহিত্য আকাদেমি, নাট্য আকাদেমিতেও হাত মিলিয়ে অনেক কাজ চলছে, যা দিদিই জানেন না। যে কোনও সময় টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিতে তালাচাবি লেগে যাবে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপের দাদাগিরিতে। এই স্বরূপ কাউন্সিলারও নন, অথচ মমতা-অরূপকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে প্রসেনজিৎ-দেব-সৃজিত-কৌশিক-পরমব্রত-অনির্বাণদের কাজ বন্ধ করতে এক মিনিট লাগে তাঁর। এক বছর ধরে স্বরূপ তাঁর স্বরূপ বোঝাচ্ছেন মিটিং না ডেকে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ না মেনে। মমতা রহস্যজনক চুপ। মাঝে তিনি নিজের ভাই বাবুনকে পর্যন্ত কিছুদিনের জন্য ত্যাজ্য করেছিলেন। এখানে এসব হয় না।
দেব-শতাব্দী-জুন থেকে শুরু করে সায়নী-লাভলি-সায়ন্তনীরা তৃণমূলের এমপি, এমএলএ। অথচ মমতা স্থানীয় বিধায়কের কীর্তিমান ভাইকে টালিগঞ্জ সামলাতে দিলেন কেন? সাহিত্যজগৎ কি তাহলে কলেজ স্ট্রিটের বিধায়কের ভাই সামলাবেন, যাত্রাপাড়া চিৎপুরের বিধায়কের ভাই, খেলার ময়দান চৌরঙ্গির বিধায়কের ভাই? অরূপকে দিদি অনেক জায়গায় জট খুলতে পাঠান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অরূপ সফল, সবাইকে নিয়ে চলার গুণের জন্য। শুধু ভাইকেই সামলাতে চূড়ান্ত ফ্লপ। অভিনেতারা বলেন, ভাই এখন দাদাকেই পাত্তা দেয় না। মমতার প্রতি সহানুভূতি সম্পন্নদের সঙ্গে রাজ্য সরকারের ঝামেলা লাগিয়ে দিতে ওস্তাদ স্বরূপ কোম্পানি।
এরপরেও যদি আপনি কেন-র উত্তর না পান, তাহলে দেখে নিন স্বরূপের নেতৃত্বাধীন ফেডারেশনের গুণগান করে তৈরি বাংলা ছবির তথাকথিত ফার্স্ট বয় সৃজিত মুখার্জি, গতবছর জুলাইয়ে যাঁর ছবির কাজ বয়কট নিয়ে এই বিবাদের সূত্রপাত সেই রাহুল মুখার্জি এবং সঙ্গীত পরিচালক তথা পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের ভিডিও।
এই ভিডিও পোস্ট করা হয়েছিল গত ১১ জুন, যুযুধান পরিচালকরা তাঁদের বক্তব্য জানিয়ে দুখানা ভিডিও ৩০ এপ্রিল ও ২৮ মে প্রকাশ করার পর। মজার কথা, মামলাকারী পরিচালকরা ভিডিওগুলো পোস্ট করেছেন একখানা স্বতন্ত্র ইউটিউব চ্যানেলে এবং নিজ নিজ সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলগুলোতে। ফেডারেশনের গুণগান করা ত্রয়ীর ভিডিও কিন্তু পোস্ট হয়েছে ফেডারেশনেরই ফেসবুক পেজ থেকে। আরও মজার কথা, পর্দায় এক কোণে তিন পরিচালককে দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে আছে একটি বাণী
আমরা একসাথে
কাজ করার পক্ষে
মিথ্যা মামলার বিপক্ষে।
ফেডারেশনে ছিলাম
আছি থাকবো
এই ভিডিওতে কলাকুশলীরা যে ছবি বানানোর কাজে নির্দেশকদের সমান জরুরি, সেকথা বলা হয়েছে। গোটা টলিউড যে পরিবারের মত, তাও বলা হয়েছে। এমনকি ‘স্বরূপদা’ কত ভাল – সেকথাও বলেছেন সেই রাহুল, যিনি ফেডারেশনের অনুমতি না নিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে একখানা ওয়েব সিরিজের শুটিং করে এসেছিলেন বলে তাঁর এখানকার ছবির শুটিং করতে দেওয়া হচ্ছিল না। তা থেকেই গোটা গোলমালের সূত্রপাত। তাঁর পাশে দাঁড়িয়েই ফেডারেশনের গা জোয়ারির প্রতিবাদ আরম্ভ করেছিলেন সুদেষ্ণা, ইন্দ্রনীল, সুব্রত, পরমব্রত, অনির্বাণ, বিদুলা প্রমুখ। সৃজিত প্রথম থেকেই ধারেকাছে ঘেঁষেননি; কৌশিক গাঙ্গুলি, শিবপ্রসাদ মুখার্জিরা মাঝপথে সরে পড়েছেন। রাহুল স্বয়ং ‘স্বরূপদা’-র ভক্ত হয়ে গেছেন। তা হোক, সকলের মেরুদণ্ড কখনো সমান শক্ত হয় না। কিন্তু উপরের ভিডিওতে লক্ষ করার মত বিষয় হল, রাহুল বলছেন, তিনি ‘স্কেপগোট’ হয়েছিলেন, ফেডারেশনের সঙ্গে তাঁর ‘সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল’ এবং তারপর তিনি প্রায় ২২২ দিন বেকার ছিলেন। অর্থাৎ প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেওয়া হল যে ফেডারেশন (বা স্বরূপদা) হল কুমীর। টালিগঞ্জের জলে থেকে তার সঙ্গে বিবাদ করলে কাজ পাওয়া যায় না। সৃজিত আর ইন্দ্রদীপ ফেডারেশনকে খুব প্রয়োজনীয় সংস্থা বলেছেন, কেন প্রয়োজনীয় তা বলেননি। টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের জন্য কী কী ভাল কাজ ফেডারেশন করেছে বা করছে – তা বলার বিন্দুমাত্র চেষ্টা নেই। সৃজিত ভিডিওর শুরুতেই ছিলেন। তিনি তো যা বলছেন তা কেন বলছেন তা-ই ভেবে পাচ্ছেন না বলে মনে হয়। কথা আটকে যায়, তারপর অনেক কষ্টে খুঁজে বার করেন ‘অসুবিধা হচ্ছে’ শব্দবন্ধ। কী অসুবিধা, কেন অসুবিধা – সেসবের মধ্যে যাননি। ইনিয়ে বিনিয়ে তিনজনেই বলেছেন, যে অসুবিধাই হয়ে থাক তা আলাপ আলোচনা করে মিটিয়ে নেওয়াই উচিত। আদালতে যাওয়া অন্যায় হয়েছে।
টলিউড যদি সত্যিই একটা পরিবার হয়, তাহলে বলতেই হবে যে এ হল গার্হস্থ্য হিংসায় লিপ্ত পরিবারের ভাষা। দীর্ঘদিন নির্যাতিত বাড়ির বউ যেই থানায় গিয়ে ডায়রি করে দেয়, অমনি শ্বশুরবাড়ির লোক বলতে শুরু করে ‘বাড়ির ঝামেলা বাড়িতেই মেটানো উচিত ছিল। এসব নিয়ে কেউ থানা-পুলিস করে? ছি ছি! পরিবারের একটা মানসম্মান নেই?’ উপরন্তু, আলোচনায় যে ফেডারেশনই বসেনি, সেকথাও চেপে গেছেন পরিচালক ত্রয়ী। আর ‘মিথ্যা মামলা’ কথাটা কিন্তু কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিরা এখন পর্যন্ত মানেননি।
এবার প্রশ্ন উঠবে, কী এমন নির্যাতন করা হয়েছিল যে পিটিশনার পরিচালকরা আদালতে গেলেন? এই প্রশ্নের উত্তর গত এক বছরে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবাদী পরিচালকরা সাংবাদিক সম্মেলন করে দিয়েছেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনেও বলেছেন। পুনরাবৃত্তি করে লেখার কলেবর বাড়াব না এবং পাঠকের আলস্যকেও প্রশ্রয় দেব না। যাঁরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবিত, প্রসেনজিৎ বাংলা বলতে বুক ফুলিয়ে লজ্জিত হওয়ায় যাঁরা সত্যিই ক্রুদ্ধ, তাঁরা নিজ আগ্রহে জেনে নেবেন। যাঁরা কিছু না জেনেই বোদ্ধা, তাঁদের জন্যে এ লেখা নয়। তাঁরা তো মনেই করেন না বাংলা ছবি কোনো দেখার মত জিনিস। কেন দেখার মত হয় না, তা নিয়েও এতদিন তাঁরা কোনো প্রশ্ন তোলেননি। এখন অনির্বাণ, পরমব্রতর নাম জড়িয়ে যাওয়ায় সোশাল মিডিয়ায় ‘এনগেজমেন্ট ফার্মিং’ করতে সুবিধা হবে বলে হঠাৎ এ বিষয়ে আগ্রহী হয়েছেন। ওঁরা ‘ওয়ার্ল্ড সিনেমা’ নিয়ে থাকেন, সোশাল মিডিয়ার উত্তেজনা থিতিয়ে গেলে নির্ঘাত আবার ওতেই ফিরে যাবেন।
তবে যে পাঠকরা বোদ্ধা নন তাঁদের সাধারণ বুদ্ধি আছে। তাঁরা নিশ্চয়ই বোঝেন যে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সিনেমা একটি রুগ্ন শিল্প। এখানে ছবির বাজেট কম, তাই শুটিংয়ের সময় কম, তাই নির্দেশক ও অভিনেতাদের পারিশ্রমিক কম, ফলে কলাকুশলীদের পারিশ্রমিক আরও কম। এমতাবস্থায় ফেডারেশনের উদ্যোগের ফলে কলাকুশলীরা খুব ভাল আছেন – একথা বলা অর্থহীন। এরকম একটা ইন্ডাস্ট্রিতে সক্রিয় শিল্পীদের কাজ করতে না দিলে কাজ যে আরও কমে যায়, তা বুঝতেও বোদ্ধা হওয়ার দরকার নেই। কারখানায় কাজ না হলে শ্রমিক কী করে ভাল থাকতে পারেন? যে ট্রেড ইউনিয়ন কাজ কমিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, সে শ্রমিক দরদী, সে প্রয়োজনীয় – একথারই বা মানে কী? আসলে যা চলছে তা যে ট্রেড ইউনিয়নের নামে গুন্ডামি বা আমির খান অভিনীত গুলাম ছবির মত মাফিয়ারাজ, তা বুঝতে অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতা লাগে না।
আরো পড়ুন বাংলা মাধ্যম স্কুলের পর বাংলা সিনেমা উঠে যাওয়ার পালা?
বলিউডের অনেক হিট ছবির মতই ওই ছবিটাও একখানা হলিউডি ছবির পুনর্নির্মাণ। অন দ্য ওয়াটার ফ্রন্ট নামের সেই ছবিতে নায়কের চরিত্রে ছিলেন মার্লন ব্রান্ডো, পরিচালক এলিয়া কাজান। মূল ছবি আর তার পুনর্নির্মাণ – দুটোতেই নায়ককে অনেককিছু খোয়াতে হয়, আক্ষরিক অর্থে মারও খেতে হয়। ওটা কিন্তু গল্প হলেও সত্যি। কাজান ছবিটা বানিয়েছিলেন পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ম্যালকম জনসনের একগুচ্ছ প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে। সেসব যদি বাদও দেন, ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের দিকে তাকালেও বুঝবেন যে আন্দোলনকারীদের ত্যাগ ছাড়া কোনো আন্দোলন হয় না। আজকাল ও জিনিসটারই অভাব, তাই কোনো প্রতিবাদই ফেসবুকের বাইরে বেশিদূর ছড়ায় না, অভীষ্ট লক্ষ্যেও পৌঁছয় না। কারণ আজকাল রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরাও প্রতীকী প্রতিবাদের বেশি কিছু করতে চান না। এই ১৩ জন পিটিশনার কিন্তু নিজেদের রুজি রোজগার বাজি রেখে লড়তে নেমেছেন। আর জি কর আন্দোলনে কেন মুখ খোলেননি, কেন একটা কথাও বলেননি – এসব বলে অনির্বাণকে আক্রমণ করতে পারেন। তৃণমূল সরকার গঠিত কমিটিতে ছিলেন বলে পরমব্রত, সুদেষ্ণাকেও গাল দিতে পারেন। কিন্তু নিজের অফিসে একটা সামান্য দাবির জন্যে লড়ে দেখুন, টের পাবেন যে মোমবাতি হাতে কদিন রাতে মিছিলে যাওয়া আর ক্যামেরার সামনে বাইট দেওয়া অতি সহজ কাজ। খেয়াল করবেন, আর জি কর আন্দোলনের সময়ে টলিউডের যে তারকারা ও কাজটা গোড়ায় করেছিলেন এবং পরে চেপে গিয়েছিলেন, তাঁদের কিন্তু তৃণমূল নেতা পরিচালিত ফেডারেশন বয়কট করছে না। কারণ ওতে ক্ষমতার কাঁচকলা।
ভাবুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন। আর যদি মনে হয় বাংলা সিনেমার ভবিষ্যতের জন্যে, বাঙালি সংস্কৃতির জন্যে এই লড়াইয়ের এক কণাও দাম আছে – তাহলে তির্যক মন্তব্য বন্ধ রাখুন। যদি এই লড়াইয়ের গুরুত্ব আরও বেশি বলে মনে করেন, তাহলে পাশেও দাঁড়াতে পারেন। বাংলা সিনেমার পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে অনেক জরুরি কাজ হবে সেটা। আইনি লড়াইয়ে কীভাবে পাশে দাঁড়াবেন? আগ্রহ থাকলে প্রশ্নটা নিজেই তুলুন, উত্তর পেয়ে যাবেন।
নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত
