অনির্বাণ কাজ পাচ্ছেন না: টালিগঞ্জের অর্ধসত্য বা হিমশৈলের চূড়া

অর্ধসত্য যে মিথ্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর সে তো সকলেই জানেন। কিন্তু ক্লিকটোপের যুগে অর্ধসত্য আবার সত্যের চেয়ে সুবিধাজনকও বটে। অর্ধসত্যে ক্লিক পাওয়া যায় বেশি, তাই সংবাদমাধ্যমের সুবিধা। অর্ধসত্য নিয়ে কয়েকদিন সোশাল মিডিয়ায় রাগ-টাগ দেখিয়ে বিবেক দংশন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, তাই যে সংবাদ গিলছে তার সুবিধা। আবার পুরো সত্যটা জেনে গেলে হয়ত ব্যক্তির এত বেশি রাগ হবে বা গ্লানি হবে যে সত্যিকারের কিছু একটা করতে ইচ্ছে হবে। সেটা ব্যক্তির পক্ষে বিপজ্জনক, ব্যক্তি সমষ্টি হয়ে উঠলে ক্ষমতার পক্ষেও। এরকমই একটা অর্ধসত্য নিয়ে কদিন ধরে বাংলার নিস্তরঙ্গ সংস্কৃতি জগৎ কিছুটা উত্তাল – অনির্বাণ ভট্টাচার্য কাজ পাচ্ছেন না। গোটা ব্যাপারটা যা, তাতে এই খবরটাকে অর্ধসত্য না বলে সোয়া সত্য বা এক দশমাংশ সত্য বললেও ভুল হয় না।

ব্যাপারটা কী আসলে? ব্যাপার হল, টলিউডের কিছু শিল্পীকে কলাকুশলীরা (আজকাল বাংলায় যাঁদের টেকনিশিয়ান বলা হয়) বয়কট করেছেন। কী করে জানা গেল বয়কট করা হয়েছে? কেউ ঘোষণা করেছে? না। কিন্তু ওই শিল্পীরা কোনো ফিল্মের বা ওয়েব সিরিজের নির্দেশক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা, গীতিকার, গায়ক বা অন্য যে ভূমিকাতেই থাকুন না কেন – শুটিংয়ের জন্য ডাকলে কোনো কলাকুশলী যাচ্ছেন না। এই বয়কটের আওতায় পড়ে যাওয়া শিল্পীদেরই একজন অনির্বাণ। এমনকি তিনি তাঁদের গানের দল হুলিগানইজমের মিউজিক ভিডিও শুট করতে গিয়েও দেখেন কোনো কলাকুশলী আসেননি। কিন্তু মূলধারার সংবাদমাধ্যম যেভাবে শুধু অনির্বাণের নাম নিয়ে হইচই করেই ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে চাইছে, তাতে বোঝা যায় যে গভীরে যাওয়ার সাধ নেই। হয়ত সাধ্যও নেই, কারণ সেটা করতে গেলে সরাসরি এ রাজ্যের ক্ষমতাসীনদের চটাতে হবে।

ঘটনা হল, অনির্বাণের একার ভাত মারার চেষ্টা চলছে না টালিগঞ্জে। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে তাঁর পাশাপাশি বাংলা ছবি ও সিরিজের দর্শকদের পরিচিত মুখ পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের নামোল্লেখ করা হয়েছে। বিকল্প সংবাদমাধ্যমগুলো এঁদের পাশাপাশি নির্দেশক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর নামও করেছে, কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে টিভির এক সময়কার পরিচিত মুখ এবং বড় পর্দার বেশকিছু ছবির পরিচালক সুদেষ্ণা রায়ের উল্লেখও করা হয়েছে। এও সেই সোয়া সত্যেরই বেসাতি। এর সুবিধা হল, পাঠক/দর্শক ভাববেন বা তাঁদের ভাবানো যাবে যে এই দু-চারজনের সঙ্গে দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের কোনো ব্যক্তিগত ঠোকাঠুকি লেগেছে। একেকজনের অতীত কার্যকলাপ উল্লেখ করে ‘যা হচ্ছে ওদের নিজেদের মধ্যে হচ্ছে, আমাদের ভাবার দরকার নেই’ – এরকম একটা বয়ান খাড়া করে দেওয়া যাবে। ফলে কয়েকদিন হইচইয়ের পরে সবাই ব্যাপারটা ভুলে যাবে, সোশাল মিডিয়ার যুগে হইচই করার মত নতুন কিছু ঠিক এসে পড়বে (এক্ষেত্রে যেমন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মাতৃভাষা সম্পর্কে হীনমন্যতা এসে পড়েছে)। ফলে কেউ আর খুঁজে দেখতে যাবে না, আসলে কী হয়েছে।

এই কুচক্র থেকে বেরোতে প্রথমেই বলা যাক যে বয়কট হচ্ছেন মূলত ১৩ জন। কোন ১৩ জন? যে ১৩ জন কলকাতা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেছেন এই মর্মে, যে ভারতের একজন নাগরিকের এদেশে কাজ করে উপার্জন করার যে সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার রয়েছে, তা লঙ্ঘন করা হচ্ছে তাঁদের বেলায়। কাজ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এই ১৩ জন কারা? সুদেষ্ণা রায়, সুব্রত সেন, কিংশুক দে, বিদুলা ভট্টাচার্য, আশিস সেন চৌধুরী, সুমিত দাম, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, অভিষেক সাহা, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, দেবাশীষ চক্রবর্তী, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, প্রসেনজিৎ মল্লিক, সৌরভ ভট্টাচার্য।

বাংলা সিনেমার যাঁরা রীতিমত খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের কাছেও হয়ত বেশিরভাগ নাম অচেনা। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে এই তালিকার কারোর কাজ করার অধিকার অন্যদের চেয়ে কম। সুতরাং বোঝা দরকার, একটা বিরাট অন্যায় ঘটে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা শিল্পে এবং সেই অন্যায় ঘটছে রাজ্য সরকারের মদতে। এটা আমার মতামত নয়। পিটিশনাররা এই দাবিটাই করেছেন। বস্তুত, রিট পিটিশন সরকারের বিরুদ্ধেই দাখিল করা যায়। কারণ নাগরিকের যে কোনো সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। ফলে এই শিল্পীদের কাজ করতে না দেওয়ার পিছনে টলিউডের কুখ্যাত ফেডারেশন – যার কর্তা মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস – আছেন বলে অভিযোগ থাকলেও, পিটিশন কিন্তু করা হয়েছে সরকার পিটিশনারদের অধিকার রক্ষা করছে না, এই অভিযোগে। এতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিক্রিয়া কী?

গতবছর এই জুলাই মাসেই যখন টালিগঞ্জে ফেডারেশন বনাম পরিচালক টানাপোড়েন শুরু হয় শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস প্রযোজিত এবং রাহুল মুখার্জি নির্দেশিত একটি ছবির শুটিং নিয়ে এবং তার জেরে কাজ বন্ধ হয়ে যায় পুরো সিনেমাপাড়ায়, তখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি স্বয়ং সব পক্ষকে ডেকেছিলেন। সেই সভায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে সরকার একখানা কমিটি গঠন করে দেবে এবং সেই কমিটি সব মিটিয়ে দেবে। সে কমিটিও গঠন হল না আর তা নিয়ে বিস্তর ইমেল পাঠানোর পরেও কোনো জবাব পাওয়া গেল না দেখে পরিচালকরা আদালতে এই পিটিশন দাখিল করলেন। মজার কথা, হাইকোর্টে বিচারপতি অমৃতা সিনহার এজলাসে এই মামলার শুনানিতে কিন্তু রাজ্য সরকারের কৌঁসুলি কেবলই প্রমাণ করার চেষ্টা করে গেছেন যে এই মামলার দুটি পক্ষ হল ফেডারেশন আর পরিচালকরা। এতে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই, কিছু করার নেই। বিচারপতি অবশ্য সেকথায় আমল দেননি। ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন জানিয়েও রাজ্য সরকার সুবিধা করতে পারেনি। মামলা আবার ফেরত এসেছে বিচারপতি সিনহার এজলাসেই। ইতিমধ্যে বিচারপতি সিনহার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের সচিবকে দেওয়া স্পষ্ট নির্দেশ সত্ত্বেও পিটিশনারদের কাজে বাধা পড়ায় তাঁরা আদালত অবমাননার মামলাও করেছেন। সে মামলার শুনানি হওয়ার কথা আগামীকাল। তাহলে ভাবুন, রাজ্য সরকার ফেডারেশনের স্বার্থরক্ষায় কতখানি মরিয়া আর পরিচালকদের নাগরিক অধিকার রক্ষায় কতখানি উদাসীন। অর্থাৎ ব্যাপারটা স্রেফ অনির্বাণ বা কয়েকজন শিল্পীকে কলাকুশলীদের বয়কট করার ব্যাপার নয়। এ রাজ্যে যে কোনো নাগরিক আইনি পথে নিজের কাজকর্ম করতে পারবেন কি পারবেন না – প্রশ্নটা সেইখানে।

সমস্যার গভীরতা বোঝার জন্যে আরও দুটো তথ্য খুব জরুরি। এই পিটিশন যখন দাখিল করা হয় তখন পিটিশনার ছিলেন ১৫ জন, এখন ১৩। গত এক বছরে আরও একটি মামলা দায়ের করেছেন বয়কট হয়ে যাওয়া শিল্পীরা। সেটা সরাসরি ফেডারেশনের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা স্বরূপের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা, কারণ তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন যে বেশিরভাগ নির্দেশকের নামেই নাকি যৌন হয়রানির অভিযোগ জমা পড়েছে তাঁর কাছে। সেই মামলা করেছিলেন ২৩০-৩৫ জন। মামলার শুনানি এখনো শুরুই হয়নি, অথচ ৭০-৮০ জন মামলাকারী মামলা প্রত্যাহার করে ফেলেছেন।

কেন এমন হল? ঠিক যে কারণে প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যস্ত রাস্তায় খুন হওয়ার পরেও পুলিস একজন সাক্ষী পায় না খুনিকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্যে। ঠিক যে কারণে আর জি কর কাণ্ডের সময়ে সারা রাজ্যের মেডিকাল কলেজের জুনিয়র ডাক্তাররা হুমকি সংস্কৃতির কথা বলছিলেন; যে কারণে সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজে ছাত্রীর ধর্ষণের পর জানা যাচ্ছে, ম্যাংগো কুমার আগেও বিস্তর কুকর্ম করেছে। কিন্তু কেউ তার টিকি স্পর্শ করতে পারেনি। উপরন্তু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে যে রাজ্যের বহু কলেজই নানা জাতের ম্যাংগোর গন্ধে বারো মাস ম ম করে। এহেন ম্যাংগোরাই এ রাজ্যের সর্বময় কর্তা এখন। গত ২০ জুন উত্তরবঙ্গ সংবাদের পাতায় বর্ষীয়ান সাংবাদিক রূপায়ণ ভট্টাচার্যকে লিখতে হয়েছে

মমতা রাত জেগে টিভি সিরিয়াল দেখেনতাঁর মতো করে সাহিত্যচর্চা করেনসবার জানা। অথচ টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিই সবচেয়ে বিপন্ন শিল্প। সাহিত্য আকাদেমিনাট্য আকাদেমিতেও হাত মিলিয়ে অনেক কাজ চলছেযা দিদিই জানেন না। যে কোনও সময় টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিতে তালাচাবি লেগে যাবে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপের দাদাগিরিতে। এই স্বরূপ কাউন্সিলারও ননঅথচ মমতা-অরূপকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে প্রসেনজিৎ-দেব-সৃজিত-কৌশিক-পরমব্রত-অনির্বাণদের কাজ বন্ধ করতে এক মিনিট লাগে তাঁর। এক বছর ধরে স্বরূপ তাঁর স্বরূপ বোঝাচ্ছেন মিটিং না ডেকে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ না মেনে। মমতা রহস্যজনক চুপ। মাঝে তিনি নিজের ভাই বাবুনকে পর্যন্ত কিছুদিনের জন্য ত্যাজ্য করেছিলেন। এখানে এসব হয় না।

দেব-শতাব্দী-জুন থেকে শুরু করে সায়নী-লাভলি-সায়ন্তনীরা তৃণমূলের এমপিএমএলএ। অথচ মমতা স্থানীয় বিধায়কের কীর্তিমান ভাইকে টালিগঞ্জ সামলাতে দিলেন কেনসাহিত্যজগৎ কি তাহলে কলেজ স্ট্রিটের বিধায়কের ভাই সামলাবেনযাত্রাপাড়া চিৎপুরের বিধায়কের ভাইখেলার ময়দান চৌরঙ্গির বিধায়কের ভাইঅরূপকে দিদি অনেক জায়গায় জট খুলতে পাঠান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অরূপ সফলসবাইকে নিয়ে চলার গুণের জন্য। শুধু ভাইকেই সামলাতে চূড়ান্ত ফ্লপ। অভিনেতারা বলেনভাই এখন দাদাকেই পাত্তা দেয় না। মমতার প্রতি সহানুভূতি সম্পন্নদের সঙ্গে রাজ্য সরকারের ঝামেলা লাগিয়ে দিতে ওস্তাদ স্বরূপ কোম্পানি।

এরপরেও যদি আপনি কেন-র উত্তর না পান, তাহলে দেখে নিন স্বরূপের নেতৃত্বাধীন ফেডারেশনের গুণগান করে তৈরি বাংলা ছবির তথাকথিত ফার্স্ট বয় সৃজিত মুখার্জি, গতবছর জুলাইয়ে যাঁর ছবির কাজ বয়কট নিয়ে এই বিবাদের সূত্রপাত সেই রাহুল মুখার্জি এবং সঙ্গীত পরিচালক তথা পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের ভিডিও।

এই ভিডিও পোস্ট করা হয়েছিল গত ১১ জুন, যুযুধান পরিচালকরা তাঁদের বক্তব্য জানিয়ে দুখানা ভিডিও ৩০ এপ্রিল ও ২৮ মে প্রকাশ করার পর। মজার কথা, মামলাকারী পরিচালকরা ভিডিওগুলো পোস্ট করেছেন একখানা স্বতন্ত্র ইউটিউব চ্যানেলে এবং নিজ নিজ সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলগুলোতে। ফেডারেশনের গুণগান করা ত্রয়ীর ভিডিও কিন্তু পোস্ট হয়েছে ফেডারেশনেরই ফেসবুক পেজ থেকে। আরও মজার কথা, পর্দায় এক কোণে তিন পরিচালককে দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে আছে একটি বাণী

আমরা একসাথে
কাজ করার পক্ষে
মিথ্যা মামলার বিপক্ষে।
ফেডারেশনে ছিলাম
আছি থাকবো

এই ভিডিওতে কলাকুশলীরা যে ছবি বানানোর কাজে নির্দেশকদের সমান জরুরি, সেকথা বলা হয়েছে। গোটা টলিউড যে পরিবারের মত, তাও বলা হয়েছে। এমনকি ‘স্বরূপদা’ কত ভাল – সেকথাও বলেছেন সেই রাহুল, যিনি ফেডারেশনের অনুমতি না নিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে একখানা ওয়েব সিরিজের শুটিং করে এসেছিলেন বলে তাঁর এখানকার ছবির শুটিং করতে দেওয়া হচ্ছিল না। তা থেকেই গোটা গোলমালের সূত্রপাত। তাঁর পাশে দাঁড়িয়েই ফেডারেশনের গা জোয়ারির প্রতিবাদ আরম্ভ করেছিলেন সুদেষ্ণা, ইন্দ্রনীল, সুব্রত, পরমব্রত, অনির্বাণ, বিদুলা প্রমুখ। সৃজিত প্রথম থেকেই ধারেকাছে ঘেঁষেননি; কৌশিক গাঙ্গুলি, শিবপ্রসাদ মুখার্জিরা মাঝপথে সরে পড়েছেন। রাহুল স্বয়ং ‘স্বরূপদা’-র ভক্ত হয়ে গেছেন। তা হোক, সকলের মেরুদণ্ড কখনো সমান শক্ত হয় না। কিন্তু উপরের ভিডিওতে লক্ষ করার মত বিষয় হল, রাহুল বলছেন, তিনি ‘স্কেপগোট’ হয়েছিলেন, ফেডারেশনের সঙ্গে তাঁর ‘সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল’ এবং তারপর তিনি প্রায় ২২২ দিন বেকার ছিলেন। অর্থাৎ প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেওয়া হল যে ফেডারেশন (বা স্বরূপদা) হল কুমীর। টালিগঞ্জের জলে থেকে তার সঙ্গে বিবাদ করলে কাজ পাওয়া যায় না। সৃজিত আর ইন্দ্রদীপ ফেডারেশনকে খুব প্রয়োজনীয় সংস্থা বলেছেন, কেন প্রয়োজনীয় তা বলেননি। টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের জন্য কী কী ভাল কাজ ফেডারেশন করেছে বা করছে – তা বলার বিন্দুমাত্র চেষ্টা নেই। সৃজিত ভিডিওর শুরুতেই ছিলেন। তিনি তো যা বলছেন তা কেন বলছেন তা-ই ভেবে পাচ্ছেন না বলে মনে হয়। কথা আটকে যায়, তারপর অনেক কষ্টে খুঁজে বার করেন ‘অসুবিধা হচ্ছে’ শব্দবন্ধ। কী অসুবিধা, কেন অসুবিধা – সেসবের মধ্যে যাননি। ইনিয়ে বিনিয়ে তিনজনেই বলেছেন, যে অসুবিধাই হয়ে থাক তা আলাপ আলোচনা করে মিটিয়ে নেওয়াই উচিত। আদালতে যাওয়া অন্যায় হয়েছে।

টলিউড যদি সত্যিই একটা পরিবার হয়, তাহলে বলতেই হবে যে এ হল গার্হস্থ্য হিংসায় লিপ্ত পরিবারের ভাষা। দীর্ঘদিন নির্যাতিত বাড়ির বউ যেই থানায় গিয়ে ডায়রি করে দেয়, অমনি শ্বশুরবাড়ির লোক বলতে শুরু করে ‘বাড়ির ঝামেলা বাড়িতেই মেটানো উচিত ছিল। এসব নিয়ে কেউ থানা-পুলিস করে? ছি ছি! পরিবারের একটা মানসম্মান নেই?’ উপরন্তু, আলোচনায় যে ফেডারেশনই বসেনি, সেকথাও চেপে গেছেন পরিচালক ত্রয়ী। আর ‘মিথ্যা মামলা’ কথাটা কিন্তু কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিরা এখন পর্যন্ত মানেননি।

এবার প্রশ্ন উঠবে, কী এমন নির্যাতন করা হয়েছিল যে পিটিশনার পরিচালকরা আদালতে গেলেন? এই প্রশ্নের উত্তর গত এক বছরে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবাদী পরিচালকরা সাংবাদিক সম্মেলন করে দিয়েছেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনেও বলেছেন। পুনরাবৃত্তি করে লেখার কলেবর বাড়াব না এবং পাঠকের আলস্যকেও প্রশ্রয় দেব না। যাঁরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবিত, প্রসেনজিৎ বাংলা বলতে বুক ফুলিয়ে লজ্জিত হওয়ায় যাঁরা সত্যিই ক্রুদ্ধ, তাঁরা নিজ আগ্রহে জেনে নেবেন। যাঁরা কিছু না জেনেই বোদ্ধা, তাঁদের জন্যে এ লেখা নয়। তাঁরা তো মনেই করেন না বাংলা ছবি কোনো দেখার মত জিনিস। কেন দেখার মত হয় না, তা নিয়েও এতদিন তাঁরা কোনো প্রশ্ন তোলেননি। এখন অনির্বাণ, পরমব্রতর নাম জড়িয়ে যাওয়ায় সোশাল মিডিয়ায় ‘এনগেজমেন্ট ফার্মিং’ করতে সুবিধা হবে বলে হঠাৎ এ বিষয়ে আগ্রহী হয়েছেন। ওঁরা ‘ওয়ার্ল্ড সিনেমা’ নিয়ে থাকেন, সোশাল মিডিয়ার উত্তেজনা থিতিয়ে গেলে নির্ঘাত আবার ওতেই ফিরে যাবেন।

তবে যে পাঠকরা বোদ্ধা নন তাঁদের সাধারণ বুদ্ধি আছে। তাঁরা নিশ্চয়ই বোঝেন যে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সিনেমা একটি রুগ্ন শিল্প। এখানে ছবির বাজেট কম, তাই শুটিংয়ের সময় কম, তাই নির্দেশক ও অভিনেতাদের পারিশ্রমিক কম, ফলে কলাকুশলীদের পারিশ্রমিক আরও কম। এমতাবস্থায় ফেডারেশনের উদ্যোগের ফলে কলাকুশলীরা খুব ভাল আছেন – একথা বলা অর্থহীন। এরকম একটা ইন্ডাস্ট্রিতে সক্রিয় শিল্পীদের কাজ করতে না দিলে কাজ যে আরও কমে যায়, তা বুঝতেও বোদ্ধা হওয়ার দরকার নেই। কারখানায় কাজ না হলে শ্রমিক কী করে ভাল থাকতে পারেন? যে ট্রেড ইউনিয়ন কাজ কমিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, সে শ্রমিক দরদী, সে প্রয়োজনীয় – একথারই বা মানে কী? আসলে যা চলছে তা যে ট্রেড ইউনিয়নের নামে গুন্ডামি বা আমির খান অভিনীত গুলাম ছবির মত মাফিয়ারাজ, তা বুঝতে অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতা লাগে না।

আরো পড়ুন বাংলা মাধ্যম স্কুলের পর বাংলা সিনেমা উঠে যাওয়ার পালা?

বলিউডের অনেক হিট ছবির মতই ওই ছবিটাও একখানা হলিউডি ছবির পুনর্নির্মাণ। অন দ্য ওয়াটার ফ্রন্ট নামের সেই ছবিতে নায়কের চরিত্রে ছিলেন মার্লন ব্রান্ডো, পরিচালক এলিয়া কাজান। মূল ছবি আর তার পুনর্নির্মাণ – দুটোতেই নায়ককে অনেককিছু খোয়াতে হয়, আক্ষরিক অর্থে মারও খেতে হয়। ওটা কিন্তু গল্প হলেও সত্যি। কাজান ছবিটা বানিয়েছিলেন পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ম্যালকম জনসনের একগুচ্ছ প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে। সেসব যদি বাদও দেন, ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের দিকে তাকালেও বুঝবেন যে আন্দোলনকারীদের ত্যাগ ছাড়া কোনো আন্দোলন হয় না। আজকাল ও জিনিসটারই অভাব, তাই কোনো প্রতিবাদই ফেসবুকের বাইরে বেশিদূর ছড়ায় না, অভীষ্ট লক্ষ্যেও পৌঁছয় না। কারণ আজকাল রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরাও প্রতীকী প্রতিবাদের বেশি কিছু করতে চান না। এই ১৩ জন পিটিশনার কিন্তু নিজেদের রুজি রোজগার বাজি রেখে লড়তে নেমেছেন। আর জি কর আন্দোলনে কেন মুখ খোলেননি, কেন একটা কথাও বলেননি – এসব বলে অনির্বাণকে আক্রমণ করতে পারেন। তৃণমূল সরকার গঠিত কমিটিতে ছিলেন বলে পরমব্রত, সুদেষ্ণাকেও গাল দিতে পারেন। কিন্তু নিজের অফিসে একটা সামান্য দাবির জন্যে লড়ে দেখুন, টের পাবেন যে মোমবাতি হাতে কদিন রাতে মিছিলে যাওয়া আর ক্যামেরার সামনে বাইট দেওয়া অতি সহজ কাজ। খেয়াল করবেন, আর জি কর আন্দোলনের সময়ে টলিউডের যে তারকারা ও কাজটা গোড়ায় করেছিলেন এবং পরে চেপে গিয়েছিলেন, তাঁদের কিন্তু তৃণমূল নেতা পরিচালিত ফেডারেশন বয়কট করছে না। কারণ ওতে ক্ষমতার কাঁচকলা।

ভাবুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন। আর যদি মনে হয় বাংলা সিনেমার ভবিষ্যতের জন্যে, বাঙালি সংস্কৃতির জন্যে এই লড়াইয়ের এক কণাও দাম আছে – তাহলে তির্যক মন্তব্য বন্ধ রাখুন। যদি এই লড়াইয়ের গুরুত্ব আরও বেশি বলে মনে করেন, তাহলে পাশেও দাঁড়াতে পারেন। বাংলা সিনেমার পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে অনেক জরুরি কাজ হবে সেটা। আইনি লড়াইয়ে কীভাবে পাশে দাঁড়াবেন? আগ্রহ থাকলে প্রশ্নটা নিজেই তুলুন, উত্তর পেয়ে যাবেন।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাংলা মাধ্যম স্কুলের পর বাংলা সিনেমা উঠে যাওয়ার পালা?

নয়ের দশক থেকে কলকাতার বড় বড় সংবাদমাধ্যম যে শহুরে দরকচা মারা ছবিগুলোকে বাংলা ছবির পুনরুত্থান বলে দাগিয়ে দিল, সেগুলো বস্তুত বিভিন্ন মেজ সেজ ফেস্টিভালে পুরস্কার জেতা ছাড়া বাংলা ছবির হোমেও লাগেনি যজ্ঞেও লাগেনি।

এখনো বছরে যে দু-চারটে দিন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির জন্য গর্ববোধ হয় এবং সেটাকে বাঁচানো প্রয়োজন বলে মনে হয়, আজ তার মধ্যে এক দিন। আজ বাংলা সিনেমার আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে উদযাপিত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন। মুর্শিদাবাদোত্তর, পহলগামোত্তর বাঙালি ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলার সহসা নিজের হিন্দু সত্তা আবিষ্কার এবং দিঘার উপকূলে তাঁদের আদরের রামমোহন-বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের প্রগতিশীলতা জগন্নাথদেবের পায়ে সঁপে দেওয়ার পর বলতে হবে, কপাল জোরে এই দিনটা পাওয়া গেছে। কেবল আজকের দিনেই বাংলা সিনেমা সম্পর্কে কখানা কথা লিখলে কেউ কেউ হয়ত গুরুত্ব দিয়ে পড়বেন। আগামীকালই আর তা হবে না। কারণ বিষয় হিসাবে কাশ্মীর-মুসলমান-পাকিস্তানের সহজ সমীকরণ বা কার বাড়িতে দিঘার মন্দিরের প্রসাদ পৌঁছল আর কোথায় পৌঁছল না, তা বাংলা সিনেমার হাল হকিকতের চেয়ে অনেক বেশি মুখরোচক।

সাংবাদিকতার সাবেকি নিয়ম মেনে সাম্প্রতিকতম ঘটনাটার উল্লেখ করেই আলোচনা শুরু করা যাক। গত বুধবার (৩০ এপ্রিল) বাংলা ছবির ছজন পরিচালক – অনির্বাণ ভট্টাচার্য, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, কিংশুক দে, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, বিদুলা ভট্টাচার্য, সুদেষ্ণা রায় – একখানা মিনিট পনেরোর ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন। সে বার্তা টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের প্রতি। ভিডিওতে বলা হয়েছে যে টালিগঞ্জ পাড়ার ফেডারেশন – যার সভাপতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস – এবং এই পরিচালকরা, এখন বিবদমান। যাঁরা বাংলা কাগজগুলোর বিনোদনের পাতায় নিয়মিত চোখ বোলান, তাঁদের কাছে এটা খবর নয়। কিন্তু পরিচালকরা বলছেন – কলাকুশলীদের ফেডারেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে পরিচালকরা কলাকুশলীদের বিপক্ষে। এই ভিডিও নির্মাণের উদ্দেশ্য – সেই ‘ভুল’ ধারণা দূর করা।

ভিডিওটা না দেখে থাকলেও, এই পর্যন্ত পড়েই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে গণ্ডগোল এতদূর গড়িয়েছে, এ রাজ্যের সমস্ত বিবাদেরই নিষ্পত্তি করে দেওয়ার ক্ষমতা ধরেন যিনি, তাঁর উপরেও ভরসা রাখতে পারেনি কোনো পক্ষই। টালিগঞ্জ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বাসস্থান থেকে বেশি দূরে নয়। তার উপর ফেডারেশন সভাপতি তাঁরই মন্ত্রিসভার সদস্যের ভাই। তা সত্ত্বেও তাঁরা দিদির হস্তক্ষেপে পরিচালকদের সঙ্গে বিবাদ মিটিয়ে নেননি। নিলে পরিচালকরা এই অভিযোগ করতেন না। আবার পরিচালকরাও মুখ্যমন্ত্রীর ছত্রছায়ায় গেলেই নিজেদের অভাব অভিযোগ দূর হবে – এ বিশ্বাস রাখতে পারেননি। ফলে ভিডিও করে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ভিতরের বিবাদ প্রকাশ্যে এনে ফেলেছেন। পুরো ভিডিও দেখলে মালুম হয় – বাধ্য হয়েছেন।

কেন হল এরকম?

সংবাদমাধ্যমে আগে প্রকাশিত হয়েছে, এই ভিডিওতেও পরিচালকরা জানিয়েছেন যে তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাননি তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি একটি কমিটি তৈরি করে দেবেন, যে কমিটি সব পক্ষের কথাবার্তা শুনে বিবাদ মেটানোর ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সেই কমিটি গঠন করতে গেলে যে সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হয়, সেটাই পরবর্তী তিন মাসে হয়নি। পরিচালকরা তারপরেও এক মাস অপেক্ষা করেন। সরকার নট নড়নচড়ন। পরিচালকদের একাধিক ইমেলেরও জবাব দেওয়া হয়নি। অতঃপর তাঁরা সাংবাদিক সম্মেলন করে ফেডারেশনের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে সর্বসমক্ষে অভিযোগ করেন। এই তাঁদের মহাপাপ। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন পেশার মানুষ জানেন, কর্মস্থলে যা অত্যাচার অবিচার হয় সেসব নিয়ে প্রকাশ্যে কথা না বলাই দস্তুর। সমাধান চাইলে যাঁরা অত্যাচার অবিচার করলেন তাঁদের কাছেই হাতজোড় করে দাঁড়ানো নিয়ম। তাঁরা সদয় না হলে খুব বড় অপরাধেও পুলিস এফআইআর নিতে চায় না। সেখানে এই পরিচালকরা একেবারে সাংবাদিক সম্মেলন করে বসলেন! ঘাড়ে কটা মাথা! ভিডিওতে পরিচালকদের অভিযোগ – এরপর থেকেই শুরু হয় সেই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত পরিচালকদের কাজ করতে না দেওয়ার ব্যবস্থা। ওঁদের শুটিংয়ে কলাকুশলীদের কাজ করতে বারণ করা হয়। তার ফলেই নাকি তাঁরা (এই ছজন সমেত মোট ১৫ জন পরিচালক) আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।

যে বাংলায় পুলিসে যাওয়াই সাধারণ মানুষের পক্ষে স্থানে স্থানে মহাপাতক, সেখানে একেবারে কলকাতা হাইকোর্টে ফেডারেশনের সর্বময় কর্তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করে বসেছেন এঁরা। সে মামলার ইতিমধ্যেই দুটি শুনানি হয়েছে, সে খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছে। বিচারপতি অমৃতা সিনহা যে নির্দেশগুলো দিয়েছেন তাতে পরিচালকদের হাত শক্ত হয়েছে। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, পরিচালকদের কাজে ফেডারেশন কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এমনকি যে ইউনিক কার্ড ফেডারেশনের তুরুপের তাস, যা না থাকলে সিনেমাপাড়ায় কাউকে কাজ করতে দেয় না তারা, সেই কার্ডকেও মূল্যহীন বলেছেন বিচারক। কিন্তু হলে হবে কী? আদালত নির্দেশ দিলেই মানব – এত সুবোধ বালকদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ নয়। ওই নির্দেশের পরেও সুদেষ্ণা রায়ের ছবির শুটিং শুরু করতে গিয়ে ঠিক তাই ঘটেছে, যা রাহুল মুখার্জির ছবির শুটিং নিয়ে গতবছর জুলাই মাসে ঘটায় টলিপাড়ার সমস্ত কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ শুটিং সূচি ঘোষণা হওয়ার পরেও একজন কুশীলবও কাজ করতে আসেননি।

সেই থেকে অচলাবস্থা চলছে টালিগঞ্জে। মুখ্যমন্ত্রী হয় মেটাননি, অথবা ধরে নিতে হবে, তাঁর নির্দেশকেও অগ্রাহ্য করার মত শক্তি টলিপাড়ার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা স্বরূপবাবুর আছে। আদালতের নির্দেশের পরেও সুদেষ্ণার ছবির কাজ বাতিল হয়ে যাওয়ায় আদালত অবমাননা হয়েছে কিনা, হয়ে থাকলে স্বরূপবাবু বা অন্য কেউ শাস্তির পাত্র কিনা, নাকি গোটা ঘটনায় তাঁর কোনো ভূমিকাই নেই – তার বিচার আদালতে হবে। কিন্তু সাড়ে ১৫ মিনিটের ভিডিওতে পরিচালকরা অভিযোগ করেছেন যে ফেডারেশনের ভয়েই কুশীলবরা নির্দিষ্ট কিছু পরিচালকের ছবিতে কাজ করতে আসছেন না। একথা সত্যি না মিথ্যা তা বলা মুশকিল, তবে হাইকোর্ট যে এই অভিযোগকে সত্যি বলেই গণ্য করেছে তার ইঙ্গিত বিচারপতির নির্দেশে রয়েছে। স্বরূপবাবু অবশ্য প্রকাশ্যে খুবই ভদ্রলোক। যতবার সংবাদমাধ্যম তাঁর কাছে এই গণ্ডগোল নিয়ে কিছু জানতে চায়, তিনি হয় বলেন আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না, নতুবা বলেন এসব তাঁর ফেডারেশনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত। যেমনটা বুধবারের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরে বলেছেন

পশ্চিমবঙ্গে এখন বিরাট বিরাট ঘটনা ঘটছে। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের নিয়োগ দুর্নীতির ফলে এক লপ্তে ২৬,০০০ মানুষের চাকরি গেছে। এদিকে মুর্শিদাবাদের দাঙ্গা এবং পহলগামের সন্ত্রাসবাদী হামলার পর সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাও বাংলার বাসিন্দাদের এ রাজ্যে এবং ভিনরাজ্যে নানাভাবে বিপদে ফেলছে। সরকারি টাকায় মন্দির তৈরি এবং তার উদ্বোধন উপলক্ষে ঘুরপথে আমিষ খাওয়াদাওয়া বন্ধ করার চেষ্টার মত অভূতপূর্ব ঘটনাও ঘটে গেছে। এতকিছুর মধ্যে বাংলা সিনেমার জগতে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা নিয়ে দীর্ঘ লেখা ফেঁদে বসার কী দরকার? প্রশ্নটা সঙ্গত এবং উত্তরটা জরুরি।

যা যা ঘটছে সবই রাজনৈতিক এবং সিনেমাপাড়ায় যা ঘটছে তাও মোটেই অরাজনৈতিক নয়। একেবারে গোদা অর্থে রাজনৈতিক তো বটেই, কারণ পরিচালকদের অভিযোগের তির শাসক দলের নেতা স্বরূপবাবুর দিকে। কিন্তু কেবল দলীয় রাজনীতির কথা ভাবলে চলবে না। জুলাই মাস থেকে এ পর্যন্ত ঘটনা পরম্পরা লক্ষ করলে বোঝা যায় যে টালিগঞ্জের এই ‘বিদ্রোহী’ পরিচালকরা যে অভিযোগ করছেন, তার সঙ্গে আর জি কর কাণ্ডের পর রাজ্যের বিভিন্ন মেডিকাল কলেজের ডাক্তাররা যে অভিযোগ করেছিলেন তার কোনো মৌলিক তফাত নেই। দুই ক্ষেত্রেই মূল অভিযোগ হল – হুমকি সংস্কৃতি চলছে। চোখ রাঙিয়ে, ভয় দেখিয়ে এক পক্ষ তাদের যা ইচ্ছে তাই করিয়ে নিতে চাইছে। প্রতিবাদ করলে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ঠিক যেভাবে সেকালে গ্রামদেশে মোড়লের বিরুদ্ধাচরণ করলে ধোপা নাপিত বন্ধ করিয়ে দেওয়া হত।

আমি, আপনি কোন ছার; রুপোলি পর্দার লোকেরা, তারকারা, এরকম ভয়ের পরিবেশে কাজ করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন। ব্যাপারটা এই রাজ্যের শুভাকাঙ্ক্ষী সকলকে ভাবিয়ে তোলার মত। শাসক দলের অনুগতরা টালিগঞ্জ পাড়ায় কলাকুশলী হিসাবে কাজ পায়, ছবিতে কাজ করতে যত লোক লাগা উচিত চাপ দিয়ে তার চেয়ে বেশি লোককে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় – এসব অভিযোগ যে তৃণমূল সরকারের আমলেই প্রথম উঠছে এমন নয়। কিন্তু কথা হল, স্বাস্থ্যবান মানুষের খানিকটা রক্ত মশা খেলে বিশেষ ক্ষতি হয় না। কিন্তু যে রক্তাল্পতায় ভুগছে তাকেও যদি রোজ একপাল মশা ছেঁকে ধরে, তাহলে অল্পদিনেই মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। ইন্ডাস্ট্রি হিসাবে বাংলা ছবি এখন সেই স্তরে পৌঁছে গেছে, অথচ ফেডারেশনের প্রতাপ কমছে না। ফলে কাজ আরও কমে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে মাত্র ৩৬ খানা ছবি তৈরি হয়েছে, যা নাকি গত ১৫ বছরে সর্বনিম্ন। ফেডারেশনের উদ্ভট সব নিয়মের ঠ্যালায় (পড়ুন দাবির ঠ্যালায়, কারণ আইনত কোনো নিয়ম বানানোর অধিকার ফেডারেশনের নেই) বাংলা ছবির প্রযোজকের সংখ্যা কমছে, বাইরের কোনো ফিল্ম ইউনিটও আর পারতপক্ষে কলকাতায় শুটিং করতে আসছে না। বাংলা ছবির অভিনেতারা কাজের অভাবে কেউ মুম্বাই পাড়ি দিচ্ছেন, কেউ ইউটিউব চ্যানেল খুলে টক শো চালাচ্ছেন, কেউ অন্য ব্যবসাপত্র খোলার কথা ভাবছেন। বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ছবির পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য, কেবল সিনেমা করে জীবিকা নির্বাহ করা শক্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে – একথা স্পষ্টাস্পষ্টি বলে গতবছর কর্পোরেট চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু অভিনেতা, পরিচালকদের হাতে না হয় এসব বিকল্প রয়েছে। যাঁরা মেক আপ করেন, আলোর কাজ করেন, জুনিয়র আর্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন অথবা স্রেফ সেটে ফাইফরমাশ খাটেন – তাঁদের তো আর নেই। এমন চললে তাঁরা যাবেন কোথায়? ফেডারেশন নিজেদের যাদের লোক বলে দাবি করছে, তাঁদেরই তো আক্ষরিক অর্থে পথে বসতে হবে। সান্ত্বনা হিসাবে তখন বড়জোর বলা যাবে ‘মনখারাপ করবেন না। আপনাদের আগে ডাক্তার আর শিক্ষকরাও পথে বসেছেন।’

গুন্ডামিই আইন হয়ে দাঁড়াবে, তার সঙ্গে আপোস করে স্রেফ নিজেরটুকু নিয়ে ভেবে তথাকথিত ‘ফার্স্ট বয়’-রা ছবি বানাবেন, বিশেষ ক্ষমতাশালী নায়কের ছবি নিয়ে বিপুল সোশাল মিডিয়া প্রচার চলবে – মাঝরাতে অমুক জায়গায় শো হাউসফুল, তমুক ছবি ব্লকবাস্টার। আর যাঁরা ইন্ডাস্ট্রির দমবন্ধ করা বর্তমান ও ভয়াবহ ভবিষ্যৎ ভেবে প্রতিবাদ করবেন তাঁদের একঘরে করা হবে। ফলে ইন্ডাস্ট্রিতে ক্রমশ কাজ কমবে। এভাবে ধুঁকতে ধুঁকতে একটা ভাষার ছবি কতদিন বেঁচে থাকতে পারে? এমনিতেই দুনিয়া জুড়ে সিনেমাশিল্পের এক ধরনের সংকট চলছে। হলিউড বা বলিউডও তার বাইরে নয়। তার উপর টলিউডের মত ছোট বাজারসম্পন্ন, আগে থেকেই দুর্বল হয়ে থাকা ইন্ডাস্ট্রিতে যদি সিনেমার বাইরের লোকেদের গা জোয়ারিই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বাংলা ছবি বাঁচবে কী করে?

বাঙালিদের মধ্যে এমন সিনেমাবোদ্ধার অভাব নেই, যাঁরা নাকটা আকাশের দিকে তুলে বলবেন ‘বাংলা ছবি না বাঁচলেই বা কী? যা সব ছবি বানায়…’। একথার উত্তর দেওয়ার আগে কতকগুলো তেতো কথা বলা দরকার।

প্রথমত, ফেডারেশন বনাম পরিচালকদের দ্বন্দ্ব টলিউডের যে কঙ্কালসার চেহারা তুলে ধরেছে তা দিয়ে শৈল্পিক দিক থেকে ভাল ছবি হওয়া অসম্ভব বললেই চলে। প্রয়াত অশোক মিত্রের কথা ধার করে বলতে হয়, অভাবের সংসারে ‘তেইশ বছরের আপাত-উঠতি শরীরেও, স্তন আর স্তন থাকে না, দুদিনেই তা হেলে প’ড়ে মাই হয়ে যায়।’ আজকাল বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছায়াছবির শুটিং হয় ১৪-১৫ দিনে। এতেই মাস্টারপিস বানাতে গেলে নির্দেশক, চিত্রগ্রাহক, সঙ্গীত পরিচালক, অভিনেতা – সকলকেই জিনিয়াস হতে হবে। একসঙ্গে এত জিনিয়াস কোনো দেশে কোনোকালেই সুলভ ছিল না।

আরও পড়ুন সিনেমার হাত ধরে ভারতীয়দের বিশ্বজয় চলছে বহুকাল ধরে 

দ্বিতীয়ত, যে তিন বাঙালি পরিচালককে জিনিয়াস গণ্য করে আজকাল আমরা বুক ফোলাই, তাঁদের কর্মজীবনে মোটেই সমস্ত ছবি হল ভরে দেখতে যায়নি বাঙালি দর্শক। গেলে ঋত্বিক ঘটক হতাশায় ক্রমশ বেশি বেশি করে মদে ডুবে যেতেন না, অকালে মারাও যেতেন না হয়ত। তাঁর মৃত্যুর পরেও কলকাতা এমন কিছু উদ্বেল হয়নি। সত্যজিৎই বাণিজ্যিক সাফল্যের মুখ দেখেছেন অনেকটা। তাও তাঁর সবচেয়ে শৈল্পিক কাজগুলোর চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে গুগাবাবা, হীরক রাজার দেশে আর ফেলুদার ছবিগুলো। মৃণাল সেনের ছবি তো খুব জনপ্রিয় হওয়ার কথাও নয়। তাঁর বক্তব্য আলাদা, শৈলীও আলাদা। বাংলা ছবিকে বাঁচিয়ে রেখেছিল আসলে সিনেমাবোদ্ধাদের হেলাশ্রদ্ধার পাত্র হয়ে থাকা ছবিগুলো। সেসব ছবি বানাতেন তপন সিংহ, অজয় কর, দীনেন গুপ্ত, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, তরুণ মজুমদার, প্রভাত রায়, অঞ্জন চৌধুরী প্রমুখ। নিখাদ প্রেমের ছবি বা মজার ছবি, আটপৌরে সাংসারিক জটিলতার ছবি, সাধারণ মানুষের রোজকার সমস্যার ছবি – এসব দেখতে দর্শক হল ভরাত বলে শিল্পী ও কলাকুশলীদের সংসার চলত, প্রযোজকদের ঘরে টাকা আসত। তাই তাঁরা হিট হবে না ধরে নিয়েই সত্যজিৎ বা মৃণালের মত শিল্পীদের ছবিতে টাকা ঢালতে পারতেন। নয়ের দশক থেকে কলকাতার বড় বড় সংবাদমাধ্যম যে শহুরে দরকচা মারা ছবিগুলোকে বাংলা ছবির পুনরুত্থান বলে দাগিয়ে দিল, সেগুলো বস্তুত বিভিন্ন মেজ সেজ ফেস্টিভালে পুরস্কার জেতা ছাড়া বাংলা ছবির হোমেও লাগেনি যজ্ঞেও লাগেনি। এক পর্দার সিনেমা হলগুলো উঠে যাওয়ার আগে থেকেই ওইসব ছবি গ্রাম আর শহরের দর্শকের মধ্যে কাঁটাতার বসিয়ে দিয়েছে। মাল্টিপ্লেক্স এসে সর্বনাশ সম্পূর্ণ করেছে। বিপুল সংখ্যক দর্শক বাংলা ছবির হাতছাড়া হয়ে গেছেন অত টাকার টিকিট কাটার ক্ষমতা নেই বলে আর গ্রামেগঞ্জে সিনেমা হল প্রায় নেই বলে। যাঁরা আছেন, তাঁদের পক্ষে হাতে ইয়াব্বড় পপকর্নের বালতি নিয়ে বাংলা ছবি কেন, কোনো ছবির পাশেই দাঁড়ানো কঠিন। মনোযোগ স্বভাবতই ৪০০ টাকার পপকর্ন নষ্ট না হওয়ার দিকেই রাখতে হবে।

এবার বলা যাক, বাংলা ছবি না বাঁচলে কী হবে। শুধু শিল্পী আর কলাকুশলীদের রুজি রোজগার বন্ধ হবে তা নয়। পৃথিবীর বিশিষ্ট সংস্কৃতিবান জাতিগুলোর অন্যতম হিসাবে বাঙালির যে পরিচিতি, তা অনেকটাই মুছে যাবে। আজ গোটা ভারতকে এক ধর্ম, এক ভাষা, এক সংস্কৃতির দেশ করে তোলার যে আপ্রাণ লড়াই চালাচ্ছে সংঘ পরিবার, তাতে সেটা হবে তাদের গুরুত্বপূর্ণ জিত। আপনি আজ সত্যজিতের অস্কার আর ঋত্বিকের মৃত্যুর এতবছর পরে তাঁকে নিয়ে মার্টিন স্করসেসির মুগ্ধতার কথা শতমুখে বলে সম্মান পান বাংলা সিনেমা বলে একটা কিছুর অস্তিত্ব আছে বলে। না থাকলে যাকেই বলতে যাবেন, সে বলবে ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমাদের একসময় নাকি সবই ছিল। এখন কী আছে বলো?’ বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোকে উঠে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এর সঙ্গে বাংলা সিনেমাশিল্পটা তুলে দিতে পারলে সোনায় সোহাগা। পাড়ায় পাড়ায় রবীন্দ্র জয়ন্তী কমে এসেছে অনেকদিন হল, আজ থেকে ৫০ বছর পরে সত্যজিতের জন্মদিন পালন করার লোকও পাওয়া যাবে না।

ব্যাপারটা কিন্তু গভীরভাবে রাজনৈতিক। আপনি মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলতেই পারেন ‘পরমব্রত চাটুজ্জে তো সরকারের দেউচা-পাঁচামির কমিটিতে ঢুকেছিল। এখন বুঝুক ঠ্যালা’, অথবা ‘অনির্বাণ ভটচায্যি তো আর জি করের বেলায় চুপ ছিল। এখন কেন?’, কিম্বা ‘সুদেষ্ণা রায় তো সরকারের কীসব কমিশনের মেম্বার। এদের পাত্তা না দেওয়াই উচিত।’ কিন্তু আপনি যত উদাসীন থাকবেন, আপনার ভাষা-সংস্কৃতির বারোটা বাজানোর জন্যে যে বড় রাজনীতিটা চলছে তার পথ তত পরিষ্কার হবে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত