ভারতে মেয়েদের ক্রিকেটের পথ এখনো বন্ধুর

জেমিমাকে মাঠের মধ্যে এনে ধর্ষণ করা উচিত – এমন কথাও পোস্ট করা হচ্ছিল সোশাল মিডিয়ায়। নারীবাদীরা কেউ তখন টুঁ শব্দ করেছিলেন বলে জানি না। এখন করছেন, কারণ জেমিমাকে চেনা গেছে। বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে, মহিলাদের ক্রিকেটের খবর নারীবাদীরাও বিশেষ রাখেন না।

লক্ষ করে দেখলাম, বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ নিয়ে কোনো মতপার্থক্য নেই যে ৩০ অক্টোবর ২০২৫ মেয়েদের ক্রিকেটের ইতিহাসে একটা বিশেষ দিন ছিল। মেয়েদের ক্রিকেটে এত রান তাড়া করে কোনো দল কখনো জেতেনি। শুধু তাই নয়, ছেলেদের বিশ্বকাপেও নক আউট ম্যাচে এত রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড নেই। জেমিমা রডরিগসের অপরাজিত ১২৭ রান যে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে কোনো ভারতীয়ের সেরা ইনিংস তা নিয়েও মনে হয় না বিশেষ তর্কের অবকাশ আছে। ২০১১ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে শচীন তেন্ডুলকর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একা কুম্ভ হয়ে ৮৫ রান করেছিলেন, যা পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল। শচীনও একাধিকবার আউট হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন জেমিমার মতই। কিন্তু সেদিন ভারত প্রথমে ব্যাট করেছিল, ঘাড়ে পাহাড়প্রমাণ রানের বোঝা ছিল না। সেই পাকিস্তান কোনো ভয় ধরানো দলও ছিল না। বৃহস্পতিবার রাতে যে অস্ট্রেলিয়াকে হরমনপ্রীত কৌররা হারালেন, তারা কিন্তু ছেলেদের ক্রিকেটে ১৯৯৯-২০১১ পর্বের অস্ট্রেলিয়ার মত দুর্ধর্ষ। এরা বিশ্বকাপে শেষবার একটা ম্যাচ হেরেছিল সেই ২০১৭ সালে। এই অবিস্মরণীয় রাতের পর দেশজুড়ে সবাই উচ্ছ্বসিত। অনেকে বলছেন, এরপর জেমিমারা বিশ্বকাপ জিতুন আর না-ই জিতুন, ভারতে মেয়েদের ক্রিকেটের দারুণ উন্নতি হতে চলেছে। সুতরাং অপ্রিয় কথাগুলো বলে ফেলার এটাই সঠিক সময়।

ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত মেয়েদের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ শেষ লগ্নে পৌঁছে গেছে। এই বিশ্বকাপ নিয়ে কথাবার্তা সম্ভবত বহুবছর পরেও শেষ হবে না। তার কারণটা স্রেফ ক্রিকেটীয় হলে চমৎকার হত। জেমিমার ঐতিহাসিক ইনিংস, ভারতের ঐতিহাসিক জয় তো রইলই, ফাইনালে যে দল জিতবে তাদেরই এটা প্রথমবার বিশ্বকাপ জয় হবে। কেবল সেগুলোই চর্চার বিষয় হয়ে থাকলে ভালো হত। প্রথম সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়িকা লরা উলভার্ট যে অনবদ্য শতরান (১৪৩ বলে ১৬৯) করেছেন, যদি তা নিয়ে আলোচনা হয় তাহলেও ক্ষতি নেই। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার ফিবি লিচফিল্ডের মারকাটারি শতরান (৯৩ বলে ১১৯), হরমনপ্রীত কৌরের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের খেলা নিয়ে কাটাছেঁড়া হলেও কোনো কথা ছিল না। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন, বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়ার পর থেকে, এদেশে না হলেও বাকি ক্রিকেট দুনিয়ায় এসবের চেয়ে বেশি আলোচনা হবে মাঠের বাইরের একটা ঘটনা নিয়ে। তার কারণ গত ২৬ অক্টোবর (রবিবার) ইন্দোরে যে ঘটনা ঘটেছে, তা ক্রিকেটে কেন, কোনো খেলার আন্তর্জাতিক আঙিনাতেই বিরল। বিশ্বকাপ খেলতে এসে অস্ট্রেলিয়ার দুই মহিলা ক্রিকেটারের সেই অভিজ্ঞতা হয়েছে যা এদেশের মেয়েদের রাস্তাঘাটে প্রায় রোজই হয়। অর্থাৎ তাঁরা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। টিম হোটেল থেকে বেরিয়ে তাঁরা কাছাকাছি এক কাফেতে যাচ্ছিলেন, পথে আকিল খান নামে একজন বাইক নিয়ে তাঁদের পিছু ধাওয়া করে, এমনকি তাঁদের শরীরেও হাত দেয়।

ব্যাপারটা নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দেড় দিনের বেশি হইচই হয়নি, ফলে হয়ত অনেকেরই নজর এড়িয়ে গেছে। কেনই বা হবে? ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত নিত্যযাত্রী মহিলারাই তো এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন প্রায়ই। ছাত্রীজীবন থেকে সাংবাদিক জীবনে পৌঁছতে পৌঁছতেই এটা এমন অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায় যে তাঁরা অফিসে বা বাড়িতে – কোথাও আর এ নিয়ে বাক্য ব্যয় করেন না। করলে বাড়িতে যার যেমন অভিজ্ঞতাই হোক, অফিসের পুরুষ সহকর্মীরা যে এটাকে কোনো ব্যাপার বলেই মনে করবেন না – একথা তাঁরা জেনে যান। অফিসের ভিতরেই তাঁদের যৌন হয়রানির ঘটনা যে ঘটে তা তো ‘মি টু’ আন্দোলনের সময়ে সংবাদমাধ্যমের বাইরের লোকেরাও জেনে গেছেন। যৌন হয়রানি প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে তৈরি আভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটিগুলো (ICC) অনেক অফিসেই হয় নিষ্ক্রিয়, নয় যারা হয়রান করে তাদেরই আখড়া। তাছাড়া আর সব পেশার মত সাংবাদিকতাতেও অধিকাংশ জায়গাতেই লাগাম তো পুরুষদের হাতে। কোনটা খবর আর কোনটা নয়, কোনটা কত বড় খবর – এসব সিদ্ধান্ত পুরুষরাই নেন। ফলে যে দিন দুয়েক অস্ট্রেলিয়ার মেয়েদের খবরটা টিভি চ্যানেল এবং খবরের কাগজে জায়গা জুড়ে ছিল, তখনো সেটা এমনকি খেলার বিভাগেরও সবচেয়ে বড় খবর হয়ে দাঁড়ায়নি। মধ্যপ্রদেশের শাসক দল বিজেপির অন্যতম পরিচিত মুখ কৈলাস বিজয়বর্গীয় যদি খাঁটি ভারতীয় কায়দায়, আক্রান্ত ক্রিকেটারদেরই এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত – এই মর্মে বক্তব্য না রাখতেন, তাহলে আরও কমেই নটে গাছ মুড়িয়ে যেত।

সত্যি বলতে, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের সম্ভবত ভারতের মেয়েরা কীভাবে বাঁচে সে ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই। হোটেলে আসা খবরের কাগজও তাঁরা বিশেষ পড়েন না বা ভারতীয় খবরের চ্যানেলগুলো দেখেন না। দেখলে হয়ত কৈলাসকেই শুভাকাঙ্ক্ষী বলে মনে করতেন, কারণ ওই ঘটনার ঠিক দুদিন আগে মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলায় এক মহিলা ডাক্তার হাতের তালুতে সুইসাইড নোট লিখে আত্মহত্যা করেন। কারণ একজন পুলিশকর্মী তাঁকে পাঁচ মাস ধরে বারবার ধর্ষণ করেছেন এবং অন্য এক পুলিশকর্মী তাঁর উপর মানসিক অত্যাচার চালাচ্ছিলেন। রক্ষকই ভক্ষক কথাটার এমন প্রাঞ্জল উদাহরণ চট করে পাওয়া যায় না। কিন্তু আমাদের দেশের মেয়েরা এমন ঘটনাতেও অবাক হবেন না। কারণ তাঁরা হাথরাসের কথা জানেন, মহিলা কুস্তিগিরদের দুর্দশাও দেখেছেন। অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটাররা অত খবর পাবেন কোথায়? ফলে নিশ্চয়ই তাঁদের মনে হয়েছিল – শহরের মাঝখানে রয়েছি, রাস্তায় লোকজনও আছে, অতএব একটু এদিক ওদিক ঘুরে আসাই যায়। ওঁরা কী করে জানবেন যে ভারতের রাস্তায় নির্জনতাই কোনো মেয়ের একমাত্র শত্রু নয়, বরং লোক বেশি থাকলে ভয় বেশি!

এ মাসের গোড়ার দিকে হায়দরাবাদ বেড়াতে গিয়ে একদিন চারমিনার দেখতে গিয়েছিলাম, সঙ্গীদের মধ্যে তিনজন লিঙ্গ পরিচয়ে নারী। একজনের বয়স ১৩, একজন চল্লিশোর্ধ্ব, আরেকজন প্রায় ৭০। সেদিন রবিবার, সন্ধে হয়ে গেছে। সামনে দেখতে পাচ্ছি চারমিনার, কিন্তু যত এগোচ্ছি সেটা যেন পিছিয়ে যাচ্ছে, কিছুতেই পৌঁছতে পারছি না। কারণ রাস্তাটায় তিলধারণের জায়গা নেই। নিজের শরীরটাকে ওই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে এদিক ওদিক করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আক্ষরিক অর্থে রুদ্ধশ্বাস ‘অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্ট’। সেই ভিড় পেরিয়ে যখন গন্তব্যে পৌঁছলাম, তখন সঙ্গী তিন নারী এক যোগে যে মন্তব্য করলেন তাতেই টের পাওয়া যায় ভারতের রাস্তাঘাট মেয়েদের জন্যে কেমন। বললেন ‘জীবনে এই প্রথম ভিড়ের মধ্যে কেউ অসভ্যতা করল না’।

এই অবস্থা অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটারদের জানার কথা নয়। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডও নাকি জানে না। অস্ট্রেলিয়ার দুই মহিলা ক্রিকেটার আক্রান্ত হওয়ার পর বোর্ডের অনারারি সেক্রেটারি দেবজিৎ শইকিয়া যে বিবৃতি দেন, তাতে বলা হয় ‘এটা গভীরভাবে দুঃখজনক এবং বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ভারত চিরকাল তার সমস্ত অতিথির প্রতি উষ্ণতা, আতিথ্য ও যত্নের জন্য পরিচিত।’ বিচ্ছিন্ন ঘটনা! মধ্যপ্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন, যাদের আতিথ্যে অস্ট্রেলিয়া দল ছিল, তাদের অনারারি সেক্রেটারি সুধীর আসনানির বিবৃতির একটা অংশ আরও এককাঠি সরেস – ‘এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় এটা পরীক্ষা করে দেখতেই হবে যে খেলোয়াড়রা হোটেলের বাইরে ঘোরাফেরা করার জন্যে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেছিলেন, নাকি তেমন কোনো অনুরোধ ছাড়াই বেরিয়েছিলেন।’ যদিও অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের চিফ এক্সিকিউটিভ পল মার্শ অচিরেই জানিয়ে দেন, খেলোয়াড়রা নিরাপত্তা প্রোটোকল মেনেই বাইরে বেরিয়েছিলেন।

এইসব কথাও আমাদের অতি পরিচিত। বাইরে বেরোল কেন, না বেরোলেই তো ধর্ষণ হত না – একথা ভারতের কত নেতা যে কতবার বলেছেন তার ঠিক নেই। নেহাত এক্ষেত্রে ব্যাপারটা আন্তর্জাতিক, বিশ্বগুরুর সম্মানের প্রশ্ন জড়িত। তার উপর যে লোকটি এই কাণ্ড করে ধরা পড়েছে সে মুসলমান। নইলে হয়ত বলা হত – মেয়েগুলো উত্তেজক জামাকাপড় পরে বেরিয়েছিল। অথবা এমনও বলা যেতে পারত যে মেয়েগুলোই লোকটাকে উত্তেজিত করে আকর্ষণ করেছিল। মানে আগামীকাল অমনজোত কৌর বা রিচা ঘোষ এমনভাবে আক্রান্ত হলে যে কর্তারা সেরকম বলবেন না তার গ্যারান্টি কিন্তু বিশ্বকাপ জিতলেও পাওয়া যাবে না। সাক্ষী মালিক, বিনেশ ফোগতদের বেলায় আমরা দেখেছি যে দেশের জন্যে সোনার মেডেল জেতাও ভারতের মেয়েদের নিরাপত্তার বা যৌন অত্যাচারের শিকার হলে তার প্রতিকারের গ্যারান্টি নয়।

আসলে মেয়েরা বাইরে বেরোবে, নিজেদের মত করে ঘুরে বেড়াবে, ক্রিকেট খেলবে – এসব ভারতের বড় অংশের মানুষের আজও পছন্দ নয় (মানুষই লিখলাম, কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজে অনেক মেয়েও ঘোর পিতৃতান্ত্রিক)। তেমন লোকেদের হাতেই এখন দেশের ভার এবং সেই সূত্রে ক্রিকেট বোর্ডের ভার। সম্ভব হলে এঁরা নতুন বন্ধু তালিবানদের মত মেয়েদের ক্রিকেট দলটা তুলেই দিতেন। কিন্তু স্বাধীনতার পরের প্রায় আট দশকে দেশটা যেখানে পৌঁছেছে সেটা তো দুম করে অস্বীকার করা যায় না, চোখের চামড়া আছে তো। সুট বুট পরা ইংরিজি জানা মৌলবাদীদের ‘মেয়েদের ক্রিকেট খেলা চলবে না’ বলতেও একটু কেমন কেমন লাগে। নইলে বিজেপির করতলগত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের মেয়েদের ক্রিকেট সম্পর্কে অবজ্ঞা কিছু কম নয়।

প্রমাণ চান? ভারতে কোথায় কোথায় বিশ্বকাপের খেলাগুলো হল দেখুন – গৌহাটি, ইন্দোর, বিশাখাপত্তনম আর মুম্বই। কল্পনা করতে পারেন, ভারতে ছেলেদের বিশ্বকাপ হচ্ছে আর কলকাতার ইডেন উদ্যান, দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা (ইদানীং অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম), চেন্নাইয়ের চিপক বা বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে একটাও খেলা নেই? ২০২৩ সালে যখন এদেশে ছেলেদের বিশ্বকাপ হল, তখন এই প্রত্যেকটা জায়গায় খেলা ছিল। মেয়েদের খেলা দেখতে এইসব বড় শহরে লোক আসবে না, তাই ছোট শহরে খেলা দেওয়া হয়েছে – এই যুক্তির কিন্তু কোনো পরিমাপযোগ্য প্রমাণ নেই। বরং বোর্ডের পক্ষ থেকে বিশ্বকাপসুলভ প্রচার না থাকা সত্ত্বেও যে চার শহরে খেলা হয়েছে, সেখানে ভারতের ম্যাচগুলোতে নিয়মিত ২৫,০০০-৩০,০০০ দর্শক হয়েছে। এর বেশি দর্শক আজকাল ছেলেদের ৫০ ওভারের ম্যাচেও প্রায়শই হয় না। এমনকি আমেদাবাদে ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ম্যাচ হচ্ছে, বিরাট কোহলি বহুদিন পরে শতরান করছেন, অথচ গ্যালারি খাঁ খাঁ – এই দৃশ্যও সাম্প্রতিক অতীতে দেখা গেছে। উপরন্তু ভারত ফাইনালে ওঠায় এখন ফাইনালের টিকিটের দাম বেড়ে গেছে বহুগুণ, কারণ চাহিদা বিপুল বেড়েছে।

মুম্বইতেও ঐতিহ্যশালী ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম বা ব্র্যাবোর্ন স্টেডিয়ামে খেলা দেওয়া হয়নি। ডি ওয়াই পাতিল স্টেডিয়াম এমন জায়গায়, যার সম্পর্কে ২০০৮ সালে মুম্বইয়ের সাংবাদিকরা মজা করে বলতেন ‘ওটা মুম্বইয়ের চেয়ে পুনের বেশি কাছাকাছি।’ শ্রীলঙ্কায় যে খেলাগুলো ছিল তার সবকটাই কিন্তু রাজধানী কলম্বোর বিখ্যাত রণসিঙ্ঘে প্রেমদাসা স্টেডিয়ামে হয়েছে। ডাম্বুলা বা ক্যান্ডিতে নয়।

তবে মেয়েদের ক্রিকেটের প্রতি বোর্ডের অবহেলা এটুকুই নয়। বিজেপির মত বিসিসিআইয়েরও গোদি মিডিয়া আছে। তার সাংবাদিকরা সোশাল মিডিয়া বিদীর্ণ করে লিখে থাকেন, মেয়েদের ক্রিকেটের জন্যে বোর্ড কতকিছু করছে। ২০২২ সালে জয় শাহ বোর্ডের সরাসরি দায়িত্বে থাকার সময়ে ঘটা করে ঘোষণা করা হয়েছিল – এখন থেকে বোর্ডের সঙ্গে কেন্দ্রীয় চুক্তিতে আবদ্ধ ছেলে আর মেয়ে ক্রিকেটাররা সমান ম্যাচ ফি (টেস্ট পিছু ১৫ লক্ষ টাকা, একদিনের ম্যাচ পিছু ৬ লক্ষ টাকা, কুড়ি বিশের ম্যাচ পিছু ৩ লক্ষ টাকা) পাবেন। গোদি মিডিয়া ঢাকঢোল পিটিয়ে একে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বলেছিল। কিন্তু এর চেয়ে ন্যক্কারজনক অর্ধসত্য কমই হয়। কারণ কোহলি, রোহিত শর্মা, শুভমান গিলরা এক বছরে যত ম্যাচ খেলেন হরমনপ্রীত, জেমিমারা তার অর্ধেকেরও কম খেলেন। ২০২২ সালের উদাহরণই নেওয়া যাক। ভারতের ছেলেদের দল খেলেছিল ১১ খানা টেস্ট ম্যাচ, ২৯ খানা একদিনের ম্যাচ আর ২২ খানা কুড়ি বিশের ম্যাচ। ভারতের মেয়েরা খেলেছিলেন মাত্র দুটো টেস্ট, ২১ খানা একদিনের ম্যাচ আর ১৭ খানা কুড়ি বিশের ম্যাচ। ২০২১ সালে করোনা অতিমারীর জন্যে স্থগিত মেয়েদের একদিনের ম্যাচের বিশ্বকাপ ২০২২ সালে হয়েছিল। নইলে একদিনের ম্যাচের সংখ্যাটা আরও কম হত। মেয়েদের ক্রিকেট এভাবে চলে বলেই ২০২৩ সালে টেস্ট অভিষেক হওয়া জেমিমা এ পর্যন্ত খেলেছেন মাত্র তিনটে টেস্ট, অথচ একই বছরে টেস্ট খেলা শুরু করে যশস্বী জয়সোয়াল খেলে ফেলেছেন ২৬ খানা ম্যাচ। সমান কাজ না দিলে সমান পারিশ্রমিক দেওয়ার ঘোষণা যে বিশুদ্ধ গঞ্জিকা, তা বলাই বাহুল্য।

পৃথিবীর যে কোনো খেলায় সাফল্য অনেককিছু বদলে দেয়। এই বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা বা খেতাব জিতে নেওয়া মেয়েদের ক্রিকেট সম্পর্কে বোর্ডের ভাবনাচিন্তা বদলাবে কিনা সেটা সময় বলবে। লোকের আগ্রহ নেই কথাটা কিন্তু মিথ্যে। যে হাজার হাজার দর্শক মাঠে এসেছেন তাঁরা সকলে যে মহিলা নন তা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না। উপরন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের তথ্য বলছে, এই বিশ্বকাপের প্রথম ১১ ম্যাচেই লিনিয়ার ও ডিজিটাল রিচের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে গেছে। বাহাত্তর মিলিয়ন দর্শকের কাছে পৌঁছেছে এই ম্যাচগুলো। গত বিশ্বকাপের চেয়ে এটা ১৬৬% বেশি। বিশেষত ৫ অক্টোবরের ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মেয়েদের ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দর্শকের দেখা ম্যাচ হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন ঝুলন সেরা বাঙালি ক্রিকেটার? মোটেই না

শেষে যে কথাটা বলব, সেটা সম্ভবত অনেক নারীবাদীরও ভালো লাগবে না। যে জেমিমার হাউ হাউ করে কান্না নিয়ে সকলে মিলে কাব্যি করা চলছে এখন, গতবছর অক্টোবরে কুৎসিতভাবে তাঁরই পিছনে লেগেছিল এদেশের সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে অনেকেই। মুম্বইয়ের খার জিমখানার প্রথম মহিলা সদস্য জেমিমাকে সেই ক্লাব ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল, তাঁর বাবার বিরুদ্ধে ক্লাব চত্বরে ধর্মান্তরের আসর বসানোর অভিযোগ তুলে। ধর্মপ্রাণ ইভান রডরিগসকে বিবৃতি দিয়ে জানাতে হয়েছিল – তিনি প্রার্থনা সভার আয়োজন করেছিলেন, তাও ক্লাব কর্তৃপক্ষের আপত্তিতে বন্ধ করে দেন। সেইসময় জেমিমাকে মাঠের মধ্যে এনে ধর্ষণ করা উচিত – এমন কথাও পোস্ট করা হচ্ছিল সোশাল মিডিয়ায়। নারীবাদীরা কেউ তখন টুঁ শব্দ করেছিলেন বলে জানি না। এখন করছেন, কারণ জেমিমাকে চেনা গেছে। বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে, মহিলাদের ক্রিকেটের খবর নারীবাদীরাও বিশেষ রাখেন না। সেটা যে খুব দোষের তা নয়। খেলার জগতে জয় না এলে মানুষের আগ্রহ তৈরি হয় না। ঠিক যে কারণে ভারতের ছেলেদের জাতীয় ফুটবল দলের থেকে ক্রিকেট দলের খবর বেশি রাখি আমরা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। যে কারণে সায়না নেহওয়াল, পি ভি সিন্ধুর সাফল্যের পর আমাদের সকলের ব্যাডমিন্টনে আগ্রহ বেড়েছে। নীরজ চোপড়ার কারণেই তো আমরা জ্যাভেলিনের খবর রাখতে শুরু করেছি।

বলার কথা এটুকুই যে খেলার মাঠে কেঁদে ফেলা অভিনব কোনো ব্যাপার নয়, পুরুষরাও কাঁদেন। ভারতীয় পুরুষরাও। স্মৃতিশক্তি নিতান্ত দুর্বল না হলে সকলেরই মনে থাকার কথা। ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের ফুটেজ দেখুন, শচীনের অবসর নেওয়ার দিনের ফুটেজ দেখুন। দিয়েগো মারাদোনার সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে পড়ে তাঁর কান্নার ছবি। সামনের বছর ফুটবল বিশ্বকাপে আবার তেমন দৃশ্য দেখতে পাবেন। কিন্তু জেমিমার কান্না মাঠে থামেনি। তিনি ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে গিয়েও ফোঁপাচ্ছিলেন। বলেছেন তিনি প্রবল উদ্বেগের শিকার (‘anxiety’) হয়েছেন গোটা বিশ্বকাপ জুড়ে। কেন এই উদ্বেগ, তাঁর কান্না কেবলই আনন্দাশ্রু কিনা, তা তলিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। মাত্র কয়েক ঘন্টার প্রশংসার পরেই সোশাল মিডিয়ায় জেমিমার কৈশোরের ভিডিও খুঁড়ে আনা শুরু হয়ে গেছে, যেখানে তিনি খ্রিস্টানদের সভায় কিছু ধর্মীয় কথাবার্তা বলছেন। সেটা নাকি ভীষণ অপরাধ। দাঁত নখ বেরিয়ে এসেছে হিন্দুত্ববাদীদের, কারণ জেমিমা ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলতে পারার জন্যে বাইবেলকে, যিশুকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা। ফাইনালে জেমিমা শূন্য রানে আউট হতে পারেন, লোপ্পা ক্যাচ ফেলে দিতে পারেন। তাঁর জন্যে আমাদের গদগদ আবেগ যেন সেদিনও অক্ষত থাকে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

আজ জুটেছে, কাল কী হবে লাতিন আমেরিকার ফুটবলের?

জিদান প্রয়াত সক্রেটিসের মত কমিউনিস্ট পার্টি করতেন না। মারাদোনার মত ফিদেল কাস্ত্রো বা কিউবাপ্রীতিও নেই। সুতরাং ধরে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই যে জিদানের মনুষ্যত্বের কাছেই টাকার অঙ্কটা অশ্লীল বলে মনে হয়েছিল।

ফরাসি সম্রাট পঞ্চদশ লুই নাকি বলেছিলেন, আমার পরেই আসবে প্লাবন। লিওনেল মেসি এখন পর্যন্ত তেমন কিছু বলেছেন বলে জানা যায়নি। তবে বিশ্বকাপ ফাইনালই যে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর শেষ ম্যাচ ছিল সেকথা তো জানা গেছে। এখন প্রশ্ন হল, আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের ভবিষ্যৎ কী? দিয়েগো মারাদোনা ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ থেকে ডোপ টেস্টে ধরা পড়ে বহিষ্কৃত হন। পরে পাকাপাকিভাবে অবসর নেওয়ার সময়ে বলেন, আমার পরে অনেকদিন বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছবে না আর্জেন্টিনা। তাঁর কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিল। ১৯৯০ সালে রোমে তাঁর নেতৃত্বে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার ২৪ বছর পরে আবার আর্জেন্টিনা ফাইনালে পৌঁছয় ২০১৪ সালে রিও দি জেনেইরোতে। মারাদোনার মত মেসির আমলেও আর্জেন্টিনা দুবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলল। আবার কবে ফাইনালে পৌঁছবে? প্রশ্নটার পরিসর আরেকটু বড় করে নেওয়া যাক? লাতিন আমেরিকার কোনও দল আবার কবে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলবে? বা লাতিন আমেরিকার দলগুলোর ভবিষ্যৎ কী? প্রশ্নগুলো বৈধ, কারণ বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিলও শেষবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছে কুড়ি বছর হয়ে গেল। কেবল ফাইনালে পৌঁছনোকেই সাফল্যের প্রমাণ হিসাবে ধরে নিয়ে অবশ্য কোনও আলোচনা করা যায় না। কিন্তু ঘটনা হল গত তিন দশকে সামগ্রিকভাবেই লাতিন আমেরিকা বিশ্বকাপে ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে ইউরোপের তুলনায়।

এমনিতেই চিলে, কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা বা প্যারাগুয়ের মত দলে মাঝেমধ্যে কয়েকজন চোখ টানার মত ফুটবলার আসেন, তখন তাঁদের নিয়ে হইচই হয়। কিন্তু দল শেষপর্যন্ত বিশ্বকাপে বেশিদূর এগোতে পারে না। উরুগুয়ে দুবার বিশ্বকাপ জিতেছিল সেই গত শতকের প্রথমার্ধে, স্মরণকালে তাদের সেরা বিশ্বকাপ ২০১০। মূলত দিয়েগো ফোরলানের নৈপুণ্যে আর লুই সুয়ারেজের আক্ষরিক অর্থে হাতযশে সেমিফাইনালে উঠে তারা হেরে যায় এবং প্লে অফে জার্মানির কাছে হেরে চতুর্থ স্থান দখল করে। তাই বিশ্বকাপে লাতিন আমেরিকার ফুটবল মানে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাই। সেই ব্রাজিল পরপর তিনটে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলে দুবার চ্যাম্পিয়ন হয় দুই সহস্রাব্দের সন্ধিকালে। তারপর ২০১৪ সালের আগে আর সেমিফাইনালেও উঠতে পারেনি এবং ঘরের মাঠে মারাকানা স্টেডিয়ামের সেই সেমিফাইনাল ব্রাজিল সমর্থকদের পক্ষে বিভীষিকা হয়ে আছে। এবারের ব্রাজিলকে অনেক বেশি জমাট দেখাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল নেইমার-নির্ভরতাও নেই। কিন্তু সেই ব্রাজিলও কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নিল। আর্জেন্টিনা ১৯৯০ আর ২০১৪— এই দুই ফাইনালের মাঝে একবারও শেষ চারে পৌঁছয়নি। স্বভাবতই আর্জেন্টিনার এবারের সাফল্যে ইউরোপের আধিপত্য খর্ব হল বলে ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে অনেকের যে উল্লাস, তার স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দিহান হওয়ার কারণ আছে। আধিপত্য আদৌ খর্ব হয়েছে কিনা তা নিয়েই সন্দেহ আছে। আগামীবার থেকে বিশ্বকাপ ৪৮ দলের হয়ে গেলে ইউরোপের প্রাধান্য উল্টে বেড়েও যেতে পারে। প্রশ্ন হল, এমন হচ্ছে কেন? ২০০২ থেকে ২০২২— এই দুই দশকে এমন কী ঘটল যে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা ক্রোয়েশিয়ার চেয়েও কম ধারাবাহিক হয়ে পড়ল? ইতালি, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ড তো বটেই, গত ২০ বছরে বুলগেরিয়া, রোমানিয়ার মত বিশ্বকাপে অনিয়মিত দলের সামনে পড়লেও কেন হেরে যায় লাতিন আমেরিকার দানবরা? এইসব প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরও। সে উত্তর মাঠের ভিতরে খুঁজলে অগভীর জবাব পাওয়া যাবে।

বিশ্বকাপে ইউরোপের বাইরের যে দলগুলো খেলতে এসেছিল, তাদের সকলের খেলোয়াড় তালিকার দিকে তাকালেই একটা জিনিস চোখে পড়ে। প্রত্যেক দলেই ইউরোপে ক্লাব ফুটবল খেলা খেলোয়াড়দের সংখ্যা প্রচুর। বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনার ২৬ জনের দলে রিজার্ভ বেঞ্চের গোলরক্ষক ফ্রাঙ্কো আর্মানি আর মাঝমাঠের খেলোয়াড় থিয়াগো আলমাদা ছাড়া সকলেই ইউরোপের কোনও না কোনও ক্লাবের খেলোয়াড়। একমাত্র আর্মানিই খেলেন নিজের দেশের ক্লাব রিভার প্লেটে। ব্রাজিল দলের ছবিটাও খুব আলাদা নয়। অতিরিক্ত গোলরক্ষক ওয়েভার্তন খেলেন সাও পাওলোর পালমেইরাসে আর মাঝমাঠের এভের্তোন রিবেইরো, আক্রমণভাগের পেদ্রো খেলেন রিও দি জেনেইরোর ক্লাব ফ্ল্যামেঙ্গোতে। এছাড়া রক্ষণভাগের দানি আলভেস খেলেন মেক্সিকোর উনিভার্সিদাদ নাসিওনাল এসিতে। আর সবাই ইউরোপে খেলেন। আফ্রিকার দেশগুলোর দল ঘাঁটলেও একই ব্যাপার দেখা যাবে। এমনকি এবার চমকে দিল যে জাপান দল, তাদেরও ২৬ জনের মধ্যে শুধু জার্মানির লিগেই খেলেন আটজন। এর সরাসরি ফলাফল হল, ফুটবলে ঘরানা বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। আফ্রিকা বা এশিয়ার ক্ষেত্রে সেটা খুব বড় কথা নয়। কারণ বিশ্ব ফুটবলে এই দুই মহাদেশ এতটাই পিছিয়ে থেকে শুরু করেছে যে তাদের এখনও নিজস্ব ঘরানা বলে কিছু তৈরি হয়নি। ইউরোপে খেলতে খেলতে বরং তাদের লাভই হয়। কবি লিখেছিলেন “দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে”। এশিয়া, আফ্রিকার এখনও নেওয়ার পালা চলছে। অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতে হয়ত দেওয়ার পালা আরম্ভ হবে। কিন্তু লাতিন আমেরিকার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তা নয়। লাতিন আমেরিকার নিজস্ব ঘরানা ছিল। সারা পৃথিবীর লাতিন আমেরিকান ফুটবলের ভক্তরা তাতেই মোহিত হয়েছিলেন। সেই ঘরানার প্রাণ হল ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, যা চোখের আরাম। সে খেলাকেই ‘জোগো বোনিতো’ অর্থাৎ ‘বিউটিফুল গেম’ বলা চলে। কিন্তু ফুটবল তো মানুষ খেলে। দেবতারা খেলে না, রোবটরাও নয়। ফলে সারা বছর যেভাবে খেলছেন একজন ফুটবলার, তিনি কালেভদ্রে জাতীয় দলের হয়ে একেবারে অন্য দর্শনে, অন্য কায়দায় খেলবেন কী করে? সেকথা জাতীয় দলের কোচকেও বুঝতে হয়, গা জোয়ারি চলে না। ফলে লাতিন আমেরিকান ফুটবলের রহস্য নষ্ট হয়ে গেছে। সারা পৃথিবীই আসলে খেলে ইউরোপের খেলা। সে খেলায় ইউরোপকে হারাতে যে কালঘাম ছুটে যাবে আর সকলের তাতে আর আশ্চর্য কী? কিন্তু ক্ষতি শুধু ওটুকু নয়।

কিলিয়ান এমবাপের একটা মন্তব্যে নাকি বেজায় চটেছেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। সেই কারণেই দুর্ভেদ্য গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ফাইনাল শেষ হওয়ার পর থেকে এমবাপেকে বিদ্রুপ করেই চলেছেন, একেকসময় তা শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করছে। এমবাপে কিছুদিন আগে বলেছিলেন “ইউরোপে আমাদের সুবিধা হল সারাক্ষণ নিজেদের মধ্যে নেশনস লিগের মত উচ্চমানের ম্যাচ খেলি। ফলে আমরা যখন বিশ্বকাপে যাই তখন তৈরি হয়ে যাই। কিন্তু ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আমেরিকায় এইরকম সুযোগ পায় না। সেখানকার ফুটবল ইউরোপের মত উন্নত নয়। সেই কারণেই গত কয়েকটা বিশ্বকাপে ইউরোপিয়ানরাই জিতেছে।” এমিলিয়ানোর অসভ্যতাকে সমর্থন না করেও তাঁর আবেগকে ধরতে পারা সম্ভব। শুধু তো আর্জেন্টিনা নয়, গোটা লাতিন আমেরিকার ফুটবল সম্পর্কেই একটা বড় কথা বলেছেন এমবাপে। খোদ ফ্রান্সকেই হারিয়ে দিয়ে মুখের মত জবাব দেওয়া হয়েছে বলে ভাবতেই পারেন এমিলিয়ানো। কিন্তু এমবাপের কথাটা ভেবে দেখার মত।

ইউরোপের চেয়ে লাতিন আমেরিকার ফুটবল যে পিছিয়ে পড়েছে তার পরিসংখ্যানগত প্রমাণ ইতিমধ্যেই দিয়েছি। তবে এমবাপে উদাহরণ দিতে গিয়ে একটু ভুল করেছেন। উয়েফা নেশনস লিগ চালু করেছে সদ্য। উদ্দেশ্য ক্লাব ফুটবলের দাপটে আন্তর্জাতিক ফুটবলের আকর্ষণ কমে যাওয়ার সমস্যা সামলানো। কিন্তু তাতে একটা বড় জিনিস স্বীকার করে নেওয়া হয়, সেটা হল ফুটবল খেলাটাকে চালায় আসলে ক্লাব ফুটবল। আরও নির্দিষ্ট করে বললে ইউরোপের ক্লাব ফুটবল। লাতিন আমেরিকা পিছিয়ে পড়েছে বছর বিশেক হল, আর নেশনস লিগের বয়স মাত্র তিন। লাতিন আমেরিকা পিছিয়ে পড়েছে কারণ তাদের ক্লাব ফুটবল পিছিয়ে পড়েছে। কেন পিছিয়ে পড়ল? কারণটা বিশুদ্ধ অর্থনীতি। ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি, জার্মানির দ্বিতীয় সারির ক্লাবগুলোও যে পারিশ্রমিক দিতে পারে তার ধারেকাছে পৌঁছতে পারে না আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় দুই ক্লাব চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিভার প্লেট আর বোকা জুনিয়র্সও। নেইমারকে খেলানোর কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না ব্রাজিলের ফ্ল্যামেঙ্গো বা পালমেইরাস। আফ্রিকার ক্লাবগুলোর সঙ্গে তো আরও দুস্তর ব্যবধান।

এমন নয় যে লাতিন আমেরিকার খেলোয়াড়দের ইউরোপে চলে যাওয়া এই সহস্রাব্দেই শুরু হয়েছে। মারাদোনা, ক্যারেকা, রোমারিও, বেবেতো, রোনাল্ডো, রোনাল্ডিনহো, রবার্তো কার্লোসরাও বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, নাপোলি, জুভেন্তাস বা এসি মিলানে খেলেছেন। কিন্তু তাঁদের সার, জল দিয়ে বড় করে তুলত আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের ফুটবলব্যবস্থাই। তারপর তাঁদের খেলা দেখে চড়া দামে কিনে নিত ইউরোপের ক্লাবগুলো। মারাদোনার মারাদোনা হওয়া শুরু বোকা জুনিয়র্সে। কেরিয়ারের শেষ প্রান্তে তিনি ফিরেও যান নিজের দেশে, তাঁর শেষ ক্লাব নেউয়েলস ওল্ড বয়েজ। কিন্তু ফুটবলের অর্থনীতি যেভাবে বদলে গেছে তাতে মেসি নিজের মাইনে কমাতে রাজি হয়েও বার্সেলোনাতেই থাকতে পারলেন না, আর্জেন্টিনায় ফিরে যাওয়া তো দূরের কথা। অবশ্য মেসি আর্জেন্টিনা ছেড়েছেন অনেক ছোট বয়সে। চে গুয়েভারার জন্মস্থান রোজারিওর রুগ্ন শিশু মেসির প্রতিভা ছোটবেলাতেই চিনে নিয়ে বিশ্বখ্যাত লা মাসিয়ায় তুলে এনেছিলেন বার্সেলোনার স্পটাররা। মেসি ও তাঁর পরিবারের হয়ত কিছুটা কৃতিত্ব প্রাপ্য তিনি স্পেনের নাগরিকত্ব গ্রহণ না করে আর্জেন্টিনার হয়েই সারাজীবন খেললেন বলে। কিন্তু ঘটনা হল পৃথিবী জুড়ে বেড়ে চলা অর্থনৈতিক বৈষম্যের সুযোগে কচি বয়সেই ইউরোপে চলে যাচ্ছে লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার ফুটবল প্রতিভা। মেসির মত ছোট বয়সে না হলেও, কেরিয়ার শুরু করার কয়েক বছরের মধ্যেই। তারপর আর কিসের ঘরানা? গোটা পৃথিবীকে এক অর্থনীতির ছাঁচে ঢালাই করার যে পরিকল্পনা বিশ্বায়ন বা নব্য উদারনীতিবাদী অর্থনীতির, তারই ফলশ্রুতিতে গোটা পৃথিবীর ফুটবলই আসলে হয়ে দাঁড়াচ্ছে ইউরোপের ফুটবল। জার্সির রংটুকুই যা আলাদা। মেসির মত জন্মগত প্রতিভা সকলের থাকে না, ফলে ফুটবলের সৌন্দর্য সিস্টেম ছাপিয়ে সকলের পায়ে জায়গা করে নিতেও পারে না। যে তরুণ আর্জেন্টাইন বা ব্রাজিলিয়ানের ফুটবল শিক্ষা হবে ইউরোপের কোচের হাতে, সারাবছর খেলবেন ইউরোপে, তিনি ড্রিবল করায় বিশ্বাস করবেন কম। এটাই স্বাভাবিক।

আরও পড়ুন বোর্ডের ঘরে যে ধন আছে, ক্রিকেটের ঘরে সে ধন আছে?

ফুটবলের আলোচনায় অর্থনীতি শব্দটা দেখেই যাঁরা নাক কুঁচকে ভাবছেন অপ্রাসঙ্গিকভাবে রাজনীতি এনে ফেলা হচ্ছে বা ইউরোপ কেবল টাকার জোরে সবাইকে পিছনে ফেলে দিচ্ছে বলায় যাঁরা রাগ করছেন তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিই ২০১৩ সালের কথা। সে বছর ওয়েলশ ফুটবলার গ্যারেথ বেলকে ইংল্যান্ডের টটেনহ্যাম হটস্পার থেকে ১০০ মিলিয়ন ইউরো (১৩১.৮৬ মিলিয়ন ডলার) দাম দিয়ে কিনে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ। সেটা তখনকার রেকর্ড ট্রান্সফার ফি। বিশ্বের সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন এবং সেইসময় রিয়ালে কার্লো আনচেলোত্তির সহকারী জিনেদিন জিদান বলেই ফেলেন “আমাকে দশ বছর আগে কেনা হয়েছিল ৭৫ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার) দিয়ে আর আমি বলেছিলাম আমি অত দাম পাওয়ার যোগ্য নই। এখন আমার মনে হয় কোনও খেলোয়াড়ই এত দাম পাওয়ার যোগ্য নয়। এটা স্রেফ ফুটবল। দুর্ভাগ্যজনক, দুর্বোধ্য যে এত টাকা কেন খরচ করা হচ্ছে।” জিদান প্রয়াত ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার সক্রেটিসের মত কমিউনিস্ট পার্টি করতেন বলে তো শোনা যায় না। মারাদোনার মত ফিদেল কাস্ত্রো বা কিউবাপ্রীতিরও খবর নেই। সুতরাং ধরে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই যে আলজিরীয় অভিবাসীদের সন্তান জিদানের মনুষ্যত্বের কাছেই কোথাও টাকার অঙ্কটা অশ্লীল বলে মনে হয়েছিল। এখন ২০২২, সর্বকালের সবচেয়ে দামি ট্রান্সফারের তালিকায় প্রথম দশেরও বাইরে চলে গেছেন বেল।

পুরো তালিকাটা দেখুন এখানে। তারপর ভেবে দেখুন, মার্কিনি মদতে বারবার নির্বাচিত সরকার পড়ে যায়, অর্থনীতির দফারফা হয়ে যায় যে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলি, ভেনিজুয়েলা, পেরুতে— সেখানকার ফুটবল কী করে লড়বে ইউরোপের সঙ্গে? কুড়ি বছর পরে একবার একটা দলের বিশ্বকাপ জয় কি সত্যিই কিছু প্রমাণ করে? এ মাসেই আর্জেন্টিনায় মুদ্রাস্ফীতির হার ৯৯ শতাংশে পৌঁছবে বলে মনে করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। বুয়েনস এয়ার্সের রাস্তা ভরিয়ে মেসির দলকে অভিবাদন জানিয়েছে যে হবু ফুটবলাররা, তাদের কজন ওই নীল-সাদা জার্সি গায়ে চাপানোর সঙ্কল্প বজায় রাখতে পারবে? প্রশ্নটা শুধু আবেগের নয়। মারাদোনার দল যখন বিশ্বকাপ জিতেছিল তখনও আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অবস্থা ভাল ছিল না। কিন্তু দুনিয়াটা বদলে গেছে। বার্সেলোনা ছেড়ে কোনও নিঃস্ব নাপোলিকে ইতালি, ইউরোপের রাজা করতে যাননি মেসি। গেছেন কাতারি ধনকুবেরদের অর্থে পুষ্ট প্যারিসের ক্লাবে। যেখানে তাঁর পাশে খেলেন নেইমার আর এমবাপে— সবচেয়ে দামি ট্রান্সফারের তালিকায় যথাক্রমে এক আর দুই নম্বরে থাকা ফুটবলার।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত

মেসি বিশ্বকাপ জিতলেন, শিল্প বিশ্বজয়ী হল আবার

মেসি কানায় কানায় ভরে উঠলেন। তিনি কী ভাবছিলেন জানি না, কিন্তু কাল টিভির পর্দাজোড়া উল্লাসে মনে হচ্ছিল কে যেন নেই।

আলতামিরার গুহাবাসীরা কি প্লেনে চড়ে দেশ দেশান্তরে যেতে পারত? না। তারা কি কম্পিউটার ব্যবহার করত? না। তারা কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মানুষের কাজ যন্ত্রকে দিয়ে করাতে পারত? তাও নয়। তারা কি একটা বোতাম টিপে কয়েক হাজার মাইল দূরের জনপদ ধ্বংস করার প্রযুক্তি আবিষ্কার করে ফেলেছিল? মোটেই না। তারা কি ক্যান্সারাক্রান্ত মানুষের মৃত্যু পিছিয়ে দেওয়ার উপায় জানত? একেবারেই না। কিন্তু তারা বাইসন আঁকতে পারত। সে বাইসন দেখতে অর্থ আর সামর্থ থাকলে আজও সারা পৃথিবীর মানুষ ছুটে যায়। মানুষের আর কিছুই থাকে না, শিল্পটুকুই থেকে যায়। যতদিন না আমাদের এই গ্রহটা মহাবিশ্বের অনিবার্যতায় জীবজগৎহীন জড়পিণ্ডে পরিণত হচ্ছে, ততদিন আর সব কিছু বদলে যাবে, ফুরিয়ে যাবে। থেকে যাবে আমাদের শিল্প।

সেইজন্যেই সাফল্যের চেয়েও শিল্প আমাদের চোখ টানে বেশি, স্মৃতির বেশি জায়গা অধিকার করে। দিয়েগো মারাদোনা তাই অনেকের চেয়ে কম গোল করে, অনেকের চেয়ে কম ট্রফি জিতেও বহু মানুষের হৃদয়সম্রাট হয়ে রয়েছেন। ক্লাবের হয়ে লিওনেল মেসির চেয়ে বেশি খেতাব ভবিষ্যতে জিততেই পারেন কোনো ফুটবলার, ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোই তো খুব পিছিয়ে ছিলেন না। মেসির চেয়ে বেশি গোল হয়ত কিলিয়ান এমবাপেও করে ফেলবেন। কিন্তু যেসব দৃশ্যের জন্ম দিয়েছেন দেড় দশকের বেশি সময়, কাতারের ফুটবল মাঠে যেসব ছবি এঁকেছেন গত একমাস – সেগুলো দিয়েই স্মৃতির মণিকোঠায় মেসির জায়গা পাকা হয়ে গেছে, মারাদোনার মতই। আর কে না জানে স্মৃতির কোনো লেবেল লাগে না, শিল্পে কোনো GOAT হয় না, কোনো র‍্যাঙ্কিং চলে না। এমন কোনো সঙ্গীতরসিক আছেন কি যিনি ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খানের গান শুনতে ভালবাসেন বলে পণ্ডিত ভীমসেন যোশীর গান শোনেন না, হিসাব করেন দুজনের মধ্যে কে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ? আমাদের স্মৃতি তো নাজি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগামী ভিড়ে গাদাগাদি ট্রেনের কামরা নয়, যেখানে উত্তমকুমারের চকিত চাহনির পাশে জায়গা হবে না সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের দীপ্তির।পথের পাঁচালী পড়ে কাঁদলে পুতুলনাচের ইতিকথা-র নির্লিপ্তিতে মুগ্ধ হওয়ার জায়গা থাকবে না – এত সীমিত নয় মানবিক আবেগ।

আর যদি শিল্প জয়যুক্ত হয়? কাল তেমন এক রাত ছিল।

বার্সেলোনার জার্সিতে তিনি যত ফুল ফুটিয়েছেন ইউরোপের মাঠে মাঠে, আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে লাতিন আমেরিকায়, দক্ষিণ আফ্রিকায়, রাশিয়ায় – সব সত্ত্বেও থেকে যাচ্ছিল অপূর্ণতা। রত্নখচিত মুকুটে যে কোহ-ই-নূর না থাকলে আর সবই বৃথা মনে হয়। শুধু আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মনে হয় তা নয়, মেসির মুখ দেখলে বোঝা যেত তাঁর নিজেরও মনে হয়। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের পর সর্বত্রগামী হয়েছিল মেসির অশ্রুসিক্ত ছবি।

আরও পড়ুন বড়লোকের খেলা

পৃথিবীর মানচিত্রে আর্জেন্টিনার একেবারে অন্য প্রান্তে থাকা ফুটবলে অনুন্নত দেশ ভারতের বাসিন্দা আমরা বিশ্বকাপ দেখি স্রেফ আনন্দের খোঁজে। আমরা প্রাক্তন উপনিবেশ, আমরা তৃতীয় বিশ্ব। স্বভাবতই এ দেশের বেশিরভাগ মানুষের সমর্থন সফল ইউরোপের চেয়ে বেশি ঝুঁকে থাকে শিল্পী লাতিন আমেরিকার দিকে। ভারতে যখন থেকে বিশ্বকাপ লাইভ দেখা যায় তখন থেকেই নিখুঁত জার্মানি, ইতালি বা লড়াকু চেক রিপাবলিক, ক্রোয়েশিয়ার চেয়ে আমাদের আবেগকে বেশি উস্কে দেয় ক্যামেরুন বা নাইজেরিয়া। আজও কি বেশ কাছের মানুষ মনে হয় না রজার মিল্লাকে? এ দেশে যারা ইংল্যান্ড, ফ্রান্স বা স্পেনের সমর্থক তাদের মনও তো আসলে কেড়ে নিয়েছিলেন ডেভিড বেকহ্যাম, জিনেদিন জিদান, ইনিয়েস্তার মত বল প্লেয়াররা – ছবি আঁকার নৈপুণ্যে। মানুষ হিংসুটে, মানুষ দাঙ্গাবাজ, মানুষ অকারণে মানুষকে অপমান করে। আইজ্যাক আসিমভ যথার্থই লক্ষ করেছিলেন, মানুষ একমাত্র জীব যারা অন্য জীবকে খাঁচায় পোরে। তবু তো মানুষ যে আনন্দ দেয় তার আনন্দ কামনা করে। খেলার মাঠে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেন শিল্পী ফুটবলাররা। তাই তাঁদের প্রতি পক্ষপাত থাকবেই। বহু মানুষ তাই চেয়েছিলেন, মেসির হাতে যেন একবার বিশ্বকাপটা ওঠে। য়োহান ক্রয়েফ কখনো বিশ্বকাপ ছুঁতে পারেননি, জর্জ বেস্টের সে সুযোগই ছিল না। সে দুর্ভাগ্য যেন মেসির না হয়।

হয়নি। কাল সেই উদ্দাম হাওয়ার রাত ছিল। অন্তত গত চল্লিশ বছরের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্বকাপের ফাইনাল। যেখানে ৩৫ বছরের মেসি প্রথমার্ধেই পেনাল্টি থেকে গোল করলেন, মাঠজুড়ে খেললেন। মাঝমাঠে নিজেদের গোলের দিকে মুখ করে বল পেলেন মেসি, মেসি থেকে জুলিয়ান আলভারেজ, আলভারেজ থেকে ম্যাক অ্যালিস্টার, ম্যাক অ্যালিস্টার থেকে আংহেল দি মারিয়া – ছবির মত গোল হল। আশি মিনিট একতরফা খেলা হওয়ার পর মেসির এক হাত যখন বিশ্বকাপে, তখন ৯৭ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটো গোল করে ফ্রান্সকে ম্যাচে ফেরালেন এরপর যিনি বিশ্বের অবিসংবাদী সেরা ফুটবলার হয়ে উঠবেন, সেই এমবাপে।

তারপর অতিরিক্ত সময়ের শেষ প্রান্তে ফের গোল দিয়ে মেসি যখন উচ্ছ্বাসে ভাসছেন, ভাবছেন সোনার পরী এবার তাঁর হাতের মুঠোয়, তখনই সামান্য ভুলে পেনাল্টি। হাওয়া ঘুরে গেল আবার। তারপর যদি বনস্পতির বিরাট ছায়া না দিতেন সোনার দস্তানার অধিকারী এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, হয়ত প্যারিসেই উড়ে যেত সোনার পরী।

নিঃসন্দেহে সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ ফাইনাল, এ যুগের সেরা ফুটবল শিল্পীর মুকুটে কোহ-ই-নূর বসিয়ে দেওয়ার ফাইনাল।

মেসি কানায় কানায় ভরে উঠলেন। তিনি কী ভাবছিলেন জানি না, কিন্তু কাল টিভির পর্দাজোড়া উল্লাসে মনে হচ্ছিল কে যেন নেই। সেই তিনি, যিনি ২০১০ সালে মেসির দলের কোচ হয়েও এমন অস্থির পদচারণা করতেন সাইডলাইনে যে মনে হত নিজেই নেমে পড়বেন। যিনি গত বিশ্বকাপেও গ্যালারিতে ছেলেমানুষের মত হাসতেন, কাঁদতেন, চিৎকার করতেন আর্জেন্টিনার ম্যাচে। যিনি ভিআইপি, তবু ভিআইপি নন। যাঁর সঙ্গে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের ফুটবল খেলতে না জানা একজন সাধারণ আর্জেন্টিনা সমর্থকের কোনো তফাত থাকত না, উদ্বিগ্ন সঙ্গীসাথীরা পিছন থেকে জামা ধরে টেনে রাখতেন – পাছে মানুষটা টাল সামলাতে না পেরে নিচে পড়ে যায়। ১৯৮৬ সালে প্রায় একা দেশকে বিশ্বকাপ জেতানোর পর যিনি জীবদ্দশায় আর আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় দেখতে পেলেন না, আমূল বদলে যাওয়া ইউরোপকেন্দ্রিক বিশ্ব ফুটবলে ২০ বছর পর লাতিন আমেরিকার বিশ্বজয়ের রাতে সেই আকাশলীন দিয়েগোকে বলতে ইচ্ছে করছিল

ফিরে এসো মারাদোনা;
নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে;
ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;
ফিরে এসো হৃদয়ে আমার…

মেসি
ছবি @ElDiegoPics টুইটার হ্যান্ডেল থেকে

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত