কুণাল, যাঁর কৌতুক আজ কামড়ায়

‘পরেরবার যদি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে এত ব্যাকফুটে থাকার দরকার নেই। সোজা মোদী, অমিত শাহ, আম্বানি, আদানি – যা প্রাণে চায় বলে দেওয়াই ভাল। কারণ যা-ই করো, গালি তো খেতেই হবে। সুতরাং অল আউট খেলাই ভাল। অত ভাবার দরকার নেই যে লোকে অমুক জোকের যুক্তিটা নিয়ে বলবে…ইন্টারনেটে দুই ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক শাসক দলের ভক্ত, আরেক ধরনের লোক শাসক দলকে রীতিমত ঘৃণা করে। অতএব…আমাকে অনেকেই বলেছে, এত ফেন্স সিটিং করছ কেন? সুতরাং ঠিক করে নিয়েছি…সেরা কমেডি হয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, তাই না? পাঞ্চ ডাউন করার চেয়ে পাঞ্চ আপ করা ভাল, আর সেটা যদি করতেই হয় তাহলে পাঞ্চটা জোরে মারাই ভাল। সুতরাং এখন যদি আমি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে সেটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হবে।’

গাম্ভীর্য নির্বোধের মুখোশ। কথাটা অনেককাল আগে বলেছিলেন এক মাস্টারমশাই। মোটেই বিশ্বাস করিনি, কারণ ততদিনে একাধিক জায়গা থেকে জেনেছি যে রাজশেখর বসু অত সরস সব গল্প লিখলেও, খুব গম্ভীর মানুষ ছিলেন। তারাপদ রায়ের সঙ্গে আলাপ ছিল এরকম একজনের মুখ থেকেও একইরকম কথা শুনেছিলাম। কিন্তু মাস্টারমশাই যে নেহাত ভুল বলেননি তার প্রমাণ গত কয়েক দিনে পাওয়া গেছে। ঋজু বিদূষক কুণাল কামরার কমেডি শো যে হলে হয়েছিল, মুম্বইয়ের সেই দ্য হ্যাবিট্যাট -এর মালিক আর কর্মচারীদের জিজ্ঞেস করলে তাঁরা নির্ঘাত বলবেন – হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেছে। তবে নির্বোধ মানেই কিন্তু নিরীহ নয়। সুকুমার রায়ের রামগরুড়ের ছানাদের হাসতে মানা; একনাথ শিন্ডে, দেবেন্দ্র ফড়নবীশের দলবল আরও এককাঠি সরেস। তারা নিজেরা না হেসেই খুশি নয়, অন্যদেরও হাসতে মানা করে ভাংচুর করে।

অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। হাসাহাসি করলে ফ্যাসিবাদী হওয়া যায় না। তাছাড়া শিবসেনার জন্মই হয়েছিল ঠ্যাঙাড়ে বাহিনি হিসাবে, মুম্বই ও সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে ভাঙার জন্যে (দুর্জনে বলে কংগ্রেসের উদ্যোগে)। কুণাল কামরার কমেডি শো নিয়ে শিবসেনার গুন্ডামি দেখে অনেকে খেয়াল করিয়ে দিচ্ছেন, শিবসেনার আদিপুরুষ বালাসাহেব ঠাকরে নিজে কার্টুনিস্ট ছিলেন, ইন্দিরা গান্ধীর ব্যঙ্গচিত্রও এঁকেছেন ইত্যাদি। কিন্তু ওসব কথা বলে লাভ নেই। বাল ঠাকরে শিবসেনার নেতা হিসাবে মোটেই কোনো গণতান্ত্রিক ব্যক্তি ছিলেন না। শিবসেনা কীভাবে মুম্বই চালাত সেকথা সে যুগের মুম্বই তথা মহারাষ্ট্রের বাসিন্দারা প্রত্যেকেই জানেন। নয়ের দশকের মুম্বই দাঙ্গায় শিবসেনার ভূমিকাও কোনো গোপন তথ্য নয়। আজ যে সারা ভারতে সুনির্দিষ্ট পরধর্মবিদ্বেষী এবং/অথবা পরজাতিবিদ্বেষী গুন্ডামি চালু করেছে সংঘ পরিবার, তার সূচনা অনেক আগেই বালাসাহেব করে দিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রে। মুসলমান তো বটেই, সেইসময় শিবসেনার আক্রমণের বড় লক্ষ্য ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় শ্রমজীবী মানুষজন। ফলে কুণালের শো নিয়ে গুন্ডামি করে এক অর্থে একনাথরা প্রমাণ করে দিলেন যে তাঁরাই বাল ঠাকরের যথার্থ উত্তরাধিকারী, উদ্ধব ঠাকরেরা নন। চলচ্চিত্র পরিচালক হনসল মেহতা ২৪ মার্চ তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে এক পোস্টে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে আজ থেকে ২৫ বছর আগে তাঁর একখানা ছবির একটামাত্র সংলাপের জন্যে শিবসৈনিকরা তাঁর অফিসে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছিল। তাঁকে মারধোর করা হয়, মুখে কালি লেপে দেওয়া হয়, তারপর জনা বিশেক রাজনৈতিক নেতা এবং হাজার দশেক লোকের সামনে এক বৃদ্ধার পা ধরে ক্ষমা চাওয়ানো হয়। মুম্বই পুলিস দ্য হ্যাবিট্যাট ভাংচুরে দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে, সেদিনও তাই করেছিল। শিবসেনা কেমনভাবে চলত তা বোঝার জন্যে একথাও মনে করা দরকার যে বালাসাহেব ঠাকরের মৃত্যুর পর গোটা মহারাষ্ট্রে প্রায় বনধ করে দেওয়ার সমালোচনা করে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্যে শিবসৈনিকরা পালঘরের দুই নিরীহ মেয়ের পিছনে লেগেছিল। তাদের পুলিস গ্রেফতার করে এবং একজনের আত্মীয়ের দোকান ভাংচুর করে শিবসৈনিকরা।

তবুও এবারের ঘটনা আর বাল ঠাকরের আমলের বিবিধ গুন্ডামিতে বিলক্ষণ তফাত আছে। তখন শিবসেনা ছিল রাষ্ট্রকেও তোয়াক্কা না করা অথবা রাষ্ট্রশক্তিকে নিজের ইচ্ছা মত চলতে বাধ্য করা শক্তি। আজ একনাথের শিবসেনা রাষ্ট্রের অংশ। স্রেফ তাঁর চ্যালাদের গুন্ডামিতে ব্যাপারটা থেমে থাকেনি, খোদ বৃহন্মুম্বই মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের আধিকারিকরা গিয়ে দ্য হ্যাবিট্যাট ভেঙে এসেছেন। উপরন্তু মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী ফড়নবীশ বলেছেন, কুণালকে ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি যা খুশি তাই বলতে পারেন না। বাকস্বাধীনতার সীমা আছে ইত্যাদি। বালাসাহেব আইনের পথে যেতেন না, নিজের পথ নিজে কেটে নিতেন। কুণালের বিরুদ্ধে কিন্তু একাধিক এফআইআর ফাইল করা হয়েছে। যারা দ্য হ্যাবিট্যাট ভেঙে দিয়ে এসেছে, তারাই থানায় গিয়ে এফআইআর করেছে কুণালের নামে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা মোকদ্দমা হওয়ার খবর নেই এখন পর্যন্ত। এখানেই সাধারণ গুন্ডামি আর ফ্যাসিবাদী হিংসার তফাত। এর বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে গেলে দুটো জিনিস অবশ্য প্রয়োজনীয় – সাহস আর কৌশল। কুণালের দুটোই আছে। কীরকম? দেখা যাক।

নায়কোচিত সাহস

দ্য হ্যাবিট্যাটের শোয়ের পর থেকে যা যা ঘটেছে তাতে কুণাল নায়ক হয়ে গেছেন – এতে অনেক আরএসএসবিরোধীকেও অসন্তুষ্ট হতে দেখছি। তাঁদের মধ্যে কারোর নায়ক ব্যাপারটাতেই আপত্তি, কারোর আবার আপত্তি কুণাল শোয়ের শেষে ভারতের সংবিধান তুলে ধরে নিজের অধিকারের কথা জানান দিয়েছিলেন বলে। আজ দেশের যা অবস্থা, সুপ্রিম কোর্টের আদেশেরও তোয়াক্কা না করে যেভাবে সংঘবিরোধীদের বাড়িঘর দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া চলছে, অপছন্দের লোক হলেই যা ইচ্ছা অভিযোগ দায়ের করে কারাবন্দি করে রাখা চলছে – তাতে কুণালের মত প্রকাশ্যে নাম করে ক্ষমতাসীন লোকেদের নিয়ে যিনি খিল্লি করবেন তিনি তো বহু মানুষের চোখে নায়ক হয়ে যাবেনই। আটকাবেন কী করে? আটকাতে হবেই বা কেন? পৃথিবীর কোন দেশে কোন বিদ্রোহ, কোন বিপ্লব আবার নায়ক ছাড়া হয়েছে? আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তো অনেক নায়ক। সকলে আবার একই মত, একই পথেরও নন। ক্ষুদিরাম বসু নায়ক, মাস্টারদা সূর্য সেন নায়ক, ভগৎ সিং নায়ক, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নায়ক; আবার জওহরলাল নেহরু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, মহাত্মা গান্ধীও নায়ক। শিল্পী সাহিত্যিকদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম নায়ক, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নায়ক, আবার পীতাম্বর দাসও নায়ক। তাঁর নাম আজ প্রায় কারোর মনে নেই, কিন্তু তাঁর রচনা করা ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ গানটা রয়ে গেছে। একটা সময় পর্যন্ত অল্লামা ইকবালও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক ছিলেন। উর্দু, হিন্দি ভাষা নিয়ে অ্যালার্জি না থাকলে ‘সারে জহাঁ সে অচ্ছা’ গানটা আজও যে কোনো দেশপ্রেমিক মানুষের প্রিয় হবে, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’-র মতই। এঁরাও সকলে এক মতের লোক নন। যিনি আমার লড়াইটাই লড়ছেন কিন্তু একই মতের লোক নন, তাঁর সাহসকে সেলাম জানাতে না পারলে আমারই ক্ষুদ্রতা প্রকাশ পায়। তাঁর নয়।

রইল সংবিধানের কথা। পৃথিবীর কোনো সংবিধান নিখুঁত নয়, ভারতের সংবিধানও নয়। আবার যে কোনো দেশের সংবিধান খুললেই দেখা যায় অনেক ভাল ভাল কথা লেখা আছে যার প্রয়োগ নেই। কথাটা ভারতের সংবিধানের ক্ষেত্রেও সত্যি। সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম, বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর, নিজেই সংবিধান সভার শেষ অধিবেশনে বলেছিলেন যে সংবিধানে সমতাবিধান করা হল, কিন্তু ভারতের সমাজ রইল অসাম্যে পরিপূর্ণ। এভাবে কতদিন ভারতে গণতন্ত্র টিকবে তা নিয়ে তিনি পরেও বারবার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ভারতের বহু মানুষ যে এই সংবিধানের দ্বারা নানা মাত্রায় উপকৃত হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ঠিক যেমন অনস্বীকার্য যে অনেক মানুষের উপর নিপীড়ন চালানো হয়েছে এবং হচ্ছে এই সংবিধানকে হাতিয়ার করেই। তা বলে যে কোটি কোটি ভারতীয় সংবিধানের উপর আস্থা রাখেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আজকের লড়াইয়ে সংবিধানকে নিজের অস্ত্র মনে করছেন তাঁদের বিরুদ্ধ পক্ষ বলে মনে করা বা তাঁদের দিকেই বাক্যবাণ ছোড়া এককথায় নির্বুদ্ধিতা। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নানা জন নানাভাবে লড়বে, যার যতটুকু ক্ষমতা সে ততটুকুই দিয়েই লড়বে। কেউ লোক হাসিয়ে লড়বে, কেউ গান গেয়ে লড়বে, কেউ লিখে লড়বে, কেউ রাস্তায় মিছিল, মিটিং করে লড়বে, কেউ আইনি লড়াই করবে। এখন ‘এই সংবিধান মানি না’ বলার সময় নয়, কারণ এখন যুদ্ধটা সংবিধানের বিরুদ্ধে নয়। এটুকু বুঝতে খুব অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যদি আপনার সোশাল মিডিয়ার বাইরে একটা সত্যিকারের লড়াই থাকে।

উপযুক্ত কৌশল

কুণালকে মুম্বই থেকে ফোনে হুমকি দিচ্ছে কিছু লোক আর কুণাল তাদের বলছেন ‘আ যা তামিলনাড়ু’ – এমন একটা অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে। অনেক খবরের চ্যানেলেও শোনানো হয়েছে। এটা ভুয়ো বলে এখন পর্যন্ত জানা যায়নি আর ঘটনা হল, মুম্বইয়ের বাসিন্দা কুণাল কয়েক বছর হল তামিলনাড়ুতে থাকতে শুরু করেছেন। ফলে তিনি যে হলে শো করেছিলেন সেখানে ভাংচুর চালাতে পারলেও একনাথের ভক্তরা কুণালকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করতে পারেনি। পারলে কী করত তা অনুমান করাও অসম্ভব। স্রেফ হনসলের হাল করে ছেড়ে দিত – একথা আজকের ভারতে নিশ্চিত করে বলা যায় না। মনে রাখতে হবে, বিনা বিচারে উমর খালিদকে বছরের পর বছর আটক করে রাখার আগে তাঁর দিকে গুলি চালানো হয়েছিল। কুণাল মুসলমান নন বলে তেমন সম্ভাবনা নেই – এরকম যাঁরা ভাবেন তাঁরা হয়ত ২০২০ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হোস্টেলে হামলার কথা ভুলে গেছেন। কুণাল অবশ্যই ভোলেননি। উপরন্তু অন্য এক বিদূষক মুনাওয়ার ফারুকীর শো যখন ২০২১ সালে ইন্দোরে বলপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং যে কৌতুক তিনি করেননি তার জন্যে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল, তখন যে বিদূষকরা মুনাওয়ারের হয়ে লড়াই লড়েছিলেন, কুণাল তাঁদের একজন। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে কুণাল সচেতনভাবেই এমন এক রাজ্যে চলে গেছেন যে রাজ্যের সরকার সংঘ পরিবারের সঙ্গে আদর্শগত লড়াইয়ে লিপ্ত, অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। শুধু তাই নয়, অদূর ভবিষ্যতে এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন ডিএমকে ক্ষমতাচ্যুত হলেও বিজেপির তামিলনাড়ুতে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই (পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু আছে)। তামিলনাড়ুতে সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এত তীব্র যে সম্প্রতি কেন্দ্রের তিন ভাষা নীতি নিয়ে বিতর্কের আবহে সেখানকার বিজেপি নেত্রী রঞ্জনা নাচিয়ার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন

মুম্বইতে দাঁড়িয়ে নাম করে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, ফড়নবীশ, মুকেশ আম্বানি, তাঁর ছেলে, আনন্দ মাহিন্দ্রা, এবং নাম না করে একনাথকে নিয়ে মস্করা করার সাহসের পিছনে যে কুণাল যে রাজ্যে থাকেন তার নিরাপত্তা কাজ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্যাপারটার মধ্যে কৌশল আছে বলে কুণালের সাহসকে এক বিন্দুও ছোট করা যায় না। কারণ সাম্প্রতিক অতীতে বিজেপিশাসিত রাজ্যে অভিযোগ দায়ের করে অন্য রাজ্যের লোককে গ্রেফতার করার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। আসাম পুলিস ২০২০ সাল থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের নির্দেশে গর্গ চ্যাটার্জিকে গ্রেফতার করতে চাইছিল। কলকাতা পুলিস নাকি সহযোগিতা করছিল না। শেষমেশ ২০২২ সালে গৌহাটি হাইকোর্ট কলকাতার পুলিস কমিশনারকে গর্গবাবুকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়, কলকাতা পুলিসকে সে নির্দেশ মানতেই হয়। গুজরাটের বিধায়ক জিগ্নেশ মেওয়ানিকেও আসাম পুলিস গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছিল। অবশ্যই গুজরাট সরকার বিজেপির হওয়ায় সুবিধা হয়েছিল। কংগ্রেস নেতা পবন খেরাকে তো স্রেফ প্রধানমন্ত্রীকে ‘নরেন্দ্র গৌতমদাস মোদী’ বলার জন্যে দিল্লি বিমানবন্দরে বিমান থেকে নামিয়ে গ্রেফতার করেছিল আসাম পুলিস। তবে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে তিনি কয়েক ঘন্টার মধ্যেই জামিন পেয়ে যান।

একথা ঠিক যে কুণালের এখন যেরকম নাম হয়েছে তাতে তাঁকে গ্রেফতার করা হলে প্রশান্ত ভূষণ বা ইন্দিরা জয়সিংয়ের মত দেশের সবচেয়ে নামকরা আইনজীবীরা হয়ত তাঁর হয়ে লড়বেন। তবে মনে রাখতে হবে, কুণাল কিন্তু গর্গ, জিগ্নেশ বা পবনের মত সক্রিয় রাজনীতির লোক নন। তাঁর কাছে গ্রেফতার হওয়া অতখানি জলভাত ব্যাপার না হওয়ারই কথা। আরও বড় কথা হল, কুণাল সুপ্রিম কোর্টকে আগে থেকেই চটিয়ে রেখেছেন। ২০২১ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট যে দ্রুততায় অর্ণব গোস্বামীর জামিন মঞ্জুর করেছিল, তাকে ব্যঙ্গ করে একগুচ্ছ টুইট করেন। তার জন্যে তাঁর নামে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে কিছু লোক, বিচারপতিরাও আদালত অবমাননার নোটিস পাঠান। কুণাল তার যে জবাব দিয়েছিলেন তাও একই সঙ্গে সাহস ও রসবোধের নিদর্শন। মোদ্দা কথা, তিনি বিচারপতিদের সামনেও মাথা নোয়াননি। শুধু কি তাই? নিজের এক শোয়ে সুপ্রিম কোর্টকে ‘ব্রাহ্মণ-বানিয়া অ্যাফেয়ার’ পর্যন্ত বলে বসে আছেন। এমন লোকের উপর কি আর বিচারপতিরা সদয় হবেন?

কুণালের পরিবর্তন

কুণাল ঋজু বিদূষক হিসাবে কাজ করছেন বছর দশেক হতে চলল। কিন্তু তিনি কি বরাবর এতটা রাজনৈতিক, এত প্রতিবাদী, এতখানি সাহসী ছিলেন? উত্তর হল – না। ২০১৬-১৭ সালে কুণালের যে ভিডিও প্রথম ভাইরাল হয় এবং তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে, তার নাম ছিল প্যাট্রিয়টিজম অ্যান্ড দ্য গভমেন্ট

এখানে তিনি যেসব কৌতুক করছেন সেগুলোও রাজনৈতিক। তিনি সেইসময় যা যা নিয়ে সর্বত্র আলোচনা হত, যেমন নোটবন্দি, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় – সব নিয়েই কথা বলছেন। কিন্তু তাতে আরও নানারকম কৌতুক মিশে আছে। তিনি সমাজের নানা ধরনের লোককে নিয়ে মজা করছেন, সোশাল মিডিয়া ট্রেন্ডগুলো নিয়ে কথা বলছেন, নেটফ্লিক্স নিয়ে মজা করছেন। তখন তাঁর মতে সরকার ছিল ভোডাফোনের মত ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’, আর নাগরিক উপভোক্তা। এরপর ২০১৭ সালে তাঁর যে শোয়ের ভিডিও ইউটিউবে আপলোড হয়, সেখানে কুণাল মূলত ট্যাক্সিচালকদের নিয়ে মজা করেন। বিশেষত উবের ড্রাইভারদের নিয়ে। বলেন যে উবের একটা ভাল অ্যাপ কিন্তু ভারতে সেটা কাজ করে না, কারণ এখানকার ড্রাইভাররা ওই অ্যাপের নিয়ম অনুযায়ী চলতে চান না। ২০১৮ সালে দেশ কে বুডঢে ভিডিও। এটাও রাজনৈতিক এবং বিজেপিবিরোধী। কিন্তু ব্যঙ্গের চাঁদমারি বৃদ্ধ দক্ষিণপন্থীরা।

তারপরের ভিডিও আবার অনেকটা অরাজনৈতিক। সেখানে কুণাল মূলত মুম্বই আর ইন্দোর – এই দুই শহরের নানা গোলমালকে ব্যবহার করে হাস্যরস উৎপাদন করেন। এসবের পাশাপাশি চলছিল তাঁর পডকাস্ট শাট আপ ইয়া কুণাল, যেখানে তিনি উমর খালিদ আর কানহাইয়া কুমারের সাক্ষাৎকার নেন। আবার বিজেপি নেতাদেরও সাক্ষাৎকার নেন। কিন্তু এই ২০১৮ সালে কুণালের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। অ্যাবিশ ম্যাথিউ নামে একজন ঋজু বিদূষক আছেন যিনি কুণালের মত অতটা জনপ্রিয় নন। তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে তিনি জার্নি অফ আ জোক নামে একখানা পডকাস্ট করেন। সেই পডকাস্টের এক পর্বে কুণাল আসেন সেবছর। সেখানে অ্যাবিশ কুণালের থেকে জানছিলেন প্যাট্রিয়টিজম অ্যান্ড দ্য গভমেন্ট শোয়ের কৌতুকগুলো কীভাবে তৈরি করা হয়েছিল। পর্বের শেষদিকে অ্যাবিশ জিজ্ঞেস করেন, ওই ভিডিওর যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে তা থেকে কুণাল কী শিখলেন? উত্তরে কুণাল বলেন ‘পরেরবার যদি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে এত ব্যাকফুটে থাকার দরকার নেই। সোজা মোদী, অমিত শাহ, আম্বানি, আদানি – যা প্রাণে চায় বলে দেওয়াই ভাল। কারণ যা-ই করো, গালি তো খেতেই হবে। সুতরাং অল আউট খেলাই ভাল। অত ভাবার দরকার নেই যে লোকে অমুক জোকের যুক্তিটা নিয়ে বলবে…ইন্টারনেটে দুই ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক শাসক দলের ভক্ত, আরেক ধরনের লোক শাসক দলকে রীতিমত ঘৃণা করে। অতএব…আমাকে অনেকেই বলেছে, এত ফেন্স সিটিং করছ কেন? সুতরাং ঠিক করে নিয়েছি…সেরা কমেডি হয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, তাই না? পাঞ্চ ডাউন করার চেয়ে পাঞ্চ আপ করা ভাল, আর সেটা যদি করতেই হয় তাহলে পাঞ্চটা জোরে মারাই ভাল। সুতরাং এখন যদি আমি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে সেটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হবে।’

আজকের কুণালের দিকে সেদিনের কুণালের যাত্রা শুরু তখন থেকে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তাঁর যে ভিডিও আপলোড হয় সেখানে কুণাল এসে দাঁড়ান একখানা কালো টি শার্ট পরে, যার উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা WAH MODIJI WAH। মঞ্চে এসেই তিনি দর্শকদের জিজ্ঞেস করেন ‘আমার আর আম্বানিজির মধ্যে মোদীজি কী করছেন? আমি সোজা আম্বানিকে কেন ভোট দিতে পারি না?’ হাসাহাসির মধ্যে দিয়ে কুণাল একবিংশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির এক নিদারুণ সত্য উদ্ঘাটন করে ফেলেন – আজকের রাজনীতিকে চালায় আসলে বড় বড় কর্পোরেশনগুলো। তখনো কিন্তু মোদীর সঙ্গে আম্বানি, গৌতম আদানির সম্পর্ক নিয়ে রাহুল গান্ধী সরব হননি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হয়ে ইলন মাস্কের লম্ফঝম্প কোনোদিন দেখতে হবে – একথাও কেউ কল্পনা করেনি। অথচ কুণাল বলেন ‘আমার মনে হয় কর্পোরেশনগুলোরই ভোটে লড়া উচিত। রতন টাটা বনাম মুকেশ আম্বানি। লড়ো ২০১৯।’ এই কৌতুককে এগিয়ে নিতে নিতেও কুণাল আমাদের এক বুনিয়াদি বিতর্কের দিকে নিয়ে যান। সেটা হল – উন্নয়ন বা বিকাশ মানে কী?

নয়া উদারনীতিবাদ আমাদের এমন মাথা খেয়েছে, এটা যে বিতর্কের বিষয় তা এদেশের মার্কসবাদের নামে শপথ নেওয়া অনেক পার্টিও এই সহস্রাব্দে ভুলেই গেছে। লক্ষ করুন, যে কুণাল আগে সরকারকে ভোডাফোনের মত একটা কোম্পানি বলেই আখ্যা দিতেন, তিনি বছর তিনেক পরেই কর্পোরেশনগুলোর মুখোশ খুলছেন হাসাতে হাসাতে। পরের পাঁচ বছরে কুণাল কী কী করলেন? একদা উবের ড্রাইভারদের আচরণ নিয়ে কৌতুক করা মানুষটি গিগ শ্রমিকদের নিয়ে তৈরি গানের ভিডিও শেয়ার করলেন নিজের ইউটিউব চ্যানেলে। দেশের গোদি মিডিয়ার মুকুটহীন সম্রাট এবং জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারী সাংবাদিক অর্ণবের যে নিজের স্টুডিওর স্বাচ্ছন্দ্যের বাইরে এলে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না তা ফাঁস করে দিলেন বিস্তর ঝামেলার ঝুঁকি নিয়েও। উমর, শার্জিল ইমামের মত রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতে সভায় বক্তৃতা দিলেন। হাস্যকৌতুকের ভিডিওগুলোতেও কৃষক আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা দেখালেন, পডকাস্টে পি সাইনাথের মত লোককে ডেকে আনলেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের সময়ে পুরোদস্তুর সাংবাদিকসুলভ অধ্যবসায়ে পর্বের পর পর্বে সরকারের রিপোর্ট কার্ড বার করলেন। অতঃপর এই সাম্প্রতিকতম ভিডিও, যা মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধীদের ভরাডুবির পর সারা দেশে ঝুলে পড়া অনেক কাঁধকে মাথা তোলার সাহস দিল।

এই ভিডিওতে কুণাল যাদের আক্রমণ করেছেন তারা বুদ্ধিমানের মত, অতি ক্ষুদ্র এক ব্যক্তি, যার নামও নেওয়া হয়নি, তাকে অপমান করা হয়েছে অভিযোগ করে হল্লা করছে। সেই হল্লায় বিরোধী পক্ষের অনেকেও ভুলছেন। তাঁরা খেয়াল করছেন না, ভারতের কোনো রাজনৈতিক নেতা এখনো যা বলেননি কুণাল প্রথমবার সেটাই বলে দিয়েছেন এই ভিডিওতে। দেশের কমিউনিস্টরা পর্যন্ত যখন ফ্যাসিবাদী শাসন চলছে না নয়া ফ্যাসিবাদী – তা নিয়ে তাত্ত্বিক তর্কে মেতে আছেন, তখন এই বিদূষক শাহরুখ খান অভিনীত বাদশা ছবির টাইটেল সংটার প্যারডি বানিয়ে মোদীকে ‘তানাশাহ’ (একনায়ক) বলে দিয়েছেন। ওঁদের লেগেছে তো আসলে ওইখানে। আজকের দিনে গণতান্ত্রিক ভড়ংটা বজায় রাখতে সব একনায়কই চায়। রচপ তায়িপ এর্দোগান, ভ্লাদিমির পুতিনও সর্বক্ষণ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে তাঁদের দেশে গণতন্ত্র চলছে। মোদীও ব্যতিক্রম নন। সেখানে একজন লোক হাসানোর লোক যদি সরাসরি একনায়ক শব্দটা উচ্চারণ করে ফেলে, তা হজম করা শক্ত। হাসিকে ভয় পায় না এমন কোনো একনায়ক হয় না। কারণ মানুষের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে ভয়ের কারণে, আর হাসি একনায়ককে খিল্লির পাত্র করে ফেলে। তাতে ভয় কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কোনো বিরোধী নেতার মুখ থেকে এই শব্দ বেরোলে খুব বেশি লোক পাত্তা না-ও দিতে পারে। কারণ একে তো অনেকে রাজনৈতিক বক্তৃতা শোনে না, তার উপর বিরোধীরা তো ক্ষমতাসীনের নামে দু-চারটে খারাপ কথা বলবেই। কিন্তু যে লোক হাসায় তার কথা স্রেফ রাগ করার জন্যেও অনেকে শোনে। ফলে কুণালের এই ভিডিও এক মূর্তিমান বিপদ। বিজেপি আই টি সেল ইতিমধ্যেই নেমে পড়েছে কুণালের পিছনে ডীপ স্টেটের ভূমিকা আছে, মার্কসবাদীদের টাকায় কুণাল চলেন – এইসব বলে পরিস্থিতি সামলাতে। মহারাষ্ট্র পুলিস কুণালের মুম্বইয়ের বাড়িতে গিয়ে, তিনি কাদের থেকে টাকাপয়সা পেয়েছেন তা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তাঁর বাবা-মায়ের কাছে শমনও দিয়ে এসেছে। মজা হল, যত এসব করা হচ্ছে তত কুণালের কৌতুকগুলোর শক্তি বেড়ে যাচ্ছে। কারণ কুণাল বহুদিন আগে থেকে নিজেই হাসি হাসি মুখে বলে থাকেন ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া নে বহত প্যায়সে দিয়ে হ্যাঁয় মেরে কো’।

একটা কথা না বলে এ আলোচনা শেষ করতে পারছি না।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের অগ্রণী সৈনিক ভাবার এক অকারণ অভ্যাস বাঙালিদের আছে। সংঘ পরিবারের গোটা ভারতের উপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার আবহে এখন আরও বেশি করে পশ্চিমবঙ্গে বেশকিছু বাংলাবাদীর উদ্ভব হয়েছে। তাঁদের অনেকে অনাবাসী ভারতীয় হয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন বিক্রি করেন সোশাল মিডিয়ায়, অবিভক্ত বাংলা আলাদা রাষ্ট্র হলে কী হত না হত তা নিয়ে বাষ্পাকুল হয়ে পড়েন। অনেকে আবার পশ্চিমবঙ্গে থেকেই নিজের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দি পড়িয়ে বাংলার সংস্কৃতি বাঁচাতে ব্যাকুল। কুণালের মত হিন্দিভাষীদের কাজের প্রশংসা করলেই তাঁরা ভীষণ রেগে যান। কিন্তু কী করা যাবে? বাংলায় একজনও যে আজ পর্যন্ত হিন্দিভাষী রবীশ কুমার বা কুণালের মত ঋজু হয়ে দাঁড়াতে পারলেন না ফ্যাসিবাদের সামনে। না কোনো সাংবাদিক, না কোনো ঋজু বিদূষক, না কোনো গায়ক, না কোনো কবি। সারা ভারতে জনপ্রিয় হওয়ার কথা বলছি না। তার জন্যে অবশ্যই কুণালরা হিন্দি, ইংরিজি ব্যবহার করার সুবিধা পান। কিন্তু বাংলা ভাষায় বাঙালিদের আলোড়িত করার মত আমির আজিজ সুলভ গনগনে একখানা কবিতা কোন কবি লিখেছেন মোদী সরকারের দশ বছরে? স্লোগান হয়ে ওঠা কবিতার আবশ্যিক গুণ নয়। কিন্তু বরুণ গ্রোভার রচিত ‘হম কাগজ নহি দিখায়েঙ্গে’ যেভাবে সারা দেশে স্লোগান হয়ে উঠেছিল, তেমন একখানা কবিতাই বা কে লিখেছেন বাংলায়? বাংলা ভাষার কোন সাংবাদিক (এমনকি বিকল্প মাধ্যমেরও) রবীশের মত লাগাতার লিখে যাচ্ছেন/বলে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে?

আরও পড়ুন হাসছি মোরা হাসছি দেখো: বীর দাসের বীরত্বে দুই ভারতের পর্দা ফাঁস

কেন্দ্রের সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা বলছি, রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বলছি না। কাজটা তো খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়, কারণ কুণালের তামিলনাড়ুর মত পশ্চিমবঙ্গও তো বিজেপিবিরোধী দলের (অন্তত তাদের বয়ান অনুযায়ী) শাসনে থাকা রাজ্য। কুণালের পিছনে যদি স্ট্যালিনের বরাভয় থেকে থাকে, এখান থেকে তাঁর মত কেউ উঠে দাঁড়ালে তাঁর পিছনেও নিশ্চয়ই মমতা ব্যানার্জির বরাভয় থাকবে। তাহলে ভয় কিসের?

আসলে বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল, আমাদের সে মুরোদ নেই। আমরা মুখেন (এবং ফেসবুকেন) মারিতং জগৎ। আমাদের রাজ্য সরকারও তাই। নইলে যে ডিলিমিটেশন হলে আমাদের সাড়ে সর্বনাশ, তার বিরুদ্ধে অবিজেপি মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠক ডাকলেন স্ট্যালিন, তাতে গেলেনই না আমাদের রাজ্য সরকারের কোনো প্রতিনিধি!

অতএব আমাদের হয়ে লড়বেও অন্যরাই। আমরা কেবল পায়ের উপর পা তুলে তাদের দোষ ধরে যাব, কেন তারা যথেষ্ট বিপ্লবী নয় তা লিখে সোশাল মিডিয়া ভরাব। যেমন এখন কুণাল সম্পর্কে ভরাচ্ছি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সোশাল মিডিয়া: বিপ্লব নয়, প্রতিবিপ্লব

২০২২ সালে রাশিয়ায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টুইটার নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ জুকেরবার্গ চীনের বিরুদ্ধে সরব হলেও রাশিয়া সম্পর্কে নীরব। আর ভারত? ২০২৩ পর্যন্ত টানা ছয় বছর আমাদের দেশ সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট শাটডাউন করা দেশের শিরোপা অর্জন করেছে। ইন্টারনেট না থাকলে মেটার কোনো অ্যাপ চলাই সম্ভব নয়। অথচ জুকেরবার্গের কিন্তু ভারত সরকারের সেন্সরশিপ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই।

বিশ শতকের প্রথম আড়াই দশকের মধ্যে অন্তত দুটো পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দেওয়ার মত ঘটনা ঘটেছিল। একটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮), অন্যটা রুশ বিপ্লব (১৯১৭)। দুটোরই অকুস্থল অবশ্য মূলত ইউরোপ। তার বাইরে এগুলোর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে সময় লেগেছে। দুটোর সঙ্গেই বিস্তর রক্তপাত জড়িয়ে। এই শতকের প্রথম আড়াই দশকে একাধিকবার বিশ্বযুদ্ধ লাগব লাগব মনে হলেও লাগেনি। কিন্তু কেবল ইউরোপ বা আমেরিকা নয়, গোটা দুনিয়া জুড়ে একটা রক্তপাতহীন বিপ্লব ঘটে গেছে বলে আমরা মনে করেছিলাম। খুবই অল্পসংখ্যক মানুষ সে বিপ্লব নিয়ে উল্লসিত হতে অস্বীকার করেছিলেন এবং আমরা যারা নাচছিলাম তাদের সতর্ক করে বলেছিলেন – ওটা বিপ্লব তো নয়ই; বরং গত কয়েক শতকে বিক্ষোভ, বিদ্রোহ, বিপ্লব এবং বিজ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ যতখানি এগিয়েছিল সেই অগ্রগতিকে একেবারে নস্যাৎ করে দেওয়ার কৌশল। কোন বিপ্লবের কথা বলছি? সোশাল মিডিয়া বিপ্লব। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে এসে শেষমেশ পরিষ্কার হয়ে গেল যে সোশাল মিডিয়া আসলে মানুষের যাবতীয় প্রগতির বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব। মুশকিল হল, আমি আপনি সবাই এই প্রতিবিপ্লবে অংশগ্রহণ করে ফেলেছি এবং এখন আর বেরোবার রাস্তা পাওয়া যাচ্ছে না।

বহু মানুষ এবং গোষ্ঠী আছেন যাঁরা সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ব্যবসায়িক, রাজনৈতিক এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক ইতিবাচক কাজকর্ম চালান। তাঁরা সোশাল মিডিয়াকে সরাসরি প্রগতির বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব আখ্যা দিচ্ছি বলে রেগে যেতে পারেন। তাঁদের একটু ধৈর্য ধরতে বলব। এ সপ্তাহে মেটার মালিক – অর্থাৎ ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ, ইনস্টাগ্রাম এবং থ্রেড নামক সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর মালিক – মার্ক জুকেরবার্গ একখানা নাতিদীর্ঘ ভিডিও বক্তৃতা প্রকাশ করেছেন। সেখানে যা বলেছেন তা বাংলায় ভাষান্তরিত করলে এইরকম দাঁড়ায়

বন্ধুগণ, আজ আমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে চাই। কারণ ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে বাকস্বাধীনতার ব্যাপারে আমাদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। আমি সোশাল মিডিয়া গড়ে তুলতে শুরু করেছিলাম মানুষকে তার নিজের কণ্ঠস্বর দেওয়ার জন্যে। প্রায় পাঁচ বছর আগে জর্জটাউনে একটা বক্তৃতা দিয়েছিলাম বাকস্বাধীনতা বজায় রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে। আমি আজও তাতে বিশ্বাস করি। কিন্তু গত কয়েক বছরে অনেককিছু ঘটে গেছে। বিস্তারিত বিতর্ক হয়েছে অনলাইন কনটেন্ট কতখানি ক্ষতি করে তা নিয়ে। সরকারগুলো আর ঐতিহ্যশালী মূলধারার সংবাদমাধ্যম বেশি বেশি করে সেন্সর চাপিয়ে দিয়েছে। এর অনেকটাই স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক। কিন্তু একথাও ঠিক যে সত্যিই অনেক ক্ষতিকর কনটেন্ট সোশাল মিডিয়ায় রয়েছে – ড্রাগ, সন্ত্রাসবাদ, শিশু নির্যাতন। আমরা এই বিষয়গুলোকে খুব গুরুত্ব দিয়ে বিচার করি এবং আমি এগুলোর দায়িত্বপূর্ণ মোকাবিলা নিশ্চিত করতে চাই। তাই কনটেন্ট মডারেট করার জন্যে আমরা অনেক জটিল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলাম। কিন্তু জটিল ব্যবস্থা গড়ে তোলার মুশকিল হল, তাতে প্রচুর ভুলও হয়। যদি ভুল করে ১% পোস্টও সেন্সর করা হয়, সেটাও কয়েক লক্ষ মানুষকে সেন্সর করা। আর আমরা এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গেছিলাম যেখানে বড় বেশি ভুল হচ্ছিল আর বড় বেশি সেন্সরশিপ চলছিল। সাম্প্রতিক নির্বাচনটাকেও [মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন] মনে হল বাকস্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সাংস্কৃতিক তুঙ্গ মুহূর্ত। সুতরাং আমরা আমাদের শিকড়ে ফিরে যেতে চলেছি এবং আমাদের ভুলের সংখ্যা কমানোর দিকে জোর দিতে চলেছি, আমাদের নীতিগুলোর সরলীকরণ করতে চলেছি এবং আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে বাকস্বাধীনতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চলেছি। আরও নির্দিষ্টভাবে বললে আমরা যা করতে চলেছি তা হল – প্রথমত, আমরা তথ্য যাচাইকারীদের বাদ দিয়ে তার বদলে এক্স সাইটের মত কমিউনিটি নোট চালু করতে চলেছি। এ কাজ শুরু হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালে প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার পরে ঐতিহ্যশালী মূলধারার সংবাদমাধ্যম ক্রমাগত লিখে গেছে ভুয়ো তথ্য কীভাবে গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কোনটা সত্যি সেটার নির্ধারক হয়ে না বসে আমরা সৎভাবে ওই দুর্ভাবনাগুলো দূর করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তথ্য যাচাইকারীরা রাজনৈতিকভাবে বড় বেশি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে কাজ করেছেন এবং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বাস অর্জন করার চেয়ে বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন বেশি। অতএব আগামী কয়েক মাস ধরে আমরা অনেক বেশি করে সবদিক রক্ষা করে এমন কমিউনিটি নোট ব্যবস্থা ধাপে ধাপে চালু করতে যাচ্ছি।

দ্বিতীয়ত, আমরা আমাদের কনটেন্ট নীতিগুলোর সরলীকরণ করে অভিবাসন আর লিঙ্গ সম্পর্কে এমন একগুচ্ছ নিষেধ তুলে দিতে যাচ্ছি যেগুলো মূলধারার বয়ানের সঙ্গে একেবারে বেমানান। যা আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠার আন্দোলন হিসাবে শুরু হয়েছিল, তা ক্রমশই হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিন্নমত এবং ভিন্নমতের লোকেদের চুপ করানোর উপায়। এখানে বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। সুতরাং আমি নিশ্চিত করতে যাই যে মানুষ নিজের বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতা আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে শেয়ার করতে পারছে।

তৃতীয়ত, আমরা যেভাবে আমাদের নীতিগুলো প্রয়োগ করি তাতেও পরিবর্তন আনতে চলেছি। ওগুলোই আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে যত সেন্সরশিপ হয় তার বেশিরভাগ ভুলের জন্যে দায়ী। আমাদের যে কোনো নীতিকে লঙ্ঘন করে যেসব পোস্ট সেগুলোকে ধরার জন্যে আমাদের ফিল্টার ছিল। এখন থেকে সেই ফিল্টারগুলো মূলত নজর দেবে বেআইনি এবং গুরুতর নীতি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর উপর। আর সেগুলোর ক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা নেওয়ার আগে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীরা রিপোর্ট করেছেন কিনা তার উপর নির্ভর করব। সমস্যা হল, ফিল্টারগুলোও ভুল করে এবং এমন প্রচুর কনটেন্ট মুছে দেয় যেগুলো মোছা উচিত নয়। সুতরাং ফিল্টারগুলোর ভূমিকা কমিয়ে আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্মের সেন্সরশিপ অনেকখানি কমিয়ে ফেলতে পারব। এছাড়াও আমরা কনটেন্ট ফিল্টারগুলোকে এমনভাবে টিউন করতে চলেছি যে কোনো কনটেন্ট মুছে দেওয়ার আগে ফিল্টারগুলোকে অনেক বেশি নিশ্চিত হতে হবে।

সত্যি কথা বলতে এগুলো করলে কিছু ক্ষতিস্বীকারও করতে হবে। এই ব্যবস্থায় অনেক কম খারাপ জিনিস ধরা পড়বে, কিন্তু যত নিরপরাধ মানুষের পোস্ট আমরা ভুল করে মুছে দিই তার সংখ্যা কমবে।

চতুর্থত, আমরা সিভিক কনটেন্ট ফিরিয়ে আনছি। বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুক সমাজ রাজনীতি কম দেখতে চাইছিল কারণ এতে মানুষের মানসিক চাপ বেড়ে যাচ্ছিল। তাই আমরা ওই ধরনের পোস্ট সুপারিশ করা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু মনে হচ্ছে আমরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছি এবং আমরা জানতে পারছি যে লোকে ওই ধরনের কনটেন্ট আবার দেখতে চাইছে। তাই আমরা ধাপে ধাপে সেই ধরনের কনটেন্ট ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আর থ্রেডে ফিরিয়ে আনতে চলেছি যাতে গোষ্ঠীগুলো বন্ধুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক থাকে।

পঞ্চমত, আমরা আমাদের ট্রাস্ট অ্যান্ড সেফটি অ্যান্ড কনটেন্ট মডারেশন টিমগুলোকে ক্যালিফোর্নিয়ার বাইরে নিয়ে যাচ্ছি এবং আমাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কনটেন্ট রিভিউ হবে টেক্সাস থেকে। আমরা যেহেতু বাকস্বাধীনতা বৃদ্ধি করতে চলেছি, সেহেতু আমার মনে হয় এমন জায়গা থেকে কাজ করলে বেশি বিশ্বস্ত হওয়া যাবে যেখানে আমাদের টিমের পক্ষপাত নিয়ে ভাবনা কম।

শেষত, আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সেইসব সরকারের বিরুদ্ধে লড়ব যারা আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে আক্রমণ করছে আরও সেন্সর করার জন্যে। গোটা পৃথিবীর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই বাকস্বাধীনতা রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী সাংবিধানিক ব্যবস্থা রয়েছে। ইউরোপে ক্রমশ এমন সব আইন বেড়ে যাচ্ছে যেগুলো সেন্সরশিপকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। ফলে সেখানে উদ্ভাবনীমূলক কিছু করা শক্ত হয়ে যাচ্ছে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর এমন গোপন কোড আছে যা দিয়ে তারা চুপিসারে কোম্পানিগুলোকে নানা পোস্ট মুছে দিতে বলতে পারে। চীন আমাদের অ্যাপগুলোকে তাদের দেশে একেবারেই নিষিদ্ধ করে রেখেছে। এই বিশ্বব্যাপী প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই করা যেতে পারে একমাত্র মার্কিন সরকারের সঙ্গে মিলে কাজ করলেই। সেই কারণেই গত চার বছরে কাজ করা খুব শক্ত হয়ে গিয়েছিল, কারণ মার্কিন সরকারও সেন্সরশিপ চালানোর জন্যে চাপ দিচ্ছিল। আমাদের এবং অন্য আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে আক্রমণ করে মার্কিন সরকার অন্য দেশের সরকারগুলোর আমাদের সেন্সর করার সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এবার আমাদের সামনে বাকস্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার সুযোগ এসেছে এবং আমি সেই সুযোগ নিতে উদগ্রীব। এতে সময় লাগবে আর এগুলো জটিল ব্যবস্থা। ফলে কখনোই একেবারে নিখুঁত হবে না। তাছাড়াও প্রচুর বেআইনি জিনিস আছে যেগুলোকে সরাতে আমাদের এরপরেও অনেক পরিশ্রম করতে হবে। কিন্তু আসল কথা হল, বহুবছর ধরে আমাদের কনটেন্ট মডারেশন প্রোগ্রামের প্রধান কাজ ছিল কনটেন্ট মুছে দেওয়া। এবার সময় এসেছে ভুল কমানোর উপর জোর দেওয়ার, আমাদের ব্যবস্থাগুলোর সরলীকরণ করার এবং আমাদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার, অর্থাৎ মানুষকে তার নিজের কথা বলতে দেওয়ার। আমি এই নতুন অধ্যায়ের দিকে সাগ্রহে তাকিয়ে আছি। ভাল থাকুন, শিগগির আরও কিছু নিয়ে ফিরে আসব।’

অতীতে কখনো এরকম বুক ফুলিয়ে কোনো বহুজাতিক কোম্পানি মার্কিন সরকারের সঙ্গে মিলে অন্য দেশের সরকারগুলোর আইনকানুনের বিরুদ্ধে লড়ার কথা ঘোষণা করেছে কিনা তা ঐতিহাসিক গবেষণার বিষয় হতে পারে। এসব বরাবর চোরাগোপ্তা চলেছে। কিন্তু জুকেরবার্গের এই ঘোষণা প্রমাণ করে দিল যে বিশ্বজুড়ে বহু ইন্টারনেট অ্যাক্টিভিস্ট যে অভিযোগ করে আসছেন এই দৈত্যাকৃতি তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে – তা সত্যি। অর্থাৎ এদের হাতে এমন উপকরণ আছে যা দিয়ে এরা মার্কিন সরকারের হয়ে অন্য দেশের সরকারের তো বটেই, সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী কাজও করতে পারে।

করেও থাকে। সোশাল মিডিয়া যেভাবে বিশ্বব্যাপী জাল বিস্তার করেছে তা করতেই পারত না, যদি না যোগাযোগ বিপ্লব ঘটত। সেই বিপ্লবে সবচেয়ে লাভবান হওয়া কোম্পানিগুলোর অন্যতম হল স্টিভ জোবস স্থাপিত অ্যাপল। এ মাসের গোড়াতেই অ্যাপল একখানা মামলা মিটিয়ে নিতে ৯৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া প্রদেশের ওকলাহোমার ফেডেরাল কোর্টে চলা এই মামলায় মামলাকারীর অভিযোগ ছিল, আইফোন ও অন্যান্য অ্যাপল উৎপাদিত যন্ত্রপাতির ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘সিরি’, যন্ত্রের মালিকের অজান্তে তার কথাবার্তা রেকর্ড করে নিয়েছে। তারপর সেই কথাবার্তা বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বেচে দেওয়া হয়েছে। তেমন হলে যে মার্কিন সরকারের কাছে বা আপনি যে দেশের লোক সে দেশের সরকারের কাছেও বেচবে না তার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না। তেমন অভিযোগও ওঠে, কেবল অ্যাপল বা ফেসবুকের বিরুদ্ধে নয়। সুন্দর পিচাইয়ের গুগল এবং সত্য নাডেলার মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধেও নানারকম অভিযোগ আছে। পিচাইকে মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের সামনে বসে প্রাইভেসি, রাজনৈতিক পক্ষপাত, হিংসায় ধুয়ো দেওয়া ইত্যাদি অভিযোগ সম্পর্কে কৈফিয়তও দিতে হয়েছে।

এগুলো কোনোটাই আমেরিকাবিরোধী বা পুঁজিবাদবিরোধী বামপন্থীদের তৈরি ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব নয়। অভিযোগগুলো নিয়ে অন্তর্তদন্ত, লেখালিখি করে থাকে ফোর্বসের মত মার্কিন এবং ঘোর পুঁজিবাদী সংবাদমাধ্যমগুলোই। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি হলিউড তো এসব নিয়ে একগুচ্ছ ছায়াছবি বানিয়ে বসে আছে। এসব যদি কেবল গালগল্প হত তাহলে এডওয়ার্ড স্নোডেনকে নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গিয়ে আত্মগোপন করে থাকতে হত না।

যা-ই হোক, জুকেরবার্গের মিনিট পাঁচেকের ঘোষণার শুধু ওটুকু নিয়ে পড়ে থাকলে আমাদের চলবে না। এগোনো যাক।

ইলন মাস্ক যখন টুইটার (অধুনা এক্স) কিনে নিলেন, তখন প্রচুর লোককে ছাঁটাই করেন। তাঁদের একটা বড় অংশ ছিলেন তথ্য যাচাইকারী, অর্থাৎ যাঁরা ওই প্ল্যাটফর্মে ভুয়ো তথ্য পরিবেশন আটকানোর দায়িত্বে ছিলেন। এবার লক্ষ করুন, জুকেরবার্গও বলছেন তথ্য যাচাইকারীদের দরকার নেই। তারা বড্ড পক্ষপাতদুষ্ট। আমরা বরং এক্সের মত কমিউনিটি নোট চালু করব। অর্থাৎ আগে যদি ফেসবুকে আপনি পোস্ট করতেন যে বারাক ওবামা হলেন ওসামা বিন লাদেনের খুড়তুতো ভাই, তাহলে ফেসবুক হয়ত তা মুছে দিত। এখন থেকে মুছবে না। যদি অন্য ব্যবহারকারীরা কথাটা যে মিথ্যে তা উল্লেখ করেন, তাহলে পোস্টের তলায় একখানা নোট দেওয়া থাকবে যে অনেকে জানিয়েছেন এই তথ্য মিথ্যা। তেমন কিছু পোস্টের দৃষ্টান্তও দেওয়া থাকবে। বলা বাহুল্য, স্মার্টফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমাদের মনোযোগ যে তলানিতে এসে পৌঁছেছে তাতে অধিকাংশ লোক ওসব নোট-ফোট খুলে দেখতে যাবে না। ফলে ভুয়ো তথ্যের রমরমা হবে। ওরকম পোস্ট যদি ছবি সহকারে করা হয় তাহলে তো কথাই নেই। আমাদের দেশে অল্টনিউজ, বুমলাইভের কর্মীদের উদয়াস্ত পরিশ্রম সত্ত্বেও বারবার জওহরলাল নেহরু এক সুন্দরী মেমের সঙ্গে নাক ঘষছেন – এমন একখানা ছবি কিছুদিন পরপরই সোশাল মিডিয়ায় ঘোরে। অথচ বহুবার প্রমাণিত হয়েছে যে ওটা ফটোশপের কারসাজি। ছবিতে আসলে নেহরুর পাশে ছিলেন মহাত্মা গান্ধী, দুজনের মধ্যে হাসিঠাট্টা চলছিল।

অল্টনিউজের কথা যখন উঠলই তখন মনে করিয়ে দিই, ২০২১ সালে নাগরিক ডট নেটকে এক সাক্ষাৎকারে ওই সংস্থার কর্ণধার প্রতীক সিনহা বলেছিলেন, যে সমাজে তীব্র মেরুকরণ হয়ে গেছে সেখানে তথ্য যাচাই যথেষ্ট নয়। কথাটা সব দেশের সব সমাজের জন্যেই সত্যি। কারণ তেমন সমাজে আপনি যাদের অপছন্দ করেন তার সম্পর্কে বানিয়ে বলা খারাপ কথাও আপনি অন্ধের মত বিশ্বাস করবেন, পছন্দের লোকেদের সম্পর্কে বানিয়ে বলা ভাল কথাও একইভাবে বিশ্বাস করবেন। যাচাই করে দেখতে যাবেন না সত্যি বলা হয়েছে না মিথ্যা। একথা জুকেরবার্গও জানেন আর আজকের আমেরিকা যে প্রবল মেরুকরণ হয়ে যাওয়া এক দেশ – সেকথাও বিলক্ষণ বোঝেন। তা সত্ত্বেও তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার মানে এর পিছনে যে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এদেশে আরএসএস-বিজেপির নেতা, কর্মী, সমর্থকরা প্রতীক, মহম্মদ জুবের প্রমুখ তথ্য যাচাইকারীদের পক্ষপাতদুষ্ট বলেন। সোশাল মিডিয়ায় গালাগালি দিয়েই ক্ষান্ত থাকেন না, এফআইআর-ও করে দেন। তার জেরে জুবেরকে ইতিমধ্যেই একবার কারাবাস করতে হয়েছে, এই মুহূর্তেও তাঁর নামে মামলা চলছে আদালতে। লক্ষ করুন, জুকেরবার্গও অভিযোগ করছেন যে তথ্য যাচাইকারীরা পক্ষপাতদুষ্ট। কোন পক্ষ? সেই পক্ষকে কেন জুকেরবার্গের অপছন্দ? তা একেবারে শেষে এসে পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তিনি ট্রাম্পের পক্ষে, অর্থাৎ তথ্য যাচাইকারীরা ট্রাম্পের বিরুদ্ধ পক্ষের। গোটা বক্তৃতায় জুকেরবার্গ বাকস্বাধীনতার হয়ে ধর্মযুদ্ধে নামার ভান করেছেন। বাকস্বাধীনতা কথাটা শুনতে অতি চমৎকার। কিন্তু কার বাকস্বাধীনতা? এক্ষেত্রে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে – অভিবাসীবিদ্বেষী, কৃষ্ণাঙ্গবিদ্বেষী, মুসলমানবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী এবং রূপান্তরকামী বিদ্বেষী ট্রাম্প ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের বাকস্বাধীনতা।

কার বাকস্বাধীনতা – এই প্রশ্নটা করতে আমরা প্রায়শই ভুলে যাই। ইউরোপের নবজাগরণ, ফরাসি বিপ্লব, পাশ্চাত্যের উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় আমরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে প্রশ্নটা উঠলেও সটান বলে দিই ‘সকলের বাকস্বাধীনতা থাকা উচিত।’ সেন্সরশিপ ব্যাপারটা যে খুব খারাপ সেটাও আমরা বিনা প্রশ্নে মেনে নিই। কথাটার মধ্যে যে একটা মস্ত ফাঁক (বা ফাঁকি) আছে সেটা একুশ শতকে এসে মাস্ক, জুকেরবার্গরা দেখিয়ে দিলেন। বলা ভাল, দেখিয়ে ফেললেন। ওই ফাঁক দিয়েই তাঁরা ভুয়ো তথ্য ও ঘৃণাভাষণের হাতি গলিয়ে দিলেন। দেখুন জুকেরবার্গ কেমন অবলীলাক্রমে বলেছেন যে এসব পরিবর্তন করলে কিছু ক্ষতি হবেই। সত্যিই সোশাল মিডিয়ায় ড্রাগ, সন্ত্রাসবাদ, শিশু নির্যাতনের মত ভয়ঙ্কর জিনিস ছড়িয়ে আছে এবং নতুন ব্যবস্থায় সেগুলো বেড়ে যাবে। কিন্তু তাতে কী হয়েছে? সেন্সরশিপ তো কমবে। অর্থাৎ মানুষের স্বার্থে বাকস্বাধীনতা চাইছেন না, বাকস্বাধীনতার স্বার্থে মানুষকে বলি দিতে চাইছেন। আপনার স্মার্টফোন হাতে পাওয়া সন্তানের কোনো বিকৃতকাম লোকের পাল্লায় পড়ে যাওয়া আটকানোর চেয়ে বিকৃতকাম লোকটার বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা বেশি জরুরি – এই হল জুকেরবার্গের যুক্তি। একইভাবে কালো মানুষকে তার চামড়ার রং নিয়ে গালাগালি দেওয়ার বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা জরুরি। মহিলাদের প্রতি লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্য করা, অশ্লীল ইঙ্গিত করা, ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার বাকস্বাধীনতাও জরুরি। যে কোনো প্রান্তিক পরিচিতিসম্পন্ন ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীকে যথেচ্ছ গালাগালি দেওয়া, তাদের বিরুদ্ধে ভুয়ো তথ্য ছড়ানো, সোশাল মিডিয়ায় ঘৃণাভাষণের স্বাধীনতা রক্ষাও জুকেরবার্গের খুবই জরুরি মনে হয়েছে।

কেন মনে হল? জুকেরবার্গ আদতে তো ব্যবসায়ী। তাঁর লক্ষ্য তো মুনাফা। তাহলে এইরকম বাকস্বাধীনতায় কি মুনাফার সম্ভাবনা বাড়বে? অবশ্যই। কারণ দেশের রাষ্ট্রপতি, যিনি মূলত একজন ধনকুবের, তিনি আপনার হাতে। ফলে তাঁর রাজনীতিকে জায়গা করে দিলেই আপনার ব্যবসা যে ফুলে ফেঁপে উঠবে সে তো জানা কথাই। মাস্ক যখন টুইটার কিনে নিলেন তখন অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক বলেছিলেন যে এটা ভুল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। কারণ ওটা আসলে ক্ষতিতে চলা ব্যবসা। মাস্ক নিজেও ২০২২ সালের নভেম্বরে বলেছিলেন যে টুইটারের দৈনিক ৪ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। ক্ষতিকে লাভে পরিণত করার জন্যে তারপর তিনি নানারকম ব্যবস্থা নেন। ভেরিফিকেশন টিক দেওয়ার জন্যে টাকা নেওয়া, বিনামূল্যে যত শব্দ পোস্ট করা যায় তার চেয়ে মাসিক মূল্যে কিছু বেশি শব্দ পোস্ট করতে দেওয়া, পোস্ট সম্পাদনা করতে দেওয়া – ইত্যাদি ব্যবস্থা চালু হয়। কিন্তু এহ বাহ্য। এখন বোঝা যাচ্ছে, আসলে মাস্কের উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্পকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করা। তিনি টুইটারের মালিকানা হস্তান্তরের পরেই ট্রাম্পের উপর চাপানো আজীবন নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনেন। তারপর ভুয়ো তথ্য, ঘৃণাভাষণ আটকানোর ব্যবস্থাগুলোর সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দেন। দেশে নিজের পছন্দের রাষ্ট্রপতি বসাতে পারলে অনেক ব্যবসার একটা ব্যবসায় যা ক্ষতি হবে তা পুষিয়ে নেওয়া এমন কী ব্যাপার? জুকেরবার্গও মাস্কের পথের পথিক।

এবার জুকেরবার্গের বক্তব্যের শেষ অনুচ্ছেদে আসা যাক। তিনি জো বাইডেনের আমলের নিন্দা করে বলেছেন, এমনিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই বাকস্বাধীনতার সাংবিধানিক রক্ষাকবচ সবচেয়ে বেশি। কিন্তু গত চার বছরে তাঁদের উপর এবং অন্য মার্কিন কোম্পানিগুলোর উপর মার্কিন সরকার সেন্সরশিপ চাপিয়ে দিচ্ছিল। ফলে অন্য দেশের সরকারগুলোরও সাহস বেড়ে গেছে। অতঃপর জুকেরবার্গ নির্দিষ্ট করে কিছু দেশ ও মহাদেশের নাম করেছেন, যারা নাকি এতই সেন্সরশিপ চালায় যে সেখানে কোনোরকম উদ্ভাবনীমূলক কাজ করা যায় না। নামগুলো কৌতূহলোদ্দীপক। চীনে মেটার অ্যাপগুলো নিষিদ্ধ, তাঁর দোকান খুলতেই দেওয়া হয়নি, অতএব চীনকে জুকেরবার্গের অপছন্দের কারণ বোঝা যায়। সত্যি বলতে বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে চীনের রেকর্ড খুব ভাল – এমনটা ভারতের কিছু কমিউনিস্ট ছাড়া বিশেষ কেউ দাবি করে না। বোধহয় শি জিনপিংকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলবেন – বেশ করি বাকস্বাধীনতা দিই না। যা পারিস কর গে যা। ফলে চীনের কথা না হয় বাদ দেওয়া গেল। লাতিন আমেরিকাকে নিয়ে আপত্তি তো থাকবেই। ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা সহ একাধিক দেশে এখন বামপন্থী দলগুলোর সরকার। এদের মার্কিন পুঁজিবাদীদের কোনোদিনই পছন্দ হয় না, হওয়ার কথাও নয়। সুতরাং তাদের প্রতি জুকেরবার্গের অসন্তোষও স্বাভাবিক। মজার ব্যাপার হল, ইউরোপের নাম করা। ইউরোপের প্রায় সব দেশের সরকারই তো পুঁজিবাদে ঘোর বিশ্বাসী। ফ্রান্সে, স্পেনে ইদানীং বামপন্থীদের প্রভাব যেমন খানিক বেড়েছে তেমনই নেদারল্যান্ডস, ইতালির মত দেশে ঘোর দক্ষিণপন্থী সরকার এসেছে। জার্মানিও ক্রমশ অতি দক্ষিণপন্থীদের দিকে ঝুঁকছে। তাহলে ইউরোপের উপর গোঁসা কেন?

আসলে ইউরোপের দেশগুলো ইন্টারনেট, প্রাইভেসি ইত্যাদি ব্যাপারে ভারতের মত কাছাখোলা নয়। এসব ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আইন আছে। সেইসব আইনভঙ্গের অভিযোগে সাম্প্রতিক অতীতে সিলিকন ভ্যালির টেক দৈত্যতের ফাঁপরে পড়তে হয়েছে। ২০১৮ সালে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পরে জুকেরবার্গকে সশরীরে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্যদের প্রশ্নের উত্তর দিতে যেতে হয়েছিল। ইউরোপের সরকারগুলোর উপরে ট্রাম্পের ডান হাত মাস্কও রুষ্ট (অনেকে বলছে ট্রাম্পই মাস্কের ডান হাত)। গত ৬ জানুয়ারি তিনি নিজের এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করেছেন ‘আমেরিকার উচিত ব্রিটেনের মানুষকে তাদের অত্যাচারী সরকারের হাত থেকে মুক্ত করা’। কারণ তাঁর মতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টার্মার মুসলমান অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর নন। আবার অতি দক্ষিণপন্থী ব্রিটিশ নেতা নাইজেল ফারাজকেও মাস্কের পছন্দ নয়। অন্য দেশে কার ক্ষমতায় থাকা উচিত আর কার উচিত নয় – তা নিয়ে এতকাল মন্তব্য করার একচেটিয়া অধিকার ছিল মার্কিন আর ইউরোপিয় দেশের রাষ্ট্রপতিদের। মন্তব্যগুলো করা হত লাতিন আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে। ২০২৫ সালে এসে দেখা যাচ্ছে মন্তব্য করছে টেক দৈত্যরা; এমনকি ইউরোপের যেসব দেশ নিজেদের গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতার পরাকাষ্ঠা বলে মনে করে তাদের সম্পর্কেও। তাহলে বোঝা যাচ্ছে গত দুশো-আড়াইশো বছর ধরে অর্জিত গণতান্ত্রিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কেমন ইউ টার্ন নিয়ে ফরাসি বিপ্লবের আগের যুগে ফিরে যাচ্ছে? বোঝা যাচ্ছে কেন সোশাল মিডিয়াকে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব বলছি?

জুকেরবার্গ যা বলেছেন শুধু তা-ই যে তাৎপর্যপূর্ণ তা কিন্তু নয়। যা বলেননি তা খেয়াল করলেও গণতন্ত্রবিরোধী বা প্রতিবিপ্লবী প্রবণতাটা ধরা যাবে। লক্ষ করুন, যেসব দেশের সরকার সেন্সরশিপ চাপিয়ে দিচ্ছে বলে জুকেরবার্গ অভিযোগ করেছেন তার মধ্যে ভারত নেই, রাশিয়া নেই। কেউ বলতেই পারেন, হাতে ফর্দ নিয়ে বসে দুনিয়ায় যতগুলো দেশে অপছন্দের সরকার আছে তাদের নাম করবে নাকি? নিশ্চয়ই তা প্রত্যাশিত নয়। কিন্তু বাজার হিসাবে ভারত আর রাশিয়া বিরাট। রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিন কীরকম দমনমূলক শাসন চালান তা জানতে কারোর বাকি নেই। বিরোধিতা করলে কী অবস্থা হয় তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ একদা বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনি, যিনি গতবছর কারাগারে মারা গেছেন। কিন্তু আজও পুতিনের সরকার সন্ত্রাসবাদীদের তালিকা থেকে তাঁর নাম সরাতে রাজি নয়। যদি একটু হাসিঠাট্টার মেজাজে আরও বিস্তারিত জানতে চান পুতিনের রাশিয়া সম্পর্কে, তাহলে বিদূষক জন অলিভারের শোয়ের এই পর্বটা দেখে নিতে পারেন।

উপরন্তু ২০২২ সালে রাশিয়ায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টুইটার নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ জুকেরবার্গ চীনের বিরুদ্ধে সরব হলেও রাশিয়া সম্পর্কে নীরব। আর ভারত? ২০২৩ পর্যন্ত টানা ছয় বছর আমাদের দেশ সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট শাটডাউন করা দেশের শিরোপা অর্জন করেছে। ইন্টারনেট না থাকলে মেটার কোনো অ্যাপ চলাই সম্ভব নয়। অথচ জুকেরবার্গের কিন্তু ভারত সরকারের সেন্সরশিপ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই।

এই মনোভাবের কারণ বোঝা কি সত্যিই শক্ত? পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুই সোশাল মিডিয়া মালিক জুকেরবার্গ আর মাস্ক হলেন ট্রাম্পের বন্ধু। আবার পুতিন আর আমাদের নরেন্দ্র মোদীর বন্ধু হলেন ট্রাম্প। মোদী আমেরিকায় গিয়ে অনাবাসী ভারতীয় ভোটারদের কাছে ট্রাম্পের হয়ে প্রায় নির্বাচনী প্রচার করে এসেছিলেন। স্লোগান চালু হয়েছিল ‘অব কি বার, ট্রাম্প সরকার’। ট্রাম্পও ভারতে এসে এলাহি অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন মোদীর নিজের শহর আমেদাবাদে। মোদীর নামাঙ্কিত ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রথম অনুষ্ঠান ছিল ট্রাম্পের অভ্যর্থনা, কোনো ক্রিকেট ম্যাচ নয়। তখন করোনা অতিমারী চলছে। দেশসুদ্ধ লোককে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখতে বলে কেবল ট্রাম্পের জন্যে লক্ষ লক্ষ লোককে সেদিন জড়ো করা হয়েছিল ওই স্টেডিয়ামে। তাছাড়া নির্বাচন এসে পড়লেই বিজেপি ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিতে কী বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে তাও তো গোপন নেই।

পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা তো আরও গভীর। ট্রাম্প প্রথমবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার সময় থেকেই অভিযোগ উঠেছে মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়া হস্তক্ষেপ করে ট্রাম্পকে সাহায্য করতে। সেই ঠান্ডা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কোনো মার্কিন রাজনীতিবিদ রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে ট্রাম্পের মত উদগ্রীব হননি। পুতিনও ট্রাম্পের প্রশংসা করে থাকেন। ট্রাম্প এবারে ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই পুতিনের ইউক্রেনের জমি দখলকে সমর্থন করে চলেছেন। সম্প্রতি বাইডেন সরকারের অনুসৃত বিদেশনীতির একেবারে উল্টো পথে হেঁটে বলেছেন ইউক্রেনের ন্যাটোয় যোগদানে রাশিয়ার আপত্তি যুক্তিযুক্ত

যা নিয়ে বাইডেন আর ট্রাম্পের মধ্যে বিশেষ ফারাক নেই তা হল ইজরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে যে গণহত্যা চালাচ্ছে তার প্রতি সমর্থন। সেই গণহত্যাকে কীভাবে মদত দেওয়া হয়েছে সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে, তা আমরা দেখেছি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলে হামাসের অতর্কিতে হানাকে অজুহাত হিসাবে খাড়া করে ইজরায়েল প্যালেস্তাইনে যে গণহত্যা শুরু করে তার প্রতি সমর্থন আদায় করতে ছড়িয়ে দিয়েছিল এই ভুয়ো খবর, যে হামাস শিশুদের মাথা কেটে নিয়েছে। এত জোরদার ছিল সেই প্রচার যে বাইডেন সাংবাদিক সম্মেলনে ওই দৃশ্য উল্লেখ করে বসেন। পরে হোয়াইট হাউসকে স্বীকার করতে হয় যে ভুল হয়েছিল। ওরকম কিছু আদৌ ঘটেনি।

জুকেরবার্গ যে বাকস্বাধীনতার ধ্বজা ওড়াচ্ছেন সেটা আসলে এরকম যাচ্ছেতাই মিথ্যা ছড়ানোর, ঘৃণা ছড়ানোর স্বাধীনতা। ট্রাম্পের আমলে যা হবে তা হল ট্রাম্প কখনোই বলবেন না, আমার ভুল হয়েছিল। ওরকম কিছু ঘটেনি। তিনি মিথ্যে কথা বলার রাজা, ঘৃণাভাষণের সম্রাট। প্রথমবার রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন একবার নিউইয়র্ক টাইমস তাদের প্রথম পাতা ভরে শুধু ট্রাম্পের মুখনিঃসৃত মিথ্যার তালিকা ছেপেছিল। সেই ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরেছেন। তাঁকে ফিরে আসতে সক্রিয় সাহায্য করেছে সোশাল মিডিয়া। অতঃপর তাঁর মিথ্যা, তাঁর ঘৃণা ছড়িয়ে দিতেও বিপুল বিক্রমে সাহায্য করবে তারাই। দুনিয়া জুড়ে যাবতীয় রাষ্ট্রীয় অন্যায়ে মদত দিয়ে আরও ফুলে ফেঁপে উঠবেন মাস্ক আর জুকেরবার্গ। যতই অভূতপূর্ব গরমের পর দাবানলে পুড়ে খাক হয়ে যাক লস এঞ্জেলস, সমুদ্র তীরবর্তী ম্যালিবু, হলিউডের অভিজাত অঞ্চল; সোশাল মিডিয়ায় মানুষকে বোঝানো হবে জলবায়ু পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। ও নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। কোনো দেশে বোঝানো হবে থালা বাসন বাজালেই অতিমারীর ভাইরাস পালাবে, মুসলমানরা ছয় বছর বয়স হলেই সন্ত্রাসবাদী হয়ে যায় – এইসব। আমার আপনার হাতের মগজ ধোলাই যন্ত্র আগামী দিনে আরও বেশি বেশি করে ভরে যাবে অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভুয়ো তথ্যে। সত্যের চেয়ে অর্ধসত্য বেশি মারাত্মক। সেই অর্ধসত্য এত বাড়িয়ে দেওয়া হবে বাকস্বাধীনতার নাম করে যে আমরা আর সত্য চিনতে পারব না। এদেশের সুপ্রাচীন জ্ঞানীদের কথা মানলে বলতে হয়, সত্যকে দেখতে পাব না মানে শিবকে দেখতে পাব না। শিবকে দেখতে পাব না মানে সুন্দরকে দেখতে পাব না। ফলে অবাধে কয়েকটা বড় বড় রাষ্ট্র দুনিয়া জুড়ে গণহত্যা চালাবে। একটার জায়গায় হয়ত দশটা হলোকস্ট হবে। পুতিন ক্রিমিয়া আর ইউক্রেনে হানা দিয়েছেন, নেতানিয়াহু প্যালেস্তাইনকে গণকবরে পরিণত করেছেন, ট্রাম্প হয়ত মেক্সিকো আর কানাডায় হানা দেবেন। ফলে চীন তাইওয়ানে হানা দিলেই বা কার কী বলার থাকতে পারে? কে বলে ইতিহাসের চাকা উল্টোদিকে ঘোরানো যায় না? দিব্যি তো ঔপনিবেশিক আমলের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছেন বড় বড় গণতন্ত্রের শাসকরা। কানাডাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম প্রদেশে পরিণত করব, গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্কের থেকে ছিনিয়ে নেব বলার পরেই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট স্বাধীন দেশ ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে ধরে দিতে পারলে ২৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার দেবে বলে ঘোষণা করেছে।

সোশাল মিডিয়া বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছিল। আমরা সেই ফাঁদে পড়ে গেছি। আমরা টের পাইনি কখন আমাদের যুক্তিবোধ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, প্রতিবাদ করার ইচ্ছা, প্রতিবাদ সংগঠিত করার ক্ষমতা – সব সেঁধিয়ে গেছে সোশাল মিডিয়ায়। ২০১০ সালে কায়রোর তাহরীর স্কোয়্যার থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে কলকাতার ধর্মতলা পর্যন্ত যত আন্দোলন সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়েছে, কোনোটার আহ্বান মাঠ ঘাট বন পেরিয়ে যায়নি। দুস্তর বাধা, প্রস্তর ঠেলে বন্যার মত পেরিয়ে যায়নি। যুগসঞ্চিত সুপ্তি সাড়া দেয়নি, হিমগিরি সূর্যের ইশারা শুনতে পায়নি। আমরা সোশাল মিডিয়ার বালুচরেই আশার তরণি বেঁধে ফেলেছি। এই লেখাও সোশাল মিডিয়াতেই শেয়ার করতে হবে। জুকেরবার্গ, মাস্কের সাহায্য ছাড়া আমরা বার্তা আদানপ্রদান করতে পারব না। বড়জোর ফেডিভার্স ব্যবহার করতে পারি বা ব্লুস্কাই-এর মত অন্য কোনো সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে যেতে পারি। কারণ সোশাল মিডিয়া আমাদের আসলে কাছাকাছি আনেনি। তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে, তারও দূরে সরিয়ে দিয়েছে। হাতের উপর হাত রাখার মন্ত্র আমরা ভুলে গেছি। আসলে আমরা হীরক রাজার দেশে ছবির সেই কৃষক, শ্রমিকদের মত হয়ে গেছি যারা বুঝতেও পারে না তারা অন্যদের দ্বারা চালিত। মগজ ধোলাই কথাটার যথার্থ ইংরিজি এতদিনে খুঁজে পেয়েছে অক্সফোর্ড ডিকশনারি – ব্রেন রট। ব্রেন ওয়াশিং নয়।

আরো পড়ুন হিন্দিভাষী ইউটিউবার যা করলেন, বাঙালিরা যা করলেন না

অস্বীকার করি না যে এই পচন আটকানোর উপায় কী, সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। কিন্তু এখনো যাঁরা ভাবছেন পেশাদার বা অপেশাদার সোশাল মিডিয়া পরিচালকদের দিয়ে রাজনৈতিক যুদ্ধ জয় করবেন বা অধিকার আদায় করবেন, তাঁদের দেখে হাসার শক্তিটুকু আছে। কারণ জুকেরবার্গ, মাস্ক, ট্রাম্প, পুতিন, নেতানিয়াহু, মোদীদের মহাজোট প্রতিবাদকে সোশাল মিডিয়ায় আবদ্ধ করে ফেলার লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে। পরবর্তী লক্ষ্য সেখানেও প্রতিবাদী স্বর স্তব্ধ করে দেওয়া। এই জোট দেখেছে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিকল্প সংবাদমাধ্যম, ইউটিউবাররা মোদীর চারশো পার আটকাতে কী ভূমিকা নিয়েছে। তারা দেখেছে ইজরায়েলি গণহত্যার বিরুদ্ধে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কীভাবে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বাইরে গিয়ে মেহদি হাসানের মত সাংবাদিকরা ইউটিউব চ্যানেল খুলে ফেলে সাংবাদিকতা করছেন।

ভারতে এসব আটকাতে মোদী সরকার নতুন আইনের খসড়া তৈরি করে ফেলেছে, সেই খসড়া প্রকাশ করতে অস্বীকারও করেছে। কোনো সন্দেহ নেই, অদূর ভবিষ্যতে ট্রাম্পও একই পথে এগোবেন। বস্তুত তিনি হুমকি দিয়েই রেখেছেন। নতুন আইন না করলেও অবশ্য ক্ষতি নেই। এঁদের বন্ধু জুকেরবার্গ, মাস্ক, পিচাইরা যে নিজেদের প্ল্যাটফর্মে বিকল্প সংবাদমাধ্যম থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দল – সকলেরই গলা টিপে ধরবেন তা নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। এমনিতেই চুপিসারে অনেক প্রোফাইলের রীচ কমিয়ে দেওয়া হয়, কোনো কোনো পোস্ট আপনা আপনি উধাও হয়ে যায়। দলবদ্ধভাবে রিপোর্ট করে দক্ষিণপন্থীদের অপছন্দের পোস্ট মুছিয়ে দেওয়া তো এখনই জলভাত। এসব এবার বাড়বে বৈ কমবে না। রাস্তাই যে একমাত্র রাস্তা সেকথা যত বেশিদিন রাজনৈতিক বিরোধীরা ভুলে থাকবে, ততদিন গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই প্রতিবিপ্লব চলছে চলবে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত