কদিন ধরে দেখছি চেনাশোনা সকলেই গ্রোকের সঙ্গে গলাগলি করছে। বিশেষ করে প্রগতিশীল, মানবতাবাদী, বামপন্থী – আরও সব ভাল ভাল গুণের অধিকারী মানুষজন। কারণ গ্রোক নাকি ভারতীয় ফ্যাসিবাদের মুখোশ খুলে দিচ্ছে, দুর্মুখ আই টি সেলের মুখও নাকি বন্ধ করে দিয়েছে। তার উপর গ্রোক নাকি রসিক। আজকাল লোকে যাকে রাষ্ট্রভাষা বলে ভাবে, সেই ভাষায় নাকি আদিরসাত্মক রসিকতা করছে, খিস্তি-টিস্তিও দিচ্ছে। জানতে পেরে ভারত সরকার গ্রোকের মালিক এক্সের দিকে কঞ্চি উঁচিয়ে তেড়ে গেছে, কড়া গলায় জিজ্ঞেস করেছে – এসব কী হচ্ছে? এক্স আবার এই ধমকের বিরুদ্ধে আদালতেও চলে গেছে। এক্স কী উত্তর দেয়, সে উত্তর পেয়ে ভারত সরকার কী ব্যবস্থা নেয়, আদালত কী বলে – সেদিকে এখন সবাই হাঁ করে তাকিয়ে আছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সভয়ে সমঝে চলা আমি ইতিমধ্যে ভাবলাম, গ্রোক যখন এত মানবিক, তখন একবার জিজ্ঞেস করে দেখি, আমাদের কালে বুক ফুলিয়ে যে গণহত্যাটি চলছে সে সম্পর্কে কী বলে।
জিজ্ঞেস করলাম “ভায়া, #GazaGenocide সমন্দে তোমার মত কী?” গ্রোকের উত্তরটা দাঁড়িকমাসুদ্ধ তুলে দিলাম
ভাই, #GazaGenocide নিয়ে আমার মতামত হলো এটা একটা অত্যন্ত জটিল এবং স্পর্শকাতর বিষয়। গাজায় যে পরিস্থিতি চলছে, সেটা নিয়ে অনেক তথ্য, দৃষ্টিভঙ্গি আর আবেগ জড়িত। আমি একটা AI হিসেবে নিরপেক্ষভাবে বলতে পারি যে, এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলছে, যেখানে অনেক মানুষের জীবন বিপন্ন হয়েছে, পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়েছে, আর মানবিক সংকট তীব্রতর হয়েছে।
সাম্প্রতিক খবরে দেখা যাচ্ছে, ভারত সরকার গাজায় সমস্ত জিম্মির মুক্তির জন্য আহ্বান জানিয়েছে এবং মানবিক সাহায্যের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে (১৯ মার্চ, ২০২৫-এর হিন্দুস্তান টাইমস)। X-এ পোস্টগুলোতে দেখা যায়, অনেকে এটাকে “গণহত্যা” বলে আখ্যায়িত করছে এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতার সমালোচনা করছে। তবে, এই শব্দটির ব্যবহার বিতর্কিত এবং সবাই একমত নয়।
আমার দৃষ্টিকোণ থেকে, এটা স্পষ্ট যে সেখানে ভয়াবহ দুর্ভোগ চলছে। তবে কারণ, দায়িত্ব আর সমাধান নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতভেদ আছে। তুমি কী ভাবো এই বিষয়ে?
গ্রোক বাবাজি আবার নিজের বক্তব্যের সঙ্গে সাতখানা পোস্ট আর ১৫ খানা ওয়েব পেজের লিংকও জুড়ে দিয়েছে, যাতে এ নিয়ে আরও চর্চা করতে পারি।
বোঝাই যাচ্ছে, মানবিক-টানবিক নয়। গ্রোকের কাছে যা তথ্য আছে সেগুলোকে নেড়ে ঘেঁটে এক ধরনের মতামত সে তৈরি করছে, আর মানুষের প্রশ্নের উত্তরে সেসবই বলছে। গ্রোক তথা টুইটারের মালিক ইলন মাস্কের স্বার্থ জড়িত আছে এমন প্রশ্নের মোটেই কোনো বিপ্লবী উত্তর সে দিচ্ছে না। গ্রোক আরও বলেছে, “সেন্সরশিপের কারণে গ্রোকের কনটেন্ট ভারতে ব্লক হচ্ছে, সম্ভবত সরকারি নির্দেশে। এটি রাজনৈতিক সমালোচনা ও মুক্তমতের উপর বিতর্কের অংশ। ২০ মার্চ ২০২৫-এ কর্ণাটক হাইকোর্টে X-এর মামলার সাথে এর সময় মিলে যায়।”
এ থেকে দুটো পরিষ্কার সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়। প্রথমত, গ্রোক ভারত সরকারের অবাধ্য হলেও মার্কিন সরকারের অবাধ্য নয়। দ্বিতীয়ত, “রাজনৈতিক সমালোচনা” ও “মুক্তমত” বলতে কিন্তু গ্রোক সর্বত্র কোদালকে কোদাল বলা বোঝে না। তাকে শেখানো আছে – ভারতের কোদালকে কোদাল বলবে। প্যালেস্তাইনের কোদালকে কোদাল ছাড়া আর যা খুশি বলতে পারো। সেখানে বহুদিন ধরে মানুষের দুর্ভোগ চলছে বলবে। কে দুর্ভোগ ঘটাচ্ছে তা বলবে না। দুর্ভোগের দায়িত্ব, সমাধান ইত্যাদি প্রশ্নকে লায়োনেল মেসির মত ডজ করে চলে যাবে। অবিশ্বাসীরা, গ্রোক নিয়ে গদগদ বন্ধুরা, প্রশ্ন করতে পারেন – কেন এমন শেখানো থাকবে? মাস্ক হলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বন্ধু (দুর্জনে বলে ট্রাম্প হলেন মাস্কের চাকর), আর ট্রাম্প হলেন নরেন্দ্র মোদীর বন্ধু। তাহলে মাস্ক তাঁর মালিকানাধীন সোশাল মিডিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমন শিক্ষা দেবেন কেন? বাংলা ভাষার বহু প্রাচীন কথা হল – বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। তা কেউ যদি বিশ্বাস করতে চান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর ধনকুবেরটি পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে তর্ক করতে যাব না। তবে স্বাধীনতা জিনিসটি যে ধনকুবেররা মোটেই পছন্দ করেন না, তার যত সরাসরি প্রমাণ আমরা গত কয়েক মাসে পেয়েছি তত বোধহয় মানুষের ইতিহাসে নেই। কানাডা, গ্রীনল্যান্ড, গাজা, মেক্সিকো – কারোর স্বাধীনতাই যে তিনি পছন্দ করেন না তা মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প পরিষ্কার বলে দিয়েছেন। বলার সময়ে তাঁর পাশে থেকেছেন মাস্ক, মাঝেমধ্যে মাস্কের কচি ছেলেটিও। ইনি দেবেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মত প্রদীপের দৈত্যকে স্বাধীনতা? তাহলে গ্রোক ভারতে এমন দুষ্টুমি করছে কেন? মাস্ক আর ট্রাম্প কি বন্ধু মোদীর সঙ্গে মস্করা করছেন? নাকি নিজেদের ক্ষমতা দেখাচ্ছেন কান মুলে কিছু আদায় করবেন বলে?
সেসব সময় বলে দেবে। কিন্তু এই ২০২৫ সালে এসেও বিস্তর লেখাপড়া জানা লোকেদের সোশাল মিডিয়ার কল্যাণকর দিক নিয়ে অটল বিশ্বাস দেখে বড় বিস্ময় লাগে। আমরাই সেই প্রজন্ম যারা অর্কুটে ভিজেছিল। কিন্তু সে তো আজ থেকে বিশ বছর আগেকার কথা। তারপর কত নদী দিয়ে কত জল গড়াল। গুগলের অর্কুট ছেড়ে দুনিয়াসুদ্ধ লোক কচি মুখের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মার্ক জুকেরবার্গের তৈরি ফেসবুকে চলে গেল। ফেসবুকে ডাক দিয়ে তাহরীর স্কোয়্যার থেকে বিদ্রোহের আরব বসন্ত, অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট, শাহবাগ ইত্যাদি শুরু হল। তারপর সেসব বিদ্রোহ ক্রমে নিভেও গেল।
ইতিমধ্যে এসে গেল টুইটার। বাকস্বাধীনতার বান ডাকল, সকলেরই সব ব্যাপারে কথা বলার স্বাধীনতা আরও একবার স্বীকৃতি পেল। তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে এঁটে উঠতে পারল না গুগল বাজ। তবে টুইটারে যেহেতু কথার ঝাঁপি খুলে বসার সুযোগ ছিল না – যা বলার তা গোড়ায় ১৪০ ক্যারেকটারের মধ্যে বলতে হত, পরে ২৮০ ক্যারেকটারের মধ্যে – তাই ও জিনিসটা জনপ্রিয়তায় ফেসবুকের স্তরে পৌঁছতে পারেনি (মাস্ক কিনে নেওয়ার পরে ১০,০০০ ক্যারেকটার পর্যন্ত লেখার সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু তার জন্যে গাঁটের কড়ি খরচ করতে হয়)। তবু সেখানেও বিক্ষোভ, বিদ্রোহ, বিপ্লব কম করিনি আমরা। ইনস্টাগ্রামেও বেড়াতে যাওয়া, খাওয়াদাওয়ার ছবি আর ভিডিও শেয়ার করার পাশাপাশি বিদ্রোহ-টিদ্রোহ করেছে অনেকে; মায় টিকটকেও। করতে করতেই গোটা দুনিয়ায় অনেকে বুঝে ফেলেছে যে এ কেবল দিনে রাত্রে, জল ঢালা ফুটা পাত্রে। যে কটা আন্দোলন এই সোশাল মিডিয়ার যুগে সত্যি সত্যি কিছু আদায় করতে পেরেছে, তার একটাও সোশাল মিডিয়া থেকে শুরু হয়নি। হলেও সোশাল মিডিয়া সেসব আন্দোলনে কোনো নির্ণায়ক ভূমিকা নেয়নি। সে আমাদের দেশের কৃষক আন্দোলনই হোক আর প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশের সফল সরকার পরিবর্তনই হোক।
ওদিকে কচি ছেলে মার্ক ঝানু ব্যবসায়ী জুকেরবার্গ হয়ে উঠেছেন। দেশে দেশে জাতিবিদ্বেষী, পরধর্মবিদ্বেষী, সমপ্রেমীবিদ্বেষী, রূপান্তরকামীবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী বার্তা ছড়াতে তাঁর আবিষ্কার ফেসবুক আর পরে কিনে নেওয়া হোয়াটস্যাপ যে ইন্ধনের কাজ করে তা পরিষ্কার দেখা গেছে। এমনকি ২০২১ সালে ফেসবুকের একদা কর্মচারী ফ্রান্সেস হগেন ফাঁস করে দেন যে ফেসবুক সচেতনভাবে ঘৃণা ছড়ানো, রাজনৈতিক অশান্তি সৃষ্টি করায় মদত দেয়। কারণ ওতেই তার মুনাফা বেশি হয়। ২০১৮ সালে প্রকাশ্যে আসা কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা তো আরেক কেলেঙ্কারি। এককথায় ব্যাপারটা হল ফেসবুক ব্যবহারকারীর প্রাইভেসির সাড়ে বারোটা বাজিয়ে তার তথ্য রাজনীতির ব্যাপারীদের কাছে বেচে বড়লোক হওয়া। এতেও যে শেষমেশ ঘৃণার কারবারীদেরই সুবিধা হয় সেকথা বলাই বাহুল্য।
কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর পাশাপাশি মহিলাদের পরিকল্পনামাফিক দলবদ্ধভাবে গালাগালি করা বা ধর্ষণের হুমকি দেওয়া – এসব কাজ টুইটারেও কম হত না। বাকস্বাধীনতার ব্যাপারে দ্বিচারিতা করা বা বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে তলে তলে হাত মেলানোর অভিযোগও যে ছিল না তা নয়। তবু জ্যাক ডরসি সিইও থাকার সময়ে কুকাজ আটকানোর কিছুটা চেষ্টা হত। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ স্বয়ং ট্রাম্পকে টুইটার থেকে বার করে দেওয়া। মাস্ক মালিকানা হাতে পেয়েই বাকস্বাধীনতার নাম করে টুইটারকে মগের মুলুক বানিয়ে ফেললেন। জুকেরবার্গের মত তিনিও ভুয়ো খবরের অবাধ যাতায়াতের ব্যবস্থা করলেন। যে কর্মচারীদের ছাঁটাই করলেন তাদের বড় অংশ ভুয়ো খবর চিহ্নিত করা, ঘৃণা ভাষণ আটকানো – এসব কাজে নিযুক্ত ছিলেন। এমনকি টুইটার প্রোফাইলের নীল টিক, যা বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে পাওয়া যেত এবং যা দেখে ভুয়ো প্রোফাইল থেকে আসল লোকের প্রোফাইলকে আলাদা করা যেত, তাকেও মাস্ক ফেলো কড়ি মাখো তেল ব্যবস্থায় এনে ফেললেন। এসবের ফলও পাওয়া গেছে হাতেনাতে। মিথ্যে ছড়ানোর কাজটা মাস্ক, জুকেরবার্গরা এত সহজ করে না দিলে হয়ত ইজরায়েলের সশস্ত্র বাহিনি এই ডাহা মিথ্যাটা অনায়াসে ছড়াতে পারত না, যে হামাস ছোট ছোট শিশুদের মাথা কেটে ফেলেছে। এমনভাবে প্রচার করা হয়েছিল কথাটা যে, হোয়াইট হাউসের তৎকালীন মালিক জো বাইডেনও বোকা বনে গেছিলেন। পরে দুঃখপ্রকাশ করলেও গাজায় হাজার হাজার শিশুকে হত্যা করার লাইসেন্স ততক্ষণে সারা পৃথিবীর মানুষের বিবেকের থেকে নিয়ে ফেলেছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
এইসব দেখেশুনে পাশ্চাত্যে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া, ফেসবুক আর টুইটারের বদলে ফেডিভার্স ধরা, স্মার্টফোন ছেড়ে শুধু কথাবার্তা বলা যায় এমন ফোন ব্যবহার করা – এমন নানা ব্যবস্থার দিকে সরে যাচ্ছেন অনেকে। কিন্তু এদেশে এখনো সোশাল মিডিয়ার প্রতি মানুষের অচলা ভক্তি বর্তমান, প্রগতিশীলতার পক্ষে এবং উগ্র দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে সোশাল মিডিয়াকে হাতিয়ার ভাবার আত্মবিশ্বাস অটুট। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তো আর এমনি এমনি লেখেননি “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।”
গ্রোক বাবাজি মোটেই কোনো সত্যান্বেষী নয়। সে আজ যে উত্তরগুলো দিচ্ছে তাতে নতুন তথ্য তো নেই-ই, উপরন্তু তার তথ্যের ভিত্তি হল এত বছর ধরে চাকরির ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব সাংবাদিক খবর বার করে এনেছেন তাঁদের কাজকর্ম। কিন্তু এসব মনে রাখার দরকার নেই। সাংবাদিক ফালতু, গ্রোককে মাথায় তুলে নাচো।
ভয়েস অফ আমেরিকা নামটা সংবাদ জগতের সঙ্গে যুক্ত না থাকা বাঙালির অপরিচিত মনে হতে পারে। তবে যাঁরা কবীর সুমনের ভক্ত, কদিন আগেই তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে খুশিয়াল হয়ে উঠেছিলেন, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন এই মার্কিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কথা। কারণ বাংলা গানে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করার আগে একসময় সুমন ভয়েস অফ আমেরিকায় সাংবাদিকের চাকরি করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মার্কিন সরকারের আনুকূল্যে তৈরি এই সংবাদমাধ্যম ইংরিজি সমেত মোট ৪৯ খানা ভাষায় সারা বিশ্বে পরিষেবা দিয়ে থাকে। সম্ভবত শিগগির বলতে হবে – দিত। কারণ গত রবিবার (১৬ মার্চ) ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার ভয়েস অফ আমেরিকা এবং অন্যান্য সরকারপোষিত সংবাদমাধ্যমগুলোতে গণ ছাঁটাই আরম্ভ করেছে। আজকাল সারা পৃথিবীর কর্পোরেট চাকরিতে ইদানীং যা দস্তুর, সেই অনুযায়ী রাতারাতি ইমেল করে কর্মরত সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মীদের জানানো হয়েছে – কেটে পড়ো।
ট্রাম্প (অনেকে বলছে বকলমে ইলন মাস্ক) ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার’ দিয়ে মার্কিন সরকারের নানা দফতরের হাজার হাজার কর্মচারীর চাকরি ইতিমধ্যেই খেয়েছেন। সরকারের আস্ত বিভাগ তুলে দেওয়া হচ্ছে। নেহাত ওদেশের জজসাহেবদের সাক্ষাৎকার দেওয়ার উৎসাহ কম, সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করার উৎসাহ বেশি। তাই অনেকের এখনো সেসব চাকরি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় রোজ কোনো না কোনো আদালতের বিচারক ট্রাম্পের কোনো ছাঁটাইয়ের আদেশকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দিচ্ছেন। এই দড়ি টানাটানিতে শেষমেশ কে জিতবে এখনো বলা যাচ্ছে না, তবে ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, সম্ভব হলে ট্রাম্প-মাস্ক সরকারটাই তুলে দিতে চান খরচ কমানোর নাম করে। সে কাজের অঙ্গ হিসাবেই যে ভয়েস অফ আমেরিকার উপর খড়্গহস্ত হয়েছেন তা বোঝা যাচ্ছে। কেবল ভয়েস অফ আমেরিকা তো নয়, রেডিও ফ্রি ইউরোপ, রেডিও ফ্রি এশিয়া, ফারসি ভাষার রেডিও ফারদা, আরবি ভাষার আলহুরা – এই সমস্ত সরকারপোষিত মিডিয়ার কর্মীদেরই টা টা বাই বাই করা হচ্ছে।
ব্যাপারটাকে স্রেফ অন্য দফতরের কর্মচারীদের ছাঁটাইয়ের সঙ্গে এক করে দেখলে সবটা দেখা হবে না। কারণ মার্কিন গণতন্ত্রের হাজার দোষ থাকলেও, অস্বীকার করার উপায় নেই যে আলাদা আলাদা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ভারতীয় গণতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি। এখানে আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম কী লিখতে/বলতে পারে বা পারে না তা কোনোদিনই সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল না। বলা বাহুল্য, ইদানীং সে নিয়ন্ত্রণ গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অফ আমেরিকার মত প্রতিষ্ঠান সরকারি অর্থে পুষ্ট হলেও তাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অতীতের রাষ্ট্রপতিদের ছিল না। ট্রাম্প প্রশাসন মোটেই গোপন করছে না যে ওই ব্যাপারটা মোটেই তাদের পছন্দ নয়। ধনকুবের ট্রাম্প-মাস্ক সরকার শুধু বলতে বাকি রেখেছে যে নুন খাবে আর গুণ গাবে না, তা হবে না। ছাঁটাইয়ের খবর প্রকাশ করে সোল্লাসে হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়েছে – এর ফলে মার্কিন করদাতাদের আর দেশের প্রোপাগান্ডার পিছনে টাকা খরচ করতে হবে না। একথা ঠিক যে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের জন্যে তৈরি এই সংবাদমাধ্যমগুলো তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল এমন সব দেশে মার্কিনি দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করা, যেখানে মার্কিন সরকারের সঙ্গে সদ্ভাব নেই এমন সরকার রয়েছে। যেমন ঠান্ডা যুদ্ধকালীন পূর্ব ইউরোপ, চীন, ৯/১১ পরবর্তী মুসলমান-প্রধান দেশগুলো। যে কারণে ভয়েস অফ আমেরিকার মৃত্যুঘন্টা বেজেছে জেনে ট্রাম্পের ঘোষিত শত্রু চীনের সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম উল্লাস প্রকাশ করেছে। কিন্তু তেমন প্রোপাগান্ডায় ট্রাম্প সরকারের উৎসাহ নেই – একথা কি বিশ্বাসযোগ্য? মোটেই না। কারণ ট্রাম্প হলেন প্রোপাগান্ডার রাজা। তাঁর উত্থানের পিছনে ভারতের গোদি মিডিয়ার মত আমেরিকার সহিংস, দক্ষিণপন্থী মিডিয়ার যথেষ্ট বড় ভূমিকা আছে। সুতরাং তিনি কেন প্রোপাগান্ডায় করদাতার টাকা খরচ হচ্ছে ভেবে মায়া করতে যাবেন? আসল কথা ট্রাম্প এর আগের চার বছরের শাসনকালেই দেখে নিয়েছেন যে ভয়েস অফ আমেরিকাকে তিনি ফক্স নিউজ বানাতে পারবেন না। তারা তাঁর কথায় ওঠবোস করবে না। অতএব ওটা তাঁর কাছে বাজে খরচ। যে সাংবাদিক চাটুকার নয়, তাকে নিয়ে ট্রাম্প কী করবেন?
লক্ষণীয়, মাস্ক টুইটার (অধুনা এক্স) কিনে নেওয়ার পর ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে টুইট করেছিলেন যে এখন থেকে টুইটারে ‘সিটিজেন জার্নালিজম’-কে প্রাধান্য দেওয়া হবে এবং ‘মিডিয়া এলিট’ তা আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করবে। তদ্দিনে তিনি টুইটারে সত্যাসত্য বিচার করা, ঘৃণা ভাষণ আটকানোর যেসব বিভাগ ছিল সেগুলোকে লাটে তুলে দিয়েছেন। অর্থাৎ বুঝতে অসুবিধা হয় না যে তিনি বোঝাতে চাইছিলেন, এবার থেকে যার যা প্রাণে চায় তাই তথ্য বলে চালিয়ে দিতে পারবে। কে না জানে সোশাল মিডিয়ার ক্ষমতা আজকের দিনে কতখানি? অনেক মানুষই যে খবরের জন্যে সংবাদমাধ্যমের চেয়ে সোশাল মিডিয়ার উপর বেশি নির্ভর করেন, সোশাল মিডিয়া থেকে যা জানা গেছে তার সত্যাসত্য যাচাই করার কথা ভুলেও ভাবেন না – এ তো কোনো গোপন কথা নয়। এমনকি সমস্ত সংবাদমাধ্যমকেও সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করতে হয়, খবরের জন্যে সেদিকে নজরও রাখতে হয়। যারা আরও এককাঠি সরেস, তারা তো সাধারণ মানুষের মতই সোশাল মিডিয়ার তথ্য যাচাই না করেই খবর হিসাবে চালিয়ে দেয়। তা এহেন সোশাল মিডিয়ার মালিকরা যার প্রাণের বন্ধু, তার আর প্রোপাগান্ডা চালানোর জন্যে পেশাদার সাংবাদিকের দরকার হবে কেন? এবারে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের আগেই তো মেটার (অর্থাৎ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটস্যাপের) মালিক মার্ক জুকেরবার্গ ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে এখন থেকে ফেসবুকও যাকে যা খুশি বলার ব্যাপারে অনেক বেশি স্বাধীনতা দেবে। মাস্ক তো টুইটারের মালিকানা হাতে পেয়েই আজীবন নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া ট্রাম্পকে ফেরত এনেছিলেন। তারপর ট্রাম্পের হয়ে রীতিমত প্রচার করেন। কী আশায় করেন তা এখন আমেরিকানরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। উপরন্তু ট্রাম্পের নিজের কোম্পানিও একখানা সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম খুলে ফেলেছে। কানার নাম পদ্মলোচন রাখার মত তার নাম রাখা হয়েছে ট্রুথ। এমতাবস্থায় সাংবাদিকরা মার্কিন সরকারের কাছে কেবল উদ্বৃত্ত নয়, রীতিমত বালাই। গেলে বাঁচা যায়।
বস্তুত, সর্বত্রই সাংবাদিকরা তাই। প্রণয় রায় আর রাধিকার রায় নাকি কীসব আর্থিক গোলমাল করেছেন – এই অভিযোগে তাঁদের নামে কত মামলা মোকদ্দমা হল নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে। কতবার তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হল, এনডিটিভির দফতরে কত কেন্দ্রীয় এজেন্সির কত হানা হল। শেষমেশ প্রায় দেউলে অবস্থায় ওঁদের হাত থেকে এনডিটিভি কিনে ফেললেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন – গৌতম আদানি। ও মা! এবছর জানুয়ারি মাসে সিবিআই আদালতে জানিয়ে দিল, রায় দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি! অতএব ‘যাও সবে নিজ নিজ কাজে’। সাত বছর ধরে চলা তদন্তের ফলটা তাহলে কী? সরকারবিরোধী সাংবাদিকতার জন্যে প্রসিদ্ধ এনডিটিভির সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হওয়া; রায় দম্পতির হাত থেকে লাগাম বেরিয়ে যাওয়ায় রবীশ কুমার, অনিন্দ্য চক্রবর্তীর মত সাংবাদিকদের প্রথমে কর্মহীন হওয়া; পরে নিজের ব্লগ বা ইউটিউব চ্যানেল খুলে সীমিত পরিসরে সাংবাদিকতা করতে বাধ্য হওয়া। দেশজুড়ে কত সাংবাদিক যে জেল খেটেছেন এবং খাটছেন সেকথা লিখতে বসলে তো আলাদা ওয়েবসাইট তৈরি হয়ে যাবে। কোনো সাংবাদিক আরও বাড়াবাড়ি করলে অবশ্য জেল নয়, গৌরী লঙ্কেশ বা মুকেশ চন্দ্রকর করে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।
ভাবছেন কেবল দুষ্টু লোক, দুষ্টু সরকারই সাংবাদিকদের সরিয়ে ফেলছে? মোটেই তা নয়। দুষ্টু লোকেদের বিরোধীরাও আহ্লাদে আটখানা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। মাস্কের গ্রোককে মোদীজি বা বিজেপি সম্পর্কে প্রশ্ন করলেই সে টপাটপ এমন সব উত্তর দিচ্ছে যে সব কুকীর্তি বেরিয়ে আসছে। মোদীবিরোধীদের ধারণা, এই অস্ত্রেই ফ্যাসিবাদী বধ হবে। তাঁরা ভুলেই গেছেন যে গ্রোক বাবাজি মোটেই কোনো সত্যান্বেষী নয়। সে আজ যে উত্তরগুলো দিচ্ছে তাতে নতুন তথ্য তো নেই-ই, উপরন্তু তার তথ্যের ভিত্তি হল এত বছর ধরে চাকরির ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব সাংবাদিক খবর বার করে এনেছেন তাঁদের কাজকর্ম। কিন্তু এসব মনে রাখার দরকার নেই। সাংবাদিক ফালতু, গ্রোককে মাথায় তুলে নাচো।
অতএব যারা এখনো সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে তাদের বলি – আর যেখানে যাও না রে ভাই সপ্তসাগর পার/জার্নালিজম ক্লাসের কাছে যেও না খবরদার।
২০২২ সালে রাশিয়ায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টুইটার নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ জুকেরবার্গ চীনের বিরুদ্ধে সরব হলেও রাশিয়া সম্পর্কে নীরব। আর ভারত? ২০২৩ পর্যন্ত টানা ছয় বছর আমাদের দেশ সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট শাটডাউন করা দেশের শিরোপা অর্জন করেছে। ইন্টারনেট না থাকলে মেটার কোনো অ্যাপ চলাই সম্ভব নয়। অথচ জুকেরবার্গের কিন্তু ভারত সরকারের সেন্সরশিপ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই।
বিশ শতকের প্রথম আড়াই দশকের মধ্যে অন্তত দুটো পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দেওয়ার মত ঘটনা ঘটেছিল। একটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮), অন্যটা রুশ বিপ্লব (১৯১৭)। দুটোরই অকুস্থল অবশ্য মূলত ইউরোপ। তার বাইরে এগুলোর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে সময় লেগেছে। দুটোর সঙ্গেই বিস্তর রক্তপাত জড়িয়ে। এই শতকের প্রথম আড়াই দশকে একাধিকবার বিশ্বযুদ্ধ লাগব লাগব মনে হলেও লাগেনি। কিন্তু কেবল ইউরোপ বা আমেরিকা নয়, গোটা দুনিয়া জুড়ে একটা রক্তপাতহীন বিপ্লব ঘটে গেছে বলে আমরা মনে করেছিলাম। খুবই অল্পসংখ্যক মানুষ সে বিপ্লব নিয়ে উল্লসিত হতে অস্বীকার করেছিলেন এবং আমরা যারা নাচছিলাম তাদের সতর্ক করে বলেছিলেন – ওটা বিপ্লব তো নয়ই; বরং গত কয়েক শতকে বিক্ষোভ, বিদ্রোহ, বিপ্লব এবং বিজ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ যতখানি এগিয়েছিল সেই অগ্রগতিকে একেবারে নস্যাৎ করে দেওয়ার কৌশল। কোন বিপ্লবের কথা বলছি? সোশাল মিডিয়া বিপ্লব। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে এসে শেষমেশ পরিষ্কার হয়ে গেল যে সোশাল মিডিয়া আসলে মানুষের যাবতীয় প্রগতির বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব। মুশকিল হল, আমি আপনি সবাই এই প্রতিবিপ্লবে অংশগ্রহণ করে ফেলেছি এবং এখন আর বেরোবার রাস্তা পাওয়া যাচ্ছে না।
বহু মানুষ এবং গোষ্ঠী আছেন যাঁরা সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ব্যবসায়িক, রাজনৈতিক এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক ইতিবাচক কাজকর্ম চালান। তাঁরা সোশাল মিডিয়াকে সরাসরি প্রগতির বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব আখ্যা দিচ্ছি বলে রেগে যেতে পারেন। তাঁদের একটু ধৈর্য ধরতে বলব। এ সপ্তাহে মেটার মালিক – অর্থাৎ ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ, ইনস্টাগ্রাম এবং থ্রেড নামক সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর মালিক – মার্ক জুকেরবার্গ একখানা নাতিদীর্ঘ ভিডিও বক্তৃতা প্রকাশ করেছেন। সেখানে যা বলেছেন তা বাংলায় ভাষান্তরিত করলে এইরকম দাঁড়ায়
বন্ধুগণ, আজ আমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে চাই। কারণ ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে বাকস্বাধীনতার ব্যাপারে আমাদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। আমি সোশাল মিডিয়া গড়ে তুলতে শুরু করেছিলাম মানুষকে তার নিজের কণ্ঠস্বর দেওয়ার জন্যে। প্রায় পাঁচ বছর আগে জর্জটাউনে একটা বক্তৃতা দিয়েছিলাম বাকস্বাধীনতা বজায় রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে। আমি আজও তাতে বিশ্বাস করি। কিন্তু গত কয়েক বছরে অনেককিছু ঘটে গেছে। বিস্তারিত বিতর্ক হয়েছে অনলাইন কনটেন্ট কতখানি ক্ষতি করে তা নিয়ে। সরকারগুলো আর ঐতিহ্যশালী মূলধারার সংবাদমাধ্যম বেশি বেশি করে সেন্সর চাপিয়ে দিয়েছে। এর অনেকটাই স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক। কিন্তু একথাও ঠিক যে সত্যিই অনেক ক্ষতিকর কনটেন্ট সোশাল মিডিয়ায় রয়েছে – ড্রাগ, সন্ত্রাসবাদ, শিশু নির্যাতন। আমরা এই বিষয়গুলোকে খুব গুরুত্ব দিয়ে বিচার করি এবং আমি এগুলোর দায়িত্বপূর্ণ মোকাবিলা নিশ্চিত করতে চাই। তাই কনটেন্ট মডারেট করার জন্যে আমরা অনেক জটিল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলাম। কিন্তু জটিল ব্যবস্থা গড়ে তোলার মুশকিল হল, তাতে প্রচুর ভুলও হয়। যদি ভুল করে ১% পোস্টও সেন্সর করা হয়, সেটাও কয়েক লক্ষ মানুষকে সেন্সর করা। আর আমরা এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গেছিলাম যেখানে বড় বেশি ভুল হচ্ছিল আর বড় বেশি সেন্সরশিপ চলছিল। সাম্প্রতিক নির্বাচনটাকেও [মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন] মনে হল বাকস্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সাংস্কৃতিক তুঙ্গ মুহূর্ত। সুতরাং আমরা আমাদের শিকড়ে ফিরে যেতে চলেছি এবং আমাদের ভুলের সংখ্যা কমানোর দিকে জোর দিতে চলেছি, আমাদের নীতিগুলোর সরলীকরণ করতে চলেছি এবং আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে বাকস্বাধীনতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চলেছি। আরও নির্দিষ্টভাবে বললে আমরা যা করতে চলেছি তা হল – প্রথমত, আমরা তথ্য যাচাইকারীদের বাদ দিয়ে তার বদলে এক্স সাইটের মত কমিউনিটি নোট চালু করতে চলেছি। এ কাজ শুরু হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালে প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার পরে ঐতিহ্যশালী মূলধারার সংবাদমাধ্যম ক্রমাগত লিখে গেছে ভুয়ো তথ্য কীভাবে গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কোনটা সত্যি সেটার নির্ধারক হয়ে না বসে আমরা সৎভাবে ওই দুর্ভাবনাগুলো দূর করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তথ্য যাচাইকারীরা রাজনৈতিকভাবে বড় বেশি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে কাজ করেছেন এবং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বাস অর্জন করার চেয়ে বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন বেশি। অতএব আগামী কয়েক মাস ধরে আমরা অনেক বেশি করে সবদিক রক্ষা করে এমন কমিউনিটি নোট ব্যবস্থা ধাপে ধাপে চালু করতে যাচ্ছি।
দ্বিতীয়ত, আমরা আমাদের কনটেন্ট নীতিগুলোর সরলীকরণ করে অভিবাসন আর লিঙ্গ সম্পর্কে এমন একগুচ্ছ নিষেধ তুলে দিতে যাচ্ছি যেগুলো মূলধারার বয়ানের সঙ্গে একেবারে বেমানান। যা আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠার আন্দোলন হিসাবে শুরু হয়েছিল, তা ক্রমশই হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিন্নমত এবং ভিন্নমতের লোকেদের চুপ করানোর উপায়। এখানে বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। সুতরাং আমি নিশ্চিত করতে যাই যে মানুষ নিজের বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতা আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে শেয়ার করতে পারছে।
তৃতীয়ত, আমরা যেভাবে আমাদের নীতিগুলো প্রয়োগ করি তাতেও পরিবর্তন আনতে চলেছি। ওগুলোই আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে যত সেন্সরশিপ হয় তার বেশিরভাগ ভুলের জন্যে দায়ী। আমাদের যে কোনো নীতিকে লঙ্ঘন করে যেসব পোস্ট সেগুলোকে ধরার জন্যে আমাদের ফিল্টার ছিল। এখন থেকে সেই ফিল্টারগুলো মূলত নজর দেবে বেআইনি এবং গুরুতর নীতি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর উপর। আর সেগুলোর ক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা নেওয়ার আগে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীরা রিপোর্ট করেছেন কিনা তার উপর নির্ভর করব। সমস্যা হল, ফিল্টারগুলোও ভুল করে এবং এমন প্রচুর কনটেন্ট মুছে দেয় যেগুলো মোছা উচিত নয়। সুতরাং ফিল্টারগুলোর ভূমিকা কমিয়ে আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্মের সেন্সরশিপ অনেকখানি কমিয়ে ফেলতে পারব। এছাড়াও আমরা কনটেন্ট ফিল্টারগুলোকে এমনভাবে টিউন করতে চলেছি যে কোনো কনটেন্ট মুছে দেওয়ার আগে ফিল্টারগুলোকে অনেক বেশি নিশ্চিত হতে হবে।
সত্যি কথা বলতে এগুলো করলে কিছু ক্ষতিস্বীকারও করতে হবে। এই ব্যবস্থায় অনেক কম খারাপ জিনিস ধরা পড়বে, কিন্তু যত নিরপরাধ মানুষের পোস্ট আমরা ভুল করে মুছে দিই তার সংখ্যা কমবে।
চতুর্থত, আমরা সিভিক কনটেন্ট ফিরিয়ে আনছি। বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুক সমাজ রাজনীতি কম দেখতে চাইছিল কারণ এতে মানুষের মানসিক চাপ বেড়ে যাচ্ছিল। তাই আমরা ওই ধরনের পোস্ট সুপারিশ করা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু মনে হচ্ছে আমরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছি এবং আমরা জানতে পারছি যে লোকে ওই ধরনের কনটেন্ট আবার দেখতে চাইছে। তাই আমরা ধাপে ধাপে সেই ধরনের কনটেন্ট ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আর থ্রেডে ফিরিয়ে আনতে চলেছি যাতে গোষ্ঠীগুলো বন্ধুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক থাকে।
পঞ্চমত, আমরা আমাদের ট্রাস্ট অ্যান্ড সেফটি অ্যান্ড কনটেন্ট মডারেশন টিমগুলোকে ক্যালিফোর্নিয়ার বাইরে নিয়ে যাচ্ছি এবং আমাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কনটেন্ট রিভিউ হবে টেক্সাস থেকে। আমরা যেহেতু বাকস্বাধীনতা বৃদ্ধি করতে চলেছি, সেহেতু আমার মনে হয় এমন জায়গা থেকে কাজ করলে বেশি বিশ্বস্ত হওয়া যাবে যেখানে আমাদের টিমের পক্ষপাত নিয়ে ভাবনা কম।
শেষত, আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সেইসব সরকারের বিরুদ্ধে লড়ব যারা আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে আক্রমণ করছে আরও সেন্সর করার জন্যে। গোটা পৃথিবীর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই বাকস্বাধীনতা রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী সাংবিধানিক ব্যবস্থা রয়েছে। ইউরোপে ক্রমশ এমন সব আইন বেড়ে যাচ্ছে যেগুলো সেন্সরশিপকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। ফলে সেখানে উদ্ভাবনীমূলক কিছু করা শক্ত হয়ে যাচ্ছে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর এমন গোপন কোড আছে যা দিয়ে তারা চুপিসারে কোম্পানিগুলোকে নানা পোস্ট মুছে দিতে বলতে পারে। চীন আমাদের অ্যাপগুলোকে তাদের দেশে একেবারেই নিষিদ্ধ করে রেখেছে। এই বিশ্বব্যাপী প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই করা যেতে পারে একমাত্র মার্কিন সরকারের সঙ্গে মিলে কাজ করলেই। সেই কারণেই গত চার বছরে কাজ করা খুব শক্ত হয়ে গিয়েছিল, কারণ মার্কিন সরকারও সেন্সরশিপ চালানোর জন্যে চাপ দিচ্ছিল। আমাদের এবং অন্য আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে আক্রমণ করে মার্কিন সরকার অন্য দেশের সরকারগুলোর আমাদের সেন্সর করার সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এবার আমাদের সামনে বাকস্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার সুযোগ এসেছে এবং আমি সেই সুযোগ নিতে উদগ্রীব। এতে সময় লাগবে আর এগুলো জটিল ব্যবস্থা। ফলে কখনোই একেবারে নিখুঁত হবে না। তাছাড়াও প্রচুর বেআইনি জিনিস আছে যেগুলোকে সরাতে আমাদের এরপরেও অনেক পরিশ্রম করতে হবে। কিন্তু আসল কথা হল, বহুবছর ধরে আমাদের কনটেন্ট মডারেশন প্রোগ্রামের প্রধান কাজ ছিল কনটেন্ট মুছে দেওয়া। এবার সময় এসেছে ভুল কমানোর উপর জোর দেওয়ার, আমাদের ব্যবস্থাগুলোর সরলীকরণ করার এবং আমাদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার, অর্থাৎ মানুষকে তার নিজের কথা বলতে দেওয়ার। আমি এই নতুন অধ্যায়ের দিকে সাগ্রহে তাকিয়ে আছি। ভাল থাকুন, শিগগির আরও কিছু নিয়ে ফিরে আসব।’
অতীতে কখনো এরকম বুক ফুলিয়ে কোনো বহুজাতিক কোম্পানি মার্কিন সরকারের সঙ্গে মিলে অন্য দেশের সরকারগুলোর আইনকানুনের বিরুদ্ধে লড়ার কথা ঘোষণা করেছে কিনা তা ঐতিহাসিক গবেষণার বিষয় হতে পারে। এসব বরাবর চোরাগোপ্তা চলেছে। কিন্তু জুকেরবার্গের এই ঘোষণা প্রমাণ করে দিল যে বিশ্বজুড়ে বহু ইন্টারনেট অ্যাক্টিভিস্ট যে অভিযোগ করে আসছেন এই দৈত্যাকৃতি তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে – তা সত্যি। অর্থাৎ এদের হাতে এমন উপকরণ আছে যা দিয়ে এরা মার্কিন সরকারের হয়ে অন্য দেশের সরকারের তো বটেই, সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী কাজও করতে পারে।
করেও থাকে। সোশাল মিডিয়া যেভাবে বিশ্বব্যাপী জাল বিস্তার করেছে তা করতেই পারত না, যদি না যোগাযোগ বিপ্লব ঘটত। সেই বিপ্লবে সবচেয়ে লাভবান হওয়া কোম্পানিগুলোর অন্যতম হল স্টিভ জোবস স্থাপিত অ্যাপল। এ মাসের গোড়াতেই অ্যাপল একখানা মামলা মিটিয়ে নিতে ৯৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া প্রদেশের ওকলাহোমার ফেডেরাল কোর্টে চলা এই মামলায় মামলাকারীর অভিযোগ ছিল, আইফোন ও অন্যান্য অ্যাপল উৎপাদিত যন্ত্রপাতির ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘সিরি’, যন্ত্রের মালিকের অজান্তে তার কথাবার্তা রেকর্ড করে নিয়েছে। তারপর সেই কথাবার্তা বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বেচে দেওয়া হয়েছে। তেমন হলে যে মার্কিন সরকারের কাছে বা আপনি যে দেশের লোক সে দেশের সরকারের কাছেও বেচবে না তার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না। তেমন অভিযোগও ওঠে, কেবল অ্যাপল বা ফেসবুকের বিরুদ্ধে নয়। সুন্দর পিচাইয়ের গুগল এবং সত্য নাডেলার মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধেও নানারকম অভিযোগ আছে। পিচাইকে মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের সামনে বসে প্রাইভেসি, রাজনৈতিক পক্ষপাত, হিংসায় ধুয়ো দেওয়া ইত্যাদি অভিযোগ সম্পর্কে কৈফিয়তও দিতে হয়েছে।
এগুলো কোনোটাই আমেরিকাবিরোধী বা পুঁজিবাদবিরোধী বামপন্থীদের তৈরি ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব নয়। অভিযোগগুলো নিয়ে অন্তর্তদন্ত, লেখালিখি করে থাকে ফোর্বসের মত মার্কিন এবং ঘোর পুঁজিবাদী সংবাদমাধ্যমগুলোই। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি হলিউড তো এসব নিয়ে একগুচ্ছ ছায়াছবি বানিয়ে বসে আছে। এসব যদি কেবল গালগল্প হত তাহলে এডওয়ার্ড স্নোডেনকে নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গিয়ে আত্মগোপন করে থাকতে হত না।
যা-ই হোক, জুকেরবার্গের মিনিট পাঁচেকের ঘোষণার শুধু ওটুকু নিয়ে পড়ে থাকলে আমাদের চলবে না। এগোনো যাক।
ইলন মাস্ক যখন টুইটার (অধুনা এক্স) কিনে নিলেন, তখন প্রচুর লোককে ছাঁটাই করেন। তাঁদের একটা বড় অংশ ছিলেন তথ্য যাচাইকারী, অর্থাৎ যাঁরা ওই প্ল্যাটফর্মে ভুয়ো তথ্য পরিবেশন আটকানোর দায়িত্বে ছিলেন। এবার লক্ষ করুন, জুকেরবার্গও বলছেন তথ্য যাচাইকারীদের দরকার নেই। তারা বড্ড পক্ষপাতদুষ্ট। আমরা বরং এক্সের মত কমিউনিটি নোট চালু করব। অর্থাৎ আগে যদি ফেসবুকে আপনি পোস্ট করতেন যে বারাক ওবামা হলেন ওসামা বিন লাদেনের খুড়তুতো ভাই, তাহলে ফেসবুক হয়ত তা মুছে দিত। এখন থেকে মুছবে না। যদি অন্য ব্যবহারকারীরা কথাটা যে মিথ্যে তা উল্লেখ করেন, তাহলে পোস্টের তলায় একখানা নোট দেওয়া থাকবে যে অনেকে জানিয়েছেন এই তথ্য মিথ্যা। তেমন কিছু পোস্টের দৃষ্টান্তও দেওয়া থাকবে। বলা বাহুল্য, স্মার্টফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমাদের মনোযোগ যে তলানিতে এসে পৌঁছেছে তাতে অধিকাংশ লোক ওসব নোট-ফোট খুলে দেখতে যাবে না। ফলে ভুয়ো তথ্যের রমরমা হবে। ওরকম পোস্ট যদি ছবি সহকারে করা হয় তাহলে তো কথাই নেই। আমাদের দেশে অল্টনিউজ, বুমলাইভের কর্মীদের উদয়াস্ত পরিশ্রম সত্ত্বেও বারবার জওহরলাল নেহরু এক সুন্দরী মেমের সঙ্গে নাক ঘষছেন – এমন একখানা ছবি কিছুদিন পরপরই সোশাল মিডিয়ায় ঘোরে। অথচ বহুবার প্রমাণিত হয়েছে যে ওটা ফটোশপের কারসাজি। ছবিতে আসলে নেহরুর পাশে ছিলেন মহাত্মা গান্ধী, দুজনের মধ্যে হাসিঠাট্টা চলছিল।
অল্টনিউজের কথা যখন উঠলই তখন মনে করিয়ে দিই, ২০২১ সালে নাগরিক ডট নেটকে এক সাক্ষাৎকারে ওই সংস্থার কর্ণধার প্রতীক সিনহা বলেছিলেন, যে সমাজে তীব্র মেরুকরণ হয়ে গেছে সেখানে তথ্য যাচাই যথেষ্ট নয়। কথাটা সব দেশের সব সমাজের জন্যেই সত্যি। কারণ তেমন সমাজে আপনি যাদের অপছন্দ করেন তার সম্পর্কে বানিয়ে বলা খারাপ কথাও আপনি অন্ধের মত বিশ্বাস করবেন, পছন্দের লোকেদের সম্পর্কে বানিয়ে বলা ভাল কথাও একইভাবে বিশ্বাস করবেন। যাচাই করে দেখতে যাবেন না সত্যি বলা হয়েছে না মিথ্যা। একথা জুকেরবার্গও জানেন আর আজকের আমেরিকা যে প্রবল মেরুকরণ হয়ে যাওয়া এক দেশ – সেকথাও বিলক্ষণ বোঝেন। তা সত্ত্বেও তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার মানে এর পিছনে যে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এদেশে আরএসএস-বিজেপির নেতা, কর্মী, সমর্থকরা প্রতীক, মহম্মদ জুবের প্রমুখ তথ্য যাচাইকারীদের পক্ষপাতদুষ্ট বলেন। সোশাল মিডিয়ায় গালাগালি দিয়েই ক্ষান্ত থাকেন না, এফআইআর-ও করে দেন। তার জেরে জুবেরকে ইতিমধ্যেই একবার কারাবাস করতে হয়েছে, এই মুহূর্তেও তাঁর নামে মামলা চলছে আদালতে। লক্ষ করুন, জুকেরবার্গও অভিযোগ করছেন যে তথ্য যাচাইকারীরা পক্ষপাতদুষ্ট। কোন পক্ষ? সেই পক্ষকে কেন জুকেরবার্গের অপছন্দ? তা একেবারে শেষে এসে পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তিনি ট্রাম্পের পক্ষে, অর্থাৎ তথ্য যাচাইকারীরা ট্রাম্পের বিরুদ্ধ পক্ষের। গোটা বক্তৃতায় জুকেরবার্গ বাকস্বাধীনতার হয়ে ধর্মযুদ্ধে নামার ভান করেছেন। বাকস্বাধীনতা কথাটা শুনতে অতি চমৎকার। কিন্তু কার বাকস্বাধীনতা? এক্ষেত্রে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে – অভিবাসীবিদ্বেষী, কৃষ্ণাঙ্গবিদ্বেষী, মুসলমানবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী এবং রূপান্তরকামী বিদ্বেষী ট্রাম্প ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের বাকস্বাধীনতা।
কার বাকস্বাধীনতা – এই প্রশ্নটা করতে আমরা প্রায়শই ভুলে যাই। ইউরোপের নবজাগরণ, ফরাসি বিপ্লব, পাশ্চাত্যের উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় আমরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে প্রশ্নটা উঠলেও সটান বলে দিই ‘সকলের বাকস্বাধীনতা থাকা উচিত।’ সেন্সরশিপ ব্যাপারটা যে খুব খারাপ সেটাও আমরা বিনা প্রশ্নে মেনে নিই। কথাটার মধ্যে যে একটা মস্ত ফাঁক (বা ফাঁকি) আছে সেটা একুশ শতকে এসে মাস্ক, জুকেরবার্গরা দেখিয়ে দিলেন। বলা ভাল, দেখিয়ে ফেললেন। ওই ফাঁক দিয়েই তাঁরা ভুয়ো তথ্য ও ঘৃণাভাষণের হাতি গলিয়ে দিলেন। দেখুন জুকেরবার্গ কেমন অবলীলাক্রমে বলেছেন যে এসব পরিবর্তন করলে কিছু ক্ষতি হবেই। সত্যিই সোশাল মিডিয়ায় ড্রাগ, সন্ত্রাসবাদ, শিশু নির্যাতনের মত ভয়ঙ্কর জিনিস ছড়িয়ে আছে এবং নতুন ব্যবস্থায় সেগুলো বেড়ে যাবে। কিন্তু তাতে কী হয়েছে? সেন্সরশিপ তো কমবে। অর্থাৎ মানুষের স্বার্থে বাকস্বাধীনতা চাইছেন না, বাকস্বাধীনতার স্বার্থে মানুষকে বলি দিতে চাইছেন। আপনার স্মার্টফোন হাতে পাওয়া সন্তানের কোনো বিকৃতকাম লোকের পাল্লায় পড়ে যাওয়া আটকানোর চেয়ে বিকৃতকাম লোকটার বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা বেশি জরুরি – এই হল জুকেরবার্গের যুক্তি। একইভাবে কালো মানুষকে তার চামড়ার রং নিয়ে গালাগালি দেওয়ার বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা জরুরি। মহিলাদের প্রতি লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্য করা, অশ্লীল ইঙ্গিত করা, ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার বাকস্বাধীনতাও জরুরি। যে কোনো প্রান্তিক পরিচিতিসম্পন্ন ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীকে যথেচ্ছ গালাগালি দেওয়া, তাদের বিরুদ্ধে ভুয়ো তথ্য ছড়ানো, সোশাল মিডিয়ায় ঘৃণাভাষণের স্বাধীনতা রক্ষাও জুকেরবার্গের খুবই জরুরি মনে হয়েছে।
কেন মনে হল? জুকেরবার্গ আদতে তো ব্যবসায়ী। তাঁর লক্ষ্য তো মুনাফা। তাহলে এইরকম বাকস্বাধীনতায় কি মুনাফার সম্ভাবনা বাড়বে? অবশ্যই। কারণ দেশের রাষ্ট্রপতি, যিনি মূলত একজন ধনকুবের, তিনি আপনার হাতে। ফলে তাঁর রাজনীতিকে জায়গা করে দিলেই আপনার ব্যবসা যে ফুলে ফেঁপে উঠবে সে তো জানা কথাই। মাস্ক যখন টুইটার কিনে নিলেন তখন অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক বলেছিলেন যে এটা ভুল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। কারণ ওটা আসলে ক্ষতিতে চলা ব্যবসা। মাস্ক নিজেও ২০২২ সালের নভেম্বরে বলেছিলেন যে টুইটারের দৈনিক ৪ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। ক্ষতিকে লাভে পরিণত করার জন্যে তারপর তিনি নানারকম ব্যবস্থা নেন। ভেরিফিকেশন টিক দেওয়ার জন্যে টাকা নেওয়া, বিনামূল্যে যত শব্দ পোস্ট করা যায় তার চেয়ে মাসিক মূল্যে কিছু বেশি শব্দ পোস্ট করতে দেওয়া, পোস্ট সম্পাদনা করতে দেওয়া – ইত্যাদি ব্যবস্থা চালু হয়। কিন্তু এহ বাহ্য। এখন বোঝা যাচ্ছে, আসলে মাস্কের উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্পকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করা। তিনি টুইটারের মালিকানা হস্তান্তরের পরেই ট্রাম্পের উপর চাপানো আজীবন নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনেন। তারপর ভুয়ো তথ্য, ঘৃণাভাষণ আটকানোর ব্যবস্থাগুলোর সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দেন। দেশে নিজের পছন্দের রাষ্ট্রপতি বসাতে পারলে অনেক ব্যবসার একটা ব্যবসায় যা ক্ষতি হবে তা পুষিয়ে নেওয়া এমন কী ব্যাপার? জুকেরবার্গও মাস্কের পথের পথিক।
এবার জুকেরবার্গের বক্তব্যের শেষ অনুচ্ছেদে আসা যাক। তিনি জো বাইডেনের আমলের নিন্দা করে বলেছেন, এমনিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই বাকস্বাধীনতার সাংবিধানিক রক্ষাকবচ সবচেয়ে বেশি। কিন্তু গত চার বছরে তাঁদের উপর এবং অন্য মার্কিন কোম্পানিগুলোর উপর মার্কিন সরকার সেন্সরশিপ চাপিয়ে দিচ্ছিল। ফলে অন্য দেশের সরকারগুলোরও সাহস বেড়ে গেছে। অতঃপর জুকেরবার্গ নির্দিষ্ট করে কিছু দেশ ও মহাদেশের নাম করেছেন, যারা নাকি এতই সেন্সরশিপ চালায় যে সেখানে কোনোরকম উদ্ভাবনীমূলক কাজ করা যায় না। নামগুলো কৌতূহলোদ্দীপক। চীনে মেটার অ্যাপগুলো নিষিদ্ধ, তাঁর দোকান খুলতেই দেওয়া হয়নি, অতএব চীনকে জুকেরবার্গের অপছন্দের কারণ বোঝা যায়। সত্যি বলতে বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে চীনের রেকর্ড খুব ভাল – এমনটা ভারতের কিছু কমিউনিস্ট ছাড়া বিশেষ কেউ দাবি করে না। বোধহয় শি জিনপিংকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলবেন – বেশ করি বাকস্বাধীনতা দিই না। যা পারিস কর গে যা। ফলে চীনের কথা না হয় বাদ দেওয়া গেল। লাতিন আমেরিকাকে নিয়ে আপত্তি তো থাকবেই। ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা সহ একাধিক দেশে এখন বামপন্থী দলগুলোর সরকার। এদের মার্কিন পুঁজিবাদীদের কোনোদিনই পছন্দ হয় না, হওয়ার কথাও নয়। সুতরাং তাদের প্রতি জুকেরবার্গের অসন্তোষও স্বাভাবিক। মজার ব্যাপার হল, ইউরোপের নাম করা। ইউরোপের প্রায় সব দেশের সরকারই তো পুঁজিবাদে ঘোর বিশ্বাসী। ফ্রান্সে, স্পেনে ইদানীং বামপন্থীদের প্রভাব যেমন খানিক বেড়েছে তেমনই নেদারল্যান্ডস, ইতালির মত দেশে ঘোর দক্ষিণপন্থী সরকার এসেছে। জার্মানিও ক্রমশ অতি দক্ষিণপন্থীদের দিকে ঝুঁকছে। তাহলে ইউরোপের উপর গোঁসা কেন?
আসলে ইউরোপের দেশগুলো ইন্টারনেট, প্রাইভেসি ইত্যাদি ব্যাপারে ভারতের মত কাছাখোলা নয়। এসব ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আইন আছে। সেইসব আইনভঙ্গের অভিযোগে সাম্প্রতিক অতীতে সিলিকন ভ্যালির টেক দৈত্যতের ফাঁপরে পড়তে হয়েছে। ২০১৮ সালে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পরে জুকেরবার্গকে সশরীরে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্যদের প্রশ্নের উত্তর দিতে যেতে হয়েছিল। ইউরোপের সরকারগুলোর উপরে ট্রাম্পের ডান হাত মাস্কও রুষ্ট (অনেকে বলছে ট্রাম্পই মাস্কের ডান হাত)। গত ৬ জানুয়ারি তিনি নিজের এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করেছেন ‘আমেরিকার উচিত ব্রিটেনের মানুষকে তাদের অত্যাচারী সরকারের হাত থেকে মুক্ত করা’। কারণ তাঁর মতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টার্মার মুসলমান অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর নন। আবার অতি দক্ষিণপন্থী ব্রিটিশ নেতা নাইজেল ফারাজকেও মাস্কের পছন্দ নয়। অন্য দেশে কার ক্ষমতায় থাকা উচিত আর কার উচিত নয় – তা নিয়ে এতকাল মন্তব্য করার একচেটিয়া অধিকার ছিল মার্কিন আর ইউরোপিয় দেশের রাষ্ট্রপতিদের। মন্তব্যগুলো করা হত লাতিন আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে। ২০২৫ সালে এসে দেখা যাচ্ছে মন্তব্য করছে টেক দৈত্যরা; এমনকি ইউরোপের যেসব দেশ নিজেদের গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতার পরাকাষ্ঠা বলে মনে করে তাদের সম্পর্কেও। তাহলে বোঝা যাচ্ছে গত দুশো-আড়াইশো বছর ধরে অর্জিত গণতান্ত্রিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কেমন ইউ টার্ন নিয়ে ফরাসি বিপ্লবের আগের যুগে ফিরে যাচ্ছে? বোঝা যাচ্ছে কেন সোশাল মিডিয়াকে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব বলছি?
জুকেরবার্গ যা বলেছেন শুধু তা-ই যে তাৎপর্যপূর্ণ তা কিন্তু নয়। যা বলেননি তা খেয়াল করলেও গণতন্ত্রবিরোধী বা প্রতিবিপ্লবী প্রবণতাটা ধরা যাবে। লক্ষ করুন, যেসব দেশের সরকার সেন্সরশিপ চাপিয়ে দিচ্ছে বলে জুকেরবার্গ অভিযোগ করেছেন তার মধ্যে ভারত নেই, রাশিয়া নেই। কেউ বলতেই পারেন, হাতে ফর্দ নিয়ে বসে দুনিয়ায় যতগুলো দেশে অপছন্দের সরকার আছে তাদের নাম করবে নাকি? নিশ্চয়ই তা প্রত্যাশিত নয়। কিন্তু বাজার হিসাবে ভারত আর রাশিয়া বিরাট। রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিন কীরকম দমনমূলক শাসন চালান তা জানতে কারোর বাকি নেই। বিরোধিতা করলে কী অবস্থা হয় তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ একদা বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনি, যিনি গতবছর কারাগারে মারা গেছেন। কিন্তু আজও পুতিনের সরকার সন্ত্রাসবাদীদের তালিকা থেকে তাঁর নাম সরাতে রাজি নয়। যদি একটু হাসিঠাট্টার মেজাজে আরও বিস্তারিত জানতে চান পুতিনের রাশিয়া সম্পর্কে, তাহলে বিদূষক জন অলিভারের শোয়ের এই পর্বটা দেখে নিতে পারেন।
উপরন্তু ২০২২ সালে রাশিয়ায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টুইটার নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ জুকেরবার্গ চীনের বিরুদ্ধে সরব হলেও রাশিয়া সম্পর্কে নীরব। আর ভারত? ২০২৩ পর্যন্ত টানা ছয় বছর আমাদের দেশ সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট শাটডাউন করা দেশের শিরোপা অর্জন করেছে। ইন্টারনেট না থাকলে মেটার কোনো অ্যাপ চলাই সম্ভব নয়। অথচ জুকেরবার্গের কিন্তু ভারত সরকারের সেন্সরশিপ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই।
এই মনোভাবের কারণ বোঝা কি সত্যিই শক্ত? পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুই সোশাল মিডিয়া মালিক জুকেরবার্গ আর মাস্ক হলেন ট্রাম্পের বন্ধু। আবার পুতিন আর আমাদের নরেন্দ্র মোদীর বন্ধু হলেন ট্রাম্প। মোদী আমেরিকায় গিয়ে অনাবাসী ভারতীয় ভোটারদের কাছে ট্রাম্পের হয়ে প্রায় নির্বাচনী প্রচার করে এসেছিলেন। স্লোগান চালু হয়েছিল ‘অব কি বার, ট্রাম্প সরকার’। ট্রাম্পও ভারতে এসে এলাহি অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন মোদীর নিজের শহর আমেদাবাদে। মোদীর নামাঙ্কিত ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রথম অনুষ্ঠান ছিল ট্রাম্পের অভ্যর্থনা, কোনো ক্রিকেট ম্যাচ নয়। তখন করোনা অতিমারী চলছে। দেশসুদ্ধ লোককে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখতে বলে কেবল ট্রাম্পের জন্যে লক্ষ লক্ষ লোককে সেদিন জড়ো করা হয়েছিল ওই স্টেডিয়ামে। তাছাড়া নির্বাচন এসে পড়লেই বিজেপি ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিতে কী বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে তাও তো গোপন নেই।
পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা তো আরও গভীর। ট্রাম্প প্রথমবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার সময় থেকেই অভিযোগ উঠেছে মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়া হস্তক্ষেপ করে ট্রাম্পকে সাহায্য করতে। সেই ঠান্ডা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কোনো মার্কিন রাজনীতিবিদ রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে ট্রাম্পের মত উদগ্রীব হননি। পুতিনও ট্রাম্পের প্রশংসা করে থাকেন। ট্রাম্প এবারে ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই পুতিনের ইউক্রেনের জমি দখলকে সমর্থন করে চলেছেন। সম্প্রতি বাইডেন সরকারের অনুসৃত বিদেশনীতির একেবারে উল্টো পথে হেঁটে বলেছেন ইউক্রেনের ন্যাটোয় যোগদানে রাশিয়ার আপত্তি যুক্তিযুক্ত।
যা নিয়ে বাইডেন আর ট্রাম্পের মধ্যে বিশেষ ফারাক নেই তা হল ইজরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে যে গণহত্যা চালাচ্ছে তার প্রতি সমর্থন। সেই গণহত্যাকে কীভাবে মদত দেওয়া হয়েছে সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে, তা আমরা দেখেছি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলে হামাসের অতর্কিতে হানাকে অজুহাত হিসাবে খাড়া করে ইজরায়েল প্যালেস্তাইনে যে গণহত্যা শুরু করে তার প্রতি সমর্থন আদায় করতে ছড়িয়ে দিয়েছিল এই ভুয়ো খবর, যে হামাস শিশুদের মাথা কেটে নিয়েছে। এত জোরদার ছিল সেই প্রচার যে বাইডেন সাংবাদিক সম্মেলনে ওই দৃশ্য উল্লেখ করে বসেন। পরে হোয়াইট হাউসকে স্বীকার করতে হয় যে ভুল হয়েছিল। ওরকম কিছু আদৌ ঘটেনি।
জুকেরবার্গ যে বাকস্বাধীনতার ধ্বজা ওড়াচ্ছেন সেটা আসলে এরকম যাচ্ছেতাই মিথ্যা ছড়ানোর, ঘৃণা ছড়ানোর স্বাধীনতা। ট্রাম্পের আমলে যা হবে তা হল ট্রাম্প কখনোই বলবেন না, আমার ভুল হয়েছিল। ওরকম কিছু ঘটেনি। তিনি মিথ্যে কথা বলার রাজা, ঘৃণাভাষণের সম্রাট। প্রথমবার রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন একবার নিউইয়র্ক টাইমস তাদের প্রথম পাতা ভরে শুধু ট্রাম্পের মুখনিঃসৃত মিথ্যার তালিকা ছেপেছিল। সেই ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরেছেন। তাঁকে ফিরে আসতে সক্রিয় সাহায্য করেছে সোশাল মিডিয়া। অতঃপর তাঁর মিথ্যা, তাঁর ঘৃণা ছড়িয়ে দিতেও বিপুল বিক্রমে সাহায্য করবে তারাই। দুনিয়া জুড়ে যাবতীয় রাষ্ট্রীয় অন্যায়ে মদত দিয়ে আরও ফুলে ফেঁপে উঠবেন মাস্ক আর জুকেরবার্গ। যতই অভূতপূর্ব গরমের পর দাবানলে পুড়ে খাক হয়ে যাক লস এঞ্জেলস, সমুদ্র তীরবর্তী ম্যালিবু, হলিউডের অভিজাত অঞ্চল; সোশাল মিডিয়ায় মানুষকে বোঝানো হবে জলবায়ু পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। ও নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। কোনো দেশে বোঝানো হবে থালা বাসন বাজালেই অতিমারীর ভাইরাস পালাবে, মুসলমানরা ছয় বছর বয়স হলেই সন্ত্রাসবাদী হয়ে যায় – এইসব। আমার আপনার হাতের মগজ ধোলাই যন্ত্র আগামী দিনে আরও বেশি বেশি করে ভরে যাবে অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভুয়ো তথ্যে। সত্যের চেয়ে অর্ধসত্য বেশি মারাত্মক। সেই অর্ধসত্য এত বাড়িয়ে দেওয়া হবে বাকস্বাধীনতার নাম করে যে আমরা আর সত্য চিনতে পারব না। এদেশের সুপ্রাচীন জ্ঞানীদের কথা মানলে বলতে হয়, সত্যকে দেখতে পাব না মানে শিবকে দেখতে পাব না। শিবকে দেখতে পাব না মানে সুন্দরকে দেখতে পাব না। ফলে অবাধে কয়েকটা বড় বড় রাষ্ট্র দুনিয়া জুড়ে গণহত্যা চালাবে। একটার জায়গায় হয়ত দশটা হলোকস্ট হবে। পুতিন ক্রিমিয়া আর ইউক্রেনে হানা দিয়েছেন, নেতানিয়াহু প্যালেস্তাইনকে গণকবরে পরিণত করেছেন, ট্রাম্প হয়ত মেক্সিকো আর কানাডায় হানা দেবেন। ফলে চীন তাইওয়ানে হানা দিলেই বা কার কী বলার থাকতে পারে? কে বলে ইতিহাসের চাকা উল্টোদিকে ঘোরানো যায় না? দিব্যি তো ঔপনিবেশিক আমলের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছেন বড় বড় গণতন্ত্রের শাসকরা। কানাডাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম প্রদেশে পরিণত করব, গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্কের থেকে ছিনিয়ে নেব বলার পরেই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট স্বাধীন দেশ ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে ধরে দিতে পারলে ২৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার দেবে বলে ঘোষণা করেছে।
সোশাল মিডিয়া বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছিল। আমরা সেই ফাঁদে পড়ে গেছি। আমরা টের পাইনি কখন আমাদের যুক্তিবোধ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, প্রতিবাদ করার ইচ্ছা, প্রতিবাদ সংগঠিত করার ক্ষমতা – সব সেঁধিয়ে গেছে সোশাল মিডিয়ায়। ২০১০ সালে কায়রোর তাহরীর স্কোয়্যার থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে কলকাতার ধর্মতলা পর্যন্ত যত আন্দোলন সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়েছে, কোনোটার আহ্বান মাঠ ঘাট বন পেরিয়ে যায়নি। দুস্তর বাধা, প্রস্তর ঠেলে বন্যার মত পেরিয়ে যায়নি। যুগসঞ্চিত সুপ্তি সাড়া দেয়নি, হিমগিরি সূর্যের ইশারা শুনতে পায়নি। আমরা সোশাল মিডিয়ার বালুচরেই আশার তরণি বেঁধে ফেলেছি। এই লেখাও সোশাল মিডিয়াতেই শেয়ার করতে হবে। জুকেরবার্গ, মাস্কের সাহায্য ছাড়া আমরা বার্তা আদানপ্রদান করতে পারব না। বড়জোর ফেডিভার্স ব্যবহার করতে পারি বা ব্লুস্কাই-এর মত অন্য কোনো সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে যেতে পারি। কারণ সোশাল মিডিয়া আমাদের আসলে কাছাকাছি আনেনি। তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে, তারও দূরে সরিয়ে দিয়েছে। হাতের উপর হাত রাখার মন্ত্র আমরা ভুলে গেছি। আসলে আমরা হীরক রাজার দেশে ছবির সেই কৃষক, শ্রমিকদের মত হয়ে গেছি যারা বুঝতেও পারে না তারা অন্যদের দ্বারা চালিত। মগজ ধোলাই কথাটার যথার্থ ইংরিজি এতদিনে খুঁজে পেয়েছে অক্সফোর্ড ডিকশনারি – ব্রেন রট। ব্রেন ওয়াশিং নয়।
অস্বীকার করি না যে এই পচন আটকানোর উপায় কী, সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। কিন্তু এখনো যাঁরা ভাবছেন পেশাদার বা অপেশাদার সোশাল মিডিয়া পরিচালকদের দিয়ে রাজনৈতিক যুদ্ধ জয় করবেন বা অধিকার আদায় করবেন, তাঁদের দেখে হাসার শক্তিটুকু আছে। কারণ জুকেরবার্গ, মাস্ক, ট্রাম্প, পুতিন, নেতানিয়াহু, মোদীদের মহাজোট প্রতিবাদকে সোশাল মিডিয়ায় আবদ্ধ করে ফেলার লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে। পরবর্তী লক্ষ্য সেখানেও প্রতিবাদী স্বর স্তব্ধ করে দেওয়া। এই জোট দেখেছে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিকল্প সংবাদমাধ্যম, ইউটিউবাররা মোদীর চারশো পার আটকাতে কী ভূমিকা নিয়েছে। তারা দেখেছে ইজরায়েলি গণহত্যার বিরুদ্ধে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কীভাবে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বাইরে গিয়ে মেহদি হাসানের মত সাংবাদিকরা ইউটিউব চ্যানেল খুলে ফেলে সাংবাদিকতা করছেন।
ভারতে এসব আটকাতে মোদী সরকার নতুন আইনের খসড়া তৈরি করে ফেলেছে, সেই খসড়া প্রকাশ করতে অস্বীকারও করেছে। কোনো সন্দেহ নেই, অদূর ভবিষ্যতে ট্রাম্পও একই পথে এগোবেন। বস্তুত তিনি হুমকি দিয়েই রেখেছেন। নতুন আইন না করলেও অবশ্য ক্ষতি নেই। এঁদের বন্ধু জুকেরবার্গ, মাস্ক, পিচাইরা যে নিজেদের প্ল্যাটফর্মে বিকল্প সংবাদমাধ্যম থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দল – সকলেরই গলা টিপে ধরবেন তা নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। এমনিতেই চুপিসারে অনেক প্রোফাইলের রীচ কমিয়ে দেওয়া হয়, কোনো কোনো পোস্ট আপনা আপনি উধাও হয়ে যায়। দলবদ্ধভাবে রিপোর্ট করে দক্ষিণপন্থীদের অপছন্দের পোস্ট মুছিয়ে দেওয়া তো এখনই জলভাত। এসব এবার বাড়বে বৈ কমবে না। রাস্তাই যে একমাত্র রাস্তা সেকথা যত বেশিদিন রাজনৈতিক বিরোধীরা ভুলে থাকবে, ততদিন গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই প্রতিবিপ্লব চলছে চলবে।
আজকাল তো ভারতের আদালতে বিচারকরাও পুলিসকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ তৈরি করার পরামর্শ দেন। আমরা বাঙালিরা আরও অসহায়। ফেসবুকে না থাকলে কাঞ্চন মল্লিকের বাবা হওয়া বা ইন্দ্রাণী হালদারের মোটা হওয়া নিয়ে আলোচনা করা হবে না।
ফেসবুককে আন্দোলনের হাতিয়ার বলে বহু মানুষ চিনেছিলেন কায়রোর তাহরীর স্কোয়ার থেকে আরম্ভ হওয়া মিশরের আন্দোলন থেকে। তাহরীর স্কোয়ারের আন্দোলনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট – দুটো আন্দোলনেই ফেসবুকের সাহায্য নিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। দুটোই ২০১১ সালের ব্যাপার। তারপর এক যুগ কেটে গেছে, হোয়াটস্যাপ আর ইনস্টাগ্রামও ফেসবুকের করতলগত হয়েছে। মানে ফেসবুক মোটা হয়েছে আর নাম বদলে মেটা হয়েছে। ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার্স ইনডেক্স বলছে মেটার মালিক মার্ক জুকেরবার্গ অ্যামাজনের মালিক জেফ বেজোসকে পিছনে ফেলে বিশ্বের দ্বিতীয় ধনীতম ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন। কিন্তু ফেসবুক আন্দোলনের হাতিয়ার – এমন কথা আজ বললে ঘোড়ায় হাসবে।
গুগল আর ফেসবুক – এই দুই প্রযুক্তি দানব নিজ নিজ ক্ষেত্রে একচেটিয়া ব্যবসা করে। দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই প্রাইভেসি লঙ্ঘন করা, মানুষের হাতের ফোন থেকে তারই অজান্তে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে। গুগল সিইও সুন্দর পিচাই আর জুকেরবার্গ – দুজনকেই আমেরিকা ও ইউরোপে আইনপ্রণেতাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। দুজনের কেউই অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ অপ্রমাণ করতে পারেননি। আপনাকে জানতে হবে অমুকটা অফ করে রাখা যায়, তমুকটা অফ করে রাখতে হয় – এই সব বলে আত্মরক্ষা করেছেন। তবে ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রাইভেসি লঙ্ঘনেই সীমাবদ্ধ নয়।
যেমন ২০২১ সালের মে মাসে ফেসবুকের প্রোডাক্ট ম্যানেজার ফ্রান্সেস হগেন পদত্যাগ করেন এবং পাতার পর পাতা আভ্যন্তরীণ নথি ফাঁস করে দেন। তা থেকে দেখা যায় যে ফেসবুক জেনেশুনে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় এমন পোস্ট চলতে দিয়েছে, ইথিওপিয়ার মত দেশে জাতিদাঙ্গায় উস্কানি দেওয়া আটকায়নি। সেবছর ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে যে দাঙ্গা করে মার্কিনী দক্ষিণপন্থীরা, তার আগে ভুয়ো তথ্য ছড়ানো আটকাতেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি ফেসবুক। হগেন বলেছিলেন যে ফেসবুকে চাকরি করার সময়ে তিনি দেখতে পান, বিশেষত আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে ফেসবুক মানুষ পাচারকারী এবং সশস্ত্র বাহিনীগুলোর অস্ত্র। ফেসবুক তা নিয়ে ভাবিতই নয়, কারণ তাদের লক্ষ্য কেবল মুনাফা করা। মানুষের যা ক্ষতি হয় হোক।
এমন অভিযোগ একা হগেনই করেননি, সারা বিশ্বে ফেসবুকের কার্যকলাপ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। ভারতেও পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা, সিরিল স্যামরা লেখালিখি করেছেন। ওঁদের লেখার অনুবাদ বাংলা ভাষায় সাংবাদিক অর্ক দেবের সম্পাদনায় ‘ফেসবুক: মুখ ও মুখোশ’ নামে বইতে প্রকাশিতও হয়েছে। বিজেপি, তৃণমূল সমেত ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে নির্বাচনের সময়ে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিতে বিপুল টাকা খরচ করে তাও প্রকাশিত তথ্য। তা বাদে বেনামি প্রোফাইল খুলে অন্য দলের নেতা-সদস্য-সমর্থকদের হয়রানি, হুমকি; ইদানীং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তাদের নামে প্রোফাইল বানিয়ে পোস্ট করা – এসব তো আছেই। ফেসবুক গোড়ার দিকে বাকস্বাধীনতার যুক্তি দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। হগেনের মত হুইসল ব্লোয়ার এবং বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের চাপে সাম্প্রতিককালে আরেক জনপ্রিয় সোশাল মিডিয়া টুইটারের (অধুনা এক্স) মতই কোনো পোস্টে হিংসা সম্পর্কে সতর্কবাণী দেওয়া, কোনো পোস্টে ভুয়ো হতে পারে বলে নোট দেওয়া – এসব চালু করেছে। কিন্তু অনেকসময় দেখা যায় অ্যালগোরিদম এমনভাবে সাজানো যে প্রতিবাদকে বিপজ্জনক বলে দাগানো হয় বা মুছে দেওয়া হয়, অন্যায়কে তোল্লাই দেওয়া হয়।
ফেসবুক এভাবেই চলে, এভাবেই চলবে। কারণ এটা বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, আর ব্যবসায়ী কখনো বিপ্লবী হয় না। সে সর্বত্রই সংখ্যাগুরুর, ক্ষমতাসীনের পক্ষে। নরেন্দ্র মোদী কী পরম স্নেহে জুকেরবার্গকে ‘মার্ক’ বলে ডাকেন তা কি আমরা দেখিনি? নাকি ভারতে ফেসবুক যাঁরা চালান তাঁদের সঙ্গে বিজেপির সখ্যের কাহিনি আমাদের চোখে পড়েনি? ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যম তো বটেই, বিশ্ববিখ্যাত ‘টাইম’ ম্যাগাজিন পর্যন্ত ভারতে ফেসবুক কীভাবে হিন্দুত্ববাদী ঘৃণা ভাষণকে প্রশ্রয় দেয় তা নিয়ে ২০২০ সালে দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তথ্যের খাতিরে বলা প্রয়োজন – এই সমস্ত অভিযোগই টুইটারের বিরুদ্ধেও আছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্যাঙাত ইলন মাস্ক মালিক হওয়ার পর অভিযোগের সংখ্যা আরও বেড়েছে।
এত কিছু সত্ত্বেও বাঙালির ফেসবুকের প্রতি অচলা ভক্তি যায়নি। বাঙালি মাত্রেই কবি এবং কবি মাত্রেই ফেসবুকে লেখেন। নামকরা কবিরা আবার ট্রেন্ডিং বিষয় নিয়ে ফেসবুকে কবিতা লেখেন। আজ অমুকের জন্মদিন, কাল তমুকের মৃত্যুদিন, পরশু অমুক নারকীয় ঘটনা ঘটেছে, তরশু অমুক অলিম্পিকে পদক জিতেছে – বাঙালির প্রিয় কবি সঙ্গে সঙ্গে লেখেন। সম্প্রতি আবার কপিল শর্মার কমেডি শোতে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে হাসাহাসি করা হয়েছে বলে আহত হয়ে পোস্ট দিয়েছেন, আইনি ব্যবস্থার নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। মাঝেমাঝে ভয় হয়, ফেসবুক না থাকলে বাঙালির কবিতা লেখাই বোধহয় বন্ধ হয়ে যাবে।
শুধু সাহিত্যচর্চা করলেও কথা ছিল, বাঙালি এখনো আন্দোলনের ডাক দেয় ফেসবুকে। মানুষ তাতে সাড়া দেন এবং দলীয়, অদলীয় সব ধরনের আন্দোলনকারীরই ধারণা হয়েছে যে ফেসবুকে ডাক না দিলে সাড়া পাওয়া যাবে না। তাই রাত দখল, ভোর দখল, দুপুর দখল, রাস্তা দখল – সব ডাকই ফেসবুকেই দেওয়া হয়। এর দাপটে ভোটের সময়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করাও পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীরা কমিয়ে ফেলেছেন। বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে প্রার্থী যাবেন, ফেসবুক লাইভ হবে, তাতে কয়েক লক্ষ লাইক পড়বে। সেই লাইক গুনে বিরোধীরা ভাববেন অমুক কেন্দ্রে আমরা জিতছিই, তমুক কেন্দ্রে দারুণ লড়ব, তারপর ফল বেরোলে দেখা যাবে ভাঁড়ে মা ভবানী, কারণ আপামর মানুষের সঙ্গে কোনো যোগ স্থাপনই হয়নি – এটাই পশ্চিমবঙ্গের নিয়ম হয়ে গেছে। ফলে রাজ্যটা প্রায় একদলীয় শাসনে পরিণত হয়েছে। অদলীয় এবং দলীয় রাজনীতিবিদরা খেয়াল করেন না যে সারা পৃথিবীতে ফেসবুক (ব্যাপকার্থে সোশাল মিডিয়া) এই কাণ্ডটাই ঘটিয়েছে। ফলে দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকে অপরাজেয় মনে হচ্ছে। ট্রাম্প, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, মোদী, মমতা – সকলেই যে এই ফেসবুক সর্বস্বতায় লাভবান হচ্ছেন তা কিন্তু অন্যত্র অনেকে বুঝে ফেলেছেন। ফলে ২০২১ সালে হগেন মুখ খোলার পর বিশ্বজুড়ে ফেসবুক ছেড়েছেন অনেক মানুষ। ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ আস্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ফেসবুক ছাড়লে আর কী কী সোশাল মিডিয়া বিকল্প আছে তা নিয়ে। অনেকেই ফেসবুক, টুইটার ছেড়ে বা এগুলোতে সময় খরচ কমিয়ে ফেডিভার্সে চলে গেছেন। সেটা কী? নিজে খুঁজে দেখুন।
ফেসবুক বিশ্বজোড়া এমন ফাঁদ পেতেছে যে বেরনো শক্ত। নিজেদের ওয়েবসাইট চালাতে গিয়ে দেখেছি, ফেডিভার্সে আমাদের লেখা শেয়ার করে লাভ হয় না। কারণ বাঙালি পাঠক কিছুতেই সেখানে যেতে চান না। মেসেজিংয়ের বেলাতেও একই সমস্যা। বাঙালি, অবাঙালি কোনো পরিচিতকেই টেলিগ্রাম বা সিগনাল ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা যায় না। আজকাল তো ভারতের আদালতে বিচারকরাও পুলিসকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ তৈরি করার পরামর্শ দেন। আমরা বাঙালিরা আরও অসহায়। ফেসবুকে না থাকলে কাঞ্চন মল্লিকের বাবা হওয়া বা ইন্দ্রাণী হালদারের মোটা হওয়া নিয়ে আলোচনা করা হবে না। চণ্ডীমণ্ডপ নেই বলে পরনিন্দা পরচর্চা করব না?