পুরস্কার কতখানি দামি?

রুষ্ট কেন্দ্রীয় সরকার এবং সরকারি দলের নেতা, মন্ত্রী, কর্মী, সমর্থক এবং পেটোয়া মিডিয়া এঁদের ‘অ্যাওয়ার্ড ওয়াপসি গ্যাং’ আখ্যা দিয়েছিল। সেই গ্যাংয়ে মন্দাক্রান্তা সেন বাদে কোনো বাঙালি নাম কি ছিল?

হলিউডের কোনো শ্রীজাত আছেন কিনা জানি না, যিনি বিধ্বংসী দাবানলের পর আসন্ন অস্কার পুরস্কার প্রদানের অনুষ্ঠান সম্পর্কে এরকম কিছু লিখবেন

এর পরেও টক শো আর কথা
এর পরেও কবিতা উৎসব
এর পরেও বিশ্বাস, প্রণতি
এর পরেও ঘুম আসবে চোখে
এর পরেও বাকি আছে ক্ষতি
এর পরেও ভোট দেবে লোকে।

হে পাঠক, আপনি বলতেই পারেন, ‘এ কী অশিক্ষিত রে বাবা! হলিউড একটা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। তার আবার কবি থাকতে যাবে কেন? তাছাড়া শ্রীজাত কি টলিউডের লোক নাকি?’ আরও বলতে পারেন ‘কিসের সঙ্গে কিসের তুলনা! শ্রীজাত কবিতাটা লিখেছিলেন একটা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে কিছু মানুষের প্রাণ যাওয়ার পরে। ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানলে জনা পঁচিশেক মানুষের প্রাণ গেছে আর বহু মানুষের বাড়িঘর পুড়ে গেছে তো প্রকৃতির রোষে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে কোন পাগলে কবিতা লেখে?’ তা সবিনয়ে কয়েকটি কথা নিবেদন করি।

কবির সঙ্গে ফিলিমের একেবারে সম্পর্ক নেই এমনটা বলা কি উচিত হবে? আমরা তো অনেকসময় সিনেমা দেখে মুগ্ধ হয়ে বলে ফেলি ‘আহা! কবিতার মত’। অবশ্য সিনেমাবোদ্ধারা বলতে পারেন ওটা কতিপয় অশিক্ষিত দর্শকের কাজ, কিন্তু আব্বাস কিয়ারোস্তামির মত লোককে নিয়ে কী করা হবে তাহলে? তিনি তো সিনেমাও বানিয়েছেন আবার কবিতাও লিখেছেন। সুদূর ইরানে যাওয়ারও দরকার নেই। বাংলাতেই প্রেমেন্দ্র মিত্র আর পূর্ণেন্দু পত্রী দুটো কাজই করেছেন। স্বয়ং শ্রীজাত সিনেমা বানিয়ে ফেলেছেন। সিনেমার গান তো তিনি বহুকাল ধরেই লিখছেন। সুতরাং তাঁকে টলিউডের লোক বললে কি বিষ্যুদবারে আমিষ ভক্ষণের চেয়ে বেশি পাপ হবে? তবে দ্বিতীয় প্রশ্নটি উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সঙ্গে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কিসের তুলনা? এর উত্তর কিঞ্চিৎ বিস্তারে দেওয়া দরকার।

হলিউডে দাবানল ছড়াল কেন? আগুন জ্বলেই চলেছে দিনের পর দিন, থামানো যাচ্ছে না কেন? হলিউড সেই কবে থেকে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে – এই নিয়ে ছবি বানিয়ে চলেছে। সেসব ছবির মধ্যে যেমন আমেরিকাকে রক্ষাকর্তা হিসাবে দেখানো ছবি তৈরি হয়েছে, তেমন সারা পৃথিবীর সর্বনাশ হবে, কেবল কিছু মানুষ আগে থেকে সতর্ক হওয়ায় বা কিছু বিশেষ সুযোগ পাওয়ায় বেঁচে যাবে – এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেও ছবি তৈরি হয়েছে। যেমন দ্য ডে আফটার টুমরো (২০০৪) বা ২০১২ (২০০৯)। কিন্তু ধ্বংসের কারণ হিসাবে ভিনগ্রহের জীবের আক্রমণ (ওয়ার অফ দ্য ওয়ার্ল্ডস, ২০০৫) থেকে শুরু করে ভূমিকম্প, পরিবেশ ধ্বংস (ওয়াল-ই, ২০০৮) পর্যন্ত অনেককিছু দেখানো হলেও রাষ্ট্রশক্তির সচেতন মূঢ়তা আর অতিধনীদের লোভের দায় খুব বেশি জায়গায় দেখানো হয়নি। গত এক দশকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে মার্কিন দেশে অতি দক্ষিণপন্থার উত্থান তথা জলবায়ু পরিবর্তনকে অস্বীকার করার প্রবণতার কারণে হয়ত সেই ধারায় পরিবর্তন আসছে। রাষ্ট্র আর অতিধনীদের এই আঁতাতকে একেবারে ল্যাংটো করে দিয়েছে (আক্ষরিক অর্থে) ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি ডোন্ট লুক আপ।

সেই ছবিতে দুই মহাকাশবিজ্ঞানী (অভিনয়ে লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও আর জেনিফার লরেন্স) আবিষ্কার করে ফেলেন এক বিশাল ধূমকেতুকে, যা সোজা পৃথিবীর দিকে ধাবমান এবং এসে পড়লে এক মুহূর্তে গোটা গ্রহটা ধ্বংস হয়ে যাবে। অথচ তাঁদের কথায় কেউ পাত্তা দেয় না, এমনকি মার্কিন রাষ্ট্রপতিও (অভিনয়ে মেরিল স্ট্রিপ) স্রেফ চেপে যেতে বলেন। সংবাদমাধ্যম, সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, রাষ্ট্রশক্তি, বিখ্যাত ব্যক্তিরা – সকলে মিলে অনিবার্য ধ্বংসের সাবধানবাণী অস্বীকার করেন এবং সাধারণ মানুষকে উল্টো বোঝাতে প্রচার করেন ‘উপরদিকে তাকাবেন না।’ বুঝতে অসুবিধা হয় না যে পরিচালক অ্যাডাম ম্যাক্কে দেখাচ্ছেন ধূমকেতু, কিন্তু বোঝাচ্ছেন জলবায়ু পরিবর্তন। এই ধরনের অন্যান্য হলিউড ছবির সঙ্গে এই ছবির বড় তফাত হল, কয়েকজনের বেঁচে যাওয়া বা শেষ মুহূর্তে কোনো নাটকীয় ঘটনায় গোটা পৃথিবীর রক্ষা পাওয়া দেখানো হয়নি। এমনকি অ্যানিমেশন ছবি ওয়াল-ই-র মত পৃথিবীতে জীবনের প্রত্যাবর্তন দেখানোর মত কোনো আশার দৃশ্য দিয়েও ছবিটা শেষ হয় না। ওই ছবি বিশ্বজুড়ে অতিমারী চলাকালীন সামান্য কিছু হলে এবং তার দুই সপ্তাহের মধ্যে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায়। বহু মানুষ দেখেন, কিন্তু ব্যাপক সমালোচনা হয়। হাস্যকর, বাড়াবাড়ি করা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা করা হয়েছে – এইসব অভিযোগ তোলেন সমালোচকরা।

ক্যালিফোর্নিয়ার যে দাবানলে লস এঞ্জেলস পুড়ে গেল, হলিউডের মেগা তারকাদের ঘরদোর ছাই হয়ে গেল; সেই দাবানলের পিছনে কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় উঠে যাওয়া এবং বনাঞ্চল একেবারে শুকনো হয়ে থাকা প্রবলভাবে দায়ী। আর আগুন নেভাতে যে পর্যাপ্ত জল পাওয়া গেল না, তার দায় প্রায় শতকরা একশো ভাগ অতিধনীদের। ক্যালিফোর্নিয়ার মোট জলের সিংহভাগ এক কোটিপতি দম্পতির দখলে। এই কারণেই সরকারি দমকল যখন জলের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরেছে তখন বেসরকারি দমকল গ্যালন গ্যালন জল ব্যবহার করতে পেরেছে।

অথচ এসব কথা স্বীকার করতে ওদেশে এখনো অনেকেই রাজি নয়। ম্যাক্কের ছবির রাষ্ট্রপতির মতই সত্যিকারের রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পও দোষ চাপাচ্ছেন ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নরের ঘাড়ে। সেটা করতে গিয়ে ট্রাম্প যা বলেছেন তা যে একেবারে বানানো কথা, তা ইতিমধ্যেই প্রমাণ হয়ে গেছে

হলিউডের তারকারা তাও নিজেদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন, কারণ তাঁদের মহার্ঘ বিমা আছে। সেসব বিমা কোম্পানি অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের গরজে বেসরকারি দমকল ডেকে নিয়ে এসেছিল। যাঁদের সম্পত্তি তাতেও বাঁচেনি তাঁরাও বিমা কোম্পানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পেয়ে যাবেন। কিন্তু সাধারণ নাগরিকদের অবস্থা সঙ্গীন। কারণ এই দাবানলের মাত্র কয়েকমাস আগে বেশকিছু বিমা কোম্পানি বিশেষত প্যাসিফিক প্যালিসেডস, অ্যাল্টাডেনার মত অগ্নিকাণ্ডপ্রবণ এলাকাগুলোতে কয়েক হাজার বাড়ি, দোকানপাটের বিমা বাতিল করে দিয়েছিল। কেন? আসলে ২০১৭-১৮ সালে এইসব এলাকায় যে দাবানল হয় তাতে কোম্পানিগুলোকে অনেক টাকা বহু মানুষকে ক্ষতিপূরণ বাবদ দিতে হয়েছিল। অমন করলে কি আর ব্যবসা চলে? বিমা ব্যবসায় তো ক্ষতিপূরণ না দেওয়াই হল ব্যবসা। তাই বেশকিছু কোম্পানি ক্যালিফোর্নিয়া প্রদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে কেটে পড়ে। কিছু কোম্পানি আবার এই শর্তে থাকতে রাজি হয়েছিল যে প্রাদেশিক সরকার তাদের আরও বেশি প্রিমিয়াম আদায় করতে দেবে। এবারের দাবানলের পরে তারাও কেটে পড়তে পারে।

সুতরাং গোল্ডেন গ্লোব, গ্র্যামি, অস্কার ইত্যাদি পুরস্কারের এই মরশুমে হলিউড ও সংলগ্ন এলাকায় এই যে ধ্বংস দেখা যাচ্ছে তার জন্যে মানুষের দায় প্রকৃতির চেয়ে কম নয়। ফলে শ্রীজাতর মত কবিতা যদি কেউ লিখেই ফেলেন, মন্দ হবে না। বস্তুত এবারের অস্কার পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান হওয়া উচিত কিনা তা নিয়ে মৃদুমন্দ বিতর্ক আরম্ভও হয়ে গেছে। সোশাল মিডিয়ায় অনেক শিল্পী বলতে শুরু করেছেন, বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান করার চেয়ে সেই টাকা ত্রাণে কাজে লাগানো উচিত বা দমকলকর্মীদের জন্যে কিছু করা উচিত। শিল্পীদের কাছেও এই বিপর্যয়ের মধ্যে অস্কার পুরস্কার আর তত দামি নেই – এমন সন্দেহ দেখা দিয়েছে। অস্কারের মনোনয়ন তালিকায় আছেন ইসাবেলা রোসেলিনি। তিনি ইনস্টাগ্রামে একখানা পোড়া অস্কার স্ট্যাচেটের ছবি পোস্ট করেছেন দিন পাঁচেক আগে, লিখেছেন ছবিটা তাঁর ভাইয়ের পাঠানো। লস এঞ্জেলস আর হলিউডের কথা ভাবতে গেলে তাঁর কেবল চোখে জল আসছে। পরে অবশ্য জানা গেছে ছবিটা ভুয়ো। কিন্তু এই মুহূর্তে শিল্পীদের কাছে অস্কারের দাম কতটুকু, তা ইসাবেলের পোস্ট থেকে সম্ভবত কিছুটা আন্দাজ করা যায়।

এইসব জানার পরে কিছু হিং টিং ছট প্রশ্ন মাথার মধ্যে কামড়াচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী, সাহিত্যিকরা কি কোনো ঘটনার ভিত্তিতেই পুরস্কার সম্পর্কে এত নিস্পৃহ হতে পারবেন? আমাদের জন্মের বহু আগে শিশিরকুমার ভাদুড়ি কেন্দ্রীয় সরকারের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু আমাদের জীবনে কতজনকেই বা পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করতে বা বাকি ভারতের শিল্পী, সাহিত্যিকদের মত পুরস্কার ফিরিয়ে দিতে দেখেছি? অথচ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় তো কম পড়েনি আমাদের। ২০১৫ সালে কন্নড় সাহিত্যিক এম এম কলবুর্গীর হত্যার পর হিন্দি ভাষার আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক উদয় প্রকাশ তাঁর পুরস্কার ফিরিয়ে দেন। পরপর কলবুর্গী, গোবিন্দ পানসারে, নরেন্দ্র দাভোলকরদের হত্যা এবং সেসব নিয়ে আকাদেমির নীরবতার প্রতিবাদে বিভিন্ন ভাষার জনা চল্লিশেক লেখক নিজেদের পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন সেইসময়। রুষ্ট কেন্দ্রীয় সরকার এবং সরকারি দলের নেতা, মন্ত্রী, কর্মী, সমর্থক এবং পেটোয়া মিডিয়া এঁদের ‘অ্যাওয়ার্ড ওয়াপসি গ্যাং’ আখ্যা দিয়েছিল। সেই গ্যাংয়ে মন্দাক্রান্তা সেন বাদে কোনো বাঙালি নাম কি ছিল? অবশ্য কেউ বলতেই পারেন, ‘খেটেখুটে পুরস্কার পেয়েছি। ফেরাতে যাব কেন ভাই?’ বললে অন্যায় হবে না। পুরস্কারের দাম সত্যিই সকলের কাছে এক নয়। কার কাছে কোনটা দাবানল তা ঠিক করতে পারেন কেবল তিনি নিজে। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি নতুন পুরস্কার তৈরি করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে সাহিত্যিক হিসাবে পুরস্কৃত করেছে বলে যেমন নিজের পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন রত্না রাশিদ ব্যানার্জি। ওঁর কাছে ওটাই পুরস্কার ছুড়ে ফেলে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট।

আরো পড়ুন আকাদেমি সমাচার: সাহিত্য পুরস্কার যার যার, তিরস্কার সবার

কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে নিজের কাজের চেয়েও, সেই কাজ উদ্দিষ্ট দর্শক বা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেয়েও, পুরস্কার বা স্বীকৃতি পাওয়ার ব্যগ্রতা কি বেশি? এ প্রশ্নও কামড়ায়। নইলে ঋতুপর্ণ ঘোষ বাড়িওয়ালি ছবিতে কিরণ খেরের গলা যে রীতা কয়রাল ডাব করেছিলেন তা কী করে ভুলে গেলেন জাতীয় পুরস্কারের গন্ধে? কেনই বা এখনকার ‘জনপ্রিয় সাহিত্য লিখি না’ বলে জাঁক করা রাজ্য সরকারের ঘোষিত বিরোধী সাহিত্যিকরাও শীত এসে পড়লেই সরকারি অনুষ্ঠানে ডাক পাওয়ার চিঠি পোস্ট করেন ফেসবুকে?

নাঃ, আর প্রশ্ন তুলে কাজ নেই। আমেরিকার দাবানল আমেরিকাতেই থাক।

প্রতর্ক ব্লগে প্রকাশিত

তালিবান শাসন: ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

এ দেশের শাসকরা তালিবান নন। কারণ তাঁরা অনেকেই গড়গড়িয়ে ইংরেজি বলতে পারেন। উচ্চশিক্ষিত বলেই পাঠ্যের দিকে সজাগ দৃষ্টি।

খুব আতঙ্কে কাটছে আমাদের। পাশেই আফগানিস্তানে তালিবান ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। ভীষণদর্শন বন্দুকধারীদের ছবি, মানুষের প্রাণপণ পালানোর ছবি আমরা টিভি, খবরের কাগজ অথবা সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে দেখছি। আফগান মানেই বর্বর, অথবা মুসলমানরা ওরকমই হয় — এরকম ভাবনার লোকেরা একরকম শান্তি পাচ্ছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা’ মনে পড়লে অশান্তি দ্বিগুণ। আফগানিস্তানের মানুষ, বিশেষ করে মহিলাদের কথা ভেবে ঘুম উড়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কেবল ‘কাবুলিওয়ালা’ লেখেননি। লিখেছিলেন “বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে/ বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে/ দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা/ দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।/ দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের উপরে/ একটি শিশির বিন্দু।” এই লাইনগুলো স্মরণ থাকলে আতঙ্কিত হওয়ার জন্য আফগানিস্তান দেখার প্রয়োজন নেই। তালিবান যা যা করে থাকে তার প্রায় কোনোটাই এ দেশে ঘটতে বাকি নেই।

তারা যখন নব্বইয়ের দশকে প্রথম ক্ষমতায় আসে, তখন থেকেই এ কথা বলে অনেকে প্রবল নিন্দার মুখে পড়েছেন। বামিয়ানের বুদ্ধ মূর্তি ভেঙে ফেলা গর্হিত কাজ, কিন্তু বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা ঐতিহাসিক অন্যায়ের প্রতিকার — এমন ব্যাখ্যাই চিৎকৃত প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কারণ তালিবান কাজটা করেছিল ক্ষমতায় এসে, বাবরি ভেঙেছিল ‘স্বতঃস্ফূর্ত জনতা’। এখন সেই স্বতঃস্ফূর্ত জনতাই দেশের ভাগ্যনিয়ন্তা। নেশন কী চায় তারাই জানে। সেই চাহিদা অনুযায়ী এডিট করা ভিডিও ক্লিপ জুগিয়ে দেয় ক্ষমতাসীন দলের আই টি সেল, পুলিস তার ভিত্তিতেই সত্য মিথ্যা যাচাই না করে মানুষকে হাজতে পুরে দেয়, সে পচতে থাকে ইউএপিএ আইনে। শরিয়তি আইনের অবিচার এর চেয়ে আর কত বেশি?

তবু এ দেশের শাসকরা তালিবান নন। কারণ তাঁরা অনেকেই গড়গড়িয়ে ইংরেজি বলতে পারেন। উচ্চশিক্ষিত বলেই পাঠ্যের দিকে সজাগ দৃষ্টি। তাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নিয়ে মহাশ্বেতা দেবীর গল্প বাতিল করেন, দলিত লেখক বামা এবং সুখরথারিনিও বাতিল হন। এঁরা গান নিষিদ্ধ করে লোকসঙ্গীত গায়ককে হত্যা করেন না, অপছন্দের লেখা সরিয়ে দেন। সে কালের জার্মানির মত বই পোড়ানোও শুরু হয়ে গেছে। আমেদাবাদের বইয়ের দোকানে ঢুকে বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’ পুড়িয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে, আবার এসব বই পাওয়া গেলে দোকানই জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। আফগানিস্তানে তালিবরা যেটাকে ইসলাম বলে সেটাই ইসলাম। ভারতেও এখন সঙ্ঘ যাকে হিন্দুধর্ম বলে সেটাই হিন্দুধর্ম। তাই বাৎস্যায়নও হিন্দু সংস্কৃতি বিরুদ্ধ।

আরও পড়ুন সাহিত্য ও সাংবাদিকতা অপ্রিয় সত্য ছাড়া বৃথা

তালিবান নেতারা সগর্বে বলে, মেয়েদের কাজকর্ম, লেখাপড়া করতে হলে ইসলামের নির্দেশ মেনে বোরখা পরে বাইরে বেরোতে হবে। ইসলামে ঠিক কী বলা আছে তা তর্কসাপেক্ষ, কিন্তু তালিবানি শাসনে তাদের মুখের কথাই আইন। এ দেশে এখনো ১৯৫০ সালের সংবিধান চালু আছে বটে, কিন্তু মহিলাদের জীবনসঙ্গী নির্বাচন, জামাকাপড়ের মাপ, মোবাইল ফোন ব্যবহার, এমনকি চাউমিন খাওয়ার অভ্যাসেও যে সংস্কৃতির বারোটা বাজছে — তা বহুবার পরিষ্কার করে দিয়েছে সঙ্ঘ পরিবার। স্বয়ং মোহন ভাগবত প্রকাশ্যেই বলে থাকেন, মেয়েদের কাজ ঘর সামলানো। উত্তরপ্রদেশের দাসনার মন্দিরের মহন্ত যতি নরসিংহানন্দের ছাপার অযোগ্য ভাইরাল বিষোদ্গারে মহিলাদের সম্পর্কে ভাবনায় তালিবান-সঙ্ঘ ঐকমত্য পরিষ্কার। এখন বিজেপি এই ঘোর মুসলমান বিদ্বেষী লোকটিকে জিহাদি আখ্যা দিচ্ছে, কিন্তু তিনি দীর্ঘদিন ধরে কপিল মিশ্রর মত গুরুত্বপূর্ণ নেতার ঘনিষ্ঠ।

আর হত্যা? গোবিন্দ পানসারে, নরেন্দ্র দাভোলকর, গৌরী লঙ্কেশদের কথা আমাদের মনে নেই। আরও অদরকারি আখলাক আহমেদ, পেহলু খানের মত অসংখ্য গণপিটুনির শিকারদের স্মৃতি। কারণ তাঁরা গরুর অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত। গত পরশু এলাহাবাদ হাইকোর্টের এক বিচারপতি তো বলেই দিয়েছেন, গরুকে জাতীয় পশু ঘোষণা করে তার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আইন দরকার। গরুর কল্যাণ হলেই দেশের কল্যাণ হবে।

আশা করা যায় তালিবান সরকার শুয়োরের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার আগেই ভারত সরকার বিচারপতির স্বপ্ন সত্যি করবেন।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত