দেবতোষ দাশ থ্রিলার লেখেন (থ্রিলার লেখেন! ছিঃ!)। দেবতোষ দাশ জনপ্রিয় লেখক (এ মা! জনপ্রিয়!)।
এত বড় বড় অভিযোগ আজকাল পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষার খুব কম লেখক সম্পর্কেই করা যায়। দুটো অভিযোগই প্রমাণিত। তা সত্ত্বেও দেবতোষ দাশ কোনো এক প্রণোদনায় ছোটগল্পও লেখেন, যার পাঠক দিনদিন কমছে। ফেসবুকের বিভিন্ন গল্প লেখার গ্রুপে কমছে না, কিন্তু বইয়ের পাঠকদের মধ্যে কমছে। তা কি ফেসবুক গ্রুপের মত বইতে নিজেও লিখে লাইক পাওয়া যায় না বলে, নাকি বইয়ের গল্প মোবাইলে পড়ার সুবিধা নেই বলে? নাকি সত্যিই এমন গল্প পর্যাপ্ত পরিমাণে লেখা হচ্ছে না এই বাংলায়, যা পাঠককে টানে? পাঠককে কোন লেখা টানে, কেন টানে – এসবও গুরুতর প্রশ্ন বটে। এত প্রশ্নের সম্মুখীন সাহিত্যের এক ধারায় দেবতোষবাবু সাঁতরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একটি কাঁঠাল ও পাকিস্তানের গল্প নামক তাঁর দ্বিতীয় গল্প সংকলন ধরে।
নামের মতই এই বইয়ের অধিকাংশ গল্পও কৌতূহলোদ্দীপক। লেখক যেমন বাংলা গল্পে সচরাচর অপরিচিত বিষয় নিয়ে লিখেছেন, তেমন পরিচিত পরিবেশ, পরিস্থিতিকেও এমন এক চোখ দিয়ে দেখেছেন যা গল্পে নতুনত্ব আনে। তিব্বতে চীন রাষ্ট্রের হানাদারি নিয়ে বাংলায় কি নিয়মিত লেখা হয়? গল্প উপন্যাস দূরের কথা, প্রতিবেদনই বা কটা লেখা হয়? হয় না যে, তাতে হয়ত লেখকদের অধ্যয়ন আর কল্পনাশক্তির অভাবের পাশাপাশি এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারত-চীনের সম্পর্কেরও ভূমিকা আছে। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী রাজনীতির যেসব ধারা বহমান, সেগুলোর সঙ্গে বাংলা ভাষার লেখকদের বিভিন্ন সময়ের ঘনিষ্ঠতা এবং তজ্জনিত গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতি পক্ষপাতও সম্ভবত খানিকটা দায়ী। যাঁরা দেবতোষবাবুর অন্য লেখার সঙ্গে পরিচিত, তাঁরা কিন্তু জানেন যে তিব্বতের রাজনীতি এই লেখকের প্রিয় বিষয়। এই সংকলনের ‘দখল’ গল্পেও সেই হানাদারির কাহিনি রয়েছে।
অফিসারের প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে সে একটা বাক্যই বলেছিল – কীসের পারমিট, এই দেশ তো আমার!
গল্পের এই শেষ বাক্য যে বাস্তবের সামনে পাঠককে দাঁড় করায়, তাতে তিব্বতের মানুষের সঙ্গে তফাতের চেয়ে মিলের দিকটাই বেশি প্রকট হয়। সেই মিল হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার মত হয়ে ওঠে সংকলনের শেষ গল্পে, যার নাম ‘এনআরসি ও আমাদের অভিজ্ঞানপত্র’। পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা বাঙাল বৃদ্ধ সুনীল ফোনে খবর পান – তাঁর আসামের অধিবাসী দিদির নাম ওঠেনি এনআরসিতে। তা নিয়ে তাঁর নিরাপত্তাহীনতা, দুশ্চিন্তা এই গল্পের কেন্দ্রে। মানুষকে রাষ্ট্রের কাছে অনবরত প্রমাণ করে যেতে হবে তার অস্তিত্বের বৈধতা, মানুষের তৈরি রাষ্ট্র মানুষকেই অবৈধ ঘোষণা করবে – বিশ্বজুড়ে অতিমারী হয়ে উঠেছে এই ব্যবস্থা। তার শিকার যেমন নামহীন তিব্বতি যুবক, তেমনই ৬০-৭০ বছর আগে পূর্ববাংলা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিমে চলে আসা বাঙালি বৃদ্ধ। লেখক তিব্বতি যুবকের জন্যে কোনো উপশম রাখেননি। তবে সুনীলের জন্য, কাল্পনিক হলেও, এক স্বস্তির পরিসর তৈরি করে দিয়েছেন।
‘দিদি, তর নাম নাই রেজিস্টারে আর আমিও ছিঁড়ি উড়াই দিসি কাগজ! আমরা আর হিন্দুস্তানের না, দিদি চল চলি যাই ফেনী। আমগো ফেনী। মধুপুর! নিব না আমগোরে? নিব না? নিব না?’
স্বামীর বিড়বিড়ানি শুনে এগিয়ে আসেন মণিমালা। হাত রাখেন পিঠে।
হালকা হয়ে যান সুনীল। মাধ্যাকর্ষণটুকু যেন এখন অগ্রাহ্য করতে পারছেন। সীমানাও তিনি পেরিয়ে যেতে পারছেন সহজেই।
এই বিপন্নতাকে লেখক একেবারে নতুন প্রকরণে পেশ করেছেন ‘কাগজ’ গল্পে। সাংবাদিক আইরিন যা লিখতে চায় তা লিখতে দেওয়া হচ্ছে না। কারণ তা ‘পলিসির বিরুদ্ধে’। সেই চাকরি থেকে বেরিয়ে এসে যখন স্বাধীন সাংবাদিক হয়ে গেল সে, তখন
অফিস থেকে বেরিয়েই টের পেল স্বস্তি, যা পা থেকে মাথা পর্যন্ত পিলপিল করে উঠে আসছে।
কিন্তু অচিরেই
ইনডিপেন্ডেন্ট প্রেস বলে যে কিছু হয় না, কিছুদিন একা-একা কাজ করেই বুঝে গেল। আবার হয় না বললেও ভুল বলা হয়, হয়, একটু কায়দা করে প্রকাশ করলেই যা-বলার ইচ্ছে, বলা যায়। আর্ট অব ডাইভারশন।
কীভাবে এই ‘আর্ট অব ডাইভারশন’ ব্যবহার করে যা বলতে চায় তা বলে আইরিন – সেটাই গল্প। কিন্তু লেখক সে গল্প বলতে যেমন চলে গেছেন ‘আর্ট অব ডাইভারশন’-এর ইতিহাসে, তেমন ব্যবহার করেছেন চিত্রনাট্যের স্টোরি বোর্ডও। এভাবে গল্পের প্রকরণ বাদ দিয়ে একেবারে অন্য প্রকরণে গল্প লেখা যে সহজ নয় তা যাঁরা চেষ্টা করেছেন তাঁরা জানেন। যাঁরা কারদানি দেখানোর জন্য করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন, তাঁরা হয়ত আরও বেশি জানেন। কিন্তু সে তো গেল লেখকদের কথা। পাঠককে এই নিরীক্ষার সামনে এসে থমকে দাঁড়াতেই হবে। সাহিত্য পড়া মানে যে এমন এক অভিজ্ঞতা যা পাঠককেও বদলে দেয়, তা টের পাওয়া যাবে। কারণ এই অভিজ্ঞতা নতুন।
আরও পড়ুন অবসাদের গল্প: বিপন্ন বিস্ময়ের গল্পকার গৌতম
লক্ষণীয় যে এই সংকলনের যে গল্পগুলো ছুঁয়ে যায়, ভাবায় – তার প্রত্যেকটাই নানাবিধ বিপন্নতার গল্প। যেগুলো তেমন ছাপ ফেলে না, সেগুলোতে বরং লেখক কিছু নিস্তরঙ্গ জীবনের আখ্যান পেশ করেছেন। সেসব গল্পের যে সংকট, সেগুলো হয় চরিত্রদের একান্ত ব্যক্তিগত অথবা আরোপিত। ‘শান’, ‘জন্মদিনের সেলফি’ বা ‘রি-ইউনিয়ন’ সেই ধরনের গল্প। বই বন্ধ করা মাত্রই ওই গল্পগুলো সম্ভবত বিস্মৃত হবেন পাঠক। কিন্তু ভোলা যাবে না ‘ম্যানিকিনের শরীর’-এর অটোচালক নন্দকে, যার উপলব্ধিতে ‘ম্যানিকিন হলেও, বলাৎকার তো বলাৎকারই!’ সংবেদনহীন সমাজ, সংবাদমাধ্যম এবং সোশাল মিডিয়ার যুগে একজন বোকা নন্দ যে যুগপৎ অমূল্য এবং মূল্যহীন – তা লেখক উন্মোচন করেছেন পরতে পরতে
দেয়ালে দেয়ালে ঘুঁটের মতো আছড়ে পড়ে জনতার বিভিন্ন বয়ান।…
রাত আটটার টক-শোয়ে, উজ্জ্বল আলো ও ক্যামেরার সামনে এনে বসানো হয় নন্দকে। সেই অনুষ্ঠানে হাজির আরও একজন। এক ম্যানিকিন। নগ্নিকা। নন্দকে হতবাক করে, সঞ্চালক তাকে অভিনয় করে দেখাতে বলেন, কীভাবে সে ম্যানিকিনের সম্মান বাঁচাতে চেষ্টা করেছিল। তিনি নন্দ’র দিকে এগিয়ে দেন নগ্ন ম্যানিকিনের শরীর।…
‘শেষ ট্রেনের আলো’ বা ‘অনলাইন অফলাইন’-এর মত আপাত নিরীহ এবং ‘এরকম আগেও পড়েছি’ মনে হওয়া গল্পেও মানুষের বিপন্নতার আখ্যান বলতে ছাড়েননি লেখক। এমনকি এই সংকলনের সবচেয়ে পেলব যে গল্প, যার নামে বইয়ের নামকরণ হয়েছে, সেখানেও লেখক যেন এক নিষ্ঠুর শল্য চিকিৎসক। লোকাল অ্যানাস্থেশিয়া ছাড়াই পাঠককে পড়িয়ে দেন
বেরং সেই প্রাচীন মানুষটির কাছে গিয়ে আজ দাঁড়াবেন বহুদিন পরে যিনি গল্পে গল্পে বলবেন, যেন অবধারিত, বয়স বাড়ার লগে লগে পাকিস্তানের কথা ক্যান এত মনে পড়ে কইতে পার বউমা!
‘চামরমনি চালের ভাত ও বোয়ালের ঝাল’ এমন একটা গল্প, যেখানে কাহিনির কথককে সুখস্মৃতি আর নিশ্চিত মৃত্যুর সম্ভাবনার মাঝে বাঁধা এক দড়ির তৈরি সাঁকো দিয়ে হাঁটতে বাধ্য করেন লেখক।
ভাতের গন্ধ নাকে আসে আমার। এদিকে প্রশস্ত করিডোর জুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছে নীরব শৈত্যপ্রবাহ। প্রতিটি প্রশ্বাস ক্রমাগত শীতল। মৃত্যুপ্রবণ।
এই তিনটি লাইনে ধরা আছে গল্পের দোলাচল। হাঁটছে কথক। ক্যান্সার হয়েছে কি হয়নি সে খবর জানতে গিয়ে দেখা হয়ে গেছে বহুকাল আগে পরিচিত, আজ মৃত্যুপথযাত্রী উমাদার সঙ্গে, মানুষের ঘরে ফেরা যাঁর বিশেষ পছন্দের। কথক বাঁচল কি বাঁচল না, তা পাঠক পড়ে নেবেন। কিন্তু এই আলোচনায় যা বলার তা হল, এই অত্যন্ত সুখপাঠ্য খাঁটি গল্পটাতেও ঘুরে ফিরে ঘরে ফেরার অভিলাষ, ফিরতে না পারার আশঙ্কা ও বিপন্নতার কথাই বলেছেন লেখক।
এত কথার পর বলা বাহুল্য যে, এই সংকলন বর্তমান আলোচকের ভাল লেগেছে। কিন্তু এই বই নিয়ে আলোচনা করার এক মস্ত বিপদ আছে। তা হল, এই বইয়ের সেরা গল্প সম্পর্কে বেশি কিছু লেখা যাবে না। কারণ মুগ্ধতা প্রকাশ করতে গেলেই গল্পটার বিশেষত্ব একেবারে ফাঁস হয়ে যাবে। শুধু এইটুকু বলা যাক, যৌন ঈর্ষা নিয়ে এরকম ভয় ধরিয়ে দেওয়া গল্প চট করে পাওয়া যায় না। গল্পের নাম ‘ৎ’। এরপরে বর্ণমালাতেও কেবল অনুস্বার, বিসর্গ আর চন্দ্রবিন্দু পড়ে থাকে। তাই লেখা শেষ করা যাক ওই গল্পের সামান্য উদ্ধৃতি দিয়ে, যাতে গল্পটার বিপজ্জনক গতিপথ খানিকটা বোঝা যায়।
নিষ্ক্রিয় এই দু’বছর সময়কালের আগে তাদের যে ছিল এক-দেড় বছরের বিবাহিত জীবন, ভুলতেই বসেছিল সে! সোহাগে-সংরাগে বাঁচতে বাঁচতে যখন সংসারে তৃতীয় জীবন আনার ইচ্ছা জাগ্রত, দু-জনেই সম্মত, এমনকি রথের মেলা থেকে দুটো ছোট্ট লাল জুতো কিনে আনে তারা, তখনই পরিমলের পতন। জগৎসংসার অচল। ভুবনজোড়া আকাশ ভেঙে পড়ে ঝুম্পার ছোট্ট মাথায়। দু’পায়ের ওপর বসে, বালতি থেকে মগ কেটে, ঝপঝপ করে জল ঢালে গায়ে-মাথায়। তলপেটে হাত বোলায়। মায়ার হাত। ঠান্ডা করে শরীর। শরীরের ভিতর মন। মনের ভিতর বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছাটুকুও পায় জল।
একটি কাঁঠাল ও পাকিস্তানের গল্প
লেখক: দেবতোষ দাশ
প্রকাশক: বৈভাষিক
প্রচ্ছদ: মৃণাল শীল
দাম: ২৮০ টাকা
