ব্যথার পূজারা হয়নি সমাপন

বিজ্ঞাপনদাতা নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবস্থাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, প্রাক্তন ক্রিকেটার, ক্রিকেট সাংবাদিক, বিশ্লেষক, ধারাভাষ্যকার – সকলকে চালায়। নিজের অজান্তে চালিত হন দর্শকরাও। ফলে পূজারা যখন খেলতেন, তখন অসম্ভব নায়কোচিত কিছু না করলে ক্রিকেটপ্রেমীরাও বিরক্তই হতেন তাঁর উপর।

আমার মায়ের দিদিমা ছিলেন ধর্মপ্রাণ হিন্দু বিধবা, নিয়মকানুন সবই পালন করতেন। কিন্তু কেউ মারা গেলে ঘটা করে শ্রাদ্ধশান্তি করা নাকি পছন্দ করতেন না। আমাদের পরিচিত মহলে প্রায়ই দেখা যেত, কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা নিজের ছেলেমেয়ের কাছে চূড়ান্ত অবহেলার শিকার হলেন। কিন্তু তিনি মারা যেতেই তারা দুশো লোক খাইয়ে শ্রাদ্ধ করছে, দানধ্যান করছে, খাবারের তালিকায় রাখা হয়েছে মৃত মানুষটার প্রিয় খাবারদাবার। তখনই আমার মা স্মরণ করতেন ‘দিদিমা বলত, থাকতে দিলে না ভাতকাপড়, মরলে পরে দানসাগর।’ গত রবিবার (২৪ অগাস্ট) চেতেশ্বর পূজারা অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর থেকে প্রাক্তন ক্রিকেটার, পূজারার সহখেলোয়াড়, সাংবাদিক, ধারাভাষ্যকার এবং ক্রিকেটভক্তদের প্রতিক্রিয়া দেখে ঠিক ওই কথাটাই মনে পড়ছে।

এ প্রসঙ্গে ঠিক দশ বছর আগে, ২০১৫ সালের ২৮ অগাস্ট, কলম্বোয় শুরু হওয়া ভারত বনাম শ্রীলঙ্কা সিরিজের তৃতীয় টেস্টের কথা স্মরণ করা দরকার। সেই সিরিজের প্রথম দুটো টেস্টে পূজারাকে খেলানো হয়নি, কারণ প্রবল প্রতিভাবান রোহিত শর্মাকে টেস্ট দলে যেনতেনপ্রকারেণ থিতু করার চেষ্টা চলছিল। জীবনের প্রথম দুটো টেস্টে পরপর শতরান করার পর থেকে পাঁচ-ছয় নম্বরে ব্যাট করে তিনি আর সুবিধা করতে পারছিলেন না। শ্রীলঙ্কার মাটি ভারতীয় ব্যাটারদের পক্ষে কোনোদিনই দুর্জয় ঘাঁটি নয়, আর ততদিনে শ্রীলঙ্কার বোলিংও অনেকটা নিরামিষ। তাই রান করার দেদার সুযোগ পাওয়া যাবে ভেবে তিন নম্বরে খেলানো হয়েছিল রোহিতকে। গলে প্রথম টেস্টে তিনি করেন যথাক্রমে ৯ ও ৪; ভারত হারে। দ্বিতীয় টেস্টে রোহিতকে আগলাতে ফেরত পাঠানো হয় পাঁচ নম্বরে, তিনে আসেন অজিঙ্ক রাহানে। রোহিত করেন ৭৯ ও ৩৪। অজিঙ্ক প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হলেও, দ্বিতীয় ইনিংসে শতরান করেন। তার উপর ভারত জিতে যায়। ফলে তৃতীয় টেস্টেও পূজারার খেলার সম্ভাবনা ছিল না, যদিও তার আগের অস্ট্রেলিয়া সফরে অ্যাডিলেডে ৭৩ ও ২১ (রোহিত ৪৩ ও ৬) আর ব্রিসবেনে ১৮ ও ৪৩ (রোহিত ৩২ ও ০) করে এসেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্ট চলাকালীনই প্রারম্ভিক ব্যাটার মুরলী বিজয়ের হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট মাথাচাড়া দিল। আরেক প্রারম্ভিক ব্যাটার শিখর ধাওয়ানেরও চোট ছিল। তাহলে কে এল রাহুলের সঙ্গে ইনিংস শুরু করবেন কে? যুক্তি বলে – রোহিত, কারণ তাঁরই তো দলে জায়গা পাকা করা দরকার। তাছাড়া তিনি এই সিরিজেই আগে তিন নম্বরে ব্যাটও করেছিলেন। ক্রিকেট মহলের চিরকালীন যুক্তি হল – যে তিন নম্বরে ব্যাট করতে পারে, সে প্রয়োজনে ইনিংস শুরু করবে। এই যুক্তিতে রাহুল দ্রাবিড় পর্যন্ত একাধিকবার ইনিংস শুরু করেছেন। কিন্তু ওসব যুক্তি রোহিতের মত প্রতিভাবানদের জন্য নয়। তিনি সেই পাঁচ নম্বরেই খেললেন, পূজারাকে বলা হল – ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে। ওপেন করতে হবে। পূজারা এলেন, দেখলেন এবং নিজস্ব ভঙ্গিমায় জয় করলেন। সাড়ে সাত ঘন্টার বেশি ব্যাট করে অপরাজিত ১৪৫। ভারত করেছিল মোটে ৩১২, বাকি ব্যাটাররা সবাই ব্যর্থ, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোর লেগস্পিনার অমিত মিশ্রের ৫৯। দ্বিতীয় ইনিংসে শূন্য রানে আউট হলেও, পূজারার ওই শতরানের জন্যই ভারত প্রথম ইনিংসে শতাধিক রানে এগিয়ে যায় এবং ম্যাচ ও সিরিজ জেতে।

এরপর কী হওয়ার কথা? ভূয়সী প্রশংসা এবং দলে জায়গা পাকা হয়ে যাওয়া। কিন্তু পূজারার বেলায় তা হয়নি। বাকিদের কথা ছেড়ে দিন, স্বয়ং সুনীল গাভস্কর ধারাভাষ্য দিতে দিতে কী বলেছিলেন মনে করিয়ে দিই। পূজারা যখন অর্ধশতরান করেন ওই ইনিংসে, তখন সঞ্জয় মঞ্জরেকর গাভস্করকে জিজ্ঞেস করেন যে, পূজারা কি এবার দলে পাকা হলেন? উত্তরে গাভস্কর বলেন, ওই দলে টিকতে থাকতে গেলে নাকি শ দেড়েক রান করতে হবে। গোটা দেশের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র পূজারাকে এভাবেই দেখে এসেছে বরাবর। সেই কারণেই আজ তাদের পূজারার বিদায়ে চোখের জল ফেলা দেখে ‘ন্যাকা’ বলতে ইচ্ছে করছে। পূজারার ওই ইনিংসের কয়েক দিনের মধ্যেই মুকুল কেশবন কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজে একখানা উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন। তাতে গাভস্করকে ওই মন্তব্যের জন্য তীব্র আক্রমণ করেন। মুকুল প্রশ্ন তোলেন ‘What team of titans was this? And what bastion of Bradmans was Pujara trying to breach?’ গোদা বাংলায় – কী এমন ভগবানদের দল এই ভারতীয় দলটা? কোন ব্র্যাডম্যানদের দুর্গে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন পূজারা? মুকুলের এই তীক্ষ্ণতা অত্যন্ত যৌক্তিক, কারণ ওই ইনিংস খেলতে খেলতে পূজারার গড় ৫০ পেরিয়ে যায়। সেইসময় রোহিত আর রাহানে তো বটেই, বিরাট কোহলির গড়ও পঞ্চাশের নিচে ছিল।

ভারতীয় ক্রিকেটের সমস্যা হল, ওই কথাগুলো কোনো ক্রীড়া সাংবাদিক লেখেননি। মুকুলের মত কলাম লেখক, যাঁরা আরও নানা বিষয়ে লেখেন, এইসব গোলমাল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে তাঁদেরই কলম ধরতে হয়। ক্রীড়া সাংবাদিকরা কখনো যে সংবাদমাধ্যমে চাকরি করেন তার স্বার্থে, কখনো বা নিজের কায়েমি স্বার্থে, যা সত্য তা বলেন না। জনপ্রিয় ক্রিকেটারদের সমালোচনা করেন না। যেসব ক্রিকেটার পরিশ্রমী কিন্তু গ্ল্যামারবিহীন কারণ সাদা বলের ক্রিকেটে সাফল্য নেই, পকেটে মোটা টাকার আইপিএল চুক্তি নেই, তাঁদের কয়েকটা ব্যর্থতাতেই ‘একে দিয়ে হবে না’ জাতীয় কথাবার্তা চালু করে দেন। পঞ্চাশ করলে বলেন একশো করতে হবে, একশো করলে বলেন দেড়শো করতে হবে, দেড়শো করলে বলেন ধারাবাহিক হতে হবে। যেন বাকিরা ভীষণ ধারাবাহিক। এই যে বিদায়ী প্রজন্মকে এখন ঘটা করে সোনার প্রজন্ম বলা হচ্ছে, তাদের একেকজনের ব্যাটিং গড় দেখুন – বিরাট (৪৬.৮৫), পূজারা (৪৩.৬০), রোহিত (৪০.৫৭), রাহানে (৩৮.৪৬)। সেরা ব্যাটারটির গড় প্রায় ৪৭। পঞ্চাশের উপরে দূরের কথা, ধারেকাছেও কেউ নেই। এই যদি সোনার প্রজন্ম হয়, তাহলে বলতে হবে সোনাও যা পেতলও তাই।

আসলে গত শতকের শেষ থেকেই যত দিন যাচ্ছে, ভারতে ক্রিকেট ব্যবসা হিসাবে তত ফুলে ফেঁপে উঠছে। ব্যবসা যত বড় হচ্ছে, তত খেলার যে অনিশ্চয়তা, খেলোয়াড়দের সাফল্য-ব্যর্থতার যে স্বাভাবিক উত্থান পতন – তা মেনে নেওয়া লগ্নিকারীদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে দিনকে রাত, রাতকে দিন করতেই হবে। যে খেলোয়াড়কে দেখতে শুনতে ভাল, কুড়ি বিশের ক্রিকেটে বা একদিনের ক্রিকেটে (ক্রমশ এটার প্রভাবও কমে যাচ্ছে) সাফল্য আছে – তার তেলা মাথাতেই তেল দিতে হবে। সোজা কথায়, যে খেলোয়াড়কে ব্র্যান্ডে পরিণত করে তার হাত দিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি পণ্যের বিজ্ঞাপন করানো যায়, তার সাফল্যই সাফল্য এবং সে সামান্য সফল হলেও সেটাকে বেলুনের মত ফুলিয়ে বিরাট করে দেখাতে হবে। কেবল টেস্ট খেলা শান্তশিষ্ট ক্রিকেটার ব্র্যান্ড হিসাবে বিকোবে না। অতএব সে খেলার জোরে ব্র্যান্ডের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারে দেখলেই সাবধান হও। তার সাফল্যকে কমিয়ে দেখাও, ব্যর্থতাকে বাড়িয়ে দেখাও।

বিজ্ঞাপনদাতা নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবস্থাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, প্রাক্তন ক্রিকেটার, ক্রিকেট সাংবাদিক, বিশ্লেষক, ধারাভাষ্যকার – সকলকে চালায়। নিজের অজান্তে চালিত হন দর্শকরাও। ফলে পূজারা যখন খেলতেন, তখন অসম্ভব নায়কোচিত কিছু না করলে ক্রিকেটপ্রেমীরাও বিরক্তই হতেন তাঁর উপর। এখন সোশাল মিডিয়ায় যতজন পূজারাকে পুরনো যৌথ পরিবারের অল্প আয়ের বড়দার মত দেখছেন বা ‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বোঝা যায় না’ কথাটা দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছেন, তাঁরাও অনেকে পূজারা দুটো ম্যাচে ব্যর্থ হলেই বলেছেন – এটাকে বাদ দেয় না কেন?

কারণ গোটা বাস্তুতন্ত্র আমাদের মাথায় ঢুকিয়েছে, বাদ দিতে হলে আগে পূজারাকেই বাদ দেওয়া উচিত, যেহেতু তাঁর ‘ইনটেন্ট’ নেই। কথাটা ভারতীয় ক্রিকেটে চালু করেছিলেন সাদা বলের ক্রিকেটে আমাদের দুটো বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি, পরে ওটাকে মুদ্রাদোষে পরিণত করেন বিরাট আর তাঁর দাদাভাই রবি শাস্ত্রী। রান করলে কি করলে না, হারলে না জিতলে – সেসব বড় কথা নয়। বড় কথা হল ‘ইনটেন্ট’ আছে কিনা। একথা যে কতবার অধিনায়ক থাকার সময়ে বিরাট আর কোচ হিসাবে শাস্ত্রী বলেছেন তার ইয়ত্তা নেই। লক্ষ করলে দেখা যাবে, হারলেই ওই শব্দটা বেশি ব্যবহার করতেন তাঁরা। কারণ ওরকম গালভরা কথা বললে হারের কারণ নিয়ে কথা বলা এড়িয়ে যাওয়া যায়, টিম ম্যানেজমেন্টের দোষত্রুটি ঢেকে ফেলা যায়। আর ধারাভাষ্যকার হয়ে যাওয়া প্রাক্তন ক্রিকেটাররা তো বহুকাল হল ‘রাজা যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ’ নীতি নিয়েছেন, যেহেতু ভারতে ক্রিকেট সম্প্রচারের দায়িত্ব পুরোপুরি বিসিসিআইয়ের হাতে এবং তাদের অলিখিত শর্ত হল – ভারতীয় দলের বা কোনো ক্রিকেটারের সমালোচনা করা যাবে না। টিম ম্যানেজমেন্ট যা বলবে তা-ই শিরোধার্য। তাই তাঁরাও দিনরাত ‘ইনটেন্ট’ নিয়ে হাত-পা নেড়ে বাণী দিয়ে গেছেন। তার উপর আছে সোশাল মিডিয়া এবং বিরাট, রোহিতদের মত তারকাদের জনসংযোগ মেশিনারি। ফলে পূজারা আরও কোণঠাসা হয়েছেন। এতকিছু সামলে তিনি যে শতাধিক টেস্ট খেলে গেলেন, কেবল তার জন্যেই একখানা প্রণাম প্রাপ্য।

সোজা কথাটা সোজা করেই বলা দরকার। বিরাট, রোহিত, রাহানে, পূজারাদের ব্যাটিং প্রজন্ম মোটেই সোনার ছিল না, ছিল মাঝারি মানের। তাঁদের সময়ে ভারতের বোলিং অতীতের বহু বোলিং আক্রমণের চেয়ে বৈচিত্র্যময় এবং উন্নত হওয়ায় বেশকিছু স্মরণীয় জয় পেয়েছে দল। আবেগ বাদ দিয়ে দেখলে এটুকুই সত্যি। যে ব্যাটিং লাইন আপে একজনের গড়ও পঞ্চাশের উপরে নয়, সে ব্যাটিং নিজের সময়ের বিশ্বসেরাও নয়। ভারতীয় দলের খেলা বেচার জন্যে ওভাবে ব্র্যান্ডিং করা দরকার ছিল, তাই করা হয়েছে। ভারতীয় ব্যাটিংয়ের সোনার প্রজন্ম ছিল শচীন তেন্ডুলকর (৫৩.৭৮), রাহুল দ্রাবিড় (৫২.৩১), বীরেন্দ্র সেওয়াগ (৪৯.৩৪), ভিভিএস লক্ষ্মণ (৪৫.৯৭), সৌরভ গাঙ্গুলিদের (৪২.১৭) প্রজন্ম। ক্রিকেটের যে কোনো যুগে যে কোনো দলে প্রথম দুজন থাকলেই অধিনায়ক বলবেন – আর যে ইচ্ছে খেলুক, চিন্তা নেই। তার সঙ্গে আবার শুরুতে মারকুটে সেওয়াগ, নিচের দিকে বিপদের দিনে ঠিক খেলে দেওয়া সৌরভ আর লক্ষ্মণ। অথচ পূজারাদের প্রজন্মের দিকে তাকালে দেখা যাবে – সৌরভ, লক্ষ্মণ যেসব সীমাবদ্ধতার কারণে আরও বড় ব্যাটার হতে পারেননি, ঠিক সেগুলোই বিরাট-রোহিত-রাহানে-পূজারাদের ছিল। এঁরা কেউ সব দেশে প্রায় সমান সফল নন। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে চারজনেই মোটের উপর ব্যর্থ, ইংল্যান্ডের রেকর্ডও সুবিধাজনক নয়। পূজারার রেকর্ড তো বেশ খারাপ (মাত্র একটা শতরান, গড় ২৯), বিরাটের রেকর্ড তত খারাপ দেখায় না ২০১৮ সালের সফরের সৌজন্যে। একমাত্র অস্ট্রেলিয়ায় এঁরা খুব সফল, যেমন সফল ছিলেন লক্ষ্মণ।

ফলে এই যে পূজারা অবসর নেওয়ার পরে তাঁকে অতিমানবিক চেহারা দেওয়া হচ্ছে, কাব্যি উপচে পড়ছে – এর কোনো যুক্তি নেই। এটা করা হচ্ছে, কারণ এই মুহূর্তে পূজারাকে নিয়ে গদগদ হয়ে কিছু লিখলেই প্রচুর ক্লিক, হিট, লাইক পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ পূজারা এখন ‘ট্রেন্ডিং’। এই চক্করে টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারীদের তালিকায় পাঁচ নম্বরে থাকা রাহুলের (১৩,২৮৮) সমগোত্রীয় বলা হচ্ছে পূজারাকে (৭,১৯৫)। এতে পূজারার গৌরব বাড়ে না, দৈত্যাকৃতি রাহুলকে বনসাই করার অপচেষ্টা হয়। পূজারা সম্প্রতি ভারত-ইংল্যান্ড সিরিজে ধারাভাষ্য দিলেন। তাতে দেখা গেল শাস্ত্রীসুলভ চড়া গলায় আবেগমথিত কথাবার্তা বলার লোক তিনি নন, বরং অল্প কথায় গভীর বিশ্লেষণই তাঁর শক্তি। সুতরাং মনে হয়, তিনিও জানেন যে রাহুলের সঙ্গে তাঁর একটাই মিল – দুজনেই তিন নম্বরে ব্যাট করেছেন দীর্ঘ সময়। বাকি সব অতিকথন।

এতক্ষণে নব্য পূজারাভক্তরা নির্ঘাত আস্তিন গোটাচ্ছেন, বলছেন ‘পূজারা খতরে মে হ্যায়’। দাঁড়ান, অত চটবেন না। পূজারা একেবারে কিছুই নন – একথা বলছি না। টেস্ট ক্রিকেটে সাত হাজার রান করাও কম কথা নয়। কিন্তু মুশকিল হল, গা জোয়ারি তুলনা এবং অতিকথনে ওই সাত হাজার রানের দাম কমে যায়। পূজারাকে তাঁর সমসাময়িক ভারতীয় ব্যাটারদের সঙ্গে তুলনা করলেই সঠিক গুরুত্ব মালুম হয়।

গত কয়েক দিন ধরে মূলত তাঁর একখানা ইনিংস নিয়েই যাবতীয় ভজন পূজন চলছে। সোশাল মিডিয়া থেকে খবরের কাগজ – সর্বত্র চোখে পড়ছে তাঁর হেলমেট পরিহিত, বাউন্সার এড়াতে ঈষৎ ঝুঁকে পড়া ছবি। সে ছবিতে চিহ্নিত করা – শরীরের কোথায় কোথায় বল লেগেছিল, তবু তিনি আউট হননি। অর্থাৎ সেই ২০২১ সালের ১৫-১৯ জানুয়ারির গাব্বা টেস্টের কথা হচ্ছে। ওই ইনিংস অবশ্যই অবিস্মরণীয়। সোয়া পাঁচ ঘন্টা ব্যাট করে, গায়ে ডজনখানেক আঘাত সহ্য করে অমূল্য ৫৬ রান করেছিলেন চতুর্থ ইনিংসে ৩২৮ রান তাড়া করতে নেমে। কিন্তু ভাগ্যিস শুভমান গিল (৯১) আর ঋষভ পন্থ (অপরাজিত ৮৯) ছিলেন। টেস্টটা ড্র হয়ে গেলে বা ভারত হেরে গেলে পূজারার ব্যথার পূজা ব্যর্থ হত, আজ কেউ ওই ইনিংসের কথা বলত না। কারণ ভারতীয় ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র, আমি-আপনিও যার অঙ্গ, এই ধরনের ইনিংসকে তার গুণমানের জন্য পাত্তা দেয় না।

বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে বলুন দেখি হনুমা বিহারী এখন কোথায়? ঠিক তার আগের টেস্টেই আহত অবস্থায়, অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে হেরে যাওয়া ম্যাচ প্রায় তিন ঘন্টা ব্যাট করে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন বিহারী। নইলে ব্রিসবেনে সিরিজ জেতার সুযোগ পাওয়াই জেতা যেত না। অথচ ওই ম্যাচের পর মাত্র চারটে টেস্টে খেলানো হয়েছিল বিহারীকে। সেগুলোতে যে একেবারে রান করতে পারেননি তাও নয়। অথচ তিনি আজ বিস্মৃত। আসন্ন রঞ্জি ট্রফিতে ত্রিপুরার হয়ে খেলবেন ঠিক করেছেন, অর্থাৎ বুঝে গেছেন যে আর জাতীয় দলে ফেরা হবে না। সিডনির সেই ইনিংসে ব্যথায় নড়তে পারছিলেন না বিহারীর সঙ্গী অশ্বিনও। তবুও দু ঘন্টার বেশি ব্যাট করে গেছেন, অস্ট্রেলিয়ার পূর্ণ শক্তির বোলিং আক্রমণ তাঁকে আউট করতে পারেনি। তারপরেও টিম ম্যানেজমেন্টের বিশ্বাস হয়নি যে অশ্বিনের ব্যাটিং শক্তি রবীন্দ্র জাদেজার চেয়ে খারাপ নয়। অশ্বিনকে বিদেশের মাঠে সেই বাইরেই বসে থাকতে হয়েছে। সম্প্রতি নিজের পডকাস্টে রাহুলের প্রশ্নের উত্তরে স্পষ্টাস্পষ্টি অশ্বিন বলেও দিয়েছেন যে ব্যাপারটা অসহ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছিল বলেই তিনি অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। এই হল ভারতীয় ক্রিকেট। এখানে পূজারার ওই ইনিংস মনে রাখা হত ম্যাচ না জিতলে?

উপরন্তু চারপাশ দেখে মনে হচ্ছে, যেন ওই ইনিংস আর ওই সিরিজ ছাড়া আর বলার মত কিছু কোনোদিন করেননি পূজারা। অথচ এই লেখা শুরুই করা গেছে এমন একটা ইনিংসের কথা দিয়ে, যেখানে দলের ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো পূজারা জেতার মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের মাটিতে পূজারার একমাত্র শতরানটাও কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ব্যাটিং বিপর্যয়ের মধ্যে একা কুম্ভ হয়ে লড়ার দৃষ্টান্ত। ২০১৮ সালে সাদাম্পটনে সেই ইনিংসে ভারতের তাবড় ব্যাটাররা অনিয়মিত স্পিনার মঈন আলিকে পাঁচ উইকেট দিয়ে বসেন। মাত্র ৮৪.৫ ওভারে ২৭৩ রানে অল আউট হয়ে যায় দল, পূজারা অপরাজিত ১৩২। তাঁর পরে সর্বোচ্চ রান ছিল অধিনায়ক বিরাটের – ৪৬। ম্যাচটা অবশ্য দল হেরেছিল।

পূজারার আরও বড় কীর্তি কী?

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাঁর রান এবং শতরান বিরাটের চেয়ে কম হলেও, গড় প্রায় সমান (বিরাট ৪৬.৭২; পূজারা ৪৭.২৮)। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। কে কত বড় খেলোয়াড় তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ভাবতেই হয় কার খেলা ম্যাচের ফলাফলকে কতখানি প্রভাবিত করেছে। আজকাল ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ কথাটাও খুব চালু। তা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পূজারা কিন্তু বিরাটের চেয়েও বড় ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার। বিরাটের অস্ট্রেলিয়ায় সেরা সিরিজ ছিল ২০১৪-১৫ মরশুমে। সেবার তিনি চারটে টেস্টে চারখানা শতরান করেন। সেই সিরিজ ভারত হেরেছিল। ২০১৮-১৯ মরশুমে ভারত যখন জিতল, বিরাটের গড় ছিল ৪০.২৮। পার্থে যে ম্যাচে শতরান করেন, সে ম্যাচে ভারত প্রায় দেড়শো রানে হেরে যায়। সেই সিরিজে রানের পাহাড় গড়েছিলেন পূজারা। চার ম্যাচে ৫২১ রান (গড় ৭৪.৪২; শতরান ৩, অর্ধশতরান ১)। শেষ টেস্টে সিডনিতে শুরুতেই ভারত অস্ট্রেলিয়ার ঘাড়ে ৬২২ রানের গন্ধমাদন চাপিয়ে দিতে পেরেছিল পূজারার ম্যারাথন ১৯৩ রানের সৌজন্যে (সঙ্গে ঋষভের স্বভাবসিদ্ধ অপরাজিত ১৫৯)। সেই ইনিংসটা নিয়েও বিশেষ কথা হচ্ছে না।

আরও পড়ুন শীর্ষে উঠেও গলি-ক্রিকেট না ভোলা অশ্বিন

২০২০-২১ মরশুমে যখন ভারত দ্বিতীয়বার সিরিজ জেতে, তখন বিরাট প্রথম টেস্টের পরে আর খেলেননি। অ্যাডিলেডের দিন-রাতের সেই ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ৭৪ রান করেছিলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৬ অল আউটের লজ্জার মধ্যে ৪। এই সিরিজে পূজারার রান দেখলে মনে হবে সাধারণ (চার টেস্টে ২৭১; গড় ৩৩.৮৭; অর্ধশতরান ৩)। কিন্তু অস্ট্রেলিয়াকে তিনি পরাস্ত করেছিলেন ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যাট করে। গোটা সিরিজে ব্যাট করেছিলেন ১,৩৬৬ মিনিট, অর্থাৎ ২২ ঘন্টার বেশি। সেবারে খুব বেশি রান ওঠেনি, ভারতের হয়ে সবচেয়ে বেশি রান করেছিলেন ঋষভ – পূজারার থেকে মাত্র তিন রান বেশি। শতরান করেছিলেন একমাত্র রাহানে। কিন্তু ভারতের জেতার পিছনে পূজারার ৯২৮ বল খেলার ভূমিকা যে কতখানি, তা এবারের অস্ট্রেলিয়া সফরের মুখে স্পষ্ট করে দিয়েছেন স্বয়ং জশ হেজলউড। তিনি বলেছেন – পূজারা না থাকায় অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগছে।

সুতরাং তথাকথিত সোনার প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সাফল্য – অস্ট্রেলিয়ায় পরপর দুবার টেস্ট সিরিজ জয় – মহানায়ক বিরাট কুমার বা রোহিত কুমারের জন্যে আসেনি, এসেছে ‘ইনটেন্ট’ না থাকা পূজারার জন্যে। তবু তাঁর টেস্ট কেরিয়ার শেষ হয়েছে ওই দুজনের আগেই। কারণ তাঁর উপর কোটি কোটি টাকা লগ্নি করা ছিল না বিজ্ঞাপনদাতাদের। ফর্ম পড়ে যাওয়ার কারণ তাঁকে বাদ দেওয়া যায়, ব্র্যান্ডদের বাদ দেওয়ার আগে নানা নাটক করতে হয়। রোহিত সম্পর্কে রটাতে হয় নিজেই নিজেকে দল থেকে সরিয়ে নিয়েছে। বিরাট অবসর নিয়ে ফেলার পরেও ফিরে আসার গুজব ছড়ানো চলতে থাকে। ২০২৩ সালের জুন মাসে শেষবার টেস্ট খেলার পরে পূজারা সাসেক্সের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছেন এবং হাজার দুয়েক রান করেছেন। কিন্তু তিনি টেস্ট দলে ফিরবেন – এমন গুজব ছড়ায়নি। বিরাট টেস্ট থেকে অবসর নিয়ে নেওয়ার পরেও ভারতের এবারের ইংল্যান্ড সফরের আগে বেশকিছু সংবাদমাধ্যম বলতে শুরু করেছিল – বিরাট নাকি কাউন্টি ক্রিকেট খেলবেন। তরুণ ভারতীয় দল লম্বা সিরিজে বিপদে পড়ে গেলে নাকি তিনি এসে উদ্ধার করবেন। বিরাট কাউন্টি খেলেননি, ভারতের তরুণ ব্যাটিংয়ের উদ্ধারকর্তার প্রয়োজনও হয়নি।

পূজারাকে নিয়ে অমন গুজব ছড়ানোর সুযোগও ছিল না, কারণ তিনি কমেন্ট্রি বক্সে হাজির ছিলেন। মুশকিল হল, তাঁর ব্যাটিংয়ের মতই ধারাভাষ্যও শান্তশিষ্ট, যুক্তিনিষ্ঠ। বৃদ্ধ গাভস্করও যে যুগে অতিরিক্ত উত্তেজনা দেখাচ্ছেন কমেন্ট্রি বক্সে, যুক্তির তোয়াক্কা না করে উগ্র জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠছেন সামান্যতম কারণে, সেখানে পূজারার ধারাভাষ্য কি চলতে দেওয়া হবে? নাকি তাঁকে এখানেও ঘাড়ধাক্কা খেতে হবে? এই আশঙ্কা থেকেই মনে হয়, পূজারার ব্যথার পূজা এখনো শেষ হয়নি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

হাশিম আমলা, ভিভিএস লক্ষ্মণের সমগোত্রীয় বিরাট কোহলি

গাভস্করের জীবনের শেষ টেস্ট ইনিংসকে বলা হয় ঘূর্ণি উইকেটে উচ্চমানের স্পিনের বিরুদ্ধে ব্যাটিংয়ের টিউটোরিয়াল। ওই মানের কোনো ইনিংস বিরাটের ব্যাট থেকে এসেছে কি? ১৯৯৮ সালে চিপকে সিরিজের প্রথম টেস্টেই শচীনের ওয়ার্নকে দমিয়ে দেওয়া ১৫৫, ওই মাঠেই পরের বছর চতুর্থ ইনিংসে আক্রম-ওয়াকার-সাকলিন সমৃদ্ধ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৩৬ – এসব ছিল অতিমানবিক ইনিংস। কারণ ব্যাটার একক লড়াই লড়ছিলেন। তেমন ইনিংসই বা বিরাট খেললেন কবে?

যদি কোনো অস্ট্রেলিয়কে জিজ্ঞেস করেন ‘ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা ডন ব্র্যাডম্যানকে বাদ দিলে আপনাদের সর্বকালের সেরা টেস্ট ব্যাটার কারা?’ উত্তরে মোটামুটি সকলেই যে নামগুলো বলবেন সেগুলো হল – গ্রেগ চ্যাপেল (গড় ৫৩.৮৬), অ্যালান বর্ডার (৫০.৫৬), স্টিভ ওয় (৫১.০৬), রিকি পন্টিং (৫১.৮৫), স্টিভ স্মিথ (৫৬.৭৪)। একই প্রশ্ন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কাউকে করলে যে নামগুলো আসবে সেগুলোও সবার জানা – গারফিল্ড সোবার্স (৫৭.৭৮), ব্রায়ান লারা (৫২.৮৮), ভিভিয়ান রিচার্ডস (৫০.২৩)। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের তিন ডব্লিউও – এভার্টন উইকস (৫৮.৬১), ক্লাইড ওয়ালকট (৫৬.৬৮), ফ্র্যাংক ওরেল (৪৯.৪৮) – আলোচনায় আসবেন। দু-একজন হয়ত জর্জ হেডলির (৬০.৮৩) নামও করতে পারেন, তবে হেডলি মাত্র ২২ খানা টেস্ট খেলেছেন।

ইংরেজদের এই প্রশ্ন করলে তাঁরা আধুনিক ক্রিকেটারদের মধ্যে জো রুটের নাম অবশ্যই করবেন, কারণ জো প্রায় ১৩,০০০ রান করে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই (৫০.৮৭)। ইনিংস শুরু করার মত শক্ত কাজ করে প্রায় সাড়ে বারো হাজার রান করেছেন এবং অধিনায়কত্ব করেছেন বলে অ্যালাস্টেয়ার কুকের নামও এসে পড়বে (৪৫.৩৫)। কিন্তু ইংরেজরা কুকের চেয়ে বেশি করে বলবেন ওয়াল্টার হ্যামন্ড (৫৮.৪৫), কেন ব্যারিংটনের (৫৮.৬৭) কথা। পাকিস্তানিদের সর্বকালের সেরা টেস্ট ব্যাটারদের নাম জিজ্ঞেস করলে অবশ্যই তাঁরা জাভেদ মিয়াঁদাদ (৫২.৫৭), ইনজামাম-উল হক (৪৯.৬০), ইউনিস খানের (৫২.০৫) নাম করবেন। পুরনো দিনের লোকেরা হয়ত জাহির আব্বাস (৪৪.৭৯), হানিফ মহম্মদের (৪৩.৯৯) কথাও বলতে পারেন। কিন্তু প্রথম তিনজনের কীর্তি যে এই দুজনকে ছাড়িয়ে অনেকদূর চলে গেছে তা নিয়ে বিশেষ বিতর্কের অবকাশ নেই।

এই দেশগুলোর চেয়ে অনেক পরে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে শুরু করা শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটপ্রেমীরা অনায়াসে বলবেন তাঁদের দেশের সর্বকালের সেরা ব্যাটারের নাম কুমার সঙ্গকারা (১২,৪০০ রান, গড় ৫৭.৪০)। তাছাড়াও বলবেন মাহেলা জয়বর্ধনের (১১,৮১৪ রান, গড় ৪৯.৮৪) কথা। অরবিন্দ ডি সিলভার নাম আসবে তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে। তিনিই শ্রীলঙ্কার প্রথম তারকা ব্যাটার। কিন্তু সাফল্যে অনেক পিছিয়ে (৬৩৬১ রান, গড় ৪২.৯৭)। বর্ণবৈষম্যের কারণে নির্বাসনে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট ক্রিকেটে ফেরত এসেছে ১৯৯১ সালে। তাই সেদেশের দুজন অসামান্য প্রতিভাধর ব্যাটার গ্রেম পোলক (৬০.৯৭) আর ব্যারি রিচার্ডস (৭২.৫৭) যথাক্রমে ২২ খানা আর চারখানা টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটপ্রেমীরা সর্বকালের সেরা ব্যাটার বলতে জাক কালিস (৫৫.৩৭) আর এবি ডেভিলিয়ার্সের (৫০.৬৬) নাম করবেন। অত্যন্ত অল্প বয়সে, দলের দুঃসময়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে একশোর বেশি টেস্টে অধিনায়কত্ব করে সফল হয়ে, ইনিংস শুরু করার গুরুদায়িত্ব পালন করেও প্রায় দশ হাজার রান করে ফেলা গ্রেম স্মিথের (৪৮.৭০) নামও বলবেন নির্ঘাত। এঁদের পরে হাশিম আমলার (৪৬.৬৪) নামও বলতে পারেন, কারণ তিনিও প্রায় দশ হাজার রান করেছেন। কিন্তু কখনোই ওই তিনজনের আগে আমলার কথা বলবেন না। ঠিক যেমন কোনো ক্যারিবিয়ান ভুলেও তাঁদের সর্বকালের সেরাদের পাশে বসাবেন না শিবনারায়ণ চান্দেরপলকে, যতই তিনি ৫১.৩৭ গড়ে ১১,৮৬৭ রান করুন। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটপ্রেমীরা জানেন যে ৫০ থেকে ৫৫ গড়ের ব্যাটার আর ৪৭ গড়ের ব্যাটারের জাতই আলাদা। এদের এক বন্ধনীতে রেখে আলোচনা করার কোনো মানে হয় না। আর কুড়ি বিশের ক্রিকেটের পেটে চলে যাওয়া ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটরসিকরা আজও বোঝেন, শুধু ধারাবাহিকতা সর্বকালের সেরাদের ক্লাবের পাস নয়। সর্বোচ্চ মানের বোলিংয়ের ঘাড়ে চেপে বসার ক্ষমতাও থাকতে হয়। সেটা চান্দেরপলের ছিল না।

বিরাট কোহলির অবসরগ্রহণ নিয়ে লেখায় তিন-তিনটে অনুচ্ছেদ জুড়ে এই আলোচনা কেন? কারণ এই মুহূর্তে কোনো ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীকে ভারতের সর্বকালের টেস্ট ব্যাটারদের নাম বলতে বললে সুনীল গাভস্কর (৫১.১৪) আর শচীন তেন্ডুলকরের (৫৩.৭৮) সঙ্গে বিরাট কোহলির (৪৬.৮৫) নামই বলবেন, রাহুল দ্রাবিড়ের (৫২.৩১) নাম বলবেন না। এমনকি সোশাল মিডিয়ায় অসংখ্য মানুষকে দেখা যাচ্ছে বিরাটকেই ভারতের সর্বকালের সেরা বলে দিতে। অবশ্য এ আর নতুন কী? তাঁকে তো কবেই গোটা খেলাটার GOAT (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম) আখ্যা দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। অথচ ভারতীয়দের মধ্যে টেস্টে মোট রান (১৩,২৮৮) এবং গড়ের দিক থেকে রাহুল ঠিক শচীনের (১৫,৯২১) পরেই। এমনকি গড়ের দিক থেকে বীরেন্দ্র সেওয়াগও (৪৯.৩৪) কোহলির চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু ৪৭ গড়ের ব্যাটার আর পঞ্চাশের উপরে গড় যে ব্যাটারদের, তারা যে কোনোভাবেই তুলনীয় নয় – সেকথা বললে এখন কেবল ক্রিকেটভক্তরা নয়, প্রাজ্ঞ ধারাভাষ্যকার, ক্রিকেট সাংবাদিক এবং প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও মানবেন না। কথাটা অন্য দেশের ক্রিকেটারদের সম্পর্কে বললে মানতে পারেন, চাই কি ওকথার সপক্ষে চাট্টি যুক্তিও জুগিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু এদেশের ক্রিকেটারদের নিয়ে বললে, বিশেষত বিরাটকে নিয়ে বললে তো গাভস্কর, তেন্ডুলকরও মানবেন না। গাভস্কর তো ইদানীং এত মহান হয়েছেন (বা এত নিচে নেমেছেন) যে ধারাভাষ্যে ঋষভ পন্থের কঠোর সমালোচনা করে পরে আবার সেই সমালোচনাকে ব্যঙ্গ করে তৈরি বিজ্ঞাপনে ঋষভের সঙ্গে মুখও দেখাচ্ছেন।

অতএব বিশেষজ্ঞ এবং ভক্তদের বিরাটপুজোর প্যান্ডেল থেকে বেরিয়ে এসে উনি টেস্ট ক্রিকেটে সর্বকালের সেরাদের মধ্যে ঠিক কোথায় পড়েন তা নিয়ে একটা নির্মোহ আলোচনা করার চেষ্টা চালাচ্ছি। তার সূচনা পরিসংখ্যান দিয়েই করতে হত। কারণ ফুটবল বা হকির চেয়ে ক্রিকেটে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সাফল্য-ব্যর্থতা অনেক বেশি পরিমাপযোগ্য এবং একজন ব্যাটারের সাফল্য পরিমাপ করার জন্য রান আর গড়কে গুরুত্ব দেওয়া আদ্যিকাল থেকে চলে আসছে। তবে কোনো সন্দেহ নেই, আজকাল ক্রিকেটালোচনায় যে পরিসংখ্যানসর্বস্বতা এসে পড়েছে তা পরিহার্য। ক্রিকেট সম্প্রচার প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহজলভ্যতায় আজকাল এমন অনেক পরিসংখ্যান নিয়ে আলোচনা চলে যা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গোঁসাইবাগানের ভূত গল্পের অঙ্কের মাস্টার করালীবাবুর জন্যে মনোরঞ্জক হতে পারে, কিন্তু খেলাটা সম্পর্কে কোনো সত্য উদ্ঘাটন করে না। তাছাড়া খেলাটা খেলে মানুষ, তার মানবিক সুবিধা-অসুবিধা সুস্থতা-অসুস্থতা সমেত; খেলা হয় বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে। এসবের যে প্রভাব খেলার উপর পড়ে, তা অতিক্রম করে মানবিক প্রয়াসের সাফল্য-ব্যর্থতাই ক্রিকেটকে মনোমুগ্ধকর করে তোলে। তার সবকিছু পরিসংখ্যানে ধরা পড়া অসম্ভব। নেভিল কার্ডাসের কথা অনুযায়ী স্কোরবোর্ড গাধা। তা যদি না-ও হয়, স্কোরবোর্ড যে সর্বজ্ঞ নয় তা মানতেই হবে। সুতরাং পরিসংখ্যান পেরিয়েও বিরাটের অবদান নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।

সংখ্যাতীত

সমস্যা হল, সেটা করতে গেলে বিরাটকে বিরাট তো দেখাবেই না, উলটে আরও সাধারণ দেখাবে। কারণ সর্বকালের সেরা যেসব নামের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা হয় (যাঁদের নিয়ে প্রথম তিনটে অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে), তাঁদের আমলের তুলনায় বিরাটের আমলে টেস্ট ক্রিকেট যে অনেক সহজ হয়ে গেছে তা অস্বীকার করা শক্ত। কথাটা কেবল আমিই বলছি এমন নয়। হর্ষ ভোগলে ২০২২ সালে ‘দ্য ফাইনাল ওয়ার্ড’ নামে এক পডকাস্টে কথাটা সবিস্তারে বলেছিলেন এবং সেজন্যে বিস্তর ট্রোলিংয়ের শিকার হয়েছিলেন। প্রসঙ্গটা ছিল তার আগের ৭-৮ বছরে টেস্ট ক্রিকেটে ভারতের আধিপত্য। তিনি যা বলেছিলেন তার বাংলা করলে এরকম দাঁড়ায়

আমি চাই না কেউ মনে করুক একটা দারুণ রেকর্ডের মধ্যে আমি ছিদ্রান্বেষণ করছি। কিন্তু মন দিয়ে রেকর্ডটা দেখলে আপনি দেখবেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় আমরা জিতিনি, নিউজিল্যান্ডে জিতিনি, ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডে ৪-১ হেরেছিলাম। ক্রিকেটের ইতিহাসে এক নম্বর হওয়ার জন্যে এটাই সবচেয়ে সহজ সময়। ৪-০ ফলে অ্যাশেজ জিতলেও এই অস্ট্রেলিয়া অতীতের অস্ট্রেলিয়া দলগুলোর মত নয়। ইংল্যান্ডের অবস্থা বেশ খারাপ। দক্ষিণ আফ্রিকা দলটা নির্বাসন থেকে ফিরে আসার পরে সম্ভবত সবচেয়ে দুর্বল এখন। আমি জানি এটা বিতর্কিত মন্তব্য হয়ে যাচ্ছে। ওদের বোলিং এখনো ওদের দেশে দারুণ। কিন্তু এই দলটা কালিস, আমলা, ডেভিলিয়ার্স, ফ্যাফ, গ্রেম স্মিথের সেই দল নয়। এই দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভারতের দক্ষিণ আফ্রিকায় হারাতে পারা উচিত ছিল।

এই লেখায় আমরা যখন অধিনায়ক বিরাটকে নিয়ে আলোচনা করব, তখন হর্ষের এই উক্তির কাছে আবার ফিরতে হবে। কিন্তু আপাতত এখানে তিনি যা বলেছেন তাকে বিরাটের ব্যাটিং বিচারে কাজে লাগালে কী পাব? বুঝতে পারব যে বিরাটের খেলোয়াড় জীবনের বেশিরভাগ সময় জুড়ে যেসব বোলিং আক্রমণের মোকাবিলা তাঁকে করতে হয়েছে, সেগুলো ক্রিকেটের ইতিহাসে কোথাও জায়গা করে নেওয়ার মত নয়।

অতীতে টেস্ট ক্রিকেটে প্রায় সব দলেই অন্তত একজন সত্যিকারের ফাস্ট বোলার থাকতেন। ‘সত্যিকারের’ বলতে যে বোলারের গতিই মূল শক্তি, স্পিড গানের যুগে বলতে হবে – ঘন্টায় ১৪৫ কিলোমিটারের বেশি। গাভস্করের আমলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের তেমন ৪-৫ জন ছিলেন – অ্যান্ডি রবার্টস, জোয়েল গার্নার, কলিন ক্রফট, মাইকেল হোল্ডিং, ম্যালকম মার্শাল। দম ফেলার ফুরসত পাওয়া যেত না। অস্ট্রেলিয়ার ছিল ডেনিস লিলি আর জেফ থমসনের জুটি, সঙ্গী হিসাবে লেন প্যাসকোর মত কেউ কেউ জুটে যেতেন। ইংল্যান্ডের ছিলেন বব উইলিস, পাকিস্তানের ইমরান খান। নিউজিল্যান্ডের রিচার্ড হেডলি তো একাই একশো। শচীনের আমলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ছিল কার্টলি অ্যামব্রোস আর কোর্টনি ওয়ালশের জোড়া ফলা। সঙ্গে কখনো ইয়ান বিশপ, কখনো প্যাট্রিক প্যাটারসন, কখনো উইনস্টন বেঞ্জামিন বা কেনেথ বেঞ্জামিন, কখনো আবার সেই বার্বাডোজের বিভীষিকা ফ্র্যাংকলিন রোজ। পাকিস্তানের সঙ্গে রাজনৈতিক কারণে বিরাটের একটাও টেস্ট খেলা হল না, শচীনও অল্পই খেলেছেন। কিন্তু যখন খেলেছেন তখন পাকিস্তানের হয়ে বল করেছেন ওয়াসিম আক্রম-ওয়াকার ইউনিস, শোয়েব আখতার। শচীনের ক্রিকেটজীবনের শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ার জোরে বোলার ছিলেন মার্ভ হিউজ, ক্রেগ ম্যাকডারমট, মার্ক হুইটনিরা। পরে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে তাদের বোলিং আক্রমণ। নেতৃত্বে গ্লেন ম্যাকগ্রা, যিনি ঠিক ‘ফাস্ট’ বোলার নন, কিন্তু নিখুঁত লাইন লেংথ এবং সুইং আর সিমের ব্যবহারে ক্রিকেট ইতিহাসে অনন্য। গতি জোগাতে তাঁর পাশে এসে যান ব্রেট লি। তাছাড়াও ছিলেন জেসন গিলেসপি। পল রিফেল, মাইকেল কাসপ্রোউইচ, ড্যামিয়েন ফ্লেমিংরা আসা যাওয়া করেছেন। একমাত্র ইংল্যান্ডেই সে যুগে ডমিনিক কর্ক আর অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ ছাড়া সত্যিকারের জোরে বোলার আসেনি, কিন্তু নিউজিল্যান্ড পেয়েছিল শেন বন্ডকে। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত শচীনের আমলে অ্যালান ডোনাল্ডের নেতৃত্বে এসে পড়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার জোরে বোলাররা – ব্রেট শুলজ, ব্রায়ান ম্যাকমিলান, গতি কম হলেও প্রায় ম্যাকগ্রার মত নিখুঁত ফ্যানি ডেভিলিয়ার্স, লান্স ক্লুজনার, শন পোলক; পরের প্রজন্মে মাখায়া এনতিনি, ডেল স্টেইন, মর্নি মর্কেল।

বিরাট খেললেন কাদের? সারা পৃথিবীতে ক্রিকেট যে হারে বেড়েছে তাতে জোরে বোলারদের পক্ষে গতি ধরে রাখা যে শক্ত তা বলাই বাহুল্য। বিরাটের ক্রিকেটজীবনে গোটা বিশ্বে ১৪৫+ কিলোমিটার/ঘন্টা গতিতে বল করা বোলার হাতে গোনা। একমাত্র ২০১৩-১৪ সাল নাগাদ মিচেল জনসনের সেই গতি ছিল, পরের দিকে ইংল্যান্ডের জোফ্রা আর্চার আর মার্ক উডের। কিন্তু আর্চার ভারতের বিরুদ্ধে মাত্র দুটো টেস্ট খেলেছেন, উড খেলেছেন চারটে। বিরাটের সময়ের বিশ্বসেরা বোলার বলতে দক্ষিণ আফ্রিকার কাগিসো রাবাদা, ইংল্যান্ডের সুইং শিল্পীদ্বয় জেমস অ্যান্ডারসন আর স্টুয়ার্ট ব্রড, অস্ট্রেলিয়ার ত্রয়ী মিচেল স্টার্ক-জশ হেজলউড-প্যাট কামিন্স। রাবাদা, স্টার্ক আর কামিন্স নিজেদের সেরা দিনে নতুন বলে ১৪০-১৪৫ কিলোমিটার/ঘন্টা গতিতে বল করেন। বল পুরনো হয়ে গেলে, পিচ বোলিং সহায়ক না হলে স্টার্ককে ভীষণই নিরামিষ দেখায়। এতটাই, যে ২০১৪ সালে শেন ওয়ার্ন বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করেছিলেন – স্টার্কের শরীরী ভাষা এবং পারফরম্যান্স ‘সফট’। ২০২২ সালে তো বলে দিয়েছিলেন স্টার্ককে দল থেকে বাদ দেওয়া উচিত। কামিন্স তেমন নন, কিন্তু তিনিও কদাচিৎ ব্যাটারকে স্রেফ গতিতে পরাস্ত করেন। হেজলউডের তো গতি অস্ত্রই নয়। তিনি খানিকটা ম্যাকগ্রার মত, মূলত লাইন লেংথ আর বাউন্স ব্যবহার করে সুইং আর সিমের উপর নির্ভর করেন।

ব্রড আর অ্যান্ডারসন যখন তরুণ ছিলেন তখন রাবাদা বা স্টার্কের মত গতিতেই বল করতেন, কিন্তু বিরাটের কেরিয়ার যত এগিয়েছে তত ওঁদের বয়স বেড়েছে এবং গতি কমেছে। ওঁরা মূলত সুইং শিল্পী। তাতেই বিরাটকে বিস্তর নাকানি চোবানি খাইয়েছেন। সেই কারণেই ইংল্যান্ডে ১৭ খানা টেস্ট খেলে বিরাটের গড় মাত্র ৩৩.২১ (১০৪৯ রান, শতরান ২, অর্ধশতরান ৫)। সুইং বোলিং নির্ভর আরেকটা দেশ হল নিউজিল্যান্ড, যাদের দলে টিম সাউদি আর ট্রেন্ট বোল্টের মত বোলার ছিলেন এবং যারা বিরাটের যুগের অন্যতম সেরা টেস্ট দলও বটে। সেই নিউজিল্যান্ডের মাটিতে বিরাট খেলেছেন মাত্র চারটে টেস্ট, গড় ৩৬। নিজের দেশে বা ইংল্যান্ডে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালেও নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিরাটের রেকর্ড বলার মত নয়। সাউদি-বোল্টের দেশের বিরুদ্ধে মোট চোদ্দখানা টেস্ট খেলে এক হাজার রানও করে উঠতে পারেননি, গড় মাত্র ৩৮.৩৬।

তবু তো বেশকিছু বিশ্বমানের সুইং বোলারকে খেলতে হয়েছে, যে ঝামেলায় বিরাটকে একেবারেই পড়তে হয়নি, তা হল বছরের পর বছর উঁচু মানের স্পিনারদের খেলা। শচীন, লারা, পন্টিং, কালিসদের যুগের মত শেন ওয়ার্ন, মুথাইয়া মুরলীধরন, মুস্তাক আহমেদ, সাকলিন মুস্তাকদের মানের স্পিনার আজ একজনও নেই। নাথান লায়ন বড়জোর প্রয়াত ডেরেক আন্ডারউডের মানের। ঘরের মাঠে একটা সিরিজে গ্রেম সোয়ান আর মন্টি পানেসরের বিরুদ্ধে গোটা ভারতীয় ব্যাটিং লাইন-আপ ল্যাজেগোবরে হয়েছিল সেই ২০১২-১৩ মরশুমে, বিরাটও হয়েছিলেন। ওই দুজনের কেরিয়ার লম্বা হলে আলাদা কথা ছিল। কিন্তু সোয়ান দ্রুত অবসর নিয়ে নেন আর পানেসর নাইট ক্লাবে অত্যধিক পান করে ফেলে কেলেঙ্কারি বাধিয়ে ইংল্যান্ড দল থেকে বিতাড়িত হন, ফিরতে পারেননি। বিরাটের ক্রিকেটজীবনে পাকিস্তানের হয়ে অন্তত দুজন বিশ্বমানের স্পিনার টেস্ট ক্রিকেট খেলেছেন – সঈদ আজমল আর ইয়াসির শাহ। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে বিরাটের খেলা হয়নি। কেরিয়ারের শেষদিকে ভারতের মাটিতে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের আনকোরা স্পিনারদের খেলতে গিয়েই বিরাটের কী হাল হয়েছে আমরা দেখেছি। বিরাটভক্তরা অবশ্য এর মধ্যেও তাঁর মহানতা খুঁজে বার করেন। তিনি নাকি অধিনায়ক হিসাবে জিততে চান বলে ভীষণ স্পিন সহায়ক পিচ বানাতে বলতেন, তাই তত রান করতে পারেননি। একই কারণে নাকি তাঁর সমসাময়িক রোহিত শর্মা, অজিঙ্ক রাহানে, চেতেশ্বর পূজারাও দেশের মাঠে স্পিনের বিরুদ্ধে সুবিধা করতে পারেননি। এর চেয়ে হাস্যকর যুক্তি কিছু হতে পারে না। তার কারণ অনেকগুলো।

প্রথমত, ভারতে চিরকালই স্পিন সহায়ক পিচ হয়। এরকম পিচে খেলেই ভারতীয় ব্যাটাররা বড় হন। তাই শচীন, গাভস্কর, রাহুলের মত সর্বকালের সেরাদের কথা ছেড়ে দিন; নভজ্যোৎ সিং সিধুর মত সাধারণ ব্যাটারও দেশের মাঠে স্পিনারদের বিরুদ্ধে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করতেন। ওয়ার্ন এখানে এসে সুবিধা করতে পারেননি, মুরলীরও ভারতের মাটিতে গড় ৪৫.৪৫, যেখানে তাঁর গোটা কেরিয়ারে গড় ২২.৭২। অথচ ওঁদের দলের বিরুদ্ধে ভারতের কুম্বলে, হরভজন সিং প্রমুখ কিন্তু দিব্যি উইকেট নিয়ে গেছেন। সেওয়াগও স্পিনারদের ত্রাস ছিলেন, মহম্মদ আজহারউদ্দিন বা ভিভিএস লক্ষ্মণ ব্যাট করলে তো স্পিন বোলিং একটা করার যোগ্য কাজ বলেই মনে হত না। সুতরাং স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে বিরাট এবং তাঁর প্রজন্মের অন্য ভারতীয় ব্যাটাররা স্পিনটা ভাল খেলতে পারেন না।

দ্বিতীয়ত, স্পিনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতা সত্ত্বেও দেশের মাটিতে বিরাট কিন্তু অনেক রান করেছেন। চোদ্দটা শতরান সহ ৫৫ টেস্টে ৪৩৩৬ রান, গড় ৫৫.৫৮। এই রানগুলো কোন ধরনের পিচে হয়েছিল তাহলে?

তৃতীয়ত, যদি বলা হয় বিরাটের অধিনায়কত্বে এমন ঘূর্ণি পিচ বানানো হত যা ভারতে অভূতপূর্ব এবং তাতে যে কোনো স্পিনার বল করলেই খেলা শক্ত হত, তাহলে মানতে হবে যে ৬৮ টেস্টে অধিনায়কত্ব করে ৪০ খানা জিতে নেওয়ার যে রেকর্ড, তাতে পিচের অবদান বিরাটের অধিনায়কত্বের চেয়ে বেশি। উপরন্তু, রবিচন্দ্রন অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজার কৃতিত্বও তাহলে যতখানি বলা হয় ততখানি নয়। যে কোনো দুজন স্পিনারই ওই ম্যাচগুলো জিতিয়ে দিতে পারতেন। বিরাটভক্তরা এ যুক্তি মানবেন কি?

বিরাটের অধিনায়কত্ব এবং তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে ব্যাটিং নিয়ে কথাবার্তা শেষ করে নেওয়া যাক। এই যে দেখা গেল সত্যিকারের ফাস্ট বোলার এবং উচ্চমানের স্পিনারদের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বিরাট শেষ করলেন ৪৭ গড়ে, তা থেকে কী কী প্রমাণ হয় ভাবি।

তিনি বিশ্বের সর্বকালের সেরাদের মধ্যে তো পড়েনই না, এমনকি পরিসংখ্যানের দিক থেকে ভারতের সেরা পাঁচজন ব্যাটারের মধ্যে পড়লেও নৈপুণ্যে তিনি গাভস্কর, শচীন, রাহুলের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। বরং লক্ষ্মণের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা যায়। দুজনেই অস্ট্রেলিয়ায় সফল আর লক্ষ্মণও কোনোদিন ইংল্যান্ডের মাটিতে সুবিধা করতে পারেননি। বিরাটের ওখানকার রেকর্ডটা তবু ভদ্রস্থ দেখায় ২০১৮ সালের দ্বিতীয় সফরটার জন্যে। ইংল্যান্ড সফরকে যে কোনো ব্যাটারের জাত চেনানোর পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়। সেখানে বিরাটের চেয়ে এমনকি দিলীপ বেঙ্গসরকর আর সৌরভ গাঙ্গুলিও বেশি সফল

তবে শুধু সেকথা নয়। গাভস্কর গোটা ক্রিকেটজীবনে কত হারা ম্যাচ বাঁচিয়ে দিয়েছেন তার হিসাব করাই শক্ত। তা বাদে ১৯৭৬ সালে পোর্ট অফ স্পেনে চতুর্থ ইনিংসে ৪০৩ রান তাড়া করার সময়ে তাঁর ম্যাচ জেতানো শতরান বিপক্ষ বোলিং আর পরিস্থিতির বিচারে মহাকাব্যিক। তেমনই অবিশ্বাস্য ১৯৭৯ সালে লন্ডনের ওভালে চতুর্থ ইনিংসে ৪৩৮ তাড়া করতে নেমে ২২১ রান, যা ভারতকে এক অভাবনীয় জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল। এমনকি গাভস্করের জীবনের শেষ টেস্ট ইনিংসকে বলা হয় ঘূর্ণি উইকেটে উচ্চমানের স্পিনের বিরুদ্ধে ব্যাটিংয়ের টিউটোরিয়াল। ওই মানের কোনো ইনিংস বিরাটের ব্যাট থেকে এসেছে কি?

১৯৯৮ সালে চিপকে সিরিজের প্রথম টেস্টেই শচীনের ওয়ার্নকে দমিয়ে দেওয়া ১৫৫, ওই মাঠেই পরের বছর চতুর্থ ইনিংসে আক্রম-ওয়াকার-সাকলিন সমৃদ্ধ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৩৬ – এসব ছিল অতিমানবিক ইনিংস। কারণ ব্যাটার একক লড়াই লড়ছিলেন। তেমন ইনিংসই বা বিরাট খেললেন কবে? পাকিস্তান ম্যাচটা তো তাও জেতাতে পারেননি শচীন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে চিপকের ঘূর্ণি উইকেটে সোয়ান-পানেসর জুটির বিরুদ্ধে চতুর্থ ইনিংসে শতরান করে সে কাজও করে দিয়েছিলেন। ২০০৪ সালে সিডনিতে তাঁর অপরাজিত ২৪১ রানও ভোলার নয়। ওই ইনিংস যে ঋষিপ্রতিম সংযমের দৃষ্টান্ত, সেকথা বারবার বলা হয়। যা আমরা খেয়াল করি না, তা হল কতগুলো স্কোরিং শট তূণে থাকলে অফসাইডে ড্রাইভ করা প্রায় বন্ধ করে দিয়েও অতগুলো রান করা যায়। বিরাটের হাতে যদি অতরকম শট থাকত, তাহলে শেষ পাঁচ বছরে সাফল্যের লেখচিত্র এভাবে নামত না।

দুই লিটল মাস্টারের তবু অনেক ভক্ত আছে, বিস্তর লেখালিখি হয় ওঁদের নিয়ে। কিন্তু দ্রাবিড়? জীবনের প্রথম টেস্ট সিরিজ ইংল্যান্ডে, দলে তখন ডামাডোল। লর্ডসে অভিষেকেই ৯৫ চাপা পড়ে গিয়েছিল সৌরভের ঝলমলে শতরানের পাশে। কিন্তু নিজের নবম টেস্টেই সব গাছ ছাড়িয়ে ওঠে তাঁর মাথা। জোহানেসবার্গে ডোনাল্ড, পোলক, ম্যাকমিলান, ক্লুজনারের বোলিংয়ে ১৪৮ আর ৮১ করেন। ২০০২ সালে হেডিংলিতে সবুজ পিচে মেঘলা দিনে ১৪৮ তো প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে জেতার অসামান্য কাহিনি। এমনকি জীবনের শেষ ইংল্যান্ড সফরেও, যখন গোটা দলের ব্যাটিং ব্যর্থ, দ্রাবিড় চারটে টেস্টে তিনটে শতরান করে গেছেন। আর এই রত্নখচিত মুকুটের কোহ-ই-নূর অবশ্যই ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ইডেন টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসের ১৮০। বিরাট কোন বিচারে এঁর চেয়ে বড় ব্যাটার?

বিরাট নিজের প্রজন্মেরও এক নম্বর ব্যাটার নন। স্মিথ আর রুট তো বটেই, কেন উইলিয়ামসনের (১০৫ টেস্টে ৯,২৭৬ রান; গড় ৫৪.৮৮, শতরান ৩৩) সঙ্গেও টেস্টে তাঁর তুলনা চলে না।

নিঃসংশয়ে বিরাট নিজের প্রজন্মের সেরা ভারতীয় টেস্ট ব্যাটার। ব্যাট হাতে তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব অস্ট্রেলিয়ার মাঠে রীতিমত মস্তানি। ২০১৪-১৫ মরশুমে চার টেস্টে চারটে শতরান অবিস্মরণীয়। অ্যাডিলেডে দুই ইনিংসেই শতরানও অসাধারণ কীর্তি। পরবর্তীকালেও অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর সেরা খেলা বেরিয়ে এসেছে। ও দেশে সাতখানা শতরান, নিজের কেরিয়ারের গড়ের চেয়ে বেশি গড়ে রান করা যে কোনো ব্যাটারের পক্ষে গর্বের। তিরিশটা শতরান করেছেন, ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দ্বিশতরানও করেছেন। এ তো চাট্টিখানি কথা নয়।

পরিসংখ্যানের বাইরে চলে গেলে অবশ্য বলতে হয় যে গত শতকের তুলনায় এই শতকে অস্ট্রেলিয়ার পিচগুলোর চরিত্র বদলেছে অনেক। তাতে রান করা সহজ হয়েছে। ১৯৯১-৯২ সফরে ভারত যে পিচগুলোতে খেলেছিল তার প্রচণ্ড গতি এবং বাউন্স আজও টের পাওয়া যায় ইউটিউব খুললে। তার সঙ্গে গত ১০-১৫ বছরের পিচগুলোর তফাত বোঝা কঠিন নয়। এই তফাত হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় ড্রপ-ইন পিচ ব্যবহার শুরু হওয়ার পর থেকে। ভারতের এবারের অস্ট্রেলিয়া সফরে পার্থের অপটাস স্টেডিয়ামের পিচ বরং নয়ের দশকের ওয়াকা (Western Australia Cricket Association) মাঠের পিচের কাছাকাছি আচরণ করেছে। এখানে একটা ছোট্ট পরিসংখ্যান হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আজ পর্যন্ত মাত্র চারটে ত্রিশতরান হয়েছে। প্রথমটা এসেছিল ১৯৬৬ সালে মেলবোর্নে বব কাউপারের ব্যাট থেকে। বাকি তিনটেই এই শতাব্দীতে। প্রথমে ২০০৩ সালে ম্যাথু হেডেন পার্থে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ৩৮০ করেন, তারপর ২০১২ সালে ভারতের বিরুদ্ধে অ্যাডিলেডে মাইকেল ক্লার্ক করেন অপরাজিত ৩২৯ আর ২০১৯ সালে সিডনিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ডেভিড ওয়ার্নার অপরাজিত ছিলেন ৩৩৫ রানে।

অধিনায়কত্ব ও উত্তরাধিকার

হর্ষ ভোগলের যে মন্তব্যের কথা উল্লেখ করেছিলাম গোড়ার দিকে, তার কাছে ফিরে যাওয়া যাক। মহেন্দ্র সিং ধোনি আর বিরাটের আমলে ভারতীয় দলের কোচ, টিম ডিরেক্টর ইত্যাদি পদে থাকা রবি শাস্ত্রী যা-ই বলে থাকুন, ঘটনা হল বিরাটের আমলে ভারতের টেস্ট দলের বিদেশে সাফল্য মোটেই ঈর্ষণীয় নয়। হর্ষ একেবারে সত্যি কথা বলেছিলেন। বিরাটের আমলে ভারত নিউজিল্যান্ডকে নিউজিল্যান্ডে হারাতে পারেনি, দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে দুর্বল দলটাকে সামনে পেয়েও দুবারের চেষ্টায় একবারও সিরিজ জিততে পারেনি। গর্ব করার মত সাফল্য বলতে পরপর দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা। তার মধ্যে ২০২০-২১ মরশুমে কিন্তু প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে লজ্জাজনকভাবে ৩৬ রানে অল আউট হয়ে গিয়েছিল বিরাটের ভারত। দ্বিতীয় টেস্ট থেকে তিনি ছিলেন না। মেলবোর্নে লড়াকু শতরান করেন অস্থায়ী অধিনায়ক রাহানে, ভারত জেতে। তারপর সিডনির তৃতীয় টেস্টে হনুমা বিহারী আর অশ্বিন শেষদিনে অত্যাশ্চর্য ব্যাটিং করে ম্যাচ বাঁচিয়ে দেন। ব্রিসবেনে চতুর্থ টেস্ট জিতে ভারত সিরিজ পকেটস্থ করে। এই জয়ের কৃতিত্বও অধিনায়ক বিরাটের হলে আইআইটি, আইআইএম তৈরির কৃতিত্ব ইংরেজদের।

আমাদের আজকাল তথ্যের প্রতি প্রবল অনীহা আর নাটকীয়তার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ। তাই বিরাটের অবসর ঘোষণার পর থেকেই প্রচুর লেখালিখি হচ্ছে ২০২১ সালের লর্ডস টেস্ট নিয়ে। সেখানে চতুর্থ ইনিংসে ৬০ ওভার মত বল করার সুযোগ পেয়ে ভারত ইংল্যান্ডকে ৫১.৫ ওভারেই অল আউট করে ম্যাচ জিতে নেয়। শোনা গিয়েছিল, বিরাট ইংল্যান্ডের ইনিংস শুরুর আগে দলের সবাইকে বলেছেন ‘এই ৬০ ওভার যেন ওদের জন্যে নরক হয়ে দাঁড়ায়’। তারপর ওই জয়। সুতরাং বলা হচ্ছে – ওই আগ্রাসনই ভারতীয় ক্রিকেটকে বিরাটের দান, ওই তাঁর উত্তরাধিকার। যা বলা হচ্ছে না, তা হল, ওই সিরিজটাও কিন্তু ভারত জেতেনি। ঠিক পরের টেস্টেই প্রথম ইনিংসে ভারত ৭৮ রানে অল আউট হয়ে যায়, বিরাট নিজে করেন সাত। আগ্রাসনের ‘আ’ দেখা যায়নি। ম্যাচটা ইনিংসে হারতে হয়।

ভারত ২-১ এগিয়ে থাকা অবস্থায় সিরিজের শেষ টেস্ট খেলাই হয়নি অদ্ভুত কারণে। শাস্ত্রী আর বিরাট কোভিডজনিত বায়ো বাবল ভেঙে এক বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে চলে গিয়েছিলেন। তারপর দেখা যায় শাস্ত্রী, ফিল্ডিং কোচ শ্রীধর, বোলিং কোচ ভরত অরুণ কোভিড পজিটিভ। ফলে ভারত আর শেষ টেস্ট খেলতে চায়নি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের অবশ্য অভিযোগ – তার কয়েকদিন পরেই আইপিএল ফের চালু হওয়ার কথা ছিল। ভারতীয় ক্রিকেটাররা তার জন্যে সুস্থ থাকতেই টেস্টটা খেলতে চাননি। না হয় সেকথা আমরা বিশ্বাস করলাম না। কিন্তু যে বিরাট টেস্ট অন্তপ্রাণ ছিলেন বলে লেখালিখি চলছে, তিনি কোন আক্কেলে বায়ো বাবল ভেঙে অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন ঠিক শেষ টেস্টের আগে? এ প্রশ্ন এতদিন কেউ তোলেননি, আর তুলেই বা কী হবে? যা-ই হোক, ওই পঞ্চম টেস্ট খেলা হয় পরের বছর জুলাইয়ে। ততদিনে বিরাটের টেস্ট অধিনায়কত্ব চলে গেছে। সে ম্যাচে ভারত হারে, সুতরাং সিরিজের ফল হয় ২-২। তার আগের সফরে, অর্থাৎ ২০১৮ সালে, বিরাট প্রায় ছশো রান করলেও সিরিজটা কিন্তু ৪-১ ব্যবধানে হারতে হয়েছিল।

একথা ঠিক যে বিরাটের নেতৃত্বে ভারতকে ভারতে কেউ হারাতে পারেনি। কিন্তু সে এমন কিছু চোখ কপালে তোলার মত ব্যাপার নয়। ভারত সম্পর্কে চিরকালই বলা হত – দেশে বাঘ বিদেশে বেড়াল। গতবছর নিউজিল্যান্ডের কাছে ৩-০ হারার আগে ভারত ঘরের মাঠে শেষ সিরিজ হেরেছিল ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের কাছে। তার আগে ২০০৪-০৫ মরশুমে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট-পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার কাছে। তার আগের সিরিজ হার ছিল ১৯৯৯-২০০০ মরশুমে, হ্যানসি ক্রোনিয়ের দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। অর্থাৎ আড়াই দশকে মোটে চারটে সিরিজ হার। আর গত শতকের ইতিহাস?

অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। সেই অস্ট্রেলিয়া ২০০৪-০৫ মরশুমের ওই জয়ের আগে ভারতে শেষ জিতেছিল ১৯৬৯-৭০ সালে। ইংল্যান্ডের আগের সিরিজ জয় ছিল ১৯৮৪-৮৫ মরশুমে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ দেশে এসে শেষবার সিরিজ জিতেছে ১৯৮৩-৮৪ মরশুমে। শ্রীলঙ্কা আজ পর্যন্ত জেতেনি, নিউজিল্যান্ড তো গতবছরই প্রথম জিতল। তারা শেষবার এ দেশে একটা টেস্ট ম্যাচই জিতেছিল সেই ১৯৮৮ সালে, তাও ১৯৬৯ সালের পর। এমনকি পাকিস্তান, যাদের সঙ্গে আমাদের আবহাওয়া এবং পিচের চরিত্র সবচেয়ে বেশি মেলে, তারাও ১৯৫২-৫৩ থেকে ২০০৭-০৮ পর্যন্ত ভারত সফরে এসে সিরিজ জিততে পেরেছিল মাত্র একবার – ১৯৮৬-৮৭ মরশুমে।

অন্যদিকে ভারতের বিদেশ সফরের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ইংল্যান্ডই একমাত্র দেশ যেখানে ভারত মাঝেমধ্যেই সিরিজ জিতেছে। অধিনায়ক হিসাবে অজিত ওয়াড়েকর জিতেছেন (১৯৭১), কপিল জিতেছেন (১৯৮৬), দ্রাবিড় জিতেছেন (২০০৭)। বিরাট পারেননি। এমনকি নিউজিল্যান্ডেও ভারত মনসুর আলি খান পতৌদি (১৯৬৭-৬৮) আর ধোনির আমলে (২০০৮-০৯) সিরিজ জিতেছিল। বিরাটের আমলে পারেনি।

ভারতকে জোরে বোলারদের দলে পরিণত করা বিরাটের উত্তরাধিকার বলে গণ্য করা হচ্ছে। যেন আটের দশকে ইমরান পাকিস্তানের জন্যে যা করেছিলেন, বিরাট তাই করেছেন। অর্থাৎ ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে খুঁজে খুঁজে আবিষ্কার করেছেন বুমরা, মহম্মদ শামি, মহম্মদ সিরাজ, উমেশ যাদব, ভুবনেশ্বর কুমার প্রমুখকে। অথচ ঘটনা তা নয়, হওয়া সম্ভবও ছিল না। কারণ ভারতীয় দল সারাবছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে বছর পঁচিশেক হয়ে গেল। তার উপর আছে আইপিএল। ফলে বিরাটের মত শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার সুযোগই হয় না। কী করে জানবেন কোথায় কোন ভাল জোরে বোলার আছে? ওই কৃতিত্ব যদি কাউকে দিতে হয় তো দিতে হবে এই পর্বে যাঁরা নির্বাচক ছিলেন তাঁদের। বস্তুত ভারতে জোরে বোলারের সংখ্যা এবং গুণমান বাড়ার একটা ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসের সুবিধাই অধিনায়ক বিরাট পেয়েছেন। একসময় বেদিকে নতুন বলে বল করতে হত, এমনকি গাভস্করও করেছেন দু-একবার। সেখান থেকে বুমরা-শামিতে পৌঁছনো বিরাট নামক কোনো জাদুকরের ইন্দ্রজাল নয়। জিনিয়াস কপিল; তাঁর পিছু পিছু মধ্যমেধার চেতন শর্মা, মনোজ প্রভাকর; তারপর সত্যিকারের গতিময় জাভাগাল শ্রীনাথের সঙ্গে মূলত সুইং বোলার ভেঙ্কটেশ প্রসাদ; অতঃপর জাহির খান, আশিস নেহরা, ইরফান পাঠান, শান্তাকুমারণ শ্রীশান্ত, আর পি সিং; রঞ্জি ট্রফিতে সবুজ পিচ, ন্যাশনাল ক্রিকেট অ্যাকাডেমির যত্ন – এত কিছু পেরিয়ে আজকের জোরে বোলাররা এসেছেন। বস্তুত বিরাট অধিনায়ক হওয়ার আগেই এসে পড়েছিলেন ইশান্ত শর্মা, উমেশ, ভুবনেশ্বর, বুমরা, শামি। এঁদের মধ্যে একমাত্র বুমরার টেস্ট অভিষেকই বিরাটের অধিনায়কত্বে।

তারপর যে জোরে বোলাররা এসেছেন তাঁরা কেউ কিন্তু এখনো ভরসা জাগানোর জায়গায় পৌঁছতে পারেননি। টানা দু-তিনটে সিরিজই খেলে উঠতে পারেন না ফিটনেসের সমস্যায়। প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ, আকাশ দীপ, হর্ষিত রানাদের উপরে পরবর্তী টিম ম্যানেজমেন্টের ভরসা এত কম যে পরপর ৪-৫ খানা টেস্টে সুযোগ দেয় না। অস্ট্রেলিয়া সফরে মেলবোর্নে অবস্থা এমন দাঁড়াল যে অধিনায়ক পারলে বুমরাকে দিয়েই সবকটা ওভার করিয়ে নেন। তাঁকে নিজমুখে বলতে হল – আর পারছি না। শেষ টেস্টে খেলতেই পারলেন না। তাহলে কীরকম পেস ব্যাটারির উত্তরাধিকার অধিনায়ক বিরাটের? উত্তরাধিকার তো তাই, যা একজনের প্রস্থানের পরেও রয়ে যায়।

সুতরাং প্রচারের ঢক্কানিনাদ আর আবেগের বাষ্প সরালে যা দেখতে পাচ্ছি, তা হল বিরাট টেস্ট ব্যাটার হিসাবে সর্বকালের সেরাদের দলে পড়েন না। পড়েন আমলা, লক্ষ্মণদের দলে। এই দলে ঢুকে পড়াও বড় কম কথা নয়। অবশ্য আমলার খাতায় একটা ত্রিশতরান আছে, লক্ষ্মণের এমন একখানা ২৮১ আছে যার জন্যে তাঁর নাম ক্রিকেটের ইতিহাসে অক্ষয়। বিরাটের সেসব নেই। অধিনায়ক হিসাবে পরিসংখ্যানগতভাবে অবশ্যই তিনি ভারতের সেরা, কিন্তু তা ভারতীয় ক্রিকেটের উন্নতির ধারাবাহিকতাতেই। শ্রীকান্তের পর থেকে যাঁরা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি টেস্ট অধিনায়ক হয়েছেন তাঁদের সাফল্যের হার ক্রমশ বেড়েছে। আজহার অতীতের সকলের চেয়ে বেশি সফল, সৌরভ আজহারের চেয়ে বেশি সফল, ধোনি সৌরভের চেয়ে বেশি সফল, বিরাট ধোনির চেয়ে বেশি সফল। আর বিরাটের উত্তরাধিকার কী – সে প্রশ্ন আপাতত উত্তরকালের জন্যে তুলে রাখাই ভাল।

দল হারলেও গুহার চিচিং বনধ হতে দেবে না ক্রিকেট বোর্ড

এঁদের সময় শেষ। সেকথা এঁদের ভক্তরা মানবেন না, তার চেয়েও বড় কথা ক্রিকেট বোর্ড মানবে না। কারণ এই তারকাদের পিছনে টাকার থলি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একগুচ্ছ স্পনসর।

রবিচন্দ্রন অশ্বিন খেললেই কি ভারত ওভালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল জিতে যেত? যশপ্রীত বুমরা যদি ফিট থাকতেন এবং খেলতেন, তাহলে কি ভারত জিতে যেত? ঋষভ পন্থ যদি প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে অন্যের এবং নিজের জীবন বিপন্ন করে শয্যাশায়ী না হতেন, তাহলে কি শেষ ইনিংসে ৪৪৪ রান তাড়া করার বিশ্বরেকর্ড করে জিতিয়ে দিতেন? এগুলোর কোনো ঠিক বা ভুল উত্তর হয় না, কারণ কী হলে কী হত কেউ বলতে পারে না। তবে তথ্য বলছে, ২০২১ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে এই তিনজনই খেলেছিলেন। তবু ভারত হেরেছিল। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সময়ে এই তিনজনের উল্লেখযোগ্য অবদান সত্ত্বেও ভারত সেই ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পরে আর কোনো আইসিসি টুর্নামেন্টেই খেতাব জেতেনি। শুধু টেস্ট ক্রিকেটের কথাই যদি বলি, গত দশ বছরে দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা ছাড়া ভারতের আর কোনো বলার মত সাফল্য নেই। দেশের মাঠে দাপটে যে কোনো দলকে হারিয়ে দেওয়ার রেকর্ড ভারতের টেস্ট ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। কিন্তু অতীতে একাধিক ভারতীয় দল ইংল্যান্ডে টেস্ট সিরিজ জিতেছে, নিউজিল্যান্ডে জিতেছে। এর একটাও রবি শাস্ত্রী-বিরাট কোহলি, রাহুল দ্রাবিড়-কোহলি বা দ্রাবিড়-রোহিত শর্মার দ্বারা হয়ে ওঠেনি। এমনকি গত দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ভাঙাচোরা, নতুন মুখদের নিয়ে তৈরি দলটার কাছেও হেরে এসেছে এই দল। সুতরাং এই একটা ম্যাচে অমুক, অমুক আর অমুক থাকলেই ভারত জিতে যেত কিনা সে প্রশ্ন না তুলে বরং অন্য কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর জানা আছে কিনা দেখুন।

১) কোন টেস্ট খেলিয়ে দেশের নির্বাচন সমিতিতে যতজন নির্বাচক থাকার কথা ততজন নেই
২) কোন টেস্ট খেলিয়ে দেশের নির্বাচন সমিতিতে প্রধান নির্বাচক বলে কেউ নেই?
৩) কোন টেস্ট খেলিয়ে দেশের জাতীয় দল নির্বাচনের পর কোনো সাংবাদিক সম্মেলন হয় না?

জানেন কি, এই তিনটে প্রশ্নেরই উত্তর ভারত? যে কোনো খেলার আন্তর্জাতিক স্তরটাকে যাঁরা পেশাদার এবং সর্বোচ্চ গুরুত্বের ব্যাপার বলে মনে করেন, তাঁরা নিশ্চয়ই বুঝবেন যে দিনের পর দিন এই ফাজলামি চালিয়ে গিয়ে বিশ্ব খেতাব কেন, কোনো সিরিজই জেতার আশা করা উচিত নয়।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী পাঁচজন নির্বাচক থাকার কথা। কিন্তু আছেন চারজন – শিবসুন্দর দাস, সুব্রত ব্যানার্জি, সলিল আঙ্কোলা আর শ্রীধরণ শরথ। এ বছর জানুয়ারি মাসে পাঁচ সদস্যের নির্বাচক কমিটিই ঘোষণা করা হয়েছিল, তার একজন চেয়ারম্যানও ছিলেন – চেতন শর্মা। কিন্তু পরের মাসেই তাঁকে পদত্যাগ করতে হয় একটা স্টিং অপারেশনে নির্বাচন সংক্রান্ত কিছু তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার ফলে। তারপর চার মাস কেটে গেছে। ভারত দেশের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট ও একদিনের সিরিজ খেলল। প্রথম দুটো টেস্টের দল নির্বাচনের সময়ে চেতন ছিলেন। তারপর থেকে দল নির্বাচন করেছেন ওই ভাঙাচোরা নির্বাচন সমিতি এবং তার অন্তর্বর্তীকালীন চেয়ারম্যান শিবসুন্দর। মনে রাখা ভাল, এ বছর অক্টোবর-নভেম্বরে ভারতে একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ। ফলে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে একদিনের সিরিজটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার দল নির্বাচনও করে ওই ভাঙা নির্বাচন কমিটি। বলা বাহুল্য, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের দল নির্বাচনের সময়েও পঞ্চম নির্বাচককে নিয়োগ করার কথা ভাবেনি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড। এভাবে বোধহয় পয়সা বাঁচানো হচ্ছে। বোর্ড সভাপতি জয় শাহের ক্রিকেটবুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, গত কয়েক বছরে তাঁর সম্পত্তি যেভাবে কয়েক হাজার গুণ বেড়েছে তাতে তাঁর ব্যবসাবুদ্ধি নিয়ে তো আর প্রশ্ন তোলা চলে না।

মজার কথা, নির্বাচন সমিতি নিয়ে এই ধাষ্টামোর সূচনা কিন্তু চেতনের পদত্যাগ থেকে শুরু হয়নি। গত নভেম্বরে কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ থেকে ভারত বিদায় নেওয়ার পর এর আগের নির্বাচন সমিতিকে ঘটা করে বরখাস্ত করে বোর্ড। সেই নির্বাচন সমিতিতেও চারজন সদস্যই ছিলেন, এবং কী আশ্চর্য! তখনো চেয়ারম্যান ছিলেন চেতনই। অর্থাৎ যে ব্যর্থতার দায় ঘাড়ে চাপিয়ে অন্য তিন নির্বাচক সুনীল যোশী, দেবাশিস মোহান্তি আর হরবিন্দর সিংকে বিদায় করে দেওয়া হল; সেই ব্যর্থতার কাণ্ডারী চেতনকে আবার নির্বাচন সমিতির চেয়ারম্যান করে নিয়ে আসা হয়েছিল।

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, ক্রিকেট বোর্ড দল নির্বাচনকে তেমন জরুরি ব্যাপার বলে মনে করে না। সেটা দল ঘোষণার ভঙ্গিতেও পরিষ্কার। ভারতীয় ক্রিকেটে দস্তুর ছিল প্রধান নির্বাচক সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে দল ঘোষণা করেন। ক্রিকেটজীবনে অতি সাধারণ এমএসকে প্রসাদ, প্রশাসক হিসাবে বিশালকায় রাজ সিং দুঙ্গারপুর বা ক্রিকেটার হিসাবেও যথেষ্ট সফল দিলীপ ভেংসরকার – কেউ প্রধান নির্বাচক হয়ে এর অন্যথা করেননি। কিন্তু সেসব বন্ধ হয়ে গেছে জয় বোর্ড সভাপতি হওয়ার পর থেকে। এখন দিনের কোনো একটা সময়ে বোর্ড প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে খেলোয়াড় তালিকা জানিয়ে দেয়। তারপর কে বাদ পড়লেন আর কাকে বিশ্রাম দেওয়া হল তা নিয়ে গুজব পল্লবিত হয়।

সবচেয়ে শোচনীয় ব্যাপার হল, ঘরোয়া ক্রিকেটে দিনের পর দিন ভাল খেলেও যে তরুণ ক্রিকেটাররা দলে সুযোগ পান না, তাঁদের কেন নেওয়া হল না তার জন্য জবাবদিহি করা হয় না। ভারতীয় ব্যাটিংয়ের টপ অর্ডার ফর্মে নেই কোভিড অতিমারীর আগে থেকে। কালে ভদ্রে এক-আধটা অর্ধশতরান বা শতরান করে উদ্ধার করেন। অধিকাংশ ইনিংসে শেষদিকে পন্থ, রবীন্দ্র জাদেজা বা শার্দূল ঠাকুর সম্মানজনক স্কোরে পৌঁছে দেন দলকে। সেই কারণেই বোলার হিসাবে বিদেশের মাঠে কল্কে না পেলেও ওঁদেরই খেলানো হয় সেরা বোলার অশ্বিনকে বসিয়ে রেখে। যেদিন জাদেজা, শার্দূলরাও পেরে ওঠেন না, সেদিন মধ্যাহ্নভোজনের আগেই খেলা শেষ হয়ে যায়, যেমন রবিবার ওভালে হল। অথবা দল খটখটে রোদের দিনেও ৩৬ অল আউট হয়ে যায়, যেমনটা ঘটেছিল ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর অ্যাডিলেডে।

এভাবে সিরিজ বা বড় ম্যাচ জেতা সম্ভব নয় বলেই ভারত অধিকাংশ ক্ষেত্রে জেতে না। অথচ ঘুরে ফিরে সেই রোহিত, সেই চেতেশ্বর পূজারা, সেই অজিঙ্ক রাহানে, সেই কোহলি খেলেই চলেছেন। এদিকে মুম্বাইয়ের ২৫ বছরের ছেলে সরফরাজ খান ৩৭ প্রথম শ্রেণির ম্যাচে সাড়ে তিন হাজার রান করে বসে আছেন প্রায় ৮০ গড়ে। তিনি কেন সুযোগ পান না জবাব দেওয়ার কেউ নেই। বাংলা দলের অভিমন্যু ঈশ্বরন (৮৭ ম্যাচে ৬৫৫৬ রান, গড় প্রায় ৪৮) পরপর বেশ কয়েকটা রঞ্জি ট্রফিতে ধারাবাহিকভাবে রান করে যাচ্ছেন। তাঁরও মেঘে মেঘেই বেলা বাড়ছে। এরকম আরও নাম আছে।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট বয়স ঢেকে ফেলছে বিজ্ঞাপনে

বাদ গিয়ে ফেরত আসা রাহানে ওভালে দুই ইনিংসেই ভারতের সেরা ব্যাটার ছিলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে রোহিত আর কোহলিও বেশ ভাল ব্যাট করলেন। কিন্তু দেখা গেল, তাঁদের যথেষ্ট ভাল ফর্মও আর দলের জন্য যথেষ্ট নয়। ভারত দুশোর বেশি রানে হারল। ক্রিকেট জগতে একথার একটাই মানে হয়। এঁদের সময় শেষ। সেকথা এঁদের ভক্তরা মানবেন না, তার চেয়েও বড় কথা ক্রিকেট বোর্ড মানবে না। কারণ এই তারকাদের পিছনে টাকার থলি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একগুচ্ছ স্পনসর। খেলা সরাসরি সম্প্রচারকারীদের প্রাণ তাদের হাতে, আর সম্প্রচারই হল বোর্ডের ধনরত্নে ভরা গুহা। হারজিতের কথা ভেবে কি আর ও গুহার চিচিং বনধ হতে দেওয়া যায়? যায় না বলেই বয়সের যুক্তিতে ঋদ্ধিমান সাহাকে রাহুল দ্রাবিড় বলে দিতে পেরেছিলেন, এবার তুমি এসো। কিন্তু কোহলিদের বয়স চোখে দেখতে পান না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত