মহাভারত ২: আজকের মহাকাব্য

অভিমন্যুকে আমরা ক্ষণজন্মা প্রতিভাবান যোদ্ধা হিসাবে ভাবতেই অভ্যস্ত, যার যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা অথচ বয়সের কারণে চক্রব্যূহ সম্পর্কে অসম্পূর্ণ জ্ঞান তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই নাটকের অভিমন্যুর ট্র্যাজেডি কিন্তু তাকে আজকের পৃথিবীর যুবকের অনেক কাছাকাছি এনে দিয়েছে।

‘তোমরা কার পক্ষে?’

‘হস্তিনাপুরের পক্ষে।’

দুর্যোধন খুশি হন না, সশস্ত্র বাহিনী প্রজাদের পিছনে এসে দাঁড়ায়।

‘তোমরা কার পক্ষে?’

‘কৌরবদের পক্ষে।’

দুর্যোধন তাতেও খুশি হন না, প্রজাদের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলে আরও বেশি সৈনিক।

‘তোমরা কার পক্ষে?’

‘দুর্যোধনের পক্ষে।’

এবার দুর্যোধনের মুখে হাসি ফোটে।

নটধা নাট্যদলের প্রযোজনা মহাভারত ২-এর এই দৃশ্যে দুর্যোধন আসলে কে? শাসক দলই দেশ আর দলের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিই দল – এই সূত্রটা কেমন চেনা চেনা লাগছে না? ওই দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় – India is Indira and Indira is India। এবছর জরুরি অবস্থার ৫০ বছর পূর্ণ হল। কিন্তু সে তো আজকের গতিময় দুনিয়ায় আদ্যিকালের কথা। তখন আমার জন্ম হয়নি, এই নাটকের অভিনেতাদের অধিকাংশেরও জন্ম হয়নি। তাহলে ২০২৫ সালের এক সন্ধ্যাতেও এই নাটক এত জ্যান্ত মনে হয় কেন? কারণ আজও, যা মহাভারতে নেই তা ভারতে নেই। উলটো দিক থেকে দেখলে, মহাভারতে যা যা আছে তার সবই ভারতে আছে। আজও আছে। ফলে শিব মুখোপাধ্যায়ের কলমে, অর্ণ মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় মহাভারতের উদ্যোগ পর্বের এই সৃজনান্তর কখনো প্রাচীন মনে হয় না, সেকেলে তো নয়ই।

মহাভারত মহাকাব্য, কারণ প্রত্যেক পাঠেই সেখান থেকে বেরিয়ে আসে কোনো না কোনো নতুন বয়ান। মহাভারত ২ নাটকে মহাকাব্যের পরিচিত চরিত্রগুলো থেকেও নাট্যকার বের করে এনেছেন আশ্চর্য নতুন সব পরত। যেমন শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দ্রৌপদীর সখ্য বহু আলোচিত, কিন্তু এখানে সেই সম্পর্কের অন্য এক মাত্রারও আভাস দেওয়া হয়েছে। দ্রৌপদীর প্রতি যৌন বুভুক্ষায় পাণ্ডবরা যে কৃষ্ণকেও সন্দেহ করে এবং তাদের নিজেদের মধ্যেকার সম্পর্কে ছায়া ফেলে দ্রৌপদীর প্রতি কামনা – তাও জীবন্ত হয়ে উঠেছে মঞ্চে। পাণ্ডবদের কাছে দ্রৌপদীর প্রত্যাশা, নিজের অপমানের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে তাদের যুদ্ধের দিকে চালনা করার তীব্র অভিলাষে সোহিনী সরকারকে দেখে মনে পড়ে অডিও ক্যাসেটে শোনা নাথবতী অনাথবৎ নাটকের শাঁওলী মিত্রকে। কিন্তু এখানে, বিশেষত দ্বিতীয়ার্ধে, যোগ হয়েছে অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার খিদের সঙ্গে মা হিসাবে সন্তানকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্যে গ্লানিবোধ। এই দ্বিধায় ভিতরে ভিতরে তছনছ হতে থাকা, অথচ প্রবল ব্যক্তিত্বশালী পাঞ্চালীকে জীবন্ত করে তুলেছেন সোহিনী।

আবার ছবিতে মহাভারত, রাজশেখর বসুর মহাভারত বা দূরদর্শনের মহাভারতেও যে খল মামা শকুনিকে দেখা যায়, এই নাটকের শকুনি তার থেকে ভিন্ন এক চরিত্র। এমনকি বহুবছর আগে একক নাটক শকুনির পাশা-য় বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় শকুনির খল হয়ে ওঠার কাহিনির মধ্যে দিয়ে তার যে অসহায়তা তুলে ধরেছিলেন, এই শকুনির অসহায়তা তার চেয়েও বেশি। ভাগ্নে দুর্যোধন ক্ষমতার মদে মত্ত হয়ে এই শকুনিকে বিশ্বাস করে না। শকুনিও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে তার চেহারা দেখে, কর্ণকে বোঝায় – দুর্যোধন এমন এক একাকিত্বে পৌঁছেছে যেখানে মামা বা নিকট বন্ধুও তার ব্যবহার্য বস্তু মাত্র। এই ভীত, নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা শকুনির চরিত্রে আশ্চর্য অভিনয় করেছেন ঋতম। যুগপৎ শারীরিক ও মানসিক আঘাতে পঙ্গু একটা মানুষকে দেখিয়েছেন তিনি।

বিরাট রাজকন্যা উত্তরার যে অর্জুনের প্রতি অনুরাগ ছিল – এর ইঙ্গিতটুকু আছে মহাভারতে। বলা আছে বিরাটরাজ অর্জুনকেই জামাই করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অর্জুন বলেন যেহেতু উত্তরা তাঁর শিষ্যা, তাই তিনি তাকে বিয়ে করতে পারেন না। বিয়ে হোক অভিমন্যুর সঙ্গে। এই নাটকে সেই ইঙ্গিতকে অবয়ব দেওয়া হয়েছে। প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকা থেকে পুত্রবধূ হয়ে যাওয়ার নিরুচ্চার বেদনা বেশ ফুটিয়ে তুলেছেন উপাবেলা, যদিও অর্জুনের চরিত্রে শুভম আগাগোড়াই আড়ষ্ট। উপরন্তু অভিমন্যুর চরিত্রাভিনেতা জ্যোতির্ময় আর শুভমকে প্রায় সমবয়সী মনে হয়েছে, উপাবেলার সঙ্গে জ্যোতির্ময়ের রসায়নও তেমন ঘনীভূত হয়নি।

তবে এই নাটকের অভিমন্যুর চরিত্র সবচেয়ে চমকপ্রদ। অভিমন্যুকে আমরা ক্ষণজন্মা প্রতিভাবান যোদ্ধা হিসাবে ভাবতেই অভ্যস্ত, যার যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা অথচ বয়সের কারণে চক্রব্যূহ সম্পর্কে অসম্পূর্ণ জ্ঞান তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই নাটকের অভিমন্যুর ট্র্যাজেডি কিন্তু তাকে আজকের পৃথিবীর যুবকের অনেক কাছাকাছি এনে দিয়েছে। তার সমরানুরাগে কোনো গৌরব নেই, বরং যুদ্ধ লাগলে নিজেরই আত্মীয়দের হত্যা করতে হবে ভেবে সে বিহ্বল। অনেকটা গীতার গোড়ার দিকের অর্জুনের মত। অথচ এমনভাবে তাকে বড় করা হয়েছে যে যুদ্ধ ছাড়া জীবনের কোনো সার্থকতা আছে বলেও তার জানা নেই। এই দ্বন্দ্বে সে আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে যায়। ভারতীয় সমাজে আত্মহননের চেষ্টাকে সচরাচর কাপুরুষতা বলেই ধরা হয়। অভিমন্যুকে সেই পথে টেনে নিয়ে গিয়ে নাট্যকার চরিত্রটার গা থেকে সমস্ত নায়কোচিত অলঙ্কার খুলে নিয়ে তাকে রক্তমাংসের মানুষে পরিণত করেছেন। তাই এই অভিমন্যুকে দেখে, উত্তরার সঙ্গে তার প্রেমের দৃশ্য দেখে মনে পড়ে ইংরেজ কবি উইলফ্রেড ওয়েনের কবিতায় বর্ণিত সেই তরুণদের, যাদের যুদ্ধযাত্রার বর্ণনায় কবি লেখেন এইসব পংক্তি

So secretly, like wrongs hushed-up, they went.
They were not ours:
We never heard to which front these were sent.

Nor there if they yet mock what women meant
Who gave them flowers.

Shall they return to beatings of great bells
In wild trainloads?
A few, a few, too few for drums and yells,
May creep back, silent, to still village wells
Up half-known roads.

তরুণদের মধ্যে যুদ্ধোন্মাদনা জাগিয়ে তুলে, তাদের প্রাণহানিকে বীরত্ব নাম দিয়ে সেই আগুনে হাত সেঁকার সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যেহেতু আসলে গৃহযুদ্ধ, সেহেতু এই নাটকের অভিমন্যুকে দেখে আরও মনে পড়ে তরুণ গল্পকার প্রবুদ্ধ ঘোষের ‘আনন্দ ময়দান ছেড়ে পালায়নি’ গল্পের আনন্দকে। তাকে ক্ষমতাসন্ধানী এক পণ্ডিতজি শিখিয়েছিলেন যে এতদিন আসল ইতিহাস জানতেই দেয়নি কেউ। ‘কীভাবে জবরদস্তি মেরেছে, মন্দির-মঠ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ওদের জন্যই দেশভাগ আর খুন। রামনাথ স্বামীর বইতে লেখা আছে তুর্কিরা বাংলা দখল করতে আসার অনেক আগে থেকে সুফি-টুফিরা বাংলায় এক-ধারসে ধর্ম পালটে দিচ্ছিল। গান গেয়ে সম্মোহন করত। তারপর গরু খাইয়ে দিত, সুন্নত করিয়ে দিত বাচ্চাদের তুলে এনে। আনন্দর কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে রাগে। বল্লাল সেন, লক্ষ্মণ সেন প্রজাদের বাঁচাতে কিছু বর্ণের ভাগ তৈরি ক’রে দিয়েছিল। সে তো নিজেদের ধর্ম বাঁচাতেই।’ সেই গল্পের শেষে ‘আনন্দর বুকে চাপাতির কোপ পরিচ্ছন্নভাবে নেমে আসবে। যন্ত্রণায়, রক্তের ফোঁটায় চোখ খুলতে পারবে না। আগুনের হলকা আরও বাড়বে কারণ মিছিল থেকে ছুটে যাওয়া লোক মহল্লার ঘরে আগুন দিচ্ছে। বোম আর গুলির আওয়াজে আনন্দর কান বুজে আসবে। ঠোঁট নড়বে। স্যার, ওরা আমাদের মিছিলে ইট মেরেছে। নোংরা নোংরা খিস্তি।’ কেন মরছে আনন্দ? কারণ ‘রিষড়ায় রামনবমীর মিছিলে সংঘর্ষ। দোকানে আগুন। পাথরবৃষ্টি। আহত প্রায় পনেরোজন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভরতি নুরুল আলম নামে এক ব্যক্তি। সংঘর্ষে মৃত এক যুবক। যুবকের পরিচয়…’

এবং দুর্যোধন। রাজশেখর লিখেছেন ‘দুর্যোধন মহাভারতের প্রতিনায়ক এবং পূর্ণ পাপী।’ এই নাটকের দুর্যোধন পূর্ণ পাপী ঠিকই, কিন্তু সে একাধারে এই নাটকের প্রতিনায়ক এবং নায়ক। এই চরিত্রে অর্ণ পুরাণের প্রতিনায়কের মধ্যে থেকে তুলে এনেছেন একজন সুচতুর একনায়ককে, যে সন্ত্রাস কায়েম করে জনমত নিয়ে আসতে পারে নিজের দিকে, তারপর চরম শঠতায় স্বয়ং কৃষ্ণকেও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়ে নিজমুখে বলে যে সে যুদ্ধ চায় না। তারপর আতঙ্কিত জনতার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেয় ‘বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’। আত্মম্ভরিতার উত্তুঙ্গ শিখর অর্ণ দেখিয়ে দিয়েছেন তাঁর অভিনয়ে। তিনি কখনো সচেতনে, কখনো অবচেতনেই নিজেকে বলেন সুযোধন। অভিনয়ে অন্যমনস্কতা তুলে ধরার আশ্চর্য ক্ষমতা দেখিয়েছেন অর্ণ। খোঁড়া মামা শকুনি, বাবা অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকেও তিনি শারীরিক পীড়ন করতে ছাড়েন না। অর্ণর অভিনয় তুঙ্গে ওঠে ধৃতরাষ্ট্রের (কৌশিক চট্টোপাধ্যায়) সঙ্গে একান্ত মুহূর্তগুলোতে এবং কৃষ্ণের (অর্পণ ঘোষাল) সঙ্গে নাচের দ্বন্দ্বযুদ্ধে। নাটকের একেবারে শেষদিকে, যুদ্ধে যাওয়ার আগে মা গান্ধারীর (সাধনা মুখোপাধ্যায়) কাছে বিদায় নেওয়ার দৃশ্যে একেবারে অন্য এক দুর্যোধন বেরিয়ে আসে। মঞ্চের উপর গর্ভস্থ শিশুর মত কুঁকড়ে শুয়ে পড়েন অর্ণ, তারপর মাকে বলে যান – দুর্যোধনের মনে কেবল অন্ধকার, কারণ বাবা জন্মান্ধ আর মা স্বেচ্ছান্ধ। তাই তাকে আলো দেখানোর কেউ ছিল না। নাটকের সবচেয়ে বড় খল চরিত্রের যাবতীয় পাপ সত্ত্বেও ওই দৃশ্যে কঠিন হয়ে পড়ে দুর্যোধনের জন্যে চোখ ভিজে আসা আটকানো।

স্নেহান্ধ ধৃতরাষ্ট্রের ক্ষমতা ও অক্ষমতা মাত্র কয়েকটা সুযোগে জীবন্ত করে তোলেন কৌশিক। অর্ণর সঙ্গে তাঁর মুহূর্তগুলো বহুদিন মনে থাকার মত। একান্ত অনুচরকে যখন তিনি বলেন যে তাঁকে খাদের সামনে দাঁড় করালেও তিনি তাকেই বিশ্বাস করবেন, কারণ অন্ধ লোকের বিশ্বাস করা ছাড়া কোনো উপায় নেই – তখন তৈরি হয় এমন মুহূর্ত, যখন পরম সত্যকে ছুঁয়ে ফেলতে পারেন একজন অভিনেতা। ফলে সন্দেহ হয় – ধৃতরাষ্ট্র আসলে কে? দৃষ্টিহীন রাজা, বখে যাওয়া ছেলের স্নেহান্ধ বাবা, নাকি কোনো দেশের একনায়কের প্রোপাগান্ডায় নিজের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলা নাগরিক? ধৃতরাষ্ট্র কি এমন এক বিকল্পহীন রাজনৈতিক অবস্থার শিকার, যেখানে লম্পট ছেলে দুঃশাসনকেও তাঁর সময়ে সময়ে দুর্যোধনের চেয়ে ভাল বলে মনে হয়?

দুঃশাসনের চরিত্রে যে লাম্পট্য ছাড়াও অনেককিছু আছে, তা সামান্য সুযোগেই দেখিয়ে দিয়েছেন সৌরভ। ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর একার কয়েকটা মাত্র মুহূর্ত দুঃশাসন চরিত্রের একমাত্রিকতা ঘুচিয়ে দিয়েছে।

আরও পড়ুন জনপ্রিয় বাংলা ছবির সযত্ন সন্ধানে তালমার রোমিও জুলিয়েট

কৃষ্ণের চরিত্রে অর্পণ মুরলীধর হিসাবে পাণ্ডব এবং দ্রৌপদীর সঙ্গে সাবলীল। কিন্তু কূটনীতিবিদ হিসাবে কর্ণ (অনুজয় চট্টোপাধ্যায়), শকুনি বা ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে দৃশ্যগুলোতে তাঁকে যতখানি ভারি দেখানো উচিত ছিল, তা দেখায় না। অন্যদিকে এই সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অভিনেতা অনুজয়ের বিশেষ কিছু করার নেই এই নাটকে।

তবে মানানসই আবহসঙ্গীত এবং এত নিপুণ অভিনয় সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত এই প্রযোজনার সেরার শিরোপা বোধহয় নাট্যকারকেই দিতে হবে। তাঁর নির্মিত চরিত্রগুলো বেদব্যাসের মহাকাব্যের মতই বহুবর্ণ, উপরন্তু সমসাময়িক। স্ত্রী ভানুমতীর (স্বাগতা) সঙ্গে একমাত্র একান্ত দৃশ্যে দুর্যোধনের মুখে শোনা যায়, সকলের ভয়ের পাত্র হওয়ার মধ্যে এক ধরনের মাদকতা আছে। একনায়কদের মনস্তত্ত্বের গভীর থেকে তুলে আনা এই সংলাপ শাশ্বত সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

নীলকণ্ঠ হয়ে সময়ের বিষ ধারণ করেছে নটধার নাটক

সংলাপের এবং অভিব্যক্তির অন্তরঙ্গতায় নাটক শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই দর্শকের সামনে থেকে মুছে যায় রসিকতা আর হিংসার, প্রশংসা আর বিদ্রুপের, বাস্তব আর কল্পনার, ভালবাসা আর ষড়যন্ত্রের সীমারেখা।

১৯৮৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মহেশ ভাটের ছবি কাশ, জনপ্রিয় সিনেমার এক ব্যর্থ নায়ক ও তার স্ত্রীর প্রেম-অপ্রেমের আখ্যান। সেই বেদনাবিধুর ছবিতে দুজনের মাঝখানে ছিল এক শিশুসন্তান। তার আসন্ন অনুপস্থিতি ছবিটিকে শেষপর্যন্ত এক ট্র্যাজিক অথচ শান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে গিয়েছিল। এখন ২০২৪। মাঝের এই চার দশকে পৃথিবী আমূল বদলে গেছে, সিনেমাসহ সমস্ত শিল্পমাধ্যমের ভোল পালটে গেছে। জঁ লুক গোদারের মত দিকপাল স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেওয়ার আগে সিনেমার মৃত্যুই ঘোষণা করে গেছেন। এ যুগে প্রথমে দারুণ সফল, তারপর ‘আর্ট সাইকেলের নিয়মে’ ব্যর্থ এক চলচ্চিত্র নির্মাতা, যে বিশ্বাস করে সিনেমা স্রেফ দুরকম – ভাল আর খারাপ, এবং তার সফল অধ্যাপিকা স্ত্রীর সন্তানহীন জীবন অনেক বেশি জটিল তথা রোমাঞ্চকর হতে বাধ্য; সে শিল্পীর মনোজগতেই হোক বা বহির্জগতে। বলিউডি ছবি বানাতে গেলে দর্শককে কিছুটা শ্বাস ফেলার জায়গা দিতেই হয়। মহেশের সেই বাধ্যবাধকতা ছিল। নাটকের নির্দেশক অর্ণ মুখোপাধ্যায়ের সেই বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে সৌমিত দেবের কলমে বিজনে বিষের নীল নাটক, ইরা লেভিনের ডেথট্র্যাপ নাটকের স্বীকরণ হলেও, থ্রিলারের সীমা ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছে আজকের মানুষের একাকিত্ব, ঈর্ষা, অবসাদ, অবদমিত কামনা বিষয়ক রোমহর্ষক সন্দর্ভ।

বিজনে বিষের নীল টানটান নাটক, দর্শককে পলক ফেলতে দেয় না – এসবই ঠিক কথা, তবে আলাদা করে না বললেও চলে। দর্শককে সচকিত রাখতে যেসব কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোও নাটকের দর্শকদের কাছে যে খুব অভিনব তা নয়। যা অভিনব তা হল অভিনেতাদের, বিশেষত দুই মুখ্য চরিত্র সুদর্শন ব্যানার্জি আর মায়া চৌধুরীর ভূমিকায় যথাক্রমে অর্ণ আর উপাবেলার, ব্যক্তিগত জীবন আর অভিনয়ের সীমা মুছে দেওয়ার দুঃসাহসিক প্রয়াস। মঞ্চসজ্জায় নিজেদেরই অল্পবয়সের অন্তরঙ্গ ছবি ঝুলিয়ে দেওয়া সেই দুঃসাহসের কণামাত্র। সংলাপের এবং অভিব্যক্তির অন্তরঙ্গতায় নাটক শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই দর্শকের সামনে থেকে মুছে যায় রসিকতা আর হিংসার, প্রশংসা আর বিদ্রুপের, বাস্তব আর কল্পনার, ভালবাসা আর ষড়যন্ত্রের সীমারেখা।

সিনেমার দুনিয়ায় একসময় গগনচারী, অধুনা পরপর তিনটে ফ্লপ ছবির পর দূরে নিক্ষিপ্ত নির্দেশক চরিত্রের অবসাদ আর ঈর্ষা শরীরে ফুটিয়ে তুলতে অর্ণ যে চঞ্চল পদচারণা, বিক্ষিপ্ত দৃষ্টিপাত এবং ক্রমাগত গা চুলকে যাওয়ার অবতারণা করেছেন তা বিস্ময়কর। নাটকের দ্বিতীয়ার্ধে তাঁর গা চুলকানোর যন্ত্রটাই যখন শিষ্য কণিষ্কের (অর্পণ ঘোষাল) হস্তগত হয়, তা চরিত্রগুলোর পালটাতে থাকা মানসিকতার চমৎকার প্রতিফলন হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন অথৈ: যত্নে নির্মিত ভারতের ট্র্যাজেডি

সুদর্শনের উকিল তলাপাত্র (সুমিত) এবং শালী হৈমন্তীর (তনুজা) চরিত্র এই নাটকে কেবল হাস্যরস উদ্রেককারী নয়, প্লটে তাদের গুরুত্ব অপরিসীম। তবু নাটকের তিনটে পায়া সুদর্শন, মায়া আর কণিষ্কই। মূলত তাদের বিষেই নীল হয়ে থাকে মঞ্চ। ফলে অর্পণের সুদূর মফস্বল থেকে আসা ডোমসন্তানের অভিনয় এক চুল এদিক ওদিক হলে নাটকের বারোটা বাজতে পারত। বস্তুত চরিত্রটা বেশ জটিল। কারণ কণিষ্ক একদিকে আজন্ম হীনমন্যতার শিকার, অন্যদিকে তার মধ্যে আছে প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা। সে বোকা সাজতে জানে। সুদর্শনের প্রতি তার যেমন শ্রদ্ধা আছে, তেমন তাকে অতিক্রম করে যাওয়ার প্রবল খিদেও আছে। কণিষ্কের মধ্যে আত্মসমর্পণ আছে, আবার আক্রান্ত হলে দ্বিগুণ আক্রোশে প্রত্যাঘাত করার সাহসও আছে। মুখে আপাত সরল হাসি ঝুলিয়ে রেখে এই বৈপরীত্য তুলে ধরার কাজটা চমৎকার করেছেন অর্পণ।

উপাবেলা মায়ার চরিত্রের দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা সফলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আবার পারিবারিক ক্ষমতার বিন্যাসে নারী হিসাবে সুদর্শনের নিচে থাকলেও, সেই নতিস্বীকার যে আসলে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা অন্যের হাতে জমা রাখা – তাও ধরিয়ে দিয়েছেন ঋজু অভিনয়ে, বিশেষত শেষাংশে।

অভিনেতাদের যোগ্য সঙ্গত করেছে আবহসঙ্গীত এবং আলোকসম্পাত। তবে মঞ্চের পিছনের পর্দার যে সিনেমাসুলভ ব্যবহার নটধা নাট্যদলের অন্য নাটক নক্ষত্র শিকার-এরও অন্যতম বৈশিষ্ট্য, তা এখানে কোনো কোনো সময়ে বাহুল্য মনে হয়েছে। নাটকের শুরুতে সুদর্শনের মনোজগৎ, তার সিনেমারুচি বোঝাতে ওই পর্দা যথাযথ ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু সর্বদা নাটকে যা চলছে তার লাগসই উদ্ধৃতি ওই পর্দায় ফুটিয়ে না তুললেই বোধহয় ভাল হত। ব্যাপারটা দর্শকের নিজের মত করে দৃশ্য ব্যাখ্যা করে নেওয়ার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে কখনো কখনো। হয়ত এমন দমবন্ধ করা মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারে মনোযোগ দিতে গিয়ে দর্শক গভীরতর বক্তব্য খেয়াল না-ও করতে পারেন – এমন আশঙ্কা থেকে ওই উদ্ধৃতিগুলো পর্দায় দেখানো হয়েছে। কিন্তু কেনই বা নির্দেশক নিজেকে শিক্ষক আর দর্শককে দুর্বল ছাত্রছাত্রী বলে ভাববেন? হাত ধরে পরীক্ষা বৈতরণী পার করিয়ে দেওয়া তো নির্দেশকের কাজ নয়। তিনি এবং তাঁর সহশিল্পীরা নিজেদের যা বলার আছে, যা করার আছে, তাই তো করবেন। বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব দর্শককেই নিতে হবে। সবাই নিজের মত করে বুঝে নেবেন, সবাই হয়ত সবটা বুঝবেনও না। কে ঠিক বুঝলেন, কে ভুল বুঝলেন তার কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাও তো শিল্পে স্থির করে দেওয়া নেই। মঞ্চে যা দেখা যাচ্ছে আর দর্শক যা দেখছেন, দুয়ে মিলেই তো নাটক। দুয়ের খানিক তফাত থাকলে ক্ষতি কী? দর্শকের বিনোদনের কথা বেশি ভাবতে গিয়েই বোধহয় দ্বিতীয়ার্ধ ঈষৎ দীর্ঘায়িতও হয়েছে। এইটুকু অনুযোগ রইল।

তৎসত্ত্বেও একথা না বললেই নয় যে, বর্তমান কালপর্বে আমাদের সকলের ভিতরেই যে জমা হয়েছে অনেক বিষ, সেই বিষে নীল হয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত, বাইরে থেকে দেখাও যাচ্ছে না সবসময় – এই তেতো সত্যের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করিয়েছে বিজনে বিষের নীল। এত কাছ থেকে সেই ভয়ানক সত্যকে দেখা গেছে এই নাটকে, যে যাঁরা সঙ্গী বা সঙ্গিনীকে নিয়ে দেখতে যাবেন তাঁদের জন্য বিধিসম্মত সতর্কীকরণ হিসাবে বলা যায় – মনে হতে পারে আপনাদের ঝগড়া আড়ি পেতে শুনে নিয়েছেন নাট্যকার ও অভিনেতারা। সুতরাং কেবল থ্রিলারের অভিনয় দেখার রোমাঞ্চ নয়, আয়নার সামনে উলঙ্গ হয়ে দাঁড়ানোর অস্বস্তিও এই নাটক দেখার প্রাপ্তি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অথৈ: যত্নে নির্মিত ভারতের ট্র্যাজেডি

অথৈ ভদ্রলোকের ছবি নয়। ভদ্রলোকেরা ভদ্রলোকের খেলার নাম করে যা যা অক্রিকেটিয় আচরণ করে, সেগুলোকে উলঙ্গ করে ফেলার ছবি। এ ছবির নায়ক একজন ‘ছোটলোক’, অথৈ লোধা, যার গোটা সম্প্রদায় স্বাধীনতার পরেও বেশ কিছুদিন দেশের আইনের চোখে অপরাধপ্রবণ জাত ছিল। আর খলনায়ক একজন ভদ্রলোক। যে সে ভদ্রলোক নয়, একেবারে কুলীন বামুন – অনগ্র চট্টোপাধ্যায়। সে আবার বিদেশে এক পা দিয়ে ফেলা ডাক্তার। এদের জন্যই আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবারের পাতায় ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপন দিয়ে লেখা হয় – ব্রাহ্মণবংশীয়, প্রকৃত সুন্দরী মেয়ে চাই। পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি জগৎ বরাবর এদেরই নিয়ন্ত্রণে। সিনেমা হলগুলোর মালিকদের মধ্যেও লোধাদের সংখ্যা যে শূন্য তা চোখ বুজে বলে দেওয়া যায় (আজকাল তো আবার সিনেমা হল ঢুকে গেছে অতি ধনী, প্রায়শই অবাঙালি উচ্চবর্গীয় মালিকদের মলের পেটে)। তাই ছবিটাও আমাদের দেখতে হয় ভদ্রলোকের চোখ দিয়েই। অনগ্র স্বয়ং এই আখ্যানের সূত্রধার। সে ছোট থেকেই বাড়িতে আশ্রিত সমবয়স্ক অথৈকে ঈর্ষা করেছে, অথচ সবকিছুতেই তার কাছে হেরেছে। খালি পায়ের ফুটবলে তাকে কাটিয়ে ভূপতিত করে গোল করেছে অথৈ। ফলে অনগ্র ওরফে গোগোর প্রিয় খেলা ক্রিকেট। সে ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটের আদবকায়দা অনুসরণ করে অথৈকে চূড়ান্ত খেলাটায় হারিয়ে দিতে নেমেছে — দিয়াকে অথৈয়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার খেলা।

বহুতলবাসী, শহুরে, অরাজনৈতিক বাংলা ছায়াছবির একঘেয়ে জগতে বহুকাল পরে অথৈ একখানা আদ্যন্ত গ্রামীণ এবং রাজনৈতিক ছবি। চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক অর্ণ আর সৃজনশীল পরিচালক অনির্বাণ সে রাজনীতি শুরু করেছেন একেবারে শিল্পী ও কলাকুশলীদের নাম দেখানো থেকে। এ ছবির টাইটেল কার্ডে কারোর নামের সঙ্গে পদবি লেখা নেই। প্রয়োজনে অমুকদা, তমুকদি আছেন। দুজন কৌশিক থাকায় একজন কৌশিকদা আছেন আর একজন কৌশিকবাবু আছেন। অর্ণর চিত্রনাট্য অতীতের বহু শেক্সপিয়রাশ্রয়ী ছবির মত তাঁর আখ্যানকে অবলম্বন করেছে বটে, কিন্তু নিজের রাজনীতির প্রতি বিশ্বস্ততার কারণে ওথেলো ছাড়িয়ে বহুদূর চলে গেছে। বাংলায় জাতপাত নেই – ভদ্রলোকদের এই নিশ্চিন্ত, আত্মপ্রতারক ধারণার গোড়া ধরে টানতে গেলে ঈর্ষা দেখানো দরকার ছিল। যে ঈর্ষায় ভদ্রলোকেরা অথৈয়ের মত সংরক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্রদের বলে – সোনার চাঁদ, সোনার টুকরো। যৌন ঈর্ষার চেয়ে বড় ঈর্ষা নেই। তাই শেক্সপিয়রের নাটকে ইয়াগোর চক্রান্তের মূলে ছিল ক্যাসিওর প্রতি ঈর্ষা, কারণ ওথেলো তার বদলে ক্যাসিওর পদোন্নতি ঘটিয়েছে। অর্ণর চিত্রনাট্যে গোগোর ঈর্ষা কিন্তু অথৈকেই, এবং তা চরমে পৌঁছেছে নিজের কামনার বস্তু দিয়া অথৈকে ভালবেসে তার সঙ্গিনী হয়ে যাওয়ায়।

গোগোর চরিত্রের দিকনির্ণয় করে তার যৌন হতাশা। অথৈ জানে গোগো তার প্রাণের বন্ধু। দুজনের অনেক মিল। দুজনে একই পুরুষের অভিভাবকত্বে একই বাড়িতে বড় হয়েছে। একই স্কুলে, একই মেডিকাল কলেজে পড়েছে। কিন্তু অথৈয়ের শয্যায় থাকে দিয়া, গোগোর শয্যাসঙ্গিনী অকালমৃতা মায়ের ছবি। দুজনেই মায়ের মৃত্যুর দৃশ্য স্বপ্নে দেখে ঘেমে নেয়ে জেগে ওঠে। কিন্তু অথৈকে শান্ত করে বিছানায় ফিরিয়ে আনার জন্য আছে দিয়া, গোগোর আছে শুধু অয়দিপাউস এষণা। মিলির সঙ্গে ভিনসুরার এক ভাঙা বাড়িতে সঙ্গমে তার শরীর সাময়িক সুখ পায়, তার মন শান্তি পায় না।

ভিনসুরা কোথায়? যাঁরা ভাবেন বাংলায় আছে ‘ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড়    ছোটো ছোটো গ্রামগুলি’, তাঁরা ভিনসুরাকে খুঁজে পাবেন না। কিন্তু যাঁরা গজদন্তমিনারে থাকেন না, তাঁরা জানেন ভিনসুরা যে কোনো শহরের মতই পাপবিদ্ধ। সেখানে সুন্দরী মেয়ের বাথরুমে উঁকি মারার চেষ্টা করে গ্রামের গাঁটকাটা, কোনো মেয়ের ফেলে যাওয়া ওড়না নিয়ে হস্তমৈথুন করে পাঁড় মাতাল, বোকা রসিকতায় একদল মেয়ের মন জয় করার চেষ্টা করে সুদর্শন যুবক, সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দায়সারা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া হয় এবং তাতে মন ওঠে না গ্রামের অল্পবয়সীদের। ছেলেরা তো বটেই, গ্রামের মেয়েরাও চটুল আইটেম নাম্বারে মত্ত হয়ে নাচে।

বাঙালি দর্শকের সিনেমা দেখার চোখ কান হয় আবর্জনা, নয় ওপরচালাক ছবি দেখে দেখে এত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সাধারণ দর্শক শুধু নয়, পেশাদার সিনেমা আলোচকরাও আইটেম নাম্বারে কেবল নর্তকীর শরীরটুকুই দেখতে পান। গানের কথাগুলো খেয়ালই করেন না। তাই এই ছবির আলোচনায় এক জনপ্রিয় বাংলা দৈনিকে লেখা হয়েছে, আইটেম নাম্বারটা নাকি অপ্রয়োজনীয় এবং হাস্যকর। কী সেই গানের কথাগুলো?

ওরে তুই ভালোর দলে নাম লিখিয়ে
কী-ই বা পেলি বল
কে করল কদর তোর ভালোকে
(সবাই) পাল্টে নিল দল

(ওরে) আর কতকাল থাকবি বোকা
ভালোর ঘরে শুধুই ধোঁকা
(এসব) ভালোর পোকা পায়ে মাড়িয়ে
দ্বন্দ্ব ভুলে যা

মন্দ হয়ে যা রে
বাবু মন্দ হয়ে যা

ওরে তুই মন্দ হয়ে মজা পাবি
অন্ধকারে ঘর সাজাবি
থাকবি আলোর থেকে দূরে
সাঁতার দিবি রাত পুকুরে

দেখলি অনেক ভালোবেসে
শূন্য পেলি দিনের শেষে
(এবার) যুগের তালে মোহের বিষে
অন্ধ হয়ে যা

মন্দ হয়ে যা রে
বাবু মন্দ হয়ে যা।

সেই অ্যারিস্টটলের আমল থেকে ট্র্যাজেডি কী, ট্র্যাজিক নায়ককে কেন ট্র্যাজেডির সম্মুখীন হতে হয় তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। পণ্ডিতরা বলেছেন ট্র্যাজিক নায়কের চরিত্রে এমন একটা উপাদান (tragic flaw) থাকে যা তাকে অনিবার্যভাবে ট্র্যাজেডির দিকে ঠেলে দেয়। সেই উপাদানের নাম দেওয়া হয়েছে – হ্যামার্শিয়া (Hamartia)। উদাহরণস্বরূপ, ম্যাকবেথের বেলায় সেই উপাদান উচ্চাকাঙ্ক্ষা, হ্যামলেটের বেলায় সিদ্ধান্তহীনতা, ওথেলোর বেলায় সন্দেহ বা ঈর্ষা। কিন্তু আধুনিক সমালোচকদের মতে হ্যামার্শিয়া কোনো চারিত্রিক উপাদান নয়, আসলে ওটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভ্রান্তি (error of judgment)। অথৈয়ের ভ্রান্তিটা তাহলে কী?

সে ভিনসুরাকে, সেখানকার মানুষকে বড় বেশি ভালবাসে, সেই ভালবাসায় অন্ধ হয়ে তাদের ভাল করতে চায়। সে সগর্বে বলে ‘এটা আমার ভিনসুরা’। সে ভিনসুরার সকলকে নিজের মত মনে করে। মুকুলকে (ক্যাসিও), গোগোকে (ইয়াগো), এমনকি দিয়াকেও (ডেসডিমোনা)। কিন্তু তারা মোটেই অথৈয়ের মত নয়। একথা উপলব্ধি না করাই অথৈয়ের ট্র্যাজেডির কারণ। সে যদি মুকুলের এক রাতের মাতলামি ক্ষমা করে দিতে পারত, যদি গোগো তার সঙ্গে এক নোংরা খেলা খেলছে সন্দেহ করেও তাকে বিশ্বাস করে না বসত, যদি দিয়ার মুকুলের প্রতি স্নেহ বুঝতে পারত – তাহলে তার পরিণতি ট্র্যাজিক হত না। কিন্তু আসলে যে ভিনসুরা তার নয়, ভিনসুরার সবাই তার মত নয় – একথা বোঝার ব্যর্থতাই অথৈকে ট্র্যাজিক নায়কে পরিণত করে। ভদ্রলোকেদের ভিনসুরায় অথৈকে একা করে দেয় তার জাতি পরিচয়। সেই পরিচয়জনিত অতীতের বিষময় স্মৃতি, তা থেকে জন্ম নেওয়া হীনমন্যতাই দিয়ার প্রতি আর মুকুলের প্রতি তার সন্দেহকে পুষ্ট করে। অথচ ওই অতীতকে সে ভুলতে পারে না, কারণ সে সগর্বে বলে, অতীতটাই তার পুঁজি।

প্রিয় ভিনসুরার সঙ্গে তার এই অমিল ফুটিয়ে তুলতে যথার্থ ভূমিকা নিয়েছে ওই আইটেম নাম্বার। সকলের উদ্দাম নৃত্য দেখে অথৈ যখন দিয়াকে নিয়ে স্থানত্যাগ করে, তখন পর্দা জুড়ে লেগে থাকে বিষাদ। হাঁ করে আইটেম নাম্বারের আইটেমের দিকে তাকিয়ে থাকলে অবশ্য তা চোখ এড়িয়ে যাবে।

হয়ত নির্দেশক ও চিত্রনাট্যকার হিসাবে অর্ণর এটা প্রথম ছবি বলে এবং সৃজনশীল পরিচালক হিসাবে সঙ্গে অনির্বাণ ছিলেন বলে এ ছবিতে সাবধানী হওয়ার কোনো ব্যাপার নেই, পরীক্ষা নিরীক্ষার কোনো খামতি নেই। কোনটা সফল হয়েছে, কোনটা ব্যর্থ – তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু বাংলা ছবির বাঁধা ছকের একেবারে বাইরে চলে গিয়ে যে এ ছবি বানানো হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এতখানি পরীক্ষামূলক হওয়া সম্ভব হত না সৌমিকের অসাধারণ ক্যামেরার কাজ এবং সংলাপের সম্পাদনা ছাড়া। অর্ণ (অথৈ) আর অনির্বাণের (গোগো) অভিনয় দক্ষতার সবটুকু সৌমিকের ক্যামেরা চেটেপুটে নিয়েছে অসাধারণ সব ক্লোজ আপে, আলো আর অন্ধকারের বৈচিত্র্যে, রঙিন আলোর শিহরণ জাগানো ব্যবহারে। অবিস্মরণীয় দৃশ্য তৈরি হয়েছে, যখন দিয়ার (সোহিনী) প্রতি অথৈয়ের বিশ্বাস একেবারে ভেঙে পড়ে। তারই সঙ্গে ভেঙে পড়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস, শহিদ মিনার – স্মৃতির শহরের, ভদ্রলোকদের তৈরি প্রেমের শহরের একেকটা স্তম্ভ।

আরও পড়ুন মায়ার জঞ্জাল: যে কলকাতা দেখতে পাই না, দেখতে চাই না

আজকের বাংলা ছবির পক্ষে বিরল যত্ন রয়েছে এই ছবির শব্দ ব্যবহারেও। সুগত, দেবাশিস, প্রসূন, অনিন্দিতরা সচরাচর কানে আসে না নেপথ্যের যেসব শব্দ, সেগুলোকেও দর্শকের কানে পৌঁছে দিয়েছেন এবং আখ্যান তার মধ্যে দিয়েও কথা বলেছে। দূরাগত মাইকের বা চলমান পথিকের গুনগুন গানও কানে এসেছে।

এবার অভিনয়ের কথায় আসা যাক। এই চিত্রনাট্য অতি উচ্চমানের অভিনয় দাবি করেছিল। সাধারণ অভিনয় দিয়ে ভিনসুরার লোধা ডাক্তার অথৈয়ের দুনিয়ার ভাঙনকে জলবায়ু পরিবর্তন বা গাজার গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত করার কোনো উপায় ছিল না। এই অসাধ্য সাধন করেছেন অর্ণ। গত কয়েক বছরে কলকাতার থিয়েটার জগতে যে তরুণ অভিনেতারা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছেন, অর্ণ তাঁদের অন্যতম। কিন্তু বড় পর্দায় এত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে তাঁকে আগে দেখা যায়নি। এই অভিনয় কেবল চোখে পড়ার মত নয়, মনে থেকে যাওয়ার মত। অনির্বাণের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মুহূর্তগুলোই হোক বা সোহিনীর সঙ্গে প্রেম-অপ্রেমের অতি দ্রুত যাতায়াতের মুহূর্ত – অর্ণর মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সবকিছু কথা বলেছে। একজন সৎ, হৃদয়বান মানুষ থেকে পশুত্বে ক্রমাবতরণ তিনি নিজের মুখে এঁকেছেন সফলভাবে।

শেক্সপিয়রের ডেসডিমোনা আর বিশাল ভরদ্বাজের ডলি – দুজনের চেয়েই বেশি স্বাবলম্বী ও স্বাধীনচেতা এই ছবির দিয়া। তাকে নায়ক তুলে আনেনি, সে স্বেচ্ছায় নিজের পরিবার ও কেরিয়ার বিসর্জন দিয়ে অথৈয়ের সঙ্গে গণ্ডগ্রামে এসে ঘর বেঁধেছে। এই চরিত্রে সোহিনীর নারীবাদ কখনো শাপমোচন (১৯৫৫) ছবির সুচিত্রা সেনের মত নীরব আত্মবিশ্বাসী, আবার কখনো হলিউডি নায়িকাদের মত সোচ্চার। সোহিনী পর্দায় পাগলের মত প্রেম করেছেন, আবার যার জন্যে সর্বস্ব ত্যাগ করে আসা, তাকে ঠিক সময়ে ঘা মেরে বাঁচানোর চেষ্টাতেও তিনি সপাট। গলা তুলে বলেন, আসলে তো অথৈয়ের প্রশ্ন এটা নয় যে দিয়া মুকুলকে ভালবাসে কিনা। আসল প্রশ্ন হল সে মুকুলের সঙ্গে শুয়েছে কিনা। সোহিনীকে কিছুটা নিষ্প্রভ দেখিয়েছে ক্লাইম্যাক্সে, যখন চলে যাওয়া প্রেমের দিন স্মরণ করে দিয়া গাইছে ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’।

এই নিষ্প্রভতার কিছুটা দায় অবশ্য চিত্রনাট্যকারকেও নিতে হবে। কারণ ওই গান যে অথৈ আর দিয়ার ব্যক্তিগত গান ছিল, তা একবারও দুজনে মিলে গোটাটা না গাওয়ায় খুব ছাপ ফেলেনি। ফলে শেষে ওই গানের অভিঘাত তেমন তীব্র হয় না। চিত্রনাট্যের এই খামতির সঙ্গে একটা বাহুল্যের উল্লেখও করতে হয়। স্টিফেন মোফাত নির্মিত বিবিসির শার্লক ওয়েব সিরিজের পর থেকে অনেক সিরিজ এবং ছবিতেই দেখা যায়, ফ্ল্যাশব্যাক দেখানোর সময়ে বর্তমানের চরিত্র সেখানে উপস্থিত। অথৈ ছবিতেও এই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে অথৈ আর গোগোর ছোটবেলা দেখাতে। কিন্তু ততক্ষণে গোগোর বর্ণনায় এবং অন্যান্য দৃশ্যের কারণে দর্শকের পক্ষে আর বোঝা শক্ত নয় যে ছোট ছেলে দুটো কে, কাদের শৈশব দেখানো হচ্ছে। সুতরাং সেখানে আর প্রাপ্তবয়স্ক গোগোকে না দেখালেও চলত।

‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’ একবার শোনা গেছে অনির্বাণের গলায়, অথৈয়ের সংবর্ধনা সভায়। অনির্বাণ যে সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী তা এতদিনে বাংলা সিনেমা ও নাটকের দর্শকরা জেনে গেছেন। সেই অনির্বাণের ছবির প্রয়োজনে ঈষৎ বেসুরো করে গাওয়া মুনশিয়ানার পরিচায়ক। মঞ্চসফল অথৈ নাটকে অনির্বাণ প্রায় সারাক্ষণ মঞ্চে থাকতেন, ছবিতেও বেশিরভাগ সময়েই পর্দায় তিনি উপস্থিত। এতখানি পরিশ্রম তাঁর অভিনয়ে একবারও ছায়া ফেলেনি। ফুর্তিবাজ অথচ কুটিল, দিলখোলা অথচ নির্দয় গোগো হিসাবে তিনি সারাক্ষণই ফুরফুরে মেজাজ বজায় রাখতে সফল। বস্তুত তাঁর সূক্ষ্ম নির্দয়তা এত প্রবল যে মাঝে মাঝে হেমেন গুপ্তের ৪২ ছবির বিকাশ রায়ের কথা মনে পড়ে যায়। বাংলা ছবি নিয়ে সেই উন্মাদনার যুগ অতিক্রান্ত। নইলে বিকাশ রায়কে দেখে লোকে যেমন ঢিল ছুড়ত শোনা যায়, তেমন অনির্বাণের দিকেও হয়ত উড়ে যেত কিছু চটি জুতো। মোটামুটি ফাঁকা প্রেক্ষাগৃহেও তাঁর দিকে বর্ষিত দু-একটা অভিশাপ কানে এল। এই চরিত্রের অভিনেতার জন্যে তা স্বর্ণপদকের সামিল। এই বহুস্তরীয় চরিত্রের জটিলতা বিচার করলে এটা কি এ পর্যন্ত সিনেমায় অনির্বাণের সেরা অভিনয়? তাঁর ভক্তরা ভেবে দেখতে পারেন।

মুকুলের চরিত্রে অর্পণ, মিলির চরিত্রে মিমি, পিঙ্কির চরিত্রে দিতিপ্রিয়া, রাধুর চরিত্রে সুমিত, মন্টুর চরিত্রে মিলন যথাযথ। গোগোর বাবার চরিত্রে প্রবীণ অভিনেতা কৌশিককে অবশ্য কিছুটা দ্বিধান্বিত মনে হয়। যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি তাঁর কতটা কী করা উচিত।

শেক্সপিয়রের ওথেলো নাটক কীভাবে শেষ হয় সকলেই জানেন, তাই এখানে স্পয়লার দেওয়ার ভয় নেই। অথৈও শেষ হয় একাধিক মৃত্যুতে। কিন্তু অনিবার্য মৃত্যুগুলোকে যে ক্যানভাসে এঁকেছে অর্ণর চিত্রনাট্য, তাতে যেন পড়া যায় অদৃশ্য কালিতে লেখা

যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।

ছোটলোক অথৈয়ের ট্র্যাজিক পরিণতি সত্ত্বেও ভদ্রলোক গোগোর চক্রান্ত তাই ব্যর্থ হয়ে যায়। ট্র্যাজেডির মারে বেশ খানিকক্ষণ চেয়ার ছেড়ে ওঠা যায় না।

বাংলা সিনেমার পক্ষে অবশ্য এ ছবি ট্র্যাজেডি নয়, বরং রীতিমত আশাব্যঞ্জক। অর্ণ স্রেফ এমন একখানা চিত্রনাট্যের জন্যেই প্রশংসা পেতে পারতেন। সঙ্গে নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করেছেন, আবার উঁচু দরের অভিনয়ও করেছেন। অনির্বাণও নির্দেশনার কাজে হাত লাগানোর পাশাপাশি ছবির গান লিখেছেন, এত বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অনায়াস দক্ষতায় অভিনয় করেছেন। একই প্রজন্মে এমন দু-দুজন শিল্পী যে ইন্ডাস্ট্রির সিনেমায় আছেন, সেই ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে একেবারে আশা ছেড়ে দেওয়া অনুচিত।

এ ছবির পাশে দাঁড়াতে হবে না, স্বচ্ছন্দে সামনে বসা যায়।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত