রেউড়ি সংস্কৃতি: যে গল্পে ডান-বাম গুলিয়ে গিয়েছে

১৯৯১ পরবর্তী যুগে দিনরাত মন্ত্রের মত কানের কাছে বলে বলে যে কয়েকটি কথা আমাদের মর্মে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার অন্যতম হল, কোনও পরিষেবা বা পণ্য বাজার থেকে পয়সা দিয়ে না কিনে পাচ্ছে মানেই সেটা দান।

আমি কোন পথে যে চলি, কোন কথা যে বলি
তোমায় সামনে পেয়েও খুঁজে বেড়াই মনের চোরা গলি।

এই প্রকল্প বারবার বিরোধীদের ফাঁপরে ফেলতে সমর্থ হয়। এমন গতিতে এমন এক লেংথে পিচ পড়ে মোদি সরকারের সিদ্ধান্তগুলো, যাতে ব্যাকফুটে যাব না ফ্রন্টফুটে খেলব ঠিক করতে করতেই বিরোধীদের ব্যাট-প্যাডের ফাঁক দিয়ে বল গলে গিয়ে উইকেট ভেঙে দেয়। এই মুহূর্তে যেমন কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের যে শেষ চিহ্নটুকু ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে, সেটুকুও মুছে ফেলতে সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু হয়েছে।

প্রাক্তন বিজেপি মুখপাত্র অশ্বিনী উপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন নির্বাচনী প্রচারে যেসব রাজনৈতিক দল ভোটারদের আকর্ষণ করতে “freebies” দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাদের নির্বাচনী প্রতীক ফ্রিজ করে দেওয়া এবং রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার দাবিতে। পিটিশনার বলেছেন “irrational freebies” অর্থাৎ মুফতে অযৌক্তিক সুযোগসুবিধা বিলোবার আগে তার অর্থনৈতিক প্রভাব আলোচনা করতে হবে। এই মামলার শুনানিতে ১১ আগস্ট মহামান্য প্রধান বিচারপতি এন ভি রামান্না বলে বসলেন, অর্থনীতির ক্ষতি আর মানুষের কল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা দরকার। অবশ্য তিনি যোগ করেছেন “আমি রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার দিকটা দেখতে চাই না। সেটা অগণতান্ত্রিক। হাজার হোক, ভারত তো একটা গণতন্ত্র।” তার আগেই ৩ আগস্ট বিচারকরা বলেছিলেন, ব্যাপারটা গুরুতর। অতএব নীতি আয়োগ, অর্থ কমিশন, আইন কমিশন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং শাসক ও বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটা কমিটি তৈরি হোক মুফতের সুযোগসুবিধার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করতে। ১৭ আগস্ট ছিল এ যাবৎ এই মামলার শেষ শুনানি, আগামী সপ্তাহে ফের শুনানি হওয়ার কথা। মজার ব্যাপার, ১১ তারিখ প্রধান বিচারপতি নিজেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, এ বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ করার কতটুকু অধিকার আছে তা নিয়ে। অথচ সেই যুক্তিতে পিটিশন বাতিল করে দেননি।

এই মামলার শুনানিতে দেশের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার কিছু মন্তব্য একবার দেখে নেওয়া যাক। “এই ফ্রিবি কালচারটাকে এখন শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আর নির্বাচন এখন এই নিয়ে লড়া হয়। ফ্রিবিগুলোকে যদি জনকল্যাণ বলে ধরা হয়, তাহলে বিপর্যয় ঘটবে। এটাই যদি নর্ম হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মাননীয় বিচারকরা নর্মগুলো ঠিক করে দিন। আইনসভা যতক্ষণ না কিছু করছে, মাননীয় বিচারকরা কিছু নর্ম ঠিক করে দিতেই পারেন।”

এই বিতর্কে দুটো জিনিস বিশেষভাবে লক্ষ করার মত। প্রথমত, ফ্রিবি বলতে স্পষ্টতই বোঝানো হচ্ছে সরকার সাধারণ মানুষকে যেসব সুযোগসুবিধা দেয় সেগুলোকে। কারণ প্রধান বিচারপতি বলেছেন অর্থনীতির ক্ষতি (“economy losing money”) আর মানুষের কল্যাণ (“welfare of the people”)— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা দরকার। অর্থাৎ বলেই দেওয়া হল অর্থনীতির কাজ মানুষের কল্যাণ করা নয়। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি তুষার ইঙ্গিত দিয়েছেন আইনসভা ফ্রিবি সম্পর্কে কিছু করবে। অর্থাৎ কোনও আইন প্রণয়ন করবে। সে করতেই পারে। লোকসভায় যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বিজেপির, তাকে ব্যবহার করে এবং রাজ্যসভায় বিল পাশ করাতে অসুবিধা হলে বিরোধী সাংসদদের সাসপেন্ড করে দিয়ে যে কোনও আইনই কেন্দ্রীয় সরকার করে ফেলতে পারে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সরকারের সে পর্যন্তও তর সইছে না। তুষার চাইছেন তার আগেই আদালত কিছু নিয়মকানুন ঘোষণা করুক।

এই জনস্বার্থ মামলা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ এই মামলা দায়ের হওয়ার কিছুদিন আগেই, গত মাসের শেষদিকে, উত্তরপ্রদেশে বুন্দেলখণ্ড এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, দেশে “রেউড়ি কালচার” চালু হয়েছে। রেউড়ি, অর্থাৎ মিষ্টি, বিতরণ করে ভোট কিনে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। দেশের পক্ষে এই সংস্কৃতি খুব বিপজ্জনক। দেশের মানুষকে, বিশেষ করে যুবসমাজকে, এই কালচার সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। রেউড়ি কালচারের লোকেরা এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দর বা ডিফেন্স করিডোর বানাতে পারবে না।

রেউড়ি মন্তব্যের পিছনের ছকটা খুব পরিষ্কার। প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের সংজ্ঞা ঘোর নব্য-উদারবাদী। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য— এসবের উন্নতি হল কি হল না তা নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। উন্নয়ন বলতে তিনি বোঝেন এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দর, ডিফেন্স করিডোর। নব্য উদারবাদী অর্থনীতিতে ভর্তুকি যেমন একটি অশ্লীল শব্দ, তেমনই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সরকারগুলো গরিব নাগরিকদের জন্য যেসব আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করেছে বা বিভিন্ন পরিষেবার মূল্যে বিশেষ ছাড় দিয়ে থাকে— সেগুলোও ক্ষতিকর, অবান্তর। তাই ওগুলোকে রেউড়ি বলা। মতাদর্শগতভাবেই মোদি সরকার ওসবের বিরোধী। সেটা বুঝতে অবশ্য কারও বাকি নেই। ২০১৪ সালের পর থেকে মহাত্মা গান্ধি ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিমকে যেরকম হেলাছেদ্দা করা হয়েছে সেদিকে নজর রাখলেই বোঝা যায়। নতুন কথাটা হল, এবার অন্য দলগুলোর সরকার ও পথে হাঁটতে না চাইলে আইন করে, পারলে আদালতের নির্দেশকে শিখণ্ডী করে তাদের শায়েস্তা করা হবে। এক দেশ, এক অর্থনীতি কায়েম করতে চাইছে মোদি সরকার। সে দেশে রেউড়ি জাতীয় প্রকল্পের কোনো স্থান নেই।

তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক কারণটাও সহজবোধ্য। সাম্প্রতিককালে যে কটা রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপিকে হারতে হয়েছে, তার প্রায় প্রত্যেকটাতেই তাদের পথ আটকে দাঁড়িয়েছে এই কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো, যা রেউড়ি – প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়। আরএসএস-বিজেপির নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি আর ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে দিল্লি আর পাঞ্জাবে আম আদমি পার্টির সস্তায় বিদ্যুৎ, চাষিদের ঋণ মকুবের প্রতিশ্রুতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ভর্তুকি এবং সরকারের সক্রিয়তায় সরকারি স্কুল ও মহল্লা ক্লিনিকের উন্নতির সামনে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের জন্য প্রায় সব বিশ্লেষকই কৃতিত্ব দিয়েছেন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, দুয়ারে সরকারের মত পদক্ষেপকে। কন্যাশ্রীর মত প্রকল্প তো আগে থেকেই চলছিল। স্তালিনের দল দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমও ক্ষমতায় এলে যে গৃহবধূদের রেশন কার্ড আছে তাঁদের মাসে ১০০০ টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সুতরাং নির্বাচনের ময়দানেও এই একটা বাধা বিজেপি কিছুতেই টপকাতে পারছে না। ফলে বিরোধীদের হাতে পড়ে থাকা এই শেষ অস্ত্রটা কেড়ে না নিলেই নয়। তাই এই আক্রমণ।

এবার শুরুতেই যে দ্বিধার কথা বলেছিলাম, সেই আলোচনায় আসি। বিজেপি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক, দুদিক থেকেই যে একটি দক্ষিণপন্থী দল তাতে সন্দেহ নেই। সেই কারণেই কয়েক লক্ষ কোটি টাকার কর্পোরেট কর মকুব করে দেওয়া তাদের মতে ফ্রিবি নয়। কিন্তু কর্মসংস্থানহীন বা দরিদ্র মহিলাদের হাতে সরকার মাসে মাসে নগদ টাকা দিলে অর্থনীতির ক্ষতি হয়ে যাবে, বিপর্যয় সৃষ্টি হবে বলে তাদের চিন্তা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাম দলগুলো, বিধানসভায় শূন্য হলেও যাদের রাস্তাঘাটে প্রধান বিরোধী হিসাবে দেখা যাচ্ছে, তারা প্রায় মোদির সুরেই গত দশ বছর ধরে তৃণমূল সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো সম্পর্কে কথা বলে আসছে কেন? সিপিএমের যে কোনও স্তরের সদস্য এবং সমর্থকরা কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ইত্যাদি প্রকল্প সম্পর্কে “খয়রাতি”, “দয়ার দান”, “টাকা দিয়ে মানুষের মুখ বন্ধ রাখছে”, “মানুষকে দয়ার পাত্র করে দিয়েছে” ইত্যাদি বাক্যবন্ধ ব্যবহার করেন। মানুষ বসে বসে টাকা পেতে ভালবাসে, তাই তৃণমূলকে ভোট দিয়ে যাচ্ছে— এতদূরও বলা হয়। গরিব মানুষ রাজনীতি বোঝেন না, ভিক্ষা পেলেই খুশি— এই জাতীয় অপমানকর মন্তব্যও প্রকাশ্যেই করা হয়। স্রেফ সোশাল মিডিয়ার বিপ্লবীরা নন, শতরূপ ঘোষের মত সংবাদমাধ্যমে দলের প্রতিনিধি হিসাবে নিয়মিত মুখ দেখানো নেতারাও সামান্য পালিশ করা ভাষায় এসব বলে থাকেন।

স্বভাবতই সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির টুইট ছাড়া রেউড়ি বিতর্কে সিপিএমের কোনও সুসংহত বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্গাপুজোর জন্য ক্লাবগুলোকে টাকা দেওয়া আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে টাকা দেওয়াকে তাঁরা এক করে দেখেন কিনা— তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট আলোচনা সিপিএম নেতারা করেন কি? অথচ এই আলোচনা জরুরি। এ রাজ্যে জনমত বলতে যে শ্রেণির মানুষের বক্তব্যকে বোঝানো হয় সাধারণত, সেই শ্রেণির মধ্যে জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে দানখয়রাতি বলে ভাবার মানসিকতা কিন্তু সুদূরপ্রসারী। ভদ্রলোক শ্রেণির যেসব ভোটার তৃণমূলকে ভোট দেন, তাঁরাও “এই শ্রী, ওই শ্রী” না থাকলেই খুশি হতেন। সরকারি কর্মচারীদের ডিএ দিতে রাজ্য সরকারের যে অনীহা তার বিপরীতে ওই প্রকল্পগুলোকে রেখে আলোচনা করতে বাঙালি মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তরা বিলক্ষণ ভালবাসেন। তৃণমূলের নেতা, মন্ত্রীদের দুর্নীতি ফাঁস হলে “এই টাকাগুলো দিয়ে ডিএ দেওয়া যেত না?”— এ প্রশ্ন শোনা যায়। কিন্তু কাউকে বলতে শোনা যায় না “এই টাকা দিয়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে এক হাজার টাকা করে দেওয়া যায় না?” অথচ এঁরা এমনিতে ভাল করেই জানেন পাঁচশো টাকায় আজকাল কিছুই হয় না। আসলে মনে করা হয়, ডিএ পাওয়া অধিকার কিন্তু লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দয়ার দান।

এর কারণ ১৯৯১ পরবর্তী যুগে দিনরাত মন্ত্রের মত কানের কাছে বলে বলে যে কয়েকটি কথা আমাদের মর্মে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার অন্যতম হল, কোনও পরিষেবা বা পণ্য বাজার থেকে পয়সা দিয়ে না কিনে পাচ্ছে মানেই সেটা দান। সরকার দিচ্ছে মানেই দান করছে। আরেকটি কথা হল, চাকুরিজীবীরা করদাতা, গরিব শ্রমজীবী মানুষ করদাতা নয়। তারা করদাতাদের টাকায় বেঁচে থাকা পরজীবী।

এই দুটিই যে সর্বৈব মিথ্যা, তা বোঝানোর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল বামপন্থীদের। কিন্তু সে দায়িত্ব তাঁরা মোটেই পালন করেননি, এখনও করেন না। ভর্তুকি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পণ্য— একথা বলে নব্য-উদারনীতিবাদ। অন্যদিকে, যে কোনও ধরনের বামপন্থার খাতায় এগুলো অধিকার। এটুকু বুঝতে এবং বোঝাতে বামপন্থীদের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বঙ্গ সিপিএমের এই অ আ ক খ প্রবলভাবে গুলিয়ে গেছে। ফলে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের সাফল্যের তালিকা দিতে গিয়ে তাঁরা দিব্যি নানা কল্যাণমূলক প্রকল্পের কথা বলেন। স্কুলের মেয়েদের সাইকেল দেওয়া যে তাঁদের আমলেই চালু হয়ে গিয়েছিল— সেকথাও বলেন। নিজেরা গরিব মানুষের জন্য কম টাকায় খাওয়ার ব্যবস্থা করতে কমিউনিটি ক্যান্টিনও চালান। কিন্তু সরকারি প্রকল্পগুলোকে বলেন দানখয়রাতি।

আমি যেমন করদাতা, আমার বাড়ির পরিচারিকাও করদাতা। তফাত হল আমি আয়কর দিই, তিনি দেন না। কারণ করের আওতায় আসার মত আয় তাঁর নেই। কিন্তু তিনি নিজের আয়ের টাকায় যা যা কেনেন সবেতেই কর দেন। আগের প্রত্যক্ষ করের যুগেও দিতেন, এখন পণ্য ও পরিষেবা করের (GST) যুগেও দেন। সুতরাং লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে যে টাকা পান বা দু টাকা কিলো চালে যে ভর্তুকি পান তাতে তাঁরও অবদান আছে, তিনি পরজীবী নন। ব্যতিক্রম বাদ দিলে এই কথাগুলো সিপিএমের সদস্য, সমর্থকরা নিজেরাই বোঝেন না বা বুঝতে অস্বীকার করেন। অন্যদের আর বোঝাবেন কী করে?

পশ্চিমবঙ্গে বাম দল বলতে অবশ্য শুধু সিপিএম বা বামফ্রন্টের দলগুলোকে বোঝায় না। কিন্তু বিকল্প বামেদের সংগঠন, অন্তত চাক্ষুষ প্রমাণে, আরও সীমিত। কিন্তু তাঁরাও যে রেউড়ি বিতর্কে খুব সোচ্চার এমন নয়। দশ বছর ধরে রাস্তায় নামার মত একাধিক ইস্যু থাকা সত্ত্বেও পথে না নামা সিপিএম অবশেষে পার্থ চ্যাটার্জি, অনুব্রত মণ্ডলের গ্রেফতারির পর বিরোধীসুলভ সক্রিয়তা দেখাচ্ছে। আর বিকল্প বামেরা সক্রিয়তা দেখাচ্ছেন ইডি-সিবিআই যেহেতু বিজেপি সরকারের হাতে, সেহেতু তৃণমূল নেতাদের বিপুল দুর্নীতি নিয়ে কেন পথে নামা উচিত নয় সেই তর্কে। উন্নয়ন মানে কী বা কী হওয়া উচিত— সে আলোচনাতেও মাঝেমধ্যে দেখা যায় ভারতীয় বামপন্থীদের। যে কারণে বেশিরভাগ বামপন্থী দলের কাছেই আজও পরিবেশ কোনও রাজনৈতিক ইস্যু নয়। নব্য-উদারবাদীদের মতই তাঁরা ভাবেন পরিবেশের সামান্য ক্ষতি করে যদি শিল্প হয়, কর্মসংস্থান হয় তাহলে তেমন ক্ষতি নেই। পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের নানা গাঢ়ত্বের লালেরা কিন্তু এ পথে হাঁটছেন না। অর্থাৎ পথ সামনে রয়েছে, কিন্তু উত্তমকুমার অভিনীত অবিনাশের মতই আমাদের বামপন্থীরাও নিজেদের চোরাগলিতে দিশেহারা।

বামেরা কী করছেন, কী বলছেন, তা কেন গুরুত্বপূর্ণ? এই জন্যে, যে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার চিরকাল থাকবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের গা জোয়ারিতেই হোক বা নাগরিকদের ভোটে, প্রাকৃতিক নিয়মেই এই সরকার একদিন চলে যাবে। তখন যে দলের সরকারই আসুক, সরকারি নীতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে দক্ষিণপন্থী ভাবনার যে আসন তৈরি হয়েছে তা ভাঙতে না পারলে ভবিষ্যতেও মানবিক সরকার দেখতে পাব না আমরা। এই ভাঙার দাবি কাদের কাছে করা যায়? বিজেপির কাছে তো নয়। রামচন্দ্র গুহ নিজেকে বলেন “ল্যাপ্সড মার্ক্সিস্ট”। আমারও এক বয়োজ্যেষ্ঠ ল্যাপ্সড মার্ক্সিস্ট বন্ধু আছেন। তিনি সর্বদাই বলেন, বামপন্থীদের থেকে কিছু আশা করা উচিত নয়। কিন্তু বামেদের বাদ দিলে যদি পড়ে থাকে বিজেপি, তাহলে আর উপায় কী? আশা করা বেঁচে থাকার জন্য জরুরি একটা কাজ। সে কাজ তো ছাড়া যায় না।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

%d bloggers like this: