সঙ্ঘারামের রক্তকরবী: রাবীন্দ্রিক অথচ সমসাময়িক

বাংলার শিল্পীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংলাপ জারি আছে, একই সময়ে দু-দুটো নাট্যদল রক্তকরবী মঞ্চস্থ করছে, আর আপনি দেখতে না গিয়েই সবটা জেনে ফেলবেন?

এই মুহূর্তে আফ্রিকার বেশ কিছু দেশে ইবোলা মহামারী চলছে। কঙ্গোয় সেই মহামারীর কেন্দ্রবিন্দু হল প্রবল দারিদ্র্যে ধ্বস্ত শহর মংবোয়ালু। কী আছে সেই শহরে? আছে সোনার খনি, গোটা এলাকার অর্থনীতি সেই খনির উপর নির্ভরশীল। আর সেই খনিতে কাজ করেন প্রচুর প্রবাসী শ্রমিক। অর্থাৎ মাটির নিচে সোনা, অথচ মাটির উপরের মানুষগুলো, সেই সোনা যারা খুঁড়ে বের করে সেই মানুষগুলো, হদ্দ গরিব। প্রয়াত পল ফার্মারের মত চিকিৎসক তথা নৃতত্ত্ববিদ লিখেছেন যে আফ্রিকার কঙ্গো, সিয়েরা লিওনের মত দেশের মানুষকে যুগের পর যুগ সোনা বা হীরের লোভে যেভাবে শোষণ করা হয়েছে, ওখানে বারবার মহামারী দেখা দেওয়ার তা অন্যতম কারণ। সুতরাং ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যদি কারও সন্দেহ হয়, রক্তকরবী নাটকের যক্ষপুরী সম্পূর্ণ কাল্পনিক, তাহলে তাকে মংবোয়ালুর খোঁজ দেওয়াই যথেষ্ট। সেখানে গেলেই দেখা পাওয়া যাবে এই নাটকের ফাগুলাল, চন্দ্রা, কিশোর, বিশু পাগল, গোকুলদের। নন্দিনী আর রঞ্জনের দেখা পাওয়া যাবে কি? সম্ভবত না, কারণ সোনা আর হীরের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ইলন মাস্ক, জেফ বেজোসের মত সর্দারদের হারাতে নন্দিনী আর রঞ্জনের সন্ধানই মানুষের সন্ধান। এই সন্ধান আছে বলেই রক্তকরবী ‘সত্যমূলক’ হলেও নাটক, ইতিহাস নয়। তবে কেবল মংবোয়ালু তো যক্ষপুরী নয়, রক্তকরবী নাটক প্রকাশের শতবর্ষ পরে আজ গোটা দুনিয়াটাই যক্ষপুরী। সেই সত্য তুলে ধরতে ক্যান্টিন আর্ট স্পেসের পর, হাতিবাগান সঙ্ঘারামের সত্যনিষ্ঠ প্রযোজনাও দেখার সুযোগ হল সম্প্রতি।

রক্তকরবী নাটকের উপস্থাপনায় মঞ্চসজ্জা বরাবরই খুব আলোচিত বিষয়। প্রদীপ কুমার পাত্র আর মদন মিস্ত্রি এখানে যে যক্ষপুরী বানিয়ে তুলেছেন তা ধ্রুপদী রবীন্দ্রনাটকের মেজাজ বজায় রেখেই আজকের দুনিয়াকে স্পষ্ট করে তুলেছে। মঞ্চের দুই প্রান্তে রাস্তার আলোর স্তম্ভে ক্লোজ সার্কিট টিভির শ্যেনদৃষ্টি এবং রাজার বন্ধ দরজার ঠিক উপরেও তার উপস্থিতি জর্জ অরওয়েলের 1984 উপন্যাসকে মনে পড়িয়ে দেয়। আমরা সবাই যে এক ডিসটোপিয়ায় বসবাস করছি, আজকের পৃথিবীর ব্যবসায়ীরা এবং রাষ্ট্র যে নজরদারি চালায় নাগরিকদের উপর, সেই আধুনিক সত্য অনায়াসে রাবীন্দ্রিক হয়ে ওঠে যখন বিশু (তথাগত চৌধুরী) ওই ক্যামেরার দিকেই আঙুল তুলে ফাগুলালকে (কল্লোল দে) বলে “তোদের আদর পড়ে যেখানে সর্দারের দৃষ্টি পড়ে সেখানেই, সোনাব্যাঙ যতই মকমক শব্দে কোলাব্যাঙের অভ্যর্থনা করে, সেটা কানে গিয়ে পৌঁছয় বোড়াসাপের।” পরিচালকের কল্পনার সঙ্গে মঞ্চ পরিকল্পনা ও নির্মাণের এই সুর মেলানো অপূর্ব। পাশাপাশি এই মঞ্চ পুঁজিবাদের ধারাবাহিকতাকেও ধারণ করেছে। বড় বড় দাঁতওয়ালা চাকা দেখে মনে পড়ে যায় চার্লি চ্যাপলিনের মডার্ন টাইমস ছবির সেই দৈত্যাকৃতি চাকাগুলোকে। রাজার রহস্যময়তার অনেকটাও মঞ্চসজ্জার কৃতিত্ব। যে অর্ধস্বচ্ছ দরজার ওপার থেকে রাজা (অনুরণ সেনগুপ্ত) কথা বলে, তাতে পড়া রাজার ছায়া তার ভয়ঙ্করতা এবং অসহায়তাকে দর্শকের সামনে অতিকায় করে তোলে।

দীপ্তেশ মুখার্জি আর অভিরূপ দে-র অবদানে এই নাটকে শব্দ ও সঙ্গীত যে আবহ নির্মাণ করেছে তা-ও স্বতন্ত্র উল্লেখের দাবি রাখে। শুরুতেই তালবাদ্য সহযোগে এবং মধুরিমা গোস্বামীর অঙ্গবিন্যাসে সোনা খনন দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করে নেয়।

অভিনয়ের আলোচনায় আসতে দেরি করলাম, কারণ রবীন্দ্রনাথ যে ভাষায় এই নাটক রচনা করেছেন, তার বিমূর্ততাকে মূর্ত করে তোলায় মঞ্চ, শব্দ, সঙ্গীতের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। ওখানে প্রয়াস ব্যর্থ হলে মনোযোগী রবীন্দ্রপাঠক দর্শক ছাড়া আর কাউকে স্রেফ অভিনয় দিয়ে ছুঁয়ে ফেলা এই নাটকে বেশ কঠিন। অভিনয়ের আলোচনা শুরু করা যাক নন্দিনীকে দিয়েই।

নন্দিনী আসলে কে? যক্ষপুরীর কড়া নিয়মে এই মস্ত বেনিয়মটি হাজির হল কোথা থেকে? রবীন্দ্রনাথের নিজের ব্যাখ্যায় “জেলেদের জালে দৈবাৎ মাঝে-মাঝে অখাদ্যজাতের জলচর জীব আটকা পড়ে। তাদের দ্বারা পেটভরা বা ট্যাঁকভরার কাজ তো হয়ই না, মাঝের থেকে তারা জাল ছিঁড়ে দিয়ে যায়। এই নাট্যের ঘটনাজালের মধ্যে নন্দিনী নামক একটি কন্যা তেমনিভাবে এসে পড়েছে।” নাটকের শেষদিকে আমরা যক্ষপুরীর মত হিংস্র খনি এলাকায় নন্দিনীর গ্রামের কথা শুনতে পাই, সে গ্রামের মানুষের কথাও পাই। সে খেতের কথা বলে, ফসলের কথা বলে, ফুল তার অঙ্গে, রং তার মনে। এই চরিত্রে ঈস্পীতা ঘোষ যতবার মঞ্চে আসেন, মঞ্চ জুড়ে থাকা অন্ধকার ও অবসাদে আলোর সঞ্চার হয়। এর কৃতিত্ব শ্রমিকদের গাঢ় নীল পোশাক, মঞ্চের দখল নিয়ে রাখা কালো রঙের বিপরীতে ঈস্পীতার সবুজ শাড়ি, হলুদ ব্লাউজ আর লাল ফুলের যতখানি (রূপসজ্জা: সঞ্জয় পাল), ততখানিই তাঁর অভিনয়ের। তিনি লঘু পায়ে চলে ফিরে বেড়ান, সে চলা নাচ নয় অথচ ছন্দময়। ঘোর লাগিয়ে দেওয়ার মত রূপ না থাকলে নন্দিনীর চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠা শক্ত, কিন্তু সে রূপ সম্পূর্ণ হয় অভিনয় ক্ষমতা দিয়ে। বস্তুত, ঘন্টা দুয়েকের বিরতিহীন নাটকের মধ্যেই দুজন নন্দিনীকে দেখা যায়। এক নন্দিনী আনন্দকে, বিদ্রোহকে এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে পুরুষের মধ্যে যে গোকুল (অর্ক চক্রবর্তী) বা চন্দ্রা (মধুরিমা) তাকে বিপদ বলে মনে করে। আরেক নন্দিনীকে দেখা যায় একেবারে শেষদিকে, যে দিশেহারা। আনন্দের বদলে শঙ্কাই তার অভিজ্ঞান। এই দুই নন্দিনীর চরিত্রেই ঈস্পীতা চমৎকার। তবে গান গাওয়ার সময়ে তাঁকে কিছুটা দুর্বল লাগে।

বিশু পাগল রক্তকরবী নাটকের কতখানি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এক নারীর হাতে আকাশের চাঁদ এনে দিতে সে যক্ষপুরীতে এসেছিল। তারপর তাকে চরবৃত্তি করতে লাগিয়ে দিয়েছিল সর্দাররা। কিন্তু সে কাজ বিশুর দ্বারা হয়নি। তাই তার অবস্থা আর পাঁচজন শ্রমিকের চেয়েও খারাপ। অথচ সে যাদের বিরুদ্ধে চরবৃত্তি করতে এসেছিল তারাই তাকে ভালোবাসে। সর্দারদের লোক থেকে শ্রমিকদের লোক হয়ে যাওয়ায় বিশুর স্ত্রীও তাকে ত্যাগ করেছে। এতখানি নিঃস্বতা সত্ত্বেও যক্ষপুরীতে বিশু একমাত্র লোক, যার গান নন্দিনীকেও মুগ্ধ করে। এই তিক্ততাহীন বিশুর চরিত্রকে তথাগত (যিনি এই নাটকের নির্দেশকও) প্রায় দার্শনিক উচ্চতা দান করেছেন। তাঁর দরাজ গানের গলা বিষণ্ণ সংলাপ উচ্চারণের সময়েও এক ধরনের নিরাসক্তির আভাস দেয়। যেন এমন একজন মানুষ, যে চোখের জলের জোয়ারেও ভোলে না যে ডাঙা আছে। তথাগতর বিশু একইসঙ্গে প্রেমিক ও সন্ন্যাসী।

মাত্র কয়েকদিন আগেই ক্যান্টিন আর্ট স্পেসের রক্তকরবী প্রযোজনায় আজকের বাংলা নাট্যমঞ্চের আরেক প্রতিভাবান অভিনেতা বুদ্ধদেব দাসের অভিনয় দেখার সুযোগ হয়েছে। দুজন ভালো অভিনেতা একই চরিত্রের কেমন দুরকম ব্যাখ্যা করেন তা এত অল্প সময়ের ব্যবধানে দেখার বিরল সুযোগ এই মুহূর্তে এই বাংলার দর্শকের হাতের মুঠোয়। বুদ্ধদেবের বিশুর সর্বাঙ্গে লেগে থাকে বিষাদ, তথাগতর মুখে লেগেই থাকে অনির্বচনীয় হাসি। যেন তিনি জানেন, জীবনের রণ রক্ত সফলতা সত্য, তবু শেষ সত্য নয়। রাজা একবার জিজ্ঞেস করে, নন্দিনীর সঙ্গে ও কে? “রঞ্জনের জুড়ি নাকি?” তার উত্তরে বিশু বলে “না রাজা, আমি রঞ্জনের ও-পিঠ, যে পিঠে আলো পড়ে না— আমি অমাবস্যা।” এই সংলাপ যখন বুদ্ধদেব বলেন, তখন ঝরে পড়ে রঞ্জন হতে না পারার হতাশা। আর তথাগত যখন বলেন, তখন মনে হয়— তিনি রঞ্জন নন এবং রঞ্জন হতে চান না। তিনি নিজের অবস্থানে খুশি। বড় বিস্ময় লাগে এই দুই অভিনেতাকে দেখে। আমাদের তো আজ বিশেষ কিছুই নেই। তবু একজন তথাগত আর একজন বুদ্ধদেব আছেন!

রাজার চরিত্রে অনুরণও চমকপ্রদ। এই চরিত্রের অভিনেতার হাতে যে কণ্ঠস্বর ছাড়া বিশেষ কোনো আয়ুধ নেই তা তো সবাই জানেন, কিন্তু এখানে অনুরণকে একটা বাড়তি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন নির্দেশক— গলার পাশাপাশি ছায়া দিয়েও অভিনয় করতে হয়েছে। অর্থাৎ এখানে রাজাকে একেবারে দেখা যায় না তা নয়, সারাক্ষণই রাজার ছায়া দেখা যায়। সুরজ বিশ্বাস ও ধনপতি মণ্ডলের আলোকসম্পাতে এ এক অদ্ভুত কাণ্ড। অনুরণ যে দক্ষতায় নিজের ছায়ার উচ্চতা বাড়িয়ে কমিয়ে এবং কণ্ঠস্বরের নিপুণ ব্যবহারে রাজার বিরাট ভাবমূর্তি তৈরি করেন, তা ভেঙে পড়ে শেষ পর্বে তাঁর অন্তরাল থেকে বেরিয়ে আসায়। তখন অনুরণের সত্যিকারের দৈহিক উচ্চতা যে বৈপরীত্য তৈরি করে তার সঙ্গে মানানসই তাঁর বিধ্বস্ত, প্রতারিত অথচ হার না মানা মানুষের অভিনয়।

আরও পড়ুন রক্তকরবী: প্রযোজনা আন্তর্জাতিক, কিন্তু বাংলা কি?

ফাগুলালের চরিত্রে কল্লোল আর তার স্ত্রী চন্দ্রার চরিত্রে মধুরিমা সাক্ষাৎ শ্রমিক ও তার গিন্নী। ঠিক যেমন জীবন থেকে উঠে আসা অধ্যাপক মনে হয় অনন্য শঙ্কর দেবভূতিকে। অন্যান্য ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দীপজ্যোতি মণ্ডল (কিশোর), অর্ক, জয়ন্ত মিত্র (সর্দার), অভিজিৎ নাগ (গোঁসাই) যথাযথ। অভিরূপের গিটার এবং নীলার্ঘ্য দত্তর ব্যাঞ্জো এই নাটকে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝিয়ে বলতে গেলে কবীর সুমন দিয়ে কীভাবে রবীন্দ্রনাথকে ছুঁয়ে ফেলেছেন নির্দেশক, সেকথাটা বলে দিতে হবে। কিন্তু সে রহস্য উদ্ঘাটন করব কেন? বাঙালির এই দুঃসময়েও বাংলার শিল্পীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংলাপ জারি আছে, একই সময়ে দু-দুটো নাট্যদল রক্তকরবী মঞ্চস্থ করছে, আর আপনি দেখতে না গিয়েই সবটা জেনে ফেলবেন? এমন অন্যায়ে প্রশ্রয় দেব না।

ক্যান্টিন আর্ট স্পেসের প্রযোজনার উপসংহার নিয়ে আমার আপত্তির কথা লিখেছিলাম। হাতিবাগান সঙ্ঘারামের নাটকের উপসংহার অতখানি পার্টিজান নয়, ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে’-র সঙ্গে শ্রুতিমধুর মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে ‘হেই সামালো ধান হো’-র। কিন্তু শ্রুতিমধুর হলেও এই সৃজনান্তর নাটকের বার্তাকে একটা অস্বস্তিকর জায়গায় নিয়ে গেছে বলে মনে হয়। নাটকটাকে আগাগোড়া সমকালীন করে তোলা হয়েছে, কিন্তু শেষে তেভাগা আন্দোলনের সময়কার এই গানের আবাহন থেকে কি এই সিদ্ধান্ত করব যে যক্ষপুরী থেকে পরিত্রাণের পথ হিসাবে কৃষিপ্রধান সভ্যতাকেই দেখলেন তথাগত ও তাঁর দল? সে সমাধান রবীন্দ্রনাথের সময়ে বাস্তবোচিত হলেও, আজকের দিনে কিন্তু একেবারেই কল্পকথা। রবীন্দ্রনাথ যখন এই নাটক লেখেন তখন তাঁর বন্ধু মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী গ্রামভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা দিচ্ছিলেন। সেই ধারণা স্বাধীন ভারতে পরিত্যক্ত হয়, গান্ধীরই শিষ্য জওহরলাল নেহরুর পৌরোহিত্যে আমাদের অর্থনীতির ভিত হয়ে দাঁড়ায় ভারি শিল্প ও বাঁধ। সেখান থেকে বহু যুগ পার করে আমরা এখন বিশ্বব্যাপী গিগ অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিভিত্তিক সামন্ততন্ত্রের (techno-feudalism) কবলে। এ যুগের সোনার খনির শ্রমিকদের নিস্তারের পথ কৃষিকাজে নেই। বিশ্বজুড়ে জমির সংকট, জমি থাকলেও জলের সংকট। সেই সংকট আরও বাড়াচ্ছে বেজোস, মাস্ক, স্যাম অল্টম্যানদের ইয়া বড় সব ডেটা সেন্টার। এখন ধানের নামে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কোনো লাভ হবে কি?

এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায় কেবল নাট্যকর্মীদের উপর চাপিয়ে দিলে অবশ্য অন্যায় হবে। তাঁরা শিল্পী, তাঁদের মূল কাজ সত্য তুলে ধরা এবং স্বপ্ন দেখানো। সে কাজ এই নাটকে শতকরা একশো ভাগ সততায় করা হয়েছে। তবে শিল্পীদের কাজেও তো আমরা ভবিষ্যতের ইশারা খুঁজি; বিশেষ করে সেইসব শিল্পীদের কাজে, যাঁরা শতবর্ষ আগের শিল্পকে নিজের সময়ের মাটিতে দাঁড় করানোর স্পর্ধা দেখান।

রক্তকরবী: প্রযোজনা আন্তর্জাতিক, কিন্তু বাংলা কি?

এমনই তাঁর অভিনয়ের জাদু যে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ যেন বিশু পাগলের চরিত্র লিখেছিলেন বুদ্ধদেব দাস অভিনয় করবেন বলেই।

ভারতীয় নাট্যজগতের প্রবাদপ্রতিম নট ও নাট্যকার গিরীশ কারনাড প্রায় দেড় দশক আগে একবার বাঙালির প্রবল বিরাগভাজন হয়েছিলেন। কারণ তিনি বলেছিলেন— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহান কবি, কিন্তু দ্বিতীয় সারির এবং মাঝারি মানের নাট্যকার। তাঁর নাটকের গরিব চরিত্রগুলো ‘কার্ডবোর্ড ক্যারেক্টার্স’। নাট্যকার হিসাবে তিনি বাদল সরকার, মোহন রাকেশ এবং বিজয় তেন্ডুলকরকে রবীন্দ্রনাথের থেকে বেশি নম্বর দিয়েছিলেন। হিন্দুদের ৩৩ কোটি ঠাকুর, বাঙালির তখন ছিল ৩৩ কোটি ১। ফলে কারনাডের এই মতামতে প্রবল রুষ্ট হয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে শ্রমিক নেতা গুরুদাস দাশগুপ্ত পর্যন্ত সকলেই। গিরীশের সমালোচনার কোনো চর্চিত উত্তর দেওয়া হয়েছিল— এমন দৃষ্টান্ত এই লেখা লিখতে বসে খুঁজে পাচ্ছি না। গিরীশের সমালোচনার উত্তরে বাংলার কোনো নাট্যদল রবীন্দ্রনাথের কোনো নাটক মঞ্চস্থ করে শৈল্পিক প্রতিবাদ করেছিল কিনা, তাও জানতে পারছি না। স্মৃতি থেকে যতটুকু উদ্ধার করতে পারছি, তাতে শেয়ালের কুমির ছানা দেখানোর মত করে বহুরূপীর রক্তকরবী প্রযোজনার কথাই তুলে ধরা হয়েছিল বিভিন্ন মহল থেকে। তবে এই মুহূর্তে বাংলার মঞ্চে অন্তত দুটো দল রক্তকরবী অভিনয় করছে— হাতিবাগান সঙ্ঘারাম ও ক্যান্টিন আর্ট স্পেস। দ্বিতীয় দলটার অভিনয় সম্প্রতি দেখার সুযোগ হল। তারা রবীন্দ্রনাথের এই বহু আলোচিত নাটককে যেভাবে সমসাময়িক করে তুলেছে, তাতে কারনাড জীবিত থাকলে হয়ত নিজের মন্তব্য পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হতেন। রবীন্দ্রনাথের নাটক যে এমন এক বিমূর্ততাকে ছুঁয়ে আছে, যা দিয়ে একশো বছর পরের মূর্ততাকেও ধরে ফেলা যায়— তা এই প্রযোজনায় দিনের আলোর মত পরিষ্কার। একথা সত্যি যে সোনার খনির শ্রমিকরা বলে না ‘বনের মধ্যে পাখি ছুটি পেলে উড়তে পায়, খাঁচার মধ্যে তাকে ছুটি দিলে মাথা ঠুকে মরে।’ এই দার্শনিকতা যদি তাদের মনে কাজ করেও, তা এইভাবে প্রকাশ করার মত ভাষাজ্ঞান তাদের থাকে না। কিন্তু কথাটা এতদূর সত্য যে তা ১৯২৫ সালে যতখানি সত্য ছিল, ২০২৬ সালেও সমান সত্য। হয়ত আজ আরও বেশি সত্য। কারণ এখন আর কেবল খনি শ্রমিক নয়, কর্পোরেট মজুরদের জীবনেও সত্য। শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন— সত্য বলা ছাড়া কবিতার কোনো কাজ নেই। সেকথা তো যে কোনো শিল্পমাধ্যমের জন্যেই সত্যি।

রবীন্দ্রনাথের নাটকে আজকের সত্যানুসন্ধানে ক্যান্টিন আর্ট স্পেস যা যা করেছে তার মধ্যে সবচেয়ে অভিনব হল মঞ্চসজ্জা। দর্শকাসনকে চারদিক থেকে ঘিরে তৈরি হয়েছে মঞ্চ, যা স্বাভাবিকভাবেই দর্শকাসনের চেয়ে উঁচুতে। ফলে নাটকের শুরুতেই যখন ফাগুলাল (ঋদ্ধিবেশ ভট্টাচার্য) বলে, আপনারা খনি এলাকায় এসে পড়েছেন, তখন তা কথার কথা থাকে না। খনির মধ্যে বসে থাকার অনুভূতি হয়। নাট্যকার রচিত মূল সংলাপ ব্যবহার করেই অন্য ঘটনাবলী, শব্দ, দৃশ্য আমদানি করে প্রযোজনার কাছাকাছি সময় দেখানো সাম্প্রতিককালে বাংলায় উইলিয়াম শেক্সপিয়রের নাটকের প্রযোজনায় জলভাত। স্বপ্নসন্ধানীর হ্যামলেট-এ যেমন চলে আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার প্রসঙ্গ, ম্যাকবেথ-এ এসে পড়ে গাজা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে এভাবে একেবারে আজকের মাটিতে নামিয়ে আনার প্রচেষ্টা সুলভ নয়। এই প্রচেষ্টার আরও বেশি প্রশংসা প্রাপ্য এইজন্যে যে ব্যাপারটা স্রেফ জয়রাজ ভট্টাচার্যের করা সিনোগ্রাফি আর অভিনেতাদের পোশাক-আশাকে থেমে থাকেনি। ফাগুলাল এখানে হিন্দিভাষী শ্রমিক, সে আর তার বউ চন্দ্রা (দেবপ্রিয়া অধিকারী) দেহাতি ভাষাতেও বাক্যালাপ করে। সর্দার (বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়) এখানে গলফ খেলে অবসর যাপন করা কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ, অধ্যাপক (অনসূয়া রাকা) সংবেদনশীল হলেও মধ্যবিত্ত অভ্যাসের বাইরে যেতে না পারা মহিলা বুদ্ধিজীবী। এইসব উচ্চশ্রেণির মানুষের মুখের ভাষায় মিশে থাকে যথেচ্ছ ইংরিজি। তবে নাটকের মূল বয়ানের বিনির্মাণের সেরা দৃষ্টান্ত শ্রমিকদের নম্বরে চিহ্নিত ইউনিফর্ম, যেখানে বিশু পাগলের নম্বর হল 69NG (রবীন্দ্রনাথের কলমে যা ৬৯ঙ), অর্থাৎ কিনা NOT GOOD। নন্দিনীর মত প্রতিষ্ঠানবিরোধী, প্রচলিত ব্যবস্থার গোড়া ধরে টান দেওয়া চরিত্রের মুখে ইংরিজি সংলাপ— বিশেষত একেবারে শেষদিকে ‘brutal capitalism’— অবশ্য বাহুল্য মনে হয়।

যেমন বাহুল্য মনে হয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল গেয়ে নাটকের সমাপ্তি। রবীন্দ্রনাথ কোনো ভান করেননি। রক্তকরবীর ভূমিকায় ‘নাট্যপরিচয়’-এ পরিষ্কার লিখে দিয়েছেন ‘এই নাটক সত্যমূলক’। সুতরাং তাঁর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু যে ধনতন্ত্র আর দেখাচ্ছেন শ্রমিকদের জীবন, তা নিয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ কোনোদিনই ছিল না। নাটকের শেষে যে ভাঙনের জয়গান, তা যে শ্রমিক অভ্যুত্থানই— তাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তারপরেও কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের মত পার্টিজান উপাদান ব্যবহার করলে বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বা তার প্রতি অনুরক্ত দর্শকরা আলাদা তৃপ্তি পেতে পারেন, কিন্তু আজকের দিনে এই নাটককে বৃহত্তর দর্শকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। সে কাজে ব্যাঘাত ঘটা অসম্ভব নয়। অবশ্য এই নাটকের দর্শক হিসাবে কাদের চান বা কাদের চান না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা যাঁরা এই নাটক করছেন তাঁদেরই।

একথা বলা এই জন্যে যে এই প্রযোজনার মধ্যে বৃত্ত বড় করে ফেলার সম্ভাবনা আছে। কারণ এখানে যত্ন করে দৃশ্য নির্মাণ করা হয়েছে এবং অভিনেতারা প্রায় সবাই নিজেদের ক্ষমতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন। ফলে কোথা দিয়ে দু ঘন্টা কেটে যায় টের পাওয়া যায় না। এই নাটকে প্রাণ আছে।

রক্তকরবী পড়া আছে বা দেখা আছে এমন সকলেই জানেন যে এই নাটকের প্রাণ হল নন্দিনী, বিশু, আর নেপথ্য থেকে রাজা। এই প্রযোজনায় বিশুর চরিত্রে বুদ্ধদেব দাস একজন জিনস পরা আধুনিক যুবক, যিনি খালি গলায় যেমন ‘চোখের জলের লাগল জোয়ার’ গেয়ে ওঠেন, তেমন গিটার বাজিয়ে ‘জামাইকা ফেয়ারওয়েল’ গেয়ে যক্ষপুরীতে আসার আগের জীবনের বেদনাবিধুর স্মৃতিচারণও করেন। তাঁর গুপ্তচর হয়ে যক্ষপুরীর শ্রমিকদের মধ্যে প্রবেশ করার স্বীকারোক্তিতে নমকহারাম (১৯৭৩) ছবির রাজেশ খান্নাকে মনে পড়ে। এতৎসত্ত্বেও এমনই তাঁর অভিনয়ের জাদু যে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ যেন বিশু পাগলের চরিত্র লিখেছিলেন বুদ্ধদেব অভিনয় করবেন বলেই। বুদ্ধদেবের অভিনয় প্রতিভা বাংলা নাটকের দর্শকদের মধ্যে বেশ কিছুদিন হল সমাদৃত। কিন্তু বিশুর চরিত্রে এই অভিনয়ে এত পরত যে অভিনেতা থেকে চরিত্রকে আলাদা করাই শক্ত হয়ে যায়। যে অহংবোধ এবং বেদনা মিশিয়ে তিনি বলেন ‘তোর সেই কিছু-না-দেওয়া আমি ললাটে পরে চলে যাব। অল্প-কিছু দেওয়ার দামে আমার গান বিক্রি করব না’, আর যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় বলেন ‘চুপ করাটাকে যে শুনতে পায়, তাতে আপদ আরো বাড়ে’, তাতে আশ্চর্য বিশ্বাস ফুটে ওঠে। মনে হয় না, বুদ্ধদেব অন্যের লেখা সংলাপ বলছেন। অভিনেতা কীভাবে নিজের শরীরকে ব্যবহার করলেন, শ্বাসকষ্টের অভিনয় কতটা নিখুঁত হল— এসব তথ্য নেহাত অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়। কারণ ওগুলো যে অভিনয় সেকথা ততক্ষণে ভুলে গেছি। আশ মেটে না বুদ্ধদেবের গলায় গিটারের ঝংকার সমেত ‘তোমায় গান শোনাব’ দু-এক লাইন শুনে, বরং খালি গলায় আরও খানিকটা শোনা গেলে হয়ত প্রাণের আরাম হত।

সেই তুলনায় নন্দিনীর চরিত্রে শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য প্রথম দিকে কিছুতেই যেন সপ্তমে পৌঁছতে পারেন না। নন্দিনীর মাদকতা অন্য চরিত্রগুলোর সংলাপ থেকেই বুঝে নিতে হয়। বরং নাটকের পরের দিকে যখন নন্দিনী ক্রমশ রণরঙ্গিনী হয়ে ওঠে, তখন শ্রাবন্তীর দেহভঙ্গিমা অনেক বেশি সাবলীল লাগে। রঞ্জনের মৃত্যুতে তাঁর শোকের বিদ্রোহের উন্মাদনায় পরিণত হওয়া বেশি স্পর্শ করে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, খুব বেশি দর্শক এখনো তথাগত চৌধুরীকে চেনেন না। ব্যাপারটা যে দুর্ভাগ্যজনক তা নিয়ে এই নাটক দেখলে আর সন্দেহ থাকবে না। রাজা চরিত্রে তাঁর অভিনয়ের প্রায় একমাত্র সম্বল কণ্ঠস্বর। রবীন্দ্রনাথ তেমনই ধার্য করেছেন। ফলে বহুরূপীর সেই বিখ্যাত প্রযোজনায় এই কঠিন কাজটা করতেন শম্ভু মিত্র স্বয়ং। তথাগত সম্বলকে আয়ুধে পরিণত করেছেন। ক্ষমতার দম্ভ, ক্ষমতার হাতে নিজেই বন্দি হয়ে যাওয়ার এবং তা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারার অসহায়তা, নন্দিনীর প্রতি অদম্য আকর্ষণ এবং তার ক্ষুদ্র সহজতার কাছে নিজের বিশালতার পরাজয় তথাগতর কণ্ঠে নদীর জোয়ার ভাঁটার মত খেলতে থাকে। রক্তকরবীর রাজাই সম্ভবত সবচেয়ে রাবীন্দ্রিক। মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ যক্ষপুরীর একনায়ককে আঁকলেন, অথচ তাকেও ভালোবাসার স্পর্শ থেকে বঞ্চিত করতে পারলেন না। সোনার খনির অন্ধকার থেকে নন্দিনীর আলো দিয়ে তাকেও বের করে নিয়ে এলেন। সে নিজের ধ্বজা নিজেই ভেঙে নিজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে চলল। শোষকের প্রতি এত মমতা কোনো বিদ্রোহ দেখায় না, দেখায়নি। হয়ত কারনাড এই চরিত্রচিত্রণকেই মাঝারিয়ানা বলতেন। কিন্তু রাজার চরিত্রটা এমন যে নন্দিনীর মত আমাদেরও তার প্রতি মায়া পড়ে যায়। পড়বে না, যদি রাজা চরিত্রের অভিনেতা তাঁর চরিত্রের স্ববিরোধী বৈশিষ্ট্যগুলোর কোনো একটায় বেশি জোর দিয়ে ফেলেন। এই টাল সামলাতে পারাই সম্ভবত ওই চরিত্রের অভিনেতার কাজটা কঠিন করে তোলে। সে কাজ চমৎকার করেছেন তথাগত। তিনি তাঁর বদ্ধ ঘরের বিশালতা ছেড়ে যখন দর্শকের চোখের সামনে বেরিয়ে আসেন, তখন ছোট হয়ে যান না। প্রিয় হয়ে ওঠেন।

আরও পড়ুন মহাভারত ২: আজকের মহাকাব্য

ফাগুলালের চরিত্রে ঋদ্ধিবেশের অভিনয় অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত, কিন্তু চন্দ্রার চরিত্রে দেবপ্রিয়া অধিকারী চমকপ্রদ। তাঁর হাত নাড়া, মুখ ঝামটা দেওয়া, দেহাতি উচ্চারণ একেবারে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক মহল্লার হিন্দিভাষী গিন্নীদের মত। বাংলা সংলাপ না থাকলে বিশ্বাস করা শক্ত হত যে চন্দ্রা চরিত্রের অভিনেত্রী বাঙালি। এই প্রযোজনায় রবীন্দ্রনাথের বয়ানের বিনির্মাণে অন্যতম বড় ঝুঁকি নেওয়া হয়েছে অধ্যাপকের চরিত্রকে নারী করে দিয়ে। ব্যাপারটা যে উতরে গেছে তার কৃতিত্ব অনসূয়ার। তিনি অধ্যাপক চরিত্রের পৌরুষ দূর করে তাতে দিব্যি নারীত্ব আরোপ করতে পেরেছেন। নন্দিনীর প্রতি এক ধরনের সমকামী আকর্ষণের আভাস নন্দিনীর চৌম্বক শক্তি বোঝাতেও সহায়ক হয়েছে। শোষণ হচ্ছে মেনে নিয়ে ক্ষমতাকে না চটানোর মধ্যবিত্ত অভ্যাসও অনসূয়া সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন। আর যিনি স্বল্প উপস্থিতিতেও প্রভাব ফেলেন, তিনি হলেন সর্দার চরিত্রে বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়। কর্পোরেট শয়তান হয়ে উঠতে তাঁকে উচ্চকিত অভিনয় করতে হয়নি, হাঁটাচলায় মাপা আভিজাত্যের পালিশ দিয়েই কাজ সেরে ফেলেছেন। তাঁর ক্রূরতা তাঁর শীতলতায়।

সবকিছুর পরে একটা ব্যাপারেই মন খুঁতখুঁত করে। এই প্রযোজনার আন্তর্জাতিক মানে ওঠার সাধ্য আছে, সংলাপে একাধিক ভাষার ব্যবহার এবং দর্শকদের হাতে দেওয়া কাগজখানায় কেবল ইংরিজির ব্যবহার থেকে মনে হয়— সাধও আছে। কিন্তু সেদিকে মন দিতে গিয়ে বাংলা কম পড়ে গেল কি? রবীন্দ্রনাথের কিন্তু আন্তর্জাতিক হওয়ার জন্যে কম বাঙালি হওয়ার দরকার পড়েনি। নাজি অধিকৃত ওয়ারশ ঘেটোতে নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের ডাকঘর নাটক করার কথা তো আমরা জানি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

দর্শকের সামনে নিজেকে খুঁড়ে ফেলার স্পর্ধায় প্রোজ্জ্বল অর্ণ, তথাগত

নাটকের বিভিন্ন মুহূর্তে যে বাবা, মা, প্রথম প্রেম, প্রাণের বন্ধু, বন্ধুর বউ, কলেজের বান্ধবী, প্রেরণাদাত্রী প্রেমিকা, হতাশ স্ত্রী, আলোর মত শিশুসন্তান এবং অন্ধকার অপরাধীরা ফুটে ওঠে অর্ণর অবয়বে— তাদের সঙ্গে আমাদের আত্মার আত্মীয়দের কোনো তফাত নেই।

বাঙালি ভালো নেই, বাংলা থিয়েটারও ভালো নেই। স্বভাবতই থিয়েটার শিল্পীরাও ভালো নেই। অন্তত কয়েকজন চেষ্টা করছেন এই ভালো না থাকা দর্শকের সামনে তুলে ধরতে। সেই প্রয়াসে এই মুহূর্তে অন্তত দুটো একক নাটক হচ্ছে আমাদের আশপাশের মঞ্চে। হাওড়ার দল নটধার অর্ণ মুখোপাধ্যায় নিজের সৃজনে করছেন আবহমানদিল্লির ধৃ আর্ট অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের শান্তনু মল্লিকের নির্দেশনায়, হাতিবাগান সঙ্ঘারামের সহযোগিতায়, তথাগত চৌধুরী করছেন দ্য মাস্কারেড এমন নয় যে বাংলা থিয়েটারে একক অভিনয় বিরল। এই কালখণ্ডেই প্রয়াত শাঁওলী মিত্রের প্রবাদে পরিণত নাথবতী অনাথবৎ নতুন করে করছেন অর্পিতা ঘোষ। আমাদের দেখার সৌভাগ্য হয়নি, কিন্তু গত শতকের আট-নয়ের দশকে শাঁওলীর ওই নাটক এবং কথা অমৃতসমান অনেককেই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। পরে অডিও ক্যাসেটে আমাদের কাছেও সেই নৈপুণ্যের ছিটেফোঁটা এসে পৌঁছেছিল, একইভাবে এসেছিল বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের শকুনির পাশা। কিন্তু সেসব মহাভারতাশ্রয়ী কাহিনির সাহায্যে সত্যান্বেষণ। এই মুহূর্তে অর্ণ আর তথাগত যা করছেন তার মৌলিকত্ব এই যে, তাঁরা পুরাণ বা রূপকের আশ্রয় ছেড়ে নগ্ন বর্তমানে দাঁড়িয়ে নিজেরই ভিতরটা খুঁড়ে দর্শককে দেখাচ্ছেন। অর্ণর নাটকের কেন্দ্রে তবু একজন চরিত্র আছে, যার নাম অর্ণ নয়। তথাগত যে চরিত্রে অভিনয় করছেন সে চরিত্রের কোনো নামও নেই। সে স্রেফ একজন অভিনেতা। দর্শক আর অভিনেতার মধ্যে যে ন্যূনতম আড়াল, তাও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাংলা থিয়েটারের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনেককিছুই এখন মন খারাপ করিয়ে দেওয়ার মত, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হতাশ করার মত। তার মধ্যেও অন্তত দুটো নাটকে এইরকম চেষ্টা হচ্ছে— এ নেহাত সামান্য কথা নয়।

আবহমান নাটকটা দাঁড়িয়ে আছে অর্ণর গল্প বলতে পারার ক্ষমতার উপরে। গল্পটা খুব সামান্য একজন মানুষের অসামান্য যন্ত্রণার। বাঙালি সমাজে ঘাপটি মেরে থাকা ভণ্ডামি, বিশেষত বর্ণবাদ সম্পর্কে ভণ্ডামির উপর, এর আগেও আলো ফেলেছেন অর্ণ। উইলিয়ম শেক্সপিয়রের ওথেলো নাটকের সৃজনান্তর অথৈ এক দশকের কাছাকাছি সময় অত্যন্ত মঞ্চসফল ছিল, যদিও সিনেমায় দর্শকানুকূল্য পায়নি। আবহমানেও একজন নিম্নবিত্ত এবং নিম্নবর্গীয় মানুষের কাহিনিই রয়েছে, যার আশৈশব যন্ত্রণার কারণগুলোর মধ্যে মিশে আছে বর্ণাশ্রমে তার অবস্থান। তবে এই নাটকের সেটাই বিষয় নয়। বিষয় তাহলে কী? এক অর্থে দর্শকই এই নাটকের বিষয়। কারণ সুচারু আত্মহননের ঠিক আগের মুহূর্তে এক ব্যর্থ সাহিত্যিক, ব্যর্থ ব্যক্তির বয়ানে যে জীবনের ছবি উঠে আসে— তা গত তিন-সাড়ে তিন দশকের পশ্চিমবঙ্গের একজন গড়পড়তা যুবকেরই জীবন। আমাদের প্রেম-অপ্রেম, সাফল্য-ব্যর্থতা, শক্তি-দুর্বলতা, সততা-শঠতা, উদ্যম-আলস্য, নারীর উপরে পৌরুষ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আমাদেরই চোখের সামনে তুলে ধরেন অর্ণ। নাটকের বিভিন্ন মুহূর্তে যে বাবা, মা, প্রথম প্রেম, প্রাণের বন্ধু, বন্ধুর বউ, কলেজের বান্ধবী, প্রেরণাদাত্রী প্রেমিকা, হতাশ স্ত্রী, আলোর মত শিশুসন্তান এবং অন্ধকার অপরাধীরা ফুটে ওঠে অর্ণর অবয়বে— তাদের সঙ্গে আমাদের আত্মার আত্মীয়দের কোনো তফাত নেই। ফলে যখন মঞ্চের উপরে চলতে থাকা ঘড়িতে সময় ফুরিয়ে আসা টের পাওয়া যায়, বেজে ওঠে শেষ ঘন্টা আর মঞ্চের ধারে চলে এসে অর্ণ দর্শকদের আঙুল তুলে অভিযুক্ত করেন এই বলে যে, চলে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু তোমাদেরই তৈরি করা সমাজে আমার বেঁচে থাকার আর উপায় নেই, তখন পালাবার পথ পাওয়া যায় না। সৌমিত দেবের কবিতার পংক্তি আর প্রয়াত জয়দেব ঘোষের ‘মুহূর্তে অমৃত মানুষ মুহূর্তে বিষ’ হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার মত বিশ্বাসযোগ্য লাগে।

মানসিক ও শারীরিকভাবে একেবারে কোণঠাসা হয়ে যাওয়া একজন মানুষকে জ্যান্ত করে তুলতে, একটা লাঠি আর একখানা অস্বস্তিকর বসার জায়গা— দৃশ্যত অর্ণর প্রপ বলতে এটুকুই। কিন্তু তিনি আসল প্রপ করে তোলেন নিজের শরীরকে। কেন্দ্রীয় চরিত্রের আলাদা ব্যক্তিত্ব তৈরি করেন তার অস্থির বাচনভঙ্গি, অনবরত গা চুলকানো, খুঁড়িয়ে চলা দিয়ে। অতীতের মানুষটা যে অন্যরকম ছিল তা বেরিয়ে আসে এসবের মসৃণ অন্তর্ধানে। মঞ্চে অন্য চরিত্রগুলোকে দেখি না, কিন্তু তাদের চোখ দিয়ে কেন্দ্রীয় চরিত্রটাকে দেখি। কখনো অর্ণ গোটা মঞ্চের অধীশ্বর হয়ে ওঠেন, কখনো মঞ্চের শূন্যতা আরও বড় দেখায় তাঁর পড়ে পড়ে লাথি খাওয়ায়, হাহাকারে। জীবনের কাছে হেরে যাওয়া মানুষটা যখন বিরতির পর উদ্ধত ঔদাসীন্যে দর্শকদের সরাসরি বলে— অনেকের হয়ত একঘেয়ে লাগছে। ভালো না লাগলে চলে যেতে পারেন; তখন গুলিয়ে যায়— কথাটা চরিত্র বলছে, নাকি অভিনেতা বলছেন। বাংলা নাটকের এই নড়বড়ে যুগে, জনপ্রিয় হওয়ার জন্যে শস্তা চমকের যুগে স্বয়ং অর্ণই কি জেরজি গ্রোটোওস্কির মত দরজা বন্ধ করে সেই থিয়েটার করতে চাইছেন, যা যার দরকার সে এসে দেখে নেবে?

আরও পড়ুন অপর আর বিজ্ঞানের চিরকালীন ট্র্যাজেডির মঞ্চায়ন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন

তথাগতর দ্য মাস্কারেড আবার আক্ষরিক অর্থে দরজা বন্ধ করে অভিনয়। এখানে মঞ্চ মানে একখানা ঘর, হলঘর বলার মত বড়ও নয়। সেখানে প্রসেনিয়াম বলেও কিছু নেই। দর্শক ঢুকে পড়েন নাটকের সাজঘরে, কোণের দরজা দিয়ে এসে হাজির হন অভিনেতা। কয়েক ঘন্টা পরেই তিনি মঞ্চে উঠবেন। দর্শকের কাছে তাঁর কিছুই লুকোবার নেই, লুকোবার উপায়ও নেই। অভিনয়ের আগে একটু স্বাস্থ্যকর খাবার দূরের কথা, সাজঘরেই চা বানিয়ে খাওয়ার উপায়টুকুও যে নেই— তা দর্শকের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় শুরুতেই। এখানে প্রপের অভাব নেই, বরং প্রাচুর্য আছে। এমন অনেককিছুই আছে যা দর্শক দেখে ফেললে নাটকের প্রার্থিত রহস্য আর থাকে না। কিন্তু সেটাই উদ্দেশ্য। তথাগত বেসিনে হাত ধোন দর্শকের সামনে, মুখে রং মাখেন দর্শকের সামনে, এমনকি শুধু অন্তর্বাসটুকু রেখে পোশাক পরিবর্তনও করেন দর্শকের সামনেই। অন্তরাল আছে, সেখান থেকে ভেসে আসে শব্দ। সেই শব্দের সঙ্গে আদানপ্রদানও করেন তথাগত, কিন্তু অন্তরালে যান না। মুখোশের পিছনে না গিয়ে, অভিনেতার মুখোশের পিছনের মানুষটাকেই উলঙ্গ চেহারায় দর্শকের সামনে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন।

এই নাটকে আয়নার মুখোমুখি বসে দর্শকের চোখের সামনেই তথাগত দাঁতের ফাঁকের ময়লা খুঁটে পরিষ্কার করেন। এত কাছ থেকে দেখা যায় বলেই শিহরিত হয়ে দেখতে হয়— কী অনায়াসে শুধুমাত্র মুখের পেশির ব্যবহারে গোবেচারা থিয়েটার অভিনেতা থেকে রামলীলার হনুমান, সেখান থেকে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া হিংস্র শাখামৃগ, ঋত্বিক ঘটক রচিত গল্পের দেহাতি শ্রমিক ও শ্রমিক নেতা এবং ফাউস্ট ও মেফিস্টোফিলিস হয়ে যান তথাগত। দেখতে দেখতে আফসোস হয়, সিনেমায় নেমে নাম না করলে গুণী অভিনেতাদের আমরা চিনতে পারি না, আদৌ জানতে পারি না। অভিনেতার নিজের আফসোস হয় না? নাম, যশ, অর্থ, প্রতিপত্তির কথা না ভেবে যিনি অভিনয় করে যেতে পারেন সারাজীবন, তিনিই নাকি সৎ শিল্পী। বাকিরা জনপ্রিয়তার কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেওয়া ‘মাল’— এমন একটা বয়ান খুব জনপ্রিয় হয়েছে আজকাল। সেই বয়ানকে মাটিতে আছড়ে ভেঙে ফেলে এই নাটক। মই বেয়ে অনেক উপরে উঠে গিয়ে তথাগত সোচ্চারে জানিয়ে দেন, বস্তিবাসীর চরিত্রে অভিনয় করতে করতে তিনি টের পেয়েছিলেন— শাহরুখ খানের মন্নতের মত অট্টালিকা তাঁরও চাই। কিন্তু প্রবল প্রতিভা থাকলেও সবাই শাহরুখ হতে পারে না। তা জেনেই অভিনেতাকে লড়ে যেতে হয়, সারাক্ষণ লড়ে যেতে হয় মেফিস্টোফিলিসের সঙ্গে। এই দ্বন্দ্বটাই আর সব দ্বন্দ্বের চেয়ে অভিনেতাকে পোড়ায় বেশি।

মুশকিল হল, অভিনেতা ধূপের মত। না পোড়ালে গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে। অর্ণ আর তথাগত— দুজনেই দারুণ সব গন্ধ ঢেলে দিয়েছেন। কখনো বারুদগন্ধ, কখনো পারিজাতগন্ধ। অর্ণ যত একের পর এক চরিত্রের কাহিনির আয়নায় কেন্দ্রীয় চরিত্রকে দাঁড় করান, তত উদ্ভাসিত হতে থাকে তাঁর ভিতরের অভিনেতা। তথাগত নিজের মুখে নতুন করে যত রং চড়ান, যত পোশাক বদলে নতুন চরিত্রকে ধারণ করেন নিজের শরীরে, তত মুখোশের নিচ থেকে বেরিয়ে আসে অভিনেতার মুখ। অর্ণ যেহেতু তাঁর কাজের জন্যে বেছে নিয়েছেন প্রসেনিয়াম, তাই দর্শক হিসাবে তবু তাঁর থেকে কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে থাকা সম্ভব হয়। ন্যাশনাল মাইম ইনস্টিটিউটের ঘরে তথাগতর দহন এত কাছে চলে আসে যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতাও কাজ করে কোনো কোনো মুহূর্তে— এই বুঝি নিজের গায়েই আগুন লেগে গেল।

দু-এক কথা অবশ্যই বলা যায় নাটক দুটোর অপূর্ণতা সম্পর্কে। যেমন অর্ণর নাটকে উৎকণ্ঠার একটা পরত যোগ করে মঞ্চে ঝুলতে থাকা ইলেকট্রনিক ঘড়িখানা, যার উদ্দেশ্য জানিয়ে দেওয়া— চরিত্রটার বেঁচে থাকার সময় ফুরিয়ে আসছে। সাধারণ ঘড়ি না হয়ে যদি ওতে কাউন্টডাউনের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়ত আরও ভালো হত। আর একক নাটকও যেহেতু যৌথতার উৎপাদন, সেহেতু প্রযোজনায় সহায়তা করেছেন যাঁরা এবং মাঝে কয়েকবার মঞ্চে আসেন যাঁরা— তাঁদের নাম কোনোভাবে দর্শকদের জানানোর ব্যবস্থা থাকলে ভালো হত। শান্তনু-তথাগতর নাটকের সমাপ্তি যেন হঠাৎই এসে পড়ে। অভিনেতার নিজেকে আবিষ্কারের লড়াইয়ের অবসান (closure) হল বলে মনে হয় না। অবশ্য এটা এই আলোচকের মত অনভিনেতার ভ্রান্তিও হতে পারে। হয়ত শান্তনু বা তথাগতর মতে, অভিনেতার নিজেকে আবিষ্কারের লড়াই কখনো শেষ হয় না। থিয়েটার তো বায়বীয় কিছু নয়, অভিনেতারও প্রেক্ষাগৃহের বাইরে অস্তিত্ব আছে। সেখানে যখন দিনরাত অশান্তি চলছে, তখন নাটক আর তার অভিনেতা কোন বিন্দুতে পৌঁছে প্রশান্ত হবে?

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত