অনধিকার প্রবেশ

যাদবপুরে প্রবেশিকা পরীক্ষা হওয়া উচিৎ না অনুচিত এই নিয়ে মতপার্থক্য আছে বিভিন্ন মহলে এবং থাকারই কথা। সরকারপোষিত একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংজ্ঞানুযায়ী আমার, আপনার মত করদাতাদের যৌথ সম্পত্তি। ফলে তার কার্যকলাপ নিয়ে নিশ্চয়ই আমাদের সকলের মতামত থাকবে। এটা আমাদের অধিকার। কর্পোরেটচালিত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের জাঁকজমক দেখে যতই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকুন, তাদের পরীক্ষা পদ্ধতি, ভর্তির প্রক্রিয়া, পাঠক্রম নিয়ে চেঁচামেচি করার অধিকার আমার আপনার নেই, এটা মনে রাখবেন।
যাদবপুরের প্রতি আমাদের সে অধিকার আছে বলেই যাদবপুরকে তথা সরকারপোষিত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বুক দিয়ে আগলানো আমাদের কর্তব্য। এবং আমাদের সকলের অধিকার রক্ষা করার জন্যেই সরকারের কথায় যাদবপুর উঠবে বসবে, এমনটা হতে দেওয়া উচিৎ না।
সরকার মানেই নাগরিক নয়। সরকারের মতামত গণতন্ত্রের সবচেয়ে উন্নত অবস্থাতেও সব নাগরিকের মতামতের প্রমাণ নয়, বড়জোর সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের মতামতের প্রমাণ। সমস্ত ইস্যুতে তাও নয়। এমতাবস্থায় ঘরে বাইরে, কাগজে, চ্যানেলে, ফেসবুকে, হোয়াটস্যাপে বিতর্ক চলতে থাকুক কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কোন পথে চলবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার শুধুমাত্র তার শিক্ষক শিক্ষিকা এবং ছাত্রছাত্রীদের হাতেই থাকতে হবে।
কিছুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রী রাজ্য সরকার পোষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে বলেছিলেন “সরকার টাকা দিচ্ছে আর সরকারের কথা মানবে না?” যেন কলেজ বা ইউনিভার্সিটি হল বারোয়ারী দুর্গাপুজো। পাড়ার কাউন্সিলর সবচেয়ে বেশি টাকা চাঁদা দেয় বলে সে চাইলে মুম্বাইয়ের মিস টিনাকে দিয়ে নবমীর দিন নাচের ব্যবস্থা করতেই হবে। যতই পাড়ার লোকে মনে করুক এটা অশ্লীল।
এভাবে তো লেখাপড়া হয় না।
উপরন্তু আজকের সরকার একরকম সিলেবাস ঠিক করবে, কাল অন্য সরকার এসে বলবে “এসব বাজে জিনিস পড়ানো হচ্ছে। কাল থেকে অন্য জিনিস পড়ানো হবে।“ আজকের সরকার বলছে “প্রবেশিকা পরীক্ষা তুলে দিতে হবে।“ কালকের সরকার বলবে “প্রবেশিকা পরীক্ষা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় চলে নাকি?” সরকার বদলের সাথে সাথে যদি লেখাপড়ার ধারা বদলায় তাহলে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের পি এইচ ডি থিসিসগুলো যে টোকা নয় সে কথা কে-ই বা বিশ্বাস করবে?
অনেক বড় বড় মাথা দেখতে পাচ্ছি প্রবেশিকা পরীক্ষা কেন ভাল নয় তার পক্ষে অনেক যুক্তি দিচ্ছেন। আমার নিজেরও দু একটা যুক্তি আছে কিন্তু সে বিতর্কে যাবই না। যেতাম যদি বুঝতাম রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে আছে যাদবপুরের শ্রীবৃদ্ধি। কিন্তু সরকারের যে ভাবের ঘরে দিনে ডাকাতি। যে সরকারের আমলে সারা রাজ্যে কলেজের আসন কেনাবেচা হয়, সেই সরকারের যাদবপুরের উন্নতির চিন্তায় রাতে ঘুম হচ্ছে না একথা নিঃস্বার্থ কেউ কেন বিশ্বাস করবে? যাদবপুরের অনেক ছাত্রছাত্রী দেখছি প্রশ্ন তুলছেন যে সেন্ট জেভিয়ার্স বা রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরও তো প্রবেশিকা পরীক্ষা নেয়, তাদেরকে সরকার জোর করছে না কেন? শুধু যাদবপুরের উন্নতিই কি সরকারের লক্ষ্য?
খুবই সঙ্গত প্রশ্ন। উত্তর একাধিক, তবে খুব সোজা। সেন্ট জেভিয়ার্সের ইউনিয়ন অরাজনৈতিক, সেখানে টি এম সি পির ঢোকার জায়গা নেই। আর বিদ্যামন্দিরের ছাত্র সংসদ বাতাসের মত। সবাই জানে আছে কিন্তু চোখে দেখতে পাওয়া যায় না। অতএব সেখানেও টি এম সি পি কে ঢোকানো যাবে না। বিদ্যামন্দিরের উপরি সুবিধা এই যে তাদের চোখ রাঙালে, মুখ্যমন্ত্রী জানেন, বিজেপি “হিন্দু খতরে মে হ্যায়” বলে তেড়ে আসবে।
যাদবপুরের প্রতি এই অহৈতুকী কৃপার অনেক কারণের একটা, স্পষ্টতই, তাদের তোলাবাজির এলাকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারার ব্যর্থতা। আরো একটা মজার জিনিস লক্ষ্য করুন। এমন দুটো ঘটনা যুগপৎ ঘটছে — কলেজ ভর্তি নিয়ে প্রকাশ্য দুর্নীতি আর যাদবপুরে অচলাবস্থা — যার প্রভাব রিকশাচালকের পরিবার থেকে উচ্চপদস্থ সরকারী আমলার পরিবার পর্যন্ত বিস্তৃত, অথচ সাম্প্রতিক ভোটগুলোর ফলাফল অনুযায়ী রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি স্পিকটি নট। আসলে ক্ষমতাসীন দলের মত তারাও চায় এ রাজ্যের লেখাপড়া গোল্লায় যাক৷ বিশেষ করে যাদবপুর গোল্লায় গেলে তো নাগপুরে মিষ্টান্ন বিতরণ হবে। মুক্ত চিন্তা এবং বামপন্থী চিন্তার আখড়াগুলো সঙ্ঘ পরিবারের কাছে পরের ছেলে পরমানন্দ। যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ। যাদবপুরের ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষককুলের মধ্যে বিভিন্ন তীব্রতার লাল রঙের পোঁচ মমতাদেবী এবং মোদীবাবুর মধ্যে সমান বিবমিষার উদ্রেক করে। ২০০৮-০৯ থেকে শুরু করে বামফ্রন্টকে পছন্দ নয় বলে যে বামপন্থীরা মমতাকেই প্রকৃত বামপন্থী বলে নন্দিত করেছেন, এখনো করেন, তাঁরা এবার ভুলটা বুঝলে ভাল হয়।
এই অসহনীয় অবস্থাতেও, যে কোন আন্দোলন শুরু হলেই যা হয়, আন্দোলনের ধরণ নিয়ে সমালোচনা করতে কেউ ছাড়ছে না। লেখাপড়ার বারোটা বাজিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করছে সরকার, তবু যাদবপুরের সুবোধ বালক বালিকাদের উচিৎ ছিল ধর্নায় না বসে, অনশন না করে বই মুখে বসে থাকা — এই কথা অনেকেই বলছেন এবং লিখছেন। যেন ছেলেমেয়েরা রুখে না দাঁড়ালে তাঁরাই ব্যাপারটা নিয়ে সরকারের সাথে কথা বলে বিহিত করতেন। যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই হয়েছিল ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে, সেখানকার ছেলেমেয়েরা প্রতিবাদ করছে কেন তাই নিয়ে প্রাজ্ঞদের অপার বিস্ময় এবং বিপুল ক্রোধ।
আমার পরিচিত যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্যের এক প্রাক্তন ছাত্র দুঃখ করে বলল তুলনামূলক সাহিত্যের একজন নাকি অনশন করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাতে নাকি অনেকে বলছে ঐ বিভাগটাই ফালতু। ওটা তুলে দেওয়াই উচিৎ কারণ ওটা পড়ে কেউ চাকরি পায় না। ছেলেটি ভেবেছিল আমার সহানুভূতি পাবে কিন্তু আমি তাকে বললাম শুধু তুলনামূলক নয়, সবরকম সাহিত্য পড়ানোই বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ। তাতে আমার মত সাংবাদিকদের মস্ত সুবিধা। আমরা রোজ যে ছাইভস্ম লিখি সেগুলোকে ছাইভস্ম বলে চেনার মত আর কেউ থাকবে না। শুধু সাহিত্যও নয়, ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগও তুলে দেওয়া উচিৎ। কারণ এদেশে বহু ইঞ্জিনিয়ার বেকার বসে আছে। যত ইঞ্জিনিয়ার আছে তত চাকরি নেই। ফলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েও চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না।
আমার কথা শুনে ছেলেটির মুখের যা চেহারা হল তাতে আমার এত অপরাধবোধ হল যে ভাবলাম ওকে সন্দেশ বিস্কুট খাওয়াই। খাওয়াতে খাওয়াতে বললাম যে কাল একটা না তৈরি হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দেশের সরকার আই আই টি, আই আই এস সি র সমান মর্যাদা দিয়েছে। যাদবপুরের কী হবে?
বেচারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে দেখে আমাদের স্কুলের জহরবাবুর জ্যামিতি ক্লাস নেওয়ার ঢঙে বললাম “আসলে একটা সাদা কাগজের উপর কয়েকটা বিন্দু একে অপরের থেকে অনেক দূরে দূরে বসে আছে। কিন্তু এগুলোকে জুড়লে দেখবি আসলে এগুলো একটা চতুর্ভুজের চারটে শীর্ষবিন্দু। একটা হল শিক্ষা ব্যবসায় জাঁকিয়ে বসতে চাওয়া কর্পোরেট, একটা সেই কর্পোরেটের দাসানুদাস ফ্যাসিবাদী সরকার, আরেকটা উচ্চশিক্ষা পুরোপুরি বেসরকারী হাতে চলে গেলেই সর্বোচ্চ যোগ্যতা না থাকলেও পড়িয়ে বা বই লিখে দু পয়সা কামিয়ে নেবে বলে ওঁত পেতে থাকা বুদ্ধিজীবী এবং চতুর্থটা হল এক শ্রেণীর ভদ্রলোক, যারা বরাবর চেয়েছে শুধু তাদের ছেলেমেয়েরাই লেখাপড়া শিখুক। চাষাভুষোর পড়াশোনা শিখে কী হবে?”

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply