আতঙ্ক

আমাদের পাড়ায় একজন আছে যে বহু বছর আগে ইডেন গার্ডেন্সে একটা মোহনবাগান – ইস্টবেঙ্গল খেলা দেখতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়েছিল। সেদিন ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল, আমার এই পাড়াতুতো কাকু জোর বেঁচে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন সোজা হয়ে হাঁটতে পারেনি। শুধু তাই নয়, এই সেদিনও বসে থাকতে থাকতে অকারণেই হঠাৎ চমকে উঠত — ট্রমা এমনই প্রবল। এত দীর্ঘ না হলেও, একটা স্বল্পমেয়াদী ট্রমা আমারও হয়ে যাচ্ছে বোধহয় — কিছু ছবি, কিছু শব্দ এমনভাবে গেঁথে যাচ্ছে মনে।
সর্বশেষ যে ছবিটা ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল সেটা হচ্ছে আজ সকালের কাগজে দেখা শ্রীরামপুর কলেজের এক অধ্যাপিকার ছবি। আতঙ্কে এভাবে কাঁদতে কোন দিদিমণিকে কখনো দেখিনি। মুহূর্তে প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময়কার দিদিমণিদের মুখগুলো ভিড় করতে শুরু করল। খবরে প্রকাশ “আন্দোলনকারী” ছাত্ররা দিদিমণিদের বাথরুমের দরজাও ভেঙে দিয়েছে। প্রাক্তন নয়, বর্তমানদের কীর্তি এটা। এর আগে অন্যত্র এক দিদিমণিকে জগ ছুঁড়ে মারার ঘটনাও সর্বজনবিদিত। কিন্তু সেখানে সান্ত্বনা ছিল এটুকু যে কান্ডটা ঘটিয়েছে এক নেতা, দিদিমণির কোন ছাত্র বা ছাত্রী নয়। এবারে আর সেকথা ভেবে নিজেকে শান্ত করা যাচ্ছে না। নির্ভয়াকান্ডের পর যখন সেই ধর্ষণের পুঙ্খানুপুঙ্খ আমাদের সামনে আসছিল, তখন যেমন মধ্যে মধ্যে নিজেকেই ধর্ষক মনে হত, তেমনি আজ কেন যেন মনে হল আমিই আমার ছোটবেলার স্নেহময়ী দিদিমণিদের বাথরুমের দরজা ভেঙে দিয়েছি। শিউরে উঠলাম। কি ভয়ঙ্কর ছাত্রকুল তৈরি করেছি আমরা! অন্যায় দাবী আদায়ের জন্যে মাতৃসমা দিদিমণিদেরও চূড়ান্ত লাঞ্ছনা করতে বুক কাঁপে না এদের। শুনছি আজকাল নাকি মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের ভাগে খুন, ধর্ষণের হুমকিও বাদ যায় না।
পশ্চিমবঙ্গে ছাত্র আন্দোলন, এমনকি উগ্র, হিংসাশ্রয়ী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। নকশাল আন্দোলনের সময়ে (যা ছাত্রদের নেতৃত্ব সত্ত্বেও ছাত্র আন্দোলনের পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না) হিট লিস্টে মাস্টারমশাইদের নাম উঠে যাওয়া, হত্যা — এসবের কথা শুনেছি। কিন্তু তখনো দিদিমণিদের উপর এ হেন আক্রমণ হয়েছে বলে জানি না। তাছাড়া অধ্যাপকদের কারো কারো বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা সত্ত্বেও সেইসব ছাত্ররা যখন পুলিশ বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে খুন হয়েছে বা পঙ্গু হয়ে গেছে — মাস্টারমশাইদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। যার সবচেয়ে জ্বলজ্বলে প্রমাণ সম্ভবত খুন হওয়া ছাত্রের স্মৃতিতে অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষের সেই বিখ্যাত কবিতা

ময়দান ভারি হয়ে নামে কুয়াশায়
দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যায় রুটমার্চ
তার মাঝখানে পথে পড়ে আছে ও কি কৃষ্ণচূড়া?
নিচু হয়ে বসে হাতে তুলে নিই
তোমার ছিন্ন শির, তিমির।

কয়েকবছর আগে যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল হল হোক কলরব আন্দোলনে তখন আলোচিত হয়েছিল একদা উপাচার্য ত্রিগুণা সেনের কথা, যিনি নিজে কংগ্রেসি ছিলেন। কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় একবার তাঁকে ফোন করে বলেন “তোমার ক্যাম্পাসে দুটো কমিউনিস্ট লুকিয়ে আছে। পুলিশ যাচ্ছে, ওদের তুমি বের করে দাও।” উত্তরে উপাচার্য বলেন “আমি বেঁচে থাকতে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পুলিশ আমার ছেলেদের গায়ে হাত দিতে পারবে না।” হোক কলরব আন্দোলনেও তো যাদবপুরের মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা ছাত্রছাত্রীদের সাথেই ছিলেন। ফলে বোঝা যায় যে যা ছাত্র আন্দোলন তা শিক্ষকবিরোধী হয় না। শিক্ষকবিরোধী হয় গুন্ডামি, যা কোন ইতিহাসের তোয়াক্কা করে না।
এ রাজ্যে এখন স্কুল কলেজের শিক্ষক, অধ্যাপকরা ভীষণ বিপজ্জনক। তাঁরা উন্নয়নবিরোধী, তাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁরা প্রচুর ছুটি পান (ঠিক সময়ে ইনক্রিমেন্ট, ডি এ ইত্যাদি যে পান না সেটা বলাও উন্নয়নবিরোধী), সবচেয়ে বড় কথা তাঁরা প্রতিবাদ করেন। অতএব এই বিপজ্জনক মানুষগুলোর হাত থেকে রাজ্যকে বাঁচাতে গেলে যা যা করার সে তো করতেই হবে। খুন, জখম, মারধোর, শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনা যতটা সম্ভব। অতএব একদিকে তাঁরা খুন হচ্ছেন, খুনের সঠিক তদন্ত দাবী করে হাজতবাস করছেন। অন্যদিকে ছাত্রছাত্রীদের হাতে মার খাচ্ছেন, লাঞ্ছিত হচ্ছেন।
এই যে অবস্থার অবনতি এর জন্যে অনেকেই আবার শিক্ষককুলকেই দাবী করে থাকেন। শিক্ষকদের রাজনীতিই পশ্চিমবঙ্গের পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট করে দিয়েছে এই কথাটা দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে। সেই কারণে কিছু অভিজ্ঞতার কথা এই বেলা বলে ফেলি। আর কিছুদিন পরে এসব বললে হয় লোকে বলবে বানিয়ে বলছি, নয় মারতে আসবে।
আমি যে স্কুলে পড়েছি ক্লাস ফাইভ থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত, সেই স্কুল সেইসময় হুগলী জেলার অন্যতম সেরা স্কুল থেকে রাজ্যের অন্যতম সেরা হয়ে উঠছে। আগ্রহী যে কেউ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের থেকে মাহেশ শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম বিদ্যালয়ের ছাত্রদের ফলাফল যাচাই করে নিতে পারেন। শুধু পরীক্ষার রেজাল্টের দিক থেকেই নয়, আরো নানা দিক থেকেই আমাদের স্কুল ছিল ব্যতিক্রমী। সে নাহয় কোন সুসময়ে স্মৃতি রোমন্থন করতে লেখা যাবে। এখন এর কৃতিত্ব কার? অবশ্যই একজনের নয়। কিন্তু আমাদের মাস্টারমশাইরা বলতেন “সুধীরবাবু না থাকলে স্কুল এই জায়গায় আসত না।”
সুধীরবাবু অর্থাৎ আমাদের হেডস্যার সুধীরকুমার মুখোপাধ্যায়। ভদ্রলোক ঘোর সিপিএম। আমি যখন ঐ স্কুলের ছাত্র তখন উনি নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি (ABTA) র জেলা সম্পাদক। সুধীরবাবুর সবচেয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনেছি আমার প্রিয় ইংরিজির মাস্টারমশাই সোমনাথবাবুর মুখে। স্যার একদিন বলেছিলেন “সুধীরবাবুর আগে কমিটি মেম্বাররা মিটিঙে চলে আসত লুঙ্গি পরে। উনি জলদগম্ভীর স্বরে বলেন ‘বাড়ি থেকে প্যান্ট পরে আসুন। সুধীরবাবুকে ছাড়া এমন হতেই পারত না।’” সোমনাথবাবু কোন শিক্ষক সংগঠনের সদস্য ছিলেন জানি না কিন্তু ঘোর গান্ধীবাদী লোক। বারবার বলেছেন “ঘরে দুটো লোকের ছবি রাখবি, আর কাউকে লাগবে না জীবনে — মহাত্মা গান্ধী আর রবীন্দ্রনাথ।”
আমাদের স্কুলের এসিস্ট্যান্ট হেডস্যার তখন পূর্ণবাবু। তিনি ইতিহাসের শিক্ষক, মার্কসবাদীদের ঘোর অপছন্দ করেন। একবার আমায় বলেছিলেন “সুধীরবাবুর সাথে আমার খুব তর্ক হয়। আমি বলেছি, আপনারা তো মুড়ি মিছরি এক দর করে দিতে চান।”
মার্কসবাদী সুধীরবাবু, গান্ধীবাদী সোমনাথবাবু আর দক্ষিণপন্থী পূর্ণবাবুর কখনো মতপার্থক্য হয়নি এমনটা নিশ্চয়ই নয়, কারণ সেটা অসম্ভব। কিন্তু তা বলে আমাদের স্কুলের উন্নতি থেমে থাকেনি, তরতরিয়ে এগিয়েছে। কেউ উলটো উদাহরণ দিতেই পারেন কিন্তু দুরকম উদাহরণেরই উপস্থিতি এটাই প্রমাণ করে যে সমস্যাটা শিক্ষকদের রাজনীতি করা নয়, খারাপ রাজনীতি করা। অবশ্য যারা অত্যাচারিত হচ্ছে তাদের রাজনীতিকেই দায়ী করা নেহাত গা জোয়ারি। সেখানে এতসব যুক্তি দিয়ে লাভই বা কী?
তপন সিংহের ছবিতে এক নিরীহ শিক্ষক রাজনৈতিক প্রশ্রয়প্রাপ্ত, সমাজবিরোধী হয়ে যাওয়া প্রাক্তন ছাত্রকে খুন করতে দেখে ফেলেন। ছাপোষা, যুবতী মেয়ের বাবা মাস্টারমশাইকে মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে মেনে নিতে হয় “আপনি কিন্তু কিছুই দ্যাখেননি, মাস্টারমশাই।” আমাদের মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের এবং আমাদেরও — এখন সেই অবস্থা। মানে মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে বেঁচে আছি। ছবিতে শিক্ষকের কন্যার মত আমাদের কতজনের যে মুখ পুড়বে আগামীদিনে কে জানে! তবে সেই মাস্টারমশাই কিন্তু শেষ পর্যন্ত সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। বার্ধক্যের লাঠিটাকে স্কুলজীবনের মত আবার শাস্তি দেওয়ার লাঠি করে নিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছিলেন ভয় দেখাতে আসা মস্তানকে।
মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের হাতে মার যারা খেয়েছে তারাই জানে সে মারের জোর কত। হয়ত এখনো পিঠ পাতার সময় হয়নি।

Advertisements

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply