ধোঁকা ধোঁকা ধোঁকা

এখন অব্দি যা খবর তাতে সুপ্রিম কোর্ট একটি ছ মাসের জন্য ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন। ছ মাসের জন্য কারণ মুসলমান মহিলাদের অধিকার রক্ষায় বিদ্যাসাগরের মত লড়ছেন যে ভদ্রলোক, তাঁর সরকার নাকি মুসলমানদের বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে কোন নতুন আইন টাইন করতে চান না। সেটা না করলে পরিস্থিতি ছ মাস পরে আবার পুনঃ তাৎক্ষণিক তালাক ভব হয়ে যাবে।
“আমরা” অবশ্য ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন ইত্যাদি জানিয়ে দিয়েছি এই রায়টার জন্যে। কারণ তাতে “আমাদের” এইটা ভাবতে সুবিধা হয় যে “আমাদের” নেতা “ওদের” মহিলাদের উদ্ধার করলেন। মামলাটা যে করেছিলেন মুসলমান মহিলারাই, এতদিন নিজেদের অধিকারের জন্য লড়লেন তাঁরাই সেটা ভুলে যেতে সুবিধা হয়। রায়টাও যে দিলেন বিচারপতিরা, মোদীবাবু নয় — সেটাও চেপে যাওয়াই ভাল কারণ আদালতের রায় বললে নেশাটা ঠিক জমে না। বিচারকদের তো আর দেখেশুনে, পছন্দ করে কপালে ভোটটি দিইনি। ফলে ওনাদের “আমাদের” লোক বলে ভাবতে এখনো একটু অসুবিধা হয়। তাছাড়া জহরকোট আর শ্বেতশুভ্র দাড়িতে যে মহারাণা প্রতাপসুলভ আবেদনটা আছে সেটা ঢলঢলে কালো কোটে কোথায়? অতএব যাঁর অবদান এই রায়ে গোটাকতক বক্তৃতা আর টুইট বৈ কিছু নয়, তাঁকেই কৃতিত্ব দিতে হবে।
দাঁড়ান, দাঁড়ান। অত অজ্ঞ ভাববেন না। এখুনি বলবেন তো “রাজীব গান্ধী যখন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে মুসলমান মহিলাদের অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দিলেন না তখন কোথায় ছিলেন?” তখন আমি অ আ ক খ শিখছিলাম। তবে রাজীব গান্ধী যে অন্যায় করেছিলেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু নিজেকে রাজীব গান্ধীর চেয়ে উৎকৃষ্ট প্রমাণ করতে শুধু আদালতে তাৎক্ষণিক তিনতালাকের (হ্যাঁ, তাৎক্ষণিক, মানে instant triple talaq কেই অসাংবিধানিক বলেছেন সুপ্রিম কোর্ট। তিনতালাককে নয়) বিরুদ্ধে সরকারী উকিলকে দিয়ে সওয়াল করালে তো যথেষ্ট হবে না, দাদা। একটা নতুন আইন করে দেখান।
এইবার অভিন্ন দেওয়ানি আইনের কথা বলবেন তো? সেটা হলেই এটা হয়ে যায়, তাই না? আচ্ছা তাই হোক। মোদীজি আমাদের বলুন শুনি কী কী থাকবে সেই আইনে? নাহয় টুইট করেই বলুন। কী বললেন? ওটা এখনো তৈরি হয়নি? বুঝুন। দেশসুদ্ধ লোকের গোঁফে তেল মাখিয়ে দিলেন এদিকে কাঁঠাল গাছটা কোথায় সেটাই বলতে পারছেন না? তার মানে যদ্দিন অভিন্ন দেওয়ানী আইন না করতে পারছেন তদ্দিন তাৎক্ষণিক তিনতালাকের কোন প্রতিকার করতে পারবেন না? ও হরি! তাহলে আর কী উদ্ধার করলেন মুসলমান মহিলাদের? না মানে এটা ঠিকই যে হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক, মহিলাদের উদ্ধার করতে না পারলে ঠিক নায়ক হওয়া যায় না। আর এদেশের বাস্তবটা হল সত্যিকারের ক্ষমতার জায়গায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষরাই বসে আছে, অতএব তারা অধিকার না দিলে মেয়েরা অধিকার পাবেও না। সুতরাং মোদীবাবুর দিকেই তো তাকিয়ে থাকতে হবে মুসলমান মহিলাদের অধিকার আদায়ের জন্যে। তিনিও যদি মুসলমান বোনেদের দুঃখে এরকম উদাসীন হন তাহলে চলে?

পুনশ্চ: এই স্ট্যাটাস যাঁরা পড়লেন তাঁদের মধ্যে যদি মোদীজির ঘনিষ্ঠ কেউ থাকেন, দয়া করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলবেন মুসলমান বোনেদের উদ্ধারকার্য শেষ করতে বেশি দেরী না করতে কারণ হিন্দু বোনেরা অনেকে বড় কষ্টে আছেন। বিবাহবিচ্ছেদ তো ছেড়ে দিন, কাকে বিবাহ করবেন সেটা ঠিক করার অধিকারটুকু পাচ্ছেন না, বাপদাদার হাতে বেঘোরে খুন হচ্ছেন। অনেকে আবার সাহস করে বিয়েটা করে ফেলেও স্বামীর সাথে শান্তিতে থাকতে পারছেন না, স্বামীর নামে লাভ জিহাদ না কিসব অভিযোগ শুনছেন বাপের বাড়িতে ঘরবন্দী হয়ে। এঁরাই বা মোদীজি ছাড়া কার ভরসায় থাকবেন?

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply