বিজ্ঞান, অপবিজ্ঞান ও কাঁচকলা

প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের লোকেরা আজকে জে এন ইউ, দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মার খেতে দেখে যেন ভাববেন না আপনাদের উপরে কোন আক্রমণ আসবে না। যে উদাহরণটা দিলাম ওটা যে কোনদিন সত্যি হয়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যেই বিজ্ঞান কংগ্রেসে প্রাচীন ভারতের বিমান প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়ে গেছে। অমর্ত্য সেনকে যারা মূর্খ বলে তারা যে অশোক সেনকে বেশিদিন পন্ডিত বলে মানবে এমন মনে করা যুক্তিসঙ্গত নয়

১৯৮০র দশকে যখন প্রাথমিক শিক্ষার গন্ডিও পেরোইনি তখন থেকেই আত্মীয়স্বজন পাড়া প্রতিবেশীদের কথাবার্তায় বুঝতে পারতাম যে উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা না করে উপায় নেই। অর্থাৎ চাকরিবাকরি পাওয়া যাবে না। একটু বড় হতেই শুনলাম শুধু বিজ্ঞান পড়াও যথেষ্ট নয়, ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হতেই হবে। নাহলে লেখাপড়া করার মানেই হয় না। ঘটনাচক্রে আমার বাবা শিক্ষক, একজন বাদে অন্য জ্যাঠারা শিক্ষক/অধ্যাপক, মামা মাসিরাও ঐ পেশায়, এমনকি মায়ের মামা মাসি, মেসোরাও অনেকে তাই। কিন্তু যা বুঝতাম সেটা হল ওঁদের সময়ে মাস্টার হওয়া ভাল ছিল কিন্তু আমার প্রজন্মের ভদ্রঘরের ছেলেকে (মেয়ে হলে অন্যরকম চলতে পারে, কারণ “সেই তো বিয়ে দিতে হবে”) ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারই হতে হবে।
কতকটা নিকটাত্মীয়দের বেশিরভাগ শিক্ষকতায় থাকার ফলে, অনেকটাই বাবা-মায়ের ব্যতিক্রমী চিন্তাভাবনার সুবাদে আর খানিকটা বরাবর অতি সাধারণ ছাত্র হওয়ার ফলে আমার উপরে বিজ্ঞান পড়ার বা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার চাপ কখনো এসে পড়েনি। নিজের ইচ্ছামতই স্কুল ছাড়ার পরে কলা বিভাগের ছাত্র হতে পেরেছিলাম। তারপর ইংরিজি সাহিত্যের অযোগ্য ছাত্রও হতে পেরেছিলাম। কিন্তু অনেক যোগ্যতর সহপাঠীকে দেখেছি যারা এই স্বাধীনতাটা পায়নি। গান বাজনায় প্রবল আগ্রহ, নিচু ক্লাস থেকেই রাজনৈতিকভাবে খুব সচেতন, বইপাগল অনেক সহপাঠীকে দেখেই মনে হত, এখনো হয়, যে তারা সাহিত্য বা সমাজবিজ্ঞানে ভাল অবদান রাখতে পারত। যারা পারেনি তাদের অপরাধ তারা পরীক্ষায় চমৎকার নম্বর পেত। ভাল নম্বর পাওয়া ছেলেদের ইংরিজিতে যাকে humanities বলে তা নিয়ে পড়াশোনা করা একেবারে বারণ ছিল। ফলে তারা এদেশের লক্ষ লক্ষ ডাক্তারের একজন হয়েছে বা কোন বহুজাতিকের হয়ে সফটওয়্যার কোড লিখে দিন কাটাচ্ছে। যারা কোনভাবে উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে গিয়ে ধ্যাড়াতে পেরেছিল তারা তবু উপকৃত হয়েছে, সাহিত্যের বা সমাজবিজ্ঞানের গবেষণায়, শিক্ষকতায় সরে এসে নিজের বিষয়কে এবং নিজেকে সমৃদ্ধ করেছে। যারা অন্ততপক্ষে জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ব্যর্থ হতে পেরেছিল তারাও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের গবেষণায় বা মাস্টারিতে প্রাণ ঢেলে দিয়ে সুখী হয়েছে।
এ থেকে যা প্রমাণ হয় তা হল প্রায় চল্লিশ বছর আগে থেকেই আমাদের দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তদের মধ্যে চালু ধারণা হল সমাজবিজ্ঞান এবং সাহিত্য ফালতু বিষয়, বিজ্ঞান পড়তে গিয়ে ব্যর্থ হলে বা মেধায় না কুলোলে তবেই ওগুলো পড়া যেতে পারে। ওগুলো এমনকি দ্বিতীয় পছন্দও নয় অনেকের কাছেই। শুধু মাড়োয়ারি নয়, অনেক বাঙালি পরিবারেও দেখেছি উচ্চ মাধ্যমিকে খারাপ নম্বর পেলে বি কমে ঢুকে পড়তে বলা হত। এর একটা কারণ এই যে কোন এক অজ্ঞাত কারণে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল কলাবিভাগে পড়লে অর্থকরী চাকরি পাওয়া যায় না। ততদিনে কিন্তু বামফ্রন্ট সরকার স্কুল, কলেজের শিক্ষকদের ভদ্রস্থ মাইনে দিতে শুরু করেছে।
এই মানসিকতার পরিবর্তন তখনো হয়নি যখন অর্থনৈতিক উদারীকরণের প্রায় এক দশক পরে শিল্পে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের প্রভাবে চাকরিবাকরি কমতে শুরু করল। এই যে সকলকে ঠেলেঠুলে বিজ্ঞান প্রযুক্তি পড়ানো এই প্রবণতাকে কিছুটা সদর্থক বলা যেত যদি এর কারণটা শুধুই পেশাগত না হয়ে মূলত বিজ্ঞানমনস্কতা হত। কিন্তু ঘটনা একেবারেই সেরকম ছিল না। আমাদের এক অধ্যাপক আবশ্যিক বাংলার ক্লাসে একবার বলেছিলেন “তোমরা এতজন যে বিজ্ঞানে অনার্স পড় তার কারণ এই নয় যে তোমরা সবাই বিজ্ঞানকে খুব জরুরী জিনিস মনে কর। তোমরা পড় কারণ একটা প্রচার আছে যে বিজ্ঞান পড়লে ভাল চাকরি পাওয়া যায়। যদি কুসংস্কারে অনার্স পড়লে ভাল চাকরি পাওয়া যেত তাহলে তোমরা কুসংস্কারেই অনার্স পড়তে।” কথাটা বলে তিনি অনেক ছাত্রের বিরাগভাজন হয়েছিলেন, কিন্তু কথাটা সত্যি। সেসময়ে যারা লেখাপড়া করেছে তারা নিজের মনে জানে যে কথাটা সত্যি।
এতে কার ক্ষতি হয়েছে? বরাবর ভাবতাম যাদের জোর করে অপছন্দের বিষয় পড়ানো হয়েছে বুঝি শুধু তাদেরই ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু এখন দেখছি একটা বিরাট সামাজিক ক্ষতি হয়ে গেছে। বেশ কয়েকটা প্রজন্ম তৈরি হয়েছে যাদের ইতিহাসজ্ঞান বলে প্রায় কিচ্ছু নেই কারণ স্কুলে ইতিহাস পড়ার সময়ে এদের বলা হয়েছিল ওটা জরুরী বিষয় নয়, “মুখস্থ করে নম্বর পেয়ে গেলেই যথেষ্ট। মন দিয়ে অঙ্ক, বিজ্ঞান পড়”। ফলে আজকে আপনি এদের বলুন ভগৎ সিংকে ১৪ই ফেব্রুয়ারি ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, এরা পত্রপাঠ বিশ্বাস করে ফেলবে। এদের বলুন জওহরলাল নেহরু দেশের জন্য কিছুই করেননি, এরা বিশ্বাস করে ফেলবে। কারণ স্কুলের ইতিহাস বইতে স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস যা পড়া হয়েছিল তার বিন্দুবিসর্গও এদের মনে নেই। মনে রাখার দরকার নেই ভেবে পড়লে মনে থাকার কথাও নয়। এদের বলুন নেহরুর বদলে সর্দার প্যাটেল প্রধানমন্ত্রী হলে দেশের চেহারা অন্যরকম হত। বিনা প্রশ্নে বিশ্বাস করে নেবে কারণ সন্দেহ হতে গেলে যে প্রাথমিক পড়াশোনা থাকতে হয় সেটাই নেই। থাকলে গুগল করেই জানতে পারত যে সর্দার নেহরুর চেয়ে ১৪ বছরের বড় এবং ১৯৪৭এ দেশ স্বাধীন হয় আর সর্দার মারা যান ১৯৫০এ। প্রধানমন্ত্রী হলেই বা তিনি দেশটা গড়ার সময় পেতেন কখন?
কিন্তু ক্ষতির শেষ শুধু ইতিহাসচেতনাহীনতায় নয়। আরো বড় ক্ষতি এই যে ভারতীয়দের বিরাট অংশ মনে করে সমাজবিজ্ঞানের বিষয়গুলোর কোন কার্যকারিতা নেই, এগুলো অধ্যয়ন করতে কোন মেধা লাগে না, যে কেউ এগুলো নিয়ে কাজ করতে পারে। এই চিন্তার কারণেই সোশাল মিডিয়ায় এবং তার বাইরেও দেখবেন বলা হয় যাদবপুর, জেএনইউ, এফ টি আই আই তে যারা পড়ে তারা হল “ফ্রি লোডার”, তাদের কোন কাজ নেই, শুধু নেশা করে। চট করে কোন আই আই টি সম্পর্কে এরকম বলতে শুনবেন না। অথচ আই আই টির ছেলেমেয়েরাও সরকারী ভর্তুকি পায়, তাদের কেউ কেউও নেশা করে। কেউ বলছে “অমর্ত্য সেন অর্থনীতির কী বোঝেন? ওনার থেকে বড়বাজারে যে ব্যবসা চালায় সে ভাল বোঝে।” আবার কেউ হয়ত বলছে “ফলি নরিম্যান চিফ জাস্টিস ছিলেন বলেই কিসে সিডিশন হয় জানেন তা প্রমাণ হয় না। উকিলরা সব বদমাইশ।”
অথচ কখনো শুনবেন না কেউ বলছে “এ পি জে আব্দুল কালাম বিজ্ঞানের কী বুঝত?” শুনবেন না কারণ গড়পড়তা লোকের ধারণা প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি নিয়ে যারা কাজ করে তারা মেধাবী এবং তাদের কাজ দেশের কাজে লাগে। সমাজবিজ্ঞানের আওতায় কী পড়ে, সেগুলো যে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে নির্ধারক ভূমিকা নেয়, বস্তুত একজন প্রযুক্তিবিদ বা পদার্থবিদের কাজের চেয়ে একজন অর্থনীতিবিদ বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর কাজের প্রভাবই যে একজন সাধারণ নাগরিকের জীবনে বেশি প্রত্যক্ষ সেকথা বোঝার শক্তি লেখাপড়া জানা ভারতবাসীর অধিকাংশেরই আজ নেই। অথচ যদি সমাজবিজ্ঞানের গুরুত্ব কম হত তাহলে উমর খালিদকে বাস্তার নিয়ে সেমিনারে বক্তৃতা দিতে আটকানো হত না, আই আই এস সি র পদার্থবিদ্যার কোন গবেষককে আটকানো হত স্ট্রিং থিওরি নিয়ে কোন বক্তৃতা দেওয়া থেকে। বলা হত “এসব বলা যাবে না। এগুলো বেদবিরোধী।”
প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের লোকেরা আজকে জে এন ইউ, দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মার খেতে দেখে যেন ভাববেন না আপনাদের উপরে কোন আক্রমণ আসবে না। যে উদাহরণটা দিলাম ওটা যে কোনদিন সত্যি হয়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যেই বিজ্ঞান কংগ্রেসে প্রাচীন ভারতের বিমান প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়ে গেছে। অমর্ত্য সেনকে যারা মূর্খ বলে তারা যে অশোক সেনকে বেশিদিন পন্ডিত বলে মানবে এমন মনে করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
যে ক্ষতি ইতিমধ্যেই হয়েছে তার ফল এখন কতদিন ভোগ করতে হবে কে জানে? নতুন বাবা-মায়েরা যদি সন্তানকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞান, সাহিত্যের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করেন তাহলে সুদূর ভবিষ্যৎটা ভাল হয়।
দায়িত্বটা অবশ্য শেষ অব্দি শিক্ষাব্যবস্থাকেই নিতে হবে। প্রেসিডেন্সির দুশো বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরী বলেছিলেন উচ্চশিক্ষায় কলাবিভাগের ছাত্রছাত্রীদেরও অঙ্ক শেখানো উচিৎ। পন্ডিত মানুষ, হয়ত ঠিকই বলেছেন, তবে দেশের এই দুঃসময়টা কেটে গেলে বোধহয় আগে দরকার স্কুলস্তর থেকে যত্ন করে ইতিহাস পড়ানোর সাথে সাথে একেবারে প্রাথমিক স্তরের রাষ্ট্রবিজ্ঞান আর অর্থনীতি পড়ানো।

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading