ফিরে আসে বৃষ্টির পাখিরা — যে সাহিত্য পাঠককে পড়িয়ে নেয়

ছোটবেলায় ‘শুকতারা’, ‘কিশোর ভারতী’ দিয়ে শুরু করে কৈশোরে ‘আনন্দমেলা’ হয়ে শারদ সাহিত্য পড়ার অভ্যেসটা যৌবনে ‘দেশ’, ‘আজকাল’, ‘নন্দন’ পর্যন্ত দিব্যি চলে এসেছিল । কিন্তু পরপর কয়েকবছর থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়ের স্বাদ নিতে হওয়ায় এবং কিছুটা জীবনের চাবুক খেয়ে ওসব পড়ার অভ্যাস ত্যাগ করেছিলাম । গতবছর এক বন্ধুর কথায় জয় গোস্বামী আর শঙ্খ ঘোষের কবিতাদুটো পড়ব বলে শারদীয় দেশ কিনেছিলাম । কিনে দেখলাম ঐ দুজন বাদেও কবিতা বিভাগটা তবু পড়া যায়, গল্প উপন্যাসে পাতা পাঁচেকের বেশি এগোতেই পারছি না । তাই এবছরে আবার বিখ্যাত শারদসংখ্যাগুলোকে ত্যাগ করেছি । তারপর, সাহিত্যিক বন্ধু থাকলে যা হয়, মেদিনীপুর জেলার ‘আমার কাগজ’ পত্রিকায় বেরোনো একটি উপন্যাস পড়ার বড্ড ইচ্ছা হল । পত্রিকাটা না হলেও উপন্যাসটা লেখকের ভালবাসায় আমার ইনবক্সে চলে এল আব্দার করামাত্রই ।
আমরা গত কয়েক দশক ধরে যেসব বাংলা গল্প উপন্যাস জনপ্রিয় পত্রপত্রিকায় পড়তে অভ্যস্ত, যেসব বাংলা ছবি মাল্টিপ্লেক্সে দেখতে অভ্যস্ত তা ভীষণভাবেই নাগরিক । স্থান, কাল, পাত্র, বিষয়, সম্পর্কের টানাপোড়েন — কোনটাই আমার মত মফঃস্বলের গেঁয়ো ভূতকে টানে না । অফিসের সময়টুকু বাদ দিলে আমার যে জীবন, আমার পরিপার্শ্ব, সেসবের গন্ধ কোথাও পাই না ।
কিন্তু ‘ফিরে আসে বৃষ্টির পাখিরা’ নামে এই যে উপন্যাস তার পটভূমি কলকাতা থেকে বেশ দূরে — খড়গপুর, যেখানে আপনি দ্রুতগামী শতাব্দী এক্সপ্রেসে উঠলেও ঘন্টা দেড়েকের আগে পৌঁছবেন না । কেন্দ্রীয় চরিত্র শুভ্র গ্রাম থেকে খড়গপুরে পড়তে আসা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে । আমার বড় চেনা । এমন কতজনের সঙ্গেই না হোস্টেলজীবন কাটিয়েছি যাদের কাছে কলকাতা তো বটেই, বেলুড়ও শহর ।
কিন্তু সত্যি বলতে কলকাতা বা তার আশেপাশের মফঃস্বলে যারা বেড়ে উঠেছে আমার মত, তারা মফঃস্বল আর তার কাছেদূরের গ্রামকে জানতেই পারে না কখনো । পৃথিবীর সব রং কলকাতায় — এমন একটা বিশ্বাস চেতনে বা অবচেতনে গড়ে ওঠে । এই উপন্যাসে লেখক যখন খড়গপুরের অলিগলি চেনাচ্ছিলেন, গিরি ময়দান স্টেশনের গুলমোহর গাছটার কথা বলছিলেন তখন আমার নবগ্রামের এমন সব পথ আর পুকুরঘাটকে ভালবাসতে ইচ্ছা করছিল যাদের ধারকাছ দিয়ে বহুকাল যাওয়া হয় না ।
কিন্তু শুধু কি একটা রেলনগরীর রোম্যান্টিক ছবি সাজানো এই উপন্যাসে ? আদৌ তা নয় । আছে লোহার ছাঁটের চোরা কারবার, মাফিয়া, তোলাবাজ । ইন্দার বাসস্টপের সন্ধ্যা, যেখানে “রোজ নতুন নতুন দেরি করে ফেলা যাত্রী” দেখা যায়, মেসবাড়ির জানলা দিয়ে দেখতে পাওয়া পরমাসুন্দরী বউটির কথার পর যখন এসব প্রসঙ্গ এসে পড়ে তখন মনে পড়ে টি এস এলিয়টকে, যেখানে অ্যালফ্রেড জে প্রুফ্রক প্রেয়সীকে বলছেন চলো, তোমাতে আমাতে সেইখানে যাই যেখানে সন্ধ্যেটা আকাশে ছড়িয়ে আছে । কার মত ? অপারেশন টেবিলে শোয়ানো অজ্ঞান রুগীটার মত ।
আধুনিক হওয়ার সাথে কলকাতালগ্ন হওয়ার যে কোন সম্পর্ক নেই সে কথা তো ভুলতেই বসেছিলাম ।
উপন্যাসটা আমার আরো আপন হয়ে ওঠে যখন এমন একজনের প্রসঙ্গ আসে যাকে দেখতে “অনেকটা আত্মগোপন করে থাকা নকশাল” এর মত । লোকটা আসলে সম্পাদক । এমন একজন সম্পাদক যে বড় শহরের বড় কাগজের চাকরি ছেড়ে এসেছে ছোট শহরে তৃণমূল স্তরের সাংবাদিকতা করবে বলে, যে বাতিলযোগ্য লুনা মোপেডে চড়ে খড়গপুর চষে বেড়ায় খবর আর সম্ভাবনাময় সাংবাদিকের খোঁজে । প্রেমের গল্প বলতে বলতে ঔপন্যাসিক আমায় শুনিয়ে দিলেন সেই গল্প — বড় শহরের মত ছোট শহরেও কিভাবে সাংবাদিকতা বদলে গেল খবরের ব্যবসায়, কিভাবে দুর্নীতিই হয়ে উঠল নিয়ম আর সৎ সাংবাদিকতা হয়ে দাঁড়াল বোকামি, কিভাবে বড় কাগজের জেলার পাতা সাড়ে সর্বনাশ করল জেলার সাংবাদিকতার । দেশজুড়ে এই ইতিহাস যে কত কাগজের !
কাদের নিয়ে ‘খবর খড়গপুর’ চালাতেন এই সম্পাদক —- শুভ্রর রণজয়দা ? আশ্চর্য কিছু চরিত্র । একজন আপাদমস্তক কবি, যে শ্মশান থেকে আহরণ করে তার বেশিরভাগ কবিতার লাইন । কেমন সে লাইনগুলো ? “তুমি সড়ক রমণীর আগুনতলে আশ্চর্য, দুর্বল / তুমি হাওয়ার গল্প, জুনের দিকে তীব্র যাওয়া… / তুমি পঠিত হচ্ছ বায়ুহারাদের দেশে, মুখে / হারিয়ে যাচ্ছ নিঃশব্দে ভ্রমিত কোন প্রেমে…”। বাসুদা, এই কবি, শ্মশানে মড়া পোড়াতে আসা একজনেরই প্রেমে পড়ে আর শ্মশানের মাটিতে শুয়েই বলে “জীবন, জীবনই শেষ কথা ।”
আরো ছিল রঘুদা — আশাহত কমিউনিস্ট বাবার আশাবাদী কমিউনিস্ট ছেলে । শহরের খালি দেওয়াল খুঁজে খুঁজে স্লোগান, কবিতার লাইন আর মার্কস, লেনিনের উক্তি লিখে বেড়ায় । সেইসব উক্তি যেগুলো তার পার্টি লোককে বলা বন্ধ করে দিয়েছে । রেলবস্তিতে বসে রঘুদা অবধারিত বিপথগামিতার আগে কিছু শিশুকে আঁকতে শেখায় ।
এছাড়াও ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী, নির্লজ্জ, অসাধু সৌমাল্যদা । এতই অসাধু যে মৃত বন্ধুর কবিতার খাতা চুরি করে নিজের কবিতায় জুড়ে দিতেও দ্বিধা বোধ করে না ।
ছিল সুপুরুষ, নির্ভীক সাংবাদিক, আমির খসরুভক্ত মাসুদদা, যার সঙ্গে অদ্ভুত এক সম্পর্কের বিপ্রতীপ কোণে দাঁড়াতে হয় শুভ্রকে ।
সবাইকে ছাপিয়ে ছিল কুন্তলা — খাঁচায় বন্দি এক মেয়ে যে আসলে কী চায় সম্ভবত তা-ই ভুলে গিয়েছিল, যেমনটা আমরা অনেকেই যাই । ফলে সে শুভ্রকে দিল দাগা, হয়ত নিজেকেও । কিন্তু তার আগে সে শুভ্রকে উপহার দিয়ে ফেলেছে এক অমর মুহূর্ত ।
শুভ্র। অপাপবিদ্ধ, সুলেখক, স্বপ্নালু শুভ্র । তারও অধঃপতন হয়, হলুদ সাংবাদিকতা তার মনের সমস্ত শ্যামলিমা কেটে সাফ করে দেয় অনবরত । কিন্তু শিকড়টা রয়েই যায় । একটি আত্মহত্যা কিংবা হত্যার পর গিরি ময়দান স্টেশনের বৃষ্টিতে পুনর্জীবন লাভ করে মনুষ্যত্ব । কী করে ? সেটা রহস্য হয়ে থাক ।
আরো অনেক রহস্য, অনেক একান্ত ব্যক্তিগত ভাললাগা অনেকেই খুঁজে পাবেন ‘বৃষ্টির পাখি’ তে । গল্পটা বিষাদে শেষ হয়নি, হয়েছে নতুন আশার সঞ্চারে । কিন্তু আমার মন বিষণ্ন হয়ে গেল এই ভেবে যে বাসুদার মতই খড়গপুরে বা অন্য কোন মফঃস্বল শহরে কি গ্রামে হয়ত কত কবি, কত ঔপন্যাসিক মরে যাচ্ছেন, আমরা কেউ জানতে পারছি না । “উড়ে যাচ্ছে প্রসবকাতর এক শালিখ / ঠোঁটে নিয়ে আমাদের ব্যর্থ মনস্কাম ।”
অন্তত এই উপন্যাসটা যে আমার পড়া হল সেজন্য ঔপন্যাসিক এবং আমার বন্ধু মৃণালকে ধন্যবাদ দিলেও ছোট করা হবে । অরিন্দম দাসের লেখা অমন কবিতার লাইনগুলোই বা পেতাম কোথায় এই উপন্যাসটা না পড়লে ? কবি চলে গেছেন অকালে, নিঃশব্দে । কিন্তু জীবনই যে শেষ কথা তাতে ভুল নেই । নইলে মৃত্যুর দেড় দশক পরে মৃণালের হাত ধরে তাঁর লাইনগুলো আমার কাছে পৌঁছালই বা কী করে আর এভাবে আমাকে নাড়িয়ে দিলই বা কী করে ?

Advertisements

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply