শিয়রে শমন

১৫ই আগস্ট ১৯৪৭ এর পর থেকে বরাবরই ভারতে দারিদ্র্য ছিল, দুর্নীতি ছিল, অশিক্ষা ছিল, জাতের নামে বজ্জাতি ছিল, ধর্মান্ধতা এবং তজ্জনিত হিংসা ছিল । তবু যে ভারত পাকিস্তানের মত সর্বৈব ব্যর্থ এবং সন্ত্রাসবাদীচালিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি তার বড় কারণ — আমরা সেনাবাহিনীকে ব্যারাকের বাইরে এবং ধর্মগুরুদের ধর্মস্থানের বাইরে আসতে দিইনি । এক কথায় আমাদের সরকার, প্রশাসন কারোর গুরুর কথায় চলেনি, কোন সেনাপ্রধানের কথাতেও চলেনি ।
কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষা যাবে কোথায় ? সেই স্বাধীন হওয়ার সময় থেকে এক শ্রেণীর ভারতীয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা “ওরা পাকিস্তান বানিয়েছে, আমরা হিন্দুস্তান বানাব । উন্নত, ভাল দেশ হওয়ার দরকার নেই । পাকিস্তানের উল্টোপিঠ বানানো চাই ।” এই দাবি হতভাগা মহাত্মা গান্ধী আর তার চ্যালাচামুন্ডারা বানচাল করে দিয়েছিল । সেই রাগে ব্যাটাকে সাবড়ে দিয়েও লাভ হয়নি । গান্ধীর পয়লা নম্বর চ্যালা নেহরু আর পয়লা নম্বর বিরোধী আম্বেদকর তো বটেই এমনকি দেশের অন্য পার্টিগুলোও হিন্দুস্তানের দাবিকে পাত্তাই দেয়নি । শেষ অব্দি তাই এরা নিজেরাই একটা পার্টি বানিয়ে নেমে পড়ল । তা অনেকবছর ঘষটানোর পরে বছরদুয়েক হল বেশ হাত পা ছড়িয়ে গ্যাঁট হয়ে এরা সরকারে বসতে পেরেছে আর বসেই শুরু হয়ে গেছে হিন্দুস্তান নির্মাণ । তারই এযাবৎ সবচেয়ে বড় ব্যবস্থা হল নাগা সাধুকে বিধানসভায় বাণী দেওয়ার সুযোগ দেওয়া ।
জ্ঞানের সাগর বাবা সেখানে বলেছেন ধর্ম আর রাজনীতি হল স্বামী স্ত্রীর মত । তাই স্ত্রীকে স্বামীর কথা শুনে চলতেই হবে । নারীবাদীরা সঙ্গত কারণেই রুষ্ট ।তাঁদের আপত্তি বাবার নগ্নতা এবং যে রূপকটা ব্যবহার করেছেন সেটা নিয়ে । কিন্তু সেসবের চেয়ে ঢের বেশি বিপজ্জনক বাবা যা বলেছেন তার নিহিতার্থ । “রাজনীতিকে ধর্মের কথা শুনে চলতেই হবে ।” অর্থাৎ সংবিধান ভুলে যান । ভারতকে বিজেপি বাবার সম্পত্তি করবার দিকে এগোচ্ছে । আইনসভায় একজন ধর্মগুরুর বক্তৃতা দেওয়ার কোন অধিকারই যেখানে নেই সেখানে একজন এসে বক্তৃতা তো দিলই আবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বলে দিয়ে গেল “এখন থেকে আমরা যা বলব তাই শুনে চলতে হবে ।” জল যে আমাদের গলা অব্দি উঠে এসেছে বুঝতে পারছেন কি ? এরপরে দাবিদাওয়া নিয়ে এমপি এমএলএ নয়, হরিসভায় ছুটতে হবে । গণতন্ত্রের বস্ত্রহরণ শুরু হয়েছে । বাবার নগ্নতা আসলে প্রতীকি ।
বিপদটা আরো বড় কেন জানেন ? সরকারপক্ষ না হয় ডেকে এনেছিল । বিরোধীরা আপত্তি করল না কেন ? কত কারণে কত ওয়াক আউট হয় আইনসভাগুলোতে । এই অনধিকার প্রবেশের প্রতিবাদে হল না কেন ? না হওয়ার মানে হচ্ছে সব দলই ধর্মের কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে, হিন্দুস্তান তৈরির পথ প্রশস্ত হচ্ছে ।
আপনি নির্ঘাৎ বলবেন “জৈনরা একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় । তাদের গুরুকে ডেকে আনা একটি ধর্মনিরপেক্ষ পদক্ষেপ । এতে হিন্দুত্ববাদীদের চক্রান্ত দেখা অন্যায় এবং হাস্যকর ।” যদি বলেন তাহলে আপনি হয় গোবেচারা নয় হাড়েবজ্জাত কারণ জৈনরা সংখ্যায় কম হলেও প্রচন্ড প্রভাবশালী । আপনি চোখ বুজে এক মিনিটে ভারতের যে কজন ধনী লোকের নাম মনে করতে পারবেন তাদের অধিকাংশ জৈন । আর জৈন সম্প্রদায়ের গুজরাতি, মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীরা ঐতিহাসিকভাবে বিজেপির সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল । মমতা হাওয়ার মধ্যেও বড়বাজারে বিজেপি কত ভোট পেয়েছিল খোঁজ নিয়ে দেখুন না । জৈন বলতেই যদি আপনি মহাবীর প্রতিষ্ঠিত সেই ব্রাক্ষ্মণ্যবাদবিরোধী ধর্মের কথা এখনো ভাবেন তাহলে আপনি ঘুমোচ্ছেন । শিগগির জাগুন ।
এত কথার পরে বলবেন না “ভারত হিন্দুস্তান হয়ে গেলে ক্ষতি কী ?” উত্তরে ধর্মনিরপেক্ষতা কেন প্রয়োজন তা নিয়ে অনেক কথা বলা যায় । আমি সেসব বলব না । শুধু অনুরোধ করব একবার গুগল করে ১৯৭০-৮০র ইরান, লেবানন, আফগানিস্তান এইসব দেশের ছবি (আলোকচিত্র) দেখুন । তারপর এখনকার ছবিগুলো দেখুন ।

Advertisements

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply