যত পূজা হল না সারা


সুপ্রভাত,

তোমরা যখন এই চিঠি পড়বে তখন আর আমি থাকব না। আমার উপর রাগ কোর না। আমি জানি তোমরা অনেকে সত্যিই আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে, আমাকে ভালবাসতে এবং আমার সাথে ভাল ব্যবহারও করতে। আমার কারো প্রতি কোন অভিযোগ নেই। চিরকাল আমি নিজেই আমার সমস্যা। আমার আত্মা আর শরীরের ব্যবধান ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে, ফলে আমি একটা দানবে পরিণত হয়েছি। আমি বরাবর লেখক হতে চাইতাম। বিজ্ঞান লেখক — কার্ল সেগানের মত। শেষ অব্দি এই চিঠিটা ছাড়া আমার আর কিছু লেখা হয়ে উঠল না।

আমি বিজ্ঞান, নক্ষত্র এবং প্রকৃতিকে ভালবাসতাম। কিন্তু মানুষকে ভালবেসেছিলাম একথা না বুঝেই, যে মানুষ বহুকাল হল প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন। আমাদের অনুভূতি ধার করা, আমাদের ভালবাসা বানানো, আমাদের স্বকীয়তা কৃত্রিম শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। আঘাত না পেয়ে ভালবাসা সত্যিই শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটা মানুষের দাম কমাতে কমাতে তার পরিচিতির সমান করে দেওয়া হয়েছে। একটা ভোটের সমান, একটা নম্বরের সমান, কোন একটা জড় পদার্থের সমান। কিছুতেই একটা মানুষকে একটা মস্তিষ্ক হিসাবে গণ্য করা হয় না, নক্ষত্রচূর্ণে তৈরি এক মহিমাময় বস্তু বলে তাকে ভাবা হয় না। কোন ক্ষেত্রেই হয় না। না লেখাপড়ায়, না রাস্তাঘাটে, না মৃত্যুতে, না জীবনে।

আমার জন্ম এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। আমার শৈশবের একাকিত্ব কিছুতেই আমার পিছু ছাড়ল না। আমি সেই কল্কে না পাওয়া শিশুটিই রয়ে গেলাম।

চলে যাওয়ার পর লোকে আমায় ভীতু বলতে পারে, স্বার্থপর বলতে পারে বা বোকা বলতে পারে। আমার তাতে বয়ে গেছে। আমি মৃত্যুর পরের জীবনে বিশ্বাস করি না, ভূত প্রেতেও বিশ্বাস করি না। আমি একমাত্র যা বিশ্বাস করি তা হল আমি তারায় তারায় ভ্রমণ করতে পারি আর অন্য বিশ্ব সম্বন্ধে জানতে পারি।

না, এটা সুশান্ত সিং রাজপুতের সুইসাইড নোটের বাংলা ভাষান্তর নয়। তিনি ভাল ছাত্র ছিলেন, জাতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় খুব উপরের দিকে র‍্যাঙ্ক করে দিল্লী কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তিও হয়েছিলেন। আর দুটো সেমিস্টার পড়লে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ারও হয়ে যেতেন। পড়েননি সে তাঁর ইচ্ছা। অভিনয় করলে বেশি ভাল করবেন বিবেচনা করে ওখানেই লেখাপড়া সাঙ্গ করেন। সিদ্ধান্তটা যে খুব ভুল ছিল তা-ও নয়। আসলে ইংরেজিতে লেখা এই সুইসাইড নোট যে ছাত্রের তিনি কিন্তু লেখাপড়াই করতে চেয়েছিলেন। তিনি হায়দরাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পি এইচ ডি গবেষক ছিলেন। সুশান্তের মত মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসেননি, এসেছিলেন দারিদ্র্য সীমার নীচের এক পরিবার থেকে। দোষের মধ্যে ছাত্র আন্দোলন করতেন, তার উপর জাতে ছোটলোক (মৃত্যুর পরে অবশ্য সকলে মিলে প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছিল তিনি আদৌ তফসিলি জাতির মানুষ নন)। তাই তাঁর স্টাইপেন্ড বন্ধ করে দিয়ে, সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়েছিল।

যাঁরা এখনো বোঝেননি বা বেমালুম ভুলে গেছেন, তাঁদের জন্য বলা যাক — ছাত্রটির নাম রোহিত ভেমুলা। মানসিক স্বাস্থ্য, অবসাদ, depression মানে কেবল বাঙালি কবি কথিত মনখারাপ আর নিম্নচাপই কিনা — এসব নিয়ে আলোচনা দেখছি আর শুনছি। অবাক হয়ে ভাবছি এই গণ বেদনা, গণ উদ্বেগ, গণ হাহাকার কেন রোহিতের কপালে জোটেনি? একটা কারণ অবশ্যই সুশান্তের পেশা। অমন সুদর্শন একজন মানুষ, যিনি এগারোটা ছবির ছোট্ট কেরিয়ারে অনেককে মোহিত করেছিলেন, তাঁর এভাবে চলে যাওয়া ভারতের কয়েকশো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটার একজন অখ্যাত গবেষকের আত্মহত্যার চেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিক্রিয়াগুলো বোঝার চেষ্টা করছি।

রোহিতের আত্মহত্যায় সোশাল মিডিয়া এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ভিতরে বাইরে বহু মানুষের প্রতিক্রিয়া ছিল “গেছে আপদ গেছে। লেখাপড়া না করে যারা রাজনীতি করে তাদের মায়া দয়া দেখানোর মানে হয় না।” অনেকের, বিশেষত রাষ্ট্রের, প্রতিক্রিয়া ছিল “ও তো দলিতই নয়, আবার দলিত দলিত করে নাচার কী আছে?” অস্যার্থ দলিত হলে না হয় কিছুটা কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করা যেত। ভয়, পাছে ভোট নষ্ট হয়। এ ছাড়াও কারো কারো প্রতিক্রিয়া ছিল “আমি ব্যাপারটা ঠিক জানি না। না জেনে কিছু বলা উচিৎ হবে না।” এর বাইরে ছিলেন তাঁরা, যাঁরা রোহিতের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলতে নারাজ। বলছিলেন ক্ষমতার কাঠামো তাকে ষড় করে জবাই করেছে আসলে।

এই শেষ দলের মানুষদের কথা বাদ দিন। তাঁরা স্পষ্টতই অ্যান্টি ন্যাশনাল। কিন্তু বাকিদের কারো কেন মনে হয়নি ছেলেটা বড় একা হয়ে গিয়েছিল, ওর পাশে কেউ কেন দাঁড়াল না? ছেলেটার হয়ত অনেক কিছু বলার ছিল, শোনার কেউ থাকলে এভাবে ওকে চলে যেতে হত না? ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে রোহিতের সুইসাইড নোট পড়ে কারো তো মনে হয়নি “ইশ! ছেলেটার মহাবিশ্ব নিয়ে কি অদম্য আগ্রহ ছিল! যদি সেগানের মত লেখক হয়ে উঠতে পারত কি ভালই না হত!” আজ সুশান্তের অ্যাস্ট্রোফিজিক্স প্রীতি নিয়ে এই গণ হা হুতাশ ক্রমশ ক্লান্ত, ক্লান্ত করে। যে যতই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করুন, আসলে স্বীকার না করে উপায় নেই যে মনোযোগের এই পার্থক্যের আসল কারণটা রোহিতই তার সুইসাইড নোটে লিখে গেছেন।

সুশান্ত যদি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পড়তেই ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবির জয় লোবোর মত প্রত্যাশার চাপে গলায় দড়ি দিতেন, তাহলেও সে মৃত্যু রোহিতের মৃত্যুর চেয়ে আমাদের বেশি নাড়া দিত। প্রথমত তিনি মধ্যবিত্ত বলে, বাংলায় যাকে বলে ভদ্রলোকের ছেলে। দ্বিতীয়ত, সুশান্ত সিং রাজপুত বলে। অন্ধ্রপ্রদেশের মালা জাতের হতদরিদ্র একটি ছেলের ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করতে করতে আত্মহত্যা করা কোন দুর্ঘটনা নয় আমাদের কাছে। “ওরা তো রিজার্ভেশন না থাকলে চান্সই পেত না”। কিন্তু ভদ্রলোকের ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার বদলে আত্মহত্যা করবে — এ কিন্তু অকল্পনীয়। আঁতকে ওঠার মত। ২০১৬ সালে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সামনে সুশান্তর বক্তৃতা শুনলাম। সেখানে তিনি বলছেন ছোট থেকেই পরিবার ঠিক করে দিয়েছিল তাঁকে ইঞ্জিনিয়ারই হতে হবে, আর দিদিদের ডাক্তার হতে হবে। সুশান্তর পরিবার যেমন, ভারতীয় সমাজও তেমন। ঠিক করে দিয়েছে রোহিত যদি একে গরীব তায় ভেমুলা হয়, তাহলে তাকে মুচি মেথর না হোক, পিওন টিওনই হতে হবে। কার্ল সেগান টেগান ভেবে আনন্দ পেলে পাক, কিন্তু সেসব হয়ে ওঠার বদলে যদি আত্মহত্যা করে বসে তাতে ব্যথিত হওয়ার কিচ্ছু নেই। তার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবার কিচ্ছু নেই। বরং অর্থনৈতিক জোরে এই নিয়ম ভেঙে যদি টিনা দাবির মত কেউ আই এ এস পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করে যায়, তখন তার মেধার প্রশংসা করার বদলে সবাই মিলে বলতে হবে “দেখেছ, কারা সব রিজার্ভেশন নিয়ে বসে আছে?”

তাই ভাবছিলাম, নিত্য সোনার চাঁদ সোনার টুকরো বলে ডাকা হয় যাদের, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কে ভাবে? স্বাধীনতার ৭৫ বছর পর এই প্রথম কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হলেন একজন আদিবাসী — সোনাঝরিয়া মিঞ্জ। যাঁরা হতে পারেননি, কেবল গায়ের রঙ, মুখের ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে ইচ্ছাকৃত এবং অন্যমনস্ক টিটকিরি শুনতে শুনতে জীবন কাটালেন বা না পেরে পড়াশোনার জায়গা থেকে, চাকরি থেকে, কখনো বা জীবন থেকেই বিদায় নিলেন চুনী কোটালের মত, তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কে ভাবে?

কে ভাবে সেইসব সম্ভাবনাময় ছেলেমেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে, যারা কেবল মুসলমান বলে বা আমিষাশী বলে অন্য শহরে পড়তে গিয়ে, চাকরি করতে গিয়ে বাড়ি ভাড়া পায় না? ঘরে বাইরে অনলাইনে অফলাইনে গত দুদিন ধরে এই যে সকলের কথা মন দিয়ে শোনার, কোন বন্ধুকে একা হতে না দেওয়ার কোটি কোটি শপথ এর মধ্যে কোথাও এসবের প্রতিকারের কোন প্রত্যয় রয়েছে কি?

অলস কল্পনায় কোন শিল্পীর হয়ত ভাবতে ইচ্ছা করবে সুশান্ত আর রোহিতের স্বর্গবাস হয়েছে। সেখানে রোহিতের বায়োপিক হচ্ছে, রোহিতের ভূমিকায় অভিনয় করছেন সুশান্ত। আমার মত বেরসিক লোকেরা এসব ভেবে উঠতে পারে না। আমরা গল্পের গরুকে একেবারে চাঁদে নিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী। মানে রোহিতের ভূমিকায় আলি ফজল।

Advertisements