সত্যজিৎ রায়কে পূজার ছলে ভুলে থাকা চলে না

অদূর ভবিষ্যতে এদেশে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সত্যজিৎও গণশত্রু বলে চিহ্নিত হবেন হয়ত।

চার্লস চ্যাপলিনকে কি সত্যিই অ্যাডলফ হিটলারের মত দেখতে ছিল? একেবারেই না। আসলে চ্যাপলিন দাড়িগোঁফহীন অত্যন্ত সুপুরুষ একজন লোক। বাংলায় যাকে বলে রমণীমোহন, উচ্চতার ব্যাপারটা বাদ দিলে তিনি তাই। বেশিরভাগ ছবিতেই অবশ্য ঐ মাছি গোঁফটাসুদ্ধই চ্যাপলিনকে দেখা যায়; কিন্তু সে চেহারাও চোখের ভাষায়, চুলের ছাঁটে, বেশভূষায় টোমেনিয়ার একনায়ক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেলের থেকে বহুযোজন দূরে। বলাই বাহুল্য যে চ্যাপলিন ইচ্ছে করেই হিঙ্কেলকে হিটলারের আদল দিয়েছিলেন। কিন্তু হিটলার কি হিঙ্কেলের মত হাস্যকর একজন লোক ছিল? তা তো নয়। বেলুন নিয়ে খেলা করার মত ছেলেমানুষি তার ছিল না, পর্দা বেয়ে ওঠার মত জোকারসুলভ কাজও সে করত বলে তার ঘনিষ্ঠ কারোর স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায় না। তাহলে চ্যাপলিন কেন এরকম হাস্যকর করে দেখালেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় খুনেটাকে?

দ্য গ্রেট ডিক্টেটর ছবির ৪০ বছর পর মুক্তি পায় হীরক রাজার দেশে। আরেক একনায়কের গল্প। হীরক রাজার চরিত্রে উৎপল দত্তকে মনে করে দেখুন। বিশাল চেহারা, লম্বা গোঁফ, মোটা গলা – বেশ ভয় ধরানো চেহারা। হিঙ্কেলের ঠিক উলটো। কিন্তু মুখের ভাষাটা? প্রথমত সে কথা বলে ছড়া কেটে। যা শুনে হাসি পেতে বাধ্য। দ্বিতীয়ত, উৎপল দত্ত পরে বলেছিলেন, শুটিংয়ের সময়ে সত্যজিৎ রায় তাঁকে বলেন ‘হীরক রাজার সংলাপগুলো গ্রাম্য উচ্চারণে বলো। যারা পড়াশোনা বিশেষ জানে না, তাদের মত। লোকটাকে দর্শকের কাছে হাস্যাস্পদ করে দাও।’

চল্লিশ বছরের ব্যবধানে দুই একনায়ককে পর্দায় দেখাতে গিয়ে দুই জিনিয়াসই দেখালেন হাস্যকর করে, অর্থাৎ ভয়ানক লোকেদের সম্পর্কে ভয় ভেঙে দিলেন। দুই স্রষ্টা একটা ব্যাপারে একমত – একনায়করা সবচেয়ে অপছন্দ করে তাদের নিয়ে হাসাহাসি, কারণ আমাদের ভয়ই তাদের শক্তি। হাসাহাসিতে ভয় কেটে যায়।

চ্যাপলিন বা সত্যজিতের সময়ে ইন্টারনেট ছিল না, মিম ছিল না। ব্যঙ্গ ছিল, শ্লেষ ছিল, একনায়ক ছিল। চ্যাপলিনের সময়ে হিটলার, সত্যজিতের সময়ে ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে, হিটলারের কুকীর্তির সবটা তখনো জার্মানির বাইরের মানুষ জানেন না। কিন্তু দ্রষ্টা চ্যাপলিন ফ্যাসিবাদের বিপদ বুঝেছেন, তাকে নিয়ে প্রবল ঠাট্টা করছেন, বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষকে অন্য ভবিষ্যতের কথা বলছেন। ১৯৮০ সালে সত্যজিৎ যখন হীরক রাজার দেশে আমাদের নিয়ে গেলেন তখন ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় ফেরত এসেছেন। ততদিনে বিশ্ববন্দিত পরিচালক ছোটদের দেখার মত রূপকথার এমন এক গল্প নিয়ে এলেন পর্দায়, যাকে উৎপল পরে বলবেন জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে সত্যজিতের প্রতিবাদ। শুধু কি তাই করেছেন সত্যজিৎ? নাকি যে স্রষ্টারা দ্রষ্টা হন, তাঁদের মতই ভবিষ্যতের একনায়কদেরও একহাত নিয়েছেন, ভবিষ্যতের প্রতিবাদীদের ভাষা জুগিয়েছেন?

গত কয়েক বছরে সোশাল মিডিয়ায় যতবার মমতা ব্যানার্জিকে হীরক রানী আর নরেন্দ্র মোদীকে হীরক রাজা বলা হয়েছে, হীরক রাজার সঙ্গে তার সভাসদদের কথোপকথনের অনুকরণে যত পোস্ট তৈরি হয়েছে – তা প্রমাণ করে সত্যজিৎ এখনো আমাদের প্রতিবাদের ভাষা। মৃত্যুর তিন দশক পরেও তাঁর কাজ আমরা ফিরে দেখব কেন? অভ্যাসবশত? না। সত্যজিৎ শুধু অভ্যাসে পরিণত হওয়ার মত শিল্পী নন, তার চেয়ে অনেক বড়। তিনি দারুণভাবে সমকালীন, তাই চিরকালীন। যেমনটা বলেছেন উৎপল, এই বক্তৃতায়

One has a sneaking suspicion that all this talk of Renaissance ideas may well be a ruse to remove from sight the living contemporaneity of Ray’s ideas and relegate him to a museum of ancient statuary which has ceased to bother us now. This suspicion is strengthened when we consider a film like Ray’s Hirak Rajar Deshe (Kingdom of Diamonds, 1980) which was his response to Mrs Gandhi’s Emergency decree. This film in the guise of a fairytale is a blast against all forms of dictatorship which believes in thought-control, prison for the workers, arrests and deportations but which all the while is preparing its own ultimate destruction.

Renaissance is an inadequate term for Ray. He was a moment in the conscience of man.

এই বক্তৃতার উপলক্ষ ছিল সাহিত্য আকাদেমি, সঙ্গীতনাটক আকাদেমি আর ললিতকলা আকাদেমির যৌথ প্রচেষ্টায় আয়োজিত এক সেমিনার। সত্যজিৎ মারা যাওয়ার ১৩ দিন পরে। মৃত্যুর পর সমস্ত সরকারি মহল থেকে – দূরদর্শনে, রেডিওতে, এমনকি এই সেমিনারে বিলি করা কাগজেও তাঁকে উল্লেখ করা হচ্ছিল “representative of Indian Renaissance” বলে। সেই তকমার বিরুদ্ধে এখানে গর্জে উঠেছেন উৎপল। বলছেন এটা আসলে প্রতিবাদীর প্রতিবাদী চরিত্র ভুলিয়ে দেওয়ার সরকারি চক্রান্ত। ভারতীয় রেনেসাঁ আবার কী জিনিস? খায় না মাথায় দেয়? ঐতিহাসিকরা যেটার কথা বলতেন তা হল বাংলার রেনেসাঁ – হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও আর তাঁর ছাত্রদের দিয়ে যার শুরু আর রবীন্দ্রনাথে যার পূর্ণতা। কিন্তু সেটাও রেনেসাঁ বলতে যা বোঝায়, সেই স্তরে পৌঁছয়নি। সমাজের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে নতুন সমাজ গড়া হয়নি। তাই পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকরা এর নাম দিয়েছেন বাংলার সংস্কার আন্দোলন। কিন্তু সত্যজিৎ শুধু সেই সংস্কারের সন্তান নন, তিনি তার চেয়ে অনেক বেশি।

তাহলে? আজ সত্যজিতের জন্মদিনে আমরা, আত্মবিস্মৃত বাঙালিরা, তাঁকে স্মরণ করব কি শুধু মোদী, মমতার বিরুদ্ধে তিনি আমাদের মিম বানানোর সুযোগ দিয়েছেন বলে? আজকে আমাদের সামনে, গোটা ভারতের সামনে, গোটা পৃথিবীর সামনে কি দুটো মাত্র বিপদ – মোদী আর মমতা? তা তো নয়। গোটা পৃথিবী জুড়েই এখন একনায়কত্বের উত্থানের যুগ। ভারতে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী নরেন্দ্র মোদীর চেহারায়, ইজরায়েলে হানাদারি বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর চেহারায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্পোরেট মুঘল ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেহারায়, রাশিয়ায় যুদ্ধবাজ জাতীয়তাবাদী ভ্লাদিমির পুতিনের চেহারায়, তুরস্কে রচপ তায়িপ এর্দোগানের চেহারায়। এই লড়াইয়ে আমাদের ভাষা যোগাতে পারেন কি সত্যজিৎ?

যতবার হীরক রাজার দেশে দেখি ততবার মনে হয় সারাজীবনে এমন বৈপ্লবিক ছবি সত্যজিৎ আর বোধহয় বানাননি। বিজ্ঞানের উপর আক্রমণের প্রতিবাদে খোদ মার্কিন মুলুকে বিজ্ঞানীরা মিছিল করেছিলেন ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে। এদেশেও বিজ্ঞানীরা এবং বিজ্ঞানচর্চা আক্রমণের মুখে পড়েছে প্রবলভাবেই, যতই চন্দ্রযান আর মঙ্গলযান পাঠানো হোক মহাকাশে। আমাদের দেশে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে অপবিজ্ঞানের চর্চা চালু করা হচ্ছে। মোদীরাজের প্রথম দিকে বিজ্ঞান কংগ্রেসে আলোচনা হত প্রাচীন ভারতের পরমাণু বোমা নিয়ে, ক্রমশ বিজ্ঞান কংগ্রেস বন্ধই করে দেওয়া হল। এখন রামলালার কপালে সূর্যতিলক এঁকে দেওয়াই বিজ্ঞানের বিরাট অর্জন বলে প্রচার করা হচ্ছে। এক বাবাজি করোনার ওষুধ, ক্যান্সারের ওষুধ – সবই আবিষ্কার করে ফেলেছেন, এমন অবৈজ্ঞানিক দাবি করে কোটিপতি হয়ে যান সরকারি মদতে।

এদিকে পিএইচডি স্কলারদের ভাতা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, প্রতিবাদের ঘাঁটি জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ধাক্কায় আটশোর কাছাকাছি পিএইচডি আসন লোপ করে দেওয়ার ঘটনাও বাসি হয়ে গেছে। কারণ ‘এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।’ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালা। দিনের পর দিন কারারুদ্ধ থাকছেন জিএন সাইবাবার মত অধ্যাপক আর উমর খালিদের মত ছাত্ররা। বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই যে অতিকায় সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি আসলে কার মূর্তি। আমাদের গোটা দেশটাই এখন মূর্তির মাঠ।

কিন্তু হীরক রাজার দেশে আটকে থাকলে ভুল করবেন। ১৯৫৫ সালের পথের পাঁচালী থেকে ১৯৯১ সালের আগন্তুক পর্যন্ত ওই একটিমাত্র ছবিই সত্যজিৎ করে গেছেন যা এই দুঃসময়ে আমাদের সম্বল – তা নয়। মনে রাখবেন, সত্যজিৎ সেই পরিচালক যাঁর প্রথম ছবি দেখে এক রাষ্ট্রপতি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন পর্দায় এত দারিদ্র্য দেখালে বিশ্বের কাছে দেশের অসম্মান হবে না? সত্যজিতের সপাট প্রতিপ্রশ্ন ছিল ‘দেশে এত দারিদ্র্য আছে সেটা সহ্য করা যদি আপনার পক্ষে অন্যায় না হয়, আমার পক্ষে সেই দারিদ্র্য দেখানো অন্যায় হবে কেন?’ একের পর এক দক্ষিণপন্থী প্রোপাগান্ডা ছবির যুগে, ইন্টারনেট ট্রোলদের প্রশ্নের মুখে এমন শিল্পীই তো আমাদের ধ্রুবতারা।

আরও পড়ুন টলমলে ট্রিবিউটে ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি গুবলেট

তিনি মারা যান ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে আর ধর্মান্ধ রাজনীতি এদেশে সবচেয়ে বড় সাফল্য পায় ডিসেম্বরে – বাবরি মসজিদ ভেঙে। তার ঠিক ৩২ বছর পরে, আজ, ধর্মান্ধতা এদেশে ফ্যাশনে পরিণত। বাবারা জাঁকিয়ে বসেছেন, দিনকে রাত রাতকে দিন করছেন, গোমূত্র দিয়ে ক্যান্সার সারানোর নিদান দিচ্ছেন, মুখ্যমন্ত্রীও হয়ে বসছেন। লেখাপড়া না জানা, গাঁইয়া, গরীব মানুষ নয়; এই বাবাদের ভক্ত এবং শক্তি সম্ভ্রান্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিপ্রাপ্ত ক্ষমতাশালীরা। মনে পড়ে না বিরিঞ্চিবাবার ভক্তদের? কিন্তু এহেন মহাপুরুষরা শেষ কথা বলেন না। যদি ভরসা হারিয়ে ফেলে থাকেন, একবার দেখুন, বারবার দেখুন কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫)। যমুনাবক্ষে মোচ্ছব করে নদীর বারোটা বাজান এক বাবা আর তাঁর কাছে উপঢৌকন হিসাবে সরকারি আশীর্বাদ নিয়ে পৌঁছন রাষ্ট্রনেতা, দেশের শ্রেষ্ঠ ধনীরা। আমার-আপনার নিরাপত্তার জন্য তৈরি সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হয় ব্যক্তিগত ভৃত্যবাহিনী হিসাবে। মনে হয় না, আমাদের যদি একজন ফেলুদা থাকত, যে বাবাকে গারদে পাঠিয়ে, ধনী ভক্তকে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড় করিয়ে সার্কাসের খেল দেখাত, তবে বেশ হত?

আমরা কি হঠাৎ পৌঁছেছি এই অন্ধকার সময়ে? এক হ্যাঁচকা টানে সংঘ পরিবার আমাদের প্রগতিশীল সমাজকে উল্টোদিকে টেনে নিয়ে গেছে? না। ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ে ফাঁকি ছিল বরাবর। ছিল বলেই ১৯৮৭ সালেও রূপ কানোয়ার সতী হয়, শাস্তি হয় না একজনেরও। ছিল বলেই শাহ বানো সুবিচার পাননি, এত বছর পরেও তিন তালাককে হাতিয়ার করে মুসলমান বিদ্বেষ ছড়িয়ে চলেছে হীরক রাজার লোকেরা। ধর্মের হাতে মেয়েদের এহেন লাঞ্ছনার কালে, অ্যান্টি-রোমিও স্কোয়াডের নামে, লাভ জিহাদের নামে মেয়েদের অধিকারকে অস্বীকার করার দিনে মনে না পড়ে উপায় নেই সত্যজিতের ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি দেবী। সেখানে জমিদার বাড়ির তরুণী বউ দয়াময়ীকে কালীভক্ত শ্বশুরের অন্ধবিশ্বাসের ভারে দেবী হয়ে উঠতে হচ্ছে, যার পরিণতি তার সাজানো জীবন তছনছ হয়ে যাওয়ায়।

বারবার উৎপলের যে বক্তৃতার উল্লেখ করছি, এই অন্ধকারে সত্যজিৎকে খুঁজতে গিয়ে যে বক্তৃতা আমাদের জোরালো টর্চ হতে পারে, সেখানে দেবী সম্পর্কে উৎপল বলছেন

“A proper tribute to Ray would have been… to make arrangements for Devi to be shown all over the country at cheaper rates. Devi is a revolutionary film in the Indian context. It challenges religion as it has been understood in the depths of the Indian countryside for hundreds of years. It is a direct attack on the black magic that is passed off as divinity in this country. Instead of the vulgarized Ramayana and Mahabharata, the Indian TV could have telecast Devi again and again; then perhaps today we would not have to discuss the outrages of the monkey brigade in Ayodhya.”

বুঝতেই পারছেন হীরক রাজার কত বড় শত্রু আমাদের সত্যজিৎ। অদূর ভবিষ্যতে এদেশে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সত্যজিৎও গণশত্রু বলে চিহ্নিত হবেন হয়ত। এমন একজন গণশত্রুকে আমরা এখন গোয়েন্দায় বেঁধে রাখলে তা হবে রবীন্দ্রনাথের সেই গানটার মত – তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

পরমাণু বোমার রাজনৈতিক ক্ষতিসাধনের প্রমাণ এই যুদ্ধ

লক্ষ করে দেখুন, এই মুহূর্তে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি শোষণমূলক, অগণতান্ত্রিক, বুলডোজার-নির্ভর শাসন চলছে।

ইউক্রেনকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সদস্যপদ দিতে উদগ্রীব। ইউরোপিয়ান কমিশন শুক্রবার (১৭ জুন, ২০২২) ভোলোদিমির জেলেনস্কির দেশকে সদস্য করে নেওয়ার সুপারিশ করেছে। সাতাশটা সদস্য দেশের অনুমোদন পেলেই ইউক্রেন পুরোদস্তুর পশ্চিমি দেশ হয়ে উঠবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন দের লেয়েন বলেছেন, ইউরোপ চায় ইউক্রেন “ইউরোপিয়ান ড্রিম” যাপন করুক। কথাগুলো শুনতে চমৎকার। কিন্তু পড়ে কি মনে হচ্ছে, কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের কথা বলা হচ্ছে? অথচ গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর প্রায় চার মাস কেটে গেছে। ক্রমশ একের পর এক এলাকায় যুদ্ধ ছড়িয়েছে এবং সাধারণ মানুষও আক্রান্ত হয়েছেন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে। যত দিন যাচ্ছে সেসব অভিযোগ বেড়েই চলেছে। যদিও ইউক্রেনের মত ছোট্ট একটা দেশ যত সহজে হেরে যাবে বলে মনে করা হয়েছিল, তত সহজে তারা হারছে না। রাশিয়া চার মাসেও আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি। কিন্তু ইউক্রেন বিশ্বের অন্য শক্তিগুলোর কাছ থেকে যতটা সাহায্য আশা করেছিল, তা পেয়েছে কি? এই প্রশ্নটা নিয়ে আলোচনা দরকার। কারণ আমাদের সকলের ভবিষ্যতের ইঙ্গিত এখান থেকে পাওয়া যাবে।

রাশিয়া যে যে কারণে ইউক্রেন আক্রমণ করেছিল, তার অন্যতম হল গত কয়েক বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটোর সাথে ইউক্রেনের আশনাই। পুতিন যে নির্বাচনী গণতন্ত্রের ভেক ধরে রাশিয়ায় একনায়কতন্ত্র চালান, তা নিয়ে সারা বিশ্বের কোনো রাজনৈতিক মতের লোকেরই বিশেষ সন্দেহ নেই। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর মুখেই মার্কিন বিদেশনীতির ঘোরতর বিরোধী নোয়ম চমস্কি বলেছিলেন, পুতিনের জায়গায় মহাত্মা গান্ধী রাশিয়ার কর্ণধার হলেও ন্যাটোর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে আরও কাছাকাছি, আরও কাছে এসো বলা মেনে নিতেন না। ন্যাটো তৈরি হয়েছিল ঠান্ডা যুদ্ধের আমলে, সোভিয়েত ব্লকের দেশগুলোর প্রতিস্পর্ধী সংগঠন হিসাবে। অথচ সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই আজ তিরিশ বছর, ন্যাটো কিন্তু পূর্ব ইউরোপে ডালপালা বিস্তার করেই চলেছে। তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক, এটা নেহাত মার্কিনবিরোধী বামপন্থী যুক্তি। ইউক্রেন একটা স্বাধীন দেশ। সে যদি মনে করে রাশিয়ার পাড়ায় বাস করেও ভ্লাদিমির পুতিনের অপছন্দের আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের সাথে অভিসারে যাবে, তাতে কার কী বলার থাকতে পারে? কিন্তু কথা হল, রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর থেকে জেলেন্সকি যে বারবার ন্যাটোর সাহায্য প্রার্থনা করলেন, তার ফল কী? ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে তো সারা পৃথিবীর মানুষ মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনের কথাবার্তা শুনে আশঙ্কা করছিলেন, ন্যাটো রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যাবে। তেমন কিছু ঘটল না তো!

যুদ্ধ শুরু হওয়ার দু সপ্তাহের মধ্যেই (৯ মার্চ) জেলেন্সকি বলে দিয়েছিলেন ইউক্রেন আর ন্যাটোর সদস্য হতে চায় না। কারণ ন্যাটো ইউক্রেনকে যুক্ত করতে তৈরি নয়। তৎসত্ত্বেও ২৪ মার্চ ব্রাসেলসে ন্যাটোর যে জরুরি বৈঠক হয় সেই বৈঠকে তিনি বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ যথেষ্ট নয়। “আপনাদের এক শতাংশ যুদ্ধবিমান আর এক শতাংশ ট্যাঙ্ক আমাদের দিন। আমাদের কিনে নেওয়ার ক্ষমতা নেই। যদি আমাদের ওগুলো দিয়ে সাহায্য করেন, তাহলে আমরা একশো শতাংশ সুরক্ষিত হতে পারি।” ফরাসি রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রঁ কিন্তু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন “ন্যাটো ঠিক করেছে এই যুদ্ধে ইউক্রেনকে সাহায্য করবে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে না জড়িয়ে।” ইউক্রেনের প্রেমের এই প্রতিদান দিল ন্যাটো। এ যেন এক পৃথিবী লিখব বলে একটা খাতাও শেষ না করার মত প্রেম। আর এতদিন পরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ‘ক্যান্ডিডেট মেম্বারশিপ’ (চূড়ান্ত সদস্যপদ পেতে সাধারণত বছর দশেক লাগে) দেওয়া হল জড়োয়ার গয়নার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইমিটেশন দুল উপহার দেওয়া।

কেন এমন করল ন্যাটো? এক কথায় এর উত্তর সম্ভবত – পরমাণু শক্তি। মনে করুন পরমাণু বোমা যদি ১৯৩০-এর দশকেই আবিষ্কৃত হত, তাহলে অ্যাডলফ হিটলার একের পর এক অস্ট্রিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করে নিল দেখেও ইংল্যান্ড, ফ্রান্স যেমন বিনীতভাবে হাত কচলাচ্ছিল; ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণ করার পরেও হয়ত সেভাবেই চালিয়ে যেত। তাহলে পৃথিবীর ইতিহাস কী হত ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। পরমাণু শক্তি আমাদের কী কী ক্ষতি করেছে তা নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন হিরোশিমা-নাগাসাকি, চেরনোবিল, ফুকুশিমা, তেজষ্ক্রিয়তা – এসব নিয়েই বেশি কথা হয়। কিন্তু পরমাণু বোমার অস্তিত্ব আমাদের যে বিপুল রাজনৈতিক ক্ষতি করেছে তা চট করে স্মরণে আসে না। পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো আজকের বিশ্বে তার প্রতিবেশে যদৃচ্ছা মাস্তানি করতে পারে। ছোট দেশগুলোর পক্ষ নিয়ে কেউ লড়তে আসবে না, কারণ পরমাণু বোমার ভয়। এ এমন এক শক্তি, যার পরিমাণ বাড়লে শক্তি বাড়ে না। ধরুন রাশিয়ার একশোটা পরমাণু বোমা আছে, আমেরিকার আছে পাঁচশোটা। আমেরিকা তবু রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না। কারণ একখানা উড়ে এসে পড়লেই তো যথেষ্ট। তারপর ফিরে পাঁচখানা ছুঁড়লেই বা কী লাভ হবে? হপ্তা দুয়েক আগেই বাইডেন বলে বসেছিলেন, চীন তাইওয়ান আক্রমণ করলে আমেরিকা সামরিকভাবে তার মোকাবিলা করবে। অনতিবিলম্বেই কিন্তু হোয়াইট হাউস এক বিবৃতি দিয়ে জানায়, চীন সম্পর্কে আমেরিকার দীর্ঘকালীন নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। সোজা কথায়, ঢোঁক গেলে। কারণটা একই।

তাহলে আমাদের নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত তো? কারণ ভারত পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র। আমরা তো প্রয়োজন পড়লে এ তল্লাটে যা ইচ্ছে তাই করতেই পারি। আমরা গান্ধী-নেহরুর দেশ বলেই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করাকে অন্যায় মনে করব, সে যুগ চলে গেছে। আমাদের দেশনায়কদের এখন আরাধ্য ইজরায়েল, যাদের অস্তিত্ব ও বিস্তার প্যালেস্তাইনকে গিলে নিয়ে। তাহলে?

আরও পড়ুন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

হাতে বিষের নাড়ুর মত বোমা আছে বলে অত আহ্লাদিত হবেন না। কারণ আমাদের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রও (চীন ও পাকিস্তান) পরমাণু শক্তিধর। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিপদ অন্যখানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হলে ইউরোপের কী হত, বাকি পৃথিবীর কী হত সেকথা থাক। জার্মানির মানুষের কী হত ভাবুন। নাজিদের সবচেয়ে বেশি অত্যাচারের শিকার হয়েছেন তো সে দেশের মানুষই। আরও কত গ্যাস চেম্বার হত, ইহুদী ফুরিয়ে যাওয়ার পর কাদের সেগুলোতে ঢোকানো হত ভেবে দেখুন। যুদ্ধের হাওয়ায় নাজি জার্মানির অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছিল একটা সময়ে। যুদ্ধ মিটে গেলে কী হত? কত মানুষ অনাহারে মারা যেতেন? লক্ষ করে দেখুন, এই মুহূর্তে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি শোষণমূলক, অগণতান্ত্রিক, বুলডোজার-নির্ভর শাসন চলছে। তা নিয়ে অন্য কোনো দেশ সমালোচনা করলেই চট করে বলা হয় “আভ্যন্তরীণ বিষয়”। এ নেহাত কাকতালীয় ঘটনা নয়। এই দেশগুলোর শাসকরা জানে, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, গ্যাস চেম্বার বা তার চেয়েও খারাপ কিছু ঘটে গেলেও অন্য কোনো দেশ সেনাবাহিনী পাঠিয়ে কোনো দেশের মানুষকে মুক্ত করার কথা স্বপ্নেও ভাববে না। কারণ পুতিন, মোদী, জিনপিংদের হাতে আছে একটা সর্বশক্তিমান ব্রিফকেস। সুতরাং পরমাণু শক্তিধর দেশের নাগরিক হিসাবে আমাদের বরং বেশি দুশ্চিন্তায় থাকা উচিত। আমরা স্বাধীন নই, পরমাণু শক্তির অধীন।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

এক যে ছিল সংসদ

বিনা বিতর্কে পছন্দের কাজগুলো হয়ে যাক – এটা এদেশে কে না চায়? যে কোনো বড় শহরের জনবহুল মোড়ে দাঁড়িয়ে যাদের ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা বলে মনে হয় তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন। কতজন যে বলবে “গণতন্ত্রের সীমা থাকা উচিৎ”, “মিলিটারি রুল হচ্ছে বেস্ট”!

সে এক সংসদ ছিল। প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসতেন জহরলাল নেহরু বলে একজন। সাহিত্যিক ই এম ফর্স্টারের ধারণা ছিল, ফরাসী দার্শনিক ভলতেয়ারের যদি পুনর্জন্ম হয় আর তিনি বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে একটা চিঠি লিখবেন ঠিক করেন, তাহলে একমাত্র যে রাষ্ট্রনেতা সেটা পাওয়ার যোগ্য, তিনি নেহরু। আর বিরোধী দলনেতার আসনে বসতেন অসামান্য বাগ্মী এবং পণ্ডিত, অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। একটু দূরেই ছিলেন হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনিও কম বড় বক্তা নন। একবার শ্যামাপ্রসাদ বক্তৃতা দিচ্ছেন, নেহরু উঠে বললেন “What nonsense are you talking?” শ্যামাপ্রসাদ জবাব দিলেন “There’s no monopoly of yours in talking nonsense, sir.”

ঘটনাটা শুনেছিলাম হাওড়ার এক সময়কার সিপিএম সাংসদ প্রয়াত সুশান্ত চক্রবর্তীর মুখে। তিনি আরও একটা সংসদীয় বিতর্কের গল্প শুনিয়েছিলেন। সেটা ওরকম মান্ধাতার আমলের ঘটনা নয়, আমাদের সময়ের অনেক কাছাকাছি। কংগ্রেস নেতা এ আর আন্তুলের বিরুদ্ধে সিমেন্ট নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ। তা নিয়ে বিরোধীরা সংসদে জোর চেপে ধরেছেন সরকারকে। বিতর্কে এক মন্ত্রী দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন, তারপর বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং বলতে উঠেছেন। শুরুতেই বললেন “The minister spoke at length, trying to cement his argument. But failed.”

এই গল্পগুলো শুনি ২০০০ সাল নাগাদ। তখন ক্লাস টুয়েলভে পড়ি, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তরুণ মাস্টারমশাই বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠিক করলেন আমাদের দিয়ে মক পার্লামেন্ট করাবেন। যেদিন অনুষ্ঠানটা হল সেদিন অতিথি হিসাবে এসে সুশান্তবাবু শুনিয়েছিলেন গল্পগুলো। ওগুলো অবশ্য লোকসভা, রাজ্যসভার অধিবেশনের সরাসরি টিভি সম্প্রচার শুরু হওয়ার আগের ঘটনা। আমি যে প্রজন্মের লোক, তারাই প্রথম টিভিতে ওসব দেখতে পায়। তখনো কিন্তু সংসদের বিতর্কগুলোর একটা ন্যূনতম মান ছিল।

আমরা ট্রেজারি বেঞ্চে অটলবিহারী বাজপেয়ীর কথার চেয়ে লম্বা বিরামযুক্ত বক্তৃতা শুনেছি, সাথে তাঁর স্বরচিত কবিতা। যেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে আছে আস্থাভোটে জয়যুক্ত হওয়ার আগে বলা “কর্তব্য পথ পর / ইয়ে ভি সহি, উয়ো ভি সহি।” আমরা লালকৃষ্ণ আদবানির সংস্কৃতাশ্রয়ী হিন্দি বক্তৃতা শুনেছি, বিরোধী আসন থেকে জলদগম্ভীর সোমনাথ চ্যাটার্জিকে শুনেছি, পূর্ণ সাংমাকে মনে আছে, ভোজপুরী হিন্দি আর টুকরো রসিকতায় গুরু বিষয়কে লঘু করে বলতে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন লালুপ্রসাদকেও মনে আছে। আরও পরে সরকারপক্ষের পি চিদম্বরম, কপিল সিবাল আর বিরোধীপক্ষের অরুণ জেটলি, সুষমা স্বরাজ, সীতারাম ইয়েচুরির বক্তব্যও কান পেতে শোনার মত ছিল। তার চেয়েও বড় কথা ওয়াক আউট, বিলের প্রিন্ট আউট ছেঁড়া, ওয়েলে নেমে স্লোগান দেওয়া — এসব সত্ত্বেও খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বিতর্ক হত। তাতে সব পক্ষের প্রধান নেতারা অংশগ্রহণও করতেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা দেবেন না, এটা কল্পনাতীত ছিল।

তারপর আচ্ছে দিন এল। কার জানি না, তবে সংসদীয় গণতন্ত্রের যে নয় তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিন সংসদ ভবনে ঢোকার সময় সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন, বলেছিলেন “এটাই তো আমার মন্দির।” এবং তারপর থেকেই ক্রমশ সংসদের অধিবেশন বসার দিন কমেছে, মন্দিরের প্রধান সেবায়েতের উপস্থিতিও কমেছে। অনেক দেশদ্রোহী বলে উনি সংসদ এড়িয়ে যান কারণ মেঠো বক্তৃতায় হাত-পা নেড়ে, চোখের জল ফেলে উতরে গেলেও সংসদে জোরালো বক্তৃতা দেওয়া ওঁর কম্ম নয়। তবে আমি একথা বিশ্বাস করি না। এটা নেহাতই কুৎসা। আসলে ভদ্রলোক দিনে মোটে চার ঘন্টা ঘুমোন তো। আমার ধারণা সেই চার ঘন্টা হল দুপুর বারোটা থেকে চারটে। তা ঐ সময়টা কি সংসদে বসে নষ্ট করা যায়? ওটুকু না ঘুমোলে মানুষটা অসুস্থ হয়ে পড়বে না?

কিন্তু দেশদ্রোহীরা তো এসব শুনবে না, তারা উল্টোপাল্টা বলবেই। সেটা বন্ধ করতে সরকার ভাল বুদ্ধি বার করেছেন – কোনো বিতর্ক হওয়ারই দরকার নেই সংসদে। এই প্রবণতা শুরু থেকেই অল্প অল্প দেখা যাচ্ছিল। বিমুদ্রাকরণের মত বড় বিষয় নিয়েও বিরোধীরা চেঁচামেচি করার পর সরকার আলোচনায় রাজি হয়েছিল। তাও চেয়েছিল যেন সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়, ভোটাভুটির ব্যাপার না থাকে। এবং যেভাবেই আলোচনা হোক না কেন, প্রধানমন্ত্রী কিন্তু বক্তব্য রাখবেন না।

এবারে আরেক কাঠি সরেস। একটা লোক দেশের এত টাকা মেরে দিয়ে পালিয়ে গেল যে এখনো ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কত টাকা, অথচ সরকারের মনেই হল না এটা নিয়ে সংসদে আলোচনার প্রয়োজন আছে। বিরোধীরা আলোচনার দাবীতে বিস্তর চেঁচামেচি করছেন (বেশ করছেন), এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানাচ্ছেন সরকার সবকিছু নিয়ে আলোচনায় রাজি। কিন্তু একথা বলছেন কবে? না বিনা বিতর্কে অর্থ বিল পাশ হয়ে যাওয়ার পরে। যা যা ছিল তাতে তার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর বিদেশের টাকায় পুষ্ট হওয়াকে আইনসম্মত করে নেওয়াও আছে। এতবড় কান্ড হয়ে গেল কোনো বিতর্ক ছাড়াই। সরকারের যেন কোনো দায় নেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে সংসদ সচল করার। ফ্লোর ম্যানেজমেন্ট কথাটার যেন কোনো অস্তিত্বই নেই।

আসলে বিনা বিতর্কে পছন্দের কাজগুলো হয়ে যাক – এটা এদেশে কে না চায়? যে কোনো বড় শহরের জনবহুল মোড়ে দাঁড়িয়ে যাদের ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা বলে মনে হয় তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন। কতজন যে বলবে “গণতন্ত্রের সীমা থাকা উচিত”, “মিলিটারি রুল হচ্ছে বেস্ট”!

আরও পড়ুন কী ঢাকছে সরকারি চোলি? কেনই বা ঢাকছে?

যাঁরা মনে করেন কথাগুলো ঠিকই, তাঁদের জন্যে একটা ঐতিহাসিক ঘটনা বলে শেষ করি। ঘটনাটার সাথে আমাদের দেশের কোন ঘটনার মিল আছে কিনা আপনারাই ভেবে দেখুন।

ঘটনাটা ঘটে ২১ মার্চ, ১৯৩৩ তারিখে। সেদিন নাজি পার্টির নেতা হিটলার পটসডাম গ্যারিসন চার্চের বাইরে তদানীন্তন জার্মান রাষ্ট্রপতি পল ফান হিন্ডেনবার্গকে হাঁটু মুড়ে অভিবাদন জানায় এবং করমর্দন করে। উপলক্ষটা ছিল নব নির্বাচিত রাইখস্ট্যাগের (জার্মান সংসদ আর কি) প্রথম অধিবেশন। যেহেতু হিন্ডেনবার্গ রাষ্ট্রপ্রধান আর দিনটা হল রাইখস্ট্যাগের অধিবেশন শুরুর দিন, তাই অনেকে মনে করেছিল হিটলার জার্মান সংবিধান ইত্যাদির প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ করল। এর পরের বারো বছর প্রমাণ করেছে তাদের ভাবনাটা সঠিক ছিল কিনা।