ওয়ারেন হেস্টিংস যা শেখালেন

এঁরা মানুষ ভাল, সাহেবদের মতো নৃশংস নন। আর জেলে দেওয়ার কথা ভাবছেন? জেলেই তো রাখা হয়েছে। অতএব বিচার-টিচারের কী দরকার? উমর, শার্জিল ইমাম, গুলফিশা ফতিমার মতো যাকে যাকে আপদ মনে করেন, ঘপ করে অ্যারেস্টো করে নিলেই হল। তারপর বিচার যখন হবে, সে হবে।

আজকাল প্রকাশ্যে কথাবার্তা হেব্বি সাবধানে বলতে হয়। কে যে কোন কথাটাকে ‘কলোনিয়াল মাইন্ডসেট’ বলে বাতিল করে দেবে! হয়তো বললাম, ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে অল্পবয়সি ছেলেমেয়েগুলোকে দেখলে মনটা হু হু করে। বুঝতে পারি, বয়স হয়ে গেল।’ অমনি কেউ তেড়ে এসে বলবে, প্রেমটা পাশ্চাত্য থেকে শিখেছি, এর সঙ্গে আমাদের দেশীয় প্রেমের কোনও সম্পর্ক নেই। হয়তো দুপুর-রোদে আইসক্রিম খেতে গিয়ে একটু বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে বলে ফেললাম ‘আহা! স্বর্গীয়’, ব্যস! অমনি আকাশবাণী শোনা যেতে পারে, ‘কেন? লস্যি, আখের রস, ঘোল— এসব খেলে আরাম হয় না? সাহেবদের পা-চাটা স্বভাব আর গেল না।’ আর কোনওভাবে যদি অ্যারিস্টটল বা শেক্সপিয়রের উদ্ধৃতি দিয়ে ফেলি কোনও লেখায়, তাহলে তো হয়ে গেল! কেন অ্যারিস্টটলের চেয়ে চাণক্য বড়, শেক্সপিয়রের চেয়ে কালিদাস— কেউ তা নিয়ে আস্ত প্রবন্ধ লিখে ফেলবে ফেসবুকের মন্তব্যেই। মানে আমি অস্বীকার করছি না যে, ঔপনিবেশিক মানসিকতা খুবই খারাপ জিনিস এবং ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ নয়, এদেশের প্রেমিক-প্রেমিকাদের বসন্ত-পঞ্চমীতেই সাজুগুজু করে বেরনো উচিত। একথাও ঠিক যে, চাণক্য অ্যারিস্টটলের চেয়ে অনেক বড় দার্শনিক (হোয়াটস্যাপে চাণক্যের বাণীসমূহ পড়লেই সেটা জলের মতো বোঝা যায়)। আমি এটাও মানি যে, লস্যি, আখের রস, ঘোল হল দেবভোগ্য জিনিস; আইসক্রিম নেহাতই মনুষ্যভোগ্য। কিন্তু কথা হচ্ছে, ঔপনিবেশিক শাসকদের থেকে ভাল ভাল জিনিসগুলো কি আমাদের শেখা উচিত নয়? অবশ্যই উচিত! আমাদের দেশের শাসকরা তো শিখেছেন। এই দেখুন না, বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংস সেই যে আড়াইশো বছর আগে মহারাজা নন্দকুমারকে টাইট দিয়েছিলেন (ফাঁসি দেওয়াও ‘কলোনিয়াল কনসেপ্ট’ কি না, নিশ্চিত হতে পারছি না, তাই ঝুঁকি নিলাম না), তা থেকে আমাদের উপনিবেশ-বিরোধী, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-বাদী শাসকরা কত কিছু শিখে নিয়েছেন।

দোষ করুক বা না-ই করুক, ঘপ করে অ্যারেস্টো কর, জেলে তো পচুক…
আচ্ছা, উমর খালিদ বলে ছেলেটির অপরাধটা কী? কারও পকেট মেরেছে? কাউকে ছুরি মেরেছে? কারও দিকে গুলি চালিয়েছে? কোথাও বোম ফেলেছে? ব্যাঙ্কডাকাতি করেছে? রেললাইন উড়িয়ে দিয়েছে? বাইকে বোম-টোম ফিট করে রেখেছিল, সেটা ফেটে মেলা লোক মরেছে? কেউ জানে না। কারণ বিচারই হচ্ছে না চার বছর হয়ে গেল। গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কিন্তু ভয়ংকর সব অভিযোগে। দাঙ্গা লাগিয়েছে, মারাত্মক সব অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দাঙ্গা করেছে, খুন করেছে, খুনের চেষ্টাও করেছে, দেশদ্রোহ চালিয়েছে, বেআইনি কাজকম্ম করেছে, সন্ত্রাসবাদী কাজও করেছে, সেসব করতে টাকা তুলেছে, আরও কীসব ষড়যন্ত্র করেছে। তা এসব যদি করে থাকে, এ তো মহা বিপজ্জনক ছেলে! এর তো সাততাড়াতাড়ি বিচার করে চিরতরে জেলে পুরে দেওয়া দরকার, নইলে একেবারে নন্দকুমার করে দেওয়া দরকার। কিন্তু সে আর হচ্ছে কই? আজ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত করার কাজটাই হল না।

আপনি বুঝি ভাবছেন এটা শাসকদের অক্ষমতা? উঁহু, মোটেই তা নয়। ফাঁসি-টাসি দিলে অনেকসময় লোকে বেজায় খেপে যায়। যাকে ফাঁসি দেবেন, কারও কারও চোখে সে আবার হিরো হয়ে যাবে। যেমন নন্দকুমার এখনও হিরো হয়ে আছেন। হেস্টিংস সাহেব আর এলিয়া ইম্পে সাহেব ভুল করেছিলেন। সেই ভুল থেকে আমাদের শাসকরা শিক্ষা নিয়েছেন। তাছাড়া এঁরা মানুষ ভাল, সাহেবদের মতো নৃশংস নন। ওসব ফাঁসি-টাসির ব্যাপার নেই। আর জেলে দেওয়ার কথা ভাবছেন? জেলেই তো রাখা হয়েছে। অতএব বিচার-টিচারের কী দরকার? উমর, শার্জিল ইমাম, গুলফিশা ফতিমার মতো যাকে যাকে আপদ মনে করেন, ঘপ করে অ্যারেস্টো করে নিলেই হল। তারপর বিচার যখন হবে, সে হবে। বিচার তো আর শাসকের হাতে নয়। সে বিচারকরা বুঝবেন। আপনার গাল দিতে ইচ্ছে হয়, বিচারকদের দিন গে। দিলেই বুঝবেন, ঠ্যালা কত। আদালত অবমাননার দায়ে আপনিও ঘপ করে অ্যারেস্টো হয়ে যাবেন, তারপর কপাল করে যদি তিহার জেলে জায়গা পান, তো পূর্ণিমা চাঁদকে ঝলসানো রুটি মনে করে উমরের সঙ্গে ভাগ করে খেতে পারেন।

আইন আইনের পথে চলবে

হেস্টিংস সাহেব একখানা কাঁচা কাজ করেছিলেন। নিজের দেশের আইনে ভারতীয় নাগরিকের বিচার করিয়েছিলেন। অর্থাৎ কিনা, যে আইন এ-দেশে চালুই নেই, সেই আইনে নন্দকুমারের বিচার হল আর মৃত্যুদণ্ড হয়ে গেল। তাই আজও লোকে একুশে আইন, ঔপনিবেশিক অবিচার ইত্যাদি পাঁচ কথা বলে। কিন্তু আমাদের শাসকরা ওসব ভুল আর করেন না। তাঁরা ইউএপিএ আইন, এনআইএ আইনের মতো ভাল ভাল আইন করেছেন। যেসব আইন ঠিক মনমতো ছিল না, সেগুলোকে গড়েপিটে নিয়েছেন, কলোনিয়াল মাইন্ডসেট থেকে তৈরি ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের জায়গায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতা চালু করেছেন। ইচ্ছে হলে এটাকে ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-ও বলতে পারেন। যার যেরকম রুচি!

আরও পড়ুন কুণাল, যাঁর কৌতুক আজ কামড়ায়

তা এখন আইন আইনের পথে চলবে। চোখে যে কাপড় বাঁধা ছিল, সেটা তো খুলে দেওয়া হয়েছে, ফলে এখন তো আর সরকার-বাহাদুরের হাত ধরে চলতে হয় না। আইন নিজেই নিজের রাস্তা দেখতে পায়। অতএব যা কাজ হবে, সব পাকা কাজ। একেবারে এদেশের আইন মেনে জেলে পোরা হোক, চাবুক মারা হোক আর ফাঁসি দেওয়াই হোক— সেসব হচ্ছে এবং হবে। কারও কিচ্ছুটি বলার নেই।

তোমার কর্ম তুমি করো মা, লোকে বলে করি আমি

সব কিছুতে শাসককে অত দেখা গেলে চলে না। এই সহজ কথাটা হেস্টিংস সাহেব হয় বুঝতে পারেননি, নয় বুঝেও রেলা নিচ্ছিলেন। কারণ ততদিনে বাংলার ভারতীয় শাসকের কোমর ভেঙে গেছে, বুঝে গেছিলেন, যা ইচ্ছে তাই করতে হবে। কিন্তু ওসব কলোনিয়াল মাইন্ডসেট। আমাদের শাসকরা খাঁটি দিশি। তাঁরা ও থেকে শিক্ষা নিয়েছেন, তাই ওরকম অসভ্যতা করেন না। মানে সবেতে নাক গলান না। সারা দেশে এত লোক হাজতবাস করছে, সবার খবর রাখা কি আর সম্ভব? খিদে পেটে কারও পার্স ছিনতাই করে দৌড় দিয়ে ধরা পড়ে যাওয়া গোঁফদাড়ি না গজানো কিশোর থেকে শুরু করে সুধা ভরদ্বাজের মতো বিলেতফেরত নামকরা মহিলা— কতজনই তো জেল খাটে। শাসকদের পক্ষে কি সম্ভব, তাদের সকলের খোঁজ রাখা? উলানবাতার থেকে উদুপি— সবদিকে নজর রেখে এসব ছোট কাজের জন্য সময় থাকে না। নজর না রাখলেই যে ইচ্ছামাফিক অনেক কাজ নিজে নিজে হয়ে যায়, বদনামও হয় না— এই কথাটা কিন্তু হেস্টিংস সাহেবের চেয়ে আমাদের শাসকরা ঢের ভাল বুঝেছেন। উদাহরণ দেব?

এই যে ধরুন ৮০ পেরিয়ে যাওয়া এক বুড়ো পাদ্রি, স্ট্যান স্বামী, তাঁকে পুলিশে ধরেছিল। তারপর মামলার শুনানি তো আজও হচ্ছে, কালও হচ্ছে। আইন আইনের পথে চলছিল, সে পথে ভীষণ জ্যাম। এসে পৌঁছতে সময় লাগবে তো! এদিকে বুড়োটার আবার সাহেবি রোগ ছিল, ‘পারকিনসন্স ডিজিজ’। এসব আমাদের দেশের রোগই নয়, কলোনিয়াল রোগ। তা সে রোগে নাকি গেলাসে করে জল পর্যন্ত খাওয়া যায় না। ভাবুন একবার সাহেবদের আদিখ্যেতা, স্ট্র দিয়ে জল খাওয়ার জন্য আদালতে আর্জি জানানো হয়েছিল। তা আইনকে তো আইনের পথে চলতে হবে। তাই স্ট্র দেওয়া উচিত কি উচিত নয় তা নিয়েও বিস্তর সওয়াল-জবাব চলে। তারপর সিদ্ধান্ত হয়— না, স্ট্র দেওয়া উচিত কাজ হবে না। এসব করতে করতে বুড়োটা অপরাধ করেছে কি করেনি, তার বিচার শুরু না-হতেই জীবন শেষ। দেখুন কেমন ট্যাক্স পেয়ারের টাকা বাঁচিয়ে দিলেন আমাদের শাসকরা। একখানা জল খাওয়ার স্ট্রয়ের দাম কি কম?

এরকম আরও অনেক ভাল ভাল জিনিস হেস্টিংস সাহেবের থেকে শিখেছেন আমাদের শাসকরা। তাই বলছিলাম, সাহেবদের সব জিনিসই ফেলে দেবেন না। ওপরদিকে তাকান, শাসকদের দেখুন এবং শিখুন— কলোনির কোন কোন জিনিস ফেলে দিতে হয় আর কোন কোন জিনিস আপন করে নিতে হয়।

ডাকবাংলা ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ফাদার স্ট্যান স্বামী: একটি শোকহীন মৃত্যু

স্ট্যান স্বামীর জামিনের আবেদন করার লোক কম ছিল না। বারবার আবেদন করা হয়েছে, বারবার শুনানি হয়েছে আর রাষ্ট্র আপ্রাণ চেষ্টা করেছে তিনি যেন জামিন না পান।

৬ জুলাই ছিল দলাই লামার ৮৬তম জন্মদিন। সেই উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই তিব্বতি ধর্মগুরুকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। মোদী যা করেন, সবই ইতিহাসে প্রথমবার ঘটে। দলাই লামাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর ব্যাপারেও নাকি তিনিই প্রথম। সে প্রথম বা চতুর্দশ যা-ই হোন, ব্যাপারটা আপত্তিকর নয়। ভারতবর্ষ সাধুসন্তদের দেশ, ধর্মভীরু মানুষের দেশ। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ধর্মগুরুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাবেন — এ আর বেশি কথা কী? তাছাড়া দলাই লামা কেবল ধর্মগুরু নন, বহু বছর ধরে ভারতেরই বাসিন্দা এবং চীনা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিব্বতি জনগণের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের নেতা। ভারতের মত গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী তো তাঁর পাশেই থাকবেন। অধিকার রক্ষার লড়াই পৃথিবীর সর্বত্র, সব সরকারের আমলেই কেউ না কেউ করে চলে। তেমনই আরেকটা লড়াইয়ের সৈনিক ছিলেন স্ট্যান স্বামী — আরেকজন ধর্মযাজক। দলাই লামার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট এই মানুষটা দলাইয়ের জন্মদিনের আগের দিনই মারা গেলেন। ধর্মভীরু এবং মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে সহমর্মী প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করে টুইট করেননি।

যে মানুষটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত; এমনকি সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নভলাখা, ভারভারা রাও, সোমা সেন, জি এন সাইবাবা, আনন্দ তেলতুম্বড়ে, হ্যানি বাবুদের সাথে মিলে নাকি প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ছক কষছিলেন, তাঁর মৃত্যুতে সেই প্রধানমন্ত্রীই শোক প্রকাশ করবেন! অন্যায় আবদার, তাই না? কিন্তু স্ট্যান স্বামীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ রয়েছে, দলাই লামার বিরুদ্ধে চীনা সরকারের অভিযোগ যে তার চেয়েও সাংঘাতিক। তিনি কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তা নয়, রীতিমত নেতা। সেই কারণেই ১৯৫৯ সালে চীনা বাহিনীর সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর তাঁকে ছদ্মবেশ ধারণ করে ভারতে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। তখনকার প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু থেকে শুরু করে মোদীর পূর্বসুরী মনমোহন সিং পর্যন্ত সব দলের সব প্রধানমন্ত্রী দলাই লামাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন। বিরোধী দলগুলোও এ নিয়ে কখনো সরকারকে আক্রমণ করেনি। এতে চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষতি হলেও নীতি বদলানো হয়নি, কারণ ভারত সরকার তিব্বতের মানুষের অধিকারকে গুরুত্ব দিতে চেয়েছে। ভাবা যেত মোদী সেই ধারাই অনুসরণ করছেন, যদি নিজের দেশের আন্দোলনকারীদের প্রতি তাঁর সরকার সংবেদনশীল হত। অন্য অনেককিছুর মত বিচারাধীন অবস্থায় বৃদ্ধ ধর্মযাজকের মৃত্যুও বোধহয় মোদীর আমলেই প্রথম হল।

এমনিতে ভারতে বিনা বিচারে পুলিশ বা বিচারবিভাগীয় হেফাজতে বছরের পর বছর আটকে থাকা নতুন কিছু নয়। নানা সমীক্ষায় দেখা যায় দলিত, আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষের কপালে এই দুর্ভোগ সহজেই জোটে। ট্যাঁকের জোর না থাকলে বা লোকলস্কর না থাকলে মাত্র কয়েকশো টাকা চুরি করা বাচ্চা ছেলেকেও বিনা বিচারে বহু বছর কারাবাস করতে হয়। মৃত্যুও অস্বাভাবিক নয়। এমনই এক মৃত্যুর ঘটনায় মঙ্গলবার সারাদিন উত্তপ্ত ছিল বর্ধমান জেলার বরাকর। কিন্তু স্ট্যান স্বামীর জামিনের আবেদন করার লোক কম ছিল না। বারবার আবেদন করা হয়েছে, বারবার শুনানি হয়েছে আর রাষ্ট্র আপ্রাণ চেষ্টা করেছে তিনি যেন জামিন না পান। কেবল জামিন নয়, পার্কিনসন্স অসুখে ভোগা এই মানুষটা যাতে জল খাওয়ার জন্য একটা স্ট্র পর্যন্ত না পান তার জন্য প্রাণপণ আইনি লড়াই করেছে মোদী সরকার। দেশদ্রোহীদের এমনটাই হওয়া উচিত — এই মত অনেকেরই। মুশকিল হল, ফাদারের দেশদ্রোহের এক বিন্দু প্রমাণ দিতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। দিল্লি দাঙ্গার জন্য এই একই আইনে অভিযুক্ত উমর খালিদের মত স্ট্যান, ভারভারা, গৌতম, সুধা, সোমাদের বিরুদ্ধেও এখন পর্যন্ত কোন প্রমাণ নেই। প্রমাণ বলতে যা জমা দেওয়া হয়েছে, তা বড়জোর কিছু বইপত্র বা লিফলেট।

ফাদার স্ট্যান সম্বন্ধে যা জানা যায়নি, তা বাদ দিয়ে যা জানা আছে সেগুলো আলোচনা করে দেখা যাক তিনি কেমন ভয়ঙ্কর লোক ছিলেন। তিনি এমন ঘোর সন্ত্রাসবাদী যে মাওবাদী সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া আদিবাসীদের পরিবার পরিজনের হাতে অস্ত্র তুলে না দিয়ে ন্যায়বিচারের দাবিতে জনস্বার্থ মামলা করতেন। সংবিধানের পঞ্চম তফসিল অনুযায়ী কেন আদিবাসী এলাকায় ট্রাইব অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল গড়া হয়নি, সে প্রশ্ন তুলতেন। খনিজ পদার্থের জন্য বা শিল্প গড়তে আদিবাসীদের জল-জঙ্গল-জমির অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে বোমা, বন্দুক, গুলিবিহীন আন্দোলন করতেন।

আরও পড়ুন বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে ইমাম রশিদি

আসলে প্রমাণের দরকার নেই, আটক করে রাখার ইচ্ছাই যথেষ্ট। Unlawful Activities (Prevention) Act বা ইউএপিএ এমন এক আইন, যে আইনে জামিন হল ব্যতিক্রম, অভিযুক্তকে আটক করে রাখাই নিয়ম। অন্য সব আইনের সাথে এই আইনের এখানেই তফাত। মনে রাখা ভাল, ১৯৬৭ সালে চালু হওয়া এই আইনকে ২০০৪ সালে ইউপিএ সরকার সংশোধনী এনে আরো কঠোর করে তোলে। বিপুল অপব্যবহারের অভিযোগে Prevention of Terrorism Act বা পোটা বাতিল করতে হওয়ায়, সেই আইনের বহু আপত্তিকর ধারা এই সংশোধনীর মাধ্যমে ইউএপিএ-তে ঢুকিয়ে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম। কোন দল প্রতিবাদে মুখর হয়নি। চার্জশিট ছাড়াই গ্রেপ্তারির ব্যবস্থা, জামিন পাওয়ার বিষয়ে নানা শর্ত আরোপ করা এবং “সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ”-এর অস্পষ্ট সংজ্ঞার আওতা বৃদ্ধি — সবই ইউপিএ আমলেই করা হয়েছিল, ২০০৮ ও ২০১২ সালে আরো দুটো সংশোধনীর মাধ্যমে। বিজেপি সরকার ২০১৯ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যক্তিকে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে দেগে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, আগে কেবল কোনো সংগঠনকে সন্ত্রাসবাদী গণ্য করা যেত। রাজ্যসভায় বাম দলগুলো, তৃণমূল কংগ্রেস, ডিএমকে, এমডিএমকে, আরজেডি এবং এআইএমআইএমের মত কয়েকটা ছোট পার্টি ছাড়া সেই সংশোধনীর বিরুদ্ধে কেউ ভোট দেয়নি। লোকসভায় এআইএমআইএম, বিএসপি, আইইউএমএল, ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং এইউডিএফ দলের মোট আটজন সাংসদ সংশোধনীর বিরুদ্ধে ভোট দেন। কংগ্রেস ভোটাভুটির সময় ওয়াক আউট করলেও রাজ্যসভায় পক্ষে ভোট দিয়েছিল।

বরাবরই ইউএপিএ-কে আরো শক্তিশালী করার পক্ষে সন্ত্রাসবাদের জুজু দেখানো হয়েছে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এই আইন প্রয়োগ করা হয়েছে সরকারবিরোধী মানুষের উপর। পশ্চিমবঙ্গে বাম আমলে এই আইনে রাজনৈতিক কর্মী, সমাজকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তৃণমূল সরকারের আমলেও সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। তবে যেহেতু এ দেশে বিজেপি বিরোধী শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, তাই এই আইনে গ্রেপ্তার হওয়া মানুষের সংখ্যা এখন কয়েকশোতে পৌঁছেছে।

আসলে ফাদার স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু আমাদের সকলকেই আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শুধু রাজনৈতিক দলগুলো নয়, আমরা সাধারণ নাগরিকরাও সন্ত্রাসবাদের নাম করলেই যে কোন সরকারি দমনপীড়নকে বৈধ বলে মেনে নিয়ে থাকি। তাই এমন সব একুশে আইন দেখে ক্ষেপে ওঠার বদলে খুশি হই। আমাদের মধ্যে অনেকে নিশ্চয়ই স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুতেও “বেশ হয়েছে” মনে করছে। কারণ আমাদের সাধু সন্তদের প্রতি ভক্তির সীমা বাবা রামদেব অব্দি। কোন ফাদারের কাজকর্মের কারণে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার যুগ আমরা পেরিয়ে এসেছি। এক্ষেত্রে কিন্তু মানুষটাকে শ্রদ্ধা করার প্রয়োজন নেই। এটুকু বোঝা দরকার যে কোন কারণে সরকারের (এমনকি স্রেফ পুলিশের) চক্ষুশূল হলেই বিনা প্রমাণে এইভাবে আমাকে, আপনাকেও দিনের পর দিন কারাগারে ফেলে রাখা সম্ভব। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এমনকি জল খাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে তিলে তিলে মেরে ফেলা সম্ভব। আইন মেনেই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত