একনায়কতন্ত্রের ছায়া ঘনাইছে সংসদ ভবনে

একথা পরিষ্কার যে সংসদ কক্ষে নিজের জায়গা বজায় রাখতে হলে বিরোধীদের স্পিকটি নট হয়ে বসে থাকতে হবে। প্রশ্ন করেছ কি মরেছ।

গতবছর ১৮ ডিসেম্বর ছিল বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল। ফাইনালের আগে এবং পরে ভারতের বহু জায়গায় ভারতীয়রা আর্জেন্তিনীয় হয়ে গিয়েছিলেন। নেহাত আর্জেন্টিনা মুসলমান-প্রধান দেশ নয়। নইলে যে হারে আর্জেন্টিনার পতাকা ঝোলানো হয়েছিল পাড়ায় পাড়ায়, কেবল পশ্চিমবঙ্গেই কয়েক হাজার লোকের নামে দেশদ্রোহের মামলা রুজু হয়ে যেত। এখনো সোশাল মিডিয়া খুললে দেখা যাচ্ছে শত শত ভারতীয় একবছর আগের সুখস্মৃতি রোমন্থন করছেন। এবছর ১৮ ডিসেম্বরে বোঝা গেল, ভারত আর আর্জেন্টিনার মিল কেবল ফুটবলপ্রীতিতে নয়।

সবে আর্জেন্টিনায় ক্ষমতায় এসেছে দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্রপতি হাভিয়ের মিলেইয়ের লিবার্টি অ্যাডভান্সেজ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট। এসেই দেশের মুদ্রার মূল্য অর্ধেক করে ফেলেছে এবং তা নিয়ে প্রতিবাদ হবে বুঝে নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী প্যাট্রিশিয়া বুলরিখ বলে দিয়েছেন, যেসব সংগঠন বা ব্যক্তি প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করবে তাদের ডিজিটাল বা সাধারণ উপায়ে চিহ্নিত করা হবে। তারপর প্রতিবাদ আটকাতে যে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করা হবে তার খরচ প্রতিবাদীদের থেকেই আদায় করা হবে। আরও যোগ করেছেন, আমরা বহুবছর সম্পূর্ণ অরাজকতার মধ্যে কাটিয়েছি। এসব খতম করার সময় এসেছে। আন্দোলন, প্রতিবাদকে ‘এক্সটর্শন’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, রাস্তাঘাটে প্রতিবাদ প্রতিরোধে নাগরিকরা অনেক ভুগেছেন। আর চলবে না। কাণ্ড দেখে বামপন্থী সাংসদ মিরিয়াম ব্রেগমান সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিলেন, বুলরিখ যা ঘোষণা করেছেন তা একেবারে অসাংবিধানিক। প্রতিবাদের অধিকার সব অধিকারের মধ্যে প্রথম অধিকার। তাতে ক্ষমতাসীন জোটের নেতা হোসে লুইস এসপার্ত সটান জবাব দিয়েছেন – হয় কারাগার, নয় বুলেট।

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ বা মধ্যপ্রদেশের শিবরাজ চৌহান কি দিল্লি মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের বুলডোজার চালানো, প্রতিবাদীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইন প্রণয়নের সঙ্গে আর্জেন্টিনার সরকারের কার্যকলাপের আন্তরিক মিল। তবে মিলেই সবে ক্ষমতায় এলেন, জাঁকিয়ে বসতে সময় লাগবে। নরেন্দ্র মোদীর সরকার দুটো মেয়াদ পূর্ণ করতে চলল, তৃতীয় মেয়াদের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। ফলে তাঁর সরকারের দমননীতি আরও বেপরোয়া হওয়াই স্বাভাবিক। দেশে বেকারত্বের হার ইংরেজ আমলের হারে পৌঁছে গেছে, জিডিপির হিসাব সন্দেহজনক, ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলো ধুঁকছে, অনাহারের আন্তর্জাতিক সূচকে ভারত নেমেই চলেছে – এসব তথ্য প্রায় সমস্ত মূলধারার সংবাদমাধ্যম পকেটে থাকা সত্ত্বেও চেপে রাখা যাচ্ছে না। বিদেশনীতি বেশ নড়বড়ে দেখাচ্ছে, দক্ষিণ ভারতে যে রাজ্যে বিজেপি সবচেয়ে শক্তিশালী সেখানে বড় হার হল কিছুদিন আগে। এইসব কারণে সম্ভবত মোদী-অমিত শাহরা মাঝে কিছুটা অনিশ্চয়তায় ভুগছিলেন। কিন্তু রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগড়ে বিরাট জয়ে তাঁরা বুঝে ফেলেছেন যে ভারতের প্রাণকেন্দ্র এখনো হাতের মুঠোয়। ফলে কংগ্রেসমুক্ত ভারতের স্লোগান বদলে ফেলা হয়েছে বিরোধীমুক্ত সংসদের অনুচ্চারিত নির্দেশে। তাই আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের বর্ষপূর্তির দিনে ইতিহাস সৃষ্টি করে শতাধিক সাংসদকে সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়েছে পুরো শীতকালীন অধিবেশন থেকে। কে জানত রোহিত শর্মার ক্রিকেট বিশ্বকাপের স্ট্রাইক রেট টপকে যাবেন দুই বৃদ্ধ – ওম বিড়লা আর জগদীপ ধনখড়! শচীন তেন্ডুলকর সম্পর্কে অভিযোগ ছিল, তিনি নব্বইয়ের ঘরে ঢুকে মন্থর হয়ে যান। সম্প্রতি বিরাট কোহলির বিরুদ্ধেও সেরকম অভিযোগ উঠছে। কিন্তু ওম আর জগদীপ ১৮ তারিখ পর্যন্ত ৯২ জন সাংসদকে সাসপেন্ড করে গতি কমাননি। পরদিনই সোজা ১৪১-এ পৌঁছে গেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ভারত অধিনায়কের হাতে বিশ্বকাপ তুলে দেওয়া এবং তা নিয়ে দেশব্যাপী বর্ণাঢ্য প্রচারের অভিলাষ তাঁরই নামাঙ্কিত মাঠে মারা গিয়েছিল, যার অন্যতম কারণ কোহলিদের মন্থর ব্যাটিং। একেবারে সুদে আসলে পুষিয়ে দিচ্ছেন সংসদের দুই কক্ষের কর্ণধার।

কেউ রেগে উঠে বলতেই পারেন, এটা কি ঠাট্টা তামাশার বিষয়? মুশকিল হল, যেভাবে এতজন বিরোধী দলের সাংসদকে সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়েছে তাতে সংসদ জায়গাটাই তো তামাশায় পরিণত হয়েছে। সাসপেন্ড হওয়া সাংসদদের অপরাধ কী? কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে কী করে চারজন সটান সংসদের ভিতরে ঢুকে পড়ল, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করা। দুজনেই সংসদের বাইরে এ নিয়ে কথা বলেছেন, সংবাদমাধ্যমে বলেছেন। কিন্তু কিছুতেই সংসদের ভিতরে বলবেন না। কেন বলবেন না? কোনো প্রশ্ন নয়।

সেই রাহুল গান্ধীকে তড়িঘড়ি লোকসভা থেকে সাসপেন্ড করার সময়েই অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে সরকারের অপছন্দের প্রশ্ন করলে সংসদে টিকতে দেওয়া হবে না। মহুয়া মৈত্রকে সাসপেন্ড করার পদ্ধতি সন্দেহকে বিশ্বাসে পরিণত করল। অবশেষে সরকারের গোঁয়ার্তুমির প্রতিবাদ করার জন্যে ১৪১ জনকে সাসপেন্ড করার পরে আর অন্যরকম ভাবার অবকাশ নেই। একথা পরিষ্কার যে সংসদ কক্ষে নিজের জায়গা বজায় রাখতে হলে বিরোধীদের স্পিকটি নট হয়ে বসে থাকতে হবে। প্রশ্ন করেছ কি মরেছ।

সাসপেনশনের যে কারণ দেখানো হচ্ছে তা যে নেহাতই লোকদেখানো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গৌতম আদানির মালিকানাধীন একটি চ্যানেলে দেখছিলাম বিজেপি মুখপাত্র শাজিয়া ইলমি আর বিজেপিপন্থী সাংবাদিক স্মিতা প্রকাশ বলছেন – সংসদ ভদ্র বিতর্কের জায়গা। বিরোধীদের তাতে আগ্রহ নেই, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছিলেন। তাই তাঁদের সাসপেন্ড করেছেন লোকসভার স্পিকার আর রাজ্যসভার চেয়ারম্যান। বহুজন সমাজ পার্টির সাংসদ দানিশ আলিকে ছাপার অযোগ্য গালাগালি দেওয়া বিজেপি সাংসদ রমেশ বিধুরীও তাহলে ভদ্র বিতর্কে লিপ্ত ছিলেন বলে ধরে নিতে হবে। আরেক বিজেপি সাংসদ প্রতাপ সিমহা, যাঁর সই করা পাস নিয়ে সেদিন সংসদ ভবনে ঢুকে পড়েছিলেন চার বিক্ষুব্ধ তরুণ, তিনিও স্পিকারকে ‘ওঁদের সম্বন্ধে কিছু জানি না’ বলেই পার পেয়ে গেলেন। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায় নিতে হল না। অর্থাৎ নিয়ম বিজেপি সাংসদদের জন্যে একরকম, বিরোধী দলের সাংসদদের জন্যে অন্যরকম।

সে ব্যাপারে অবশ্য বিজেপি নেতাদের বিশেষ রাখঢাক নেই। অরুণ জেটলি সংসদের কাজে বাধা দেওয়াকেও সংসদীয় ব্যবস্থার অঙ্গ বলেছিলেন। ২০০১ সালে সংসদ ভবনে সন্ত্রাসবাদী হানার পরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিবৃতি দিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীও বিবৃতি দিয়েছিলেন। এসব বলেও বিজেপি মুখপাত্রদের দমানো যাচ্ছে না। তাঁরা অবলীলাক্রমে বলে দিচ্ছেন, ওসব কবেকার কথা। এখন দিন বদলে গেছে, আজ আর ওসব চলবে না। যা নেহাতই চক্ষুলজ্জার খাতিরে বলছেন না, তা হল গণতন্ত্র-ফন্ত্র আর চলবে না। সে কারণেই তো ইংরেজ আমলের ফৌজদারি দণ্ডবিধির আধুনিকীকরণের নামে নিয়ে আসা হয়েছে এমন আইন যা পুলিসকে দেবে আরও একচ্ছত্র ক্ষমতা। সরকারের আস্তিনে আছে নতুন টেলিযোগাযোগ সংক্রান্ত বিল, যা আইনে পরিণত হলে কোনো ব্যক্তির বা কোনো এলাকার টেলিযোগাযোগ সরকার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারবে নিজের বিবেচনা অনুযায়ী। আরও আছে পোস্টাল পরিষেবা সংক্রান্ত আইন, যা মোতাবেক পোস্ট অফিস যে কোনো পার্সেল খুলে ফেলতে পারবে। দরকার বুঝলে তা প্রাপকের কাছে না-ও পাঠাতে পারে।

আরও পড়ুন এক যে ছিল সংসদ 

একনায়কতন্ত্রের ছায়া ঘনিয়ে এল। এদিকে বিরোধীরা তাঁদের অর্ধেকের বেশি সাংসদ সাসপেন্ড হয়ে যাওয়ার পরেও লক্ষ্মী হয়ে সংসদের সিঁড়িতেই ধরনা দিচ্ছেন। কে কটা আসনে লড়বেন তা নিয়ে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে আলোচনা হচ্ছে, মমতা ব্যানার্জি রাহুল গান্ধীকে পাশ কাটিয়ে জোটের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে মল্লিকার্জুন খড়্গের নাম করছেন। এ রাজ্যের বামেরা আরও এককাঠি সরেস। তাঁরা মীনাক্ষী মুখার্জিকে ইনসাফ যাত্রা নামক কী একটা কর্মসূচিতে নামিয়ে দিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখছেন তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করবেন। অথচ বিজেপি ২০২৪ নির্বাচন জিতে গেলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটা থাকবে কিনা, তার বিধানসভার গঠন কী হবে তার ঠিক নেই।

সুতরাং ভারতীয় গণতন্ত্র বাঁচবে কিনা, এ প্রশ্ন করলে একটাই উত্তর দেওয়া চলে – সবই রামের ইচ্ছে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

অসংসদীয় শব্দ: মুখ বুজে বাঁচা অভ্যাস করতে হবে

“কথা বোলো না কেউ শব্দ কোরো না 
ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন 
গোলযোগ সইতে পারেন না।”

মনোজ মিত্রের নরক গুলজার নাটকের এই গান গত শতকের একটা অংশে রীতিমত জনপ্রিয় ছিল। আমাদের এঁদো মফস্বলে কলকাতার গ্রুপ থিয়েটার দেখার অভ্যাস খুব বেশি লোকের ছিল না। তৎসত্ত্বেও নব্বইয়ের দশকে অন্তত দুবার শখের অভিনেতাদের পাড়ার মঞ্চে এই নাটক করতে দেখেছি আর নারদের চরিত্রে যে-ই থাকুক, তার গলায় সুর থাক বা না থাক, এ গান গাওয়া মাত্রই দর্শকদের মজে যেতে দেখেছি। পিতামহ ব্রহ্মা টেনে ঘুমোচ্ছেন, দেবর্ষি নারদ নেচে নেচে এই গান গাইছেন – এই হল দৃশ্য। নাটকটি আগাগোড়া সরস। এখানে ব্রহ্মা একজন মানুষকে পুনর্জন্ম দেওয়ার জন্য ঘুষ নিতে যান, চিত্রগুপ্ত দেখে ফেলে আর্তনাদ করে ওঠে “উৎকোচ”। ব্রহ্মা ট্যাঁকে টাকা গুঁজতে গুঁজতে বলেন “মেলা ফাজলামি কোরো না। উৎকোচ ছাড়া আমাদের ইনকামটা কী, অ্যাঁ? আমরা কি খাটি, না এগ্রিকালচার করি, না মেশিন বানাই? অতবড় স্বর্গপুরীর এস্ট্যাবলিশমেন্ট কস্ট আসবে কোত্থেকে, অ্যাঁ?” তাছাড়া এই নাটকে একজন বাবাজি আছেন, যিনি ব্রহ্মার কৃপায় কল্পতরু থলি পাওয়া মাত্রই রম্ভাকে চেয়ে বসেন। কিন্তু থলিতে হাত ঢোকালে হাতে উঠে আসে একটি মর্তমান কলা।

আর বেশি লিখব না, কারণ বৃদ্ধ বয়সে মনোজ মিত্রকে হাজতবাস করানো আমার উদ্দেশ্য নয়। কথা হল বিশ-পঁচিশ বছর আগে একশো শতাংশ হিন্দু (নব্বই শতাংশ উচ্চবর্ণ) অভিনেতাদের দ্বারা অভিনীত এই নাটক দেখেছি, আর একশো শতাংশ হিন্দু দর্শককুলকে নাটক দেখে হেসে গড়াগড়ি খেতে দেখেছি। কিন্তু বিস্তর ধস্তাধস্তির পর মহম্মদ জুবের আজ দিল্লি পুলিসের দায়ের করা মামলাতেও জামিন না পেলে এবং জজসাহেব তাঁর রায়ে বাকস্বাধীনতা যে সাংবিধানিক অধিকার সেটি ষোড়শোপচারে মনে করিয়ে না দিলে সাহস করে এই লেখা লিখতে বসতাম না। কারণ কী লেখা যাবে, কোনটা বলা যাবে সে ব্যাপারে আজকাল আর সংবিধান চূড়ান্ত নয়, সরকারের বকলমে পুলিস চূড়ান্ত। পুলিসের অধিকারের সীমাও বেড়ে গেছে অনেক। একদা পুলিসের হাত এত ছোট ছিল, যে আশিতে আসিও না ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় জলে নেমে পড়ে বলেছিলেন তাঁকে আর ধরা যাবে না, কারণ তিনি তখন জলপুলিসের আন্ডারে। আর এ যুগে আসাম পুলিসের হাত গুজরাট পর্যন্ত লম্বা, পশ্চিমবঙ্গ পুলিসের হাত গোয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দেশটা যে প্রেতপুরীতে পরিণত হয়েছে, এই বোধহয় তার সর্বোত্তম প্রমাণ। কারণ ছোটবেলায় জ্যাঠা-জেঠিদের মুখে কলকাতায় মেসে থেকে চাকরি করা এক গ্রাম্য ভদ্রলোকের গল্প শুনেছিলাম। তিনি বহুকাল পরে বাড়ি গিয়ে খেতে বসেছেন, ডালের সাথে মেখে খাবেন বলে দুটি পাতিলেবুর আবদার করেছেন। করেই দেখেন বউয়ের হাতদুটো ইয়া লম্বা হয়ে নিজের বাড়ির সীমানা পেরিয়ে পাশের বাড়ির গাছ থেকে লেবু পেড়ে নিয়ে এল। আসলে ওলাউঠার মহামারীতে গ্রাম সাফ হয়ে গিয়েছিল। ঘৃণার মহামারীতে আমাদের দেশ সাফ হয়ে গেছে। গল্পের ভদ্রলোক শহরে পালিয়ে বেঁচেছিলেন, আমরা কোথায় পালিয়ে বাঁচব জানি না। ভারত জোড়া ফাঁদ পেতেছ, কেমনে দিই ফাঁকি? আধেক ধরা পড়েছি গো, আধেক আছে বাকি।

আমরা ভারতীয়, আমরা মেনে নিতে জানি। যা যা বলা বারণ, লেখা বারণ সেগুলো মেনে নিয়ে চলব বলেই ঠিক করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম অবাক কাণ্ড! কেবল আমরা মানিয়ে নিলে চলবে না, হাজার ভণ্ডামি ও নোংরামি সত্ত্বেও যে সংসদের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি তার সদস্যদের জন্যেও তালিকা তৈরি হয়েছে। ভগবান, থুড়ি সরকার, যাতে নিশ্চিন্তে নিদ্রা যেতে পারেন, কেউ গোল করতে না পারে তার নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা করতে কোন কোন শব্দ উচ্চারণ করা যাবে না, অর্থাৎ কোনগুলো অসংসদীয়, তার নতুন ফর্দ প্রকাশিত হয়েছে সংসদের মৌসুমি অধিবেশনের প্রাক্কালে। সেখানেই শেষ নয়, আরও বলা হয়েছে, সংসদ চত্বরে কোনো “ডেমনস্ট্রেশন”, ধর্না, ধর্মঘট করা যাবে না। এমনকি অনশন বা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানও করা যাবে না। অর্থাৎ সমস্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই গণতন্ত্রের মন্দিরে বারণ। এ হল সেই মন্দির, যেখানে প্রথমবার প্রবেশ করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘটা করে সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা যাবে না – এই দারুণ ধর্মনিরপেক্ষ আদেশের কারণ অবশ্য দুর্বোধ্য। কারণ মাত্র কয়েকদিন আগে নতুন সংসদ ভবনে দন্তবিকশিত সিংহের মূর্তি স্থাপন করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে পুজো-আচ্চা করেছেন। তাহলে বক্তব্যটি কি এই, যে পুরনো মন্দিরে পুজো চলবে না, নতুন মন্দিরে চলবে? গণতন্ত্রের মন্দিরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করার অর্থই বা কী? তাহলে কি শান্তিভঙ্গ করে যেসব প্রতিবাদ প্রণালী, সেগুলোর পথ পরিষ্কার করা হচ্ছে? মোদীজির বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর ক্যাপিটল হিলে যেরকম প্রতিবাদ দেখে সারা বিশ্ব শিউরে উঠেছিল, তেমন প্রতিবাদ ছাড়া কি এ দেশে আর কোনো প্রতিবাদ করতে দেওয়া হবে না? করলেই বুলডোজার চালানো হবে? প্রতিবাদের চেহারা অবশ্য বিচিত্র। পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কায় আরেক ধরনের প্রতিবাদ হচ্ছে। প্রতিবাদের ধরনধারণ, সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আজ পর্যন্ত কোনো দেশের কোনো শাসকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অবশ্য মোদীজি বালক বয়সে খালি হাতে কুমিরের মুখ থেকে ক্রিকেট বল এবং কুমিরছানা নিয়ে এসেছেন। তাঁর অসাধ্য কী?

মোদীজির সরকার কী কী পারে তা আমরা এতদিনে জেনে ফেলেছি, বিরোধীরা কী পারেন তা দেখা এখনো বাকি আছে। অসংসদীয় শব্দের তালিকার সংযোজনগুলো সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। দু-একজন বিরোধী সাংসদ বলছেন বটে, তাঁরা নির্দেশ অগ্রাহ্য করে ওই শব্দগুলো সংসদে ব্যবহার করবেন, কিন্তু সেই ২০১৪ সাল থেকে তাঁরা যেরকম লক্ষ্মীসোনা হয়ে আছেন, তাতে না আঁচালে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। পালানিয়প্পম চিদম্বরমের মত দু-একজন প্রবীণ সাংসদ তো ইতিমধ্যেই টুইট করে দেখিয়েছেন, ভাষার উপর দখল থাকলেই যে শব্দগুলোকে অসংসদীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলো বাদ দিয়েও সরকারের সমালোচনা করা সম্ভব। সোশাল মিডিয়ায় মস্করাও চালু হয়েছে, শশী থারুরের মত জ্যান্ত থিসরাস থাকতে আর কিসের চিন্তা? এমন সুবোধ বিরোধী থাকতে আমাদের আর কিসের চিন্তা? ইন্টারনেট জোক আর মিম সংস্কৃতি এমন গভীরে পৌঁছেছে যে সাংসদরাও গভীরে ভাবছেন না। তাঁরা বোধহয় ভেবে দেখছেন না, যে কোনো শব্দ অসংসদীয় বলে ঘোষিত হল মানে জোর করে সে শব্দ উচ্চারণ করলেও সংসদের কার্যবিবরণীতে তা নথিবদ্ধ করা হবে না। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে অন্তত সংসদের কার্যবিবরণী থেকে কোনো ইতিহাস লেখক জানতে পারবেন না যে ভারতে ‘স্নুপগেট’ বলে কিছু ঘটেছিল, কেউ ‘ডিক্টেটোরিয়াল’ ছিল বা সরকারের বিরুদ্ধে ‘তানাশাহি’-র অভিযোগ ছিল। মনোমত ইতিহাস লেখার যে ব্যবস্থা ভারতে চলছে, এ-ও যে তারই অঙ্গ, সেকথা বিরোধী দলের কেউ বুঝছেন কি? শুধু ইতিমধ্যেই লিখিত ইতিহাস বিকৃত করা নয়, এই অসংসদীয় শব্দের তালিকা যে ভবিষ্যতে যে ইতিহাস লেখা হবে তা-ও বিকৃত করার প্রচেষ্টা, তা বিরোধীরা কেউ ভেবে দেখেছেন বলে তো মনে হচ্ছে না।

আরও পড়ুন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হলে ক্ষতি নেই বিজেপির

এত সহজে ইতিহাস থেকে সত্য মুছে ফেলা যায় কিনা সে বিতর্ক নেহাতই বিদ্যায়তনিক। তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বিরোধী দলের রাজনীতিবিদদের অধিকার হরণ শুরু হওয়া মাত্রই সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিবাদ করা উচিত। কিন্তু আমাদের বিরোধীরা তেমন করেন না। তাঁদের মধ্যে বিদ্যাসাগর কথিত গোপালরাই দলে ভারি। মাঝেমধ্যে রাহুল গান্ধী রাখাল হয়ে ওঠেন বটে, কিন্তু কদিন না যেতেই ইউরোপে দম নিতে চলে যান। সুললিত ইংরেজি বলতে পারা থারুর বা মহুয়া মৈত্র, ডেরেক ও’ব্রায়েনরাই আজকের সংসদীয় বিরোধিতার মুখ। তাঁরা ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত বা সোমনাথ চ্যাটার্জির মত জাঁদরেল নন, সেকালের মমতা ব্যানার্জির মত ওয়েলে নেমে গিয়ে স্পিকারের মুখে কাগজ ছুড়ে মারার মত মেঠো রাজনীতিও তাঁদের আসে না। তেমন কাজ করলেও দল যে তাঁদের পাশে দাঁড়াবেই, তার নিশ্চয়তা নেই। এমন বিরোধী পেলে যে কোনো শাসকেরই পোয়া বারো হয়। তারা কাকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করবে তা নিয়ে অযথা মাথা ঘামায়, শেষ লগ্নে মাথা চুলকে বলে, আগে বললে তো ওনাদের প্রার্থীকেই সমর্থন করতাম। এদিকে সরকার নিশ্চিন্তে একের পর এক অধিকার হরণ করে চলে।

অতএব আমরা, সাধারণ ভারতীয়রা, আধেক ধরা পড়ে বাকি আধেকের আশঙ্কাতেই থাকি। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বা রচপ তৈয়প এর্দোগানের তুরস্কে মানুষ যেমন মুখ বুজে বাঁচে, তেমনভাবে বাঁচা আমাদের শিগগির অভ্যাস করে নিতে হবে। তবে অসংসদীয় শব্দের তালিকার মত হাজতে পোরার যোগ্য শব্দেরও একটা প্রকাশ্য তালিকা থাকলে আমাদের সুবিধা হয়।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত