বিবিসিকে বাদ দিয়ে বিশ্বগুরু থাকতে পারবেন মোদী?

বিবিসি যতখানি সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ভোগ করে এসেছে চিরকাল, ততখানি আমাদের দূরদর্শন বা অল ইন্ডিয়া রেডিও কোনো দলের সরকারের আমলেই ভোগ করেনি

এই লেখা যখন লিখতে বসেছি, তখন টানা তৃতীয় দিন ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের দিল্লি ও মুম্বাই অফিস জুড়ে বসে আছেন আয়কর আধিকারিকরা। বিবিসি কর্তৃপক্ষ কর্মচারীদের ইমেল পাঠিয়ে জানিয়েছেন আপাতত যেন দফতরে না এসে বাড়ি থেকেই তাঁরা কাজ চালিয়ে যান। এডিটর্স গিল্ড অফ ইন্ডিয়া, ভারতের সম্পাদকদের একটি অগ্রগণ্য সংগঠন, এবং প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়ার মত সাংবাদিকদের সংগঠন একে সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানোর প্রচেষ্টা হিসাবে দেখছে জানিয়ে প্রথম দিনেই (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিবৃতি দিয়েছে। কিন্তু সরকারপক্ষ কিন্তু বলেই যাচ্ছে, এটা বিবিসির দফতরে হানা নয়, সমীক্ষা (সার্ভে) মাত্র। এ এক আইনানুগ নিয়মিত প্রক্রিয়া। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে বলেই নাকি এই সার্ভে করা হচ্ছে।

বলা বাহুল্য, বিবিসি এ দেশের কোনো আইন ভেঙে থাকলে তদন্তের স্বার্থে তাদের দফতরে সার্ভে করা বা হানা দেওয়া এবং তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি দেওয়া ভারত সরকারের আয়কর বিভাগের অধিকার এবং কর্তব্য। কিন্তু মুশকিল হল, এরকম সার্ভে আয়কর বিভাগ এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট গত কয়েক বছরে একাধিকবার দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমের দফতরে চালিয়েছে। অথচ একবারও কোনো সার্ভে বা হানা থেকে কোনো সংবাদমাধ্যমের অপরাধের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এডিটর্স গিল্ডের বিবৃতিতেই উল্লেখ করা হয়েছে নিউজক্লিক, নিউজলন্ড্রি, দৈনিক ভাস্কর এবং ভারত সমাচারের দফতরে আয়কর ও ইডি হানার কথা। তার বাইরেও বেশকিছু সংবাদমাধ্যমের দফতরে এমন ঘটনা ঘটেছে। কাশ্মীরের সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের কাছে তো এসব জলভাত। তাঁরা কথায় কথায় কাগজ বন্ধ করে দেওয়া, নিগ্রহ, ইউএপিএ আইনে কারাবাস – এসবে অভ্যস্ত। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা টিভির অফিসেও ডিসেম্বর মাসে ইডি হানা দিয়েছিল। এই সবকটি সংবাদমাধ্যমই আবার কেন্দ্রীয় সরকারকে অসুবিধায় ফেলে এমন প্রতিবেদন বা বিরোধী মতামত প্রকাশ করার জন্য বিখ্যাত (বা সরকারের কাছে কুখ্যাত)। এ যদি নেহাত কাকতালীয় ব্যাপার হয়, তাহলে বলতেই হবে এই কাক আর এই তাল একেবারে রাজযোটক। ফলে বিবিসির দফতরে যা চলছে তিনদিন ধরে, তাকে বাঁকা নজরে না দেখে উপায় নেই।

এডিটর্স গিল্ডের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০২ সালের গুজরাটের ঘটনাবলী এবং নরেন্দ্র মোদীর রাজত্বে দেশজুড়ে সংখ্যালঘু মানুষের উপর আক্রমণ নিয়ে বিবিসির দুই পর্বের তথ্যচিত্রের পরেই এই সার্ভে। সে তথ্যচিত্র দেশের মানুষকে দেখতে না দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল এই সরকার। ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটারকে দিয়ে ওই তথ্যচিত্রের সমস্ত লিঙ্ক ব্লকও করানো হয়েছিল। ফলে দুয়ে দুয়ে চার করতে কোনো অসুবিধা নেই।

তা বাদেও সরকার যে আসলে বিবিসির উপর ওই তথ্যচিত্রের শোধ তুলছে, আর্থিক অনিয়ম স্রেফ ছুতো – এমন মনে করার কারণ ঘটিয়ে দিচ্ছে নিজেই। কারণ বিবিসি দফতরে হানা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ‘সরকারি’ ভাষ্য নেই। একটি আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থার দফতরে এইরকম হানা (আচ্ছা সার্ভেই হল) আন্তর্জাতিক খবরে পরিণত হয়ে গেছে, অথচ আয়কর বিভাগের কোনো শীর্ষস্থানীয় আধিকারিক বা অর্থমন্ত্রকের কোনো সচিব স্তরের আধিকারিক এ নিয়ে কোনো প্রেস বিবৃতি দেননি। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের দুটি টুইটার হ্যান্ডেলের একটিতেও এ নিয়ে একটি লাইন দেখলাম না। তাহলে প্রথম অনুচ্ছেদে লিখলাম কেন, সরকারপক্ষ বলেই যাচ্ছে…? সেখানেই মজা। ২০০২ সালে গুজরাটে ঠিক কী হয়েছিল, তা নিয়ে সঙ্ঘ পরিবার কখনো এক স্বরে কথা বলে না। একটি অংশ বলে, যা হয়েছিল বেশ হয়েছিল। সন্ত্রাসবাদীদের উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন মোদী। আরেকটি অংশ বলে, খোদ সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে মোদীজির কোনো দোষ ছিল না। এর উপর আর কথা হয় নাকি? সব বিরোধীদের অপপ্রচার।

আরো পড়ুন এই মৃত্যু উপত্যকাই আমার দেশ

বিবিসির দফতরে আয়কর বিভাগের বিচরণ সম্পর্কেও একই পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। এক দল সাংবাদিকের কাছে কিছু তথ্য পাঠিয়ে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। একদা সরকারবিরোধী বলে পরিচিত, রায় দম্পতির প্রস্থানের পর সরকারি হয়ে ওঠা এনডিটিভির সাংবাদিক সংকেত উপাধ্যায়ই যেমন। তিনি টুইট করে এই অভিযোগের কথা জনসমক্ষে এনেছেন। অথচ এই তথ্যের সূত্র কী জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানিয়েছেন, সরকার প্রেস নোট হিসাবে ওই তথ্যগুলি জানিয়েছে। সরকার মানে কে? প্রেস নোটের উপর লেটারহেড কার ছিল? নিচের স্বাক্ষরটি কার? কোন মন্ত্রক থেকে পাঠানো হয়েছে এই নোট? এসবের কোনো উত্তর এই সাংবাদিকরা দিতে পারেননি। অন্যদিকে বিজেপির মুখপাত্ররা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সময়ে বিবিসিকে তেড়ে গাল পাড়ছেন। বিবিসি দুর্নীতিগ্রস্ত, মিথ্যের ঝাঁপি খুলে বসেছে – এরকম নানা অভিযোগ করছেন। ঠিক যে অভিযোগগুলো ‘ইন্ডিয়া: দ্য মোদী কোয়েশ্চেন’ তথ্যচিত্র মুক্তি পাওয়ার পরেও তাঁরা করেছিলেন। এই অভিযোগগুলো সত্যি হতেই পারে। কিন্তু তার সঙ্গে আয়কর বিভাগের কী সম্পর্ক? এর কোনো উত্তর তাঁদের কাছে নেই। অর্থাৎ প্রকারান্তরে মেনে নেওয়া হচ্ছে, আর্থিক অনিয়ম নয়। আপত্তি বিবিসি কী দেখাচ্ছে তা নিয়ে।

স্বাভাবিকভাবেই ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলি এক সুরে সরকারকে সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধের অভিযোগে অভিযুক্ত করছে। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ থেকে শুরু করে সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য পর্যন্ত সকলেই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সরকারের নিন্দা করেছেন। কিন্তু তাতে মোদী সরকারের কী-ই বা এসে যায়? দেশের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম হয় ভক্তিতে নয় ভয়ে সরকারকে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিয়েছে। এনডিটিভির মত দু-একটি নাছোড়বান্দা সংবাদমাধ্যমকে মুকেশ আম্বানি বা গৌতম আদানি কিনে ফেলছেন – চুকে গেল ঝামেলা। কিন্তু বিবিসির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে তার কিছু অন্তত প্রমাণ করতে না পারলে অন্য ক্ষতির সম্ভাবনা। আজকের দুনিয়ায় নিজের দেশের সাড়ে বারোটা বাজিয়েও রাষ্ট্রনেতা হিসাবে বিদেশে নাম কুড়ানো অসম্ভব নয়। বিশেষ করে ভারতের মত দেশ, যার বিরাট বাজার বহুজাতিকদের দরকার এবং যে দেশ পরমাণু শক্তিধর – সে দেশের ভিতরে সংখ্যালঘুরা বাঁচল কি মরল, জনা দুয়েক পুঁজিপতি মিলে দেশের সমস্ত সম্পদের দখল নিয়ে নিল কিনা তা নিয়ে অন্য কোনো দেশ মাথা ঘামাতে যায় না। কিন্তু সেসব দেশের সংবাদমাধ্যমের গায়ে হাত পড়লে যা হয়, তা হল গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে পরিচিতির বারোটা বাজে। সে পরিচিতি নিয়ে কমিউনিস্ট চীনের রাষ্ট্রপ্রধান বিশেষ মাথা ঘামান না। শি জিনপিং নিজের দেশের সকলকে নিজের ইচ্ছামত চালাতে পারলে খুশি, বিশ্বগুরু হতে চান না। কিন্তু মোদী তো চান। তাঁকে যদি ব্রিটেন, আমেরিকার সংবাদমাধ্যম ভ্লাদিমির পুতিন আর জিনপিংয়ের সঙ্গে একাসনে বসিয়ে একনায়ক বলে দেগে দেয় – তা কী পছন্দ হবে মোদীজির?

বিবিসি ব্রিটেনের রাজকীয় সনদের মাধ্যমে গঠিত সরকারের একটি মন্ত্রকের অধীন অথচ স্বায়ত্তশাসিত কর্পোরেশন। একে আমাদের প্রসার ভারতীর সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে ভুল হবে। বিবিসি যতখানি সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ভোগ করে এসেছে চিরকাল, ততখানি আমাদের দূরদর্শন বা অল ইন্ডিয়া রেডিও কোনো দলের সরকারের আমলেই ভোগ করেনি। ফলে ব্রিটেনে কনজারভেটিভ বা লেবার – যার সরকারই থাক, ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মোদী যতই দহরম মহরম করুন, বিবিসি চটলে তারা আরও বেশি করে ভারত সরকার সম্পর্কে বিরূপ প্রচার করবে। বিবিসির দেখাদেখি অন্য বিদেশি সংবাদমাধ্যমও করবে। বিশ্বগুরুর ভাবমূর্তিতে অনবরত আঁচড় পড়তে থাকলে কি খুশি হবেন মোদী? বিবিসি ধোয়া তুলসীপাতা নয়, তবে মনে রাখা ভাল, তারা কিন্তু নিজেদের দেশের ইতিহাসের বিশালকায় রাষ্ট্রনেতা উইনস্টন চার্চিলকেও ছেড়ে কথা বলে না। কথাটা বুঝতেন বলেই ইন্দিরা গান্ধী একসময়ে বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি খড়্গহস্ত হয়েও পরে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ শুরু করেন।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

কী ঢাকছে সরকারি চোলি? কেনই বা ঢাকছে?

আজ বিবিসির তথ্যচিত্র মুছে দেওয়া হচ্ছে, কাল ২০০২ সালে গুজরাটে আদৌ কোনো দাঙ্গা হয়েছিল বলে পোস্ট করলেই তা মুছে দেওয়া হবে। আহসান জাফরি খুন হননি – ওটি ভুয়ো খবর। বিলকিস ধর্ষিত হননি – ওটিও ভুয়ো খবর।

চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়
চোলি কে পিছে?
চুনরী কে নীচে কেয়া হ্যায়
চুনরী কে নীচে?

আমাদের তখন সবে গোঁফের রেখা উঠছে। সন্ধেবেলা দূরদর্শনের ‘সুপারহিট মুকাবলা’ অনুষ্ঠানে খলনায়ক ছবির এই গান পরপর কয়েক সপ্তাহ বেজেছিল এবং আমাদের উদ্বেল করেছিল। তখনো বাঙালি ছেলেমেয়েরা ভূমিষ্ঠ হয়েই হিন্দিতে পণ্ডিত হয়ে যেত না, ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের বাবা-মায়েরাও দলে দলে হিন্দিকে তাদের দ্বিতীয় ভাষা করে তুলতে উদগ্রীব হতেন না। ফলে চোলি আর চুনরী শব্দদুটির অর্থ জানতে আমাদের কিঞ্চিৎ সময় লেগেছিল। জানার পর আমাদের রোমাঞ্চ কোন মাত্রায় পৌঁছেছিল তা আজকের স্মার্টফোন প্রজন্ম কল্পনা করতে পারবে না। কিছুদিন পরে সে রোমাঞ্চে জল ঢেলে দিতে কেউ বা কারা আদালতে মামলা ঠুকে দিল। গানটি শ্লীল না অশ্লীল তা নিয়ে প্রবল তর্কাতর্কি লেগে গেল, কিছুদিন পরে দেখা গেল জনপ্রিয়তায় একসময় এক নম্বরে উঠে যাওয়া ওই গান আর ‘সুপারহিট মুকাবলা’ অনুষ্ঠানে বাজানো হচ্ছে না। ইলা অরুণের গাওয়া ওই চারটি লাইন মোটেই অশালীন নয় – এই যুক্তির পক্ষে যারা, তাদের হাতিয়ার ছিল অলকা ইয়াগনিকের গাওয়া পরের কয়েক লাইন

চোলি মে দিল হ্যায় মেরা
চুনরী মে দিল হ্যায় মেরা
ইয়ে দিল ম্যায় দুঙ্গি মেরে ইয়ার কো, পেয়ার কো।

অকাট্য যুক্তি। ছবিতে দেখা যেত এক নাচাগানার আসরে নীনা গুপ্তা গানের প্রথম চার লাইনের প্রশ্নটি তুলছেন, আর লাস্যময়ী মাধুরী দীক্ষিত স্পষ্ট উত্তর দিয়ে দিচ্ছেন। অতএব অন্য কিছু ভাবার তো কোনো কারণ নেই। যতদূর মনে পড়ে আদালতে গানটির অশ্লীলতা প্রমাণ হয়নি, তাই প্রায় একই যুগের খুদ্দার ছবির অন্য একটি গান ‘সেক্সি সেক্সি সেক্সি মুঝে লোগ বোলে’-র মত আদালতের নির্দেশে গানের কথা বদল করে নতুন করে প্রকাশ করতে হয়নি। কিন্তু ঘটনা হল, চোলির পিছনে আর চুনরীর নিচে যা আছে তা নিয়ে আমাদের রোমাঞ্চে জল ঢালা সম্ভব হয়নি। আমরা যে যার মত করে বুঝে নিয়েছিলাম কী আছে – দিল না অন্য কিছু।

২০০২ সালে গুজরাটে গোধরায় ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের পর কী ঘটেছিল, তাতে নরেন্দ্র মোদীর কতখানি দায় ছিল, আদৌ ছিল কি ছিল না – এ প্রশ্ন উঠলেই আমার ওই গানটির কথাই মনে পড়ে। হৃদয় তো অনেক গভীরে গেলে পাওয়া যায়। বয়ঃসন্ধির ছেলেপুলেদের অতদূর যাওয়ার ধৈর্য থাকে না। আমরা, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘স্কিন ডিপ’, ওই গানের সে অর্থটুকু ভেবেই আহ্লাদিত হতাম। দূরবর্তী কোনো মাইক থেকে গানটি ভেসে এলে বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে চোখ মারামারি চলত, ঠোঁটে থাকত দুষ্টু হাসি। তা বলে কি আমাদের মধ্যে একটিও সুবোধ বালক ছিল না? তারা আমাদের অসভ্য উল্লাস দেখে যারপরনাই বিরক্ত হত। দু-একজন খাঁটি সাত্ত্বিক মানসিকতায় আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করত, আমরা গানটির একেবারে ভুল অর্থ ভেবে নিচ্ছি। একই গানের কথার যে একাধিক অর্থ হওয়া সম্ভব সে শিক্ষা আমরা তখনই পাই – রবীন্দ্রসঙ্গীতের গভীরতা বা ভারতচন্দ্রের ব্যাজস্তুতিকে স্পর্শ করার আগেই।

বিলিতি কবিতার রোম্যান্টিক যুগের কবিরা মনে করতেন মানুষ অমৃতের সন্তান। জন্মের পরেও বেশ কিছুদিন সে নিষ্পাপ থাকে, তারপর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তার মধ্যে পাপ প্রবেশ করে, পবিত্রতা বিদায় নেয়। কবি উইলিয়াম ব্লেক Songs of Innocence আর Songs of Experience নামে দুটি পরিপূরক কবিতার বই লিখে ফেলেছিলেন, আর উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ লিখেছিলেন এ জগৎ হল কারাগার। একটি ছেলে যত বড় হয় তত তার চতুর্দিকে ঘনিয়ে আসে সে কারাগারের গরাদ (“Shades of the prison-house begin to close/Upon the growing Boy”)। ২০০২ সালের মত ঘটনা যখন ঘটে তখন মানুষ অমৃতের সন্তান না মৃত্যুর সওদাগর তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ দেখা দেয়। তবে এখন পিছন ফিরে মনে হয় মাধুরীর চোলি যেমন আমাদের নিষ্পাপ নাবালকত্ব থেকে অভিজ্ঞ সাবালকত্বে পৌঁছে দিয়েছিল, তেমনই গুজরাট ২০০২ ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে রাম জন্মভূমি নিয়ে গণহিস্টিরিয়া তৈরি করা আর মসজিদ ভাঙার রাজনীতির নাবালকত্ব থেকে শাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে অভীষ্ট লক্ষ্যপূরণের সাবালকত্বে পৌঁছে দিয়েছিল।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত একাধিক মামলায় রায় দিয়েছে – কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু, ধর্ষণ, বাস্তুচ্যুতির পিছনে কোনো বৃহত্তর অপরাধমূলক চক্রান্ত ছিল না। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মোদীরও কোনো প্রত্যক্ষ দায় ছিল না। এর উপরে আর কথা কী? কে না জানে, ভারতের বিচারব্যবস্থার মত নিখুঁত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা পৃথিবীর কোথাও নেই? সেই কারণেই তো বিচারপতি নিয়োগের কলেজিয়াম ব্যবস্থাকে বাতিল করার দাবিতে উঠেপড়ে লেগেছে মোদী সরকার। তাদের অভিযোগ – ব্যবস্থাটি অগণতান্ত্রিক। আইনমন্ত্রী কিরেন রিজিজু আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় যশবন্ত চন্দ্রচূড় প্রায় বাগযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন প্রতিদিন। কী কাণ্ড! যে ব্যবস্থা মোদীর বিরুদ্ধে যাবতীয় রাজনৈতিক চক্রান্ত নস্যাৎ করে তাঁকে পদ্মফুলের মত নিষ্পাপ প্রমাণ করেছে, সেই ব্যবস্থাকে কিনা তাঁর সরকারই মনে করে অগণতান্ত্রিক!

এমন সময়, হাঁউ মাউ খাঁউ, গণহত্যার গন্ধ পাঁউ বলে এসে পড়ল বিবিসির তথ্যচিত্র ইন্ডিয়া: দ্য মোদী কোয়েশ্চেন। নতুন করে উঠে পড়ল চোলির পিছনে কী আছে সেই প্রশ্ন। এইবেলা পরিষ্কার করে দেওয়া যাক, উদাহরণ হিসাবে শুধুমাত্র বিপরীতকামী পুরুষদের মধ্যে চালু থাকা নারীদেহ সম্পর্কে একটি রগরগে আলোচনাকে কেন টেনে এনেছি। কারণটি খুব সোজা। ওই যে বললাম, আমরা যে যার মত করে বুঝে নিয়েছিলাম? লক্ষ করলে দেখা যাবে, গুজরাটে ঠিক কী হয়েছিল বিজেপির ভোটাররাও ঠিক একইভাবে যে যার মত করে বুঝে নিয়েছে। ওই যে বললাম, গানটি ভেসে এলেই আমাদের মধ্যে চোখ মারামারি চলত? ঠিক একই ব্যাপার বিজেপি ও তার ভোটারদের মধ্যে চলে। বিবিসির তথ্যচিত্রে যা যা দেখানো হয়েছে তার কিছুই কিন্তু নতুন নয়। নতুন খবর বলতে এটুকুই, যে ব্রিটিশ সরকার এক নিজস্ব তদন্ত চালিয়েছিল, যার সিদ্ধান্ত হল মোদী স্বয়ং দায়ী। যে সমস্ত প্রমাণ, যেসব সাক্ষীকে এই তথ্যচিত্রের দর্শকরা দেখছেন তাঁদের কথা ভারতের বহু ছোটবড় সংবাদমাধ্যমে গত দুই দশকে প্রকাশিত হয়েছে। রাকেশ শর্মার তথ্যচিত্র ফাইনাল সলিউশন দেখলে বিবিসির তথ্যচিত্রের চেয়েও বেশি ঠান্ডা স্রোত নামবে শিরদাঁড়া বেয়ে। সেই তথ্যচিত্রটি যখন ইউটিউবে প্রথম আপলোড করা হয়, তখন সরকারের হাতে তা ব্লক করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু দলে দলে লোক বারবার রিপোর্ট করে ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড’-কে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করে সাময়িকভাবে ব্লক করিয়ে দিয়েছিল।

ফলে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। উঠলেই প্রত্যেকবার বিজেপি নেতা ও সমর্থকদের থেকে দুরকম উত্তর পাওয়া যায়। এক দল বলে, সব বানানো গল্প। সুপ্রিম কোর্ট ক্লিনচিট দিয়েছে। আরেক দল বলে, যা করেছে বেশ করেছে। মুসলমানদের বেশি বাড়তে দেওয়া উচিত নয়। অমিত শাহ স্বয়ং যেমন সংবাদসংস্থা এএনআইকে বলেছিলেন, মোদীজির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত অভিযোগ করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সেই অভিযোগকারীদের ক্ষমা চাওয়া উচিত। আবার সম্প্রতি হিমাচল প্রদেশে নির্বাচনী প্রচারে বলেছেন, ২০০২ সালে মোদীজি যারা হিংসা ছড়ায় তাদের উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন। ফলে গুজরাটে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যার যা পছন্দ সে তাই বুঝে নেবে।

আমরাও ঠিক এমনই করতাম। এক দল মাধুরীর হৃদয় নিয়ে ভাবত, আরেক দল মাংসপিণ্ড নিয়ে। এমন চোলিকেন্দ্রিক পৌরুষই যে গুজরাট ২০০২-এর অভিজ্ঞান তা আর কেউ না জানলেও বিলকিস বানো বিলক্ষণ জানেন।

ভারত সরকার ইউটিউবে বিবিসির তথ্যচিত্রের যত লিঙ্ক আছে সব ব্লক করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিবিসির তথ্যচিত্রের লিঙ্ক শেয়ার করায় বেশকিছু টুইটও মুছে দিতে বলেছে। যদি বলি এই সাবালক জীবনের চেয়ে সেই নাবালক জীবন ভাল ছিল, তাহলে স্রেফ স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়ছি বলা যাবে কি? তখন ভারত রাষ্ট্র স্রেফ যৌনতাকেই অশ্লীল বলে বিবেচনা করত, ঢেকেঢুকে রেখে, গানের কথা বদলে দিয়ে বা কোনো ফিল্মের গোটা দু-চার চুম্বন দৃশ্য বাদ দিয়েই নিজের ক্ষমতা জানান দিত। তাও কেউ আদালতে দৌড়লে তবে। এখন তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করে নিজের অপছন্দের কিছু দেখলেই তাকে অসত্য বলে দেগে দিয়ে ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে দিতে পারে। ঠিক সেই কাজটিই করা হয়েছে এক্ষেত্রে। কদিন আগেই, গত মঙ্গলবার, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের ওয়েবসাইটে আপলোড হওয়া সংশোধনীর এক খসড়ায় দেখা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো যে খবরকে ভুয়ো খবর বলে ঘোষণা করবে সে খবর কোনো সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করা যাবে না। শেয়ার হলে তার দায়িত্ব বর্তাবে সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মটির উপর।

অর্থাৎ আজ বিবিসির তথ্যচিত্র মুছে দেওয়া হচ্ছে, কাল ২০০২ সালে গুজরাটে আদৌ কোনো দাঙ্গা হয়েছিল বলে পোস্ট করলেই তা মুছে দেওয়া হবে। আহসান জাফরি খুন হননি – ওটি ভুয়ো খবর। বিলকিস ধর্ষিত হননি – ওটিও ভুয়ো খবর। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো হয়ত এমনই বলবে। তা সরকার বা সরকারি সংস্থাগুলি বলতেই পারে। কিন্তু যত বলবে ততই চোলির পিছনে কী আছে সে প্রশ্ন জোরালো হবে। সরকারের এখনো চোলি কেন প্রয়োজন – সে প্রশ্নও উঠবে নির্ঘাত। কারণ গুজরাট দাঙ্গায় অভিযুক্ত, এমনকি শাস্তিপ্রাপ্তরাও তো এখন মুক্ত। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাব্যের সত্যতা প্রমাণ করে গারদ ঘনিয়ে এসেছে কেবল উমর খালিদ, শার্জিল ইমামদের মত নাবালকদের উপর – যারা গালভর্তি দাড়ি গজিয়ে যাওয়ার পরেও মানুষকে মৃত্যুর সওদাগর ভাবার সাবালকত্বে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

আরও পড়ুন অসংসদীয় শব্দ: মুখ বুজে বাঁচা অভ্যাস করতে হবে

সামান্য আশাবাদী অবশ্য হওয়া যায় একথা ভেবে, যে সরকারের এখনো খানিক লজ্জাশরম আছে বলেই চোলির প্রয়োজন পড়ছে। তবে ইন্টারনেটের যুগে চোলি যথাস্থানে রাখা লৌহকঠিন সরকারের পক্ষেও কষ্টসাধ্য। শীত বড়জোর আর এক মাস। তারপর বসন্ত সমীরণে ভোরের দিকে হাওড়ার ফেরিঘাট থেকে যদি বাগবাজার অভিমুখে নৌকাবিহারে বেরিয়ে পড়েন, তাহলে দেখতে পাবেন ভাগীরথীর পাড়ে প্রাতঃকৃত্য করতে বসেছেন অনেকে। তাঁরা বসেন নদীর দিকে পিছন ফিরে। তাতে সুবিধা হল, আপনি তাঁদের উলঙ্গ অবস্থায় দেখতে পেলেও তাঁরা আপনাকে দেখতে পান না। ফলে ভেবে নেওয়া সহজ হয় যে আপনিও তাঁদের দেখতে পাচ্ছেন না। ইন্টারনেটে একটি দেশের মধ্যে তথ্য ও তথ্যচিত্র ব্লক করা এমনই ব্যাপার। অবশ্য আত্মপ্রতারণা ছাড়া একনায়কত্ব বাঁচে কেমন করে?

পুনশ্চ: বিবিসির তথ্যচিত্রের নামে পার্ট ওয়ান কথাটি রয়েছে। কঙ্গনা রানাওয়াতের হিট ছবির সংলাপের ভাষায় “অভি তো হমে ঔর জলীল হোনা হ্যায়।”

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত