সাহসী পাঠকের জন্য সাহসী লেখকের প্রথম গল্পের বই

এ বই পড়লে আর কখনো কোনো ভাষার কোনো আখ্যানের শেষে ‘And they lived happily ever after’ বাক্যটি বা ওর সমার্থক কোনো বাক্য পড়ে পাঠক বিশ্বাস করতে পারবেন কিনা সন্দেহ।

সরকার থেকে একটা বড় যজ্ঞের আসর বসানো হয়েছে। ত্রিকালসিদ্ধ নাগা জ্যোতিষ আর একটা কানা গেরুয়া কৌপীনধারী যজ্ঞে ঘি ঢালছে। কেজি কেজি ঘি। মণ মণ বেলকাঠ। গম্ভীর মন্ত্রপাঠ। ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে চারদিক। অনুভূতি যথাযথ করার জন্যে যজ্ঞ হচ্ছে। ভয়, বিরক্তি, খুশি, রাগ, দুঃখ, লজ্জা, আশ্চর্য/অবাক সব যেন ব্যাকরণমাফিক হয়। তারপর সমস্ত কিছু আগের মতো যথাযথ হয়ে গেলে এই গল্পগুলো মিথ হয়ে যাবে। মুখফেরতা আখ্যান। আর, আখ্যানের শেষে জেগে থাকবে, ‘And they lived happily ever after.’

এই অনুচ্ছেদটি যে বইয়ের শেষ অনুচ্ছেদ, সেই বইটির নাম আয়না উধাও, লেখক প্রবুদ্ধ ঘোষ। এটি উপন্যাস নয়, ছোটগল্পের বই। তবু এই বই পড়লে মনে হয়, লেখক আসলে একটিই আখ্যান নানাভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরছেন। তার কারণ শুধু এটুকু নয় যে এক গল্পের চরিত্রকে অন্য গল্পেও পাওয়া যাচ্ছে। কেবল এটুকুও নয়, যে এক গল্পের পটভূমি ‘হরষেবিষাদ’ শহরের নাম সরকার পালটে ‘হরষবিলাসী’ করে দিচ্ছে অন্য এক গল্পে। এসবের চেয়ে বড় কথা হল, লেখক গোটা বইটি জুড়েই আমাদের জানা ঘটনাবলীকে, বিস্মৃত ঘটনাবলীকে অজানা করে তুলছেন গল্প বলার গুণে। আবার অজানাকে জানার গণ্ডির মধ্যে এনে ফেলছেন। এ কাজ করতে গিয়ে সাধারণত অপ্রিয় সত্যে প্রলেপ দেওয়া হয়, প্রবুদ্ধ করেছেন ঠিক উল্টো। তিনি কখনো পাঠকের স্মৃতির পুরুষাঙ্গে হাতুড়ি মেরেছেন, কখনো পাঠকের স্তনের বোঁটা ছিঁড়ে নিয়েছেন। এ বই পড়লে আর কখনো কোনো ভাষার কোনো আখ্যানের শেষে ‘And they lived happily ever after’ বাক্যটি বা ওর সমার্থক কোনো বাক্য পড়ে পাঠক বিশ্বাস করতে পারবেন কিনা সন্দেহ। বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে পৃষ্ঠপ্রচ্ছদ পর্যন্ত পাঠককে সুখী, মেদুর গল্পের সন্ধান দেওয়ার বদলে লেখক কেবলই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছেন। কখনো কখনো তিনি পাঠকের প্রতি এতই নির্দয় যে গল্পের পিছনের আসল ঘটনাটি সরাসরি উদ্ধৃত করেছেন সংবাদমাধ্যম থেকে। যেমন ‘জাদু-বাস্তারবাদ ও পুতনার আখ্যান’ গল্পের বন্ধনীর মধ্যে রাখা এই অংশটি

(পাঠক নিশ্চয় ভাবছেন, “এ-সব হয় নাকি সভ্য দেশে?” বা। “কেআরপি-র নামে কুৎসা রটানো” ভেবে অশ্লীলতার মামলা ঠুকতে তৈরি হচ্ছেন? প্লিজ রেগে যাবেন না। এগুলো হয়েছে। এরকমই হয়। সিএনএন-১৮ মিডিয়ার সাংবাদিক তনুশ্রী পাণ্ডে বাস্তারের আদিবাসী মহিলাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। ২০১৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বাস্তারের মহিলাদের অভিজ্ঞতা রেকর্ড করেছিলেন। প্রকাশিত হবার পরে কিছু হইচই হয়েছিল। “I was four months pregnant when I was raped. They (the security forces) did not care I was pregnant,” said a feeble voice, her face blurred by the channel. Another said, she had just delivered (eight hours before) and lactating. “They were not convinced and a cop squeezed my breasts to see if there was milk.” Another woman said “they groped me, sexually assaulted and beat me.”) সাংবাদিক তনুশ্রীর এই রেকর্ডিং এবং লেখার আগে ও পরে এমন অনেকবার হয়েছে। হরবখত হতেই থাকে। যেহেতু গল্পের মধ্যে কিছুটা বিশ্বাসযোগ্যতা রাখতে হয়, তাই তথ্যসূত্র দেওয়া। অবিশ্যি আমাদের গণতন্ত্রে এ-সব অবিশ্বাস্য বা অলীক সংলাপ। যাই হোক, সত্যি লেখা লেখকের কাজ নয়, গল্প লেখা কাজ। আসুন, আবার গল্পে ফিরি।)

লেখক পাঠককে বারবার চমকে দেওয়ার ব্যাপারে কতখানি সচেতন তা বই পড়া শেষ করে গল্পগুলির নামের দিকে তাকালেই টের পাওয়া যাচ্ছে – ১) ‘লোকটা এই পাড়াতেই কোথাও থাকে’, ২) ‘আশু কেন গোয়েন্দা হতে পারছে না’, ৩) ‘আলোমানুষ ও আগুনের লোককথা’, ৪) ‘একঘণ্টার ভাবনায় প্রতিমা যেভাবে বাঁচতে চাইছিল’, ৫) ‘উধাও-আয়না আর আকাশপ্রদীপের লোককথা’, ৬) ‘একটা ভীষণ সুখী সময় আর কয়েকটা থেমে যাওয়া ট্রামের গল্প’, ৭) ‘ক্যাপ্টেন আজ নিশ্চিন্তে ঘুমোবে’, ৮) ‘জাদু-বাস্তারবাদ ও পুতনার আখ্যান’, ৯) ‘একজন ও এবং ওদের আখ্যান’, ১০) ‘আনন্দ ময়দান ছেড়ে পালায়নি’, ১১) ‘সরকার সব ঠিক ক’রে দেবে’।

প্রথম দুটি নামে অনিশ্চয়তা স্পষ্ট, এবং গল্পদুটিও, পাঠক যত এগোবেন, তত তাঁকে এমন এক জগতের সন্ধান দেবে যেখানে লোকটা এবং আশু কিছুতেই থিতু হতে পারছে না। পাঠকও সেই অনিশ্চয়তার, অস্বস্তির ফাঁসে ছটফট করবেন, পালাতে পারবেন না। আলো আর আগুন পাশাপাশি দেখে যে আশঙ্কা মনে উঁকি দেয়, তৃতীয় গল্পে সেই আশঙ্কাই ক্রমশ বিরাট আকার ধারণ করেছে। বিরাট করে তুলতে লোককথার প্রকরণের সার্থক ব্যবহার করেছেন লেখক। চতুর্থ গল্পের নামে বলেই দেওয়া হয়েছে যে এ মাত্র একটি ঘন্টার ভাবনা। কিন্তু এক ঘন্টার মধ্যে একজন মানুষের আস্ত জীবনভাবনা যখন সেঁধিয়ে যায় তখন তো চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে যেতে হয়। তারপর ভাবুন, আয়নাবিহীন বাড়ির কথা ভাবলেই অস্বস্তি হয় না? অসম্ভব মনে হয় না? প্রায় প্রত্যেক গল্পেই কলমের খোঁচায় বাস্তবের নাড়ি ভুঁড়ি বার করে এনেছেন লেখক, পঞ্চম গল্পে তা তুঙ্গে উঠেছে। ষষ্ঠ গল্পের নামে পাঠকের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, গল্প চলে ঠিক উল্টো পথে। ফলে পাঠককে ফের চমকে উঠতে হয়। ক্রমশ পরিষ্কার হয় যে গল্পের নামে ‘সুখী’ শব্দটি নয়, ‘ভীষণ’ শব্দটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তম গল্পেও শিরোনামের প্রত্যাশার ঠিক উল্টো মেরুতে পাঠককে নিয়ে যান লেখক। অষ্টম গল্পটি, এই আলোচকের মতে, এই বইয়ের সবচেয়ে সচকিত করার মত এবং সেরা গল্প। নামটি একইসঙ্গে মার্কেজ এবং মহাভারত মনে পড়িয়ে দেয়। গল্প সে উচ্চতায় না পৌঁছলে পরিতাপের বিষয় হত। কিন্তু লেখক নিপুণভাবে বিস্তৃত ক্যানভাসে অত্যাচারের আখ্যান লিখতে পেরেছেন। সে আখ্যান সত্যিই বাস্তবের ঊর্ধ্বে এবং পুতনার মত দৈত্যাকৃতি। নবম গল্পটির নাম প্রথম দুটি গল্পের মত কেবল অনিশ্চয়তা নয়, অকিঞ্চিৎকরতারও আভাস দেয়। আমরা সকলেই নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের পরিবার পরিজন ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং অতিমারীর সময়ে অকিঞ্চিৎকর মানুষের যে আখ্যান রচনা করেছেন লেখক, তা পাঠককে নড়বড়ে করে দেবে। দশম গল্পে আনন্দের ময়দান ছেড়ে না পালানোর পরিণতিও পাঠককে সুখী করবে না। আর শেষ গল্পের নাম? এই লেখার প্রথম অনুচ্ছেদ আবার পড়ুন। সরকার কীভাবে সব ঠিক করে দেয় তার আঁচ পাবেন।

এখন কথা হল, গাঁটের কড়ি খরচ করে এমন ঘেঁটি ধরে নেড়ে দেওয়া বই পড়বেন কেন? প্রথমত, লেখক মনে করেছেন ভোরের বেলার তারার কাছে তাঁর কিছু কথা আছে। তাই তিনি লিখেছেন, পড়া না পড়া পাঠকের ব্যাপার। এটি প্রথম গল্পের বই হলেও প্রবুদ্ধ স্পষ্টতই পাঠকের মন জোগানোর কথা ভেবে লেখেননি। সে কারণেই গল্পগুলি ব্যতিক্রমী। যদি কোনো পাঠক নিজের পাঠাভ্যাসের বাইরে যেতে না চান, অজ্ঞাত অনুভূতির সন্ধান যদি তাঁর সাহিত্য পড়ার কারণ না হয়, তাহলে এ বই না পড়াই ভাল। যে পাঠক ঝুঁকি নিতে ভালবাসেন – এ বই তাঁর জন্য। এখানে প্রেম আছে, কিন্তু পরিচিত চেহারায় নেই। যৌনতা আছে, হিংসা আছে প্রবলভাবে, গায়ের লোম খাড়া করে দেওয়ার মত রোমাঞ্চ আছে। কিন্তু রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের মত করে নয়। বরং গোয়েন্দাপ্রেমী পাঠককে গোটা বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্য সম্পর্কেই ভাবিয়ে তোলার মত গল্প ‘আশু কেন গোয়েন্দা হতে পারছে না’। যে পাঠক বিশ্বাস করেন সাহিত্য মানে তাতে দুটি জিনিস থাকতেই হবে – ভাষাশিল্প আর কল্পনাশক্তি, এ বই তাঁরও মনের খোরাক হবে। আলোচককে বিশ্বাস করা নিষ্প্রয়োজন। নিজেই পড়ে দেখুন ‘একঘণ্টার ভাবনায় প্রতিমা যেভাবে বাঁচতে চাইছিল’ গল্পের প্রথম অনুচ্ছেদের এই অংশ

বাপির কাটা মাথা ভেসে ওঠে। ‘সিলি হাওয়া ছুঁ গয়ি, সিলা বদন ছিল্ গয়া’ গানটা ভেসে আসছে। বাবুদা রেডিয়ো শোনে এখনও। ক্ষয়া ক্ষয়া রেডিয়োর গায়ে আশি দশক থেকে ধুলো জমেছে। সুরেলা আওয়াজও তাই ধুলোমাখা ধূসর হয়ে আসে। ভাঙা ভাঙা। এ-সব সারাবে না কেউ আর। ‘বেচে দাও বাবুদা, ভালো ফোন কেনো একটা’ – এই অনুরোধের আসরে পাত্তা না দিয়েই বাবুদা চা পাতা ফোটায়। বাবুদার দোকানে উঠে যাওয়া গেঞ্জিকলের সুতো লেগে থাকে। ভেঙে যাওয়া ভেপার ল্যাম্পের ফিকে আলো ছড়িয়ে থাকে। বাবুদার দোকানে এখনও তৃণমূল বা বিজেপির পতাকা লাগানোর ধক দেখায়নি কেউ। অথচ পাঁচটা দশের চা খেতে খেতে শ্যামল, বলাই, অমররা বাবুদার দোকানের পতাকা পালটে দেওয়ার আলোচনা করছে অনেক বছর ধরেই। প্রত্যেক পাড়াতেই একটা-দু’টো এমন দোকান থেকে যায়। রেডিয়োর নব ঘোরে, পছন্দের স্টেশন। সন্ধের মুখে সিলি হাওয়া ছুঁয়ে যায়। শরীরে আনচান করে ফ্রিকোয়েন্সি মিলে গেলে। প্রতিমা বাপির মাথাটা দুলতে দেখে। সারা শরীরে কোথাও কোনো আঘাতের দাগ নেই। ক্ষত নেই। শ্মশানে যখন বাপির বডিটা বাঁশের চ্যাঁচাড়িতে শোয়ানো হল, টুপ ক’রে মাথাটা আলাদা হয়ে গেল।

বিশ শতকে একটা সময়ে অনেক গল্পকার বলতেন, পৃথিবীতে বলার মত গল্প শেষ হয়ে গেছে। সুতরাং প্লটের আর গুরুত্ব নেই, এখন গল্পকারের কাজ হল কতরকমভাবে গল্প বলা যায় তা দেখানো। দেখতে দেখতে এই তত্ত্বের বয়সও কম হল না। কিন্তু আজকাল যাঁরা এই তত্ত্বে বিশ্বাস করে গল্প লেখেন, প্রায়শই দেখা যায় তাঁরা গল্প লেখার অছিলায় প্রবন্ধ লিখছেন। তাঁরা মনে করেন, যা বলছেন তা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে প্লট তৈরি করার দরকার নেই। প্রবুদ্ধ যথেষ্ট গম্ভীর বিষয় নিয়ে গল্প লিখেছেন, ভাষার উপর তাঁর যথেষ্ট দখল। তবুও তিনি অভিনব গল্প বলেছেন, প্লট নির্মাণে যত্ন নিয়েছেন। কোনো গল্পে একটি শহরের সমস্ত আয়না উধাও হয়ে যাচ্ছে, কোনো গল্পে একজন গোয়েন্দা হতে চেষ্টা করছে। কিন্তু তদন্ত শেষ করার আগেই তাকে নিরস্ত করছে একের পর এক মক্কেল। কেন? তা জানতে গেলে গল্পটি পড়তে হবে। প্রবুদ্ধ একটি গল্পে অনায়াসে ঘটনাকে কল্পনার জোরে বীভৎস রসে সিক্ত করে লোককথার সঙ্গে মিলিয়ে দিচ্ছেন, তো আরেকটি গল্পে একেবারে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণের কথোপকথন থেকে নিঃসৃত হচ্ছে তাঁর আখ্যান।

আরও পড়ুন অবসাদের গল্প: বিপন্ন বিস্ময়ের গল্পকার গৌতম

এর জন্য প্রবুদ্ধর প্রশংসা প্রাপ্য। কিন্তু তাঁর কলমের জোর যেখান থেকে আসছে, হয়ত সেখানেই তাঁর দুর্বলতাও। প্রবুদ্ধর গল্পের রাজনীতির কথা বলছি। প্রবুদ্ধ ঠিক করে নিয়েছেন তিনি কাদের গল্প বলবেন, কাদের পক্ষে দাঁড়াবেন। এই স্থিরতা না থাকলে তাঁর গল্প এত তীক্ষ্ণ হত না। কিন্তু এর ফলে কোনো কোনো গল্পে বহু চরিত্র ভিড় করছে, কিন্তু কোনো চরিত্রই জ্যান্ত হয়ে উঠছে না। তাদের উপর ঘটে যাওয়া নির্যাতন যত স্পষ্ট, মানুষগুলিকে কি তত স্পষ্ট দেখাচ্ছে? লেখক ভেবে দেখতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, বেশকিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে গল্প অতিকথনের শিকার বলে মনে হয়। এই সমস্যা সবচেয়ে প্রকট ‘আশু কেন গোয়েন্দা হতে পারছে না’ গল্পে। চমৎকার প্লট, চমৎকার বক্তব্য এবং তার যথোপযুক্ত ভাষা এই গল্পের। কিন্তু মনে হয় লেখক কিছুতেই নিশ্চিত হতে পারছিলেন না যে তাঁর বক্তব্য পাঠক বুঝে উঠতে পারবেন কিনা। তাই একের পর এক ঘটনা যোগ করে গেছেন, যা গল্পটির দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করা ছাড়া কিছু করতে পারেনি। কিংবা ধরা যাক, ‘একজন ও এবং ওদের আখ্যান’ গল্পের এই কটি লাইন

‘ও’-র কোনো নাম নেই। থেকেই বা কী হবে? আধার আছে, নম্বর। খিদে আছে। ওদের দিকে তাচ্ছিল্যের বিস্কুট, ব্লিচিং আর রুটি ছুঁড়ে দেওয়া আছে। আমাদের পবিত্রস্তোত্র বা পুরাণকথনের থেকে বহুদূরে ও।

গল্পটি আসলে আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। শেষাংশে গল্পের ব্যাখ্যা দেওয়া এই অংশের প্রয়োজন ছিল না। মনোযোগী পাঠক নির্ঘাত বুঝতে পারবেন ‘ও’ কেন একটি নামহীন চরিত্র। পাঠককে অস্বীকার করে গল্প লেখার যে সাহস এ বইতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রবুদ্ধ দেখিয়েছেন, এখানে এসে সেই সাহস তিনি ত্যাগ করেছেন। এত প্রতিভাবান লেখকের এই দোলাচল কিঞ্চিৎ হতাশ করে। তবে ভরসার কথা, প্রবুদ্ধ অত্যন্ত তরুণ লেখক এবং এই তাঁর প্রথম গল্পের বই। ফলে সামলে নেওয়ার সময় এবং সুযোগ তাঁর আছে। আর যে জিনিসটি রসভঙ্গ করেছে দু-একটি গল্পে, সেটি হল স্লোগান অর্থে ‘নাড়া’ শব্দটি। বুঝতে অসুবিধা হয় না, লেখক যে অঞ্চলের গল্পে শব্দটি ব্যবহার করেছেন সে অঞ্চলের কথ্য হিন্দির কথা মাথায় রেখে ওই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে ‘নারা’ লেখাই সমীচীন। কারণ হিন্দিতে ‘নাড়া’ বলা হয় পায়জামার দড়িকে বা গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে হাতে যে জিনিসটি বাঁধা হয় তাকে।

তবে এই বই লেখক প্রবুদ্ধ সম্পর্কে প্রত্যাশার পারদ চড়িয়ে দিল। অদ্বয় চৌধুরীর প্রচ্ছদও প্রশংসার দাবি রাখে। কারণ তা ছিমছাম অথচ ব্যতিক্রমী।

আয়না উধাও
লেখক: প্রবুদ্ধ ঘোষ
প্রকাশক: বৈভাষিক
প্রচ্ছদ: অদ্বয় চৌধুরী
দাম: ৩০০ টাকা

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত