‘তোমরা কার পক্ষে?’
‘হস্তিনাপুরের পক্ষে।’
দুর্যোধন খুশি হন না, সশস্ত্র বাহিনী প্রজাদের পিছনে এসে দাঁড়ায়।
‘তোমরা কার পক্ষে?’
‘কৌরবদের পক্ষে।’
দুর্যোধন তাতেও খুশি হন না, প্রজাদের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলে আরও বেশি সৈনিক।
‘তোমরা কার পক্ষে?’
‘দুর্যোধনের পক্ষে।’
এবার দুর্যোধনের মুখে হাসি ফোটে।
নটধা নাট্যদলের প্রযোজনা মহাভারত ২-এর এই দৃশ্যে দুর্যোধন আসলে কে? শাসক দলই দেশ আর দলের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিই দল – এই সূত্রটা কেমন চেনা চেনা লাগছে না? ওই দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় – India is Indira and Indira is India। এবছর জরুরি অবস্থার ৫০ বছর পূর্ণ হল। কিন্তু সে তো আজকের গতিময় দুনিয়ায় আদ্যিকালের কথা। তখন আমার জন্ম হয়নি, এই নাটকের অভিনেতাদের অধিকাংশেরও জন্ম হয়নি। তাহলে ২০২৫ সালের এক সন্ধ্যাতেও এই নাটক এত জ্যান্ত মনে হয় কেন? কারণ আজও, যা মহাভারতে নেই তা ভারতে নেই। উলটো দিক থেকে দেখলে, মহাভারতে যা যা আছে তার সবই ভারতে আছে। আজও আছে। ফলে শিব মুখোপাধ্যায়ের কলমে, অর্ণ মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় মহাভারতের উদ্যোগ পর্বের এই সৃজনান্তর কখনো প্রাচীন মনে হয় না, সেকেলে তো নয়ই।
মহাভারত মহাকাব্য, কারণ প্রত্যেক পাঠেই সেখান থেকে বেরিয়ে আসে কোনো না কোনো নতুন বয়ান। মহাভারত ২ নাটকে মহাকাব্যের পরিচিত চরিত্রগুলো থেকেও নাট্যকার বের করে এনেছেন আশ্চর্য নতুন সব পরত। যেমন শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দ্রৌপদীর সখ্য বহু আলোচিত, কিন্তু এখানে সেই সম্পর্কের অন্য এক মাত্রারও আভাস দেওয়া হয়েছে। দ্রৌপদীর প্রতি যৌন বুভুক্ষায় পাণ্ডবরা যে কৃষ্ণকেও সন্দেহ করে এবং তাদের নিজেদের মধ্যেকার সম্পর্কে ছায়া ফেলে দ্রৌপদীর প্রতি কামনা – তাও জীবন্ত হয়ে উঠেছে মঞ্চে। পাণ্ডবদের কাছে দ্রৌপদীর প্রত্যাশা, নিজের অপমানের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে তাদের যুদ্ধের দিকে চালনা করার তীব্র অভিলাষে সোহিনী সরকারকে দেখে মনে পড়ে অডিও ক্যাসেটে শোনা নাথবতী অনাথবৎ নাটকের শাঁওলী মিত্রকে। কিন্তু এখানে, বিশেষত দ্বিতীয়ার্ধে, যোগ হয়েছে অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার খিদের সঙ্গে মা হিসাবে সন্তানকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্যে গ্লানিবোধ। এই দ্বিধায় ভিতরে ভিতরে তছনছ হতে থাকা, অথচ প্রবল ব্যক্তিত্বশালী পাঞ্চালীকে জীবন্ত করে তুলেছেন সোহিনী।
আবার ছবিতে মহাভারত, রাজশেখর বসুর মহাভারত বা দূরদর্শনের মহাভারতেও যে খল মামা শকুনিকে দেখা যায়, এই নাটকের শকুনি তার থেকে ভিন্ন এক চরিত্র। এমনকি বহুবছর আগে একক নাটক শকুনির পাশা-য় বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় শকুনির খল হয়ে ওঠার কাহিনির মধ্যে দিয়ে তার যে অসহায়তা তুলে ধরেছিলেন, এই শকুনির অসহায়তা তার চেয়েও বেশি। ভাগ্নে দুর্যোধন ক্ষমতার মদে মত্ত হয়ে এই শকুনিকে বিশ্বাস করে না। শকুনিও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে তার চেহারা দেখে, কর্ণকে বোঝায় – দুর্যোধন এমন এক একাকিত্বে পৌঁছেছে যেখানে মামা বা নিকট বন্ধুও তার ব্যবহার্য বস্তু মাত্র। এই ভীত, নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা শকুনির চরিত্রে আশ্চর্য অভিনয় করেছেন ঋতম। যুগপৎ শারীরিক ও মানসিক আঘাতে পঙ্গু একটা মানুষকে দেখিয়েছেন তিনি।
বিরাট রাজকন্যা উত্তরার যে অর্জুনের প্রতি অনুরাগ ছিল – এর ইঙ্গিতটুকু আছে মহাভারতে। বলা আছে বিরাটরাজ অর্জুনকেই জামাই করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অর্জুন বলেন যেহেতু উত্তরা তাঁর শিষ্যা, তাই তিনি তাকে বিয়ে করতে পারেন না। বিয়ে হোক অভিমন্যুর সঙ্গে। এই নাটকে সেই ইঙ্গিতকে অবয়ব দেওয়া হয়েছে। প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকা থেকে পুত্রবধূ হয়ে যাওয়ার নিরুচ্চার বেদনা বেশ ফুটিয়ে তুলেছেন উপাবেলা, যদিও অর্জুনের চরিত্রে শুভম আগাগোড়াই আড়ষ্ট। উপরন্তু অভিমন্যুর চরিত্রাভিনেতা জ্যোতির্ময় আর শুভমকে প্রায় সমবয়সী মনে হয়েছে, উপাবেলার সঙ্গে জ্যোতির্ময়ের রসায়নও তেমন ঘনীভূত হয়নি।
তবে এই নাটকের অভিমন্যুর চরিত্র সবচেয়ে চমকপ্রদ। অভিমন্যুকে আমরা ক্ষণজন্মা প্রতিভাবান যোদ্ধা হিসাবে ভাবতেই অভ্যস্ত, যার যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা অথচ বয়সের কারণে চক্রব্যূহ সম্পর্কে অসম্পূর্ণ জ্ঞান তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই নাটকের অভিমন্যুর ট্র্যাজেডি কিন্তু তাকে আজকের পৃথিবীর যুবকের অনেক কাছাকাছি এনে দিয়েছে। তার সমরানুরাগে কোনো গৌরব নেই, বরং যুদ্ধ লাগলে নিজেরই আত্মীয়দের হত্যা করতে হবে ভেবে সে বিহ্বল। অনেকটা গীতার গোড়ার দিকের অর্জুনের মত। অথচ এমনভাবে তাকে বড় করা হয়েছে যে যুদ্ধ ছাড়া জীবনের কোনো সার্থকতা আছে বলেও তার জানা নেই। এই দ্বন্দ্বে সে আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে যায়। ভারতীয় সমাজে আত্মহননের চেষ্টাকে সচরাচর কাপুরুষতা বলেই ধরা হয়। অভিমন্যুকে সেই পথে টেনে নিয়ে গিয়ে নাট্যকার চরিত্রটার গা থেকে সমস্ত নায়কোচিত অলঙ্কার খুলে নিয়ে তাকে রক্তমাংসের মানুষে পরিণত করেছেন। তাই এই অভিমন্যুকে দেখে, উত্তরার সঙ্গে তার প্রেমের দৃশ্য দেখে মনে পড়ে ইংরেজ কবি উইলফ্রেড ওয়েনের কবিতায় বর্ণিত সেই তরুণদের, যাদের যুদ্ধযাত্রার বর্ণনায় কবি লেখেন এইসব পংক্তি
So secretly, like wrongs hushed-up, they went.
They were not ours:
We never heard to which front these were sent.
Nor there if they yet mock what women meant
Who gave them flowers.
Shall they return to beatings of great bells
In wild trainloads?
A few, a few, too few for drums and yells,
May creep back, silent, to still village wells
Up half-known roads.
তরুণদের মধ্যে যুদ্ধোন্মাদনা জাগিয়ে তুলে, তাদের প্রাণহানিকে বীরত্ব নাম দিয়ে সেই আগুনে হাত সেঁকার সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যেহেতু আসলে গৃহযুদ্ধ, সেহেতু এই নাটকের অভিমন্যুকে দেখে আরও মনে পড়ে তরুণ গল্পকার প্রবুদ্ধ ঘোষের ‘আনন্দ ময়দান ছেড়ে পালায়নি’ গল্পের আনন্দকে। তাকে ক্ষমতাসন্ধানী এক পণ্ডিতজি শিখিয়েছিলেন যে এতদিন আসল ইতিহাস জানতেই দেয়নি কেউ। ‘কীভাবে জবরদস্তি মেরেছে, মন্দির-মঠ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ওদের জন্যই দেশভাগ আর খুন। রামনাথ স্বামীর বইতে লেখা আছে তুর্কিরা বাংলা দখল করতে আসার অনেক আগে থেকে সুফি-টুফিরা বাংলায় এক-ধারসে ধর্ম পালটে দিচ্ছিল। গান গেয়ে সম্মোহন করত। তারপর গরু খাইয়ে দিত, সুন্নত করিয়ে দিত বাচ্চাদের তুলে এনে। আনন্দর কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে রাগে। বল্লাল সেন, লক্ষ্মণ সেন প্রজাদের বাঁচাতে কিছু বর্ণের ভাগ তৈরি ক’রে দিয়েছিল। সে তো নিজেদের ধর্ম বাঁচাতেই।’ সেই গল্পের শেষে ‘আনন্দর বুকে চাপাতির কোপ পরিচ্ছন্নভাবে নেমে আসবে। যন্ত্রণায়, রক্তের ফোঁটায় চোখ খুলতে পারবে না। আগুনের হলকা আরও বাড়বে কারণ মিছিল থেকে ছুটে যাওয়া লোক মহল্লার ঘরে আগুন দিচ্ছে। বোম আর গুলির আওয়াজে আনন্দর কান বুজে আসবে। ঠোঁট নড়বে। স্যার, ওরা আমাদের মিছিলে ইট মেরেছে। নোংরা নোংরা খিস্তি।’ কেন মরছে আনন্দ? কারণ ‘রিষড়ায় রামনবমীর মিছিলে সংঘর্ষ। দোকানে আগুন। পাথরবৃষ্টি। আহত প্রায় পনেরোজন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভরতি নুরুল আলম নামে এক ব্যক্তি। সংঘর্ষে মৃত এক যুবক। যুবকের পরিচয়…’
এবং দুর্যোধন। রাজশেখর লিখেছেন ‘দুর্যোধন মহাভারতের প্রতিনায়ক এবং পূর্ণ পাপী।’ এই নাটকের দুর্যোধন পূর্ণ পাপী ঠিকই, কিন্তু সে একাধারে এই নাটকের প্রতিনায়ক এবং নায়ক। এই চরিত্রে অর্ণ পুরাণের প্রতিনায়কের মধ্যে থেকে তুলে এনেছেন একজন সুচতুর একনায়ককে, যে সন্ত্রাস কায়েম করে জনমত নিয়ে আসতে পারে নিজের দিকে, তারপর চরম শঠতায় স্বয়ং কৃষ্ণকেও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়ে নিজমুখে বলে যে সে যুদ্ধ চায় না। তারপর আতঙ্কিত জনতার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেয় ‘বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’। আত্মম্ভরিতার উত্তুঙ্গ শিখর অর্ণ দেখিয়ে দিয়েছেন তাঁর অভিনয়ে। তিনি কখনো সচেতনে, কখনো অবচেতনেই নিজেকে বলেন সুযোধন। অভিনয়ে অন্যমনস্কতা তুলে ধরার আশ্চর্য ক্ষমতা দেখিয়েছেন অর্ণ। খোঁড়া মামা শকুনি, বাবা অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকেও তিনি শারীরিক পীড়ন করতে ছাড়েন না। অর্ণর অভিনয় তুঙ্গে ওঠে ধৃতরাষ্ট্রের (কৌশিক চট্টোপাধ্যায়) সঙ্গে একান্ত মুহূর্তগুলোতে এবং কৃষ্ণের (অর্পণ ঘোষাল) সঙ্গে নাচের দ্বন্দ্বযুদ্ধে। নাটকের একেবারে শেষদিকে, যুদ্ধে যাওয়ার আগে মা গান্ধারীর (সাধনা মুখোপাধ্যায়) কাছে বিদায় নেওয়ার দৃশ্যে একেবারে অন্য এক দুর্যোধন বেরিয়ে আসে। মঞ্চের উপর গর্ভস্থ শিশুর মত কুঁকড়ে শুয়ে পড়েন অর্ণ, তারপর মাকে বলে যান – দুর্যোধনের মনে কেবল অন্ধকার, কারণ বাবা জন্মান্ধ আর মা স্বেচ্ছান্ধ। তাই তাকে আলো দেখানোর কেউ ছিল না। নাটকের সবচেয়ে বড় খল চরিত্রের যাবতীয় পাপ সত্ত্বেও ওই দৃশ্যে কঠিন হয়ে পড়ে দুর্যোধনের জন্যে চোখ ভিজে আসা আটকানো।
স্নেহান্ধ ধৃতরাষ্ট্রের ক্ষমতা ও অক্ষমতা মাত্র কয়েকটা সুযোগে জীবন্ত করে তোলেন কৌশিক। অর্ণর সঙ্গে তাঁর মুহূর্তগুলো বহুদিন মনে থাকার মত। একান্ত অনুচরকে যখন তিনি বলেন যে তাঁকে খাদের সামনে দাঁড় করালেও তিনি তাকেই বিশ্বাস করবেন, কারণ অন্ধ লোকের বিশ্বাস করা ছাড়া কোনো উপায় নেই – তখন তৈরি হয় এমন মুহূর্ত, যখন পরম সত্যকে ছুঁয়ে ফেলতে পারেন একজন অভিনেতা। ফলে সন্দেহ হয় – ধৃতরাষ্ট্র আসলে কে? দৃষ্টিহীন রাজা, বখে যাওয়া ছেলের স্নেহান্ধ বাবা, নাকি কোনো দেশের একনায়কের প্রোপাগান্ডায় নিজের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলা নাগরিক? ধৃতরাষ্ট্র কি এমন এক বিকল্পহীন রাজনৈতিক অবস্থার শিকার, যেখানে লম্পট ছেলে দুঃশাসনকেও তাঁর সময়ে সময়ে দুর্যোধনের চেয়ে ভাল বলে মনে হয়?
দুঃশাসনের চরিত্রে যে লাম্পট্য ছাড়াও অনেককিছু আছে, তা সামান্য সুযোগেই দেখিয়ে দিয়েছেন সৌরভ। ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর একার কয়েকটা মাত্র মুহূর্ত দুঃশাসন চরিত্রের একমাত্রিকতা ঘুচিয়ে দিয়েছে।
আরও পড়ুন জনপ্রিয় বাংলা ছবির সযত্ন সন্ধানে তালমার রোমিও জুলিয়েট
কৃষ্ণের চরিত্রে অর্পণ মুরলীধর হিসাবে পাণ্ডব এবং দ্রৌপদীর সঙ্গে সাবলীল। কিন্তু কূটনীতিবিদ হিসাবে কর্ণ (অনুজয় চট্টোপাধ্যায়), শকুনি বা ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে দৃশ্যগুলোতে তাঁকে যতখানি ভারি দেখানো উচিত ছিল, তা দেখায় না। অন্যদিকে এই সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অভিনেতা অনুজয়ের বিশেষ কিছু করার নেই এই নাটকে।
তবে মানানসই আবহসঙ্গীত এবং এত নিপুণ অভিনয় সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত এই প্রযোজনার সেরার শিরোপা বোধহয় নাট্যকারকেই দিতে হবে। তাঁর নির্মিত চরিত্রগুলো বেদব্যাসের মহাকাব্যের মতই বহুবর্ণ, উপরন্তু সমসাময়িক। স্ত্রী ভানুমতীর (স্বাগতা) সঙ্গে একমাত্র একান্ত দৃশ্যে দুর্যোধনের মুখে শোনা যায়, সকলের ভয়ের পাত্র হওয়ার মধ্যে এক ধরনের মাদকতা আছে। একনায়কদের মনস্তত্ত্বের গভীর থেকে তুলে আনা এই সংলাপ শাশ্বত সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।
নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত
