মানিকবাবুর মেঘ: অনন্য রোম্যান্টিক ছবি

‘বাংলায় শিল্প নেই, শিক্ষা নেই, চাকরি নেই, আইনশৃঙ্খলা নেই’-এর মত ‘ভাল সিনেমা নেই’ কথাটাও বহু আলোচিত। মানিকবাবুর মেঘ দেখার পর সন্দেহ হতে বাধ্য – সত্যিই কি আমাদের ভাল সিনেমা নেই, নাকি ভাল সিনেমার দর্শক নেই?

‘আমার ইচ্ছে করে শূন্যে উঠে মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটি’ – বাংলা ছবির গানে এই লাইন লেখা হয়েছিল ৫০ বছরেরও কম সময় আগে। সেই ছবি দর্শক হল ভরিয়ে দেখেছিল, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার রচিত এই গান এবং তার গায়ক মান্না দে-কে মাথায় করে রেখেছিল। বাংলা সিনেমার সেই জমজমাট আসর মাটি হয়ে গেছে। কোন শশীকান্ত কবে কীভাবে মাটি করল তা নিয়ে ইদানীং কিছু কথাবার্তা হয়, নিঃসন্দেহে আরও হওয়া দরকার। তবে শিল্পসুষমার স্বাদ নেওয়ার অধিকার সব দেশে, সব কালেই দর্শককে অর্জন করতে হয়। সে অধিকার না থাকলে শিল্পের সমস্ত আয়োজন ‘অরসিকেষু রস নিবেদনম্’ হয়ে দাঁড়ায়। ‘বাংলায় শিল্প নেই, শিক্ষা নেই, চাকরি নেই, আইনশৃঙ্খলা নেই’-এর মত ‘ভাল সিনেমা নেই’ কথাটাও বহু আলোচিত। মানিকবাবুর মেঘ দেখার পর সন্দেহ হতে বাধ্য – সত্যিই কি আমাদের ভাল সিনেমা নেই, নাকি ভাল সিনেমার দর্শক নেই? গত এক যুগেই পশ্চিমবঙ্গে অন্তত গোটা আষ্টেক বেশি ছবি হয়েছে যেগুলো রহস্য রোমাঞ্চ, সম্পর্কের টানাপোড়েন বা প্রেম-ঢিসুম ঢিসুম-মধুরেণ সমাপয়েৎ ফর্মুলার বাইরে গিয়ে রসোত্তীর্ণ শিল্প হতে চেষ্টা করেছে। ভূতের ভবিষ্যৎ (২০১২), বল্লভপুরের রূপকথা (২০২২)-র মত দু-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে সেই প্রয়াসগুলো কিন্তু দর্শকের দাক্ষিণ্য পায়নি। বাকিটা ব্যক্তিগত (২০১৩) বা আসা যাওয়ার মাঝে (২০১৪) তত দর্শক পায়নি, যত দর্শক পেয়েছে যেমন তেমনভাবে নির্মিত ব্যোমকেশের ছবিগুলো। পুনরাবৃত্তিমূলক ফেলুদা বা কাকাবাবুর গল্প নিয়ে নির্মিত ছবিগুলোর অর্ধেক দর্শকও মায়ার  জঞ্জাল (২০২০) ঝিল্লি (২০২১), ভটভটি (২০২২), নীহারিকা (২০২৩) ভূতপরী (২০২৪) বা অথৈ (২০২৪) দেখেননি। সম্ভবত সেই কারণেই ২০২১ সাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন ফিল্মোৎসবে পুরস্কৃত মানিকবাবুর মেঘকে পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ দর্শকের জন্য মুক্তি পেতে অপেক্ষা করতে হল ২০২৪ সাল পর্যন্ত। অনির্বাণ ভট্টাচার্যের মত বিখ্যাত শিল্পী এ ছবির নিবেদক না হলে এবং ছবির একখানা গান না গাইলে হয়ত এরপরেও ছবিটা নিয়ে বিশেষ আলোচনা হত না।

মেঘের কথা হচ্ছিল। বাংলা সিনেমার মেঘের উপর দিয়ে হাঁটার ইচ্ছাশক্তি খর্ব হতে হতে কী করে গেটেড কমিউনিটির কোনো একটা টাওয়ারের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের ঘরে নেমে এল – তার ইতিহাস হয়ত কোনোদিন লেখা হবে। এই ছবির পরিচালক অভিনন্দন ব্যানার্জি কিন্তু আমাদের সেই আর্থসামাজিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। কথাসর্বস্ব বাংলা ছবির যুগে তিনি এমন এক ছবি বানিয়েছেন যেখানে ক্যামেরার প্রত্যেকটা ফ্রেম কথা বলে, চরিত্রগুলো কথা বলে যতটুকু দরকার ততটুকুই। তেমনই এক মুখর ফ্রেমে পরিচালক ধরেছেন এক রিয়েল এস্টেট কোম্পানির হোর্ডিং। সেই বিজ্ঞাপন সম্ভাব্য ক্রেতাকে লোভ দেখাচ্ছে – আসুন, মেঘেদের সঙ্গে বাস করুন। অথচ তখন ক্রয়ক্ষমতাহীন মানিকবাবু – এ ছবির প্রধান চরিত্র – একখানা ছাদওয়ালা বাড়ি খুঁজছেন তাঁর গাছগুলোর জন্যে। বন্ধুর কাছে মুখঝামটা শুনছেন – নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় না, বৃক্ষরোপণের শখ!

ক্রমশ গরম বেড়ে চলা, বৃষ্টিবিরল কলকাতা শহরের এক নিঃসঙ্গ বাসিন্দার এই সাদাকালো বাস্তবতা পর্দায় তুলে আনা, একইসঙ্গে রোম্যান্টিক থাকার সাহসের জন্য পরিচালককে অভিনন্দন না জানিয়ে উপায় নেই। না, মানিকবাবু মানে এখানে সত্যজিৎ রায় নন। এ ছবি সত্যজিতের জীবনের কোনো সফল বা বিফল মুহূর্ত নিয়ে নয়, তাঁর কোনো কাজের অনুপ্রেরণাও এখানে চোখে পড়ে না। বরং অতি সামান্য চাকরি করার পাশাপাশি ছোটদের আবৃত্তির টিউশনি করা এই মানিকবাবু শেখান সুকুমার রায়ের ‘মেঘ মুলুকে ঝাপসা রাতে,/রামধনুকের আবছায়াতে,/তাল বেতালে খেয়াল সুরে,/তান ধরেছি কণ্ঠ পুরে।/হেথায় নিষেধ নাইরে দাদা,/নাইরে বাঁধন নাইরে বাধা।/হেথায় রঙিন আকাশতলে/স্বপন দোলা হাওয়ায় দোলে,/সুরের নেশায় ঝরনা ছোটে,/আকাশ কুসুম আপনি ফোটে, রঙিয়ে আকাশ, রঙিয়ে মন/চমক জাগে ক্ষণে ক্ষণ!’ দূষিত বাতাসে ঢেকে যাওয়া কংক্রিটের জঙ্গল একবিংশ শতকের কলকাতা শহরে সুকুমারের এই রোম্যান্স যিনি ছুঁতে পারেন তিনি ছাড়া আর কে-ই বা মরা গাছেও রোজ জল দেবে, বাবার মৃত্যুর দিনেও রুটি কিনে আনবে রাস্তার কুকুরের জন্যে, অদেখা প্রেমিকার সঙ্গে ভাগ করে খাবে ডালভাত আর ঢ্যাঁড়শ ভাজা? হ্যাঁ, এটা প্রেমের ছবি। আর সব ব্যাপারে অত্যন্ত সাধারণ মানিকবাবু, দালালকে কোনো লেখাপড়া ছাড়াই টাকা দিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার মত বোকা মানিকবাবু, একজন দুরারোগ্য রোম্যান্টিক। আজকের কলকাতার পক্ষে বেমানান রোম্যান্টিক, যেমন বেমানান ছিলেন সে যুগের ইউরোপে সেরভান্তেসের ‘রোম্যান্টিক’ নায়ক দন কিহোতে। এ ছবির সমাপ্তি যেভাবে ঘটিয়েছেন অভিনন্দন, তা একেবারেই সুকুমারীয় – যে সুকুমারকে শিশুসাহিত্যের আড়ালখানা ভেদ করে আমরা দেখতে পাই না।

ছবির যে কথা বলতে সংলাপ লাগে না তা যেমন আমরা ক্রমশ ভুলে যাচ্ছি, তেমনি সংলাপ না থাকলেও শব্দ যে কথা বলতে পারে তাও ভুলে যাচ্ছি। কারণ শব্দগুলোকে আলাদা করার মত নৈঃশব্দ্য ক্রমশই বিরল হচ্ছে আমাদের চারপাশে। প্রথমবার ফিল্মে কাজ করা অনুপ সিংয়ের নয়নাভিরাম ক্যামেরার সঙ্গে মুপ্পালা কিরণ কুমার, টেনি আর শুভজিৎ মুখার্জি যে শব্দ-নৈঃশব্দ্য-আবহসঙ্গীতের নকশা বুনেছেন, তা অতি পরিচিত দৃশ্য থেকে চমকে ওঠার মত ছবি উদ্ধার করে এনেছে বারবার। নইলে রাস্তার আলোর মাধ্যমে কথোপকথন সম্ভব হত না। কেবল কণ্ঠস্বর দিয়ে একটা চরিত্র হয়ে উঠতেও পারতেন না মানিকবাবুর বাড়িওয়ালি। একেবারে শয্যাশায়ী বাবাও সন্তানের জীবনে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর প্রস্থানে কী বিরাট শূন্যতা তৈরি হয় তাও কেবল শব্দ আর সঙ্গীতের গুণে দেখিয়ে দেওয়া গেছে কোনো সংলাপ ছাড়াই। বোঝা গেল না? স্বাভাবিক। কারণ এই ছবি অনির্বচনীয় দৃশ্যে ভরপুর, অনির্বচনীয় কল্পনায় ঋদ্ধ। না দেখলে বোঝা যাবে না, বেশি বোঝানোর চেষ্টা করাও বাচালতা।

এই বাচালতা জিনিসটা এ ছবির একেবারেই নেই। একা মানুষের শোক বা তার অবদমিত কাম – কোনোটা বোঝাতেই অভিনন্দনকে বচন ব্যবহার করতে হয় না। জীবনানন্দ দাশের ভাষায় ‘বাজারের পোকাকাটা জিনিসের কেনাকাটা’ করা মানুষ মানিকবাবুর চরিত্রে চন্দন সেন এই অনির্বচনীয়তা সারা শরীরে ধারণ করায় দারুণ সফল। ছবির প্রথমার্ধের বিমর্ষ চন্দন আর দ্বিতীয়ার্ধের খুশিয়াল চন্দন কীভাবে একই ব্যক্তি থেকেও দুজন আলাদা মানুষ হয়ে যান – দেখে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। মুখে যে প্রেমিক হাসি তিনি ফুটিয়েছেন, তা কেবল মনোমুগ্ধকর নয়, রোমাঞ্চকরও। যোগ্য সঙ্গত করেছেন দেবেশ রায়চৌধুরী, নিমাই ঘোষ, অরুণ গুহঠাকুরতা এবং ব্রাত্য বসু।

আরও পড়ুন হারানের নাতজামাই: স্মৃতিমেদুরতার নাটক

চন্দন যে মসৃণভাবে সিনেমার পর্দার মাঝবয়সী রোম্যান্টিক নায়ক হয়ে উঠতে পারেন, তা কি দশকের পর দশক তাঁর অভিনয়ের গুণগ্রাহী দর্শকরাও কেউ কল্পনা করেছিলেন? অভিনন্দন কিন্তু করেছেন। কল্পনাশক্তিতে, এবং সেই কারণে চিত্রনাট্যে, তিনি একশোয় একশো। অভিনন্দন কলকাতার রাজপথ, গলিপথ, ফুটপাথ, দেওয়ালগুলোকে তো বটেই; ধাপার মাঠ আর ময়দানকেও এ ছবির চরিত্র করে তুলেছেন চিত্রনাট্যের গুণে। তবে সেখানেই তাঁর নৈপুণ্য শেষ নয়। আজকের বাংলা ছবির দর্শক হিসাবে দুরুদুরু বুকে না বলে উপায় নেই যে এই পরিচালকের হাতে একখানা জাদুদণ্ড আছে বলে মনে হয়। তার ছোঁয়ায় সেকেলে বাক্স টিভির ফ্রেমের ভিতর টবে ফুল ধরে; চিত্রনাট্যের তালে তাল দেয় দেয়ালের টিকটিকি, মাকড়সা; আঁকা ছবি হয়েও রোম্যান্সে পর্দা মুড়ে দেন উত্তমকুমার আর সুচিত্রা সেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে তাঁদের জ্যান্ত করে তুলতে হয় না। এমন জাদু বাংলা ছবিতে আমাদের বয়সের দর্শকরা অন্তত দেখেনি। প্রবীণরা বলতে পারবেন আদৌ কোনোদিন দেখা গেছে কিনা। তবে একটাই অনুযোগ – এত যত্নে নির্মিত ছবির শেষে নাম দেখানোর সময়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘দ্বীজেন্দ্রলাল’ হয়ে যাওয়া অনভিপ্রেত।

দুরুদুরু বুকে কেন বললাম? প্রথমত, প্রথম ছবিটাই এমন বানান যে তরুণ পরিচালক তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে যুগপৎ আশা আর আশঙ্কা হয়। আমাদের মা-মাসিরা এসব ক্ষেত্রে পরিচালকের কড়ে আঙুল দাঁতে কেটে মাথায় তিনবার থুতু দিতেন। দ্বিতীয়ত, দর্শক যদি এই ছবিকে মা-মাসিদের মত করে আশীর্বাদ না করেন তাহলে অভিনন্দনকেও হয়ত পরের ছবিটা ফর্মুলায় ফেলেই বানাতে হবে। অন্য কোনো পরিচালকও হয়ত এমন কিছু করার সাহস করবেন না, কারণ এই ছবির প্রযোজক হয়ে যে ঝুঁকি বৌদ্ধায়ন মুখার্জি আর মোনালিসা মুখার্জি নিয়েছেন, সে ঝুঁকি আর কোনো প্রযোজক নেবেন না। বাংলা ছবির কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না, আমরা কেবল সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের জাবর কেটে যাব।

অনেকে বলছেন, মানিকবাবুর মেঘ আন্তর্জাতিক মানের ছবি। সেসব বোদ্ধারা জানেন। কিন্তু নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলা ছবির সাধারণ দর্শকের জন্য এ ছবি এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এই উচ্চতার রোম্যান্টিক ছবি আমরা বহুকাল দেখিনি। বারবার রোম্যান্টিক ছবি বলছি, প্রেমের ছবি বলছি। তাহলে ছবির নায়িকাকে নিয়ে কিছু বলছি না কেন? তাঁর কথা উহ্যই থাক, কারণ তিনি অনির্বচনীয়। নিজে চোখে দেখে আসুন।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

হারানের নাতজামাই: স্মৃতিমেদুরতার নাটক

শিউরে ওঠার অনুভূতি কিন্তু হারানের নাতজামাই নাটকের শেষে হল না। যদিও শেষে মঞ্চে নির্মিত হল মাণিক লিখিত পুলিসকে ঘিরে ধরার দৃশ্য, যা দেখে মন্মথর মনে হয় “মণ্ডলের জন্য হলে মানে বোঝা যেত, হারাণের বাড়ীর লোকের জন্য চারদিকের গাঁ ভেঙে মানুষ এসেছে!”

ব্যর্থ বিপ্লব আর বিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির উত্তরাধিকার বলতে যা যা পড়ে থাকে তার মধ্যে প্রধান কি মধ্যবিত্ত স্মৃতিমেদুরতা? প্রশ্নটা আমার মত মাঝবয়সীর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ না দেখেছি তেলেঙ্গানার গণসংগ্রামের পার্টিকে, না দেখেছি ১৯৬৪ সালে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার আগের পার্টিকে। কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর দ্বারা সংগঠিত তেভাগা আন্দোলনের মত কোনো বিদ্রোহ আমার জীবনে দেখার অভিজ্ঞতা হয়নি। নকশাল আন্দোলনের মত কোনো বিপ্লব প্রচেষ্টাও দেখিনি। সবটাই আমার কাছে হয় ইতিহাস, নয় গল্পকথা। তেভাগা আন্দোলন বলতে ছোট থেকে শুনে আসা সলিল চৌধুরীর ‘ঘুমভাঙার গান’ ক্যাসেটটার কথাই প্রথমে মনে পড়ে। সে জিনিসও প্রযুক্তিগত কারণে এখন আর চলে না। মাঝে মাঝে রোদে দিয়ে তাজা রাখার চেষ্টা করি না তা নয়, কিন্তু ক্যাসেট বাজাতে গেলে যে যন্ত্রটি দরকার তা বাড়ি থেকে বিদায় হয়েছে বহুকাল আগে। ঊর্ধ্বমুখী মধ্যবিত্ত অস্তিত্বে সপ্তাহান্তে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হলে হারানের নাতজামাই নাটকের মঞ্চায়ন দেখতে যাওয়া তাই অদেখা বিদ্রোহের ওম নেওয়ার চেষ্টা মাত্র।

গত ১৯ মার্চ (রবিবার) মধুসূদন মঞ্চে যাদবপুর রম্যাণীর নাটক দেখতে গিয়েছিলাম ওই ওমটুকু নিতেই। পর্দা ওঠার পরে যখন দেখি মঞ্চসজ্জায় চোখে পড়ার মত জায়গা করে নিয়েছেন চিত্তপ্রসাদ ও সোমনাথ হোড় এবং নিভু নিভু আলোয় কৃষকদের বৈঠক চলছে, যা অবধারিতভাবে মনে পড়ায় সোমনাথ হোড়ের আঁকা একটি বিখ্যাত ছবিকে, তখনই আমার অদেখা বিদ্রোহের পরিবেশ তৈরি করতে সফল হয়ে যান মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পকে নাট্যরূপদানকারী অরুণ মুখোপাধ্যায়।

আমাদের যুগের শহুরে মধ্যবিত্ত বামপন্থার সঙ্গে লোকায়ত সংস্কৃতির ব্যবধান দুস্তর। লোকায়ত সংস্কৃতি আর আমরা বিপ্লবী সংস্কৃতি বলতে যা বুঝি তা বিপ্রতীপ কোণে অবস্থান করে বললেও ভুল হয় না। আমাদের বামপন্থী গান, কবিতা, ছবি – সবকিছুরই মুখ পশ্চিম দিকে ঘোরানো। আমরা যতজন ‘বেলা চাও’ বা ‘জন হেনরি’ শুনেছি, ততজন যে ‘মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য’ শুনিনি তা হলফ করে বলা যায়। এই নাটক দেখলে আঁচ পাওয়া যায়, এমনটি চিরকাল ছিল না। গোটা নাটক জুড়ে উদাত্ত কণ্ঠে গান গেয়ে চরণদাস (অভিজিৎ) চরিত্রটি বিদ্রোহকে কৃষক পরিবারের উঠোনে শক্ত খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দিয়েছে। গ্রামের যাত্রাদল এবং সে দলের অভিনেতাদের বিদ্রোহের সঙ্গে তলে তলে জড়িয়ে থাকাও বিপ্লবী সংস্কৃতি আর লোকায়ত সংস্কৃতির মেলবন্ধন তুলে ধরেছে। এর তুঙ্গ মুহূর্ত তৈরি হয় যখন হারানের (মাণিকের বানান অনুযায়ী হারাণ) বাড়ির দাওয়ায় কৃষকদের সঙ্গে মিলে চরণদাস শোনায় সদ্য বাঁধা গান ‘ন্যাংটার নেই বাটপাড়ে ভয়’। গানটি বাঁধা হয়েছে রামপ্রসাদী ‘মন রে কৃষিকাজ জানো না’ গানের সুরে। গোটা নাটকে ওই একটি সময়েই মনে হল প্রেক্ষাগৃহের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রটি বড় বেশি সক্রিয়। আমার দেশের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জীবনধারণ করা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে আমার অপরিচয়ের পরিমাণ শিরশিরানি ধরিয়ে দিল। কী হতে পারত আর কী হচ্ছে – সেকথা ভেবে বিষণ্ণ লাগল। হয়ত অপ্রাসঙ্গিক, তবু খেয়াল হল, যে মঙ্গলশঙ্খ ছাড়া হিন্দু বাড়ির পুজোআচ্চা চলে না সেই শাঁখ বাজিয়েই এককালে এ দেশে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বিদ্রোহীদের সাবধান করে দেওয়া হত – পুলিস আসছে। আজ মন্দিরের মাইক থেকে জানান দেওয়া হয় – অমুক মুসলমানের বাড়ির ফ্রিজে হিন্দুদের পূজনীয় প্রাণির মাংস আছে। চলো বিহিত করে আসি।

মাণিক গল্পের নামে হারাণ চরিত্রটিকে রেখেছিলেন বটে, কিন্তু আখ্যানে সে চরিত্রের ভূমিকা নগণ্য। অরুণবাবুর নাট্যরূপে হারাণের অভিনয় করার পর্যাপ্ত সুযোগ আছে এবং সে সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন প্রবীণ অভিনেতা শ্যামল চক্রবর্তী। গল্পের মতই এই নাটকেও অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ময়নার মা। মেক আপের দিক থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাজানো গোছানো মনে হলেও দেবলীনা চক্রবর্তী সব মিলিয়ে মন্দ নন। বিশেষত দারোগা মন্মথর (শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়) মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভুবন মণ্ডলকে বাঁচানোর দৃশ্য, যা আখ্যানের কেন্দ্রবিন্দু, সেখানে তিনি চমৎকার। মন্ডলের চরিত্রে চন্দন সেন বা চণ্ডী ঘোষের চরিত্রে মেঘনাদ ভট্টাচার্যের অভিনয় নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। তাঁদের অভিনয় ক্ষমতা তো প্রমাণিত। তবে মথুর চরিত্রে সৌমিত্র মিত্র অতখানি মাতাল না হলেও হয়ত ক্ষতি ছিল না। হারানের নাতজামাই নাটক দেখতে গিয়ে কেষ্ট মুখার্জিকে মনে পড়া খুব সুখকর অভিজ্ঞতা নয়।

দর্শককে টিকিটের দাম চুকিয়ে দেওয়ার তাগিদেই কিনা জানি না, এই নাটক হাস্যরস সৃষ্টির দিকে একটু বেশিই নজর দিয়েছে। উপরন্তু চণ্ডী ঘোষ আর সাতকড়ি (সৌমিত্র বসু) কতটা খারাপ লোক তা প্রমাণ করতে গিয়ে যেসব দৃশ্যের অবতারণা করা হয়েছে সেগুলি বড় বেশি করে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বেশি বয়সে যেসব উচ্চকিত বাংলা ছবিতে অভিনয় করতে বাধ্য হয়েছিলেন সেগুলির কথা মনে পড়ায়। কোনো সাহিত্যকর্মের নাট্যরূপ দেওয়ার অভিশাপই এই। যা যা সংযোজিত হল তা আখ্যানে নতুন মাত্রা যোগ করল কিনা সে প্রশ্ন দর্শকের মনে এসেই পড়ে। বাংলার জোতদাররা সব সাধুপুরুষ ছিল এমন দাবি নিশ্চয়ই কেউ করে না, মাণিক তো করতেন না বটেই। কিন্তু এখানে গ্রামের বিধবা হরিমতীর (সুজাতা সরকার) সঙ্গে চণ্ডী ঘোষের যে অবৈধ সম্পর্ক দেখানো হয়েছে তা বিদ্রোহকে কতখানি ঘনীভূত করেছে তা অন্তত আমার কাছে স্পষ্ট নয়।

অবশ্য মাণিকের গল্পের মূল সুর বিদ্রোহ হলেও এই নাটক সেখান থেকে বেশ খানিকটা সরে গেছে। ফলে হারানের নাতজামাই জগমোহনের চরিত্রে আমূল পরিবর্তন এসেছে। মাণিকের জগমোহন ফিটফাট কড়া ধাতের লোক, পেলবতার লেশমাত্র নেই। অরুণবাবুর জগমোহন (শুভঙ্কর মুখার্জ্জী) তোতলা, বাপের সামনে কেঁচো হয়ে থাকে, রামায়ণ পালায় জটায়ুর চরিত্রে অভিনয় করে এবং এতটাই পেলব যে সীতার ভূমিকায় অভিনয় করা মেয়েলি স্বভাবের রসিক (গৌতম সেন) তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অনাদায়ী রুপোর গয়নার জন্যে বউকে শ্বশুরবাড়িতে ফেলে রাখা নিয়ে মাণিকের জগমোহনের বিন্দুমাত্র আফসোস নেই। সে শ্বশুরবাড়ি যায় বউয়ের জন্যে মনটা হু হু করেছে বলে নয়, লোকমুখে বউয়ের ব্যভিচারিণী হওয়ার গল্প শুনে। ময়নাদের গ্রামের বিদ্রোহী মেজাজ যে তাকে আদৌ স্পর্শ করেছে এমন ইঙ্গিত মাণিক প্রায় শেষ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত দেন না। দারোগা মন্মথ ময়নার থুতনিতে হাত দিতে এলে সে যে “লাফিয়ে এসে ময়নাকে আড়াল করে গর্জে ওঠে”, তা কতটা বউয়ের প্রতি প্রেমে আর কতটা অধিকারবোধে সেকথা ভাবার ভার মাণিক পাঠকের উপরেই ছেড়ে দিয়েছেন।

আরও পড়ুন মায়ার জঞ্জাল: যে কলকাতা দেখতে পাই না, দেখতে চাই না

অরুণবাবুর জগমোহন কিন্তু ময়নার প্রেমে ডগমগ। এত প্রেম থাকতে সে আগে কেন বউকে নিতে ছুটে আসেনি সাতকড়ির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, সে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে। এই নাটকে ময়না সত্যিই অন্য কারোর সঙ্গে রাত কাটিয়েছে কিনা সে প্রশ্ন করতে জগমোহন আসেও না, আসে তার বাবা সাতকড়ি। এসে বলে বউকে সে আর ঘরে নেবে না। জগমোহন বরং পরে এসে বাবার সিদ্ধান্ত নস্যাৎ করে এতদিন পরে বউয়ের সঙ্গে প্রেম করতে বসে। মাণিকের গল্পের সুস্পষ্ট রাজনীতি নাটকের এই শেষ দৃশ্যে এসে একেবারে ভেঙে পড়ে। গল্প পড়লে পরিষ্কার হয়, যে কেবল কৃষক নেতা মণ্ডল নয়, একটি গোটা পরিবার বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্রামের মানুষের কাছে। জগমোহনও যে শেষপর্যন্ত বিদ্রোহের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, ময়নাকেও স্ত্রী হিসাবে পাশে নিয়েছে – এতগুলো কথা মাণিক বুঝিয়ে দেন একটিমাত্র বাক্যে – “ময়না তাড়াতাড়ি আঁচল দিয়েই রক্ত মুছিয়ে দিতে আরম্ভ করে জগমোহনের।” শিউরে উঠে পাঠক বুঝতে পারে, জগমোহন মণ্ডল না হলেও, আগের রাতে পুলিসকে ধোঁকা দেওয়ায় যুক্ত না থাকলেও গ্রেপ্তার বরণ করেছে বিদ্রোহের দায় স্বীকার করে। আগের রাতে যে হারানের নাতজামাই ছিল সে বিদ্রোহী, আজ সকালে যে হারানের নাতজামাই সে-ও বিদ্রোহী। এ যেন সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই অমোঘ পংক্তি “বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন।”

এই শিউরে ওঠার অনুভূতি কিন্তু হারানের নাতজামাই নাটকের শেষে হল না। যদিও শেষে মঞ্চে নির্মিত হল মাণিক লিখিত পুলিসকে ঘিরে ধরার দৃশ্য, যা দেখে মন্মথর মনে হয় “মণ্ডলের জন্য হলে মানে বোঝা যেত, হারাণের বাড়ীর লোকের জন্য চারদিকের গাঁ ভেঙে মানুষ এসেছে!” কিন্তু তার আগেই অরাজনৈতিক হয়ে গেছে নাটকটি। ফলে জোতদার আর পুলিসকে যখন মঞ্চে ঘিরে ফেলে সশস্ত্র কৃষকরা, আর বেজে ওঠে “হেই সামালো ধান হো, কাস্তেটা দাও শান হো”, তখন ছোটবেলা থেকে শুনে আসা গানের স্মৃতিমেদুরতাটুকু নিয়েই বেরিয়ে আসা যায় প্রেক্ষাগৃহ থেকে। তার বেশি কোনো সঞ্চয় থাকে না। সে অবশ্য আমার মুদ্রাদোষও হতে পারে। আমি তো কখনো রক্তে ধান বুনিনি, আমি পঞ্চাশ টাকা কিলো মিনিকিট চালের ভাত খাই।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত