গিলি গিলি গে: মোদী ম্যাজিক বলতে যা বোঝায়

মোদী ম্যাজিক কথাটা তো সেই ২০১৪ সাল থেকে শুনে আসছেন। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি, ম্যাজিকটা ঠিক কী? এমনিতে বাঙালি পি সি সরকারের জাত। হাত-পা বেঁধে গালা দিয়ে সিল করা প্যাকিং বাক্সে পুরে সমুদ্রে ফেলে দিলেও সাঁতরে পাড়ে এসে ওঠা, লোকের চোখে সামনে আস্ত ট্রেন বা তাজমহল ভ্যানিশ করে দেওয়াই যে ম্যাজিকের সর্বোচ্চ স্তর তা আমরা ছোটবেলা থেকে জানি। ফলে জাত জাদুকর চিনতে আমাদের ভুল হয় না। পি সি সরকার জুনিয়র যে দলের প্রার্থী হয়েছিলেন একদা, সেই দলের সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা নরেন্দ্র মোদীর ম্যাজিকগুলো এইবেলা চিনে নেওয়া আমাদের কর্তব্য। কারণ প্রথম দু দফা ভোটদানের পরে অনেক বিশ্লেষক বলছেন ২০১৪ আর ২০১৯ সালের মত মোদী ম্যাজিক নাকি হচ্ছে না। এঁদের বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে ৪ জুন মোদী চারশো পার করে ফেলতেই পারেন। তখন এঁরা কী বলবেন? আমরা বরং একটু এগিয়ে থাকার চেষ্টা করি। ইন্দ্রজাল কেমন করে হয় তা তো শুধু জাদুকর জানেন। আমাদের সাধ্য কী বুঝে ফেলি? আমরা কেবল জাদুকর মঞ্চের উপরে যা যা করেন সেগুলো চিহ্নিত করতে পারি। সেটাই করা যাক।

ছিল নির্বাচন কমিশন, হল ঠুঁটো জগন্নাথ

এবারের ভোটে সোজা পথে জেতা সহজ হবে না আন্দাজ করে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বেছে নেওয়ার কমিটিতে দেশের প্রধান বিচারপতির বদলে একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে রাখার আইন পাস করা হয়েছে। তারপর সেই আইন অনুযায়ী এমন লোকেদের বেছে নেওয়া হয়েছে যাঁরা মোদীর গত রবিবারের ঘৃণাভাষণ নিয়ে মন্তব্য করতেও ভয় পান। সতেরো হাজার নাগরিক স্বাক্ষরিত চিঠি বা মোদীর মন্তব্য নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সমালোচনাও নির্বাচন কমিশনের মুখ খোলাতে পারেনি। এর জন্যে নির্বাচন কমিশনারদের আবার রামভক্ত বলে বসবেন না। তাঁরা কুম্ভকর্ণের ভক্ত। তবে চক্ষুলজ্জা বলে তো একটা জিনিস আছে। তাই তাঁরা নিরপেক্ষতা দেখাতে রাহুল গান্ধী আর মোদী – দুজনের বক্তব্যেই আপত্তি জানিয়ে দুই ব্যক্তিকে নয়, তাঁদের পার্টিকে নোটিস পাঠিয়েছেন। অভূতপূর্ব ঘটনা, অর্থাৎ ম্যাজিক।

প্রার্থী ভ্যানিশ

যে কোনো বড় ঐন্দ্রজালিকের মত মোদীর ঝুলিতে আরও অনেক তাস আছে। তাঁর খাসতালুক গুজরাটের সুরাটে যাতে এই গরমে ভোটারদের ভোট দিতে বেরোতে না হয় তার ব্যবস্থা করে ফেলেছে দল। কংগ্রেস প্রার্থী নীলেশ কুম্ভানির প্রস্তাবকদের সই নিয়ে সন্দেহ আছে বলে অভিযোগ করেছিল বিজেপি। রিটার্নিং অফিসার সৌরভ পাড়হি সেই অভিযোগে সায় দেন। বলেন প্রস্তাবকরা নাকি হলফনামা জমা দিয়ে জানিয়েছেন যে ওগুলো তাঁদের সই নয়। কংগ্রেস অভিযোগ করেছে সেই প্রস্তাবকদের অপহরণ করা হয়েছিল, যাতে প্রার্থী তাঁদের সশরীরে রিটার্নিং অফিসারের সামনে হাজির করতে না পারেন। ঘটনা এইটুকু হলেও না হয় কথা ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের বিকল্প প্রার্থী সুরেশ পাড়সালার মনোনয়নও বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। শুধু কি তাই? সুরাট কেন্দ্রের নির্দল প্রার্থীরাও কোনো অজ্ঞাত কারণে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন। ফলে বিজেপি প্রার্থী মুকেশ দালাল ইতিমধ্যেই হাসি হাসি মুখে রিটার্নিং অফিসারের হাত থেকে জয়ীর শংসাপত্র নিয়ে ছবি তুলে ফেলেছেন। এদিকে কুম্ভানি নিজেও সোমবারের পর উধাও। কংগ্রেসের কেউ কেউ মনে করছেন উনি কয়েকদিনের মধ্যেই বিজেপিতে যোগ দেবেন। গুজরাট প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি তাঁকে ছ বছরের জন্য দল থেকে বহিষ্কারও করেছে বিজেপির সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগ করে।

এর আগেই আমেদাবাদ পূর্ব আসনের কংগ্রেস প্রার্থী রোহন গুপ্তা নাম ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পর বাবার অসুস্থতার দোহাই দিয়ে ভোটে দাঁড়াবেন না বলেন, তারপর দলত্যাগ করেন। আগামী কয়েক দফার নির্বাচনে আরও কত আসনে এরকম ঘটবে কে বলতে পারে?

এক পার্টি থেকে দুই, দুই থেকে চার

কংগ্রেস মোদীর ঘৃণাভাষণ এবং সুরাটের ঘটনার প্রতিবাদ করে নির্বাচন কমিশনে লম্বা চিঠি দিয়ে এসেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কী করবে? অনেক আগেই মহারাষ্ট্রের দুই শক্তিশালী দল শিবসেনা আর এনসিপিকে ভেঙে দিয়েছে মোদীর বিকাশ। তারপর বিজেপির সঙ্গে চলে যাওয়া অংশকেই আসল দল তকমা দিয়ে তাদেরই দলীয় প্রতীক ব্যবহারের ক্ষমতা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। মোদী সাত্ত্বিক মানুষ, মদ্যপান করেন না। তাই দীপ জ্বেলে যাই ছবির অনিল চ্যাটার্জির মত জলের বোতল হাতে নিয়ে গাইতেই পারেন ‘এমন বন্ধু আর কে আছে?’

লোকাল ট্রেনে দশ টাকায় দশখানা কলম বিক্রি করা হকারদের দেখেছেন তো? তাঁরা একটা করে কলম বার করেন আর এমন বিশদে তার গুণাবলী বর্ণনা করেন যে মনে হয় এটাই শেষ কলম। তারপর বলেন ‘এখানেই শেষ নয়…’। মোদীর চারশো পারের ম্যাজিকও সেইরকম।

যেমন সিপিএম অভিযোগ করেছে, ত্রিপুরা পশ্চিম কেন্দ্রের সরকারি নথিই বলছে কোথাও কোথাও ১০০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে।

নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র…

এখানেই শেষ নয়। আছে ইভিএম। মোদীভক্তদের কথা আলাদা। তার বাইরে যাঁরা কাল অবধিও ইভিএমে কারচুপি আছে শুনলেই বিরোধীদের ছিঁচকাঁদুনে বলতেন, তাঁরাও এখন ব্যাপারটাকে নেহাত ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব বলে উড়িয়ে দিতে পারছেন না। কারণ নির্বাচন কমিশন ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই যা করে, তাকে বাংলায় বহুকাল ধরে বলা হয় ‘ঠাকুরঘরে কে রে? আমি তো কলা খাইনি’।

নির্বাচনী বন্ড নিয়ে যাঁরা মামলা করেছিলেন তাঁদের অন্যতম, অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রাইটস (এডিআর), এবং আরও অনেকে মিলে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ইভিএম নিয়ে। ইভিএম বাতিল করার দাবি করা হয়নি। দাবি ছিল ইভিএমের ভোট যে ভোটারের মতই প্রতিফলিত করছে তা নিশ্চিত করতে সমস্ত ভোটার ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেল (ভিভিপ্যাট) স্লিপ গোনা হোক। নির্বাচন কমিশন সেটুকুও এড়াতে মরিয়া। ভিভিপ্যাট গোনার জন্যে নয়, গুনতে গেলে পাঁচদিন লেগে যাবে ইত্যাদি অদ্ভুত যুক্তি দেওয়া হয়েছিল কমিশনের পক্ষ থেকে। কোনো প্রযুক্তিগত গোলমাল যে নেই তাও কেবল মুখের কথায় বিশ্বাস করতে হবে – এরকমই দাবি নির্বাচন কমিশনের। শুনানি চলাকালীনই কেরালার কসরগোড় থেকে খবর আসে যে মক পোলে বিজেপির প্রতীকে একটা করে অতিরিক্ত ভোট চলে যাচ্ছে কিছু ইভিএমে। বিচারপতি সঞ্জীব খান্না ও বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের বেঞ্চ কমিশনকে খতিয়ে দেখতে বলে। কমিশন বলে দেয় খবরটাই নাকি মিথ্যে।

আরও পড়ুন এক যে ছিল সংসদ

মজার কথা, নির্বাচন কমিশনের যে চার বিশেষজ্ঞের দল আছে ইভিএম-ভিভিপ্যাট ব্যবস্থা সুরক্ষিত আছে কিনা তা দেখার জন্য, তার সদস্যরা নিজেরাই ভিভিপ্যাট নির্মাণ করেছেন। দ্য নিউজ মিনিট ওয়েবসাইটের এই তাক লাগানো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গত সোমবার। মানে আপনার বানানো মেশিন যে ঠিক কাজ করছে তার সার্টিফিকেট দিচ্ছেন আপনিই। এরকম একটা ব্যবস্থায় চলছে গোটা দেশের লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন। কখনো কোনো বাইরের লোককে পরীক্ষা করে দেখতে দেওয়া হয়নি এই ব্যবস্থায় কোনো গলদ আছে কিনা। কিন্তু শেষমেশ বিচারপতিরা রায় দিয়েছেন, সমস্ত ভিভিপ্যাট স্লিপ গোনার কোনো দরকার নেই। তবে যে কম্পিউটার থেকে ইভিএমে পার্টিগুলোর প্রতীক ঢোকানো হয়, সেগুলোকেও ইভিএম আর ভিভিপ্যাট মেশিনের সঙ্গে ফল ঘোষণার ৪৫ দিন পর পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে। পরাজিত প্রার্থীরা ৫% ইভিএম যাচাই করতে চাইতে পারবেন স্বখরচায়।

বিচারপতি খান্না আর বিচারপতি দত্ত এই রায় দিতে গিয়ে বলেছেন, সবসময় অন্ধভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অবিশ্বাস করলে অপ্রীতিকর সন্দেহ তৈরি হতে পারে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি। এতদিন জানতাম বিশ্বাস অন্ধ হয়। বিচারপতিদ্বয় আমাদের শেখালেন, অবিশ্বাসও অন্ধ হয়।

ট্রেন ভ্যানিশ

এখানেও শেষ নয়। অভিযোগ উঠেছে যে আসামের প্রবাসী শ্রমিকরা (যাঁদের বড় অংশ মুসলমান) যাতে ভোট দিতে আসতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যে আসামগামী ছটা ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।

জাদুকর মোদী যখন ঝুলি থেকে এত পায়রা, খরগোশ ইত্যাদি বার করতে পারেন তখন তাঁর চারশো পার করা কি নিশ্চিত?

মোটেই না। গত কয়েক বছর ধরে যেভাবে বিরোধী মতের রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী, ছাত্রনেতা এবং সাংবাদিকদের কারারুদ্ধ করা হচ্ছে; গত কয়েক মাসে যেভাবে বিরোধী দলের মুখ্যমন্ত্রীদেরও জেলে পোরা হয়েছে; গত কয়েক দিন ধরে মোদী যেভাবে কংগ্রেসকেও মাওবাদী বলে দেগে দিচ্ছেন তাঁর বক্তৃতায় এবং তাঁর ডান হাত শাহ যেভাবে বলেছেন এবার ক্ষমতায় এলে দুবছরের মধ্যে ভারতে মাওবাদ শেষ করে দেওয়া হবে, তার সঙ্গে অনেকটা মিলে যায় ১৯৩৩ সালে জার্মানির ফেডারেল ইলেকশনের আগে নাজি সরকারের কার্যকলাপ। অত কাণ্ড করেও কিন্তু তারা সেবার নির্বাচনে একা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। জার্মান ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (ডিএনভিপি) মদত দরকার হয়েছিল। সেই দলকে অনতিবিলম্বেই গিলে নেয় অ্যাডলফ হিটলারের দল এবং প্রতিষ্ঠিত হয় একনায়কতান্ত্রিক শাসন। মোদীর দলেরও জোটসঙ্গী আছে। ২০১৯ সালের চেয়ে কম, কারণ অনেকেই বিপদের আশঙ্কা করে কেটে পড়েছে। তবু আছে। তার বাইরেও আছে কিছু দল, যাদের দুর্নীতির সুযোগ নিয়ে ভ্যানিশ করার জন্যে মোদীর হাতে আছে আয়কর বিভাগ, ইডি, সিবিআই। গত সোমবারই যেমন কলকাতা হাইকোর্টের এসএসসি মামলার রায়ে সিবিআই তদন্তের আওতায় চলে এসেছে মমতা ব্যানার্জির পুরো ক্যাবিনেট। অর্থাৎ এই রায়ে আর কিছু হোক না হোক, অন্তত লোকসভা ত্রিশঙ্কু হলে মোদীর তৃণমূলের সমর্থন আদায় করার ব্যবস্থা হয়ে রইল।

১৯৩৩ সালের পর জার্মানিতে আর বহুদলীয় নির্বাচন হয়নি দেড় দশক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাজি জার্মানির শোচনীয় পরাজয় না হলে আরও কতদিন হত না তা বলা কঠিন। সুতরাং যে ভারতীয় ভোট দেওয়ার অধিকারকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, তিনি যে দলেরই সমর্থক হোন, এই নির্বাচনে তাঁর একটাই কাজ – আর পাঁচটা দলের সমর্থন নিয়েও মোদীর ক্ষমতায় ফিরতে না পারা নিশ্চিত করা। ম্যাজিক মঞ্চেই ভাল। কারণ সে ম্যাজিকে যারা ভ্যানিশ হয় তাদের জাদুকর আবার ফিরিয়ে আনেন। নাজিরা যাদের ভ্যানিশ করে দিয়েছিল তারা কিন্তু আর ফেরেনি। তাদের মধ্যে কেবল কমিউনিস্ট, সোশালিস্ট আর নাজিবিরোধী, ইহুদি আর সমকামীরা ছিল না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত