গৌরী লঙ্কেশ এখন অবান্তর স্মৃতি

যেহেতু সাংবাদিকরা আকাশ থেকে পড়েন না, আর সকলের মত তাঁরাও একটা আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপাদন, সেহেতু গৌরীর খুনে অভিযুক্তদের সাম্প্রতিক জামিন এবং মালা পরিয়ে বরণের দৃশ্যও আমাকে অবাক করেনি। মুচকি হেসে স্ক্রোল করে অন্য খবরে চলে যেতে আমার অসুবিধা হয়নি।

গৌরী

“বাট গৌরী লঙ্কেশ ওয়াজ নট আ জার্নালিস্ট। শি ওয়াজ অ্যান অ্যাক্টিভিস্ট।”

৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭। বক্তা পঞ্চাশের বেশি সংস্করণবিশিষ্ট একটি ভারতীয় ইংরিজি কাগজের একাধিক সংস্করণের একজন সম্পাদক। ঠিক তার আগের দিন গৌরী নিজের বাড়ির সামনে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছেন। কথাগুলো ভদ্রলোক বলছিলেন একঝাঁক অতি তরুণ সাংবাদিককে, যারা সদ্য কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সাংবাদিকতায় পা রেখেছে। স্বাধীনতার ৭০ বছর পরে কলকাতার যে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অফিসে দাঁড়িয়ে নিজের পদের সুযোগ নিয়ে উনি কথাগুলো বলছিলেন, পরাধীন দেশে নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে লিখে লিখে মরে যাওয়া হিন্দু প্যাট্রিয়ট কাগজের সম্পাদক হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত রাস্তাটা সেখান থেকে কিলোমিটার দেড়েক। এমনকি যে অফিসে দাঁড়িয়ে তিনি কথা বলছিলেন, সেই অফিসের সামনের রাস্তার নামকরণ হয়েছিল সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে। হরিশ তবু সরকারি কর্মচারী ছিলেন, দলীয় রাজনীতি করতেন না। সুরেন বাঁড়ুজ্জে রীতিমত কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন। সেইসঙ্গে দ্য বেঙ্গলি নামের কাগজ সম্পাদনা করতেন। সম্ভবত তিনিই প্রথম ভারতীয় সাংবাদিক, যাঁকে কাগজের একটি লেখার জন্যে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হয়। আরও পিছিয়ে গেলে এই কলকাতাতেই রামমোহন রায় বলে একজন সাংবাদিকের নাম পাওয়া যাবে। রামমোহনের কলমের জোরে ইংরেজ আমলের সুপ্রিম কোর্টকেও গেঁয়ো রায়তের চাবুক খেয়ে মৃত্যুর ঘটনায় জেলা জজের কৈফিয়ত তলব করতে হয়েছিল। সেই শহরে বসে একজন শীর্ষস্থানীয় সম্পাদক গৌরীর মৃত্যুর পরদিনই বলতে পেরেছিলেন যে গৌরী সাংবাদিক ছিলেন না, কারণ তিনি অ্যাক্টিভিস্ট ছিলেন।

দৃশ্যটা দেখেছিলাম এবং কথাগুলো শুনেছিলাম ফুটখানেক দূর থেকে। চুপ করে থাকতে হয়েছিল, কারণ ওই যে বললাম – আমি তখন কর্পোরেট ক্রীতদাস। ক্রীতদাসের প্রতিবাদ করার অধিকার থাকে না, সাহসও থাকে না। তবে আমাদের পায়ের তলার জমি যে সরছে সেটা সেদিনই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল আমার কাছে। যে দেশে একজন সাংবাদিক খুন হলে অন্য সাংবাদিকরা বলে – ও সাংবাদিক নয় কারণ ও অ্যাক্টিভিস্ট, সে দেশে কোনো সাংবাদিকের জীবনেরই যে দাম থাকবে না অদূর ভবিষ্যতে, চাকরি থাকা দূর অস্ত, তা বুঝতে আমার অসুবিধা হয়নি। আমার অনুমান নির্ভুল প্রমাণ করে বছর তিনেকের মধ্যেই অতিমারীর অজুহাতে ভারতের মিডিয়ায় ব্যাপক সাংবাদিক ছাঁটাই শুরু হয়। যেহেতু সাংবাদিকরা আকাশ থেকে পড়েন না, আর সকলের মত তাঁরাও একটা আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপাদন, সেহেতু গৌরীর খুনে অভিযুক্তদের সাম্প্রতিক জামিন এবং মালা পরিয়ে বরণের দৃশ্যও আমাকে অবাক করেনি। মুচকি হেসে স্ক্রোল করে অন্য খবরে চলে যেতে আমার অসুবিধা হয়নি। কারণ সাংবাদিক হত্যা আর সাংবাদিক ছাঁটাইয়ের উদ্দেশ্য একই – ক্ষমতাশালীর সমালোচনা বন্ধ করা, ক্ষমতার দিকে আঙুল তোলা বন্ধ করা, ক্ষমতাহীনের কণ্ঠ সকলের কানে পৌঁছবার ব্যবস্থা নষ্ট করা।

আরও পড়ুন তালিবান শাসন: ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

লজ্জাজনক হলেও স্বীকার না করে উপায় নেই, যে খুন হওয়ার আগে পর্যন্ত গৌরী আমার কাছে খুব পরিচিত ছিলেন না। দু-একবার নাম শুনেছিলাম। কিন্তু দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, সানডে পত্রিকা, ইনাড়ু টিভি চ্যানেলের মত বড় বড় কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে দেড় দশক কাজ করলেও গৌরীকে আমরা যেসব কাজের জন্য আজও মনে রেখেছি সেসব তিনি করেছেন মাতৃভাষা কন্নড়ে, মূলত তাঁর বাবা পলিয়া লঙ্কেশের মৃত্যুর পর তাঁরই প্রতিষ্ঠিত কাগজ লঙ্কেশ পত্রিকে (পরবর্তীকালে গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে)-র দায়িত্ব নিয়ে। আমরা বাঙালিরা আমেরিকায় কী হচ্ছে খবর রাখি, ইউরোপের সাংবাদিকতার হাল হকিকতও জানি। কিন্তু বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সাংবাদিকদের খবর জানি না। বড়জোর হিন্দি ভাষার রবীশ কুমারদের আমরা চিনি। তাও তাঁরা কর্পোরেট টিভি চ্যানেলে তারকা হয়ে উঠেছিলেন বলে। গৌরীর মত বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সংবাদমাধ্যমে যাঁরা মরণপণ সাংবাদিকতা করেন তাঁদের খবর আমরা পাই কোথায়? হয়ত চাই না বলেই পাই না। তাই আমাদের নিজেদের বিকল্প সাংবাদিকতা হয়ে দাঁড়ায় শিকড়হীন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুবিধাবাদীও। লিটল ম্যাগাজিনের দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও বাংলায় বিকল্প সংবাদমাধ্যম সম্ভবত তৈরিই হত না মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতার পরিসর ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে না গেলে। অন্যদের দোষ দেব না, আমারও তো দিব্যি চলে যাচ্ছিল দেড় দশক কর্পোরেট ক্রীতদাস হয়ে মাসান্তে মোটা মাইনে পকেটস্থ করে। গৌরীর হত্যা নাড়া দিলেও, নড়াতে তো পারেনি। বিকল্প হওয়ার জ্বালা যে অনেক। যা পাওয়া যায় তার চেয়ে ছাড়তে হয় অনেক বেশি।

আসলে গৌরীর মৃত্যু কেবল তাদেরই নড়াতে পেরেছে, গৌরী যাদের জন্য নিজের কলমকে হাতিয়ারের মত ব্যবহার করেছিলেন। নইলে নিজের বাড়ির সামনে খুন হওয়ার সাতবছর পরেও, কারা সম্ভাব্য খুনি তার মোটামুটি হদিশ থাকা সত্ত্বেও গৌরীর হত্যাকারীরা শাস্তি পাবে না কেন? মনে রাখা ভাল, গৌরী হিন্দুত্ববাদীদের দীর্ঘদিনের শত্রু হলেও তাঁকে যখন খুন করা হয় তখন কর্ণাটকে ছিল সিদ্দারামাইয়ার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার। সেই সরকারের পুলিসও অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার কাজে তেমন এগোয়নি। ইতিমধ্যে একাধিকবার সরকার বদল হয়ে গতবছর গৌরীর রাজ্যে আবার ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস, আবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন সিদ্দারামাইয়া। বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে কংগ্রেসের কর্ণাটক জয়ের অন্যতম কারণ রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো যাত্রা এবং হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান। তবু কিন্তু হিন্দুত্ববাদের আমৃত্যু প্রতিপক্ষ গৌরীর হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ১৭ জনের মধ্যে ১১ জন ইতিমধ্যেই জামিনে মুক্ত। রাহুলের মহব্বতের দোকানে গৌরীর জন্যে কি তবে কিছুই নেই? যেমন চারবছর ধরে বিনা বিচারে আটক সেই উমর খালিদের জন্য তাঁর দোকানে নেই একটা শব্দও, যাঁকে গৌরী নিজের ছেলে বলতেন?

আসলে বোবার যেমন শত্রু নেই, তেমনি যথার্থ সাংবাদিকের শত্রুর অভাব নেই। গৌরীরও ছিল না। কর্ণাটকের আজকের উপমুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারের বিরুদ্ধেও গৌরী একসময় লেখালিখি করেছিলেন। এমনকি সিদ্দারামাইয়া সরকারের টিপু সুলতান জয়ন্তী পালন করার সিদ্ধান্তকেও তিনি ভাল চোখে দেখেননি। তিনি ওই সিদ্ধান্তকে ‘নরম সাম্প্রদায়িকতা’ আখ্যা দিয়েছিলেন। এমন একজনের হত্যাকারীরা শাস্তি পেল কি পেল না, তা নিয়ে কেনই বা মাথা ঘামাতে যাবে কোনো দল বা তার নেতৃত্ব? যে ভারতে প্রয়োজনীয় অর্ণব গোস্বামী, নাভিকা কুমার, মৌপিয়া নন্দীর মত সরকারি তোতাপাখিরা; সেখানে গৌরী যে অপ্রয়োজনীয় তা বলাই বাহুল্য।

গৌরীর মৃত্যুর পর তাঁর আমৃত্যু বন্ধু এবং প্রাক্তন স্বামী সাংবাদিক চিদানন্দ রাজঘাট্টা এক দীর্ঘ ফেসবুক পোস্ট করেছিলেন, যা একান্ত ব্যক্তিগত অথচ গৌরী লঙ্কেশের শত্রু কারা এবং কেন – তা বোঝার সবচেয়ে ভাল উপায়। সেই পোস্ট পড়ে হয়ত বাঙালি বদভ্যাসেই আমার মনে পড়েছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেইসব লাইন ‘অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে/তোমার মুখ অশ্রু-ঝলোমলো/লিখিও, উহা ফিরৎ চাহো কিনা?’ আজ সাতবছর পরে মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা আর কাব্যে আটকে নেই। গৌরী এই দেশের কাছে ব্যবহারিকভাবেও অবান্তর স্মৃতিই হয়ে গেছেন।

রোববার.ইন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading