দুর্গকে দুর্ভেদ্য করে তুলতে চারপাশে পরিখা কেটে দেওয়ার প্রথা সুপ্রাচীন। ইউরোপ, এশিয়া – সব জায়গার রাজারাই এই পন্থা অবলম্বন করতেন। বর্তমানে কেন্দ্রে সরকার চালাচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের ঘোর অপছন্দের মোগল সম্রাটরাও একাজ করেছিলেন। লালকেল্লাকে বেষ্টন করে সেই পরিখা আজও আছে, যদিও এই শীতে সেই পরিখা শুকনো। লালকেল্লার প্রবেশদ্বারে আজ দাঁড়িয়ে আছেন নরেন্দ্র মোদী। সেলফি পয়েন্টে বসে, দাঁড়িয়ে তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার জন্যে সময়ও ব্যয় করেন অনেক পর্যটক। মোদী ছবির মত, বা সম্রাটের মতই নীরব, এবং তাঁর রাজধানী দিল্লিকে দুর্ভেদ্য করতে এই মুহূর্তে দুর্গের মতই ঘিরে ফেলেছে দিল্লি পুলিস। পার্শ্ববর্তী হরিয়ানা, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ থেকে যাতে দিল্লিতে ঢোকা না যায় সেজন্য লম্বা লম্বা পেরেক, কংক্রিটের বাধা, কাঁটাতারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কে আসছে দিল্লি আক্রমণ করতে? সুদূর পারস্য থেকে নাদির শাহ? আফগানিস্তান থেকে আহমদ শাহ আবদালী? গজনীর সুলতান মামুদ? অ্যাটিলা দ্য হুন? অ্যালারিক দ্য গথ? না। আসছেন এই দেশের মাটিতে জন্মানো, বেড়ে ওঠা এবং এদেশেরই মাটিতে ফসল ফলানো কৃষকরা। কী জন্যে আবার দিল্লি অভিমুখে চলেছেন কৃষক সংগঠনের আন্দোলনকারীরা? সরকারকে উৎখাত করতে নয়, নিজেদের বহু পুরনো দাবি আদায় করতে। সেই দাবিগুলোর মধ্যে আছে এম এস স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার দাবি। এই সেই স্বামীনাথন, যাঁকে মাত্র কয়েকদিন আগে ভারতরত্ন বলে ঘোষণা করেছে মোদীরই সরকার। তাহলে কৃষকদের ট্র্যাক্টর নিয়ে দিল্লি শহরে ঢুকতে দিতে আপত্তি কিসের? এই কৃষকদের বন্দুক দেখিয়ে লাভ হয় না, ইডি, সিবিআই লেলিয়ে দিয়ে দল ভাঙানোর উপায় নেই, এঁরা পথে নেমে পড়লে দাবি আদায় করে তবেই বাড়ি ফেরেন – এই কি তবে আতঙ্কের কারণ?
মাত্র দুটো শীত কেটেছে, তারপরেই আবার পথে নেমেছেন দেশের কৃষকরা। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে সংসদে পাস করা তিনটে নতুন কৃষি আইন বাতিল করার দাবিতে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা অগ্রাহ্য করে ২০২০ থেকে ২০২১ দিল্লির রাস্তায় বসেছিলেন আন্দোলনকারী কৃষকরা। প্রবল প্রতাপান্বিত সরকার প্রথমে তাঁদের দাবিতে আমল দিতে চায়নি, তারপর আলোচনায় বসেছে, একইসঙ্গে বশংবদ প্রচারমাধ্যমকে দিয়ে দেশের বাকি মানুষের কাছে আন্দোলনকারীদের ভণ্ড, সন্ত্রাসবাদী, দেশবিরোধী ইত্যাদি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে। বহু কৃষক সেই দীর্ঘ আন্দোলনে থাকতে থাকতে পথেই প্রাণ হারিয়েছেন। উত্তরপ্রদেশের লখিমপুর খেরিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ছেলের গাড়ি চারজন কৃষককে পিষে দিয়েছে। কিন্তু আন্দোলন থামেনি। কৃষকদের ঘিরে ফেলতে সরকারের ঝুলি থেকে ব্যারিকেড, কাঁটাতার বেরিয়েছে তখনই। কিন্তু কৃষকরা পিছু হটেননি, নিজেদের দাবিতে অনড় থেকেছেন এবং শেষপর্যন্ত বিরোধী দলের সাংসদরা সংখ্যার কারণে সংসদে যে আইনগুলো পাস হওয়া আটকাতে পারেননি, সেগুলোকে বাতিল করিয়ে তবেই দিল্লি ছেড়েছেন। আর ২-৩ মাসের মধ্যেই নির্বাচন। এই সময় কৃষকদের চাপের কাছে ফের মাথা নোয়াতে হলে সম্রাট মোদীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ক্ষমতায় ফেরার পথে মাথা তুলে দাঁড়াবে কাঁটা – একথা ভেবেই কি কেন্দ্রীয় সরকার আক্রান্ত?
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, ১৪ ফেব্রুয়ারির দিল্লি অভিযানে হরিয়ানার কৃষকদের যোগ দেওয়া আটকাতে সে রাজ্যের বিজেপি সরকারের পুলিস এলাকায় এলাকায় হুমকি দিচ্ছে, যারা আন্দোলনে যাবে তাদের পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা হবে। আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে তাদের বিরুদ্ধে।
হরিয়ানা পুলিস ড্রোন থেকে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার মহড়া দিয়েছে। সে মহড়া কাজে লাগানো হয়েছে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে, শম্ভু সীমান্তে ১৪ ফেব্রুয়ারি সকালেও। চালানো হয়েছে জলকামান, এমনকি রবারের বুলেটও।
আরও পড়ুন ক্রিকেটার তুমি কার?
গণতান্ত্রিক দেশের রাজধানীতে রবারের বুলেট চলতে দেখার অভ্যাস ভারতের নাগরিকদের নেই। সেটা আছে কাশ্মীর উপত্যকার মানুষের। কাশ্মীরকে শান্ত করে দেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন সম্রাট মোদী। দেখা যাচ্ছে, কাশ্মীরের মত ঘটনা খোদ দিল্লিতে ঘটছে। আসলে সরকারের অপছন্দের কথা বললেই তার বিরুদ্ধে চলবে যাবতীয় অস্ত্র। জায়গাটা কাশ্মীর হোক, মণিপুর হোক আর দিল্লিই হোক। কাশ্মীরে না হয় ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের বিপদ আছে, মণিপুরে আছে মেইতেই বনাম কুকি সংঘর্ষ। দিল্লিতে তো কৃষকরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লড়তে আসছিলেন না। তাহলে এত বাধা তৈরি করা কেন? কার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে বলে সন্দেহ করছে সরকার? জানার কোনো উপায় নেই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর বলেছেন, হিংসায় কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। কৃষকদের আলাপ আলোচনা করা উচিত। সরকার আলোচনা করতে চায়, করছেও। তিনি অবশ্য বলেননি, আলোচনা করতে হলে দিল্লি শহরকে দুর্গম গিরি কান্তার মরু করে তুলতে হবে কেন? কেনই বা আন্দোলনকারীদের আক্রমণ করতে হবে?
গত দুদিনের ঘটনাবলী থেকে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যেও উঠে আসছে একগুচ্ছ প্রশ্ন। বিভিন্ন রাজ্যের, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের, নানা আদর্শের কৃষকরা তাঁদের দাবির ভিত্তিতে একজোট হয়ে এত আক্রমণের সামনেও এক হয়ে হার-না-মানা আন্দোলন করতে পারেন। অথচ বিরোধী দলগুলো পারে না কেন? তাদের সরকারবিরোধিতা কেবল কিছু বক্তৃতা, যাত্রা আর নির্বাচনে আসন ভাগাভাগিতে সীমাবদ্ধ থেকে যায় কেন? দেশের বিভিন্ন অংশের মানুষের অসন্তোষকে পুঞ্জীভূত করে গণআন্দোলনের রূপ দেওয়ার কাজে খামতি থেকে যাচ্ছে কেন? যে সরকার কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে বহিঃশত্রুর মত ব্যবহার করে, পেশিশক্তির পূর্ণ ব্যবহার করে, তাকে স্রেফ নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি আর আসন সমঝোতা করে হারিয়ে দেওয়া যাবে – এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে কী করে দিন কাটাচ্ছেন ভারতের বিরোধী নেতৃবৃন্দ?
নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত
