আলতো ফ্লিক: ক্রিকেট নিয়ে ব্যতিক্রমী বই

‘দাস্তান-এ ফাস্ট বোলিং’ লেখাটায় লেখক কলিন কাউড্রের একখানা মাত্র ২২ রানের ইনিংসের কথা লিখেছেন, যার মূল্য সংখ্যায় ধরা পড়ে না। এই বইটাও মাত্র ৬৬ পাতার। কিন্তু এমন বই মোটা হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

বই

পশ্চিমবঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার চিরকালই বিরল। তা বলে ক্রিকেট নিয়ে লিখিত বইয়ের সংখ্যা কম নয়। আসন্ন কলকাতা বইমেলায় আরও কয়েক বস্তা বই বেরোবে ক্রিকেট নিয়ে। ফেসবুকে চোখ রাখলেই তা দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগ বইতেই প্রথিতযশা সাংবাদিকদের তারকাদের সঙ্গে ওঠাবসার কাহিনি অথবা স্বঘোষিত ক্রিকেটবোদ্ধাদের আবেগসর্বস্ব গদ্যের মোড়কে পরিবেশিত আজগুবি কথাবার্তা ছাড়া বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায় যখন এমন একটা বই হাতে এসে পৌঁছয় যার প্রায় প্রত্যেকটা পাতাই উদ্ধৃত করতে ইচ্ছা করে, তখন চমকে উঠতে হয়। ক্রিকেট এমন একটা খেলা, যা নিয়ে ক্রিকেট খেলিয়ে দেশগুলোর সাহিত্যিকরাও বিস্তর লেখালিখি করেছেন। আবার সিএলআর জেমস, নেভিল কার্ডাস, পিটার রোবাক, গিডেয়ন হাইয়ের মত সাংবাদিকদের লেখা সাহিত্যে উত্তীর্ণ হয়েছে। বাংলাতেও একসময় অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, শঙ্করীপ্রসাদ বসু, মতি নন্দীরা ক্রিকেট নিয়ে লিখেছেন। শেষেরজন তো বেশি সাংবাদিক না বেশি সাহিত্যিক তা বলা বেশ কঠিন। অথচ ইদানীং ক্রিকেট নিয়ে গন্ডা গন্ডা বই বেরোলেও, বুক ঠুকে কটাকে আর সেই ধারার উত্তরসূরী বলা যায়? অরিজিৎ সেনের আলতো ফ্লিক – এক চিলতে ক্রিকেটের গল্প কিন্তু ক্রিকেটারদের হাঁড়ির খবর লেখা আর দর্শক হিসাবে ক্রিকেট দেখে বিশেষজ্ঞ হিসাবে বই লেখার চলতি হাওয়ার পন্থী না হয়ে, ক্রিকেটের ইতিহাস খুঁড়ে সচরাচর অনালোচিত ক্রিকেটারদের কথা বলেছে। ক্রিকেট যেভাবে জীবনকে প্রতিফলিত করে আর জীবন যে অলৌকিক কায়দায় ক্রিকেট মাঠে এসে বসে, তার সন্ধানে বহুদূর গেছে এই বই। তাই সৃষ্টি হয়েছে খাঁটি সাহিত্য।

এ বইকে যদি কেউ ব্যক্তিগত গদ্যের বই আখ্যা দেন, তাতেও লেখকের কৃতিত্ব এতটুকু কমে না। বস্তুত ফ্ল্যাপের লেখক পরিচিতিতে লেখাই রয়েছে “ক্রিকেট নিয়ে লেখার জন্য যে যে যোগ্যতা লাগে… মানে শচীন তেন্ডুলকরের সাথে হোটেল লাউঞ্জে ছবি বা গোপাল বসুর সাথে আড্ডার স্মৃতি বা নিদেনপক্ষে ক্লাব হাউসে যাতায়াত… কোনটাই ঝুলিতে নেই। একবার দূর থেকে উরকেরি রামনকে দেখা আর একবার কাছ থেকে রাসেল আর্নল্ডকে… ব্যাস…”। মুশকিল হল, এসব তথাকথিত যোগ্যতা ছাড়া যাঁরা ক্রিকেট নিয়ে লেখেন আজকাল, তাঁরা আবার সগর্বে ফেনা পরিবেশন করেন। কিন্তু অরিজিৎ একেবারেই সেরকম ‘জিয়া নস্ট্যাল’ করে দিয়ে বাজিমাত করার চেষ্টা করেননি। অথচ স্মৃতি এ বইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অসম্ভব সংবেদনশীল স্মৃতি না থাকলে ‘ফেলুকে নিয়ে মোনোলগ’ শীর্ষক রচনার এই অনুচ্ছেদগুলো লেখা অসম্ভব

এদিকে ওয়াসিম জাফর ব্যাটে [ব্যাট হাতে?] দাঁড়িয়ে আছে। দুটো ছায়া [,] নিজের আর ব্যাটের। দুটোই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হছে [হচ্ছে]। কত রান করেছে জাফর… একশ [।] একশ চল্লিশ, একদিনে এত? এখনো খেলা বাকি, ইস্ কেন সকাল থেকে নেই আমি! আমি এভাবে অন্য কাজে আটকে গেলাম? সারা জীবনই আমি অন্য কাজে আটকে গেছি। যখন আমার সেখানে [যেখানে?] থাকার কথা, আমি তার থেকে কয়েক যোজন দূরে থেকেছি, পরে হাঁফাতে হাঁফাতে পৌঁছে গেছি সেখানে। তখন আর কিছু করার নেই। আমি যখন আমার পেশেন্টের বাড়ির লোকেদের বলি – আর কিছু করার নেই… কিস্যু না, আমি তখনও জানি একটা জিনিস করা বাকি… ক্ষমা চাওয়া, এখন কিছু করার নেই কিন্তু যখন করার ছিল, আমি করতে পারিনি। আমি শুধু আমিই, নার্স না, আয়া না, অন্য ডাক্তার না শুধু আমিই পারতাম বাবু তোমাকে বাঁচাতে। কিন্তু তখন আমি অন্য কোথাও ছিলাম, অন্য কিছু ভাবছিলাম। …

তুমি যখন শত মুহূর্ত আমায় উপহার দিয়েছ, দুচোখ ভরে তোমার কভার ড্রাইভ [,] ফ্লিক, গ্লান্স দেখার জন্য… তোমাকে বাঁচানোর… তোমাকে লুকিয়ে রাখার জন্য, “ফেলু”… তখন আমি পাগলের মত এগারো নম্বর গেট খুঁজে বেড়াচ্ছি। আর যখন পেলাম… রোদ পড়তে শুরু করেছে। তোমার ছায়া, ব্যাটের ছায়া বাড়তে বাড়তে পুরো সবুজ মাঠ গ্রাস করে নিয়েছে।

এই ছায়াভরা মাঠে আর কাউকে দেখতে পাব না আমি। ওয়াসিম জাফর… তেন্ডুলকার… ফেলু কাউকে না। আমি শুধু আমাকেই দেখতে পাচ্ছি। এই সঙ্গঁ [সঙ্গ] আমার আর সহ্য হচ্ছে না। সব শান্ত হয়ে গেল কেন? তেন্ডুলকার আউট… বিরাশি রানে। একশ ছেচল্লিশ মিনিট মাঠে ছিল, দু-ঘন্টা ছাব্বিশ মিনিট। তাতেই এত থম্ মেরে গেল সবাই। ফেলু দু-বছর ছিল – দুবছর প্লাস আরও কিছু দিন… কত দিন এক্স্যাক্ট্… মনে পড়ে… মনে পড়ে না।

কে এই ফেলু? রজনী সেন রোডের বাসিন্দা জনপ্রিয় গোয়েন্দা নয়। ওইসব চর্বিতচর্বণ থেকে এ বই বহু দূরে। ফেলু কে, জাফরের ম্যারাথন ইনিংস দেখতে দেরিতে মাঠে পৌঁছে, অথবা ইউসুফ ইউহানা আর ইউনিস খানের লম্বা জুটি দেখতে দেখতে পেশায় চিকিৎসক লেখকের কেন ফেলুকে মনে পড়ে – তা জানতে গেলে পড়তে হবে বইটা। উৎসুক পাঠকের জন্যে এই কাজটুকু তোলা থাক।

অরিজিৎ অনেক লেখাতেই নিজের আর পাঠকের মাঝে একজন কথককে রেখেছেন বড় বা ছোট ভূমিকায়। কোথাও সেই কথক লেখকের বাবা, কোথাও কোনো মাস্টারমশাই। সেভাবেই আলোচনায় এসে পড়েছেন ক্রিকেট-ইতিহাসের অনেক বিস্মৃত চরিত্র। যেমন শ্রীলঙ্কার জোরে বোলার ডিএস জয়সুন্দরা। শ্রীলঙ্কার জোরে বোলারদের সম্পর্কে লেখার সংকল্প নিয়ে বসে যাঁর নাম শুনে লেখকের প্রতিক্রিয়া “জয়বর্ধনে ইয়েস। জয়সূর্য ইয়েস। কিন্তু হু অন আর্থ ইজ জয়সুন্দরা?”

লেখকের বাবা তখন বলেন “তবে? তুমি বাংলা গদ্য নিয়ে গবেষণা করছ অথচ বিদ্যাসাগরের কথা জানো না… ছোটগল্পের ছাত্র – কিন্তু মঁপাসা পড়নি – এভাবে হয়?”

এরপর ডন সুমিগেন জয়সুন্দরা সম্পর্কে জানা যায় যতটুকু জানা সম্ভব। মহম্মদ নিসার আর অমর সিংকে মনে রেখেও, তিনি অনেকের মতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে উপমহাদেশের দ্রুততম বোলার। এমনিতেই শ্রীলঙ্কা তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনো শক্তি নয়। তার উপর তাঁর কেরিয়ারের অর্ধেক চলে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গ্রাসে। কেরিয়ারের শুরুর দিকে চাকিং করায় সাসপেন্ডও হয়েছিলেন। কিন্তু যেটুকু তথ্য আছে তা থেকে জানা যায় ক্লাব ক্রিকেটে পাঁচবার হ্যাটট্রিক করেছেন, তিনবার ইনিংসে দশ উইকেট নিয়েছেন। ১৯৪০-৪১ সালে শ্রীলঙ্কার একটা দলের সঙ্গে ভারত সফরে এসেছিলেন জয়সুন্দরা। দুটো বেসরকারি টেস্টে খেলেছিলেন। তার একটা ভারত জেতে, অন্যটা ড্র হয়। মাদ্রাজের বিপক্ষে একটা টুর গেমে জেতে জয়সুন্দরার দল এবং তিনি সে ম্যাচে ছয় উইকেট নেন।

জয়সুন্দরার কাহিনি লেখকের বাবা শেষ করেন একটি নিদারুণ মন্তব্যে

অন্য বিষয় বাছো বাবু। ইতিহাস বড় বিশ্বাসঘাতক। কোন ডন সিংহাসন পায়… কোন ডন নীরবে বয়ে চলে… বয়েই চলে…

আরও পড়ুন এটা যুদ্ধ নয়, ক্রিকেট; ওঁরা গ্ল্যাডিয়েটর নন, ক্রিকেটার

যারা সিংহাসন পায়নি, জয়সুন্দরার মত যারা রয়ে গেছে নিষ্ফলের, হতাশের দলে; তাদের প্রতি লেখকের মমতা আগাগোড়া বহমান। পত্রপত্রিকায় কাল্পনিক একাদশ তো কতই তৈরি হয়, কে আর বসে বসে কোনোদিন টেস্ট খেলতে না পাওয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সফল ভারতীয় ক্রিকেটারদের একাদশ তৈরি করে? লেখকের তৈরি একাদশটা এইরকম – সুরেন্দ্র ভাবে (সহ-অধিনায়ক), এমভি শ্রীধর, বিবি নিম্বলকর, অমল মজুমদার, কেপি ভাস্কর, সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (অধিনায়ক), দেবরাজ গোবিন্দরাজ, পান্ডুরাং সালগাঁওকর, দুর্গাশঙ্কর মুখার্জী, পদ্মাকর শিভালকর, কানোয়ালজিৎ সিং। ১৯০৭ সালের ইংল্যান্ড সফরে দক্ষিণ আফ্রিকা দলে খেলা চার গুগলি বোলারকে নিয়েই বা কে আলাদা করে লিখতে যায়?

তবে এ বই একবার পড়ে, আবার পড়তে হবে, বারবার পড়তে হবে অজানা ইতিহাস বা সংবেদনশীলতা বা মহম্মদ আজহারউদ্দিনের একটা ফ্লিকের বিশ্লেষণে গভীরতার জন্যে নয়। পড়তে হবে ক্রিকেটকে ব্যক্তিগত আর ব্যক্তিগতকে ক্রিকেট করে তোলার দক্ষতার টানে। যা শিখরে পৌঁছেছে ‘১৯.৪.২০২৩’ শীর্ষক লেখায়। শুরুর দিকটা উদ্ধৃত না করলে চলে না

বাবাকে দিয়ে এলাম। মানে গঙ্গায় দিয়ে এলাম। ছ-ফুটের লোকটা বিনা প্রতিবাদে ভেসে গেল।

বন্ধুরা দুহাতে আমায় ধরে বাবুঘাটের সিঁড়ি দিয়ে তুলল। জানি না কেন ওরা আমায় ধরে আছে… এমন সময় তো একা থাকতে হয়… এমন সময়ের মুখোমুখি তো একা হতে হয়… নেভিল কার্ডাস সেই কবে বলে গেছেন

“… terrible are the emotions of long on when the ball is driven high towards him and when he waits for it – alone in the world…”

হঠাৎ মনে হল অরুণ লালের কথা। ক্যানসার সার্জারির রাতে। ম্যাচ ৫০-৫০। মানে রাত কাটতেও পারে… নাও পারে। অরুণ লাল ডান হাতে পায়ে টোকা মেরে মনে মনে বললেন “লালজী… আজ রাতে উইকেটটা দিও না…”

আমিও মনে মনে বলতে লাগলাম “আজ রাতে উইকেটটা দিও না… নো সফ্ট ডিসমিসল… আমায় আউট করুক এসে… আমি উইকেট দেব না।”

‘দাস্তান-এ ফাস্ট বোলিং’ লেখাটায় লেখক কলিন কাউড্রের একখানা মাত্র ২২ রানের ইনিংসের কথা লিখেছেন, যার মূল্য সংখ্যায় ধরা পড়ে না। এই বইটাও মাত্র ৬৬ পাতার। কিন্তু এমন বই মোটা হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

তবে বই নির্মাণে আরও যত্নবান হওয়া দরকার ছিল। র আর ড় প্রয়োগে ভুল হয়েছে প্রায়শই, যতিচিহ্নের গোলমাল আর শব্দের মাঝের ফাঁক অজায়গায় পড়ার বিভ্রাটও বিরল নয়। সর্বোপরি চিন্ময় মুখোপাধ্যায়ের প্রচ্ছদ একেবারেই বইয়ের নামের এবং লেখার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারেনি। তবে এ বইকে মলাট দিয়ে বিচার করতে গেলে নেহাতই অবিচার হবে।

আলতো ফ্লিক – এক চিলতে ক্রিকেটের গল্প
লেখক: অরিজিৎ সেন
প্রকাশক: কুবোপাখি প্রকাশন
মূল্য: ২৫০ টাকা

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

One thought on “আলতো ফ্লিক: ক্রিকেট নিয়ে ব্যতিক্রমী বই”

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading