১৪৬ বছর ধরে ক্ষমতা দেখিয়ে চলেছে বুলডোজার

বুলডোজার

 “বুলডোজার, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?”

রাজধানী দিল্লির জাহাঙ্গিরপুরীতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেরও তোয়াক্কা না করা বুলডোজারে বাড়িঘর, দোকানপাট গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল যাঁদের, তাঁরা এই প্রশ্ন করেছিলেন কিনা জানি না। তবে বৃন্দা কারাত নিশ্চিত জানতেন, বুলডোজার কখনো পথ হারায় না। যন্ত্র হলেও সে নিজের পক্ষ সম্পর্কে রীতিমত সচেতন। সেই ১৮৭৬ সাল থেকে সে ক্ষমতা প্রদর্শনের কাজ করে যাচ্ছে।

সে বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী রাদারফোর্ড বি হেস আর ডেমোক্র্যাট স্যামুয়েল টিলডেনের লড়াইতে বারবার এসে যেত বুলডোজারের কথা। বুলডোজ করা বলতে বোঝানো হত কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের উপর অত্যাচার করে, ভয় দেখিয়ে তাদের ভোটদানে বিরত করা। অবাক হচ্ছেন? ভেবেছিলেন চড়াম চড়াম ঢাকের বাদ্যি আমাদের নিজেদের আবিষ্কার? তা-ও কি হয়? আমরা না অহিংস জাতি? বরং বলা যায় আমেরিকা যেখানে, বুলডোজার সেখানে। ওসামা বিন লাদেনের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ও দিয়েই। আমেরিকা সমর্থিত ইজরায়েলের সেনাবাহিনীকেও গাজায় প্যালেস্তিনীয় যুবকের মৃতদেহ বুলডোজার দিয়ে পরিষ্কার করতে দেখা গেছে। আবার আফগানিস্তানের প্রাক্তন সিআইএ এজেন্ট গুল আগা শেরজাই, যে এখন তালিবান সরকারের শরিক, তার নাঙ্গারহার প্রদেশের শাসক থাকার সময়ে (২০০৫-২০১৩) নামই হয়ে গিয়েছিল বুলডোজার। কারণ প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে গেলেই সাধারণ মানুষ তার কাছে অসমাপ্ত রাস্তা তৈরি করার আবেদন জানাত। শেরজাই নাকি পত্রপাঠ বুলডোজার চালিয়ে কাজ শুরু করে দিত।

আসলে চাষবাসের কাজে লাগবে বলে তৈরি বুলডোজারের ব্যবহার ক্রমশই শহুরে হয়ে উঠেছে। পালোয়ানরা পেশি ফোলায়, ক্ষমতাশালীরা বুলডোজার ফলায়। জরুরি অবস্থার সময়ে ভারতভাগ্যবিধাতা হয়ে ওঠা সঞ্জয় গান্ধীও পুরনো দিল্লির সৌন্দর্যায়নের নাম করে ওই যন্ত্র চালিয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালে এই এপ্রিল মাসেই সঞ্জয়ের ডান হাত আমলা জগমোহনের (সেই জগমোহন, যিনি ১৯৮৯ সালে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের হত্যার সময়ে জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যপাল ছিলেন এবং পরে বিজেপিতে যোগ দেন) উদ্যোগে লালকেল্লা, জামা মসজিদ এবং এবং তুর্কমান গেট সংলগ্ন এলাকা চিহ্নিত করা হয় বস্তি উচ্ছেদ করে সৌন্দর্যায়নের জন্য। তা করতে গিয়ে অশান্তি দেখা দিলে ওই এলাকার বাসিন্দাদের অন্যত্র সরে যেতে বলা হয়, কিন্তু তুর্কমান গেটের বাসিন্দারা নাছোড়বান্দা। ১৮ এপ্রিল পুলিস প্রতিবাদীদের উপর গুলি চালায়, অনেকের মৃত্যুও হয়। বিবিসির মত বিদেশি সংবাদমাধ্যমের মতে, বেশকিছু প্রতিবাদীকে বুলডোজার দিয়ে পিষেও দেওয়া হয়েছিল।

আরও পড়ুন শাহীনবাগ: কী পাইনি তার হিসাব মেলাতে…

অতএব যোগী আদিত্যনাথের বুলডোজার, মধ্যপ্রদেশের খারগোনে শিবরাজ সিং চৌহানের বুলডোজার বা দিল্লির জাহাঙ্গিরপুরীর — ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা মেনেই এগিয়েছে। তবে আরেকটা ব্যাপারেও ইতিহাস দারুণ ধারাবাহিক। তা হল গা-জোয়ারি শাসককে শেষপর্যন্ত বুলডোজ করে দেওয়া। এই বিধির বাঁধন কাটবার মত শক্তিমান বুলডোজার সম্ভবত এখনো তৈরি হয়নি।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

One thought on “১৪৬ বছর ধরে ক্ষমতা দেখিয়ে চলেছে বুলডোজার”

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading