মা হওয়া কি মুখের কথা?

হাতি মা এমনকি গোমাতাও নন। হলে না হয় একটা মন্দির টন্দির করে দেওয়ার কথা ভাবা যেত। তা যখন সম্ভব নয় তখন মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রতিবাদ করাই কি উচিৎ কাজ নয়?

আমাদের ভাবনায় মায়েরা অতিমানবিক। তাঁরা পারেন না এমন কিছু নেই। দশ মাস দশ দিন পেটে ধরতে পারেন, অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করে প্রসব করতে পারেন, বাড়ির সব কাজ একাই করতে পারেন শুধু নয়, নিখুঁতভাবে পারেন। মায়েদের নেহাত মানুষ হয়ে বাঁচা খুবই লজ্জার। অতএব আমাদেরই দায়িত্ব যন্ত্রণা অকল্পনীয় স্তরে নিয়ে গিয়ে তাঁদের অতিমানবিক হতে সাহায্য করা। এই দায়িত্ব আমরা একনিষ্ঠ নিয়মানুবর্তিতায় বরাবর পালন করে এসেছি। বিশ্বাস হচ্ছে না? আচ্ছা দাঁড়ান।

একেবারে পুরাণ থেকে শুরু করুন। সীতা অন্তঃসত্ত্বা, রামচন্দ্র বাবা হবেন। যাকে বলে হৈ হৈ কাণ্ড, রৈ রৈ ব্যাপার। একজন রানীর প্রসবে কোন সমস্যা হওয়ারই কথা নয়। সর্বদা যত্নে থাকবেন, ভালমন্দ খাবেন, সময় মত রাজবৈদ্যের উপস্থিতিতে তাঁর সন্তান হবে। কিন্তু তা আর হল কোথায়? দস্যু মোহনের গল্পের মত “কী হইতে কী হইয়া গেল”, সীতার চরিত্র সম্বন্ধে সর্বজ্ঞ রাম পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। প্রজাদের কানাকানি তাঁর কানে জ্বালা ধরাল, তিনি সীতাকে নির্বাসন দিলেন। লব কুশের জন্ম হল জঙ্গলের মাঝখানে বাল্মীকির আশ্রমে।

তারপর দেবকী। তিনিও রাজনন্দিনী, যথারীতি আরেক রাজার সাথে বিয়েও হল। এঁরও যথা সময়ে নির্বিঘ্নে মা হতে পারার কথা। কিন্তু পাষণ্ড ভ্রাতা কংস ইতিমধ্যে খবর পেয়েছে বোনের অষ্টম গর্ভই তার মৃত্যুর কারণ হবে। তাই স্বামী স্ত্রী দুজনকেই ঢোকাও কাস্টডিতে। আর কি নিখুঁত ব্যবস্থা! অষ্টম গর্ভ অব্দি অপেক্ষা করার ব্যাপার নেই। একটি করে সন্তান হয় আর পত্র পাঠ তাদের শেষ করে দেওয়া হয়। এত কষ্ট সহ্য করেও কিন্তু দেবকী ঠিক শ্রীকৃষ্ণের জন্ম দিয়েই ফেললেন। আবার স্বামী-স্ত্রী ষড় করে দৈব সহায়তায় সন্তানটিকে বাঁচিয়েও ফেললেন। ভাবুন, দেবকী অতিমানবিক নন?

কলি যুগ বলে আজকাল সতীত্ব টতীত্ব নিয়ে লোকে অত মাথা ঘামায় না। বিজ্ঞান সে যুগের মত উন্নত নেই। ফলে অমুকের গর্ভ তমুকের মৃত্যুর কারণ হবে — এসবও জানতে পারা যায় না। তবে অতিমানবিক মা কিন্তু কম পড়েনি। এই ধরুন ‘মাদার ইন্ডিয়া’। ছবিটা নাকি সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি। ভাবুন, একজন মহিলা স্বামী পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর চরম দারিদ্র্য সামলে ছেলেদের মানুষ করলেন। শেষে আবার বিগড়ে যাওয়া ছেলেকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে নিজেই তাকে হত্যা করলেন। এ যুগের কোন বাবা পারবেন? ক্ষমতাবান, স্নেহান্ধ বাবাদের আমলে ছেলেদের সম্পত্তি কেমন লাফিয়ে বাড়ছে সে তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি।
সে যা-ই হোক, সিনেমার মাদার ইন্ডিয়াকে অন্তত গর্ভাবস্থায় রাজার তাড়নায় জঙ্গলে বা জেলে কাটাতে হয়নি। বাস্তবের গুজরাটে বিলকিস বানোর তিন বছরের মেয়ে সালেহাকে তাঁর চোখের সামনেই পাথরে আছড়ে মেরে ফেলা হয় বলে অভিযোগ। আসলে ধর্ষণ করার তাড়া ছিল আর কি। তারপর এতগুলো বছর কেটে গেছে, বিলকিস এখনো আইন আদালত করে চলেছেন। অতিমানবিক নয়? মা বলেই তো পারেন।

তারপর সফুরা জারগর। ভাল ছাত্রী, পি এইচ ডি করছেন জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিজের এবং আসন্ন সন্তানের নাগরিকত্ব লোপাট করে দেওয়ার চক্রান্তের বিরুদ্ধে মিছিল, মিটিং, ধরনা সংগঠিত করার অপরাধে গত ১২ই এপ্রিল গ্রেপ্তার হয়েছেন। কোন দোকানে আগুন লাগাননি, কাউকে গাঁট্টা পর্যন্ত মারেননি। অন্যকে ওসব করতে প্ররোচিত করেছেন এমন প্রমাণও আদালতে দাখিল করা হয়নি পুলিশের পক্ষ থেকে। তবু এই অন্তঃসত্ত্বা তরুণী গতকালও জামিন পেলেন না। বিচারক বললেন অন্তত চাক্কা জ্যাম করার প্রাথমিক প্রমাণ তো পাওয়া গেছে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে। অতএব জামিন দেওয়া যাবে না। এ নিয়ে অনেকে রাগ করছেন। তাঁরা মহৎ উদ্দেশ্যটা বুঝতেই পারছেন না। সফুরাকে এমন যন্ত্রণার মধ্যে না রাখলে তিনি পৌরাণিক মহত্ত্বে উত্তীর্ণ হবেন কী করে? পুরাণগুলো কি কেবল হিন্দুদের সম্পত্তি নাকি? ওগুলো হিন্দু, মুসলমান নির্বিশেষে সব ভারতীয়ের। সে যুগে ইসলাম ছিল না বলে দুঃখ কষ্ট সহ্য করে মহত্ত্ব অর্জনে মুসলমান মহিলারা অনেক পিছিয়ে আছেন। তাঁদের সমান হওয়ার সুযোগ দিতে হবে না?

এখন আপনারা বলবেন হাতি মায়ের জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভুলভাল তথ্য দিয়ে কেঁদে ভাসাচ্ছেন, মানুষ মায়ের জন্য কেন দরদ নেই? ধুর মশাই! হাতি কি মানুষ? তার কি পুরাণ আছে? তার মহৎ হওয়ার কোন দরকার আছে? সে একটা নিরীহ জীব। তাকে যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখাই কর্তব্য। বিশেষত বাকি ভারতে শিল্পের জন্য, খনিজের জন্য, বুলেট ট্রেনের জন্য জঙ্গল সাফ করে দেওয়ার ফলে হাতিদের যখন ক্ষতি হচ্ছে তখন কেরালায় অন্তত তাদের বাঁচাতেই হবে। তাই এই তৎপরতা। ভাল করে ভেবে দেখুন, হাতি মা এমনকি গোমাতাও নন। হলে না হয় একটা মন্দির টন্দির করে দেওয়ার কথা ভাবা যেত। তা যখন সম্ভব নয় তখন মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রতিবাদ করাই কি উচিৎ কাজ নয়?

মাথা ঠান্ডা করে শবাসন করুন। করলেই বুঝতে পারবেন, সব ঠিক আছে। মায়েদের প্রতি আমাদের ব্যবহার একেবারে সনাতন ঐতিহ্য মেনে চলছে। অসুবিধা অন্যত্র। মায়েরা তো মহান হয়ে যান, এবারও হবেন হয়ত। বিষ্ণুর অবতার রামকে কিন্তু শেষ অব্দি নিতান্ত ছাপোষা গেরস্থের মত অবসাদে ভুগে সরযূ নদীর জলে ঝাঁপ দিতে হয়েছিল। কংসের অবস্থা আরো শোচনীয়। জনসমক্ষে হাঁটুর বয়সী ছেলের কাছে বেদম পেটানি খেয়ে মৃত্যু। পুরাণ কিন্তু ভারতীয়দের যৌথ উত্তরাধিকার, কেবল হিন্দুদের সম্পত্তি নয়।

ভারতমাতা কি জয়!

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading