বং কারেকশন

জন্মদিনে ছোটদের উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার, সত্যজিৎ দিতে ভয় হয়। যদি আদৌ ছুঁয়েই না দ্যাখে স্নেহভাজনটি?

জ্যাঠতুতো, পিসতুতো মিলিয়ে আমার এগারোজন জামাইবাবু। সর্বকনিষ্ঠ শ্যালক হওয়ার কারণে তাঁদের অনেকের বিয়ের সময়ে আমি যুক্তাক্ষর পর্যন্ত জানতাম না। কিন্তু শালা শালীদের সিনেমা দেখতে নিয়ে যাওয়ার সময়ে আমাকে তাঁরা বঞ্চিত করেননি। আমার কাছে এবং আমার তুতো ভাইবোনদের কাছে তাই জামাইবাবুরা বড় আব্দারের জায়গা। আজকাল কিন্তু তাঁরা বিরল। জিজু নামের এক নতুন প্রজাতি তাঁদের জায়গা দখল করেছে।

পাশের বাড়ির ছেলেটা আমাকে কাকু বলে না, বলে আঙ্কল। আমার স্ত্রীকে আমার মেয়ে বন্ধুদের ছেলেমেয়েরা মামী বলা শিখল না, শিখল আন্টি। ট্রেনে বাসে অচেনা বয়স্ক মহিলারাও আর মাসিমা নেই, আন্টি হয়ে উঠেছেন। সম্পূর্ণ অচেনা লোককে আন্তরিক ভদ্রতায় “দাদা, একটু সরবেন?” বলার দিন গেছে। কেঠো “এক্সকিউজ মি” না বললে অভদ্র বলেই মনে করা হয় আজকাল।
ঘরোয়া আইবুড়ো ভাতকে কনুইয়ের গুঁতোয় এক কোণে সরিয়ে দিয়েছে মেহেন্দির জাঁকজমক। জন্মদিনে ছোটদের উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার, সত্যজিৎ দিতে ভয় হয়। যদি আদৌ ছুঁয়েই না দ্যাখে স্নেহভাজনটি?
প্রাণের বন্ধু এখন আর ভাইয়ের মত নয়। সে হল ব্রো। মেয়েদের পাতানো ভায়েরা সব “ভাইয়া”। যে বন্ধুর মা চমৎকার রাঁধেন, তাঁর রান্না “সুপার সে ভি উপর”।

অনেক শিক্ষিত পাড়ায় গ্রীষ্মে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা বন্ধ বহুকাল, যেমন নবমীতে পাড়ার মণ্ডপে ছোটদের জন্যে ধুনুচি নাচের প্রতিযোগিতাও উঠে গেছে। কোথাও কোথাও এসে গেছে টিভির রিয়্যালিটি শোয়ের অনুকরণে নাচ গানের প্রতিযোগিতা, যেখানে পাঁচ ছয় সাত আট বছরের শিশুরা হিন্দি ছবির আইটেম সঙে নেচে গেয়ে হাততালি পায়।
প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কাঁধ ঝুলে পড়া ছেলেকে তার বন্ধুরা “দেবদাস দেবদাস ভাব করলে প্যাঁদাব কিন্তু” বলে না, বলে “কাম অন ইয়ার।” ইংরিজি শব্দ বাদ দিয়ে বাংলা ছবির নামকরণ হওয়াই শক্ত হয়ে গেছে, হলেও তা লেখা হয় রোমান হরফে। ছবির নায়ক নায়িকা প্রেম সম্বোধন করে “সোড়িঁয়ে”, “সাইয়াঁ”, “জানু”, “জানেমন” বলে। প্রিয়ার কী রূপ সে-ও জানে না, যে কখনো ভালবাসে।

অমিত শাহ এসব জানেন। তিনি জানেন হিন্দি চাপাতে গেলে তামিল, তেলুগু, মালয়ালিরা ক্ষেপে উঠতে পারে, বাঙালিদের ক্ষেপে ওঠার সম্ভাবনা কম। কারণ বাঙালি সুদূর অতীতে ব্যতিক্রমী ছিল বটে, এখন সে শুধু “হটকে”।

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading