একটি অসাধু গল্প

এ অঞ্চলে যজমানি এবং পাঠশালায় শিক্ষকতার কারণে পল্টুদের পরিবারের বিস্তর প্রতিপত্তি ছিল বহুকাল হইতে। কবে হইতে? অন্তত বুড়োশিবতলার বুড়ো বটগাছ যদ্দিন আছে তদ্দিন তো বটেই। এই প্রতিপত্তি আরো বাড়িয়া গেল যখন কয়েক দশক পূর্বে পল্টুর বাপ-জ্যাঠারা লাঠিসোটা এবং বুদ্ধি একত্র করিয়া পার্শ্বস্থ গ্রামের ভক্ত পদবিধারী ডাকাত পরিবারকে কপর্দকশূন্য করিয়া দিলেন। গোড়ায় পল্টুর পিতামহ উহাদের ধোপা নাপিত অবধি বন্ধ করাইয়াছিলেন, অতঃপর শক্তিহীন ভক্তকুল পায়ে ধরিয়া “আর করিব না” বলিয়া নাকখত দেয়ায় আদেশ হইয়াছিল — কোন ঘরে কোন অস্ত্র রাখা চলিবে না, নিজেদের গ্রামের বাহিরে কাহারো সাথে অদরকারে কথা বলা চলিবে না এবং সর্বোপরি নিজগ্রামের বা অন্য কোন গ্রামের মোড়ল হইবার চেষ্টা করা চলিবে না। “জো হুজুর” বলিতে তাহাদের জুড়ি ছিল না। তাই তাহারা এসবই মানিয়া লইল।
অতঃপর আমাদের পল্টু বাড়িয়া উঠিল, সংস্কৃত শিক্ষায় এবং আঁক কষায় বিশেষ ব্যুৎপত্তির কারণে আমাদের অঞ্চলে বিলক্ষণ দু চার পয়সা করিল এবং খ্যাতির অধিকারী হইল। প্রত্যুৎপন্নমতি হওয়ায় পল্টুর পূর্বপুরুষেরা যাহা চিন্তাও করেন নাই পল্টু তাহাই সম্ভব করিল। সে যজমানি ও শিক্ষকতা ছাড়িয়া দিয়া শুধু মোড়লি করিয়াই বিস্তর ধনী হইয়া উঠিল।
ওদিকে ভক্তরাও বসিয়া নাই। গিরীশ মহাপাত্র যেমন নিজে না খাইলেও অন্যের কাজে লাগিতে পারে বলিয়া গাঁজার কলিকা সংরক্ষণ করিত, ভক্তরাও তেমনি “নিজে শিখিতেছি না, অন্যকে শিখাইতেছি” বলিয়া অস্ত্রশিক্ষা ও মোড়লি শিক্ষা চালু করিয়া দিল আপনাদিগের উঠোনে। পল্টুর বাপ-কাকাদের কাছে কোন কোন ম্লেচ্ছ অভিযোগ করিয়াছিল বটে যে ইহাদের এখনই মাজা ভাঙিয়া দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাবুরা কহিলেন “ম্লেচ্ছগুলার সবেতে বাড়াবাড়ি।” সুতরাং ভক্তদের শক্তি সঞ্চয় নির্বিঘ্নে চলিতে লাগিল।
পল্টু যদ্দিনে বড় হইল তদ্দিনে ভক্ত পরিবার জনপ্রিয় হইতে শিখিয়া ফেলিয়াছে শুধু নয়, পল্টুর পরিবার অপেক্ষা এলাকায় বেশি জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে। এ অঞ্চলের লোককে সত্যের সাথে মিথ্যার উত্তম মিশ্রণ পান করাইয়া তাহারা বুঝাইতে সমর্থ হইয়াছে যে পল্টু ও তাহার পিতৃপুরুষ অদ্যাবধি কেবলই নিজেদের ঘর হইতে এ অঞ্চলের কোষাগার পর্যন্ত সিঁধ কাটিয়াছে, অন্য কিছু করে নাই। এই সমস্তের ফলে ভক্ত পরিবার কালে কালে নিজেদের শিষ্যদের মাধ্যমে অঞ্চলের মোড়লি দখল করিতে সমর্থ হইলেন।
আগেই বলিয়াছি আমাদের পল্টু আঁক কষিতে সেই ছোট থেকেই বিশেষ পারদর্শী। এখন প্রবীণ হইলেও সে ঘরের দেয়ালে প্রত্যহ শুভঙ্করী আঁক কষিত। ফলে দেয়ালের লিখন টের পাইয়া সে যথাসময়ে মাটিতে পোঁতা মোহরের কলসগুলিসমেত শহরে সরিয়া পড়িয়াছিল। অধুনা ভক্তকুলপতি নীরেন ভক্ত যখন সদলবলে আসিয়া পল্টুদের ভদ্রাসনের দখল লইল, তখন গহ্বরগুলি দেখিয়াই সে যা বোঝার বুঝিয়া গেল।
নীরেন স্বভাবে ডাকাত হইলেও, খুন, জখম, ফষ্টিনষ্টিতে রুচি থাকিলেও গুণীর কদর জানিত। সে ঠিক করিল তাহাদের গৃহের বিশ্বকর্মাপূজা উপলক্ষে সাক্ষাৎ বিশ্বকর্মা পল্টুকে সংবর্ধনা জানাইবে। শুনিয়া আমরা গ্রামবাসীরা, যাহারা নীরেনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ, ভীত সন্ত্রস্ত ছিলাম, তাহারা আশায় বুক বাঁধিলাম — বুঝি বা রত্নাকরের বাল্মীকি হইবার দিন ঘনাইয়া আসিল।
যথাকালে বিশ্বকর্মা আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বহু বৎসর পরে গ্রামে পদার্পণ করিয়া আমাদের সেই ছোট্ট পল্টু নিতান্ত আবেগপ্রবণ হইয়া পড়িল। ভক্তদের দাওয়ায় পা রাখিয়াই সে নীরেনকে জড়াইয়া ধরিয়া অশ্রুপাত করিয়া কহিল “ওঃ! ছেলে বয়সে এই দাওয়ায় তোমার ঠাকুর্দা বিশ্বনাথ ভক্তের কোলে বসিয়া কত খেলা খেলিয়াছি। অমন স্নেহময় ব্যক্তি ইহজীবনে আর একটিও দেখিলাম না।” শুনিয়া আমরা, এ তল্লাটের বৃদ্ধরা, বাকরুদ্ধ হইয়া গেলাম। প্রথমে তো বুঝি নাই কার কথা হইতেছে। ভাবিতেছিলাম আমার নব্বই বছরের জীবনে এমন সজ্জন আমাদের গাঁয়ে কাহাকে দেখিয়াছি। হঠাৎ পার্শ্বে দন্ডায়মান সুবল খুড়ো, যাঁহার বয়স ১০৩, তিনি অতি অভব্য ভাষায় সরোষে বলিয়া উঠিলেন “শালা বিশে ডাকাতকে সজ্জন বলচে র‍্যা। বিশে লুকিয়ে কিসব ভূত পেরেতের পুজো কত্ত। আমাদের গেরামের বাচ্চা ধরে এনে বলি দিত। পল্টুর বাপ আজ থাকলে ব্যাটার ঠ্যাং ভেঙে দিত।” বুঝিলাম খুড়ো প্রাণের মায়া ত্যাগ করিয়াছেন। আমার এখনো শতবর্ষ হইতে ঢের দেরী, তাই তাঁহার পাশ হইতে ছিটকাইয়া সরিয়া আসিলাম। বলা তো যায় না, কেহ যদি শুনিতে পাইয়া নীরেনের কানে লাগাইয়া দেয়! চাণক্য নাকি বলিয়াছেন রাজার সমালোচকের পাঁচ বিঘতের মধ্যে থাকিতে নাই।
অতঃপর পুজোমন্ডপের অনুষ্ঠানে নীরেন পল্টুকে কিছু বলিতে অনুরোধ করিল। আমরা শিরদাঁড়া সোজা করিয়া বসিলাম। আহা! কি চমৎকার বলিল আমাদের পল্টু!
“আজ আমি আপনাদের কাছে এতদঞ্চলের আদর্শ ও ইতিহাস সম্বন্ধে কিছু বলিব।
আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই অঞ্চলকে প্রেম এবং সহমর্মিতার ভিত্তিতে গড়িয়া তুলিয়াছিলেন। সভ্য, অসভ্য সকল মানুষের সহায়তায় এই অজ গাঁয়ে সভ্যতার গোড়াপত্তন করিয়াছিলেন। আমরা সর্বদাই ভ্রাতৃত্বের পথে চলিয়াছি, কাহাকেও শত্রু জ্ঞান করি নাই। তাই কবি বলিয়াছেন ‘যত মার খাই / পরোয়া তো নাই / মারো মোরে আরবার। / যে মারিছে মাথে / তাহারেও হাতে / দিতে হবে অধিকার।’ অতএব বন্ধুগণ, আমাদের হিংসা পরিহার করিতে হইবে, সকলকে ভালবাসিতে হইবে, বুঝিতে হইবে হিংসার দ্বারা কোন মহৎকার্য হয় না। চালাকির দ্বারা হইলেও হইতে পারে।”
শুনিয়া আমরা সকলেই প্রবল করতালি দিলাম। ভক্তরা এবং তাহাদের ছাত্ররাও দেখিলাম যৎপরোনাস্তি উল্লসিত। কিন্তু বক্তৃতা শেষ হওয়ামাত্রই যাহা ঘটিল তাহা আমাদের স্বপ্নাতীত। নীরেন উঠিয়া দাঁড়াইয়া মাথায় হাত ঠেকাইয়া অশ্রু গদগদ কন্ঠে চিৎকার করিয়া উঠিল “প্রভু, তোমায় আগে কেন চিনতে পারিনি, প্রভু? চিরকাল তোমায় পল্টু বলেই জেনেচি। এ পাপ আমি রাখব কোথায়, প্রভু? ক্ষমা কর, প্রভু, এই অধমের অপরাধ ক্ষমা কর।” বলিতে বলিতে সে দৌড়াইয়া মঞ্চে উঠিয়া পল্টুর পায়ে গিয়া পড়িল। দেখাদেখি সমস্ত ভক্ত পরিবার এবং তাহাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও সাষ্টাঙ্গ হইল। আমরা সকলেই পল্টুর স্বর্ণচশমায় শ্রীচৈতন্যের দিব্যচক্ষু প্রত্যক্ষ করিলাম। এও বুঝিলাম, ত্রেতায় যিনি রাম, দ্বাপরে যিনি কৃষ্ণ, ফাঁপরে তিনিই পল্টু। নীরেন উঠিয়া দাঁড়াইয়া মাইক হস্তে লইয়া ঘোষণা করিল সেই মুহূর্ত হইতে ভক্তরা এবং তাহাদের পারিষদবর্গ ডাকাতি, খুন, জখম, ধর্ষণ, চিটিংবাজি, ফেরেব্বাজি, কালোবাজারি ইত্যাদি সমস্ত অপরাধমূলক কার্য ছাড়িয়া দিল। এরপর হইতে আমাদের অঞ্চলে অখন্ড শান্তি, সচ্ছলতা, সমৃদ্ধি বিরাজ করিবে।
আমরা হর্ষিত হইয়া বুঝিতে পারিলাম দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানে সুদিন আসিয়া পড়িয়াছে।

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply