সোশাল মিডিয়া: বিপ্লব নয়, প্রতিবিপ্লব

২০২২ সালে রাশিয়ায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টুইটার নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ জুকেরবার্গ চীনের বিরুদ্ধে সরব হলেও রাশিয়া সম্পর্কে নীরব। আর ভারত? ২০২৩ পর্যন্ত টানা ছয় বছর আমাদের দেশ সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট শাটডাউন করা দেশের শিরোপা অর্জন করেছে। ইন্টারনেট না থাকলে মেটার কোনো অ্যাপ চলাই সম্ভব নয়। অথচ জুকেরবার্গের কিন্তু ভারত সরকারের সেন্সরশিপ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই।

বিশ শতকের প্রথম আড়াই দশকের মধ্যে অন্তত দুটো পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দেওয়ার মত ঘটনা ঘটেছিল। একটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮), অন্যটা রুশ বিপ্লব (১৯১৭)। দুটোরই অকুস্থল অবশ্য মূলত ইউরোপ। তার বাইরে এগুলোর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে সময় লেগেছে। দুটোর সঙ্গেই বিস্তর রক্তপাত জড়িয়ে। এই শতকের প্রথম আড়াই দশকে একাধিকবার বিশ্বযুদ্ধ লাগব লাগব মনে হলেও লাগেনি। কিন্তু কেবল ইউরোপ বা আমেরিকা নয়, গোটা দুনিয়া জুড়ে একটা রক্তপাতহীন বিপ্লব ঘটে গেছে বলে আমরা মনে করেছিলাম। খুবই অল্পসংখ্যক মানুষ সে বিপ্লব নিয়ে উল্লসিত হতে অস্বীকার করেছিলেন এবং আমরা যারা নাচছিলাম তাদের সতর্ক করে বলেছিলেন – ওটা বিপ্লব তো নয়ই; বরং গত কয়েক শতকে বিক্ষোভ, বিদ্রোহ, বিপ্লব এবং বিজ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ যতখানি এগিয়েছিল সেই অগ্রগতিকে একেবারে নস্যাৎ করে দেওয়ার কৌশল। কোন বিপ্লবের কথা বলছি? সোশাল মিডিয়া বিপ্লব। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে এসে শেষমেশ পরিষ্কার হয়ে গেল যে সোশাল মিডিয়া আসলে মানুষের যাবতীয় প্রগতির বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব। মুশকিল হল, আমি আপনি সবাই এই প্রতিবিপ্লবে অংশগ্রহণ করে ফেলেছি এবং এখন আর বেরোবার রাস্তা পাওয়া যাচ্ছে না।

বহু মানুষ এবং গোষ্ঠী আছেন যাঁরা সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ব্যবসায়িক, রাজনৈতিক এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক ইতিবাচক কাজকর্ম চালান। তাঁরা সোশাল মিডিয়াকে সরাসরি প্রগতির বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব আখ্যা দিচ্ছি বলে রেগে যেতে পারেন। তাঁদের একটু ধৈর্য ধরতে বলব। এ সপ্তাহে মেটার মালিক – অর্থাৎ ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ, ইনস্টাগ্রাম এবং থ্রেড নামক সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর মালিক – মার্ক জুকেরবার্গ একখানা নাতিদীর্ঘ ভিডিও বক্তৃতা প্রকাশ করেছেন। সেখানে যা বলেছেন তা বাংলায় ভাষান্তরিত করলে এইরকম দাঁড়ায়

বন্ধুগণ, আজ আমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে চাই। কারণ ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে বাকস্বাধীনতার ব্যাপারে আমাদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। আমি সোশাল মিডিয়া গড়ে তুলতে শুরু করেছিলাম মানুষকে তার নিজের কণ্ঠস্বর দেওয়ার জন্যে। প্রায় পাঁচ বছর আগে জর্জটাউনে একটা বক্তৃতা দিয়েছিলাম বাকস্বাধীনতা বজায় রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে। আমি আজও তাতে বিশ্বাস করি। কিন্তু গত কয়েক বছরে অনেককিছু ঘটে গেছে। বিস্তারিত বিতর্ক হয়েছে অনলাইন কনটেন্ট কতখানি ক্ষতি করে তা নিয়ে। সরকারগুলো আর ঐতিহ্যশালী মূলধারার সংবাদমাধ্যম বেশি বেশি করে সেন্সর চাপিয়ে দিয়েছে। এর অনেকটাই স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক। কিন্তু একথাও ঠিক যে সত্যিই অনেক ক্ষতিকর কনটেন্ট সোশাল মিডিয়ায় রয়েছে – ড্রাগ, সন্ত্রাসবাদ, শিশু নির্যাতন। আমরা এই বিষয়গুলোকে খুব গুরুত্ব দিয়ে বিচার করি এবং আমি এগুলোর দায়িত্বপূর্ণ মোকাবিলা নিশ্চিত করতে চাই। তাই কনটেন্ট মডারেট করার জন্যে আমরা অনেক জটিল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলাম। কিন্তু জটিল ব্যবস্থা গড়ে তোলার মুশকিল হল, তাতে প্রচুর ভুলও হয়। যদি ভুল করে ১% পোস্টও সেন্সর করা হয়, সেটাও কয়েক লক্ষ মানুষকে সেন্সর করা। আর আমরা এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গেছিলাম যেখানে বড় বেশি ভুল হচ্ছিল আর বড় বেশি সেন্সরশিপ চলছিল। সাম্প্রতিক নির্বাচনটাকেও [মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন] মনে হল বাকস্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সাংস্কৃতিক তুঙ্গ মুহূর্ত। সুতরাং আমরা আমাদের শিকড়ে ফিরে যেতে চলেছি এবং আমাদের ভুলের সংখ্যা কমানোর দিকে জোর দিতে চলেছি, আমাদের নীতিগুলোর সরলীকরণ করতে চলেছি এবং আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে বাকস্বাধীনতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চলেছি। আরও নির্দিষ্টভাবে বললে আমরা যা করতে চলেছি তা হল – প্রথমত, আমরা তথ্য যাচাইকারীদের বাদ দিয়ে তার বদলে এক্স সাইটের মত কমিউনিটি নোট চালু করতে চলেছি। এ কাজ শুরু হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালে প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার পরে ঐতিহ্যশালী মূলধারার সংবাদমাধ্যম ক্রমাগত লিখে গেছে ভুয়ো তথ্য কীভাবে গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কোনটা সত্যি সেটার নির্ধারক হয়ে না বসে আমরা সৎভাবে ওই দুর্ভাবনাগুলো দূর করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তথ্য যাচাইকারীরা রাজনৈতিকভাবে বড় বেশি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে কাজ করেছেন এবং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বাস অর্জন করার চেয়ে বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন বেশি। অতএব আগামী কয়েক মাস ধরে আমরা অনেক বেশি করে সবদিক রক্ষা করে এমন কমিউনিটি নোট ব্যবস্থা ধাপে ধাপে চালু করতে যাচ্ছি।

দ্বিতীয়ত, আমরা আমাদের কনটেন্ট নীতিগুলোর সরলীকরণ করে অভিবাসন আর লিঙ্গ সম্পর্কে এমন একগুচ্ছ নিষেধ তুলে দিতে যাচ্ছি যেগুলো মূলধারার বয়ানের সঙ্গে একেবারে বেমানান। যা আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠার আন্দোলন হিসাবে শুরু হয়েছিল, তা ক্রমশই হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিন্নমত এবং ভিন্নমতের লোকেদের চুপ করানোর উপায়। এখানে বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। সুতরাং আমি নিশ্চিত করতে যাই যে মানুষ নিজের বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতা আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে শেয়ার করতে পারছে।

তৃতীয়ত, আমরা যেভাবে আমাদের নীতিগুলো প্রয়োগ করি তাতেও পরিবর্তন আনতে চলেছি। ওগুলোই আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে যত সেন্সরশিপ হয় তার বেশিরভাগ ভুলের জন্যে দায়ী। আমাদের যে কোনো নীতিকে লঙ্ঘন করে যেসব পোস্ট সেগুলোকে ধরার জন্যে আমাদের ফিল্টার ছিল। এখন থেকে সেই ফিল্টারগুলো মূলত নজর দেবে বেআইনি এবং গুরুতর নীতি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর উপর। আর সেগুলোর ক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা নেওয়ার আগে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীরা রিপোর্ট করেছেন কিনা তার উপর নির্ভর করব। সমস্যা হল, ফিল্টারগুলোও ভুল করে এবং এমন প্রচুর কনটেন্ট মুছে দেয় যেগুলো মোছা উচিত নয়। সুতরাং ফিল্টারগুলোর ভূমিকা কমিয়ে আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্মের সেন্সরশিপ অনেকখানি কমিয়ে ফেলতে পারব। এছাড়াও আমরা কনটেন্ট ফিল্টারগুলোকে এমনভাবে টিউন করতে চলেছি যে কোনো কনটেন্ট মুছে দেওয়ার আগে ফিল্টারগুলোকে অনেক বেশি নিশ্চিত হতে হবে।

সত্যি কথা বলতে এগুলো করলে কিছু ক্ষতিস্বীকারও করতে হবে। এই ব্যবস্থায় অনেক কম খারাপ জিনিস ধরা পড়বে, কিন্তু যত নিরপরাধ মানুষের পোস্ট আমরা ভুল করে মুছে দিই তার সংখ্যা কমবে।

চতুর্থত, আমরা সিভিক কনটেন্ট ফিরিয়ে আনছি। বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুক সমাজ রাজনীতি কম দেখতে চাইছিল কারণ এতে মানুষের মানসিক চাপ বেড়ে যাচ্ছিল। তাই আমরা ওই ধরনের পোস্ট সুপারিশ করা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু মনে হচ্ছে আমরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছি এবং আমরা জানতে পারছি যে লোকে ওই ধরনের কনটেন্ট আবার দেখতে চাইছে। তাই আমরা ধাপে ধাপে সেই ধরনের কনটেন্ট ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আর থ্রেডে ফিরিয়ে আনতে চলেছি যাতে গোষ্ঠীগুলো বন্ধুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক থাকে।

পঞ্চমত, আমরা আমাদের ট্রাস্ট অ্যান্ড সেফটি অ্যান্ড কনটেন্ট মডারেশন টিমগুলোকে ক্যালিফোর্নিয়ার বাইরে নিয়ে যাচ্ছি এবং আমাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কনটেন্ট রিভিউ হবে টেক্সাস থেকে। আমরা যেহেতু বাকস্বাধীনতা বৃদ্ধি করতে চলেছি, সেহেতু আমার মনে হয় এমন জায়গা থেকে কাজ করলে বেশি বিশ্বস্ত হওয়া যাবে যেখানে আমাদের টিমের পক্ষপাত নিয়ে ভাবনা কম।

শেষত, আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সেইসব সরকারের বিরুদ্ধে লড়ব যারা আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে আক্রমণ করছে আরও সেন্সর করার জন্যে। গোটা পৃথিবীর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই বাকস্বাধীনতা রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী সাংবিধানিক ব্যবস্থা রয়েছে। ইউরোপে ক্রমশ এমন সব আইন বেড়ে যাচ্ছে যেগুলো সেন্সরশিপকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। ফলে সেখানে উদ্ভাবনীমূলক কিছু করা শক্ত হয়ে যাচ্ছে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর এমন গোপন কোড আছে যা দিয়ে তারা চুপিসারে কোম্পানিগুলোকে নানা পোস্ট মুছে দিতে বলতে পারে। চীন আমাদের অ্যাপগুলোকে তাদের দেশে একেবারেই নিষিদ্ধ করে রেখেছে। এই বিশ্বব্যাপী প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই করা যেতে পারে একমাত্র মার্কিন সরকারের সঙ্গে মিলে কাজ করলেই। সেই কারণেই গত চার বছরে কাজ করা খুব শক্ত হয়ে গিয়েছিল, কারণ মার্কিন সরকারও সেন্সরশিপ চালানোর জন্যে চাপ দিচ্ছিল। আমাদের এবং অন্য আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে আক্রমণ করে মার্কিন সরকার অন্য দেশের সরকারগুলোর আমাদের সেন্সর করার সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এবার আমাদের সামনে বাকস্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার সুযোগ এসেছে এবং আমি সেই সুযোগ নিতে উদগ্রীব। এতে সময় লাগবে আর এগুলো জটিল ব্যবস্থা। ফলে কখনোই একেবারে নিখুঁত হবে না। তাছাড়াও প্রচুর বেআইনি জিনিস আছে যেগুলোকে সরাতে আমাদের এরপরেও অনেক পরিশ্রম করতে হবে। কিন্তু আসল কথা হল, বহুবছর ধরে আমাদের কনটেন্ট মডারেশন প্রোগ্রামের প্রধান কাজ ছিল কনটেন্ট মুছে দেওয়া। এবার সময় এসেছে ভুল কমানোর উপর জোর দেওয়ার, আমাদের ব্যবস্থাগুলোর সরলীকরণ করার এবং আমাদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার, অর্থাৎ মানুষকে তার নিজের কথা বলতে দেওয়ার। আমি এই নতুন অধ্যায়ের দিকে সাগ্রহে তাকিয়ে আছি। ভাল থাকুন, শিগগির আরও কিছু নিয়ে ফিরে আসব।’

অতীতে কখনো এরকম বুক ফুলিয়ে কোনো বহুজাতিক কোম্পানি মার্কিন সরকারের সঙ্গে মিলে অন্য দেশের সরকারগুলোর আইনকানুনের বিরুদ্ধে লড়ার কথা ঘোষণা করেছে কিনা তা ঐতিহাসিক গবেষণার বিষয় হতে পারে। এসব বরাবর চোরাগোপ্তা চলেছে। কিন্তু জুকেরবার্গের এই ঘোষণা প্রমাণ করে দিল যে বিশ্বজুড়ে বহু ইন্টারনেট অ্যাক্টিভিস্ট যে অভিযোগ করে আসছেন এই দৈত্যাকৃতি তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে – তা সত্যি। অর্থাৎ এদের হাতে এমন উপকরণ আছে যা দিয়ে এরা মার্কিন সরকারের হয়ে অন্য দেশের সরকারের তো বটেই, সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী কাজও করতে পারে।

করেও থাকে। সোশাল মিডিয়া যেভাবে বিশ্বব্যাপী জাল বিস্তার করেছে তা করতেই পারত না, যদি না যোগাযোগ বিপ্লব ঘটত। সেই বিপ্লবে সবচেয়ে লাভবান হওয়া কোম্পানিগুলোর অন্যতম হল স্টিভ জোবস স্থাপিত অ্যাপল। এ মাসের গোড়াতেই অ্যাপল একখানা মামলা মিটিয়ে নিতে ৯৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া প্রদেশের ওকলাহোমার ফেডেরাল কোর্টে চলা এই মামলায় মামলাকারীর অভিযোগ ছিল, আইফোন ও অন্যান্য অ্যাপল উৎপাদিত যন্ত্রপাতির ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘সিরি’, যন্ত্রের মালিকের অজান্তে তার কথাবার্তা রেকর্ড করে নিয়েছে। তারপর সেই কথাবার্তা বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বেচে দেওয়া হয়েছে। তেমন হলে যে মার্কিন সরকারের কাছে বা আপনি যে দেশের লোক সে দেশের সরকারের কাছেও বেচবে না তার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না। তেমন অভিযোগও ওঠে, কেবল অ্যাপল বা ফেসবুকের বিরুদ্ধে নয়। সুন্দর পিচাইয়ের গুগল এবং সত্য নাডেলার মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধেও নানারকম অভিযোগ আছে। পিচাইকে মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের সামনে বসে প্রাইভেসি, রাজনৈতিক পক্ষপাত, হিংসায় ধুয়ো দেওয়া ইত্যাদি অভিযোগ সম্পর্কে কৈফিয়তও দিতে হয়েছে।

এগুলো কোনোটাই আমেরিকাবিরোধী বা পুঁজিবাদবিরোধী বামপন্থীদের তৈরি ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব নয়। অভিযোগগুলো নিয়ে অন্তর্তদন্ত, লেখালিখি করে থাকে ফোর্বসের মত মার্কিন এবং ঘোর পুঁজিবাদী সংবাদমাধ্যমগুলোই। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি হলিউড তো এসব নিয়ে একগুচ্ছ ছায়াছবি বানিয়ে বসে আছে। এসব যদি কেবল গালগল্প হত তাহলে এডওয়ার্ড স্নোডেনকে নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গিয়ে আত্মগোপন করে থাকতে হত না।

যা-ই হোক, জুকেরবার্গের মিনিট পাঁচেকের ঘোষণার শুধু ওটুকু নিয়ে পড়ে থাকলে আমাদের চলবে না। এগোনো যাক।

ইলন মাস্ক যখন টুইটার (অধুনা এক্স) কিনে নিলেন, তখন প্রচুর লোককে ছাঁটাই করেন। তাঁদের একটা বড় অংশ ছিলেন তথ্য যাচাইকারী, অর্থাৎ যাঁরা ওই প্ল্যাটফর্মে ভুয়ো তথ্য পরিবেশন আটকানোর দায়িত্বে ছিলেন। এবার লক্ষ করুন, জুকেরবার্গও বলছেন তথ্য যাচাইকারীদের দরকার নেই। তারা বড্ড পক্ষপাতদুষ্ট। আমরা বরং এক্সের মত কমিউনিটি নোট চালু করব। অর্থাৎ আগে যদি ফেসবুকে আপনি পোস্ট করতেন যে বারাক ওবামা হলেন ওসামা বিন লাদেনের খুড়তুতো ভাই, তাহলে ফেসবুক হয়ত তা মুছে দিত। এখন থেকে মুছবে না। যদি অন্য ব্যবহারকারীরা কথাটা যে মিথ্যে তা উল্লেখ করেন, তাহলে পোস্টের তলায় একখানা নোট দেওয়া থাকবে যে অনেকে জানিয়েছেন এই তথ্য মিথ্যা। তেমন কিছু পোস্টের দৃষ্টান্তও দেওয়া থাকবে। বলা বাহুল্য, স্মার্টফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমাদের মনোযোগ যে তলানিতে এসে পৌঁছেছে তাতে অধিকাংশ লোক ওসব নোট-ফোট খুলে দেখতে যাবে না। ফলে ভুয়ো তথ্যের রমরমা হবে। ওরকম পোস্ট যদি ছবি সহকারে করা হয় তাহলে তো কথাই নেই। আমাদের দেশে অল্টনিউজ, বুমলাইভের কর্মীদের উদয়াস্ত পরিশ্রম সত্ত্বেও বারবার জওহরলাল নেহরু এক সুন্দরী মেমের সঙ্গে নাক ঘষছেন – এমন একখানা ছবি কিছুদিন পরপরই সোশাল মিডিয়ায় ঘোরে। অথচ বহুবার প্রমাণিত হয়েছে যে ওটা ফটোশপের কারসাজি। ছবিতে আসলে নেহরুর পাশে ছিলেন মহাত্মা গান্ধী, দুজনের মধ্যে হাসিঠাট্টা চলছিল।

অল্টনিউজের কথা যখন উঠলই তখন মনে করিয়ে দিই, ২০২১ সালে নাগরিক ডট নেটকে এক সাক্ষাৎকারে ওই সংস্থার কর্ণধার প্রতীক সিনহা বলেছিলেন, যে সমাজে তীব্র মেরুকরণ হয়ে গেছে সেখানে তথ্য যাচাই যথেষ্ট নয়। কথাটা সব দেশের সব সমাজের জন্যেই সত্যি। কারণ তেমন সমাজে আপনি যাদের অপছন্দ করেন তার সম্পর্কে বানিয়ে বলা খারাপ কথাও আপনি অন্ধের মত বিশ্বাস করবেন, পছন্দের লোকেদের সম্পর্কে বানিয়ে বলা ভাল কথাও একইভাবে বিশ্বাস করবেন। যাচাই করে দেখতে যাবেন না সত্যি বলা হয়েছে না মিথ্যা। একথা জুকেরবার্গও জানেন আর আজকের আমেরিকা যে প্রবল মেরুকরণ হয়ে যাওয়া এক দেশ – সেকথাও বিলক্ষণ বোঝেন। তা সত্ত্বেও তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার মানে এর পিছনে যে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এদেশে আরএসএস-বিজেপির নেতা, কর্মী, সমর্থকরা প্রতীক, মহম্মদ জুবের প্রমুখ তথ্য যাচাইকারীদের পক্ষপাতদুষ্ট বলেন। সোশাল মিডিয়ায় গালাগালি দিয়েই ক্ষান্ত থাকেন না, এফআইআর-ও করে দেন। তার জেরে জুবেরকে ইতিমধ্যেই একবার কারাবাস করতে হয়েছে, এই মুহূর্তেও তাঁর নামে মামলা চলছে আদালতে। লক্ষ করুন, জুকেরবার্গও অভিযোগ করছেন যে তথ্য যাচাইকারীরা পক্ষপাতদুষ্ট। কোন পক্ষ? সেই পক্ষকে কেন জুকেরবার্গের অপছন্দ? তা একেবারে শেষে এসে পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তিনি ট্রাম্পের পক্ষে, অর্থাৎ তথ্য যাচাইকারীরা ট্রাম্পের বিরুদ্ধ পক্ষের। গোটা বক্তৃতায় জুকেরবার্গ বাকস্বাধীনতার হয়ে ধর্মযুদ্ধে নামার ভান করেছেন। বাকস্বাধীনতা কথাটা শুনতে অতি চমৎকার। কিন্তু কার বাকস্বাধীনতা? এক্ষেত্রে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে – অভিবাসীবিদ্বেষী, কৃষ্ণাঙ্গবিদ্বেষী, মুসলমানবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী এবং রূপান্তরকামী বিদ্বেষী ট্রাম্প ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের বাকস্বাধীনতা।

কার বাকস্বাধীনতা – এই প্রশ্নটা করতে আমরা প্রায়শই ভুলে যাই। ইউরোপের নবজাগরণ, ফরাসি বিপ্লব, পাশ্চাত্যের উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় আমরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে প্রশ্নটা উঠলেও সটান বলে দিই ‘সকলের বাকস্বাধীনতা থাকা উচিত।’ সেন্সরশিপ ব্যাপারটা যে খুব খারাপ সেটাও আমরা বিনা প্রশ্নে মেনে নিই। কথাটার মধ্যে যে একটা মস্ত ফাঁক (বা ফাঁকি) আছে সেটা একুশ শতকে এসে মাস্ক, জুকেরবার্গরা দেখিয়ে দিলেন। বলা ভাল, দেখিয়ে ফেললেন। ওই ফাঁক দিয়েই তাঁরা ভুয়ো তথ্য ও ঘৃণাভাষণের হাতি গলিয়ে দিলেন। দেখুন জুকেরবার্গ কেমন অবলীলাক্রমে বলেছেন যে এসব পরিবর্তন করলে কিছু ক্ষতি হবেই। সত্যিই সোশাল মিডিয়ায় ড্রাগ, সন্ত্রাসবাদ, শিশু নির্যাতনের মত ভয়ঙ্কর জিনিস ছড়িয়ে আছে এবং নতুন ব্যবস্থায় সেগুলো বেড়ে যাবে। কিন্তু তাতে কী হয়েছে? সেন্সরশিপ তো কমবে। অর্থাৎ মানুষের স্বার্থে বাকস্বাধীনতা চাইছেন না, বাকস্বাধীনতার স্বার্থে মানুষকে বলি দিতে চাইছেন। আপনার স্মার্টফোন হাতে পাওয়া সন্তানের কোনো বিকৃতকাম লোকের পাল্লায় পড়ে যাওয়া আটকানোর চেয়ে বিকৃতকাম লোকটার বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা বেশি জরুরি – এই হল জুকেরবার্গের যুক্তি। একইভাবে কালো মানুষকে তার চামড়ার রং নিয়ে গালাগালি দেওয়ার বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা জরুরি। মহিলাদের প্রতি লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্য করা, অশ্লীল ইঙ্গিত করা, ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার বাকস্বাধীনতাও জরুরি। যে কোনো প্রান্তিক পরিচিতিসম্পন্ন ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীকে যথেচ্ছ গালাগালি দেওয়া, তাদের বিরুদ্ধে ভুয়ো তথ্য ছড়ানো, সোশাল মিডিয়ায় ঘৃণাভাষণের স্বাধীনতা রক্ষাও জুকেরবার্গের খুবই জরুরি মনে হয়েছে।

কেন মনে হল? জুকেরবার্গ আদতে তো ব্যবসায়ী। তাঁর লক্ষ্য তো মুনাফা। তাহলে এইরকম বাকস্বাধীনতায় কি মুনাফার সম্ভাবনা বাড়বে? অবশ্যই। কারণ দেশের রাষ্ট্রপতি, যিনি মূলত একজন ধনকুবের, তিনি আপনার হাতে। ফলে তাঁর রাজনীতিকে জায়গা করে দিলেই আপনার ব্যবসা যে ফুলে ফেঁপে উঠবে সে তো জানা কথাই। মাস্ক যখন টুইটার কিনে নিলেন তখন অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক বলেছিলেন যে এটা ভুল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। কারণ ওটা আসলে ক্ষতিতে চলা ব্যবসা। মাস্ক নিজেও ২০২২ সালের নভেম্বরে বলেছিলেন যে টুইটারের দৈনিক ৪ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। ক্ষতিকে লাভে পরিণত করার জন্যে তারপর তিনি নানারকম ব্যবস্থা নেন। ভেরিফিকেশন টিক দেওয়ার জন্যে টাকা নেওয়া, বিনামূল্যে যত শব্দ পোস্ট করা যায় তার চেয়ে মাসিক মূল্যে কিছু বেশি শব্দ পোস্ট করতে দেওয়া, পোস্ট সম্পাদনা করতে দেওয়া – ইত্যাদি ব্যবস্থা চালু হয়। কিন্তু এহ বাহ্য। এখন বোঝা যাচ্ছে, আসলে মাস্কের উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্পকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করা। তিনি টুইটারের মালিকানা হস্তান্তরের পরেই ট্রাম্পের উপর চাপানো আজীবন নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনেন। তারপর ভুয়ো তথ্য, ঘৃণাভাষণ আটকানোর ব্যবস্থাগুলোর সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দেন। দেশে নিজের পছন্দের রাষ্ট্রপতি বসাতে পারলে অনেক ব্যবসার একটা ব্যবসায় যা ক্ষতি হবে তা পুষিয়ে নেওয়া এমন কী ব্যাপার? জুকেরবার্গও মাস্কের পথের পথিক।

এবার জুকেরবার্গের বক্তব্যের শেষ অনুচ্ছেদে আসা যাক। তিনি জো বাইডেনের আমলের নিন্দা করে বলেছেন, এমনিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই বাকস্বাধীনতার সাংবিধানিক রক্ষাকবচ সবচেয়ে বেশি। কিন্তু গত চার বছরে তাঁদের উপর এবং অন্য মার্কিন কোম্পানিগুলোর উপর মার্কিন সরকার সেন্সরশিপ চাপিয়ে দিচ্ছিল। ফলে অন্য দেশের সরকারগুলোরও সাহস বেড়ে গেছে। অতঃপর জুকেরবার্গ নির্দিষ্ট করে কিছু দেশ ও মহাদেশের নাম করেছেন, যারা নাকি এতই সেন্সরশিপ চালায় যে সেখানে কোনোরকম উদ্ভাবনীমূলক কাজ করা যায় না। নামগুলো কৌতূহলোদ্দীপক। চীনে মেটার অ্যাপগুলো নিষিদ্ধ, তাঁর দোকান খুলতেই দেওয়া হয়নি, অতএব চীনকে জুকেরবার্গের অপছন্দের কারণ বোঝা যায়। সত্যি বলতে বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে চীনের রেকর্ড খুব ভাল – এমনটা ভারতের কিছু কমিউনিস্ট ছাড়া বিশেষ কেউ দাবি করে না। বোধহয় শি জিনপিংকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলবেন – বেশ করি বাকস্বাধীনতা দিই না। যা পারিস কর গে যা। ফলে চীনের কথা না হয় বাদ দেওয়া গেল। লাতিন আমেরিকাকে নিয়ে আপত্তি তো থাকবেই। ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা সহ একাধিক দেশে এখন বামপন্থী দলগুলোর সরকার। এদের মার্কিন পুঁজিবাদীদের কোনোদিনই পছন্দ হয় না, হওয়ার কথাও নয়। সুতরাং তাদের প্রতি জুকেরবার্গের অসন্তোষও স্বাভাবিক। মজার ব্যাপার হল, ইউরোপের নাম করা। ইউরোপের প্রায় সব দেশের সরকারই তো পুঁজিবাদে ঘোর বিশ্বাসী। ফ্রান্সে, স্পেনে ইদানীং বামপন্থীদের প্রভাব যেমন খানিক বেড়েছে তেমনই নেদারল্যান্ডস, ইতালির মত দেশে ঘোর দক্ষিণপন্থী সরকার এসেছে। জার্মানিও ক্রমশ অতি দক্ষিণপন্থীদের দিকে ঝুঁকছে। তাহলে ইউরোপের উপর গোঁসা কেন?

আসলে ইউরোপের দেশগুলো ইন্টারনেট, প্রাইভেসি ইত্যাদি ব্যাপারে ভারতের মত কাছাখোলা নয়। এসব ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আইন আছে। সেইসব আইনভঙ্গের অভিযোগে সাম্প্রতিক অতীতে সিলিকন ভ্যালির টেক দৈত্যতের ফাঁপরে পড়তে হয়েছে। ২০১৮ সালে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পরে জুকেরবার্গকে সশরীরে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্যদের প্রশ্নের উত্তর দিতে যেতে হয়েছিল। ইউরোপের সরকারগুলোর উপরে ট্রাম্পের ডান হাত মাস্কও রুষ্ট (অনেকে বলছে ট্রাম্পই মাস্কের ডান হাত)। গত ৬ জানুয়ারি তিনি নিজের এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করেছেন ‘আমেরিকার উচিত ব্রিটেনের মানুষকে তাদের অত্যাচারী সরকারের হাত থেকে মুক্ত করা’। কারণ তাঁর মতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টার্মার মুসলমান অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর নন। আবার অতি দক্ষিণপন্থী ব্রিটিশ নেতা নাইজেল ফারাজকেও মাস্কের পছন্দ নয়। অন্য দেশে কার ক্ষমতায় থাকা উচিত আর কার উচিত নয় – তা নিয়ে এতকাল মন্তব্য করার একচেটিয়া অধিকার ছিল মার্কিন আর ইউরোপিয় দেশের রাষ্ট্রপতিদের। মন্তব্যগুলো করা হত লাতিন আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে। ২০২৫ সালে এসে দেখা যাচ্ছে মন্তব্য করছে টেক দৈত্যরা; এমনকি ইউরোপের যেসব দেশ নিজেদের গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতার পরাকাষ্ঠা বলে মনে করে তাদের সম্পর্কেও। তাহলে বোঝা যাচ্ছে গত দুশো-আড়াইশো বছর ধরে অর্জিত গণতান্ত্রিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কেমন ইউ টার্ন নিয়ে ফরাসি বিপ্লবের আগের যুগে ফিরে যাচ্ছে? বোঝা যাচ্ছে কেন সোশাল মিডিয়াকে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব বলছি?

জুকেরবার্গ যা বলেছেন শুধু তা-ই যে তাৎপর্যপূর্ণ তা কিন্তু নয়। যা বলেননি তা খেয়াল করলেও গণতন্ত্রবিরোধী বা প্রতিবিপ্লবী প্রবণতাটা ধরা যাবে। লক্ষ করুন, যেসব দেশের সরকার সেন্সরশিপ চাপিয়ে দিচ্ছে বলে জুকেরবার্গ অভিযোগ করেছেন তার মধ্যে ভারত নেই, রাশিয়া নেই। কেউ বলতেই পারেন, হাতে ফর্দ নিয়ে বসে দুনিয়ায় যতগুলো দেশে অপছন্দের সরকার আছে তাদের নাম করবে নাকি? নিশ্চয়ই তা প্রত্যাশিত নয়। কিন্তু বাজার হিসাবে ভারত আর রাশিয়া বিরাট। রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিন কীরকম দমনমূলক শাসন চালান তা জানতে কারোর বাকি নেই। বিরোধিতা করলে কী অবস্থা হয় তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ একদা বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনি, যিনি গতবছর কারাগারে মারা গেছেন। কিন্তু আজও পুতিনের সরকার সন্ত্রাসবাদীদের তালিকা থেকে তাঁর নাম সরাতে রাজি নয়। যদি একটু হাসিঠাট্টার মেজাজে আরও বিস্তারিত জানতে চান পুতিনের রাশিয়া সম্পর্কে, তাহলে বিদূষক জন অলিভারের শোয়ের এই পর্বটা দেখে নিতে পারেন।

উপরন্তু ২০২২ সালে রাশিয়ায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টুইটার নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ জুকেরবার্গ চীনের বিরুদ্ধে সরব হলেও রাশিয়া সম্পর্কে নীরব। আর ভারত? ২০২৩ পর্যন্ত টানা ছয় বছর আমাদের দেশ সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট শাটডাউন করা দেশের শিরোপা অর্জন করেছে। ইন্টারনেট না থাকলে মেটার কোনো অ্যাপ চলাই সম্ভব নয়। অথচ জুকেরবার্গের কিন্তু ভারত সরকারের সেন্সরশিপ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই।

এই মনোভাবের কারণ বোঝা কি সত্যিই শক্ত? পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুই সোশাল মিডিয়া মালিক জুকেরবার্গ আর মাস্ক হলেন ট্রাম্পের বন্ধু। আবার পুতিন আর আমাদের নরেন্দ্র মোদীর বন্ধু হলেন ট্রাম্প। মোদী আমেরিকায় গিয়ে অনাবাসী ভারতীয় ভোটারদের কাছে ট্রাম্পের হয়ে প্রায় নির্বাচনী প্রচার করে এসেছিলেন। স্লোগান চালু হয়েছিল ‘অব কি বার, ট্রাম্প সরকার’। ট্রাম্পও ভারতে এসে এলাহি অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন মোদীর নিজের শহর আমেদাবাদে। মোদীর নামাঙ্কিত ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রথম অনুষ্ঠান ছিল ট্রাম্পের অভ্যর্থনা, কোনো ক্রিকেট ম্যাচ নয়। তখন করোনা অতিমারী চলছে। দেশসুদ্ধ লোককে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখতে বলে কেবল ট্রাম্পের জন্যে লক্ষ লক্ষ লোককে সেদিন জড়ো করা হয়েছিল ওই স্টেডিয়ামে। তাছাড়া নির্বাচন এসে পড়লেই বিজেপি ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিতে কী বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে তাও তো গোপন নেই।

পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা তো আরও গভীর। ট্রাম্প প্রথমবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার সময় থেকেই অভিযোগ উঠেছে মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়া হস্তক্ষেপ করে ট্রাম্পকে সাহায্য করতে। সেই ঠান্ডা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কোনো মার্কিন রাজনীতিবিদ রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে ট্রাম্পের মত উদগ্রীব হননি। পুতিনও ট্রাম্পের প্রশংসা করে থাকেন। ট্রাম্প এবারে ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই পুতিনের ইউক্রেনের জমি দখলকে সমর্থন করে চলেছেন। সম্প্রতি বাইডেন সরকারের অনুসৃত বিদেশনীতির একেবারে উল্টো পথে হেঁটে বলেছেন ইউক্রেনের ন্যাটোয় যোগদানে রাশিয়ার আপত্তি যুক্তিযুক্ত

যা নিয়ে বাইডেন আর ট্রাম্পের মধ্যে বিশেষ ফারাক নেই তা হল ইজরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে যে গণহত্যা চালাচ্ছে তার প্রতি সমর্থন। সেই গণহত্যাকে কীভাবে মদত দেওয়া হয়েছে সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে, তা আমরা দেখেছি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলে হামাসের অতর্কিতে হানাকে অজুহাত হিসাবে খাড়া করে ইজরায়েল প্যালেস্তাইনে যে গণহত্যা শুরু করে তার প্রতি সমর্থন আদায় করতে ছড়িয়ে দিয়েছিল এই ভুয়ো খবর, যে হামাস শিশুদের মাথা কেটে নিয়েছে। এত জোরদার ছিল সেই প্রচার যে বাইডেন সাংবাদিক সম্মেলনে ওই দৃশ্য উল্লেখ করে বসেন। পরে হোয়াইট হাউসকে স্বীকার করতে হয় যে ভুল হয়েছিল। ওরকম কিছু আদৌ ঘটেনি।

জুকেরবার্গ যে বাকস্বাধীনতার ধ্বজা ওড়াচ্ছেন সেটা আসলে এরকম যাচ্ছেতাই মিথ্যা ছড়ানোর, ঘৃণা ছড়ানোর স্বাধীনতা। ট্রাম্পের আমলে যা হবে তা হল ট্রাম্প কখনোই বলবেন না, আমার ভুল হয়েছিল। ওরকম কিছু ঘটেনি। তিনি মিথ্যে কথা বলার রাজা, ঘৃণাভাষণের সম্রাট। প্রথমবার রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন একবার নিউইয়র্ক টাইমস তাদের প্রথম পাতা ভরে শুধু ট্রাম্পের মুখনিঃসৃত মিথ্যার তালিকা ছেপেছিল। সেই ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরেছেন। তাঁকে ফিরে আসতে সক্রিয় সাহায্য করেছে সোশাল মিডিয়া। অতঃপর তাঁর মিথ্যা, তাঁর ঘৃণা ছড়িয়ে দিতেও বিপুল বিক্রমে সাহায্য করবে তারাই। দুনিয়া জুড়ে যাবতীয় রাষ্ট্রীয় অন্যায়ে মদত দিয়ে আরও ফুলে ফেঁপে উঠবেন মাস্ক আর জুকেরবার্গ। যতই অভূতপূর্ব গরমের পর দাবানলে পুড়ে খাক হয়ে যাক লস এঞ্জেলস, সমুদ্র তীরবর্তী ম্যালিবু, হলিউডের অভিজাত অঞ্চল; সোশাল মিডিয়ায় মানুষকে বোঝানো হবে জলবায়ু পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। ও নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। কোনো দেশে বোঝানো হবে থালা বাসন বাজালেই অতিমারীর ভাইরাস পালাবে, মুসলমানরা ছয় বছর বয়স হলেই সন্ত্রাসবাদী হয়ে যায় – এইসব। আমার আপনার হাতের মগজ ধোলাই যন্ত্র আগামী দিনে আরও বেশি বেশি করে ভরে যাবে অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভুয়ো তথ্যে। সত্যের চেয়ে অর্ধসত্য বেশি মারাত্মক। সেই অর্ধসত্য এত বাড়িয়ে দেওয়া হবে বাকস্বাধীনতার নাম করে যে আমরা আর সত্য চিনতে পারব না। এদেশের সুপ্রাচীন জ্ঞানীদের কথা মানলে বলতে হয়, সত্যকে দেখতে পাব না মানে শিবকে দেখতে পাব না। শিবকে দেখতে পাব না মানে সুন্দরকে দেখতে পাব না। ফলে অবাধে কয়েকটা বড় বড় রাষ্ট্র দুনিয়া জুড়ে গণহত্যা চালাবে। একটার জায়গায় হয়ত দশটা হলোকস্ট হবে। পুতিন ক্রিমিয়া আর ইউক্রেনে হানা দিয়েছেন, নেতানিয়াহু প্যালেস্তাইনকে গণকবরে পরিণত করেছেন, ট্রাম্প হয়ত মেক্সিকো আর কানাডায় হানা দেবেন। ফলে চীন তাইওয়ানে হানা দিলেই বা কার কী বলার থাকতে পারে? কে বলে ইতিহাসের চাকা উল্টোদিকে ঘোরানো যায় না? দিব্যি তো ঔপনিবেশিক আমলের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছেন বড় বড় গণতন্ত্রের শাসকরা। কানাডাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম প্রদেশে পরিণত করব, গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্কের থেকে ছিনিয়ে নেব বলার পরেই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট স্বাধীন দেশ ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে ধরে দিতে পারলে ২৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার দেবে বলে ঘোষণা করেছে।

সোশাল মিডিয়া বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছিল। আমরা সেই ফাঁদে পড়ে গেছি। আমরা টের পাইনি কখন আমাদের যুক্তিবোধ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, প্রতিবাদ করার ইচ্ছা, প্রতিবাদ সংগঠিত করার ক্ষমতা – সব সেঁধিয়ে গেছে সোশাল মিডিয়ায়। ২০১০ সালে কায়রোর তাহরীর স্কোয়্যার থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে কলকাতার ধর্মতলা পর্যন্ত যত আন্দোলন সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়েছে, কোনোটার আহ্বান মাঠ ঘাট বন পেরিয়ে যায়নি। দুস্তর বাধা, প্রস্তর ঠেলে বন্যার মত পেরিয়ে যায়নি। যুগসঞ্চিত সুপ্তি সাড়া দেয়নি, হিমগিরি সূর্যের ইশারা শুনতে পায়নি। আমরা সোশাল মিডিয়ার বালুচরেই আশার তরণি বেঁধে ফেলেছি। এই লেখাও সোশাল মিডিয়াতেই শেয়ার করতে হবে। জুকেরবার্গ, মাস্কের সাহায্য ছাড়া আমরা বার্তা আদানপ্রদান করতে পারব না। বড়জোর ফেডিভার্স ব্যবহার করতে পারি বা ব্লুস্কাই-এর মত অন্য কোনো সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে যেতে পারি। কারণ সোশাল মিডিয়া আমাদের আসলে কাছাকাছি আনেনি। তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে, তারও দূরে সরিয়ে দিয়েছে। হাতের উপর হাত রাখার মন্ত্র আমরা ভুলে গেছি। আসলে আমরা হীরক রাজার দেশে ছবির সেই কৃষক, শ্রমিকদের মত হয়ে গেছি যারা বুঝতেও পারে না তারা অন্যদের দ্বারা চালিত। মগজ ধোলাই কথাটার যথার্থ ইংরিজি এতদিনে খুঁজে পেয়েছে অক্সফোর্ড ডিকশনারি – ব্রেন রট। ব্রেন ওয়াশিং নয়।

আরো পড়ুন হিন্দিভাষী ইউটিউবার যা করলেন, বাঙালিরা যা করলেন না

অস্বীকার করি না যে এই পচন আটকানোর উপায় কী, সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। কিন্তু এখনো যাঁরা ভাবছেন পেশাদার বা অপেশাদার সোশাল মিডিয়া পরিচালকদের দিয়ে রাজনৈতিক যুদ্ধ জয় করবেন বা অধিকার আদায় করবেন, তাঁদের দেখে হাসার শক্তিটুকু আছে। কারণ জুকেরবার্গ, মাস্ক, ট্রাম্প, পুতিন, নেতানিয়াহু, মোদীদের মহাজোট প্রতিবাদকে সোশাল মিডিয়ায় আবদ্ধ করে ফেলার লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে। পরবর্তী লক্ষ্য সেখানেও প্রতিবাদী স্বর স্তব্ধ করে দেওয়া। এই জোট দেখেছে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিকল্প সংবাদমাধ্যম, ইউটিউবাররা মোদীর চারশো পার আটকাতে কী ভূমিকা নিয়েছে। তারা দেখেছে ইজরায়েলি গণহত্যার বিরুদ্ধে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কীভাবে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বাইরে গিয়ে মেহদি হাসানের মত সাংবাদিকরা ইউটিউব চ্যানেল খুলে ফেলে সাংবাদিকতা করছেন।

ভারতে এসব আটকাতে মোদী সরকার নতুন আইনের খসড়া তৈরি করে ফেলেছে, সেই খসড়া প্রকাশ করতে অস্বীকারও করেছে। কোনো সন্দেহ নেই, অদূর ভবিষ্যতে ট্রাম্পও একই পথে এগোবেন। বস্তুত তিনি হুমকি দিয়েই রেখেছেন। নতুন আইন না করলেও অবশ্য ক্ষতি নেই। এঁদের বন্ধু জুকেরবার্গ, মাস্ক, পিচাইরা যে নিজেদের প্ল্যাটফর্মে বিকল্প সংবাদমাধ্যম থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দল – সকলেরই গলা টিপে ধরবেন তা নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। এমনিতেই চুপিসারে অনেক প্রোফাইলের রীচ কমিয়ে দেওয়া হয়, কোনো কোনো পোস্ট আপনা আপনি উধাও হয়ে যায়। দলবদ্ধভাবে রিপোর্ট করে দক্ষিণপন্থীদের অপছন্দের পোস্ট মুছিয়ে দেওয়া তো এখনই জলভাত। এসব এবার বাড়বে বৈ কমবে না। রাস্তাই যে একমাত্র রাস্তা সেকথা যত বেশিদিন রাজনৈতিক বিরোধীরা ভুলে থাকবে, ততদিন গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই প্রতিবিপ্লব চলছে চলবে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাঙালির ফেসবুক: চণ্ডীমণ্ডপ নেই বলে পরনিন্দা পরচর্চা করব না?

আজকাল তো ভারতের আদালতে বিচারকরাও পুলিসকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ তৈরি করার পরামর্শ দেন। আমরা বাঙালিরা আরও অসহায়। ফেসবুকে না থাকলে কাঞ্চন মল্লিকের বাবা হওয়া বা ইন্দ্রাণী হালদারের মোটা হওয়া নিয়ে আলোচনা করা হবে না।

ফেসবুককে আন্দোলনের হাতিয়ার বলে বহু মানুষ চিনেছিলেন কায়রোর তাহরীর স্কোয়ার থেকে আরম্ভ হওয়া মিশরের আন্দোলন থেকে। তাহরীর স্কোয়ারের আন্দোলনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট – দুটো আন্দোলনেই ফেসবুকের সাহায্য নিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। দুটোই ২০১১ সালের ব্যাপার। তারপর এক যুগ কেটে গেছে, হোয়াটস্যাপ আর ইনস্টাগ্রামও ফেসবুকের করতলগত হয়েছে। মানে ফেসবুক মোটা হয়েছে আর নাম বদলে মেটা হয়েছে। ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার্স ইনডেক্স বলছে মেটার মালিক মার্ক জুকেরবার্গ অ্যামাজনের মালিক জেফ বেজোসকে পিছনে ফেলে বিশ্বের দ্বিতীয় ধনীতম ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন। কিন্তু ফেসবুক আন্দোলনের হাতিয়ার – এমন কথা আজ বললে ঘোড়ায় হাসবে।

গুগল আর ফেসবুক – এই দুই প্রযুক্তি দানব নিজ নিজ ক্ষেত্রে একচেটিয়া ব্যবসা করে। দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই প্রাইভেসি লঙ্ঘন করা, মানুষের হাতের ফোন থেকে তারই অজান্তে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে। গুগল সিইও সুন্দর পিচাই আর জুকেরবার্গ – দুজনকেই আমেরিকা ও ইউরোপে আইনপ্রণেতাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। দুজনের কেউই অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ অপ্রমাণ করতে পারেননি। আপনাকে জানতে হবে অমুকটা অফ করে রাখা যায়, তমুকটা অফ করে রাখতে হয় – এই সব বলে আত্মরক্ষা করেছেন। তবে ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রাইভেসি লঙ্ঘনেই সীমাবদ্ধ নয়।

যেমন ২০২১ সালের মে মাসে ফেসবুকের প্রোডাক্ট ম্যানেজার ফ্রান্সেস হগেন পদত্যাগ করেন এবং পাতার পর পাতা আভ্যন্তরীণ নথি ফাঁস করে দেন। তা থেকে দেখা যায় যে ফেসবুক জেনেশুনে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় এমন পোস্ট চলতে দিয়েছে, ইথিওপিয়ার মত দেশে জাতিদাঙ্গায় উস্কানি দেওয়া আটকায়নি। সেবছর ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে যে দাঙ্গা করে মার্কিনী দক্ষিণপন্থীরা, তার আগে ভুয়ো তথ্য ছড়ানো আটকাতেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি ফেসবুক। হগেন বলেছিলেন যে ফেসবুকে চাকরি করার সময়ে তিনি দেখতে পান, বিশেষত আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে ফেসবুক মানুষ পাচারকারী এবং সশস্ত্র বাহিনীগুলোর অস্ত্র। ফেসবুক তা নিয়ে ভাবিতই নয়, কারণ তাদের লক্ষ্য কেবল মুনাফা করা। মানুষের যা ক্ষতি হয় হোক।

এমন অভিযোগ একা হগেনই করেননি, সারা বিশ্বে ফেসবুকের কার্যকলাপ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। ভারতেও পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা, সিরিল স্যামরা লেখালিখি করেছেন। ওঁদের লেখার অনুবাদ বাংলা ভাষায় সাংবাদিক অর্ক দেবের সম্পাদনায় ‘ফেসবুক: মুখ ও মুখোশ’ নামে বইতে প্রকাশিতও হয়েছে। বিজেপি, তৃণমূল সমেত ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে নির্বাচনের সময়ে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিতে বিপুল টাকা খরচ করে তাও প্রকাশিত তথ্য। তা বাদে বেনামি প্রোফাইল খুলে অন্য দলের নেতা-সদস্য-সমর্থকদের হয়রানি, হুমকি; ইদানীং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তাদের নামে প্রোফাইল বানিয়ে পোস্ট করা – এসব তো আছেই। ফেসবুক গোড়ার দিকে বাকস্বাধীনতার যুক্তি দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। হগেনের মত হুইসল ব্লোয়ার এবং বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের চাপে সাম্প্রতিককালে আরেক জনপ্রিয় সোশাল মিডিয়া টুইটারের (অধুনা এক্স) মতই কোনো পোস্টে হিংসা সম্পর্কে সতর্কবাণী দেওয়া, কোনো পোস্টে ভুয়ো হতে পারে বলে নোট দেওয়া – এসব চালু করেছে। কিন্তু অনেকসময় দেখা যায় অ্যালগোরিদম এমনভাবে সাজানো যে প্রতিবাদকে বিপজ্জনক বলে দাগানো হয় বা মুছে দেওয়া হয়, অন্যায়কে তোল্লাই দেওয়া হয়।

ফেসবুক এভাবেই চলে, এভাবেই চলবে। কারণ এটা বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, আর ব্যবসায়ী কখনো বিপ্লবী হয় না। সে সর্বত্রই সংখ্যাগুরুর, ক্ষমতাসীনের পক্ষে। নরেন্দ্র মোদী কী পরম স্নেহে জুকেরবার্গকে ‘মার্ক’ বলে ডাকেন তা কি আমরা দেখিনি? নাকি ভারতে ফেসবুক যাঁরা চালান তাঁদের সঙ্গে বিজেপির সখ্যের কাহিনি আমাদের চোখে পড়েনি? ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যম তো বটেই, বিশ্ববিখ্যাত ‘টাইম’ ম্যাগাজিন পর্যন্ত ভারতে ফেসবুক কীভাবে হিন্দুত্ববাদী ঘৃণা ভাষণকে প্রশ্রয় দেয় তা নিয়ে ২০২০ সালে দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তথ্যের খাতিরে বলা প্রয়োজন – এই সমস্ত অভিযোগই টুইটারের বিরুদ্ধেও আছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্যাঙাত ইলন মাস্ক মালিক হওয়ার পর অভিযোগের সংখ্যা আরও বেড়েছে।

আরও পড়ুন হিন্দিভাষী ইউটিউবার যা করলেন, বাঙালিরা যা করলেন না

এত কিছু সত্ত্বেও বাঙালির ফেসবুকের প্রতি অচলা ভক্তি যায়নি। বাঙালি মাত্রেই কবি এবং কবি মাত্রেই ফেসবুকে লেখেন। নামকরা কবিরা আবার ট্রেন্ডিং বিষয় নিয়ে ফেসবুকে কবিতা লেখেন। আজ অমুকের জন্মদিন, কাল তমুকের মৃত্যুদিন, পরশু অমুক নারকীয় ঘটনা ঘটেছে, তরশু অমুক অলিম্পিকে পদক জিতেছে – বাঙালির প্রিয় কবি সঙ্গে সঙ্গে লেখেন। সম্প্রতি আবার কপিল শর্মার কমেডি শোতে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে হাসাহাসি করা হয়েছে বলে আহত হয়ে পোস্ট দিয়েছেন, আইনি ব্যবস্থার নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। মাঝেমাঝে ভয় হয়, ফেসবুক না থাকলে বাঙালির কবিতা লেখাই বোধহয় বন্ধ হয়ে যাবে।

শুধু সাহিত্যচর্চা করলেও কথা ছিল, বাঙালি এখনো আন্দোলনের ডাক দেয় ফেসবুকে। মানুষ তাতে সাড়া দেন এবং দলীয়, অদলীয় সব ধরনের আন্দোলনকারীরই ধারণা হয়েছে যে ফেসবুকে ডাক না দিলে সাড়া পাওয়া যাবে না। তাই রাত দখল, ভোর দখল, দুপুর দখল, রাস্তা দখল – সব ডাকই ফেসবুকেই দেওয়া হয়। এর দাপটে ভোটের সময়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করাও পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীরা কমিয়ে ফেলেছেন। বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে প্রার্থী যাবেন, ফেসবুক লাইভ হবে, তাতে কয়েক লক্ষ লাইক পড়বে। সেই লাইক গুনে বিরোধীরা ভাববেন অমুক কেন্দ্রে আমরা জিতছিই, তমুক কেন্দ্রে দারুণ লড়ব, তারপর ফল বেরোলে দেখা যাবে ভাঁড়ে মা ভবানী, কারণ আপামর মানুষের সঙ্গে কোনো যোগ স্থাপনই হয়নি – এটাই পশ্চিমবঙ্গের নিয়ম হয়ে গেছে। ফলে রাজ্যটা প্রায় একদলীয় শাসনে পরিণত হয়েছে। অদলীয় এবং দলীয় রাজনীতিবিদরা খেয়াল করেন না যে সারা পৃথিবীতে ফেসবুক (ব্যাপকার্থে সোশাল মিডিয়া) এই কাণ্ডটাই ঘটিয়েছে। ফলে দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকে অপরাজেয় মনে হচ্ছে। ট্রাম্প, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, মোদী, মমতা – সকলেই যে এই ফেসবুক সর্বস্বতায় লাভবান হচ্ছেন তা কিন্তু অন্যত্র অনেকে বুঝে ফেলেছেন। ফলে ২০২১ সালে হগেন মুখ খোলার পর বিশ্বজুড়ে ফেসবুক ছেড়েছেন অনেক মানুষ। ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ আস্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ফেসবুক ছাড়লে আর কী কী সোশাল মিডিয়া বিকল্প আছে তা নিয়ে। অনেকেই ফেসবুক, টুইটার ছেড়ে বা এগুলোতে সময় খরচ কমিয়ে ফেডিভার্সে চলে গেছেন। সেটা কী? নিজে খুঁজে দেখুন।

ফেসবুক বিশ্বজোড়া এমন ফাঁদ পেতেছে যে বেরনো শক্ত। নিজেদের ওয়েবসাইট চালাতে গিয়ে দেখেছি, ফেডিভার্সে আমাদের লেখা শেয়ার করে লাভ হয় না। কারণ বাঙালি পাঠক কিছুতেই সেখানে যেতে চান না। মেসেজিংয়ের বেলাতেও একই সমস্যা। বাঙালি, অবাঙালি কোনো পরিচিতকেই টেলিগ্রাম বা সিগনাল ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা যায় না। আজকাল তো ভারতের আদালতে বিচারকরাও পুলিসকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ তৈরি করার পরামর্শ দেন। আমরা বাঙালিরা আরও অসহায়। ফেসবুকে না থাকলে কাঞ্চন মল্লিকের বাবা হওয়া বা ইন্দ্রাণী হালদারের মোটা হওয়া নিয়ে আলোচনা করা হবে না। চণ্ডীমণ্ডপ নেই বলে পরনিন্দা পরচর্চা করব না?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

টুইটার, বাইজু’স আঁধারে ছাঁটাই সম্পর্কে কয়েকটি কথা

ভারতের সাদা কলারের কর্মীদের কাছে গত তিরিশ বছরে ইউনিয়ন এমন একটি শব্দে পরিণত হয়েছে যা শুনলে কানে গঙ্গাজল দিতে হয়, অবেলায় স্নান করতে হয়।

দিকে দিকে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে, টুইটারে ছাঁটাই পর্ব উঠেছে চরমে। এতদিনে সবাই জেনে গেছেন, প্রায় হাজার চারেক লোককে ইতিমধ্যেই ছাঁটাই করেছেন ইলন মাস্ক। চুয়াল্লিশ বিলিয়ন ডলারে টুইটার কিনে নেওয়ার পর কর্মীদের ইমেল করে তিনি জানিয়েছেন টুইটারের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে গেলে নাকি ছাঁটাই করা ছাড়া উপায় নেই। কারণ, শুক্রবার তাঁর করা একটি টুইট থেকে জানা যাচ্ছে, টুইটার প্রতিদিন চার মিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সান্ত্বনা দেওয়ার ঢঙে সেই টুইটে যোগ করেছেন, যাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে তাদের তিন মাসের বিদায়ী ভাতা (severance) দেওয়া হচ্ছে। আইনত যা দেওয়ার কথা, সে ভাতা নাকি তার ৫০% বেশি। যে কোম্পানি দৈনিক চার মিলিয়ন ডলার ক্ষতিতে চলে সে কোম্পানি কেনার জন্য ইলন এত লাফালাফি কেন করেছিলেন সে প্রশ্ন থাক। তিনি যে টুইট মডারেশনে যুক্ত আস্ত বিভাগগুলোকেই কর্মী ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে তুলে দিচ্ছেন, তার ভুয়ো খবর, হিংসাত্মক বাচনের উপর কী প্রভাব পড়বে এবং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব কী হবে – সে আলোচনাও অন্য দিনের জন্য তোলা থাক। বরং আরেকটি ছাঁটাইয়ের ঘটনার দিকে নজর দেওয়া যাক।

শাহরুখ খানের ওকালতি এবং বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মাদের জামায় জ্বলজ্বলে লোগোর কারণে বাইজু’স নামটি এখন কারোর জানতে বাকি নেই। অনলাইনে লেখাপড়া করিয়ে ছেলেমেয়েদের সব পরীক্ষায় দারুণ নম্বর পাইয়ে দেবে – এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাইজু রবীন্দ্রনের এই এডটেক স্টার্টআপ চালু হয়েছে মাত্র কয়েক বছর হল। এরই মধ্যে এত উন্নতি করেছে যে ভারতীয় ক্রিকেট দলের শার্ট স্পনসর হয়েছে, চলতি ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির অ্যাসোশিয়েট স্পনসর হয়েছে। উপরন্তু, দিন দুয়েক হল নিজেদের এক ‘নন-প্রফিট’ উদ্যোগের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করেছে লায়োনেল মেসিকে। খেয়াল করুন, সুনীল ছেত্রীকে নয়, ক্রিকেট তারকাদের কাউকেও নয়, একেবারে মেসি। মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার যাকে বলে। অথচ এই বাইজু’সই সেপ্টেম্বর মাসে ঘোষণা করেছিল তারা আড়াই হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে। কারণ গত চার বছরে কোম্পানির যে বিপুল বৃদ্ধি হয়েছে তার ফলে কোম্পানির বৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে এছাড়া উপায় নেই। এই যুক্তি গত সোমবার (৩১ অক্টোবর) এক লিঙ্কডইন পোস্টে বাইজু’স দিয়েছিল। এই টেকসই করে তোলার অঙ্গ হিসাবেই তিরুবনন্তপুরমের টেকনোপার্কে বাইজু’সের অফিস তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এতে ১৪০ জন কর্মীর চাকরি যেত। কিন্তু কোম্পানির সংগঠিত কর্মীরা এবং কেরালা সরকার সে গুড়ে বালি দিয়ে দিয়েছেন। বুধবার (২ নভেম্বর) মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এবং রাজ্যের লেবার কমিশনার ডক্টর বাসুকির সাথে বাইজু রবীন্দ্রনের বৈঠকের পর ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। টেকনোপার্কের কর্মী সংগঠন প্রতিধ্বনি টেকনোপার্ক হপ্তাখানেক আগে কেরালার শ্রমমন্ত্রী ভি শিবনকুট্টির সঙ্গে নিজেদের পরিস্থিতি জানিয়ে সাক্ষাৎ করে। এক সপ্তাহের মধ্যেই হাতেনাতে ফল পাওয়া গেল।

টুইটার আর বাইজু’সের ছাঁটাইয়ের ঘটনা পরপর ঘটায় একটি সুবিধা হয়েছে। এ দেশের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত মানুষ ছাঁটাইয়ের বিভীষিকা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছেন, অনবরত কথাবার্তা বলছেন সোশাল মিডিয়ায়। ফলে সচরাচর ছাঁটাইয়ের পক্ষে যেসব যুক্তি তাঁরা দিয়ে থাকেন সেগুলোর বৈধতা নিয়ে আলোচনা করার পরিসর তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক উদারীকরণের যুগে সারা ভারতে (কেবল পশ্চিমবঙ্গে নয়) বহু কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ঠিক কত শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন তার হিসাব কোনো রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমমন্ত্রকও দিতে পারবে বলে মনে হয় না। ঠিক কত মানুষ কৃষিকাজ অলাভজনক হয়ে যাওয়ায় প্রবাসী শ্রমিক (পরিযায়ী শ্রমিক কথাটা অশ্লীল। কলকাতাবাসী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বেঙ্গালুরুতে চাকরি করতে গেলে তাকে পরিযায়ী ইঞ্জিনিয়ার বলি কি?) হয়ে গেছেন তার হিসাবও যেমন দেশের সরকার রাখে না। ভাগ্যিস অতিমারী এল! নইলে তো আমরা মনে করতাম শ্রমিকদের জীবন মৃত্যুর হিসাব রাখে দেশের সরকার ঘটনা হল, ও হিসাব আমরাও রাখি না। ফলে ছাঁটাইয়ের হিসাব রাখারও প্রশ্ন ওঠে না। কারণ আমরা যারা গাঁটের কড়ি খরচ করে খবরের কাগজ পড়ি, টিভিতে খবর দেখি বা হাতের স্মার্টফোনে ফেসবুক টুইটার দেখি এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে খবর সংগ্রহ করি – তাদের বাড়ির লোকেরা সাধারণত কারখানার লে অফে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, পশ্চিমবঙ্গ থেকে মহারাষ্ট্রে নির্মাণ শ্রমিক হয়েও তাদের যেতে হয় না। কিন্তু আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরাই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাঙ্কার, অ্যাকাউন্ট্যান্ট ইত্যাদি হয়। মাইক্রোসফট, গুগল, মেটা, টুইটার বা অ্যামাজনে চাকরি পেলে আমরা শতমুখে তা বলে বেড়াই। সুন্দর পিচাই, সত্য নাডেলা বা পরাগ আগরওয়ালকে দেখে আমাদের চোখ চকচক করে। মনে হয় আমার বাড়ির ছেলেটিও তো একদিন ওই উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। ফলে যে লে অফ দেশের হাজার হাজার বন্ধ কারখানার শ্রমিকের দরজায় আতঙ্কের উপর্যুপরি ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়তে পড়তে অবশেষে গা সওয়া হয়ে গেছে গত ৩০ বছরে, সেই লে অফ ইলনের কল্যাণে অবশেষে হ্যাশট্যাগ হয়ে আমাদের ঘুম কেড়ে নিতে পেরেছে।

ঘুম ছুটে যাওয়া অনেকসময় ভাল, কারণ তাতে গা ঝাড়া দিয়ে জেগে ওঠা যায়। আমরা সাদা কলারের শ্রমিকরা (হ্যাঁ, শ্রমিকই। সেটা ছাঁটাই হওয়া মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পান) সেই নয়ের দশক থেকে ছাঁটাই সম্বন্ধে যা জেনে এবং বিশ্বাস করে এসেছি, টুইটার ও বাইজু’সের ছাঁটাইয়ের আঁধারে আসুন সেগুলিকে প্রশ্ন করি। প্রথমত, আমরা জানি যে ছাঁটাই কখনো এমনি এমনি করা হয় না। করা হয় ব্যবসার প্রয়োজনে। কীরকম প্রয়োজন? ইলন বলছেন কোম্পানি বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বলে ছাঁটাই করা প্রয়োজন, বাইজু বলেছেন কোম্পানির বিপুল বৃদ্ধি হয়েছে বলে ছাঁটাই করা প্রয়োজন। দুজনেই সত্যবাদী যুধিষ্ঠির ধরে নিয়েই এগোনো যাক।

প্রথম জন স্বেচ্ছায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে একটি কোম্পানিকে কবজা করলেন, তারপর আবিষ্কার করলেন সে কোম্পানি লাভজনক নয়। তাই তিনি লে অফ করবেন। দ্বিতীয় জনের বয়ান অনুযায়ী, ব্যবসা প্রত্যাশার চেয়ে বড় হয়ে গেছে, তাই মুনাফা করতে হলে ছাঁটাই করা ছাড়া উপায় নেই। ইলনের ইচ্ছে হয়েছিল বলে টুইটার কিনেছিলেন, এখন দেখছেন সামলাতে পারবেন না। তার খেসারত দিতে হবে হাজার চারেক কর্মচারীকে। বাইজুর ইচ্ছে হয়েছিল বলে গত বছর আকাশ ইনস্টিটিউট কিনে নিয়েছিলেন। তার মার্কেটিং এবং ক্যাম্পেনের জন্য ৭.৫% হারে ৩০০ কোটি টাকা ধারও নিয়েছেন গত মাসে। তার আগে বর্তমান লগ্নিকারীদের থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থও সংগ্রহ করেছেন। এদিকে রাজস্ব আদায় নাকি আগের বছরের ১,৯১৮.২৫ কোটি টাকা থেকে কমে ২০২১ আর্থিক বর্ষে ১,৩৭৮.৫১ কোটি টাকা হয়ে গেছে। অথচ মেসির পারিশ্রমিক দেওয়া যাচ্ছে, কর্মীদের চাকরি না খেলে চলছে না। অর্থাৎ দুই ধনকুবের কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত গানের মত “খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে/বিরাট শিশু আনমনে”। তাঁরা কেবল নিজের টাকা নিয়ে নয়, হাজার হাজার কর্মচারীর বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও খেলবেন। খেলতে খেলতে যখন মনে হবে যথেষ্ট মজা (অর্থাৎ মুনাফা) হচ্ছে না, তখনই ছাঁটাই করবেন। যুক্তিটা নিজের মত করে বানিয়ে নেবেন আর আপনি যেহেতু বিশ্বাস করেন ছাঁটাই বিনা কারণে হয় না, তাই আপনি নিজে লেড অফ হলেও মাথা নেড়ে বলবেন “সত্যিই তো। ব্যবসার স্বার্থে তো এটা করতেই হবে।”

কর্মী ছাঁটাই করে বা ‘পে কাট’ করে বৃহৎ পুঁজির ব্যবসার কতখানি স্বার্থরক্ষা হয় সে সম্পর্কে আরেকটি উদাহরণ দিই। এই উদাহরণ অতীতেও দিয়েছি, কিন্তু বধিরদের শোনাতে বিস্ফোরণের প্রয়োজন হয়। এক বিস্ফোরণে কাজ না হলে বারবার বিস্ফোরণ ঘটাতে হয়। ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি ভারতের অন্যতম বৃহৎ মিডিয়া হাউসের মালিকানাধীন একটি খবরের কাগজ সম্পাদকীয় পাতায় এক দীর্ঘ প্রবন্ধে লিখেছিল, সংবাদপত্র শিল্প বিপন্ন এবং তাকে বাঁচাতে হলে সরকারি সাহায্য প্রয়োজন এবং কর্মী সংকোচন ছাড়া উপায় নেই। কারণ কর্মচারীদের মাইনে দিতে বিপুল খরচ হচ্ছে। ২১ তারিখে দিল্লির সাংবাদিকদের সংগঠন দিল্লি ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্টসের সভাপতি এস কে পাণ্ডে এবং সাধারণ সম্পাদক সুজাতা মাধোক এক লিখিত বিবৃতিতে জানান, ভারত সরকারের কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রককে কোম্পানিগুলি যে হিসাবপত্র জমা দেয় তাতে দেখা যাচ্ছে, ওই মিডিয়া হাউসের বাৎসরিক আয় আনুমানিক ৪৮০০ কোটি টাকা আর বেতন বাবদ খরচ করে প্রায় ৫৫১ কোটি টাকা, অর্থাৎ আয়ের মাত্র ১১%। উপরন্তু ওই ৫৫১ কোটির ১০২ কোটি খরচ হয় মাত্র ৪০ জনকে মাইনে দিতে। এই মিডিয়া হাউসটি পরে অতিমারীর সময়ে এক বড় অংশের সাংবাদিক এবং অসাংবাদিক কর্মীদের ছাঁটাই করে এবং যাদের ছাঁটাই করা হয়নি তাদেরও মাইনে কমিয়ে দেয়।

যে কোনো কর্পোরেট, তার ব্যবসা যা-ই হোক, এরকম বেতন কাঠামোতেই চলে। তাহলেই বুঝুন, কর্মী ছাঁটাই করলে ব্যবসার কতটুকু স্বার্থরক্ষা হয়।

এবার ছাঁটাই সম্বন্ধে দ্বিতীয় বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা যাক – ছাঁটাই হয় উদ্বৃত্ত, অযোগ্য লোকেরা।

আগেই বলেছি, লে অফ খেলা ছাড়া কিছুই নয়। বুঝে নেওয়া দরকার, যে এ খেলার গোলপোস্ট বসায় মালিক পক্ষ, ইচ্ছা অনুযায়ী বড় ছোটও করে মালিক পক্ষই। সুতরাং কে প্রয়োজনীয় আর কে উদ্বৃত্ত, কে যোগ্য আর কে অযোগ্য – তা-ও ঠিক হয় মালিক পক্ষের ইচ্ছানুযায়ী। সে ইচ্ছা যে নিতান্ত যুক্তিহীন, তা অবশ্য নয়। যুক্তিটা কী? যুক্তি হল মালিক সে বছর কতটা মুনাফা করতে চাইছেন। যদি চাহিদা খুব বেশি হয়, তাহলে প্রমাণ করা হবে উঁচু পদের বিরাট অঙ্কের বেতন পাওয়া কর্মচারীরা উদ্বৃত্ত। নইলে প্রমাণ করা হবে নিচুতলার এবং মাঝের সারির কর্মীরা উদ্বৃত্ত। এই কারণেই ২০০৮-০৯ সালের আর্থিক মন্দার সময়ে ভারতের বহু তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিতে উচ্চপদস্থদেরই চাকরি গিয়েছিল। আবার ২০১৯-২১ সময়কালে ভারতের সংবাদমাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ ছাঁটাই হয় সেখানে কোনো মিডিয়া হাউস বিদায় করেছিল মাসে কয়েক লক্ষ টাকা মাইনে পাওয়া সম্পাদকদের, কোনো হাউস আবার ওসব বাছবিচার না করে কাগজের আস্ত সংস্করণ, আস্ত চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছিল।

এ তো গেল উদ্বৃত্তের কথা। আর যোগ্যতা? আমাদের অনেকেরই ধারণা, ছাঁটাই হয় কেবল অযোগ্য কর্মীরা। কখনো ভেবে দেখেছেন, যে অযোগ্য তাকে চাকরিতে নেওয়া হয়েছিল কেন? অতীতে ভারতে যখন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সমস্ত শিল্পেই জোরদার ছিল, তখন বলা হত ট্রেড ইউনিয়নের চাপে নাকি দরকারের চেয়ে বেশি লোক নিতে হয়েছিল, অযোগ্য লোক নিতে হয়েছিল। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তো সরাসরি অভিযোগ, স্বাধীনতার পর থেকেই রাজনৈতিক কারণে বহু উদ্বৃত্ত কর্মচারী নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর থেকে সাদা কলারের চাকরিতে ইউনিয়ন তো কার্যত উঠে গেছে। সমস্ত কর্পোরেট অফিসে বাহারি এইচ আর ডিপার্টমেন্ট রয়েছে। তারা প্রায় সেকালের পাত্রী দেখার মত “চুল খুলে দেখাও তো মা”, “হেঁটে দেখাও তো মা” পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ করে। এতৎসত্ত্বেও এত অযোগ্য কর্মী আসে কোথা থেকে? তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক, তারা ইন্টারভিউয়ে চালাকি করে ঢুকে পড়ে। যদি বা পড়ে, তারা যে অযোগ্য সে কথা কোম্পানির মুনাফার ক্ষিদে বেড়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত কারোর খেয়াল হয় না কেন? অনেকসময় ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সর্বশেষ আভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে যে কর্মচারী ভাল রেটিং পেয়েছে সে-ও ছাঁটাই হয়ে গেল। কী করে এমন ঘটে?

আসলে যোগ্যতার গোলপোস্টও মালিক পক্ষের মর্জিমাফিক সরিয়ে ফেলা হয়। নইলে পৃথিবীর সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করা এবং প্রশিক্ষণ নেওয়া যে ইঞ্জিনিয়াররা এত বছর ধরে টুইটার চালাচ্ছিলেন তাঁরা রাতারাতি এই শুক্রবার অযোগ্য হয়ে গেলেন কী করে?

আরও পড়ুন যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে

ছাঁটাই সম্পর্কে আমাদের ধারণার পরিবর্তন প্রয়োজন – এই মর্মে এত দীর্ঘ আলোচনা ফেঁদেছি কেন? কারণ এর পরিবর্তন না ঘটালে যাঁরা এখনো ছাঁটাই হননি তাঁরাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বেন অদূর ভবিষ্যতে। অতিমারীর সময়ে যখন চারদিকে বিভিন্ন শিল্পে লে অফ আর পে কাট চলছে, আমার এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার প্রতিবেশী সগর্বে বলেছিলেন “আমার চিন্তা নেই। আমি জানি আমার যোগ্যতা আছে। একটা গেলে আরেকটা ঠিক পেয়ে যাব।” কেবল অযোগ্য লোকেরা ছাঁটাই হয় – এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে গেলে ওরকম অকারণ নিরাপত্তায় ভোগা অসম্ভব নয়। টুইটার, গুগল, মেটা ইত্যাদি হল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বড় কোম্পানি। তারা যে দৃষ্টান্ত তৈরি করে তা-ই বিশ্বের সর্বত্র অনুসরণ করে থাকে ছোট, বড়, মাঝারি কোম্পানিগুলি। সুতরাং কোনো কর্পোরেটের কোনো কর্মচারীই যে নিরাপদ নন তা বুঝে নেওয়ার সময় এসেছে। অনুসিদ্ধান্ত হিসাবেই বুঝতে পারা উচিত যে লে অফের আসল কারণ, কোনো শিল্পেই, ব্যবসা বাঁচানো নয়। দীর্ঘকাল বলা হত শ্রমিক আন্দোলনের জন্য, ধর্মঘট, পেন ডাউন ইত্যাদির জন্য ব্যবসার ক্ষতি হয়। ফলে ছাঁটাই করতে হয়, শিল্প তুলে দিতে হয়। তা তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে বা সংবাদমাধ্যমে তো ওসব বালাই নেই। ধর্মঘটই বা কোথায়? তবু কেন শিল্প নড়বড়ে? কেন ছাঁটাই করতে হচ্ছে?

সুতরাং ছাঁটাইয়ের আসল কারণ হল মুনাফা বাড়ানো। কত বাড়ানো? এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই, কারণ মালিকের লোভের কোনো শেষ নেই। যে কোনো স্তরের কর্পোরেট কর্মচারীই জানেন, আজকাল পরের আর্থিক বর্ষের ব্যবসার লক্ষ্যমাত্রা স্থির হয় আগের বছরের মুনাফা অনুযায়ী। আগেরবারের চেয়ে বেশি মুনাফা না করা গেলেই হিসাবে ক্ষতি লেখা হয়। অর্থাৎ লাভ-ক্ষতির সংজ্ঞাই বদলে ফেলা হয়েছে পুঁজির হাঙরের ক্ষিদে মেটানোর জন্য। এই ক্ষিদে যে কোনোদিন আপনাকেও গিলে নেবে। আপনার যোগ্যতা আপনার বর্ম নয়।

লোক কমিয়ে মুনাফা বাড়ানোর আরও উৎকৃষ্ট পন্থা মালিকদের নজরে পড়ে গেছে ইতিমধ্যেই। তার নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। বিজ্ঞান, প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে স্বয়ংক্রিয়তা (automation)। সেই ধারাবাহিকতাতেই এসে পড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কম্পিউটারের আগমনে কিছু মানুষের কাজ গিয়েছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলেও যাবে। সবাইকে তৈরি থাকতে হবে। যে প্রশ্নের উত্তর নেই সে প্রশ্ন তোলা চলবে না – এরকম গা জোয়ারি চিন্তায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। সে অভ্যাস থেকে বেরোতে আমাদের বাধ্য করবে অদূর ভবিষ্যৎ। তখন নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে, কোথাও কি থামা উচিত? প্রযুক্তি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ প্রযুক্তির জন্য? স্বয়ংক্রিয়তা তো আবিষ্কৃত হয়েছিল মানুষের ভার লাঘব করার জন্য? মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়া কি স্বয়ংক্রিয়তার কাজ? এসব প্রশ্ন তখন তুলে কোনো লাভ হবে না, কারণ অর্থনীতি এবং শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা আমরা অনেকদিন হল ছেড়ে দিয়েছি।

একা একা মৌলিক প্রশ্ন তুলে অবশ্য কোনোদিনই কোনো লাভ হয়নি। তিরুবনন্তপুরমের বাইজু’স কর্মীরা ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করাতে পেরেছেন একজোট হয়েছেন বলে। সম্প্রতি আমাদের স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় অ্যামাজনের কর্মীরাও লড়াই করে ইউনিয়ন করার অধিকার আদায় করেছেন। কিন্তু ভারতের সাদা কলারের কর্মীদের কাছে গত তিরিশ বছরে ইউনিয়ন এমন একটি শব্দে পরিণত হয়েছে যা শুনলে কানে গঙ্গাজল দিতে হয়, অবেলায় স্নান করতে হয়। ইউনিয়ন করবে চটকলের শ্রমিকরা; বড়জোর সুইগি, জোম্যাটো, ফ্লিপকার্টের ডেলিভারি বয়রা; উবের, ওলার ড্রাইভাররা। সাদা কলারের সম্ভ্রান্তবংশীয়রা হাড়িকাঠে গলা দিয়ে বেচারা জল্লাদের বাঁচার প্রয়োজন বিবেচনা করে সসম্মানে বলি হবেন।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত