শ্রীমালবিজয়: রক্তাক্ত প্রথম উপন্যাসে অকুতোভয় পরীক্ষা

অভিষেক ঝা সম্পাদিত ‘ত্রস্তের শিকড়বাকড়’ নামের সেই সংকলনের পৃষ্ঠ প্রচ্ছদে লেখা হয়েছিল ‘সৃষ্টি ও কৃষ্টির বেলোয়ারী ধারণা, বিবিধের মাঝে মিলনমহান ভারতরাষ্ট্রের সফেদ পোশাকে এই বই হলুদ মূত্রদাগ।’ ভারতেরই আরেক অঞ্চলে স্থাপিত অন্য এক জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত সিন্ধুর উপন্যাসকেও একই আখ্যা দিলে ভুল হবে না।

একজন বিজ্ঞানী আর একজন সাহিত্যিক – দুজনেই পরীক্ষানিরীক্ষা চালান। তফাত হল, বিজ্ঞানীর পরীক্ষা সফল না ব্যর্থ তা তিনি টের পেয়ে যান হাতেনাতে, স্বীকৃতিও পান অনতিবিলম্বে। সাহিত্যে কোন পরীক্ষা সফল আর কোন পরীক্ষা ব্যর্থ তা ঠিক করে দেবে কে? ফলে সাহিত্যিককে সাফল্যের জন্যে সারাজীবন অপেক্ষা করতে হয়। এমনও হতে পারে, জীবদ্দশায় তাঁকে কেউ সফল বলে মানল না, স্বীকৃতি পেলেন মৃত্যুর পর। জীবনানন্দ দাশ যতই লিখুন ‘মানুষটা মরে গেলে যদি তাঁকে ওষুধের শিশি/কেউ দেয়, বিনি দামে, তাতে কার লাভ…’, সাহিত্যিক মরণোত্তর স্বীকৃতিকে অগ্রাহ্য করতে পারেন না। বিজ্ঞানীর পরীক্ষার পরীক্ষক প্রকৃতি। নম্বর দেন তখনই। সাহিত্যিকের পরীক্ষক কাল। তিনি এক লেখাই বারবার দেখেন। আজ যে লেখায় একশোয় একশো দিলেন, পরে সেই লেখাকে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দিতে পারেন। আবার বহুদিন ডাস্টবিনে পড়ে থাকা লেখা তুলে এনে লেটার মার্কস বসিয়ে দিতে পারেন। গ্যালিলিও বা টেস্টটিউব বেবির আবিষ্কারক সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের উল্লেখ করে কেউ বলতেই পারেন যে বিজ্ঞানীদেরও সর্বদা স্বীকৃতি জীবদ্দশায় জোটে না। কিন্তু সমকালের স্বীকৃতি না পেলেও, প্রকৃতি যে তাঁকে জয়যুক্ত করেছে তা একজন বিজ্ঞানীর কাছে গোপন থাকে না। তাই তো কথিত আছে, গ্যালিলিও নাকি অর্ধোন্মাদ অবস্থাতেও বলতেন ‘কিন্তু পৃথিবী ঘুরছে’। সাহিত্যিক এই স্বস্তিটুকুও পান না। সুতরাং সিন্ধু সোম তাঁর প্রথম উপন্যাস শ্রীমালবিজয়-এ যে পরীক্ষা চালিয়েছেন, তা সফল না ব্যর্থ সে আলোচনায় যাব না। কিন্তু শুরুতেই বলে নেওয়া যাক, শুধু এই পরীক্ষাটা চালানোর জন্যেই তাঁর প্রশংসা প্রাপ্য। একশো আটান্ন পাতার এই উপন্যাসে লেখক শুধু চরিত্রগুলোর নয়, নিজেরও রক্ত ঝরানোর স্পর্ধা দেখিয়েছেন। নিজের লেখাকে নিজেই বলেছেন ‘একটি আনখাই গদ্যপাঁচালি’।

এই গদ্যপাঁচালির মূল স্পর্ধা গদ্যে। কথক তথাকথিত মান্য বাংলাকে পাত্তা না দিয়ে কখনো লিখেছেন বরাকর উপত্যকার মালদের ভাষায়। ওই স্থানীয় ভাষায় স্বভাবতই মিশেছে ওই এলাকার নানা জনগোষ্ঠীর ভাষা। এ ভাষা পড়তে অপরিচিত পাঠককে প্রথমদিকে হোঁচট খেতে হবে। হোঁচট খেতে খেতে এগোবার উদ্যম থাকলে এই মালভূমির ভূপ্রকৃতি একসময় সড়গড় হয়ে আসবে, পরিচিত সমভূমিতেও গিয়ে পড়বেন একসময়। কিন্তু সেখানে নিয়ে গিয়েও লেখক পাঠককে ভুলতে দেন না আসলে কোন অশান্ত ভূমিতে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। কথক মাল যুবক তো আর নাগরিক জীবন থেকে বিযুক্ত নয়, তাকে শিল্পী হওয়ার চেষ্টা করতে হয় প্রমিত বাংলা বলা সমাজের মধ্যেই। কোন মানুষের বেড়ে ওঠাই বা একান্ত নিজের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ? তাই তার ভাবনার ভাষায় মিশেই থাকে নিজস্ব ভাষা আর মান্য ভাষা। কিন্তু গোটা উপন্যাসে মান্য ভাষায় লেখা অংশগুলোতেও অন্তত সমাপিকা ক্রিয়ার ব্যবহারে লেখক ধরে রেখেছেন স্থানীয় ভাষা। যাইনি নয়, ‘যাই নাই’। দেখিনি নয়, ‘দেখি নাই’। এই একরোখামি চিনিয়ে দেয় লেখকের রাজনীতিকে, তাঁর স্পর্ধাকে।

সাম্প্রতিক অতীতে পশ্চিমবঙ্গে আসামের বাঙালি বিস্তর আলোচিত হয়েছিল আসামে ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস (এনআরসি) তৈরি প্রসঙ্গে। অধুনা বাংলাদেশে শিকড় থাকা মানুষকে বেনাগরিক করে দেওয়ার সেই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে কোণঠাসা করার চেষ্টা হয়েছিল ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের। দীর্ঘকাল ধরেই তাঁরা অসমিয়াদের চক্ষুশূল, তাঁদের বলা হয় মিঞা। তাঁরা সগর্বে কবিতা লেখেন নিজেদের মুখের ভাষায়, যাকে আলাদা করে মিঞা কবিতা বলার চল আছে। সে ভাষাকে রাষ্ট্রের এতই অপছন্দ (নাকি ভয়?) যে মিঞা কবিদের নামে এফআইআর হয়, গ্রেফতারও হতে হয়। ২০১৯ সালে সেই মিঞা কবিতার একখানা সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ থেকে। অভিষেক ঝা সম্পাদিত ত্রস্তের শিকড়বাকড় নামের সেই সংকলনের পৃষ্ঠ প্রচ্ছদে লেখা হয়েছিল “সৃষ্টি ও কৃষ্টির বেলোয়ারী ধারণা, বিবিধের মাঝে মিলনমহান ভারতরাষ্ট্রের সফেদ পোশাকে এই বই হলুদ মূত্রদাগ।’ ভারতেরই আরেক অঞ্চলে স্থাপিত অন্য এক জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত সিন্ধুর উপন্যাসকেও একই আখ্যা দিলে ভুল হবে না।

এও এক বিক্ষুব্ধ জনপদ। এখানে মিশে রয়েছে নানা জনগোষ্ঠী, যাদের মধ্যে কখনো রক্তাক্ত সংঘাত চলে, কখনো শান্তিকল্যাণ। তবে সিন্ধুর কলমে তারা স্বনামে নেই সর্বদা। বাস্তব আর জাদুবাস্তব আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে যেভাবে প্রবল হিংসার রক্তে মাখামাখি ছবি এঁকেছেন লেখক, তাতে আপনাকে মৃত্যু উপত্যকার বাসিন্দাদের চিনে নিতে হবে লক্ষণ দেখে। যেমন

তখন উদ্বাস্তু বস্তি বা অজাতকুজাত পাড়া, কোনোটারই অবস্থা খুব একটা ভালো না। আকাশ মাঝে মাঝেই গরুড়ের ছায়ায় ছল ছল করে উঠছে! মাটিতে তার ছায়াটা স্পষ্ট হলেও আকাশ থেকেই সে রওনা দেয় বলে বোধহয় আকাশে সেই মৃদু অন্ধকারের কোনো লেশ পাওয়া যায় নাই কোনদিন! অন্তত আমি তো দেখি নাই! এককালে হয়তো যেত! তখন মূল কায়ার বিভীষিকা ছায়া অবধি গড়িয়ে নামত না। কিন্তু এই কালে বস্তির বাচ্চাগুলো পর্যন্ত নিজের ছায়ার সঙ্গে খেলতে ভয় পায়। মানুষ নিজের ছায়া দেখে আঁতকে উঠে কাপড় চোপড় সামলে রাখে। বিশ্বাসঘাতকের গন্ধ ভাসে বাতাসে বাতাসে। কলজে পোড়া গন্ধ তার বড়ই খোশবু আনে আমার ভিতরে।

অথবা

…কিন্তু বাকি পিঁপড়ারা বলাবলি করে, সেই ঝুলিয়ে রাখা শরীর থেকেও নাকি শুদ্ধতার জ্যোৎস্না একেবারে ঝরে ঝরে পড়ছিল। তখন সেই বমিগায়ে পিঁপড়া সমেত অন্য পিঁপড়ারা দাবিয়ে রাখা কয়েকজনকে দ্রুত গাড়িতে তুলে বস্তি থেকে মিলিয়ে যেতে থাকলে মালতীর ছিটকে পড়া ঘিলুর অনেকখানি তাদের সঙ্গে মিলিটারির গাড়িতেই পাড়ি দেয়। যেটুকু পড়ে থাকে চাকার ধূলায় তার চারপাশে একটা নীরব বলয় তৈরি হয়। তখন সেই গোধূলিকবর ভেদ করে ওপাশে দূর থেকে আমি বাবাকে পিঁপড়াগাড়িতে চলে যেতে দেখি। এরপরে বাবার সঙ্গে আমার আর দেখা হয় না।

ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীকে এইভাবে আঁকার শৈলীতে মনে পড়ে যায় ১৯৯২ সালে পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া আর্ট স্পিগেলমানের গ্রাফিক নভেল মাউস

অবশ্য স্পিগেলমানের চেয়েও শ্রীমালবিজয়ের লেখকের আত্মীয়তা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের সঙ্গে বেশি। বিশ্বসাহিত্য যেদিকেই গড়াক, বাংলার সাহিত্যিকদের মধ্যে এখনো জাদু বাস্তবের যথেষ্ট রমরমা। অনেক লেখকই তাঁর গল্পে, উপন্যাসে জাদু বাস্তব তৈরি করেছেন বলে কলার তোলেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সেইসব প্রয়াস স্রেফ ভাষার কারিকুরিতে বা গল্প বলার বিশেষ ঢঙে পর্যবসিত হয়েছে। মার্কেজ বা অন্যরা যে শখ করে, কেবল লিখতে ভাল লেগেছে বলেই জাদু বাস্তব ব্যাপারটা সৃষ্টি করেননি তা বাঙালি লেখকদের সচরাচর মনে থাকে না। অথচ ১৯৮২ সালে নোবেল পুরস্কার নেওয়ার বক্তৃতায় মার্কেজ নিজের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে, নিজের বিশ্ববিশ্রুত উপন্যাস ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচিউড-এর সূত্র ধরে, বলেছিলেন, লাতিন আমেরিকার বাস্তবতা এমনই যে তা ব্যক্ত করার অন্য কোনো উপায় ছিল না। তাই লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে জাদু বাস্তবতার জন্ম, যা ইউরোপের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। মার্কেজের কথায় ‘আমি কিছুটা দুঃসাহস করেই বলতে পারি যে বাস্তবের মাপে না আঁটা এই বাস্তবটার দিকে সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ লেটার্সের নজর পড়া উচিত ছিল, কেবল তার সাহিত্যিক অভিব্যক্তির উপরে নয়। কাগুজে বাস্তব নয়, যে বাস্তব আমাদের ভিতরে বাস করে এবং যা আমাদের প্রতিদিনের অসংখ্য মৃত্যুর মুহূর্তগুলোর কারণ। যা আমাদের অন্তহীন সৃজনশীলতার উৎস; দুঃখ এবং সৌন্দর্যে ভরপুর। আমি, এই ভবঘুরে এবং স্মৃতিমেদুর কলম্বিয়ানটি, তারই অংশ হয়ে থাকা একজন ভাগ্যবান ব্যক্তি মাত্র। কবি ও ভিক্ষুরা, সঙ্গীতশিল্পী ও ভবিষ্যদ্বক্তারা, যোদ্ধা ও ইতররা, আমরা যারা ওই বেলাগাম বাস্তবতায় বেঁচে থাকা জীব – আমাদের খুব বেশি কল্পনা করতে হয়নি। কারণ আমাদের একটা বড় সমস্যা হল আমাদের জীবনগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার মত করে বলার পথ দুর্লভ। বন্ধুরা, এটাই আমাদের নিঃসঙ্গতার মূল।’ [নোবেল পুরস্কারের ওয়েবসাইট থেকে ইংরেজি বক্তৃতার ভাষান্তর আমার]

শ্রীমালবিজয় পাঁচালিকারের নিঃসঙ্গতাও ঠিক এইখানে। তার রক্তাক্ত বাস্তবের বয়ানও অন্য কোনো প্রকরণে, অন্য কোনো ভাষায় বলা যেত না।

… শূন্যতার বুকে দানা দেয় অপরিশীলন। মনে হল সাঁত করে গলির ওপাশে কেউ সরে গেল। লোকটা ন্যাংটো! লোক? ছায়ার লিঙ্গ নিয়েও আজকাল ভেবে চলেছি দেখছি! গ্রেট! এতটা না এসে শিল্পী কীভাবেই বা হতাম? আমার শিকড়ের কাছে আমার রক্তবমি করা শরীর পড়ে থাকত না?

শিকড়ের প্রতি টান থেকেই হয়ত সেই স্পর্ধা আসে যা একই উপন্যাসে দুরকম বাংলা ব্যবহার করার সাহস দেয় লেখককে। না, এখানে কথকের বাংলা আর সংলাপের বাংলা আলাদা হওয়ার কথা বলা হচ্ছে না। সে তো হওয়ারই কথা। ইদানীং লেখকদের আলস্যে বা নানারকম মানুষের কথা শোনার অনভ্যাসে বাংলা গল্প, উপন্যাসে হয়ে ওঠে না। কেউ চেষ্টা করতে গেলে বিকট ফলাফল হয়। শ্রীমালবিজয় উপন্যাসে লেখক গল্প বলতেই দুরকম ভাষা ব্যবহার করেছেন। ভারতের বিভিন্ন অংশের বিভিন্ন চেহারার বাংলা কোনোদিনই মূলধারার সাহিত্য, সিনেমার ভাষা হয়ে উঠতে পেল না। এর একমাত্র ব্যতিক্রম বোধহয় বাংলা ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংলাপ। কিন্তু তাও শুধুমাত্র হাস্যরসের উদ্রেক করতেই ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে কলকাতার বাংলা ছাড়া কোনো ভাষায় যে ‘সিরিয়াস’ সাহিত্য সম্ভব, লেখা হয়েছেও, তা বড় অংশের পাঠক জানতেই পারেননি। অনেকে সেসব ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা হিসাবে মানতেও চান না। সিন্ধু নিজের প্রথম উপন্যাসেই কিন্তু এই বিভাজনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়েছেন। কে না জানে, মানুষ যখন চিন্তামগ্ন থাকে অথবা স্বপ্ন দেখে, তখনকার ভাষাই আসলে তার মাতৃভাষা। সে ভাষা ব্যবহার করলে হয়ত পারিপার্শ্বে তাকে হাস্যাস্পদ হতে হয়, তাই সে বলে না। কিন্তু নিজের সঙ্গে কথোপকথনে সেই ভাষাই একমেবাদ্বিতীয়ম। পারিপার্শ্বের ভাষাও আবার দীর্ঘ অভ্যাসে মিশে যায় সেই ভাষায় – অনায়াসে, অলক্ষ্যে। জন্ম হয় এক অন্যতর ভাষার। শ্রীমালবিজয় উপন্যাসে ঠিক তাই করা হয়েছে। ভাবতে ভাবতে যেমন হয়, কোনো কোনো অনুচ্ছেদের মাঝখানেই ভাষা বদলে ফেলেছেন লেখক। লোকে পড়বে কি পড়বে না, ভাষার জন্যেই এ বই প্রত্যাখ্যান করবে কিনা, সেসব চিন্তা উড়িয়ে দিয়ে এই প্রয়াস। তাও আবার প্রথম উপন্যাসে। শিহরণ জাগানো আখ্যানের কথা বাদ দিলেও, কেবল এইজন্যে লেখক প্রশংসার্হ।

আরও পড়ুন সুখেন মুর্মুর চদরবদর: অচেনার আনন্দ, অজানার সংকট

তবে সুপ্রসন্ন কুণ্ডুর প্রচ্ছদ সন্তুষ্ট করতে পারে না। আগে দর্শনধারী পরে গুণবিচারী – বেশিরভাগ পাঠকের ক্ষেত্রেই এ কথার মার নেই। সম্ভবত প্রকাশকের পরিকল্পনাতেই এই উপন্যাসের প্রচ্ছদ অবিশেষ, কারণ এটা ‘প্রথমোপন্যাস’ সিরিজের বই। এই পরিকল্পনা অনেক পাঠককে বিমুখ করতে পারে। অন্তত এই উপন্যাসের বেলায় তাতে লেখকের চেয়ে পাঠকের ক্ষতি বেশি বলেই মনে হয়।

শ্রীমালবিজয়
লেখক: সিন্ধু সোম
প্রকাশক: কেতাবি
প্রচ্ছদ: সুপ্রসন্ন কুণ্ডু
দাম: ৩০০ টাকা

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

সাহিত্য ও সাংবাদিকতা অপ্রিয় সত্য ছাড়া বৃথা

সাংবাদিকতা করা মানেই হল, সজাগ দৃষ্টিতে যে ক্ষমতাশালী – সে সরকার হতে পারে, ব্যবসায়ী হতে পারে, মাস্টার হতে পারে, ডাক্তার হতে পারে, উকিল হতে পারে – তার দোষত্রুটি খেয়াল করা এবং সকলের চোখের সামনে সত্য উদ্ঘাটিত করা।

দক্ষিণ দিনাজপুরের বুনিয়াদপুর মহাবিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের আমন্ত্রণে গত ১৫ মার্চ ২০২৩ (বুধবার) ছাত্রছাত্রীদের জন্য ‘সাহিত্য ও সাংবাদিকতা’ বিষয়ে এই ভাষণ দেওয়া হয়েছিল।

শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আমার প্রণাম, প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের ভালবাসা। আমাকে আজ বলতে ডাকার জন্যে কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং সংস্কৃত বিভাগকে ধন্যবাদ। তোমাদের যে মাস্টারমশাইরা আমার আগে বললেন, তাঁরা আমার উপরে একটা গুরুভার চাপিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা আশা করেছেন যে আমার বক্তৃতা থেকে তোমরা একটা পেশাগত দিশা পাবে। এখন আমি নিশ্চিত নই সেটা পাবে কিনা। তোমরা শুনে দ্যাখো।

জীবন সবাইকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না, আমাকে দিয়েছে। ইংরেজি অনার্সের ছাত্র হিসাবে যখন বিএ পরীক্ষা দিয়েছিলাম, তখন একটা পেপারে আমাদের ৪০ নম্বরের প্রবন্ধ লিখতে হত। সেবার সবাই বলেছিল একটা প্রবন্ধ আসবেই। টেস্ট পরীক্ষায় এসেছিলও বটে। আমি অনেক বই-টই ঘেঁটে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, টেস্ট পরীক্ষার খাতা দেখানোর সময়ে মাস্টারমশাই “চমৎকার হয়েছে” বলে পিঠও চাপড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষা দিতে বসে দেখি, সে প্রবন্ধ আসেনি। এসেছে আজকের বিষয়টা – সাহিত্য ও সাংবাদিকতা। যেহেতু প্রস্তুতি ছিল না, সেহেতু সেদিন কীরকম লিখেছিলাম শুনেই বুঝতে পারছ। নম্বরও পেয়েছিলাম তেমনই। আমার সেই সময়কার সহপাঠী এবং তোমাদের মাস্টারমশাই ডঃ শান্তিগোপাল দাসের কল্যাণে আমি আজ দ্বিতীয় সুযোগ পেয়েছি। আজকের পরীক্ষকরা, মানে তোমরা, নিশ্চয়ই অত কড়া পরীক্ষক নও। দ্যাখো আজ পাস করতে পারি কিনা।

এই বক্তৃতার আয়োজক যেহেতু এই কলেজের সংস্কৃত বিভাগ, বিশেষ করে সেই কারণেই ধরে নিচ্ছি, রাজা বিক্রমাদিত্য আর কালিদাস – এই নাম দুটো কারোর অজানা নয়। বিক্রমাদিত্যের নবরত্নসভা নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। তার মধ্যে একটা গল্প শুধু সংস্কৃত কেন, প্রায় যে কোনো বিভাগের লোকেরই জানা। সেই গল্পটা দিয়েই আজকের আলোচনা শুরু করব। নবরত্নসভায় কালিদাস ছাড়াও আরেকজন কবি ছিলেন, তাঁর নাম বররুচি। তাঁর একটু অভিমান বা ক্ষোভ ছিল, যে রাজা তাঁর চেয়ে কালিদাসকে বেশি গুরুত্ব দেন, যদিও কবি হিসাবে তিনি কালিদাসের চেয়ে কোনো অংশে কম যান না। এই ক্ষোভের কথা রাজা জানতেন। তা তিনি ঠিক করলেন একদিন প্রমাণ করে দেবেন কালিদাস মহত্তর কবি। কীভাবে করলেন? একদিন সভাসদদের নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছেন, সামনে একটা মরা গাছ পড়ে আছে। রাজা ওই গাছটা দেখিয়ে বররুচিকে বললেন “কবিবর, এ নিয়ে এক লাইন হয়ে যাক?” কবি বললেন “শুষ্কং কাষ্ঠং তিষ্ঠত্যগ্রে।” তারপর রাজা কালিদাসকে বলতে বললেন। তিনি বললেন “নীরসতরুবরঃ পুরতো ভাতি।” আর কোনো সংশয় রইল না। যিনি শুকিয়ে যাওয়া গাছেও রসসঞ্চার করতে পারেন তাঁর চেয়ে বড় কবি আর কে আছে?

বাংলা ভাষার সম্ভবত সর্বকালের সেরা সাহিত্য সমালোচক বুদ্ধদেব বসু অবশ্য মেঘদূতম অনুবাদ করে তার ভূমিকায় লিখেছেন, প্রচলিত ধারণাটা ভুল। আসলে বররুচির শ্লোকটাই সাহিত্য হিসাবে উন্নততর। কিন্তু সে বিতর্কে যাব না, কারণ আমার এই গল্পটা বলার উদ্দেশ্য আলাদা। কথা হল, সাহিত্য হিসাবে কালিদাস যা বলেছেন তা হয়ত মহত্তর, কিন্তু সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বররুচি যা বলেছেন সেটাকেই এগিয়ে রাখতে হবে। কোনোরকম অলঙ্করণ বাদ দিয়ে সত্যকে তুলে ধরা – এই যদি সাংবাদিকতার কাজ হয়, তাহলে মানতেই হবে বররুচি বেশি সফল।

কিন্তু সাংবাদিকতার কাজ কি এটাই? অলঙ্করণ বাদ দিয়ে সত্যকে তুলে ধরা? অলঙ্করণ করলে কি সাংবাদিকতা আর সাংবাদিকতা থাকে না? আরও প্রশ্ন আছে। সত্য বলা কি শুধু সাংবাদিকতারই কাজ, সাহিত্যের কাজ নয়? সাহিত্য মানে কি স্রেফ কতকগুলো বানানো কথা? সংস্কৃত, বাংলা, ইংরেজি বা অন্য যে কোনো ভাষার সাহিত্য নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন তাঁরা সকলেই বোধহয় মানবেন যে কবিতাই হল সাহিত্যের সবচেয়ে বিমূর্ত ধারা। কারণ কবিতার প্রকরণ এবং বিষয়বস্তু – দুটোতেই কল্পনার আধিপত্য। তা বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন, শঙ্খ ঘোষ, আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগেই তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায় লিখে দিয়েছেন “সত্যি বলা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই কবিতার। কিন্তু জীবিকাবশে শ্রেণীবশে এতই আমরা মিথ্যায় জড়িয়ে আছি দিনরাত যে একটি কবিতার জন্যেও কখনো-কখনো অনেকদিন থেমে থাকতে হয়।” এরপর তো আর সত্য বলা সাহিত্যের কাজ নয়, এ কথা বলার অবকাশ নেই। তাহলে?

আমরা বরং আগে ভেবে দেখি যে সাংবাদিকতা আসলে কী? ইংরেজি সাহিত্যের মাস্টারমশাই, দিদিমণি এবং ছাত্রছাত্রীরা জর্জ অরওয়েলের কথা জানেন। অরওয়েল বলেছিলেন সাংবাদিকতা হল তাই, যা কেউ না কেউ প্রকাশিত হতে দিতে চায় না। বাকি সবই হল জনসংযোগ, মানে পাবলিক রিলেশন বা সংক্ষেপে পি আর। যা অরওয়েলের সময়ে না হলেও, আমাদের সময়ে একটা আস্ত পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তোমাদের মধ্যে যারা ভবিষ্যতে কোথাও কোনো গণমাধ্যমের পাঠক্রমে ভর্তি হবে, তারা দেখতে পাবে একইসঙ্গে সাংবাদিকতা এবং পাবলিক রিলেশন পড়ানো হয়। কিন্তু অরওয়েলের কথাটা শুনলেই বোঝা যাচ্ছে, দুটো আসলে পরস্পরবিরোধী বিষয়।

ব্যাপারটা কীরকম? ধরা যাক, তোমাদের কলেজে সাংবাদিকতা বিভাগ চালু করা হচ্ছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ খবরটা স্থানীয় কাগজের সম্পাদকদের কাছে পাঠালেন, তারাও ছেপে দিল। এটা প্রয়োজনীয় কাজ হল, কারণ এলাকার সাংবাদিকতা পড়তে আগ্রহী ছেলেমেয়েরা জানতে পারল এবং তাদের অভিভাবকরা জানতে পারলেন। কিন্তু এটা জনসংযোগ হল, সাংবাদিকতা হল না। এবার ধরা যাক, কোনো কলেজে সাংবাদিকতা বিভাগ আছে, সেখানে ছেলেমেয়েরা ভর্তিও হয়েছে। অথচ সেখানে অধিকাংশ ক্লাস হয় না, সময়ে পরীক্ষা হয় না। কারণ বেশিরভাগ অধ্যাপক বহুদিন হল কলেজেই আসেন না। এই খবরটা কোনো কাগজে কি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হল বা কোনো খবরের চ্যানেলে দেখানো হল। এইটা সাংবাদিকতা হল। কারণ এ খবর বাইরে যাক তা কলেজ কর্তৃপক্ষ চাইবেন না। আবার এমনও হতে পারে যে তাঁরা চাইছিলেন খবরটা প্রকাশিত হোক, হইচই হোক। কারণ এই অচলাবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলছে, কর্তৃপক্ষ প্রতিকার করতে চেয়েও পারেননি উপরতলার চাপে বা অবজ্ঞায়। সেক্ষেত্রে আবার এ খবর প্রকাশিত হোক সেটা উপরতলা চাইবে না।

তাহলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারা যাচ্ছে, সাংবাদিকতা বলে রোজ যা চলছে আমাদের চারপাশে, তার অধিকাংশই আসলে পি আর। মোটেই সাংবাদিকতা নয়। রাত্রিবেলা স্টুডিওতে বসে গলা ফাটিয়ে “দ্য নেশন ওয়ান্টস টু নো” বলা সাংবাদিকতা নয়। কিন্তু এরকম হচ্ছে তো। কেন হচ্ছে? সে আবার একটা আলাদা আলোচনার বিষয়। এই বক্তৃতাতেও শেষদিকে খানিকটা সে আলোচনায় আসব, কারণ তোমাদের শান্তিগোপাল স্যার আমাকে পইপই করে বলে দিয়েছেন, কী করে সাংবাদিক হতে হয় সেটা যেন বলি। সেকথা বলতে গেলে ওই আলোচনায় ঢুকতেই হবে। কিন্তু আপাতত আমরা দেখব, যে সাহিত্য আর সাংবাদিকতা নিয়ে একত্রে আলোচনা কেন দরকার? সাংবাদিকতা আর সাহিত্যে কোথায় মিল, কোথায় অমিল? দুটোর মধ্যে কি আদৌ কোনো সীমারেখা আছে? সে রেখা কি সবসময় বজায় থাকে? না থাকলে কোথায় মুছে যায়?

এ পর্যন্ত আমাদের আলোচনা থেকে যা উঠে এসেছে, তার মধ্যে দুটো জিনিস আলাদা করে চিহ্নিত করা দরকার। ১) সাংবাদিকতা আর সাহিত্য – দুয়ের কাজই সত্য বলা, ২) সাংবাদিকতার কাজ অপ্রিয় সত্য প্রকাশ করা। এই দ্বিতীয় কাজটার উল্লেখে সাংবাদিকতার সঙ্গে সাহিত্যের একটা তফাতের আভাস পাওয়া যায়। কারণ প্রাথমিকভাবে আমরা সাহিত্যের কাছে কেন যাই? আরও সহজ করে যদি বলি – গল্পের বই, কবিতার বই, নাটক বা প্রবন্ধের বই পড়তে চাই কেন? আনন্দ পাব বলে। তাহলে সাহিত্য পড়ার মূল উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই আনন্দ পাওয়া? এমনটা শুধু যে আমাদের মত সাধারণ মানুষেরই মত তা নয়, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের পথে বইয়ের তথ্য ও সত্য প্রবন্ধে লিখেছেন “যে প্রকাশচেষ্টার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে, আপন প্রয়োজনের রূপকে নয়, বিশুদ্ধ আনন্দরূপকে ব্যক্ত করা, সেই চেষ্টারই সাহিত্যগত ফলকে আমি রসসাহিত্য নাম দিয়েছি।” প্রবন্ধের নামটা খেয়াল করো। আজকের বিষয়ের সঙ্গে মিল আছে। সাংবাদিকতা ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করছি; প্রবন্ধের নাম ‘তথ্য ও সত্য’। রবীন্দ্রনাথ যা বলেছেন তা যদি ঠিক হয়, তাহলে মানতে হবে যে সত্য প্রকাশ করা সাংবাদিকতার মত সাহিত্যেরও কাজ বটে, কিন্তু অপ্রিয় সত্য নয়। তোমাদের শান্তিগোপাল স্যারের পাশে বসে যখন সংস্কৃত ক্লাস করতাম, তখন শিখেছিলাম প্রাচীন হিন্দুশাস্ত্রেও উপদেশ দেওয়া হয়েছে “সত্যম অপ্রিয়ম মা বদ”। মানে অপ্রিয় সত্য বোলো না। এটাই তাহলে সাহিত্যে পালনীয়, তাই না?

কিন্তু এই যুক্তি মানলে বিশ্বসাহিত্যের সেরা সৃষ্টির অনেকগুলোকেই যে আর সাহিত্য বলে মানা যাবে না! ইংরেজ কবি পিবি শেলি ‘টু আ স্কাইলার্ক’ কবিতায় লিখেই দিয়েছেন “Our sincerest laughter/With some pain is fraught/Our sweetest songs are those that tell of saddest thought.” মানে আমরা যখন সবচেয়ে জোরে হাসি, তার মধ্যেও কিছুটা বেদনা মিশে থাকে। আমাদের সবচেয়ে মিষ্টি গান সেগুলোই, যেগুলোতে সবচেয়ে কষ্টের কথা বলা আছে। কথাগুলো গানের ক্ষেত্রে যতটা সত্যি, সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ততটাই সত্যি। ধরো বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের যে স্থান, ইংরেজি সাহিত্যে তো সে স্থান উইলিয়াম শেক্সপিয়রের। তিনি ১৬১৬ সালে মারা গেছেন, আজ ৪০০ বছর পরেও তাঁর কোন নাটকগুলো বারবার পড়া হয়, মঞ্চে অভিনীত হয়, বারবার নানা রূপে সিনেমার পর্দায় নিয়ে যাওয়া হয়? কমেডিগুলো নয়, ট্র্যাজেডিগুলো। ম্যাকবেথ, হ্যামলেট, ওথেলো, জুলিয়াস সিজার, রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট। সারা পৃথিবীর সাহিত্য সমালোচকরা মানেন, এগুলোই শেক্সপিয়রের সেরা কাজ। অথচ এগুলো যে শুধু বিয়োগান্ত তা নয়, প্রথম চারটে নাটকের কেন্দ্রে আছে চারটে খুন। পঞ্চমটায় দুই নিরপরাধ যুবক-যুবতীর মৃত্যু ঘটে। উপরন্তু শত্রুতা, বিশ্বাসঘাতকতা, অন্তর্ঘাত, অবৈধ প্রেম এসবে ভর্তি এই নাটকগুলো। ওগুলোর বিজ্ঞাপনে অনায়াসে লেখা যেত “লাশ কা মাউন্টেন, খুন কা ফাউন্টেন। ডেঞ্জার! ডেঞ্জার! ডেঞ্জার!” কথাটা ম্যাকবেথ, ওথেলো আর হ্যামলেট অবলম্বনে বিশাল ভরদ্বাজের মকবুলওমকারা আর হায়দার  ছবিগুলো যারা দেখেছে তারা পরিষ্কার বুঝতে পারবে।

শেক্সপিয়র তবু অনেক আধুনিক দৃষ্টান্ত। একেবারে রামায়ণ, মহাভারতে চলে যাই। রাম-সীতা আর লক্ষ্মণকে বনবাসে যেতে হল কেন? রামের সৎ মা কৈকেয়ী আর দাসী মন্থরার ষড়যন্ত্রে। রাম-রাবণের যুদ্ধই বা লাগল কেন? রাবণ অন্যের বউকে অপহরণ করলেন বলে। পাশ্চাত্য জগতের পুরাণ হোমারের ইলিয়াড, তারও কেন্দ্রে একজন নারীর উপর কর্তৃত্ব কায়েম করা নিয়ে যুদ্ধ – সেই নারী হলেন হেলেন অফ ট্রয়। আর মহাভারতে কতগুলো অপ্রিয় সত্য আছে সেকথা তো গুনতে শুরু করলে শেষ হবে না। আজকের ভারতের আইনকানুন, নীতি নৈতিকতা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে এখন মহাভারত লিখলে প্রথমে বইটা নিষিদ্ধ হয়ে যেত, তারপর ব্যাসদেবের বাড়িতে ঢিল পড়ত, শেষমেশ পুলিস এসে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দিত। সবচেয়ে বড় কথা, রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড – সবই শেষপর্যন্ত যুদ্ধের গল্প। রামায়ণে তবু উত্তরকাণ্ড বলে একটা ব্যাপার আছে। মহাভারত তো যুদ্ধের পর কার কী হল সে গল্প দিয়েই শেষ। যুদ্ধে যে আসলে কেউ জেতে না – একথা শান্তিপর্বে ব্যাসদেব যেভাবে দেখিয়েছেন তাতে মহাভারতকে যদি পৃথিবীর প্রাচীনতম যুদ্ধবিরোধী সাহিত্যকর্ম বলে চিহ্নিত করি তাহলে ভুল হবে না।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, সাংবাদিকতার মত সাহিত্যেরও একটা বড় কাজ অপ্রিয় সত্য প্রকাশ করা। অবশ্য রবীন্দ্রনাথের “বিশুদ্ধ আনন্দরূপ” কথাটার বিস্তার আমরা আনন্দ বলতে যা বুঝি তার চেয়ে অনেক বেশি এবং তার মধ্যে এইসব মহান সাহিত্য অনায়াসে এঁটে যায়। কারণ আমাদের দেশের প্রাচীন নন্দনতত্ত্বে নবরসের কথা বলা হয়েছে। যে কোনো মহান সাহিত্য ওই নটার এক বা একাধিক রসের সন্ধান দেয়। যে কোনো রসেই রয়েছে বিশুদ্ধ আনন্দরূপ। যাকে ট্র্যাজেডি বলা হয়, তাতে শেষে পাওয়া যায় করুণরস। সে রসে যে বিশুদ্ধ আনন্দরূপ রয়েছে সে ব্যাপারে এমনকি পাশ্চাত্যের প্রাচীন নন্দনতত্ত্বের গুরু অ্যারিস্টটলও একমত। ওই আনন্দরূপ আবিষ্কার করে যে অনুভূতি হয় তিনি তার নাম দিয়েছেন catharsis

এখন ঘটনা হল, যত দিন গেছে, সাহিত্যে অপ্রিয় সত্যের ভাগ কিন্তু তত বেড়েছে। ফলে সাহিত্যের আজ যে চেহারা দাঁড়িয়েছে তার সবটা আমরা নবরসের ধারণা দিয়ে বা অ্যারিস্টটল, রবীন্দ্রনাথের ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারব না। দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব সারা পৃথিবীর মানুষের উপর এবং স্বভাবতই সাহিত্যের উপর পড়েছে। আমাদের দেশে, বিশেষ করে বাংলায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, পরবর্তীকালে নকশাল আন্দোলন, তারপর ১৯৯১ সালে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক উদারীকরণের প্রভাবও পড়েছে সাহিত্যে। ফলে অপ্রিয় সত্যের পরিমাণ বেড়েই চলেছে, এখনো বাড়ছে। পাশাপাশি সাংবাদিকতার পরিমাণ ও বিস্তার বেড়েছে। সাংবাদিকতার সঙ্গে সাহিত্যের সীমারেখাও অস্পষ্ট হয়েছে। এটা কাকতালীয় নয়, যে বিংশ শতাব্দীর বহু বিখ্যাত সাহিত্যিক জীবনের কোনো পর্বে বা সারাজীবন পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী স্প্যানিশ ভাষার সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ থেকে শুরু করে বাংলার প্রমথনাথ বিশী, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মতি নন্দী, রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায় বা আজকের প্রচেত গুপ্ত – তালিকা তৈরি করলে কয়েক মাইল লম্বা হবে। পৃথিবীর যেসব জায়গায় মানুষ বেশি কষ্টে আছে, জীবনযুদ্ধ যেখানে বেশি প্রবল, সেখানে সাহিত্য আর সাংবাদিকতার তফাত আরও কমে এসেছে। এর সবচেয়ে দগদগে উদাহরণ প্যালেস্তাইনের কবি, পেশায় সাংবাদিক রাফীফ জিয়াদার একখানা কবিতা। তোমরা ইউটিউবে গিয়েই সার্চ করলে স্বচক্ষে দেখতে পাবে রাফীফ কীভাবে সমস্ত শরীর, মন দিয়ে কবিতাটা আবৃত্তি করেছেন।

কয়েক বছর আগে সেই ভিডিও দেখে ইংরিজিতে লিখিত এই কবিতার বাংলা ভাষান্তর করেছিলাম। তোমরা শুনে দ্যাখো, ইজরায়েলি হানাদারির মুখে বেঁচে থাকা প্যালেস্তিনীয়দের কথা কীভাবে রাফীফের কলমে উঠে এসেছে। এটা কি সাহিত্য, নাকি সাংবাদিকতা? নাকি দুটোই। তোমরাই বিচার করো।

আজ আমার শরীরটা মুখরোচক বুলেটিন
সাউন্ড বাইট আর শব্দসংখ্যায় বাঁধা,
পরিসংখ্যানে ভারি,
সব প্রশ্নের মাপা উত্তর দিতে তৈরি।
আমার ইংরিজিটা ঘষেমেজে,
জাতিপুঞ্জের সনদগুলো ঝালিয়ে নিয়ে এসেছি
তবু সে আমায় জিজ্ঞেস করল:
“মিস জিয়াদা, তোমার মনে হয়না সব মিটে যাবে
যদি তোমরা শিশুদের হিংসার পথ দেখানো বন্ধ করো?”
আমি শান্ত হওয়ার শক্তি খুঁজলামকিন্তু শান্তি তো আমার জিভের ডগায় নেই
গাজায় বোমাবৃষ্টি দেখতে দেখতে
শান্তি এইমাত্র কেটে পড়ল
আমরা বাঁচতে শেখাই, ভাই
(রাফীফ, হাসতে থাকো),
আমরা বাঁচতে শেখাই
আমরা প্যালেস্তিনীয়রা বাঁচতে শেখাই
ওরা শেষ আকাশের টুকরোটা দখল করে নেওয়ার পরেও,
শেষ আকাশপারে পাঁচিল তোলার পরেও,
আমরা বাঁচতে শেখাই

কিন্তু আজ আমার শরীরটা মুখরোচক বুলেটিন
সাউন্ড বাইট আর শব্দসংখ্যায় বাঁধা

“আরে আমাদের একটা গল্প চাই, একটা মানবিক গল্প,
রাজনৈতিক খবর-টবর নয়
আমরা লোককে তোমার, তোমার দেশের লোকের ব্যাপারে
জানাতে চাই
“বৈষম্য”, “দখলদারী” এইসব শব্দ চলবে না,
এটা রাজনৈতিক ব্যাপার নয়
সাংবাদিক হিসাবে আমাদের বল তোমার কথা,
মানে যা রাজনৈতিক নয়, এমন কিছু।”

আজ আমার শরীরটা মুখরোচক বুলেটিন

“ধরো গাজার একজন মহিলার গল্প যার চিকিৎসা দরকার,
বা তোমার কথাই বল নাআচ্ছা তোমার কটা হাড় ভাঙা?
এতগুলো কি যে সূর্য ঢেকে যাবে?
আমাকে তোমাদের মৃতদেহগুলো দাও না,
আর নামের তালিকা,
বারোশো শব্দের মধ্যে

আজ আমার শরীরটা মুখরোচক বুলেটিন
সাউন্ড বাইট আর শব্দসংখ্যায় বাঁধা,
এমনভাবে যাতে সন্ত্রাসবাদীদের রক্ত দেখে যাদের মন গলে না
তাদেরও নাড়িয়ে দেওয়া যায়

কিন্তু ওরা ব্যথা পেয়েছে,
গাজার গরু-ছাগলগুলোর জন্য ওরা সত্যিই খুব ব্যথিত
তাই আমি ওদের জাতিপুঞ্জের সনদগুলো দিলাম,
আর বললাম আমরা নিন্দা করি,
ঘেন্না করি, প্রত্যাখ্যান করি ওগুলো।
এটা সমানে-সমানে লড়াই নয়:
দখলদার আর ভিটেমাটি চাটি হওয়া লোকজন,
আর একশো, দুশো, এক হাজার মৃতদেহের কথা বলছি।
তা ছাড়া যুদ্ধাপরাধ আর গণহত্যার কথা বলছি
বলতে বলতে হাসি,
হেসে বলি “সন্ত্রাসবাদীদের কথা বলছি না কিন্তু”
আমি আবার গুনি, বারবার গুনি –
একশো, দুশো, এক হাজার মৃতদেহ।
কেউ আছেন? কেউ শুনছেন?
আহা, ঐ মড়াগুলোর উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে
যদি হাউ হাউ করে কাঁদতে পারতাম,
যদি সব উদ্বাস্তু শিবিরে খালি পায়ে দৌড়ে যেতে পারতাম,
আর সব শিশুর কান চেপে রাখতে পারতাম,
যাতে ওদের বোমার আওয়াজ শুনতে না হয় বাকি জীবন
আমার মত!

আজ আমার শরীর মুখরোচক বুলেটিন
আর শোনো ভাই, তোমার জাতিপুঞ্জের সনদ
কস্মিনকালেও এ ব্যাপারে কিস্যু করেনি
আর কোনো সাউন্ড বাইট, কোনো সাউন্ড বাইট,
সে যতই নিখুঁত হোক না কেন,
আমার ইংরিজি যতই ঝরঝরে হোক না কেন,
কোনো সাউন্ড বাইট সে জীবনগুলো ফিরিয়ে দিতে পারবে না।
কোনো সাউন্ড বাইট পারবে না এসব মেটাতে।

আমরা বাঁচতে শেখাই ভাই,
আমরা বাঁচতে শেখাই

আমরা প্যালেস্তিনীয়রা রোজ সকালে জেগে উঠি
বাকি দুনিয়াকে বাঁচতে শেখাব বলে

সভ্যতার ইতিহাস যত লম্বা তার সাপেক্ষে বিচার করলে সাংবাদিকতা অত্যন্ত আধুনিক ব্যাপার, কিন্তু সাহিত্য অতি প্রাচীন। বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যে আধুনিক যুগ বলতে বিভিন্ন সময়কে বোঝানো হয়, আধুনিকতার সংজ্ঞাও সেই অনুযায়ী বদলে যায়। এখানে আধুনিক শব্দটা আমি সাহিত্যের ইতিহাসে যে অর্থে ব্যবহার হয় একেবারেই সে অর্থে ব্যবহার করছি না। শব্দটার সবচেয়ে সংকীর্ণ যে অর্থ, মানে সাম্প্রতিককালের ব্যাপার – সে অর্থেই ব্যবহার করলাম। তাহলে এতক্ষণ ধরে সাহিত্য আর সাংবাদিকতার অমিলগুলোকে বাতিল করতে করতে এসে এতক্ষণে একটা অমিল স্বীকার করলাম। তার মানে নিশ্চয়ই সাহিত্য আর সাংবাদিকতার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে গেছে বললেও কোনো একটা সীমারেখা আমি মানি?

মানি তো বটেই। কী সেটা? উদ্দেশ্যের সীমারেখা। আবার রবীন্দ্রনাথের সংজ্ঞায় ফিরে যাই। “যে প্রকাশচেষ্টার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে, আপন প্রয়োজনের রূপকে নয়, বিশুদ্ধ আনন্দরূপকে ব্যক্ত করা, সেই চেষ্টারই সাহিত্যগত ফলকে আমি রসসাহিত্য নাম দিয়েছি।” সাহিত্যের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রচুর বিতর্ক আবহমানকাল ধরে চলছে। রবীন্দ্রনাথের আমলেও জোরদার বিতর্ক চলছিল। সেইসময় অনেকের মত ছিল সাহিত্যের উদ্দেশ্য লোককে শিক্ষিত করা। রবীন্দ্রনাথ তাতে ঘোর আপত্তি করেছিলেন। ওই সাহিত্যের পথে বইতেই ‘বাস্তব’ নামে প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন “লোক যদি সাহিত্য হইতে শিক্ষা পাইতে চেষ্টা করে তবে পাইতেও পারে, কিন্তু সাহিত্য লোককে শিক্ষা দিবার জন্য কোনো চিন্তাই করে না। কোনো দেশেই সাহিত্য ইস্কুল-মাস্টারির ভার লয় নাই। রামায়ণ মহাভারত দেশের সকল লোকে পড়ে তাহার কারণ এ নয় যে, তাহা কৃষাণের ভাষায় লেখা বা তাহাতে দুঃখী-কাঙালের ঘরকরনার কথা বর্ণিত। তাহাতে বড়ো বড়ো রাজা, বড়ো বড়ো রাক্ষস, বড়ো বড়ো বীর এবং বড়ো বড়ো বানরের বড়ো বড়ো লেজের কথাই আছে। আগাগোড়া সমস্তই অসাধারণ। সাধারণ লোক আপনার গরজে এই সাহিত্যকে পড়িতে শিখিয়াছে।” সাহিত্যের উদ্দেশ্য নিয়ে এতরকম পরস্পরবিরোধী মতামত আছে, যে তা থেকে কোনো মোদ্দাকথা বের করা অসম্ভব। এই হলে যতজন বসে আছেন তাঁদের প্রত্যেককে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কেন সাহিত্য পড়েন? আলাদা আলাদা উত্তর পাওয়া যাবে। আবার সাহিত্যিকদের যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কেন লেখেন? তাহলেও কোনো একটা উত্তর পাওয়া যাবে না। কিন্তু একথা ঠিক, যে বিন্দুমাত্র আত্মসম্মান আছে এমন কোনো সাহিত্যিক বলবেন না “লিখতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু লেখা আমার চাকরি, তাই লিখি।”

সাংবাদিকদের অনেককে জিজ্ঞেস করলে কিন্তু এই উত্তরটা পাওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ সাহিত্যের মূলে আছে মানসিক প্রয়োজন বা আরেকটু তরল করে বললে, সাহিত্য হৃদয় সংক্রান্ত ব্যাপার। সাংবাদিকতার মূলে আছে ব্যবহারিক প্রয়োজন। কথাটা শুধু সাংবাদিকের দিক থেকেই সত্যি তা নয়। একজন পাঠকও যে জন্যে পয়সা দিয়ে গল্পের বই কেনেন, সেই কারণেই খবরের কাগজ কেনেন কি? যে কারণে হলে গিয়ে বা মোবাইলে সিনেমা দ্যাখো তোমরা, ঠিক সেই কারণেই টিভিতে বা মোবাইলে খবর শোনো কি? তা তো নয়। সাহিত্য পড়ো বা সিনেমা দ্যাখো উপভোগ করার জন্যে। কিছু ক্ষেত্রে হয়ত নতুন কিছু জানার জন্যে। কাগজ পড়ো বা টিভিতে কি মোবাইলে খবর পড়ো চারপাশে কী হচ্ছে জানতে চাও বলে। যা হচ্ছে তার সঙ্গে নিজের রোজকার ভালমন্দ জড়িয়ে আছে বলে। কালিদাস, রবীন্দ্রনাথ বা শেক্সপিয়রের লেখা যদি কেউ না-ই পড়ে তার কী ক্ষতি হবে? ভারতের মত দেশে বেশিরভাগ লোকই তো সাহিত্য পড়ে না। কারণ সাহিত্য পড়তে গেলে যে প্রাথমিক পড়াশোনা করা দরকার তার সুযোগই পায় না। যারা পায় তাদের অনেকের হাতেও খাওয়া, পরা, থাকার ব্যবস্থা করে এবং পাঠ্য বইয়ের ব্যবস্থা করে এতটা অতিরিক্ত পয়সা থাকে না যে সাহিত্য পাঠ করার জন্যে শখ করে বই কিনবে। কিনে পড়ার ক্ষমতা না থাকলেও মানুষ যাতে বই পড়তে পারে তার জন্যে লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার বলে একটা চমৎকার জিনিস মানুষ আবিষ্কার করেছিল। কিন্তু সে জিনিস তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা আমরা করে ফেলেছি। সে যা-ই হোক, আর্থিক ক্ষমতা না থাকলেও কিন্তু মানুষ খবর সংগ্রহ করতে চেষ্টা করে। নিজে কাগজ কিনতে না পারলে দোকানে গিয়ে পড়ে, প্রতিবেশীর কাগজ চেয়ে নিয়ে পড়ে। ইদানীং অবশ্য কাগজের জনপ্রিয়তা কমছে। কিন্তু মোটামুটি সকলেই টিভিতে খবর শোনে। নিদেনপক্ষে হাতের মোবাইলে বিভিন্ন ওয়েবসাইট খুলে খবর দেখে। ফেসবুকে দেখে, হোয়াটস্যাপে দেখে। অনেকসময় ভুয়ো খবরও দেখে ফ্যালে, কিন্তু দ্যাখে। মানুষের খবরের খিদে কিছুতেই মেটে না।

সাহিত্য আর সাংবাদিকতা যাদের জন্যে, অর্থাৎ পাঠক বা দর্শক – তাঁদের উদ্দেশ্যে যখন এরকম তফাত আছে, তখন সাহিত্য আর সংবাদ উৎপাদনের উদ্দেশ্যেও তফাত থাকতে বাধ্য। সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য মানুষকে অবগত করা। কী বিষয়ে? তা ঠিক করে সংবাদ পরিবেশকরা, চলতি কথায় সংবাদমাধ্যম। যেখানে সাংবাদিকরা চাকরি করেন। অর্থাৎ খবরের কাগজ বা চ্যানেল বা ওয়েবসাইট বা নিউজ এজেন্সি। পৃথিবীর যে কোনো দেশের খবরের কাগজ হাতে নিলে বা খবরের সাইট খুললে বা খবরের চ্যানেল দেখলে দেখা যাবে বিভাগগুলো মোটামুটি একই। রাজনীতির খবর, অর্থনীতির খবর, খেলার খবর, বিনোদন জগতের খবর। আমাদের দেশে এখনো খুব বেশি চল নেই যে দু ধরনের খবরের, সেগুলো হল পরিবেশ সম্পর্কিত খবর আর বিজ্ঞানের খবর। কিন্তু তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে একেকটা সংবাদমাধ্যমে একেকটা বিভাগের গুরুত্ব একেকরকম। কেউ রাজনীতির খবর বেশি পরিবেশন করে, কেউ সিনেমা-টিনেমা নিয়ে বেশি মেতে থাকে, কেউ আবার খেলা নিয়ে। যারা রাজনীতির খবর বেশি দেয় তাদের মধ্যেও কেউ এ দলের খবর বেশি দেয়, কেউ ও দলের খবর বেশি দেয়। এই তফাতগুলো কেন হয়? সে প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে আগে অন্য একটা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া দরকার। এই যে বললাম, মানুষকে অবগত করা। আচ্ছা, অবগত হওয়ার দরকারটা কী? এই বুনিয়াদপুরে বসে যদি না-ই জানা যায় কলকাতায় কী হচ্ছে, দিল্লিতে কী হচ্ছে, ইউক্রেনের রাজধানী কিভে কী হচ্ছে বা নিউইয়র্কে কী হচ্ছে; তাতে ক্ষতিটা কী?

ক্ষতি ছিল না, যদি আমরা একটা রাজতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক দেশে বাস করতাম। আমাদের অধিকার বলে কিছু থাকত না, আইনকানুন বলেও কিছু থাকত না। রাজা বা একনায়কের মুখের কথাই হত আইন, আমাদের সবাইকে মুখ বুজে সেই আইন মেনেই চলতে হত। প্রতিবাদ করলেই পুলিস মিলিটারি ইত্যাদি দিয়ে মারধোর করা হত, জেলে পুরে দেওয়া হত, গুমখুন করা হত। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৫ই অগাস্ট ইংল্যান্ডের রানির শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার তিন বছরের মাথায়, ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি, আমরা, মানে ভারতের সাধারণ নাগরিকরা, একটা কাণ্ড করে বসেছি। আমরা একটা গণতান্ত্রিক সংবিধান চালু করেছি। পৃথিবীর অন্য অনেক গণতান্ত্রিক দেশের মত এই সংবিধান অনুযায়ী আমাদের কিসে ভাল, কিসে মন্দ; কোন আইনটা করা হবে আর কোন আইনটা বাতিল করা হবে, আমাদের প্রতিনিধি হয়ে কারা দেশ চালাবে – এসব ঠিক করার দায়িত্ব আমরা নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছি। তা এইসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আমরা নেব কী করে যদি কোথায় কী হচ্ছে সে সম্পর্কে অবগতই না থাকি? আর অবগত থাকা মানে মূলত খারাপ কী কী হচ্ছে সে সম্পর্কে অবগত থাকা। মানে আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কোথায় কোথায় তাঁদের যে দায়িত্ব আমরা দিয়েছি ভোটের মাধ্যমে, তা থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন সে সম্পর্কে অবগত থাকা। মানে ঘুষ নিচ্ছেন কি? আমাদের ভুল বুঝিয়ে বা অন্ধকারে রেখে এমন কোনো আইন তৈরি করছেন কি যাতে আমাদের ক্ষতি হতে পারে? তাঁদের হাতে যেসব যন্ত্রপাতি রয়েছে – মানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, পুলিসবাহিনী, সেনাবাহিনী – সেগুলো ব্যবহার করে এমন কিছু করছেন কি, যাতে তাঁরাই যে আমাদের ভৃত্য সেই ব্যাপারটা উল্টে গিয়ে আমরা তাঁদের ভৃত্য হয়ে যাই? যেসব সরকারি পরিষেবা আমাদের পাওয়ার কথা, তা আমরা সবাই পাচ্ছি কি? এমন নয় তো, যে কলকাতায় সরকারি হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু বুনিয়াদপুরে পাওয়া যাচ্ছে না? বা বুনিয়াদপুরে সরকারি স্কুলে লেখাপড়া হচ্ছে, মেদিনীপুরে হচ্ছে না? বর্ধমানে মসৃণ রাস্তা হচ্ছে, কিন্তু ঔরঙ্গাবাদে হচ্ছে না? সরকার আমাদের মত সাধারণ লোকেদের মধ্যে মারদাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে না তো? অন্য কোনো দেশের সরকারের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি করছে না তো, যাতে সরকারের আমাদের উপর নজরদারি করতে সুবিধা হয় এবং আমাদের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হয়? আমাদের টাকায় তৈরি সরকারি সংস্থা জলের দরে একজন, দুজন ধনী লোককে বেচে দিচ্ছে না তো?

এই সমস্ত বিষয়ে অবগত হওয়ার জন্যে একটা গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিকরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এমন হতেই পারে, আমার যে সিদ্ধান্তটা মনে হয় ঠিক তোমার মনে হল সেটা ঠিক নয়। কিন্তু আমার কেন মনে হয় ঠিক, আর তোমার কেন মনে হয় ঠিক নয় তা নিয়ে তর্ক হওয়া উচিত। তর্কে আমি ভুল প্রমাণিত হলে আমাকে তোমার সিদ্ধান্ত মানতে হবে, তুমি ভুল প্রমাণিত হলে তোমাকে আমার সিদ্ধান্ত মানতে হবে। এই প্রক্রিয়াতেই আমাদের প্রতিনিধিদের মধ্যে বিতর্ক চলবে পৌরসভায়, পঞ্চায়েতে, বিধানসভায়, লোকসভায়, রাজ্যসভায়। তারপর সংখ্যাগরিষ্ঠ যাতে মত দেবে তাই হবে। একেই বলে গণতন্ত্র। কিন্তু আমাদের হাতে যদি তথ্যই না থাকে, তাহলে মত দেব কিসের ভিত্তিতে? দিলে কিছুদিন পরে বোঝা যাবে এমন মত প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যা অধিকাংশ মানুষের মত হলেও আসলে তাদের পক্ষেই ক্ষতিকর হয়েছে। এমনটা ঘটেও, কারণ মানুষ মাত্রেই ভুল করে। একা করে বলেই অনেকে মিলেও ভুল করতে পারে। ভুল শোধরাতে হলেও আগে তো বুঝতে হবে ভুল করেছি। কী করে বুঝব, যদি আমার কাছে তথ্যই না থাকে?

এই ব্যাপারগুলো শুধু সরকারের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের বেলায় নয়, যে কোনোরকম ক্ষমতায় যে আছে তার সঙ্গে যে ক্ষমতায় নেই তার সম্পর্কের বেলাতেই সত্যি। সুতরাং এবার নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে, অরওয়েল কেন বলেছিলেন, সাংবাদিকতা হচ্ছে তাই, যা কেউ না কেউ প্রকাশিত হতে দিতে চায় না? কোনো ক্ষমতাশালী তো চাইবে না তার কুকীর্তির খবর প্রকাশ পাক। যে সৎ ক্ষমতাশালী সে-ও হয়ত চাইবে না তার ভুলচুক লোকে জেনে যাক, কারণ সে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। সুতরাং সাংবাদিকতা করা মানেই হল, সজাগ দৃষ্টিতে যে ক্ষমতাশালী – সে সরকার হতে পারে, ব্যবসায়ী হতে পারে, মাস্টার হতে পারে, ডাক্তার হতে পারে, উকিল হতে পারে – তার দোষত্রুটি খেয়াল করা এবং সকলের চোখের সামনে সত্য উদ্ঘাটিত করা। আমি যখন সাংবাদিকতার ছাত্র ছিলাম, আমাদের এক মাস্টারমশাই বলেছিলেন “একশোটা শকুন মরলে একটা সাংবাদিক জন্মায়।” কথাটা কিন্তু নিন্দাসূচকভাবে বা ব্যঙ্গার্থে বলা নয়। বলার অর্থ হল, শকুনকে যেমন সারাক্ষণ ভাগাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, সাংবাদিকেরও কাজ হল সারাক্ষণ কোথায় কী অন্যায় হচ্ছে খুঁজে যাওয়া। আমাদের চারপাশ পরিষ্কার রাখার জন্যে শকুন কতটা প্রয়োজনীয় প্রাণী সে সম্পর্কে পুরনো দিনের লোকেদের ধারণা ছিল, আমাদের নেই। ফলে শকুন এখন একটা লুপ্তপ্রায় প্রাণী। সাংবাদিকও লুপ্তপ্রায় প্রাণী। কারণ যুগের হাওয়ায় সংবাদ হয়ে গেছে তেল, সাবান, শ্যাম্পু, এয়ার কন্ডিশনারের মত একটা পণ্য। ফলে সাংবাদিকরা চাকরি করেন যেসব সংবাদমাধ্যমে তারা আর সাংবাদিকদের দিয়ে শকুনের কাজটা করাতে চায় না, সেলসম্যান বা সেলসগার্লের কাজ করায়। কে না জানে, ব্যবসা করতে গেলে ক্ষমতাশালীর সঙ্গে বিবাদ করা চলে না? কিছু নাছোড়বান্দা সাংবাদিক এখনো আছেন, যাঁরা কিছুতেই বিক্রেতা হয়ে যেতে রাজি নন। তাঁরা কেউ ইন্টারনেটের সুযোগ নিয়ে ইউটিউব চ্যানেল খুলছেন, ফেসবুক পেজ খুলছেন। আমরা কয়েকজন যেমন একটা ওয়েবসাইট খুলেছি। কিন্তু এইভাবে সাংবাদিকতা করার অসুবিধা হল বড় বড় সংবাদমাধ্যমের মত আমাদের বিরাট পুঁজি নেই, বিজ্ঞাপন নেওয়ার উপায় নেই। কারণ বিজ্ঞাপন নিলেই বিজ্ঞাপনদাতারা হয়ে যাবেন ক্ষমতাশালী, তখন আর তাঁরা আমাদের শকুনের কাজটা করতে দেবেন না।

এই কারণেই আজকাল বেশকিছু ক্রাউড-ফান্ডেড মিডিয়া তৈরি হয়েছে। মানে তুমি সেই সাইটে গিয়ে কোনো লেখা পড়লে বা ভিডিও দেখলে, দেখে তার জন্যে টাকা দিলে। সেই টাকাতেই যারা কাজ করছে তাদের পারিশ্রমিক দেওয়া হবে, সাইটের কাজকর্ম চলবে। তোমরা নিশ্চয়ই জানো এরকম অনেক সংবাদমাধ্যমের কথা। আমি যে সাইটের সঙ্গে যুক্ত সেটাও এরকমই একটা সাইট। কিন্তু বাংলায় এভাবে কাজ চালানো দ্বিগুণ শক্ত। কারণ সারা ভারতের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের উপরেও হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা তো চলছেই, সেইসঙ্গে বাংলা যে একটা ফালতু ভাষা, সেটা বাঙালিরা নিজেরা সবচেয়ে বেশি করে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। এই যে আমি বক্তৃতা দিচ্ছি বাংলায়, আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে সংস্কৃত বিভাগ। অথচ এই ফ্লেক্সটা লেখা হয়েছে ইংরেজিতে। এমতাবস্থায় তোমাদের বাংলায় সাংবাদিকতা করতে বলি কী করে? আদৌ সাংবাদিক হতেই বা বলি কী করে, যা তোমাদের মাস্টারমশাইরা আমাকে বলতে বলছেন? বলার সমস্যা আছে।

পৃথিবীর কোন দেশে সাংবাদিকরা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন তা নিয়ে প্রতি বছর একটা সমীক্ষা হয়। ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স’ বলে এক আন্তর্জাতিক সংগঠন এই সমীক্ষা করে। ২০২২ সালের সর্বশেষ সমীক্ষায় ভারতের স্থান ছিল ১৮২টা দেশের মধ্যে ১৫০ নম্বরে। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক – যাঁদের মধ্যে তোমাদের সবচেয়ে জানা নাম হয়ত গৌরী লঙ্কেশ – খুন হয়ে গেছেন। খুন হয়ে যাওয়া সাংবাদিকদের একটা লম্বা তালিকা দেওয়া সম্ভব। বক্তৃতা অতি দীর্ঘ হয়ে যাবে বলে সে তালিকা দিচ্ছি না। শুধু এইটুকু তোমাদের বলে দিই, যে খুন হয়ে যাওয়াই একমাত্র সম্ভাব্য বিপদ নয়। তোমরা হয়ত সিদ্দিক কাপ্পান বলে একজনের নাম শুনেছ। তিনি কেরালার সাংবাদিক। উত্তরপ্রদেশে একটি দলিত মেয়ে ধর্ষিত হয়, খুন হয়, তারপর অভিযোগ ওঠে যে রাজ্যের পুলিসই নাকি দেহটা তার বাবা-মাকে অন্ধকারে রেখে রাতের অন্ধকারে জ্বালিয়ে দিয়েছে। সারা পৃথিবীর লোক টিভির পর্দায় দেখে ফেলেছে ঘটনাটা। তারপর সে ঘটনা নিয়ে আরও গভীরে লিখবেন বলে কেরালা থেকে সিদ্দিক যাচ্ছিলেন হাথরাসে। তিনি পৌঁছবার আগেই, কোনো প্রতিবেদন লেখার আগেই, স্রেফ লিখতে পারেন বলেই পুলিস তাঁকে গ্রেপ্তার করে হাজতে পুরে দেয়। তারপর দুবছরের বেশি সময় কারাবাস করে সিদ্দিক এই কিছুদিন আগে জামিন পেয়েছেন। জামিন, খালাস নয় কিন্তু। মানে মামলাটা এখনো চালু আছে। অথচ পুলিস তাঁর বিরুদ্ধে যা যা অভিযোগ করেছে তার পক্ষে বিন্দুমাত্র প্রমাণ দেখাতে পারেনি।

এইরকম বিপদের মুখে আমাদের দেশের সাংবাদিকরা এখন সাংবাদিকতা করেন। তোমরা ঠিক আমার ছেলেমেয়ের বয়সী নও, কিন্তু আমার ভাইবোনের মত তো বটেই। তা আমি এগুলো জেনেশুনে কী করে তোমাদের বলি, যে সাংবাদিকতা করো? ভারত সরকার অবশ্য বলেছে যে ওই সমীক্ষাটা ভুল। মেথডোলজি ভুল, অনেক কম নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ইত্যাদি। কিন্তু আমি যদি কোনো মেয়ের বাবা না হতাম, তাহলে হয়ত কায়মনোবাক্যে সরকারের কথা বিশ্বাস করে নিয়ে তোমাদের বলতে পারতাম, ঠিক আছে। সরকার একটা কথা বলেছে আর একটা সংগঠন উল্টো কথা বলেছে। তোমরা নিজেরা ময়দানে নামো, নেমে পরখ করে দ্যাখো সত্যিটা কী। কিন্তু আমি বাপু তোমাদের সে ঝুঁকি নিতে বলতে পারছি না।

এ প্রসঙ্গে বলে দিই, ইতিহাস বলছে কোনো দেশ যখন সাংবাদিকদের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, তখন সাহিত্যিকরাও শান্তিতে থাকতে পারেন না। তোমরা তেলুগু ভাষার কবি ভারভারা রাওয়ের কথা হয়ত জানো। এই অশীতিপর কবিও দীর্ঘকাল কারান্তরালে কাটিয়েছেন ওইরকমই আরেকটা অভিযোগে, যা পুলিস আজ অব্দি প্রমাণ করতে পারেনি। আপাতত জামিনে বাইরে আছেন অসুস্থ বলে। পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে অভিজিৎ রায়ের মত ব্লগারদের হত্যার কথাও তোমরা নিশ্চয়ই জানো। ব্লগাররা ঠিক সাহিত্যিক না হলেও সাংবাদিকতা আর সাহিত্যের মাঝামাঝি একটা জায়গায় বিচরণ করেন বলা যায়। আবার বিশ্ববিখ্যাত সলমন রুশদির উপর প্রাণঘাতী আক্রমণের কথাও নিশ্চয়ই জানো। তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচেছেন, একটা চোখ প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদাহরণ অসংখ্য, যা থেকে বোঝা যায় সারা পৃথিবীর সাংবাদিক এবং সাহিত্যিকদের জন্যে এ বড় সুখের সময় নয়, এ বড় আনন্দের সময় নয়।

আরও পড়ুন সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্রের স্তম্ভ নয়, গণতন্ত্রই সংবাদমাধ্যমের স্তম্ভ

কী করে সাংবাদিক হতে হয় আসলে সেটাই আমি এতক্ষণ ধরে বলেছি, যদি তোমরা বুঝে থাকো। কিন্তু কী করে সাংবাদিকতার চাকরি পেতে হয় তা বলা আমার সাধ্যের বাইরে। কারণ সমস্ত সংবাদমাধ্যম ব্যাপকভাবে সাংবাদিক ছাঁটাই করেছে গত ৫-৬ বছরে। কোভিড-১৯ আসার আগে থেকেই বহু কাগজ, টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিল। অতিমারীর সময়ে ওটাকে অজুহাত করে আরও বেশি কর্মী সংকোচন করা হয়েছে, বহু বড় বড় কাগজ তাদের অনেক জায়গার সংস্করণ তুলে দিয়েছে, যেগুলো রেখেছে সেখানেও প্রচুর সাংবাদিক এবং অন্যান্য বিভাগের কর্মীদের চাকরি গেছে। যে সাংবাদিকদের চাকরি যায়নি, তাঁরা অরওয়েলের ভাষায় পাবলিক রিলেশন করতে বাধ্য হচ্ছেন। আজকাল পাবলিক রিলেশন যেহেতু নিজেই একটা আলাদা পেশা, সেহেতু ও কাজটা করতে হলে সরাসরি তাতে যাওয়াই ভাল। কারণ তাতে সাংবাদিকদের চেয়ে বেশি মাইনে পাওয়া যায়। কোথায় শিখবে? কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় – তিনটে জায়গাতেই সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগের পাঠক্রমের অঙ্গ হিসাবেই ওটা পড়ানো হয়। যারা আরেকটু দূরে যেতে পারবে, তারা ওড়িশার ঢেঙ্কানল বা দিল্লির ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ মাস কমিউনিকেশনসে পড়তে পারো। এছাড়া আছে চেন্নাইয়ের এশিয়ান কলেজ অফ জার্নালিজম। এগুলো অনেকদিনের প্রতিষ্ঠান। এছাড়া একগুচ্ছ নতুন সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে যারা সাংবাদিকতা এবং পি আর পড়ায়। তাদের তত্ত্বতালাশ তোমরা গুগল করলেই পাবে।

যে কথাটা বলে শেষ করব সেটা হল সাহিত্য যেমন সাংবাদিকতার মত অপ্রিয় সত্য উদ্ঘাটন করে তেমন সাংবাদিকতাও দেখার গভীরতায় এবং ভাষার সৌন্দর্যে সাহিত্যে বা শিল্পে উত্তীর্ণ হতে পারে। যে কারণে শুরুতেই প্রশ্ন তুলেছিলাম, অলঙ্করণ করলে কি সাংবাদিকতা আর সাংবাদিকতা থাকে না? উত্তর হল আলবাত থাকে। বস্তুত, সঠিক অলঙ্করণ ছাড়া সাংবাদিকতা যে বার্তা দিতে চাইছে তা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। পাঠকের কাছে আদৌ না পৌঁছতে পারে। সাংবাদিকতা সম্পর্কে আমরা এভাবে ভাবতে অভ্যস্ত নই, কারণ সাংবাদিক বলতেই আমরা রিপোর্টার বুঝি। কথাটার মানে আসলে সাংবাদিক নয়। রিপোর্টার মানে প্রতিবেদক, যিনি যা ঘটেছে তার প্রতিবেদনটা এনে দেন। সেটা অবশ্যই সাংবাদিকতা, কিন্তু ওই প্রতিবেদনকে যথাযথভাবে সাজিয়ে পাঠক বা দর্শকের সামনে হাজির করা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ। সেই কাজ যাঁরা করেন তাঁদের মধ্যে অনেকরকম লোক আছেন। এক দলের নাম সম্পাদক। কোন খবরটা নেব, কোনটা নেব না তা সম্পাদকরা ঠিক করেন। কোন খবরটাকে কীভাবে নেব তাও সম্পাদকরা ঠিক করেন। কোন খবরটা কাগজের প্রথম পাতায় যাবে, কোনটা ভিতরে যাবে; কোনটা প্রথম পাতায় ছবিসহ বড় করে যাবে, কোনটা ছোট করে এক কলমে যাবে – এই সমস্ত সিদ্ধান্ত, যা বাদ দিয়ে সাংবাদিকতা হয় না, সেগুলো সম্পাদকরা নেন। উপরন্তু সংবাদের অলঙ্করণ মানে শুধু সম্পাদনাও নয়। চিত্রসাংবাদিক বা ফটোগ্রাফারদের আমরা সাংবাদিক ভাবতে অভ্যস্ত নই, কিন্তু তাঁদের কাজ আসলে সাংবাদিকতার ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এমন সব ছবি তোলা সম্ভব যে ছবি নিজেই গোটা ঘটনাটা বলে দেবে, আলাদা করে প্রতিবেদন লেখার দরকারই হবে না। তার উপর কাগজ, টিভি, ওয়েবসাইট – সর্বত্রই আছেন গ্রাফিক ডিজাইনাররা। তাঁরা কোনো প্রতিবেদনের নির্যাস বা প্রতিবেদনের অতিরিক্ত কিছুও আকর্ষণীয় করে তুলে ধরতে পারেন। এতরকম অলঙ্করণ ঠিকঠাক হলে, তবে কাজটা সাংবাদিকতা হয়ে ওঠে। মানে প্রকৃত অলঙ্করণ ছাড়া সাংবাদিকতা হয় না।

এছাড়াও সাংবাদিকতার মধ্যেই প্রতিবেদন বা রিপোর্টের চেয়েও গভীরে গিয়ে লেখা হয় এবং সাহিত্যে উত্তীর্ণ হতে পারে এরকম এক স্বতন্ত্র ধারা আছে। তার নাম রিপোর্টাজ। বাংলা ভাষায় যাঁরা ভাল রিপোর্টাজ লিখেছেন তাঁদের একজন দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি আমাদের ভাষার একজন উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিকও বটে। তাঁর একটা ছোট্ট রিপোর্টাজের নাম ‘মাটিতে এক ঋতু’। তার শেষদিকটা পড়ে এই বক্তৃতা শেষ করব। এখানে দীপেন্দ্রনাথ লখনৌয়ের উপকণ্ঠে একটা বস্তির কথা লিখছেন।

… পেছনে ভাঙা লোহার বেড়ার ওপর দিয়ে রেললাইন চলে গেছে কানপুরের দিকে। সামনেও কালো পিচের চওড়া রাস্তা। বাঁ দিকে পচা নালা, দক্ষিণে মজা নর্দমা। ধার ঘেঁষে মানুষ তার প্রতিদিনের কাজটুকু সেরে রেখেছে। জমাট দুর্গন্ধ। আর এরই মধ্যে ওদের সেই এক টুকরো পৃথিবী। যার ওপর দিয়ে অন্তত খ্রিস্ট জন্মের পরও এক হাজার ন’শো চুয়ান্নটি বসন্ত চলে গেছে।

মাথা হেঁট করে ফিরে আসছিলাম। কিন্তু, হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হল।

অবাক বিস্ময়ে দেখলাম একটা খুপরির দোরগোড়ায় আধহাতটাক জমি কুপিয়ে কে যেন দুটো ঝাউ আর কী একটা বুনো ফুলগাছের ডাল সযত্নে পুঁতে দিয়েছে। এত ছোট যে চোখে পড়ে কি পড়ে না। জমিটার চারপাশ সুন্দর করে নিকোনো। এত তুচ্ছ যে সহজেই দৃষ্টি এড়িয়ে যায়।

জিজ্ঞেস করলাম : কে পুঁতেছে রে?

আধডজন ছেলে কাছেই খেলা ছেড়ে অবাক হয়ে আমাদের দেখছিল। ছুটে গিয়ে সামনের অন্ধকার কুঠরিটা থেকে কানহাইয়ালালকে ধরে আনল। নাম জানতে চাইলাম। রুগ্ন বাছুরের মতো নির্বোধ আর অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে সে উত্তর দিল।

বললাম : এই ডাল তুমি পুঁতেছ এখানে?

অপরাধীর ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়ল সে।

জিজ্ঞেস করলাম : কেন?

মিষ্টি সুরে দেহাতি ঢঙে সে উত্তর দিল : কাহে, গাছ হোবে।

গাছ হলে কী হবে?

আবার সে বিমূঢ় দৃষ্টিতে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ফিক করে হেসে ফেলল হঠাৎ। হলদে রঙের ছোট্ট দাঁতগুলো বার করে কেমন এক সলজ্জ ভঙ্গিতে বলল : কাহে, ফুল হোবে।

বললাম : ফুল হোনেসে কেয়া হোগা কানহাইয়ালাল?

কিছু না ভেবেই ঝটপট উত্তর দিল সে : কাহে, সুন্দর হোবে।

আর প্রশ্ন করতে পারলাম না। দেখলাম ওখানকার শ্রমিকনেতা, আমাদের সঙ্গী সরফজি এক দৃষ্টিতে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁরও চোখে শিল্পীর দৃষ্টি। তাঁর ঠোঁটেও কী এক সার্থকতার হাসি।

তারপর কলকাতায় ফিরে এসেছি।

এখানে দৈনিক স্টেটসম্যান পড়ি, সাপ্তাহিক ‘দেশ’-এর পাতা ওলটাই। অ্যালবার্ট হলে বসে বিবর্ণ কফির স্বাদে মশগুল থেকে বন্ধু আর পরিচিতের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে, সাহিত্য নিয়ে তর্ক করি। আবার, ইতিহাসের নতুন মূল্যবোধকে যাচাই করার জন্য ডাক এলে ছুটে যাই ময়দানের সভায়। জীবন এখানে দ্রুত, বৈচিত্র্য আর পরস্পর-বিরোধিতার আবর্তে প্রাণ এখানে অবিরাম দোলায় দুলছে।

কিন্তু এরই মধ্যে থেকে থেকে মনে পড়ে যায় সেই দিনটা। মন্ত্রের মতো কতকগুলো কথা আর স্বপ্নের মতো গোটা দুই মুখ।

আর মনে হয়, আবার ফাল্গুন আসছে।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত