বাঙালি ভালো নেই, বাংলা থিয়েটারও ভালো নেই। স্বভাবতই থিয়েটার শিল্পীরাও ভালো নেই। অন্তত কয়েকজন চেষ্টা করছেন এই ভালো না থাকা দর্শকের সামনে তুলে ধরতে। সেই প্রয়াসে এই মুহূর্তে অন্তত দুটো একক নাটক হচ্ছে আমাদের আশপাশের মঞ্চে। হাওড়ার দল নটধার অর্ণ মুখোপাধ্যায় নিজের সৃজনে করছেন আবহমান; দিল্লির ধৃ আর্ট অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের শান্তনু মল্লিকের নির্দেশনায়, হাতিবাগান সঙ্ঘারামের সহযোগিতায়, তথাগত চৌধুরী করছেন দ্য মাস্কারেড। এমন নয় যে বাংলা থিয়েটারে একক অভিনয় বিরল। এই কালখণ্ডেই প্রয়াত শাঁওলী মিত্রের প্রবাদে পরিণত নাথবতী অনাথবৎ নতুন করে করছেন অর্পিতা ঘোষ। আমাদের দেখার সৌভাগ্য হয়নি, কিন্তু গত শতকের আট-নয়ের দশকে শাঁওলীর ওই নাটক এবং কথা অমৃতসমান অনেককেই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। পরে অডিও ক্যাসেটে আমাদের কাছেও সেই নৈপুণ্যের ছিটেফোঁটা এসে পৌঁছেছিল, একইভাবে এসেছিল বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের শকুনির পাশা। কিন্তু সেসব মহাভারতাশ্রয়ী কাহিনির সাহায্যে সত্যান্বেষণ। এই মুহূর্তে অর্ণ আর তথাগত যা করছেন তার মৌলিকত্ব এই যে, তাঁরা পুরাণ বা রূপকের আশ্রয় ছেড়ে নগ্ন বর্তমানে দাঁড়িয়ে নিজেরই ভিতরটা খুঁড়ে দর্শককে দেখাচ্ছেন। অর্ণর নাটকের কেন্দ্রে তবু একজন চরিত্র আছে, যার নাম অর্ণ নয়। তথাগত যে চরিত্রে অভিনয় করছেন সে চরিত্রের কোনো নামও নেই। সে স্রেফ একজন অভিনেতা। দর্শক আর অভিনেতার মধ্যে যে ন্যূনতম আড়াল, তাও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাংলা থিয়েটারের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনেককিছুই এখন মন খারাপ করিয়ে দেওয়ার মত, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হতাশ করার মত। তার মধ্যেও অন্তত দুটো নাটকে এইরকম চেষ্টা হচ্ছে— এ নেহাত সামান্য কথা নয়।
আবহমান নাটকটা দাঁড়িয়ে আছে অর্ণর গল্প বলতে পারার ক্ষমতার উপরে। গল্পটা খুব সামান্য একজন মানুষের অসামান্য যন্ত্রণার। বাঙালি সমাজে ঘাপটি মেরে থাকা ভণ্ডামি, বিশেষত বর্ণবাদ সম্পর্কে ভণ্ডামির উপর, এর আগেও আলো ফেলেছেন অর্ণ। উইলিয়ম শেক্সপিয়রের ওথেলো নাটকের সৃজনান্তর অথৈ এক দশকের কাছাকাছি সময় অত্যন্ত মঞ্চসফল ছিল, যদিও সিনেমায় দর্শকানুকূল্য পায়নি। আবহমানেও একজন নিম্নবিত্ত এবং নিম্নবর্গীয় মানুষের কাহিনিই রয়েছে, যার আশৈশব যন্ত্রণার কারণগুলোর মধ্যে মিশে আছে বর্ণাশ্রমে তার অবস্থান। তবে এই নাটকের সেটাই বিষয় নয়। বিষয় তাহলে কী? এক অর্থে দর্শকই এই নাটকের বিষয়। কারণ সুচারু আত্মহননের ঠিক আগের মুহূর্তে এক ব্যর্থ সাহিত্যিক, ব্যর্থ ব্যক্তির বয়ানে যে জীবনের ছবি উঠে আসে— তা গত তিন-সাড়ে তিন দশকের পশ্চিমবঙ্গের একজন গড়পড়তা যুবকেরই জীবন। আমাদের প্রেম-অপ্রেম, সাফল্য-ব্যর্থতা, শক্তি-দুর্বলতা, সততা-শঠতা, উদ্যম-আলস্য, নারীর উপরে পৌরুষ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আমাদেরই চোখের সামনে তুলে ধরেন অর্ণ। নাটকের বিভিন্ন মুহূর্তে যে বাবা, মা, প্রথম প্রেম, প্রাণের বন্ধু, বন্ধুর বউ, কলেজের বান্ধবী, প্রেরণাদাত্রী প্রেমিকা, হতাশ স্ত্রী, আলোর মত শিশুসন্তান এবং অন্ধকার অপরাধীরা ফুটে ওঠে অর্ণর অবয়বে— তাদের সঙ্গে আমাদের আত্মার আত্মীয়দের কোনো তফাত নেই। ফলে যখন মঞ্চের উপরে চলতে থাকা ঘড়িতে সময় ফুরিয়ে আসা টের পাওয়া যায়, বেজে ওঠে শেষ ঘন্টা আর মঞ্চের ধারে চলে এসে অর্ণ দর্শকদের আঙুল তুলে অভিযুক্ত করেন এই বলে যে, চলে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু তোমাদেরই তৈরি করা সমাজে আমার বেঁচে থাকার আর উপায় নেই, তখন পালাবার পথ পাওয়া যায় না। সৌমিত দেবের কবিতার পংক্তি আর প্রয়াত জয়দেব ঘোষের ‘মুহূর্তে অমৃত মানুষ মুহূর্তে বিষ’ হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার মত বিশ্বাসযোগ্য লাগে।
মানসিক ও শারীরিকভাবে একেবারে কোণঠাসা হয়ে যাওয়া একজন মানুষকে জ্যান্ত করে তুলতে, একটা লাঠি আর একখানা অস্বস্তিকর বসার জায়গা— দৃশ্যত অর্ণর প্রপ বলতে এটুকুই। কিন্তু তিনি আসল প্রপ করে তোলেন নিজের শরীরকে। কেন্দ্রীয় চরিত্রের আলাদা ব্যক্তিত্ব তৈরি করেন তার অস্থির বাচনভঙ্গি, অনবরত গা চুলকানো, খুঁড়িয়ে চলা দিয়ে। অতীতের মানুষটা যে অন্যরকম ছিল তা বেরিয়ে আসে এসবের মসৃণ অন্তর্ধানে। মঞ্চে অন্য চরিত্রগুলোকে দেখি না, কিন্তু তাদের চোখ দিয়ে কেন্দ্রীয় চরিত্রটাকে দেখি। কখনো অর্ণ গোটা মঞ্চের অধীশ্বর হয়ে ওঠেন, কখনো মঞ্চের শূন্যতা আরও বড় দেখায় তাঁর পড়ে পড়ে লাথি খাওয়ায়, হাহাকারে। জীবনের কাছে হেরে যাওয়া মানুষটা যখন বিরতির পর উদ্ধত ঔদাসীন্যে দর্শকদের সরাসরি বলে— অনেকের হয়ত একঘেয়ে লাগছে। ভালো না লাগলে চলে যেতে পারেন; তখন গুলিয়ে যায়— কথাটা চরিত্র বলছে, নাকি অভিনেতা বলছেন। বাংলা নাটকের এই নড়বড়ে যুগে, জনপ্রিয় হওয়ার জন্যে শস্তা চমকের যুগে স্বয়ং অর্ণই কি জেরজি গ্রোটোওস্কির মত দরজা বন্ধ করে সেই থিয়েটার করতে চাইছেন, যা যার দরকার সে এসে দেখে নেবে?
আরও পড়ুন অপর আর বিজ্ঞানের চিরকালীন ট্র্যাজেডির মঞ্চায়ন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন
তথাগতর দ্য মাস্কারেড আবার আক্ষরিক অর্থে দরজা বন্ধ করে অভিনয়। এখানে মঞ্চ মানে একখানা ঘর, হলঘর বলার মত বড়ও নয়। সেখানে প্রসেনিয়াম বলেও কিছু নেই। দর্শক ঢুকে পড়েন নাটকের সাজঘরে, কোণের দরজা দিয়ে এসে হাজির হন অভিনেতা। কয়েক ঘন্টা পরেই তিনি মঞ্চে উঠবেন। দর্শকের কাছে তাঁর কিছুই লুকোবার নেই, লুকোবার উপায়ও নেই। অভিনয়ের আগে একটু স্বাস্থ্যকর খাবার দূরের কথা, সাজঘরেই চা বানিয়ে খাওয়ার উপায়টুকুও যে নেই— তা দর্শকের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় শুরুতেই। এখানে প্রপের অভাব নেই, বরং প্রাচুর্য আছে। এমন অনেককিছুই আছে যা দর্শক দেখে ফেললে নাটকের প্রার্থিত রহস্য আর থাকে না। কিন্তু সেটাই উদ্দেশ্য। তথাগত বেসিনে হাত ধোন দর্শকের সামনে, মুখে রং মাখেন দর্শকের সামনে, এমনকি শুধু অন্তর্বাসটুকু রেখে পোশাক পরিবর্তনও করেন দর্শকের সামনেই। অন্তরাল আছে, সেখান থেকে ভেসে আসে শব্দ। সেই শব্দের সঙ্গে আদানপ্রদানও করেন তথাগত, কিন্তু অন্তরালে যান না। মুখোশের পিছনে না গিয়ে, অভিনেতার মুখোশের পিছনের মানুষটাকেই উলঙ্গ চেহারায় দর্শকের সামনে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন।
এই নাটকে আয়নার মুখোমুখি বসে দর্শকের চোখের সামনেই তথাগত দাঁতের ফাঁকের ময়লা খুঁটে পরিষ্কার করেন। এত কাছ থেকে দেখা যায় বলেই শিহরিত হয়ে দেখতে হয়— কী অনায়াসে শুধুমাত্র মুখের পেশির ব্যবহারে গোবেচারা থিয়েটার অভিনেতা থেকে রামলীলার হনুমান, সেখান থেকে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া হিংস্র শাখামৃগ, ঋত্বিক ঘটক রচিত গল্পের দেহাতি শ্রমিক ও শ্রমিক নেতা এবং ফাউস্ট ও মেফিস্টোফিলিস হয়ে যান তথাগত। দেখতে দেখতে আফসোস হয়, সিনেমায় নেমে নাম না করলে গুণী অভিনেতাদের আমরা চিনতে পারি না, আদৌ জানতে পারি না। অভিনেতার নিজের আফসোস হয় না? নাম, যশ, অর্থ, প্রতিপত্তির কথা না ভেবে যিনি অভিনয় করে যেতে পারেন সারাজীবন, তিনিই নাকি সৎ শিল্পী। বাকিরা জনপ্রিয়তার কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেওয়া ‘মাল’— এমন একটা বয়ান খুব জনপ্রিয় হয়েছে আজকাল। সেই বয়ানকে মাটিতে আছড়ে ভেঙে ফেলে এই নাটক। মই বেয়ে অনেক উপরে উঠে গিয়ে তথাগত সোচ্চারে জানিয়ে দেন, বস্তিবাসীর চরিত্রে অভিনয় করতে করতে তিনি টের পেয়েছিলেন— শাহরুখ খানের মন্নতের মত অট্টালিকা তাঁরও চাই। কিন্তু প্রবল প্রতিভা থাকলেও সবাই শাহরুখ হতে পারে না। তা জেনেই অভিনেতাকে লড়ে যেতে হয়, সারাক্ষণ লড়ে যেতে হয় মেফিস্টোফিলিসের সঙ্গে। এই দ্বন্দ্বটাই আর সব দ্বন্দ্বের চেয়ে অভিনেতাকে পোড়ায় বেশি।
মুশকিল হল, অভিনেতা ধূপের মত। না পোড়ালে গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে। অর্ণ আর তথাগত— দুজনেই দারুণ সব গন্ধ ঢেলে দিয়েছেন। কখনো বারুদগন্ধ, কখনো পারিজাতগন্ধ। অর্ণ যত একের পর এক চরিত্রের কাহিনির আয়নায় কেন্দ্রীয় চরিত্রকে দাঁড় করান, তত উদ্ভাসিত হতে থাকে তাঁর ভিতরের অভিনেতা। তথাগত নিজের মুখে নতুন করে যত রং চড়ান, যত পোশাক বদলে নতুন চরিত্রকে ধারণ করেন নিজের শরীরে, তত মুখোশের নিচ থেকে বেরিয়ে আসে অভিনেতার মুখ। অর্ণ যেহেতু তাঁর কাজের জন্যে বেছে নিয়েছেন প্রসেনিয়াম, তাই দর্শক হিসাবে তবু তাঁর থেকে কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে থাকা সম্ভব হয়। ন্যাশনাল মাইম ইনস্টিটিউটের ঘরে তথাগতর দহন এত কাছে চলে আসে যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতাও কাজ করে কোনো কোনো মুহূর্তে— এই বুঝি নিজের গায়েই আগুন লেগে গেল।
দু-এক কথা অবশ্যই বলা যায় নাটক দুটোর অপূর্ণতা সম্পর্কে। যেমন অর্ণর নাটকে উৎকণ্ঠার একটা পরত যোগ করে মঞ্চে ঝুলতে থাকা ইলেকট্রনিক ঘড়িখানা, যার উদ্দেশ্য জানিয়ে দেওয়া— চরিত্রটার বেঁচে থাকার সময় ফুরিয়ে আসছে। সাধারণ ঘড়ি না হয়ে যদি ওতে কাউন্টডাউনের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়ত আরও ভালো হত। আর একক নাটকও যেহেতু যৌথতার উৎপাদন, সেহেতু প্রযোজনায় সহায়তা করেছেন যাঁরা এবং মাঝে কয়েকবার মঞ্চে আসেন যাঁরা— তাঁদের নাম কোনোভাবে দর্শকদের জানানোর ব্যবস্থা থাকলে ভালো হত। শান্তনু-তথাগতর নাটকের সমাপ্তি যেন হঠাৎই এসে পড়ে। অভিনেতার নিজেকে আবিষ্কারের লড়াইয়ের অবসান (closure) হল বলে মনে হয় না। অবশ্য এটা এই আলোচকের মত অনভিনেতার ভ্রান্তিও হতে পারে। হয়ত শান্তনু বা তথাগতর মতে, অভিনেতার নিজেকে আবিষ্কারের লড়াই কখনো শেষ হয় না। থিয়েটার তো বায়বীয় কিছু নয়, অভিনেতারও প্রেক্ষাগৃহের বাইরে অস্তিত্ব আছে। সেখানে যখন দিনরাত অশান্তি চলছে, তখন নাটক আর তার অভিনেতা কোন বিন্দুতে পৌঁছে প্রশান্ত হবে?
নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত
