পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সাহিত্যে এই মুহূর্তে বীভৎসতার কোনো অভাব নেই। ভূত প্রেত দত্যি দানো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। শীত জমে উঠলেই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় যে অসংখ্য বইমেলা হয় এবং শীত বুড়িছোঁয়া করে কলকাতা ত্যাগ করার সময়ে করুণাময়ীতে যে বইমেলা হয়, সেগুলোতে একাধিক স্টলে বেশ কয়েকজন লেখকের কুচকুচে কালো বা টকটকে লাল রংয়ের ভয়াবহ দৃশ্যওলা প্রচ্ছদের প্রচুর বই দেখতে পাওয়া যায়। স্টলে খানিকক্ষণ সময় কাটালেই বোঝা যায় সেসব বইয়ের কাটতি ভালই। তবে প্রচ্ছদ পেরিয়ে বইয়ের ভিতরে ঢুকলে প্রায়শই ভয়ের চেয়ে হাসি পায় বেশি। মুণ্ডহীন ধড়ের বর্ণনায় লাল চোখের কথা লেখা হলে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার চেয়েও চিন্তার কথা এই যে, সেসব বইয়ের অনেকগুলোই শিশুপাঠ্য, কিশোরপাঠ্য হিসাবে বিক্রি হয়। শিশুদের জন্য প্রকাশিত শারদ সাহিত্যও এই ধরনের গল্প, উপন্যাসে ছেয়ে থাকে। সমস্যা শিশুদের জন্য ভূত প্রেতের গল্প লেখায় নয়। সারা পৃথিবীর শিশুরাই চিরকাল ওসব পড়তে ভালবাসে, পড়লে সর্বনাশ হবে এমনও নয়। কিন্তু শিশুদের জন্য বীভৎস রস পরিবেশন করতে গেলে যে সংবেদনশীলতা দরকার তা এইসব সাহিত্যকর্মে দেখা যায় না – সমস্যা সেইখানে।
এই আবহে শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের একানড়ে চমকে দেয়। কারণ তিনি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য একখানা সফল ভয়ের উপন্যাস লিখেছেন এক শিশুকে কেন্দ্রে রেখে। সেই চরিত্র নির্মাণে যে সংবেদনশীলতা রয়েছে তা কেবল একজন যত্নশীল ভাষাশিল্পীর পক্ষেই রক্ষা করা সম্ভব। বাংলাভাষী শিশুদের দুর্ভাগ্য যে এই সংবেদনশীলতা তাদের জন্য লেখা ভয়ের গল্পে আজকাল থাকে না।
আরও পড়ুন হৃদয়ে ভোরের শব্দ: কোলাহলহীন কবিতা
আসলে আজকের শিশুরা একা। বড়দের বহুযুগব্যাপী নিচতা, শঠতা, হিংস্রতা তাদের একা করে দিয়েছে। সেই একাকিত্ব ভয়ানক, রক্তাক্ত। বাঙালি ঘরে বহুকাল ধরে প্রচলিত একানড়ের গল্পকে আশ্রয় করে সেই ভয়াবহতার আখ্যান লিখেছেন শাক্যজিৎ। এই কাহিনি পড়তে গিয়ে ভয়ের গল্পের পরিচিত গা শিরশিরে ভাব অনুভব করতে করতে হঠাৎ দেখি এক অপরিচিত অতিকায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তাতে নিজের বীভৎস চেহারা দেখে নিজেই চমকে উঠি। এক আতঙ্ক থেকে ক্রমশ আরেক আতঙ্কে তলিয়ে যাওয়া এক শিশুকে বাঁচাতে পারা যাচ্ছে না, যাবে না, আমাদেরই পাপের ফলে এমনটা ঘটছে – একথা উপলব্ধি করার অসহায়তা টুনুর পরেশমামার মত পাঠককেও পেঁচিয়ে ধরে। না ধরলে বুঝতে হবে, আমাদের মধ্যে আর অন্যের জন্যে বেদনা অনুভব করার সংবেদন অবশিষ্ট নেই। টুনুর বাবা, মা এবং মামাবাড়ির গ্রামের যেসব হৃদয়হীনদের পাপ টুনুকে একা করে দিয়েছে; আমরাও তাদের দলেই পড়ি। একটা ন বছরের ছেলে কতখানি একা হলে তার চোখে
হেমন্তের চাঁদ রক্তাক্ত হয়, ভরা পূর্ণিমায় গোল থালাটির দিকে তাকালে স্পষ্টত যে ক্ষরণ। নিঃশব্দ অন্ধকার জঙ্গলের ওপর থমথমে চাঁদটি যখন জ্যোৎস্নার আঁচল বিছিয়ে দিচ্ছে মাঠময়, টুনুর মনে হয়েছিল এই আলোতে চরাচরের আপাদমস্তক সে মুখস্থ করে ফেলতে পারে। সন্ধেবেলাই ঝট করে একবার বেরিয়ে তালগাছে নিচে চিঠি রেখে এসেছে, ফলত ঝিমঝিম রাত্রে সারা শরীরে সুখকর ব্যথাজ্বরকে চাখতে চাখতে টুনু ঘুমিয়েই পড়ত, কারণ অন্য অবকাশ কি উপদ্রব এই মুহূর্তে তার কাছে কিছুই ছিল না, যদি না অনিচ্ছা সত্বেও [মুদ্রণ প্রমাদ] নিজেকে টেনে হিঁচড়ে যেতে হত বাথরুমে। যেহেতু সে আর বিছানায় হিসি করবে না, আর রাগিয়ে দেবে না দিদাকে, তাই ঘুমের আগে বাথরুমে যাওয়া, জল না খাওয়া তেষ্টা পেলেও, এগুলোই রোজকার প্র্যাকটিস। এবং বাথরুমে যেতে গিয়েই টুনুর চোখে পড়ল ছোটোমামার ঘর।
বাড়ি ভর্তি লোক থাকা সত্ত্বেও শিশুর এই নিদারুণ একাকিত্ব এবং তার ফলে জীবিতের চেয়ে মৃতের সঙ্গে কথাবার্তা চালাবার অধিকতর আগ্রহ একানড়েকে জীবন্ত এবং ভয়াবহ করে তোলে। ভীষণদর্শন ভূত বা রক্তারক্তির বর্ণনা দিয়ে ভয়ের আবহ তৈরি করা বিশেষ শক্ত নয়, বরং ক্লান্তিকর। কিন্তু আকারে ইঙ্গিতে তিলে তিলে দমবন্ধ করা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করার যে মুনশিয়ানা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বা সত্যজিৎ রায়ের গল্পে দেখা যায়, তা এই বইয়ের পরতে পরতে রয়েছে। যদিও মামাবাড়িতে টুনুর অসহায় একাকিত্ব মনে পড়িয়ে দেয় বাংলা সাহিত্যের অন্য এক প্রবাদপ্রতিম শিশুচরিত্রকে – অপরাজিত উপন্যাসের কাজল। হয় সচেতনভাবে অথবা অবচেতনে শাক্যজিৎ, কাজল আর টুনুর মিলে, অমিলে লিপিবদ্ধ করেছেন বাঙালি সমাজের গত প্রায় এক শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া বিবর্তন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, যতদিন কাজলের দিদিমা জীবিত ছিলেন ততদিন তার আদর ছিল। টুনুর দিদিমা জীবিত, কিন্তু তাঁকে টুনুর বেশ দূরের মানুষ বলেই মনে হয়। কাজল জানত সে জন্মের পরেই মাকে হারিয়েছে, কিন্তু প্রবল হতাশার মধ্যেও তার মনে আশা ছিল – একদিন বাবা আসবে, তাকে যারা অনাদরে রেখেছে তাদের প্রত্যেককে বকে দেবে। কিন্তু একানড়ে যত এগোয়, টুনুর বিশ্বাস তত দৃঢ় হয় যে মা ফোনে যতই আশ্বাস দিক, তাকে আসানসোলে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আসবে না। আর টুনুর বাবার উপস্থিতি তো কেবল মায়ের সঙ্গে কলহের স্মৃতিতে।
বড়দের তৈরি এই হৃদয়হীন সমাজে আমাদের শিশুরা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের চোখের সামনেই। আমরা খেয়াল করছি না। বাবান, সুতনু, গুবলু, টুনু – এরা সকলে আসলে একই পথ দিয়ে পাতালপ্রবেশ করছে। আমাদের ভয় পাওয়া দরকার, অথচ আমরা ভয় পাচ্ছি না। আমরা বুঝতে পারছি না, যে পাপ আমরা করে চলেছি তা থেকে আমাদের কারোর নিস্তার নেই। যেভাবে
কেউ মরে গেছে, কেউ পাগল হয়ে গেছে, গণেশকে যখ টেনে নিয়ে গিয়েছিল পুকুরের তলায়, রাত্রে বডি ভেসে ওঠে, কৃষ্ণ বাস চাপা পড়ে মরেছে, বাবাইকে ছাদের ওপর থেকে ঠেলে ফেলে দিয়ে–
সেভাবে আমাদের সবাইকেই পাপের ফল ভোগ করতে হবে। শাক্যজিৎ ভয় দেখিয়ে দিলেন।
একানড়ে
লেখক: শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
প্রকাশক: সপ্তর্ষি প্রকাশন
প্রচ্ছদ: এক্ষণ পাল
দাম: ২৫০ টাকা
নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত
