ভুল করেছেন সাক্ষী মালিক

মহম্মদ আলী সাদা চামড়ার আমেরিকানদের বর্ণবৈষম্যবাদী ব্যবহারে অপমানিত হয়ে নিজের অলিম্পিক পদক ওহায়ো নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন। সাক্ষী মালিক এখন নিশ্চয়ই ভাবছেন, সেদিন গঙ্গায় তাঁর অলিম্পিক পদকটাও ফেলে দিলেই ভাল হত। কৃষক নেতাদের কথায় থেমে যাওয়া উচিত হয়নি। ইতিহাসের চাকা ঘোরে। তাই আলীকে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি ১৯৯৬ সালে আটলান্টা অলিম্পিকের সময়ে আরেকটা সোনার পদক দেয়। এই ইতিহাস সাক্ষীকে কোনো আশা দেবে কিনা, আমরা জানি না। ইতিহাসের চাকা সবসময় সামনের দিকে ঘোরে না, পিছনদিকেও যে ঘোরে তার প্রমাণ ইতিহাসেই রয়েছে। কোনো দেশে ইতিহাসের উল্টোদিকে হাঁটা শুরু হলে সে চাকা ফের সামনের দিকে ঘোরা দেখে যাওয়ার সুযোগ সকলের হয় না। উপরন্তু বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই আলীর দেশে তাঁর জন্মের একশো বছর আগে থেকেই চলছিল, আলীর অলিম্পিক সোনা জয়ের একশো বছর আগে তা নিয়ে আস্ত একটা গৃহযুদ্ধও হয়ে গিয়েছিল। ভারতে আজও লিঙ্গবৈষম্য অত বড় সমস্যা বলে কেউ মনে করে না। ফলে সাক্ষীকে পদক জলাঞ্জলি দিতে না দিয়ে কৃষক নেতা নরেশ টিকায়েত সেদিন তাঁর উপকারই করেছিলেন বলতে হবে, কারণ বাকি জীবনটা সাক্ষীর অন্তত পদকটা রইল।

সাক্ষীকে অবশ্য বোকাই বলতে হবে। তিনি কি ভেবেছিলেন তাঁর এবং অন্য কুস্তিগীরদের লড়াইয়ে একজন দোর্দণ্ডপ্রতাপ পুরুষ ক্ষমতাচ্যুত হবে স্রেফ মেয়েদের লাঞ্ছনা করার অভিযোগে? এদেশে ও আবার একটা অভিযোগ নাকি? ‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা’ কথাটা তো আমাদের দেশেই তৈরি। ভোগ করতে না জানলে আর বীর কিসের? আজও সফল পুরুষদের বন্ধুবান্ধবরা (মেয়ে বন্ধুরাও) রসিকতা করে বলেই থাকে “এখনো একটা স্ক্যান্ডাল হল না? তাহলে আর কী সাকসেসফুল হলি?” ভারতে খেলাধুলো করতে তো সাধারণত যান নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েরা। কর্পোরেট চাকরি, যেখানে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলারা চাকরি করতে যান, সেখানকার ‘মি টু’ আন্দোলনই শেষপর্যন্ত মিইয়ে গেল। তখনকার মত চক্ষুলজ্জার খাতিরে যে অভিযুক্ত পুরুষদের পদচ্যুত করা হয়েছিল, তাঁরা অনেকেই নিজের জায়গায় ফিরে এসেছেন যথারীতি। অনেককে তো এমন দায়িত্বে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা কার্যত পদোন্নতি। এমন দেশে সাক্ষী, ফোগত বোনেরা, বজরং পুনিয়া প্রমুখ অন্যরকম পরিণামের আশা করেছিলেনই বা কেন?

আলীর দেশের জিমন্যাস্টদের ল্যারি নাসার বলে একজন ডাক্তার ছিল। সে দুই দশক ধরে মেয়ে জিমন্যাস্টদের উপর যৌন নির্যাতন চালিয়েছিল। শেষমেশ আদালতে দেড়শোর বেশি জিমন্যাস্ট সাক্ষ্য দেওয়ার পরে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে সেই নরাধম ৪০ থেকে ১৭৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়, অর্থাৎ তার বাকি জীবন কারাগারেই কাটবে। এদিকে ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে মহিলা কুস্তিগীরদের অভিযোগের তদন্ত কী হচ্ছে না হচ্ছে তারই ঠিক নেই। সামান্য এফআইআর ফাইল করাতেই দেশের হয়ে পদকজয়ী কুস্তিগীরদের রাস্তায় বসে থাকতে হয়েছে। নাসারের বিরুদ্ধে যাঁরা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তাঁদের পুরোভাগে ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অলিম্পিক পদকজয়ী জিমন্যাস্টরা। অলিম্পিক সোনা জয়ী এবং বিশ্বরেকর্ডধারী সিমোন বাইলসও ছিলেন। শুনানিতে যৌন হয়রানির কথা বলতে গিয়ে তাঁরও অশ্রুপাত হয়েছিল, কিন্তু তাঁকে চোখের জলে জিমন্যাস্টিক্সকে বিদায় জানাতে হয়নি।

সাক্ষী আর তাঁর সঙ্গী কুস্তিগীররা আরও একটা ভুল করেছেন। তাঁদের উচিত ছিল যৌন হয়রানির ভিডিও তুলে রাখা। আজকের ভারতে একমাত্র কোনো অন্যায়ের ভিডিও ভাইরাল হলেই আমরা আলোড়িত হই, প্রশাসন নড়ে চড়ে বসে, প্রধানমন্ত্রী অন্তত সংসদের বাইরে বিবৃতি দেন। পরে অবশ্য কে ভাইরাল করল সে খোঁজ পড়ে। তবু অন্তত নিন্দেমন্দ হয়। মণিপুরের সেই দুজন মহিলার ব্যাপারে তো তাই হয়েছিল। মনে নেই? সেই যাঁদের উলঙ্গ করে গোটা গ্রাম ঘোরানো হয়েছিল, গণধর্ষণ করা হয়েছিল? ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সে ঘটনা অবশ্য প্রকাশিত হয়েছিল অনেকদিন পরে। তাছাড়া ওই দুজনের একজন সৈনিকের বউ। তাঁর সঙ্গে কি আর কুস্তিগীরদের তুলনা চলে? এঁদের তো টিভি ক্যামেরার সামনে দিয়েই রাত্রিবেলা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে পারে পুলিস।

আরও পড়ুন শুধু কুস্তির পদক নয়, দেবতার গ্রাসে আজ সবার সন্তান

সাক্ষী আর কুস্তির আখড়ায় নামবেন না বলেছেন, গোটা লড়াইয়ে মহিলা কুস্তিগীরদের পাশে থাকা পুরুষ কুস্তিগীরদের অন্যতম বজরং পুনিয়া জানিয়েছেন, ২০১৯ সালে পাওয়া পদ্মশ্রী ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু এসবে আমাদের বিশেষ কিছু এসে যাচ্ছে না। সোশাল মিডিয়ায় কিছু পোস্ট হচ্ছে, সাক্ষীর কান্নায় বেঁকেচুরে যাওয়া মুখের ছবি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে – এই পর্যন্ত। অবশ্য কী-ই বা হওয়ার ছিল? সবে মঙ্গলবার গাজিয়াবাদের ধরমবীর চা দিতে দেরি হওয়ায় স্ত্রী সুন্দরীকে তলোয়ারের এক ঘায়ে শেষ করে দিয়েছেন। মাসখানেক হল সিনেমা হল মাতাচ্ছে কথায় কথায় বউয়ের গলা টিপে ধরা আর প্রেমিকাকে দিয়ে নিজের জুতো চাটানো রণবীর কাপুর অভিনীত একটা চরিত্র। এই দেশে সাক্ষীর কান্নার কী দাম? একটা মেয়ের অলিম্পিক পদকেরই বা কী মূল্য? শেষমেশ একটা মেয়েই তো।

মেয়েদের জন্যে দেশটা এমনই ছিল বরাবর, তবে মাঝেমধ্যে কিছু গোলমেলে কাণ্ডও ঘটতে দেখা গেছে অতীতে। এক যুগ আগের এক ডিসেম্বরের কথা মনে পড়ে। পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে বেরনো একটা মেয়েকে ঘন্টার পর ঘন্টা ধর্ষণ এবং অকথ্য অত্যাচার করেছিল কয়েকজন মিলে। মেয়েটা হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছিল অনেকদিন। শেষপর্যন্ত বাঁচেনি। দেশজুড়ে সে কদিন কেবল তারই কথা বলেছিল মানুষ। সারা সন্ধে গলা ফাটিয়েছিলেন টিভি অ্যাঙ্কররা, গর্জে উঠেছিলেন সরকারবিরোধী নেতারা, দিল্লির রাস্তায় পর্যন্ত মানুষের ঢল নেমেছিল। দামিনী, নির্ভয়া – কতশত নামকরণ হয়েছিল মেয়েটার। তার মৃত্যুর পরে ধর্ষণ সংক্রান্ত আইন সংস্কার, মেয়েদের নিরাপত্তা বিধানে নতুন তহবিল তৈরি – সে এক কাণ্ড! এবছর ডিসেম্বরে বোধহয় অনেক বেশি ঠান্ডা পড়েছে, তাই গোটা দেশ শীতল। অথবা শরীরটা একেবারে ক্ষতবিক্ষত না হলে, অত্যাচারিত হয়ে মৃত্যুশয্যায় না পৌঁছলে এদেশের মেয়েদের মানসম্মান নিয়ে ভাবা চলে না। অবশ্য হাথরাসের মেয়েটা মরে যাওয়ার পরেও, পুলিসই রাতের অন্ধকারে দাহকার্য সম্পন্ন করার পরেও আমরা তাকে নিয়ে ভাবিনি। কাঠুয়ার বাচ্চা মেয়েটার মৃত্যুর পরে তার ধর্ষকদের সমর্থনে তো রীতিমত মিছিল করেছি আমরা। সে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading