আজ জুটেছে, কাল কী হবে লাতিন আমেরিকার ফুটবলের?

জিদান প্রয়াত সক্রেটিসের মত কমিউনিস্ট পার্টি করতেন না। মারাদোনার মত ফিদেল কাস্ত্রো বা কিউবাপ্রীতিও নেই। সুতরাং ধরে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই যে জিদানের মনুষ্যত্বের কাছেই টাকার অঙ্কটা অশ্লীল বলে মনে হয়েছিল।

লাতিন আমেরিকার

ফরাসি সম্রাট পঞ্চদশ লুই নাকি বলেছিলেন, আমার পরেই আসবে প্লাবন। লিওনেল মেসি এখন পর্যন্ত তেমন কিছু বলেছেন বলে জানা যায়নি। তবে বিশ্বকাপ ফাইনালই যে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর শেষ ম্যাচ ছিল সেকথা তো জানা গেছে। এখন প্রশ্ন হল, আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের ভবিষ্যৎ কী? দিয়েগো মারাদোনা ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ থেকে ডোপ টেস্টে ধরা পড়ে বহিষ্কৃত হন। পরে পাকাপাকিভাবে অবসর নেওয়ার সময়ে বলেন, আমার পরে অনেকদিন বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছবে না আর্জেন্টিনা। তাঁর কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিল। ১৯৯০ সালে রোমে তাঁর নেতৃত্বে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার ২৪ বছর পরে আবার আর্জেন্টিনা ফাইনালে পৌঁছয় ২০১৪ সালে রিও দি জেনেইরোতে। মারাদোনার মত মেসির আমলেও আর্জেন্টিনা দুবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলল। আবার কবে ফাইনালে পৌঁছবে? প্রশ্নটার পরিসর আরেকটু বড় করে নেওয়া যাক? লাতিন আমেরিকার কোনও দল আবার কবে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলবে? বা লাতিন আমেরিকার দলগুলোর ভবিষ্যৎ কী? প্রশ্নগুলো বৈধ, কারণ বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিলও শেষবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছে কুড়ি বছর হয়ে গেল। কেবল ফাইনালে পৌঁছনোকেই সাফল্যের প্রমাণ হিসাবে ধরে নিয়ে অবশ্য কোনও আলোচনা করা যায় না। কিন্তু ঘটনা হল গত তিন দশকে সামগ্রিকভাবেই লাতিন আমেরিকা বিশ্বকাপে ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে ইউরোপের তুলনায়।

এমনিতেই চিলে, কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা বা প্যারাগুয়ের মত দলে মাঝেমধ্যে কয়েকজন চোখ টানার মত ফুটবলার আসেন, তখন তাঁদের নিয়ে হইচই হয়। কিন্তু দল শেষপর্যন্ত বিশ্বকাপে বেশিদূর এগোতে পারে না। উরুগুয়ে দুবার বিশ্বকাপ জিতেছিল সেই গত শতকের প্রথমার্ধে, স্মরণকালে তাদের সেরা বিশ্বকাপ ২০১০। মূলত দিয়েগো ফোরলানের নৈপুণ্যে আর লুই সুয়ারেজের আক্ষরিক অর্থে হাতযশে সেমিফাইনালে উঠে তারা হেরে যায় এবং প্লে অফে জার্মানির কাছে হেরে চতুর্থ স্থান দখল করে। তাই বিশ্বকাপে লাতিন আমেরিকার ফুটবল মানে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাই। সেই ব্রাজিল পরপর তিনটে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলে দুবার চ্যাম্পিয়ন হয় দুই সহস্রাব্দের সন্ধিকালে। তারপর ২০১৪ সালের আগে আর সেমিফাইনালেও উঠতে পারেনি এবং ঘরের মাঠে মারাকানা স্টেডিয়ামের সেই সেমিফাইনাল ব্রাজিল সমর্থকদের পক্ষে বিভীষিকা হয়ে আছে। এবারের ব্রাজিলকে অনেক বেশি জমাট দেখাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল নেইমার-নির্ভরতাও নেই। কিন্তু সেই ব্রাজিলও কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নিল। আর্জেন্টিনা ১৯৯০ আর ২০১৪— এই দুই ফাইনালের মাঝে একবারও শেষ চারে পৌঁছয়নি। স্বভাবতই আর্জেন্টিনার এবারের সাফল্যে ইউরোপের আধিপত্য খর্ব হল বলে ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে অনেকের যে উল্লাস, তার স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দিহান হওয়ার কারণ আছে। আধিপত্য আদৌ খর্ব হয়েছে কিনা তা নিয়েই সন্দেহ আছে। আগামীবার থেকে বিশ্বকাপ ৪৮ দলের হয়ে গেলে ইউরোপের প্রাধান্য উল্টে বেড়েও যেতে পারে। প্রশ্ন হল, এমন হচ্ছে কেন? ২০০২ থেকে ২০২২— এই দুই দশকে এমন কী ঘটল যে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা ক্রোয়েশিয়ার চেয়েও কম ধারাবাহিক হয়ে পড়ল? ইতালি, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ড তো বটেই, গত ২০ বছরে বুলগেরিয়া, রোমানিয়ার মত বিশ্বকাপে অনিয়মিত দলের সামনে পড়লেও কেন হেরে যায় লাতিন আমেরিকার দানবরা? এইসব প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরও। সে উত্তর মাঠের ভিতরে খুঁজলে অগভীর জবাব পাওয়া যাবে।

বিশ্বকাপে ইউরোপের বাইরের যে দলগুলো খেলতে এসেছিল, তাদের সকলের খেলোয়াড় তালিকার দিকে তাকালেই একটা জিনিস চোখে পড়ে। প্রত্যেক দলেই ইউরোপে ক্লাব ফুটবল খেলা খেলোয়াড়দের সংখ্যা প্রচুর। বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনার ২৬ জনের দলে রিজার্ভ বেঞ্চের গোলরক্ষক ফ্রাঙ্কো আর্মানি আর মাঝমাঠের খেলোয়াড় থিয়াগো আলমাদা ছাড়া সকলেই ইউরোপের কোনও না কোনও ক্লাবের খেলোয়াড়। একমাত্র আর্মানিই খেলেন নিজের দেশের ক্লাব রিভার প্লেটে। ব্রাজিল দলের ছবিটাও খুব আলাদা নয়। অতিরিক্ত গোলরক্ষক ওয়েভার্তন খেলেন সাও পাওলোর পালমেইরাসে আর মাঝমাঠের এভের্তোন রিবেইরো, আক্রমণভাগের পেদ্রো খেলেন রিও দি জেনেইরোর ক্লাব ফ্ল্যামেঙ্গোতে। এছাড়া রক্ষণভাগের দানি আলভেস খেলেন মেক্সিকোর উনিভার্সিদাদ নাসিওনাল এসিতে। আর সবাই ইউরোপে খেলেন। আফ্রিকার দেশগুলোর দল ঘাঁটলেও একই ব্যাপার দেখা যাবে। এমনকি এবার চমকে দিল যে জাপান দল, তাদেরও ২৬ জনের মধ্যে শুধু জার্মানির লিগেই খেলেন আটজন। এর সরাসরি ফলাফল হল, ফুটবলে ঘরানা বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। আফ্রিকা বা এশিয়ার ক্ষেত্রে সেটা খুব বড় কথা নয়। কারণ বিশ্ব ফুটবলে এই দুই মহাদেশ এতটাই পিছিয়ে থেকে শুরু করেছে যে তাদের এখনও নিজস্ব ঘরানা বলে কিছু তৈরি হয়নি। ইউরোপে খেলতে খেলতে বরং তাদের লাভই হয়। কবি লিখেছিলেন “দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে”। এশিয়া, আফ্রিকার এখনও নেওয়ার পালা চলছে। অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতে হয়ত দেওয়ার পালা আরম্ভ হবে। কিন্তু লাতিন আমেরিকার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তা নয়। লাতিন আমেরিকার নিজস্ব ঘরানা ছিল। সারা পৃথিবীর লাতিন আমেরিকান ফুটবলের ভক্তরা তাতেই মোহিত হয়েছিলেন। সেই ঘরানার প্রাণ হল ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, যা চোখের আরাম। সে খেলাকেই ‘জোগো বোনিতো’ অর্থাৎ ‘বিউটিফুল গেম’ বলা চলে। কিন্তু ফুটবল তো মানুষ খেলে। দেবতারা খেলে না, রোবটরাও নয়। ফলে সারা বছর যেভাবে খেলছেন একজন ফুটবলার, তিনি কালেভদ্রে জাতীয় দলের হয়ে একেবারে অন্য দর্শনে, অন্য কায়দায় খেলবেন কী করে? সেকথা জাতীয় দলের কোচকেও বুঝতে হয়, গা জোয়ারি চলে না। ফলে লাতিন আমেরিকান ফুটবলের রহস্য নষ্ট হয়ে গেছে। সারা পৃথিবীই আসলে খেলে ইউরোপের খেলা। সে খেলায় ইউরোপকে হারাতে যে কালঘাম ছুটে যাবে আর সকলের তাতে আর আশ্চর্য কী? কিন্তু ক্ষতি শুধু ওটুকু নয়।

কিলিয়ান এমবাপের একটা মন্তব্যে নাকি বেজায় চটেছেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। সেই কারণেই দুর্ভেদ্য গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ফাইনাল শেষ হওয়ার পর থেকে এমবাপেকে বিদ্রুপ করেই চলেছেন, একেকসময় তা শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করছে। এমবাপে কিছুদিন আগে বলেছিলেন “ইউরোপে আমাদের সুবিধা হল সারাক্ষণ নিজেদের মধ্যে নেশনস লিগের মত উচ্চমানের ম্যাচ খেলি। ফলে আমরা যখন বিশ্বকাপে যাই তখন তৈরি হয়ে যাই। কিন্তু ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আমেরিকায় এইরকম সুযোগ পায় না। সেখানকার ফুটবল ইউরোপের মত উন্নত নয়। সেই কারণেই গত কয়েকটা বিশ্বকাপে ইউরোপিয়ানরাই জিতেছে।” এমিলিয়ানোর অসভ্যতাকে সমর্থন না করেও তাঁর আবেগকে ধরতে পারা সম্ভব। শুধু তো আর্জেন্টিনা নয়, গোটা লাতিন আমেরিকার ফুটবল সম্পর্কেই একটা বড় কথা বলেছেন এমবাপে। খোদ ফ্রান্সকেই হারিয়ে দিয়ে মুখের মত জবাব দেওয়া হয়েছে বলে ভাবতেই পারেন এমিলিয়ানো। কিন্তু এমবাপের কথাটা ভেবে দেখার মত।

ইউরোপের চেয়ে লাতিন আমেরিকার ফুটবল যে পিছিয়ে পড়েছে তার পরিসংখ্যানগত প্রমাণ ইতিমধ্যেই দিয়েছি। তবে এমবাপে উদাহরণ দিতে গিয়ে একটু ভুল করেছেন। উয়েফা নেশনস লিগ চালু করেছে সদ্য। উদ্দেশ্য ক্লাব ফুটবলের দাপটে আন্তর্জাতিক ফুটবলের আকর্ষণ কমে যাওয়ার সমস্যা সামলানো। কিন্তু তাতে একটা বড় জিনিস স্বীকার করে নেওয়া হয়, সেটা হল ফুটবল খেলাটাকে চালায় আসলে ক্লাব ফুটবল। আরও নির্দিষ্ট করে বললে ইউরোপের ক্লাব ফুটবল। লাতিন আমেরিকা পিছিয়ে পড়েছে বছর বিশেক হল, আর নেশনস লিগের বয়স মাত্র তিন। লাতিন আমেরিকা পিছিয়ে পড়েছে কারণ তাদের ক্লাব ফুটবল পিছিয়ে পড়েছে। কেন পিছিয়ে পড়ল? কারণটা বিশুদ্ধ অর্থনীতি। ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি, জার্মানির দ্বিতীয় সারির ক্লাবগুলোও যে পারিশ্রমিক দিতে পারে তার ধারেকাছে পৌঁছতে পারে না আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় দুই ক্লাব চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিভার প্লেট আর বোকা জুনিয়র্সও। নেইমারকে খেলানোর কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না ব্রাজিলের ফ্ল্যামেঙ্গো বা পালমেইরাস। আফ্রিকার ক্লাবগুলোর সঙ্গে তো আরও দুস্তর ব্যবধান।

এমন নয় যে লাতিন আমেরিকার খেলোয়াড়দের ইউরোপে চলে যাওয়া এই সহস্রাব্দেই শুরু হয়েছে। মারাদোনা, ক্যারেকা, রোমারিও, বেবেতো, রোনাল্ডো, রোনাল্ডিনহো, রবার্তো কার্লোসরাও বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, নাপোলি, জুভেন্তাস বা এসি মিলানে খেলেছেন। কিন্তু তাঁদের সার, জল দিয়ে বড় করে তুলত আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের ফুটবলব্যবস্থাই। তারপর তাঁদের খেলা দেখে চড়া দামে কিনে নিত ইউরোপের ক্লাবগুলো। মারাদোনার মারাদোনা হওয়া শুরু বোকা জুনিয়র্সে। কেরিয়ারের শেষ প্রান্তে তিনি ফিরেও যান নিজের দেশে, তাঁর শেষ ক্লাব নেউয়েলস ওল্ড বয়েজ। কিন্তু ফুটবলের অর্থনীতি যেভাবে বদলে গেছে তাতে মেসি নিজের মাইনে কমাতে রাজি হয়েও বার্সেলোনাতেই থাকতে পারলেন না, আর্জেন্টিনায় ফিরে যাওয়া তো দূরের কথা। অবশ্য মেসি আর্জেন্টিনা ছেড়েছেন অনেক ছোট বয়সে। চে গুয়েভারার জন্মস্থান রোজারিওর রুগ্ন শিশু মেসির প্রতিভা ছোটবেলাতেই চিনে নিয়ে বিশ্বখ্যাত লা মাসিয়ায় তুলে এনেছিলেন বার্সেলোনার স্পটাররা। মেসি ও তাঁর পরিবারের হয়ত কিছুটা কৃতিত্ব প্রাপ্য তিনি স্পেনের নাগরিকত্ব গ্রহণ না করে আর্জেন্টিনার হয়েই সারাজীবন খেললেন বলে। কিন্তু ঘটনা হল পৃথিবী জুড়ে বেড়ে চলা অর্থনৈতিক বৈষম্যের সুযোগে কচি বয়সেই ইউরোপে চলে যাচ্ছে লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার ফুটবল প্রতিভা। মেসির মত ছোট বয়সে না হলেও, কেরিয়ার শুরু করার কয়েক বছরের মধ্যেই। তারপর আর কিসের ঘরানা? গোটা পৃথিবীকে এক অর্থনীতির ছাঁচে ঢালাই করার যে পরিকল্পনা বিশ্বায়ন বা নব্য উদারনীতিবাদী অর্থনীতির, তারই ফলশ্রুতিতে গোটা পৃথিবীর ফুটবলই আসলে হয়ে দাঁড়াচ্ছে ইউরোপের ফুটবল। জার্সির রংটুকুই যা আলাদা। মেসির মত জন্মগত প্রতিভা সকলের থাকে না, ফলে ফুটবলের সৌন্দর্য সিস্টেম ছাপিয়ে সকলের পায়ে জায়গা করে নিতেও পারে না। যে তরুণ আর্জেন্টাইন বা ব্রাজিলিয়ানের ফুটবল শিক্ষা হবে ইউরোপের কোচের হাতে, সারাবছর খেলবেন ইউরোপে, তিনি ড্রিবল করায় বিশ্বাস করবেন কম। এটাই স্বাভাবিক।

আরও পড়ুন বোর্ডের ঘরে যে ধন আছে, ক্রিকেটের ঘরে সে ধন আছে?

ফুটবলের আলোচনায় অর্থনীতি শব্দটা দেখেই যাঁরা নাক কুঁচকে ভাবছেন অপ্রাসঙ্গিকভাবে রাজনীতি এনে ফেলা হচ্ছে বা ইউরোপ কেবল টাকার জোরে সবাইকে পিছনে ফেলে দিচ্ছে বলায় যাঁরা রাগ করছেন তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিই ২০১৩ সালের কথা। সে বছর ওয়েলশ ফুটবলার গ্যারেথ বেলকে ইংল্যান্ডের টটেনহ্যাম হটস্পার থেকে ১০০ মিলিয়ন ইউরো (১৩১.৮৬ মিলিয়ন ডলার) দাম দিয়ে কিনে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ। সেটা তখনকার রেকর্ড ট্রান্সফার ফি। বিশ্বের সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন এবং সেইসময় রিয়ালে কার্লো আনচেলোত্তির সহকারী জিনেদিন জিদান বলেই ফেলেন “আমাকে দশ বছর আগে কেনা হয়েছিল ৭৫ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার) দিয়ে আর আমি বলেছিলাম আমি অত দাম পাওয়ার যোগ্য নই। এখন আমার মনে হয় কোনও খেলোয়াড়ই এত দাম পাওয়ার যোগ্য নয়। এটা স্রেফ ফুটবল। দুর্ভাগ্যজনক, দুর্বোধ্য যে এত টাকা কেন খরচ করা হচ্ছে।” জিদান প্রয়াত ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার সক্রেটিসের মত কমিউনিস্ট পার্টি করতেন বলে তো শোনা যায় না। মারাদোনার মত ফিদেল কাস্ত্রো বা কিউবাপ্রীতিরও খবর নেই। সুতরাং ধরে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই যে আলজিরীয় অভিবাসীদের সন্তান জিদানের মনুষ্যত্বের কাছেই কোথাও টাকার অঙ্কটা অশ্লীল বলে মনে হয়েছিল। এখন ২০২২, সর্বকালের সবচেয়ে দামি ট্রান্সফারের তালিকায় প্রথম দশেরও বাইরে চলে গেছেন বেল।

পুরো তালিকাটা দেখুন এখানে। তারপর ভেবে দেখুন, মার্কিনি মদতে বারবার নির্বাচিত সরকার পড়ে যায়, অর্থনীতির দফারফা হয়ে যায় যে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলি, ভেনিজুয়েলা, পেরুতে— সেখানকার ফুটবল কী করে লড়বে ইউরোপের সঙ্গে? কুড়ি বছর পরে একবার একটা দলের বিশ্বকাপ জয় কি সত্যিই কিছু প্রমাণ করে? এ মাসেই আর্জেন্টিনায় মুদ্রাস্ফীতির হার ৯৯ শতাংশে পৌঁছবে বলে মনে করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। বুয়েনস এয়ার্সের রাস্তা ভরিয়ে মেসির দলকে অভিবাদন জানিয়েছে যে হবু ফুটবলাররা, তাদের কজন ওই নীল-সাদা জার্সি গায়ে চাপানোর সঙ্কল্প বজায় রাখতে পারবে? প্রশ্নটা শুধু আবেগের নয়। মারাদোনার দল যখন বিশ্বকাপ জিতেছিল তখনও আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অবস্থা ভাল ছিল না। কিন্তু দুনিয়াটা বদলে গেছে। বার্সেলোনা ছেড়ে কোনও নিঃস্ব নাপোলিকে ইতালি, ইউরোপের রাজা করতে যাননি মেসি। গেছেন কাতারি ধনকুবেরদের অর্থে পুষ্ট প্যারিসের ক্লাবে। যেখানে তাঁর পাশে খেলেন নেইমার আর এমবাপে— সবচেয়ে দামি ট্রান্সফারের তালিকায় যথাক্রমে এক আর দুই নম্বরে থাকা ফুটবলার।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading