মঙ্গলবার বিকেলে কলকাতায় একটি রাজনৈতিক মিছিল ছিল। অদলীয় রাজনীতির আড়ালও সে মিছিলে ছিল না। যাঁরা সংগঠিতভাবে এসেছিলেন তাঁরা লাল পতাকা হাতেই এসেছিলেন। কারোর পতাকায় লালের উপর সাদায় কাস্তে হাতুড়ি আঁকা, কারোর আবার লালের উপর হলুদ রংয়ের বাঘ। সাদার উপর লাল তারা আঁকা পতাকাও ছিল এই মিছিলে। মিছিলটি ঘোষিতভাবেই বামফ্রন্টের মিছিল, অর্থাৎ এ রাজ্যে ১৯৭৭-২০১১ যেসব দল জোট বেঁধে ক্ষমতায় ছিল তাদের এবং তাদের বিভিন্ন গণসংগঠনের ডাকেই এই মিছিল। কয়েক হাজার লোকের এই মিছিলে কোনো জুনিয়র বা সিনিয়র ডাক্তার ছিলেন কিনা জানি না, থাকলেও ডাক্তার পরিচয়ে ছিলেন না। পতাকা নিয়ে হাঁটা অসংখ্য মানুষের একেকজন হয়ে ছিলেন। মিছিল চিরকাল অনেকের, একের নয়।
তা বলে বামফ্রন্টের মিছিল ডাক্তারদের ভুলে গিয়ে, আর জি কর হাসপাতালে ধর্ষিত ও নিহত মেয়েটিকে ভুলে গিয়ে কেবল মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে মসনদে বসতে চাওয়ার মিছিল হয়ে দাঁড়ায়নি। পরিশীলিত শহুরে মধ্যবিত্তদের গলাগুলি স্লোগান তুলেছে
সময় যত দীর্ঘ হবে
আওয়াজ তত তীক্ষ্ণ হবে।
বিচার যত থমকে রবে
আওয়াজ তত তীক্ষ্ণ হবে।
আবার রংচটা জামা প্যান্ট, শস্তা ছাপা শাড়ি পরা পালিশবিহীন মানুষ স্লোগান দিয়েছেন
নেংটি ছেড়ে ধেড়ে ধরো
আর জি করের মাথা ধরো।
এই মিছিল শহুরের, এই মিছিল গেঁয়োর। এই মিছিল টি-শার্ট আর পনিটেলের, এই মিছিল ফেজ টুপি আর দাড়ির। এই মিছিল ক্রপ টপের, এই মিছিল হিজাবের। এই মিছিল স্নিকার্সের, এই মিছিল হাওয়াই চটির। আপনার প্রিয় টিভি চ্যানেল বা ইউটিউব চ্যানেল হয়ত দেখাবে না, তাই সবচেয়ে বেশি করে বলা প্রয়োজন – এই মিছিলে শুধু বহু মানুষ হাঁটেননি, যাঁরা হাঁটেননি তাঁরা পথের দুধার থেকে মিছিলকে আপন করে নিয়েছেন। তবে গোড়া থেকে শুরু করাই ভাল।
***
রাজাবাজার ট্রাম ডিপো থেকে তখনো মিছিল শুরু হয়নি, জমায়েত ক্রমে স্ফীত হচ্ছে। দেখি এক কাঁচাপাকা চুলের শীর্ণকায় ভদ্রলোক একটি সদ্য গোঁফদাড়ি ওঠা বাবুসোনা প্রজাতির ছেলেকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছেন এক বৃদ্ধার দিকে ‘দেখছ? অন্তত ৮০ বছর বয়স হবে ওনার।’ কানে খাপছাড়া কয়েকটি শব্দ যেতে সেই বৃদ্ধা এবং তাঁর সঙ্গিনীরা ঘুরে তাকালেন। ভদ্রলোক বললেন ‘খারাপ কথা বলছি না দিদিভাই। আপনার উদাহরণ দিচ্ছি। শেখাচ্ছি।’ ওঁরা হেসে এগিয়ে যেতেই ছেলেটিকে বললেন ‘উনি এত বয়সে মিছিলে আসতে পেরেছেন, তোমার অসুবিধাটা কী?’ অপ্রস্তুত ধোপদুরস্ত ছেলেটি সহসা কথা খুঁজে পেল না। উনি বললেন ‘অন্যের জন্যেও কিছু করতে হয় তো।’
অনতিদূরেই আরও ভাল দৃষ্টান্ত ছিল। ওঁর চোখে পড়েনি, আমার চোখে পড়ল কিছুক্ষণের মধ্যেই।
ভদ্রলোকের বয়স খুব বেশি হবে না। কিন্তু কোনো গভীর অসুখ তাঁকে প্রায় চলচ্ছক্তিহীন করে ফেলেছে। হাত দুটো বেঁকে গেছে, পা দুটোও। কয়েক ইঞ্চি এগোতেও তাঁর কয়েক মিনিট সময় লাগে। দেখে ভেবেছিলাম ইনি আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতে এসেছেন, নিশ্চয়ই মিছিলে যাবেন না। কিন্তু সন্ধের মুখে শ্যামবাজারে নেতাজি মূর্তির পাদদেশে পুলিস যখন মিছিলের গতি রোধ করল, বিস্মিত হয়ে দেখলাম ওই ভদ্রলোক আমার পাশে এসে গেছেন আবার।
ওই পথ হাঁটতে হাঁটতে ততক্ষণে তরুণ-তরুণী, মাঝবয়সীদের দল যেমন চোখে পড়েছে, তেমনি দেখেছি এমন বন্ধুদের যারা দুজনে স্রেফ একে অপরের হাত ধরে চলে এসেছে। তাদের মুখ বলছে, শরীরী ভাষা বলছে – আগে কখনো কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা নেই। তাই স্লোগানে গলা মেলাতে প্রথম প্রথম তারা রাঙা হয়ে উঠছিল, পরে লজ্জা ভেঙে গেল। মিছিল চিরকাল লজ্জা ভাঙে, ব্যক্তিকে সমষ্টির একজন হতে শেখায়। সমষ্টিতে মিশে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে ব্যক্তি। এ জিনিস যে মিছিলে ঘটে না, সে কি সত্যি মিছিল?
হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম – মানুষ কেন মিছিলে যায়? নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকার জন্যে? এই মিছিলে মানুষ কেন গিয়েছিল? এখন গোটা পশ্চিমবঙ্গে রোজ যে নানা সংগঠনের ডাকে মিছিল বেরোচ্ছে, মানুষ কেন যাচ্ছে সেসবে? ‘চরম অন্যায় দেখে আমি প্রতিবাদ করেছিলাম আমার মত করে’ – ভবিষ্যতের এই তৃপ্তিটুকুর জন্যে? হয়ত তাই। তাতেই বা দোষ কী? কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আজকের বহুনিন্দিত লাল পতাকার মিছিলে কেন এসেছেন এত মানুষ? কোনো পতাকাহীন মিছিলে গেলেও তো পাপস্খালনের অনুভূতি পাওয়া যায়। এ রহস্য উদ্ঘাটন আমার পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু জানি না, কোনো পতাকা বা কোনো দলের প্রতি টান না থাকলে অতি বৃদ্ধ বাবাকে ছোট্ট ছেলের মত হাত ধরে মিছিলে নিয়ে আসতে পারে কিনা তাঁর ছেলে। ছেলেটি আমারই বয়সী। বেশভূষা দেখে এবং মুখের ভাষায় মনে হল, দূর গ্রাম থেকে এসেছেন ওঁরা। দুজনেরই ঘাড়ে লাল পতাকা। হয়ত জোয়ান বয়সে বাবাই মিছিলে হাঁটা শিখিয়েছিলেন ওই ছেলেকে, আজ দ্বিতীয় শৈশবে পৌঁছে সেই ছেলে তাঁকে হাত ধরে নিয়ে এসেছে। এভাবেই তো মিছিল এগোয়। মিছিল, বিশেষত লাল পতাকার মিছিল, আসলে তো রিলে। অদলীয় মিছিলেও কি এমন হয়? জানি না।
***
সপ্তাহের গোড়ার দিকে এক কর্মব্যস্ত দিনে কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে ট্র্যাফিক স্তব্ধ করে দেওয়া কোনো মিছিল সম্পর্কে এত ভাল ভাল কথা লেখা প্রায় অসম্ভব ছিল আর জি করের ওই ডাক্তার মেয়েটির ধর্ষণ ও হত্যার আগে পর্যন্ত। যথাসময়ে নিজ নিজ কাজে যাওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছু যে থাকতে পারে, তা টের পাওয়ার জন্যে আমাদের একটি সম্ভাবনাময় প্রাণ খোয়াতে হল। আজ যখন বিপুল জমায়েতের কারণে রাজাবাজার ট্রাম ডিপোয় পৌঁছবার আগেই বাস দাঁড়িয়ে পড়ল আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোডের উপর, তখন ভেবেছিলাম বাসযাত্রীরা কর্মনাশা মিছিলকে দু-চারটে গালমন্দ করবেন। অবাক কাণ্ড! তেমন কিছু হল না। বাস খালি করতে করতে তাঁরা বলাবলি করলেন ‘একটা দিন একটু হেঁটে চলে যাব।’ স্কুলফেরত একটি ছেলে ক্লান্তি প্রকাশ করে মাকে বলছিল ‘আমি কিন্তু আর হাঁটতে পারব না।’ মা বললেন ‘ঠিক পারবি।’ মিছিল শুরু হওয়ার পর থেকে কেবলই তাকাচ্ছিলাম বিডন স্ট্রিটের মত শহরের যেসব গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা এপিসি রোডে এসে মিশেছে, সেখানে আটকে থাকা বাসযাত্রী, বাইক আরোহী, চারচাকার আরোহীদের মুখের দিকে। যদি বিরক্তি থেকেও থাকে, কোনো মুখে তার বহিঃপ্রকাশ চোখে পড়ল না। এখনকার দস্তুর অনুযায়ী অনেকে বরং নিজের মোবাইলে ধরে রাখছিলেন মিছিলের ছবি। যা বিরক্তির কারণ তা কি কেউ সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করার জন্যে মোবাইলে ধরে রাখে? বোধহয় না।
পতাকাওলা, পতাকাহীন মিলিয়ে নয় নয় করে কম মিছিলে যাইনি গত ৩০-৩২ বছরে। কিন্তু মঙ্গলবারের মিছিল যত শ্যামবাজারের দিকে এগোল, তত যেসব দৃশ্য দেখলাম তা ইতিপূর্বে দেখিনি। রাস্তার ধারের বহুতলের বারান্দা জুড়ে সপরিবারে দাঁড়িয়ে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে চিৎকার করছেন মানুষ। বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলফেরত মায়েরা দাঁড়িয়ে পড়েছেন মিছিল দেখে আর মিছিল থেকে কেউ গিয়ে একখানা লাল পতাকা ধরিয়ে দিয়েছে এক পড়ুয়ার হাতে। সে একখানা উঁচু জায়গায় উঠে সজোরে নাড়ছে সেই পতাকা, স্লোগান দেওয়া হচ্ছে সবাই মিলে।
আরও পড়ুন সিপিএম পথে ফিরেছে, কিন্তু ব্যালটে ফিরবে কি?
রাস্তার ধারের দোকানের নীল কলারের কর্মচারীরা ফুটপাথ থেকে পথে নেমে এসে স্লোগান দিচ্ছেন। সবচেয়ে অবাক করলেন মহিলারা – নিম্ন মধ্যবিত্ত, গরিব পরিবারের মহিলারা। যে যেভাবে পেরেছেন বেরিয়ে এসেছেন পথে। মলিন নাইটির উপর গামছা জড়িয়ে, বাচ্চা কোলে নিয়েও। এপিসি রোডের অন্য পারে দাঁড়িয়ে তাঁরা স্লোগান দিচ্ছিলেন মিছিলের লোকেদের চেয়েও বেশি উৎসাহে। রাস্তার দুপাশে এত মানুষ এত প্রাণ যোগ করলেন মিছিলে, মনে হচ্ছিল যাঁরা হাঁটছেন তাঁদের গার্ড অফ অনার দিচ্ছেন ওঁরা। সবচেয়ে আশ্চর্য, অনেক জায়গায় মহিলারা লাল পতাকার এই মিছিলকে এমন অকুণ্ঠ সমর্থন জানাচ্ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকায় সজ্জিত এলাকায় দাঁড়িয়ে। খান্না মোড়ের সামান্য আগে একটি জরাজীর্ণ বাড়ি। তার দোতলার বারান্দায় ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়েছিলেন জনা দশেক মহিলা। এত তাঁদের গলার জোর এবং ঘুণধরা কাঠের রেলিংয়ের উপর ঝুঁকে পড়ে স্লোগান দেওয়ার উৎসাহ, যে ভয় হচ্ছিল, বাড়িটি তখনই ভেঙে পড়বে। আশ্চর্যের কথা, ওই বারান্দা থেকে কিন্তু ঝুলছিল একটি তিনকোণা ক্রুদ্ধ হনুমানের পতাকা।
স্পষ্টত, এ রাজ্যের গরিব মানুষও ক্রুদ্ধ। মহিলারা ক্রুদ্ধ। হতে পারে, এখন তাঁরা কার হাতে কোন পতাকা আছে তা দেখছেন না। তাঁরা কেবল জানেন, কোন পতাকা তাঁদের অপছন্দ। লক্ষণীয় বিষয় হল, এই শ্রেণির মানুষ বামেদের থেকে ক্রমশ দূরে গেছেন বলেই ২০১১ সাল থেকে কমতে কমতে রাজ্যের ও দেশের আইনসভায় এ রাজ্যের বামেরা আজ শূন্য। অন্যদিকে এই শ্রেণির মানুষের, বিশেষত মহিলাদের, আশীর্বাদই মমতা ব্যানার্জির সরকারের পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি সত্ত্বেও একের পর এক বিরাট নির্বাচনী জয়ের বড় কারণ। আর তা থেকেই সীমাহীন ঔদ্ধত্যের জন্ম, যে ঔদ্ধত্য গোটা রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিকে সন্দীপ ঘোষদের রাজত্ব করে রেখেছে। নইলে আজ হবু ডাক্তার মেয়েটিকে মরতে হত না।
লালবাজারে ডাক্তারদের অবরোধের কাছে শেষমেশ কলকাতার নগরপাল বিনীত গোয়েলের মাথা নোয়ানো আর ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস বরাবর অরাজনৈতিক মানববন্ধনে হয়ত চাপা পড়ে যাবে বামফ্রন্টের আপাদমস্তক রাজনৈতিক মিছিলের খবর। কিন্তু মিছিলের বাইরের মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হল না, তাঁদের রাজনীতি সম্পর্কে বা লাল পতাকা সম্পর্কে অন্তত এই মুহূর্তে কোনো ছুঁতমার্গ আছে। কে এই আন্দোলন থেকে ফায়দা তুলবে না তুলবে তা নিয়ে ওঁরা ভাবিত নন তথাকথিত নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দের মত। অবশ্য নাগরিক সমাজের কর্ণধাররা এঁদের নিজের সমাজের মানুষ বলে ধরেন বলে মনে হয় না। লাল পতাকাধারীরা এঁদের হাতে পতাকা ছেড়ে দিতে পারেন কিনা, এঁদের মিছিলে টেনে আনতে পারেন কিনা – তার উপর নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ। সে ভবিষ্যৎ কিন্তু রাজ্যের রাজধানীতে একদিনের মিছিল দিয়ে গড়া যাবে না।
নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

