Site icon amarlikhon

হকারদের নিয়ে বেকার গোলমাল!

হকারদের

বেলঘরিয়া স্টেশনে হকার উচ্ছেদ ও তার প্রতিরোধ। ছবি এক্স থেকে

যদি উচ্ছেদই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এসব ভাবার প্রয়োজন নেই। সরকারি সম্পত্তি মানে যে আসলে নাগরিকের সম্পত্তি— সেকথা কজন নাগরিকই বা জানে, বোঝে এবং বিশ্বাস করে? সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সকলকে জানানোর ব্যবস্থা তো কোনোদিন করাই হয়নি। আর এখন তো কে নাগরিক তা ঠিক করছে রাষ্ট্র। ফলে যদি কাল রেলের জমিতে ব্যবসা করা বা বসবাস করা মানুষকে অনাগরিক বলে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়, তাহলেই মুশকিল আসান।

পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের একমাস পূর্ণ হয়েছে। রাজ্যটা যে বদলে গেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ৯ মে-র আগে পর্যন্ত রাজ্যের সাধারণ মানুষ বলুন, বিরোধী রাজনৈতিক দলের লোকেরা বলুন আর সংবাদমাধ্যমই বলুন— সকলেই বলত যে পশ্চিমবঙ্গের বিরাট সমস্যা হল বেকার সমস্যা। গত একমাসে বেকার সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, প্রধান হয়ে গেছে হকার সমস্যা। হকাররা কার সমস্যা? এখন পর্যন্ত তাঁরা রেলের সমস্যা। কেন? না তাঁরা গোটা রাজ্যজুড়ে রেলের জমি দখল করে রেখেছেন। সম্ভবত সেই কারণেই লোকাল ট্রেন ঠিক সময়ে চলছে না, দূরপাল্লার ট্রেন ৩-৪ ঘন্টা লেট। রেলের জমি দখলমুক্ত হলেই স্টেশনগুলো হয়ে যাবে হলিউডি সিনেমার স্টেশনগুলোর মত। শিয়ালদা বা হাওড়া স্টেশন দখলমুক্ত করা হয়েছে, বাকিগুলোকেও করতে পারলেই আমাদের আর পাঁচ টাকার ভাঁড়ের চা বাদাম বিস্কুট দিয়ে খেতে হবে না। আমরা উন্নত দেশের লোকেদের মত এই অসহ্য গরমে আড়াইশো-তিনশো টাকার আইসড টি বা কোল্ড কফি খাব, সঙ্গে থাকবে কনফেকশনারির সম্ভার। যে নিত্যযাত্রীদের স্টেশনে পৌঁছলেই খিদেয় পেট চুঁই চুঁই করে, তাঁদেরও আর ডিম-পাঁউরুটি, ঘুগনি, মুড়ি-তরকারি— এ সমস্ত ছাইপাঁশ খেয়ে থাকতে হবে না। গত নভেম্বরেই রেল বোর্ড খাবারদাবার সম্পর্কে নিয়ম বদলে স্টেশন চত্বরে কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ড’স, পিৎজা হাট, হলদিরামদের দোকান খোলার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু দোকান খুলবে কোথায়? হকাররা বসে আছেন যে। হকারদের পাশেই দোকান খুললেও চলবে না। কজন আর ভাঁড়ের চা থাকতে লাটে, ফ্র্যাপে, ক্যাপুচিনো খেতে যাবে? এই সমস্যার সমাধান করতেই হত। অতএব পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার রেলের জায়গা খালি করতে নেমেছে।

যতই আসুক বিঘ্ন বিপদ, হাওয়া হোক প্রতিকূল, সরকার হকার ও বস্তি উচ্ছেদ করেই ছাড়বে। কাজটা দক্ষভাবে করতে রাজ্যের মুখ্যসচিবকে চেয়ারম্যান করে, রেলমন্ত্রক আর রাজ্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি আর কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে নিয়ে গঠন করা হয়েছে টাস্ক ফোর্স। টাস্কটি এমন যে ফোর্স ব্যবহার করতেই হবে। প্রথমে কেবল হকার উচ্ছেদ, বস্তি উচ্ছেদ চলছিল। এখন দেখা যাচ্ছে উত্তরপাড়া বা কোন্নগরের মত জায়গায় হকার উচ্ছেদের সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে টোটো স্ট্যান্ড, অটো স্ট্যান্ড স্টেশন চত্বর থেকে সরিয়ে দেওয়ার কাজকে। আপনি বয়স্ক হতে পারেন, অসুস্থ হতে পারেন, প্রতিবন্ধী হতে পারেন। আইন আপনাকে মানতেই হবে, অর্থাৎ ৫০/৬০/১০০ মিটার দূর থেকে হেঁটে স্টেশনে আসতে হবে। আইন সকলের জন্য এক। কথাটা আমাদের সংবিধানে লেখা আছে। তাই আমরা যারা লেখাপড়া শিখেছি খানিকটা, মাথার উপরে পাকা ছাদ আছে এবং ঘরে এসি, গ্যারেজে গাড়ি আছে— তারা চাই আইন একেবারে অক্ষরে অক্ষরে পালিত হোক। রেলের জমিতে কেবল রেলের জিনিস থাকবে। দোকান কেন থাকবে? ঘরবাড়ি কেন থাকবে? অটো, টোটো কেন দাঁড়াবে?

ঠিক কথা। আমার জমিতে যেমন কেবল আমার সম্পত্তিই থাকতে পারে। সেখানে অন্য কাউকে কিছু করতে গেলে আমার অনুমতি নিতে হবে, আমার থেকে জমি কিনতে হবে বা লিজ নিতে হবে। নিদেনপক্ষে আমাকে ভাড়া দিতে হবে। রেলের বেলাতেই বা অন্য নিয়ম হবে কেন? তুমি গরিব বলে নিয়মকানুন মানবে না? যাদবপুর হোক আর ব্যারাকপুর। তোমাকে উঠে যেতেই হবে, না উঠলে বুলডোজার দিয়ে তুলে দেওয়া হবে। আইনে বুলডোজারের কথা কোথায় লেখা আছে সেটা অবশ্য জানা একটু শক্ত। আইনে বরং আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথা আছে, দেশের সব আইনেই থাকে। কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশেও যে আইনের কিছু এসে যায় না সেটা যাদবপুরের ক্ষেত্রে দেখা গেল। যাক সে কথা। দুনিয়া জুড়েই তো দেখা যাচ্ছে একটা আইনই স্বতঃসিদ্ধ— জোর যার মুলুক তার। নাহয় আমাদের এখানেও তাই হল। তাছাড়া অতীতে কি কখনো হকার উচ্ছেদ হয়নি? ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিপুল জয় পাওয়ার পরে পরেই তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারও করেছিল, তার বহু আগে বামফ্রন্ট সরকার কলকাতা শহরে ‘অপারেশন সানশাইন’ করেছিল। রেল করলেই দোষ?

হক কথা। আইন মেনে চলা উচিত, তার বাইরে কারও পা দেওয়া উচিত নয়। স্ট্রিট ভেন্ডার্স (প্রোটেকশন অফ লাইভলিহুড অ্যান্ড রেগুলেশন অফ স্ট্রিট ভেন্ডিং) অ্যাক্ট, ২০১৪ নামে একখানা আইন আছে। সেই আইনে বলে আছে, ততক্ষণ রাস্তার বিক্রেতাদের উচ্ছেদ করা যাবে না যতক্ষণ না টাউন ভেন্ডিং কমিটি সমস্ত বিক্রেতাদের বিষয়ে সমীক্ষা চালাচ্ছে এবং তারা যে বিক্রেতা, সেই সার্টিফিকেট দিচ্ছে। তারপর কোনো প্রয়োজনে ওইসব দোকান সরানোর দরকার থাকলে বিক্রেতাদের কমপক্ষে ৩০ দিনের নোটিশ দিতে হবে। আরও বলা আছে, উচ্ছেদ শেষ অস্ত্র। বরং বিক্রেতাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের অন্যত্র ব্যবসা করার সুযোগ দিতে হবে এবং এমন জায়গা চিহ্নিত করে দিতে হবে যেখানে তাঁরা ব্যবসা চালাতে পারেন। এই আইন অবশ্য চালু হয়েছিল ১ মে ২০১৪, মানে নরেন্দ্র মোদীর সরকার তৈরি হওয়ার হপ্তা দুয়েক আগে। এমন হতেই পারে যে আইনটি ওঁদের পছন্দ নয়। ওঁরা মনে করছেন এসব আদিখ্যেতা। তাহলেও তো আইনটি আগে বদল করতে হবে সংসদে পাশ করিয়ে। রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে স্বাক্ষর করাতে হবে। অবশ্য উন্নয়নে দেরি করা ঠিক নয়। সোনার বাংলা যত তাড়াতাড়ি বানানো যায় তত ভালো। সেক্ষেত্রে অত আইনকানুনের তোয়াক্কা করলে চলবে না।

আরও পড়ুন এসএসসি: স্থান কাল পাত্র গুলিয়ে যাওয়া সাংবাদিকের স্বীকারোক্তি

বোধহয় এই সূত্র মেনেই দিকে দিকে উচ্ছেদ চলছে। তবে ওই রেলের জমি সম্পর্কে দু-একখানা কথা আছে। রেল তো বি আর চোপড়ার বানানো দূরদর্শনের মহাভারতের কালচক্র নয় যে আদি অনন্তকাল ধরে ছিল। ১৮৫৩ সালের আগে ভারতে রেল বলে কিছু ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের রেলপথ এবং যেসব স্টেশনে উচ্ছেদ হয়েছে এখন পর্যন্ত, তাদের বয়স আরও কম। তা এই স্টেশনগুলো বানানোর জন্য রেল জমি পেল কোথায়? রেলের আগে এসব জমির মালিক ছিল কারা? ভারতের বহু সরকারি স্কুল, কলেজ, হাসপাতালের মত রেলের ইতিহাস ঘাঁটলেও দেখা যাবে যে এইসব জমি এক বা একাধিক ব্যক্তির সম্পত্তি ছিল। কোথাও বা কোনো গোষ্ঠীর সম্পত্তি ছিল। তাঁদের থেকে যৎসামান্য দামে, কখনো বা বিনামূল্যে রেল এইসব জমি পেয়েছিল। মানুষ সানন্দে দিয়েছিলেন, কারণ রেল হলে অনেক মানুষের সুবিধা হবে, তাঁদের নিজেদেরও হবে। সরকারি সম্পত্তি কথাটার ইংরিজি যে public property, সে তো আর এমনি এমনি নয়। এই পাবলিকের মধ্যে কিন্তু স্টেশন চত্বরের দোকানদার, টোটোচালক, অটোচালক— সবাই পড়েন। ফলে রেলের মালিক তথা রেলের জমির মালিক তাঁরাও। অন্তত যতক্ষণ না ভারতীয় রেল সরকারি সম্পত্তি থেকে এক বা একাধিক কর্পোরেটের সম্পত্তি হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং বক্তব্য যদি এই হয় যে, রেলকে ভাড়া দিচ্ছ না বা লিজ নাওনি বলে তোমাকে রেলের এলাকায় ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না, তাহলে সমাধান খুব সহজ। এই হকার, বস্তিবাসী, টোটোচালক, অটোচালকদের সঙ্গে কাগজে কলমে চুক্তি করা। তাতে রেলেরও আয় হয়, এঁদেরও চোখের জল ফেলতে হয় না।

অবশ্য যদি উচ্ছেদই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এসব ভাবার প্রয়োজন নেই। সরকারি সম্পত্তি মানে যে আসলে নাগরিকের সম্পত্তি— সেকথা কজন নাগরিকই বা জানে, বোঝে এবং বিশ্বাস করে? সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সকলকে জানানোর ব্যবস্থা তো কোনোদিন করাই হয়নি। আর এখন তো কে নাগরিক তা ঠিক করছে রাষ্ট্র। ফলে যদি কাল রেলের জমিতে ব্যবসা করা বা বসবাস করা মানুষকে অনাগরিক বলে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়, তাহলেই মুশকিল আসান। যে নাগরিক নয় তার আবার অধিকার কী? বুলডোজার চালানোর চেয়ে এটা করা সহজ কাজ। বুলডোজার চালিয়ে দোকানপাট, ঘরদোর ভেঙে দিতে গিয়ে খামোকা বহু জায়গায় রক্তারক্তি হচ্ছে। সরকারবিরোধী নেতাদের হাজতে পুরতে হচ্ছে। তাতে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন নতুন করে তৈরি হচ্ছে। এসব বাজে ঝামেলার কোনো মানে হয়?

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

Exit mobile version